📄 তওবা : ক্ষমা প্রার্থনা এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসা
আর তোমরা তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁরই নিকট ফিরে এসো। নিশ্চয়ই আমার রব পরম দয়ালু, অতীব স্নেহময়। সূরা হুদ: ৯০
হে আদমসন্তান! আমাকে বেশি বেশি করে ডাকো এবং আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো এবং কিছু মনে করব না। হে আদমসন্তান! তোমার পাপ যদি আকাশের মেঘ পর্যন্ত পৌঁছে যায় আর আমার কাছে ক্ষমা চাও, তবুও তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। এমনকী যদি এক পৃথিবী সমান পাপ নিয়েও আমার কাছে আসো এবং এমন অবস্থায় আসো—তুমি আমার সাথে কাউকে শরিক করোনি, তাহলে তোমার সামনে আমি এক পৃথিবী সমান ক্ষমা নিয়ে হাজির হব। [১০৫]
আমরা যতই নষ্ট হয়ে যাই না কেন, আল্লাহর কাছ থেকে যত দূরেই চলে যাই না কেন, অতীতে যা-ই করে থাকি না কেন, আমাদের পাপের বোঝা যত ভারীই হোক না কেন, আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমা ও অনুগ্রহ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তওবার চর্চা আমাদের জন্য দেওয়া আল্লাহর সবচেয়ে বড়ো উপহার। তওবা শব্দের অর্থ অনুশোচনা হলেও শব্দটির আভিধানিক অর্থ- ফিরে আসা। তওবা হলো প্রত্যাশার সাথে এ কথা স্মরণ করা-আমাদের অমর আত্মা পার্থিব কোনো ভুলের মাধ্যমে বিকৃত হতে পারে না।
আমরা যখন ক্ষমা প্রার্থনার জন্য আল্লাহর দিকে ফিরি, তখন আমাদের হৃদয় সেই অবস্থানে চলে যায়, পাপের কারণে যে অবস্থানের ওপর আবরণ পড়ে গিয়েছিল। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'চক্ষু অন্ধ হয় না; বরং বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়ে যায়।' সূরা হজ: ৪৬
তওবা আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে দেয়, যাতে আল্লাহর নুর সেখানে প্রবেশ করতে পারে। তওবা আমাদের ভেতরে ঐশী অন্তর্দৃষ্টি এনে দেয়। ফলে আমাদের চেতনার দৃষ্টি সৃষ্টিজগৎ থেকে সরে এসে আল্লাহর ভালোবাসার প্রতি নিবদ্ধ হয়।
আমরা যখন আন্তরিকভাবে তওবা করি, তখন আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাই এবং আমাদের পাপগুলো আল্লাহর অনুগ্রহ দিয়ে মুছে দেওয়ার প্রার্থনা জানাই। অর্থাৎ তওবা আমাদের আল্লাহর অনুগ্রহ ও ভালোবাসার সাথে যুক্ত করে দেয়।
ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহর পথনির্দেশের শুরু ও সমাপ্তি
মানুষের প্রথম প্রার্থনা ছিল আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। আদম ও মা হাওয়া (আ) যখন নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেলেন এবং বুঝতে পারলেন তাঁরা ভুল করেছেন, তখন প্রার্থনা করলেন-
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন আর দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।' সূরা আ'রাফ: ২৩
আল্লাহ তাঁদের ডাকে সাড়া দিলেন এবং তাঁদের ক্ষমা করে দিলেন। কুরআনে বিষয়টি এভাবে এসেছে-
'অতঃপর আদম তাঁর রবের পক্ষ থেকে কিছু বাণী পেল, ফলে আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করলেন। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী, অতি দয়ালু।' সূরা বাকারা: ৩৭
মানব সৃষ্টির সূচনা থেকে আমাদের যে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে, তা হলো- আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং পরকালের বিচার দিবসেও আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাই করব। জান্নাতে প্রবেশের সময় আমরা এভাবে প্রার্থনা করব-
'হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।' সূরা আত-তাহরিম : ৮
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই; বরং আল্লাহ চান, আমরা যেন তাঁর কাছে ক্ষমা চাই।
'তোমার যে ভালো কর্ম তোমাকে অহংকারী করে, তার চেয়ে হাজারগুণ ভালো তোমার সেই মন্দ কর্ম, যা জন্য তোমাকে অনুতপ্ত করে।' -আলি (রা)
ক্ষমা প্রার্থনার আরবি হলো ইস্তেগফার এবং এটি 'আল মিগফার' শব্দের সাথে সংশ্লিষ্ট, যার অর্থ-ক্ষতিকর কোনো কিছু থেকে মাথা ঢেকে রাখা। অন্য কথায়, ইস্তেগফার আপনার পাপগুলোকে আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহ দিয়ে ঢেকে রাখে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তুমি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না এবং যখন তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে-এরূপ অবস্থায়ও আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না।' সূরা আনফাল : ৩৩
আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা আমাদের কৃতকর্মের পরিণাম থেকে আল্লাহর সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ইস্তেগফার কেবল পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাই নয়; বরং আমরা যথেষ্ট ইবাদত করতে পারছি না- সেজন্যও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। মানুষ হিসেবে আমরা আল্লাহর যত ইবাদতই করি না কেন, তা আল্লাহর অনুগ্রহের সাথে তুলনা করলে কোনো মতেই যথেষ্ট নয়। তাই আমরা আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ইবাদতের অসম্পূর্ণতার কারণে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।
'তোমরা কেন আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো না, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও?' সূরা নামল: ৪৬
আমরা যখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, তখন আল্লাহ আমাদের উচ্চতর স্থানে উন্নীত করেন। যেমনটি নুহ (আ) বলেছিলেন-
'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর অনুশোচনাভরে তাঁর দিকেই ফিরে যাও। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের শক্তিকে আরও শক্তি দিয়ে বৃদ্ধি করে দেবেন; আর অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।' সূরা হুদ: ৫২
আমরা যখন ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরি, তখন আল্লাহ জবাবে তাঁর ক্ষমা, করুণা ও দয়ার বৃষ্টি দিয়ে আমাদের সিক্ত করেন। ত্রুটিমুক্ত হয়ে নয়; ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমেই কেবল আল্লাহর অনুগ্রহের সমুদ্রের সন্ধান পাওয়া সম্ভব।
আল্লাহর এককত্বের কাছে ফেরা
আমাদের হৃদয়ের ভেতরে এক আল্লাহর সামনে যে মিথ্যা খোদাগুলোকে আমরা স্থাপন করেছি, ক্ষমা প্রার্থনার মানে হলো- সেগুলোর অপসারণ। আমরা পাপ করি যা কিছু পাওয়ার বাসনা থেকে, তা একমাত্র আল্লাহই আমাদের দিতে পারেন। তাই এক একটা পাপ করার সাথে সাথে আমাদের হৃদয়ে এক একটি মিথ্যা খোদা তৈরি হয়। ক্ষমা প্রার্থনা মিথ্যা খোদাগুলোকে একে একে সরিয়ে দেয়।
আল্লাহ যখন আমাদের কোনো পাপের কথা মনে করিয়ে দেন, তখন এর মাধ্যমে মূলত তিনি আমাদের শাস্তি দেন না; বরং তাঁর দিকে আমাদের আহ্বান করেন। অষ্টম শতকের সাধক রাবেয়া বসরিকে এক লোক প্রশ্ন করেছিল- 'আমি অনেক পাপ করেছি। যদি আমি তওবা করি, আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?'
রাবেয়া বসরি জবাবে বলেছিলেন- 'বিষয়টি এর ঠিক উলটো। আল্লাহ যদি তোমাকে ক্ষমা করেন, তবেই তুমি তওবা করতে সক্ষম হবে।'
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তিনি তোমাদের আহ্বান করেন তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করার জন্য।' সূরা ইবরাহিম: ১০
তওবা অর্থ ফিরে আসা। এর মানে হলো, প্রতিটি মুহূর্তেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। তওবা আমাদের হৃদয়ের ভেতর আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহকে ধারণ করার জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়।
শুরু করুন এখনই
আল্লাহর দিকে ফিরে আসার যাত্রা সেখান থেকে শুরু হয়, যেখানে আমরা আছি। ঈমানে ফিরে আসার জন্য অন্য কোনো যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজন নেই; আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্তিই হলো এর জন্য প্রয়োজনীয় একমাত্র যোগ্যতা। অন্যকথায়, কোনো কিছুই এতখানি ভেঙে যায় না বা এতখানি নষ্ট হয় না যে, সেই আল্লাহ একে শুধরে দিতে বা মেরামত করতে পারবেন না; যিনি জগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-'পানি ময়লাকে বলল, আমার কাছে এসো। ময়লা বলল-আমি লজ্জা পাচ্ছি। পানি বলল-আমি ছাড়া কে আছে তোমার লজ্জা ধুয়ে দেবে?' এমনকী যদি আমরা একই অপরাধ বারবারও করি, তবুও আল্লাহ বারবার তাঁর অনুগ্রহের পানি দিয়ে আমাদের অপরাধগুলো ধৌত করে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। জেনে রাখুন, আপনার পাপের বোঝা যত বড়োই হোক না কেন, তা আল্লাহর করুণার চেয়ে বড়ো নয়।
'হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' সূরা জুমার: ৫৩
মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন- 'শয়তান বলল-"আপনার সত্তার শপথ হে প্রভু! আমি আদমের সন্তানদের বিভ্রান্ত করেই যাব, যতক্ষণ না তাদের আত্মা তাদের শরীর ত্যাগ করবে।” আল্লাহ বললেন- “আমার সত্তা ও গৌরবের শপথ! আমি তাদের ক্ষমা করেই যাব, যতক্ষণ তারা আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে থাকবে। "' [১০৬]
প্রকৃতপক্ষে সে-ই সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগা, যে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনাহীন জীবনযাপন করে। আল্লাহ হলেন 'আফউ' বা ক্ষমাকারী, যাঁর ক্ষমাশীলতা মহাসাগরের চাইতেও বিশাল। তিনি আমাদের পাপের সকল রেকর্ড এমনভাবে মুছে দেন, যেন ওই রেকর্ডে কোনো কালে কিছুই ছিল না।
'তোমার রবের সপ্রশংস তাসবিহ পাঠ করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী।' সূরা নাসর: ৩
যদি আপনি দেখেন-আপনি কুপ্রবৃত্তির সেই প্ররোচনায় আবার পড়েছেন, যে প্ররোচনাকে আপনি আগেই জয় করেছেন বলে ভেবেছিলেন, তাহলে হতাশ হবেন না। ভুল করা ও ফিরে আসার প্রক্রিয়াটি অনেকটা স্পাইরালের মতো। আপনি হয়তো ভাবছেন, আপনি পেছনে চলে গেছেন; কিন্তু আপনি জানেন না, আপনি আরও গভীরে প্রবেশ করেছেন। তওবার চর্চা হলো আপনার ভেতকার এমন আধ্যাত্মিক সংশোধন, যার মাধ্যমে আপনি আপনার হৃদয় ও সংকল্পকে আবার আল্লাহর সাথে যুক্ত করতে পারেন।
অন্তরের কুপ্ররোচনাকে প্রার্থনায় পরিণত করুন
আধ্যাত্মিকতার পথে এগিয়ে যাওয়া ও আল্লাহওয়ালা (মুত্তাকি) হয়ে যাওয়ার মানে এই নয় যে, আমাদের আর পরীক্ষা করা হবে না এবং আমরা আর মনের কুপ্ররোচনার শিকার হব না; বরং বিষয় হলো-আপনি আধ্যাত্মিকতার পথে যতই এগিয়ে যাবেন, অন্ধকার ও পাপ ততই আপনাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে থাকবে। আকাশে নক্ষত্র সব সময় থাকে, কেবল রাতের অন্ধকারেই আমরা সেগুলো দেখতে পাই। কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের ডাক তেমন সব সময়ই বিরাজ করে। কুপ্ররোচনার শিকার হওয়া না হওয়ার মধ্যে আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দা ও আল্লাহর দূরবর্তী বান্দার মধ্যকার পার্থক্য সূচিত হয় না; পার্থক্য সূচিত হয় উভয়ের মনোযোগ নিবদ্ধের স্থান নির্বাচনের মধ্যে।
আমরা যতই আল্লাহর নুরের দিকে ফিরি, আমাদের মনের আকাশ ততই উজ্জ্বল হতে থাকে এবং কুপ্রবৃত্তির নক্ষত্রগুলো ততই নিষ্প্রভ ও বিলীন হতে থাকে। কুপ্ররোচনাকে জয় করার জন্য নিজের ওপর নির্ভর করতে নয়, আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়তে বলা হয়েছে। শয়তান আমাদের ত্রুটি প্রবণতাকে ব্যবহার করে বোঝায় যে, আমরা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য উপযুক্ত নই। তাই মনে রাখতে হবে, আমরা যদি শয়তানের সাথে একা লড়াই করি, তাহলে আমরা সব সময় পরাজিত হব। শয়তানকে পরাজিত করার একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর সাহায্য নেওয়া।
'নিশ্চয়ই যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, শয়তানের স্পর্শে তাদের মনে কুমন্ত্রণা জাগলে তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন তাদের দৃষ্টি খুলে যায়।' সূরা আ'রাফ: ২০১
শয়তানের কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে লড়াই করার পূর্বে আপনার কর্তব্য হলো-আগে আল্লাহর কাছে ধরনা দেওয়া। যখনই আপনি কোনো কুমন্ত্রণা অনুভব করবেন, আপনার মন যখন আপনাকে এমন কোনো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করবে-যা আল্লাহর নির্দেশের লঙ্ঘন কিংবা আপনি যে কাজটি করার সংকল্প করেছেন, কিন্তু আপনি দ্বিধাগ্রস্ত যে কাজটি সঠিক কি না, এমতাবস্থায় সাথে সাথে আল্লাহর কাছে দুআ করুন, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে সুরক্ষা কামনা করুন।
শয়তানের কথাগুলো সাধারণত এমন হয়-তুমি তো যথেষ্ট আল্লাহওয়ালা মানুষ নও... ত্রুটি-বিচ্যুতি তো তোমার হয়েই থাকে... তুমি তো পাপী লোক... কাজটি তেমন বড়ো কোনো পাপের কাজ নয়... একবার শুধু কাজটি করো, পরে কখনো আর এমনটি করো না... আল্লাহ এতে তেমন কিছু মনে করবেন না... তুমি যত খারাপ কাজই করো না কেন, তিনি তোমার কোনো ক্ষতি করবেন না... অতএব, তোমার মন যা চায় তা করো।
আপনি শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব করলে এর বিরুদ্ধে লড়তে যাবেন না কিংবা এর ভেতর ডুবে যাবেন না; বরং আল্লাহর কাছে দুআ করুন এবং লড়াইটা আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিন। শয়তান যদি আপনাকে কোনো কিছুর প্রলোভন দেখায়, আপনার প্রার্থণাকে আরও গভীর করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করুন। শয়তান যদি আপনাকে প্রার্থনা বন্ধ করতে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহকে বলুন, তিনি যেন নামাজে আপনার মনোযোগ বৃদ্ধি করে দেন। শয়তান যদি আপনার ত্রুটিগুলোর কারণে আপনাকে লজ্জা দেয়, তাহলে আল্লাহর কাছে আপনার সংকল্পকে পবিত্র করার সাহায্য প্রার্থনা করুন। শয়তান যখনই আপনার দুর্বল জায়গায় আঘাত হানবে, তখনই আপনি ঈমান মজবুত করার বাসনায় আল্লাহর কাছে আসার চেষ্টা করবেন।
আমরা যখন আল্লাহর নুর থেকে আড়ালে চলে যাই (যেমনটি সূর্যের আলো থেকে পৃথিবী আড়ালে চলে যায়), তখন আমরা আধ্যাত্মিকভাবে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাই। আল্লাহর শাস্তির কারণে অন্ধকার আমাদের গ্রাস করে না। অন্ধকার গ্রাস করে এ কারণে যে, ইচ্ছার স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও আমরা সত্যের আলো থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবশ্য এ অন্ধকার একটি মায়া বা বিভ্রম মাত্র। আল্লাহ আমাদের ফুসফুসের ভেতরের নিশ্বাসের চাইতেও নিকটে অবস্থান করেন।
তওবার সবচেয়ে বড়ো মহিমা হলো তওবার মাধ্যমে পাপগুলো পুণ্যে পরিণত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তারা ছাড়া; যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' সূরা ফুরকান: ৭০
আল্লাহ ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। তিনি চান আমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাই। তওবা হলো আল্লাহর সীমাহীন দয়ার মহাসমুদ্রে প্রবেশের একমাত্র পথ।
'আমাদের প্রতিপালক প্রতিরাতের শেষ তৃতীয়াংশে সর্বনিম্ন আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন- “কে আছ আমাকে ডাকার, যার ডাকে আমি সাড়া দেবো? কে আছ আমার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার, যা আমি তাকে দান করব? কে আছ আমার ক্ষমা চাওয়ার, যাকে আমি ক্ষমা করব?” [১০৭]
আল্লাহর দিকে ফেরা
আমরা যখন তওবা করি, তখন আমরা একদিকে আমাদের পাপসমূহ থেকে ফিরে আসি এবং অন্যদিকে আল্লাহর সরল-সঠিক পথের সাথে নিজেকে একাত্ম করে দিই। আমাদের অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে, তবে সাথে সাথে অবশ্যই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে যেতে হবে।
'আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।' সূরা রা'দ: ১১
পাপ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর নুরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে সবকিছুই বদলে যায়। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন-
'যে দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যার সৃষ্টি, একই দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটির সমাধান অসম্ভব।'
তওবা আমাদের হৃদয়ের অবস্থান বদলে দেয়, আমাদের চেতনাকে নিজের অহং থেকে সরিয়ে আল্লাহর স্মরণের সাথে যুক্ত করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন, ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও।' সূরা বাকারা: ২২২
তওবা পাপের মায়াজাল ছিন্ন করে আমাদের আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ পাইয়ে দেয়।
আল্লাহর ক্ষমার অসীম ক্ষমতা
মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর ক্ষমার একটি বিস্ময়কর ঘটনা তাঁর সাহাবিদের শুনিয়েছেন-
'এক লোক ৯৯ জন মানুষকে হত্যার পর হঠাৎ অনুশোচনা বোধ করল এবং আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ সন্ধান করতে শুরু করল। একজন আলিম ব্যক্তিকে খুঁজে পেয়ে সে তাকে জিজ্ঞেস করল-যদি সে তওবা করে, আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করবেন কি না। আলিম ভুল করে জবাবে বলল-তার ক্ষমা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। লোকটি রাগান্বিত হয়ে তাকেও হত্যা করল।
এরপর লোকটি একজন বিখ্যাত আলিমকে খুঁজে বের করে বলল-সে ১০০ জন মানুষকে হত্যা করেছে, তার কি ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না। আলিম ব্যক্তিটি জানতেন, ওই লোকটির পরিবর্তনের জন্য তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজন। অতএব, সে জবাবে বলল- “তুমি ও তোমার তওবার মাঝে কে আছে? তুমি ওই জায়াগায় যাও, যেখানকার লোকেরা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে। তাদের সাথে যোগ দিয়ে ইবাদত করতে থাকো। আর তোমার নিজ ভূমিতে ফিরে এসো না। কেননা, এ জায়গা নষ্ট হয়ে গেছে।"
লোকটি আন্তরিকভাবে তওবা করল এবং ঈমানদার লোকদের পবিত্র ভূমির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছার আগেই লোকটি মারা গেল। তার মৃত্যুর পর রহমতের ফেরেশতা ও শাস্তির ফেরেশতা উভয়ই এলো এবং তার আত্মা নেওয়ার জন্য বিতর্কে লিপ্ত হলো। রহমতের ফেরেশতা বলল-"লোকটি আল্লাহর কাছে এসেছে তওবাযুক্ত হৃদয় নিয়ে।" শাস্তির ফেরেশতা বলল-“সে তার সারাজীবনে একটি পুণ্যের কাজও করেনি।"
তখন আল্লাহ বিষয়টির মীমাংসা করার জন্য মানুষের বেশে তৃতীয় একজন ফেরেশতাকে সেখানে পাঠালেন। মধ্যস্থতাকারী ফেরেশতা বললেন-“দুটি ভূমির মধ্যকার দূরত্ব মাপো। লোকটির মৃতদেহ থেকে যে ভূমির দূরত্ব কম হবে, সে অনুযায়ী তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে।” ফেরেশতার দূরত্ব মেপে দেখলেন, লোকটির অবস্থান পুণ্যময় ভূমির নিকটে। অতএব, রহমতের ফেরেশতা তার আত্মা নিয়ে গেল (কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে-দূরত্বের পরিমাপ প্রথমে লোকটির বিপক্ষে গিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ দিয়ে লোকটির পক্ষে জমিনকে প্রসারিত করে দিয়েছেন)।' [১০৮]
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-শেষ বিচারের দিবসে যারা অন্যায় করেছে, অপরকে কষ্ট দিয়েছে বা হত্যা করেছে, তাদের ওপর পূর্ণ ন্যায়বিচার করা হবে। উপরিউক্ত ঘটনা থেকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ঠিক হবে না যে, আমরা যা ইচ্ছা করব এবং এরপর পরোক্ষভাবে ক্ষমা চেয়ে নেব; বরং এ ঘটনার শিক্ষা হলো-আমরা যদি আন্তরিকভাবে ফিরে আসি, তাহলে আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহপ্রাপ্ত হব এবং চরম মাত্রার অপরাধ করার পরও আল্লাহর কাছে ফিরে এলে তিনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আরও শিক্ষা হলো, আমাদের মানুষকে আশার আলো দেখাতে হবে, হতাশ করা যাবে না। ভয় দেখিয়ে বা লজ্জা দিয়ে কোনোদিন কাউকে বদলানো যায় না। মানুষকে বদলে দেওয়া যায় তার সামনের পথকে সহজ করে উপস্থাপনের মাধ্যমে। আল্লাহর ভালোবাসা ও প্রেমের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করেই মানুষকে বদলে দিতে হয়।
ইমাম গাজালি বলেছেন-
'ধর্মে মানুষের অবিশ্বাসের অর্ধেক কারণ হলো-সেই সব ধার্মিক মানুষ, যারা নিজেদের ভয়ানক আচরণ ও বিপজ্জনক কথাবার্তার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার প্রতি মানুষের মনে ঘৃণার চাষাবাদ করে চলেছে।'
মানুষের বিচার করা আমাদের কাজ নয়; বরং ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের ভেতরের সম্ভাবনা বিকাশের চেষ্টা করাই আমাদের কাজ।
'সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও বীতশ্রদ্ধ করো না।' [১০৯]
নিজেকে মুক্ত করার জন্য অপরকে ক্ষমা করুন
তওবা মানে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টির কাছেও আল্লাহর দয়া, করুণা, অনুগ্রহ ও ক্ষমার প্রতিবিম্ব হিসেবে ফিরে আসা। আপনি যখন অপরকে ক্ষমা করেন, তখন আপনার আয়নায় একটি ফ্লাশলাইট জ্বলে ওঠে। ফলে যে রহমত আপনি অপরের প্রতি প্রেরণ করছেন, একই রহমত আপনি নিজের জন্যও ফিরে আসছে।
'আর ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো তা দ্বারা, যা উৎকৃষ্টতর। ফলে তোমারও যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে, সে যেন হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।' সূরা হা-মিম সিজদা : ৩৪
ক্ষমা তখনই করা সম্ভব হয়, যখন আপনি মানুষের ভেতকার সহজাত কল্যাণময়তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং মানুষের অসৎকর্মের বিষয়গুলোকে অগ্রাহ্য করে চলেন। যে আপনার সাথে মন্দ আচরণ করেছে, তার প্রতি মন্দ আচরণ উপহার দেওয়া হলো জঙ্গলে জ্বলে উঠা আগুন নেভানোর জন্য সে আগুনে পেট্রোল ঢালার মতো। বিশ্ববিখ্যাত মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন-
'অন্ধকার কখনো অন্ধকার দূর করতে পারে না; একমাত্র আলোই পারে অন্ধকার দূর করতে। ঘৃণা কখনো ঘৃণাকে মিটিয়ে দিতে পারে না; একমাত্র ভালোবাসাই পারে ঘৃণাকে মিটিয়ে দিতে।' [১১০]
ক্ষমা একদিকে অপরকে তার ভুলের খাঁচা থেকে মুক্ত করে দেয়, অন্যদিকে আমাদের নিজেদেরও দোষারোপের কারাগার থেকে মুক্ত করে দেয়। যখন আমরা অপরকে ক্ষমা করে দিই, তখন আমাদের মাথার ওপর চেপে বসা অপরের সীমালঙ্ঘনের বোঝা নামিয়ে দিয়ে হালকা হয়ে যাই।
মহানবি (সা) বলেছেন-
'যে তোমার সাথে মন্দ আচরণ করে, তার সাথে মন্দ আচরণ করো না; বরং তার সাথে ক্ষমাশীলতা ও দয়ার্দ্র আচরণ করো।' [১১১]
এমনকী কেউ যদি ক্ষমা না চায়, 'স্যরি' না বলে কিংবা ক্ষমা চাইলেও তা যদি আন্তরিক না হয়, তবুও তাকে ক্ষমা করতে বলা হয়েছে। এ কারণে ক্ষমা করতে বলা হয়নি যে, তার ক্ষমা প্রয়োজন; বরং এ কারণে ক্ষমা করতে বলা হয়েছে, আমাদের নিজেদের হৃদয়ের শান্তি প্রয়োজন। আমরা যখন অপরকে শান্তি দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে নিজের ভেতর ক্রোধ ও রাগ পুষে রাখি, তখন আমরা অপরের চেয়ে নিজেরই বেশি ক্ষতি করি। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন-'অপরের প্রতি রাগ পুষে রাখার মানে হলো-নিজে বিষ পান করা এবং আশা করা যে, অপর লোকটি মারা যাবে।' অপরকে ক্ষমা করে দেওয়ার মানে হলো-নিজের রাগের শৃঙ্খল থেকে নিজেকে মুক্ত করে দেওয়া। আধ্যাত্মিক পথের বেলায় অপরের প্রতি অনুগ্রহশীল হওয়া হলো আল্লাহর অনুগ্রহ প্রাপ্তির সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন মাধ্যম।
'যে অপরের প্রতি দয়া করে, দয়ময় আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন।' [১১২]
অপরের প্রতি ক্ষমা করার সুযোগ হলো, আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের দেওয়া উপহারস্বরূপ। কেননা, সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য, স্নেহ-মমতা ও দয়াশীলতার গুণাবলি দিয়ে আমাদের তাঁর নিকটস্থ হওয়ার আহ্বান জানান। অপরকে ক্ষমা করলে একদিকে যেমন আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনি বিনিময়ে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়া যায়। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয়, সে পাপ থেকে পবিত্র হয়ে যায়।' সূরা মায়েদা : ৪৫
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যখন আমরা অপরকে ক্ষমা করে দিই, তখন বিনিময়ে আল্লাহ আমাদের সেই সব পাপ ক্ষমা করে দেন, যেগুলো আমাদের হৃদয়কে ভারী করে রেখেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিক? আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল, বড়োই দয়ালু।' সূরা নুর: ২২
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, আল্লাহ আমাদের ন্যায়বিচার চাওয়ার অধিকার দিয়েছেন। তবুও আমাদের সাথে অন্যায় করা হলে আমরা নিজেকে প্রশ্ন করে দেখতে পারি-ক্ষমা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে আমরা নিজেরা আল্লাহর ক্ষমার স্বাদ পাওয়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছি না তো? আল্লাহ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধগুলোকেও ক্ষমা করতে বলেছেন। কেননা, আল্লাহ স্বয়ং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধগুলোকে অবিরতভাবে ক্ষমা করে চলেছেন।
একজন সুফি সাধক বলেছেন- 'ফুলের মতো হও, ফুল সবার কাছে তার সুগন্ধ ছড়িয়ে চলেছে; এমনকী তার কাছেও, যে নিজ হাতে ফুলকে নষ্ট করে।' আমাদের সাথে কেউ অন্যায় করলেও বিনিময়ে আমরা তার প্রতি অন্যায় করব না। কেননা, আল্লাহর প্রেমিক হিসেবে আমাদের আল্লাহর প্রেমের গুণাবলি নির্বিশেষে সকল সৃষ্টির প্রতি প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। ক্ষমা মানে এই নয় যে, আমরা অপরের কাছ থেকে তার দায়িত্ব বুঝে নেব না; বরং ক্ষমা মানে হলো-দয়া, স্নেহ, মমতা ও অনুগ্রহের চর্চা।
সার্বক্ষণিক ক্ষমা প্রার্থনা
মহানবি দিনে বহুবার আসতাগফিরুল্লাহ পাঠ করতেন, যার অর্থ-'আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি।' রাসূল বলেছেন-
'যদি কেউ অবিরতভাবে ক্ষমা চেয়ে থাকে, আল্লাহ তার প্রতিটি হতাশা দূর করার জন্য এবং প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য পথ বের করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। [১১৩]
যদিও আসতাগফিরুল্লাহ হলো ক্ষমা চাওয়ার সবচেয়ে সাধারণ দুআ, তবুও ক্ষমা চাওয়ার আরও একটি গভীর ও সুপরিচিত দুআ রয়েছে। এটি হলো- 'আসতাগফিরুল্লাহিল আজিম আল লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম ওয়া আতুবু ইলাইহি।' এর অর্থ হলো-'আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি, তিনি সর্বশক্তিমান। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী। আমি ক্ষমার জন্য তাঁর দিকেই ফিরে আসি।'
মহানবি বলেছেন-
'আমরা যদি এ দুআ পাঠ করাকে আমাদের অভ্যাসে পরিণত করতে পারি, তাহলে আমাদের পাপগুলো যদি দুনিয়ার সমুদ্রের ফেনারাশির মতো বেশিও হয়, তবুও আল্লাহ তাঁর অসীম রহমত দিয়ে আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। ' [১১৪]
আল্লাহর ভালোবাসার দিকে ফিরে আসা
ক্ষমা প্রার্থনার মানে হলো, আল্লাহর ভালোবাসার পথে ফিরে আসা। ক্ষমার মাধ্যমে আমরা অনুতাপের আগুনে পুড়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তুলি, যাতে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার আমাদের আকৃষ্ট করতে না পারে।
'খাঁটি তওবা হলো-হৃদয় থেকে অনুশোচনা অনুভব করা, জিহ্বা দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং অপরাধটির পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় সংকল্প করা।'
প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে ফিরে আসার এক একটি সুযোগ। রাসূল বলেছেন-
'আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন সত্তরবারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর দিকে ফিরে আসি।' [১১৫]
ক্ষমা প্রার্থনা ও জিকির আমাদের হৃদয়ের আয়নার ওপর পরা মরিচাকে পরিষ্কার করে দেয়। আমাদের হৃদয়ে প্রতিনিয়ত বর্ষিত আল্লাহর সৌন্দর্যকে অবলোকনের সুযোগ করে দেয়। ক্ষমা প্রার্থনার মানে হলো, হৃদয়ের ভার মুক্তি এবং আল্লাহর সীমাহীন করুণার স্বাদ আস্বাদন। এক সুফি-সাধক বলেছেন-
'সমুদ্র কোনো নদীকেই ফিরিয়ে দেয় না। অসীম দয়ার আধার আল্লাহ কী করে পাপীকে ফিরিয়ে দেবেন?'
আল্লাহ এভাবে ক্ষমা চেয়ে শিখিয়েছেন-
'হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন। আর আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।' সূরা মুমিনুন: ১১৮
টিকাঃ
১০৫. হাদিসে কুদসি
১০৬. আহমাদ
১০৭. বুখারি
১০৮. বুখারি, মুসলিম
১০৯. বুখারি
১১০. King, Martin Luther. 'Love Your Enemies.' November 17, 1957, Dexter Baptist Church, 'Dexter Baptist Church'
১১১. বুখারি
১১২. তিরমিজি
১১৩. আবু দাউদ
১১৪. আবু দাউদ, তিরমিজি
১১৫. বুখারি
📄 শাহাদাহ : একত্ববাদের সৌধ
আশহাদু আল্লা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল।
একজন মানুষ মুসলিমে পরিণত হয় যে ঘোষণা দিয়ে, তাকে বলা হয় শাহাদাহ। ইসলামের মহাসমুদ্রে প্রবেশের প্রথম দরজা হলো শাহাদাহ। শাহাদাহ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ার কাঠামো বিনির্মাণ করে। শাহাদাহর প্রথম অংশ হলো সকল মিথ্যা খোদা এবং জগতের সবকিছুর সাথে সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করে আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে সাক্ষ্য দান করা। শাহাদাহর দ্বিতীয় অংশ হলো-মুহাম্মাদ (সা)-কে আল্লাহর রাসূল (বার্তাবাহক) হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করা, যার সারকথা হলো-তাঁর সকল পদক্ষেপকে অনুসরণের সংকল্প করা। যখন কোনো মানুষ হৃদয়ের গভীর থেকে 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল'-ঘোষণাটি দেয়, তখন সে মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঈমান এমন কিছু নয়-যা অর্জনযোগ্য; বরং ঈমান হলো ইতোমধ্যে আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন, তা উন্মোচনের পথে যাত্রা। যে কুফরি করে অর্থাৎ আল্লাহকে মানতে অস্বীকার করে, তাকে বলা হয় কাফির। কাফির শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো এমন ব্যক্তি, যে সত্যকে ঢেকে রাখে। এ অর্থে কৃষক তার বীজ মাটিতে পুঁতে রাখে বলে কৃষককে আরবিতে কাফির বলা হয়। আধ্যাত্মিক অর্থে কাফির হলো সেই ব্যক্তি, যে তার হৃদয়ে থাকা ঈমানের মহামূল্যবান রত্নকে ঢেকে রাখে। পবিত্র কুরআনে শোকর বা কৃতজ্ঞতার বিপরীত শব্দ হিসেবে কুফর ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলাম এবং বলেছিলাম-আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয় আর কেউ অকৃতজ্ঞ (কাফারা) হলে আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।' সূরা লোকমান: ১২
মুসলিমদের কাছে কাফির সে নয়, যে আন্তরিকভাবে সত্যের সন্ধান করে চলেছে; বরং সেই কাফির, যে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও অহংকার, দম্ভ ও অকৃতজ্ঞতার কারণে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করে। অন্যকথায়, কাফিরদের মানসিক অবস্থা হলো মানবীয় স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীত।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো-আপনি কাউকে ইসলাম গ্রহণ করতে বা ইসলামের বার্তাগুলোকে মেনে নিতে বাধ্য করতে পারেন না। ঈমান স্বীকৃতি লাভ করে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীন প্রয়োগের মাধ্যমে। মানুষ যখন তার ইচ্ছার স্বাধীনতাকে পূর্ণভাবে ব্যবহার করে আল্লাহর অস্তিত্ব ও প্রভুত্বকে মেনে নেবে, তখনই সে ঈমানদার বলে বিবেচিত হবে। এ কারণে কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- 'দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো জবরদস্তি (বাধ্যবাধকতা) নেই।' সূরা বাকারা: ২৫৬
জগতের প্রতিটি মানুষ তার হৃদয়ে ঈমানের বীজ বহন করে চলেছে। এই বীজ কীভাবে বেড়ে উঠবে, তা নির্ভর করে আল্লাহ তার জন্য কী পরিকল্পনা করে রেখেছেন এবং সে আধ্যাত্মিকতার পথে কতটুকু চেষ্টা-সাধনা করবে তার ওপর।
'যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, আল্লাহ তার হৃদয়কে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।' সূরা তাগাবুন: ১১
শাহাদাহর প্রথম অংশ
আল্লাহকে বাইরের জগতে খুঁজে বের করা আমাদের কাজ নয়, আমাদের কাজ হলো নিজের ভেতরের দিকে দৃষ্টি দেওয়া এবং আল্লাহ ইতোমধ্যে কতখানি আমাদের নিকটে অবস্থান করছেন, তা স্মরণ করা। শাহাদাহ শব্দের অর্থ কেবল 'সাক্ষ্য দেওয়া' নয়; বরং কোনো কিছুর চাক্ষুষ সাক্ষী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া। এ অর্থে শাহাদাহর মাধ্যমে আমরা রুহের জগতের দৃশ্যমান চাক্ষুষ সাক্ষ্যের ঘোষণা দিয়ে থাকি। [১১৬] আমরা যখন বর্তমানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিই, তার মানে মূলত আমরা রুহের জগতের সেই সাক্ষ্যেরই পুনরাবৃত্তি করি। যখন আমরা বলি-'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তখন আমরা শুধু এ কথাই বলি না যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; বরং এ কথাও বলি যে, আল্লাহ ছাড়া জগতের কোনো কিছুরই সত্যিকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ, তিনি সৃষ্টিজগতের সবকিছুরই একাধারে উৎস ও গন্তব্য।
যেকোনো সংখ্যাকে অসীম দিয়ে ভাগ দিলে যেমন শূন্য হয়, তেমনি যেকোনো সসীম সৃষ্টি ও অসীম আল্লাহর ভাগফলও শূন্য হয়।
'পৃথিবীপৃষ্ঠে যা কিছু আছে-সবই ধ্বংসশীল। কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা (সত্তা); যিনি মহীয়ান, গরীয়ান।' সূরা আর-রহমান: ২৭
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো লক্ষ্য, পরিণাম বা গন্তব্যের জন্য বিনিয়োগ করা হলো অনেকটা মরুভূমিতে বরফ বিনিয়োগ করার মতো; যে বিনিয়োগের পরিণামে লোকসান অনিবার্য। আমরা যদি আমাদের পার্থিব কামনা-বাসনাগুলোকে আমাদের খোদা বানিয়ে ফেলি, তাহলে নিরন্তর অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা আমাদের গ্রাস করে রাখে। কেননা, আমাদের আবেগ ও ইচ্ছা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল।
'আসমান ও জমিনে যদি আল্লাহ ছাড়া আরও অনেক উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই (আসমান ও জমিন) ধ্বংস হয়ে যেত। কাজেই আরশের অধিপতি আল্লাহ মহান ও পবিত্র সেসব থেকে, যা তারা তাঁর প্রতি আরোপ করে।' সূরা আম্বিয়া: ২২
যেখানেই পৃথকীকরণ, সেখানে মতের ভিন্নতা; যার অনিবার্য পরিণাম দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ দৃষ্টান্ত পেশ করছেন: এক ব্যক্তির প্রভু অনেক, যারা পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক প্রভুর অনুগত-এ দুজনের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।' সূরা জুমার : ২৯
আপনি যদি এ বিশ্বজগৎকে আপনার প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে আপনি সৃষ্টির সবকিছুর দাসে পরিণত হবেন। কিন্তু আপনি যদি এক আল্লাহকে আপনার একমাত্র প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সৃষ্টিজগতের সবকিছু আপনার দাসত্ব করবে। আল্লাহর ভালোবাসা ও দয়ার প্রবাহ সকল সৃষ্টির মধ্যে সঞ্চারিত করাই হবে আপনার মিশন।
সকল নবি ও রাসূলকে আল্লাহর এককত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের একই বার্তা দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
‘আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং পরিহার করো তাগুতকে। অতঃপর, তাদের মধ্যে আল্লাহ কাউকে হিদায়াত দান করেছেন এবং তাদের মধ্য থেকে কারও ওপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা জমিনে ভ্রমণ করো-অতঃপর দেখ, অস্বীকারকারীদের কী পরিণতি হয়েছে।' সূরা নাহল : ৩৬
আমাদের হৃদয় কেবল তখনই পরম শান্তির স্বাদ অনুভব করতে পারে, যখন আমরা আমাদের সকল কামনা-বাসনাকে এক আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সোপর্দ করত সক্ষম হই। মহানবি বিষয়টিকে এভাবে তুলে ধরেছেন-
'যে ব্যক্তি এর ওপর মৃত্যুবরণ করল-সে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য সম্পর্কে জানে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' [১১৭]
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাক্যটির দুটি অংশ রয়েছে; লা ইলাহা অর্থ-কোনো উপাস্য (ইলাহ) নেই। ইল্লাল্লাহ অর্থ-আল্লাহ ছাড়া। এখান থেকে জানা যায়, আল্লাহ চান তাঁর স্বীকৃতি দেওয়ার পূর্বে আমরা যেন সকল উপাস্যকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিই। যখন হতাশা বা একাকিত্ব আমাদের গ্রাস করে, ভাবি-কেন মানুষ দুনিয়া ত্যাগ করে, কেন কোনো কিছুই স্থায়ী হয় না, কেন আমাদের চারদিকে যা ছড়িয়ে আছে-তাকে মিথ্যা মোহ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না, তখন আমরা লা ইলাহা পর্যায়ে থাকি; যতক্ষণ না ইল্লাল্লাহর দিকে হাঁটা শুরু করি। আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নিলে আমাদের যাবতীয় ব্যথা-বেদনা ও শূন্যতা দূর হয়ে যায়। হৃদয় অনাবিল শান্তিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা হওয়ার উপযুক্ত নই-এই ভেবে আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করা পুরো মাত্রায় ভুল কাজ। মনে রাখতে হবে, আমরা পুরোপুরি নির্ভুল হয়ে যাই-এমনটি আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে আশা করেন না। তিনি চান আমরা আমাদের সকল ত্রুটি-বিচ্যুতিকে সাথে নিয়েই যেন তাঁর কাছে ফিরে আসি। আমরা যখন আমাদের দারিদ্র্য, অভাব ও শূন্যতাগুলোকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিই, তখন তিনি তাঁর দানশীলতা (আল কারিম), পরাক্রমশীলতা (আস-সামাদ) ও ঐশ্বর্যময়তা (আল গানি) দিয়ে সেগুলোকে পূর্ণ করে দেন। আমাদের ঘরকে আলোকিত করতে হলে আমরা যেমন দরজা-জানালা খুলে দিই-যাতে সূর্যের আলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে, তেমনি আমাদের হৃদয়ের ঘরকে আলোকিত করতে হলেও হৃদয়ে দরজা খুলে দিতে হবে, যাতে আল্লাহর নুর সেখানে প্রবেশ করতে পারে।
আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা একটি বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাদের সাথে থাকেন। তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আল্লাহর সাথে আমাদের দূরত্ব তৈরি হয় তাঁকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থেকে। এ কারণে আমরা যখন আমরা অনিশ্চয়তা, সংশয় বা আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করি, তখন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র জিকির আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। এই জিকির আমাদের ভেতরে আল্লাহর নুর প্রবেশ করায়। ফলে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করি এবং আমাদের ভেতরকার ঈমান বিকশিত হতে শুরু করে।
কোনো কিছুকে অস্তিত্বে আনতে হলে সেটির জন্য আগে জায়গা খালি করতে হয়। 'লা ইলাহা'র মাধ্যমে আমরা আগে শূন্যতা তৈরি করি, তারপর 'ইল্লাল্লাহ'র মাধ্যমে সেই শূন্য স্থানকে পূর্ণ করি। লা ইলাহা'র মাধ্যমে আমরা সকল মিথ্যা খোদা, বস্তুগত সম্পদ, দুনিয়ার প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান মানুষ, নিজের লোভ-লালসা ইত্যাদিকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিই। নতুন সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে যেমন পুরোনো ভার্সনকে আনইনস্টল করতে হয়, তেমনি আল্লাহকে হৃদয়ে ইনস্টল করতে পুরোনো সকল খোদাকে আনইনস্টল করতে হয়। অন্য কথায়, ইল্লাল্লাহ'র পূর্বশর্তই হলো-'লা ইলাহা'। আল্লাহকে একমাত্র প্রভু হিসেবে মেনে নিতে হলে আপনাকে দুনিয়াবি সকল খোদা বা খোদাসদৃশ সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করেই আসতে হবে; অন্যথায় আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও সে ঘোষণা হবে কৃত্রিম ও নিষ্ফল।
আপনি যখন আল্লাহর প্রভুত্বকে নিজের ভেতর সত্যিকারার্থে ধারণ করতে পারবেন, তখন যেদিকে আপনি মুখ ফেরাবেন (পূর্ব বা পশ্চিম), কেবল আল্লাহর চেহারাই দেখতে পাবেন। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া ছাড়া কোনো কিছুরই অস্তিত্ব আপনার চোখে পড়বে না। নিচের ঘটনায় এই চিত্র সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে-
'এক সুফি একদিন দেখলেন, একটি বালক জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সুফি ঠিক করলেন, বালকটিকে জীবন সম্পর্কে কিছু শিক্ষা দান করবেন। তিনি বালকটিকে জিজ্ঞেস করলেন- "এ আলো কোথা থেকে এসেছে?” বালকটি প্রথমে আলোর দিকে তাকাল, তারপর তাকাল সুফির দিকে। এরপর আচমকা সে ফুঁ দিয়ে আলো নিভিয়ে দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল- “কিন্তু আলোটা গেল কোথায়?"
ঘটনার আকস্মিকতায় সুফি নির্বাক হয়ে গেলেন। বালকটি যে মহাসত্য উন্মোচন করল, তা হলো-যে উৎস থেকে আলো আসে, অবশেষে একই জায়গায় আলো ফিরে যায়।'
পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে সে কথাই ফুটে উঠেছে- 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন-নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' সূরা বাকারা: ১৫৬
আল্লাহর এককত্বের ভেতর তিনিই শুরু, তিনিই শেষ; তিনিই অতীত, তিনিই বর্তমান, তিনিই ভবিষ্যৎ। আল্লাহর অস্তিত্বের সামনে সব বিচ্ছেদ বিলীন হয়ে যায়, জগতের সবকিছু অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে।
শাহাদাহর দ্বিতীয় অংশ
একজন মানুষ যখন আল্লাহর অস্তিত্বকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর আত্মার সহজাত জ্ঞানকে বাস্তবে পরিণত করে, তখন অনিবার্যভাবে যে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, তা হলো-এ জ্ঞান দিয়ে সে কী করবে? মুসলিমদের জন্য মুহাম্মাদ (সা) হলেন এ প্রশ্নের উত্তর। কুরআনের কথাগুলো লিখিত আকারে আসেনি; বরং ২৩ বছর ধরে নবিজির ওপর কুরআন ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হয়েছে। সাহাবিরা যখন কুরআনের কথা ভাবতেন, তখন তাঁদের কল্পনায় রাসূল (সা)-এর মুখ ও তাঁর কণ্ঠের তিলাওয়াতই ভেসে আসত। এ দৃষ্টিতে আল্লাহর বার্তা ও বার্তাবাহক পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। মুহাম্মাদ (সা) হলেন ইসলামের কালিমার মৌলিক একটি অংশ। কারণ, তিনি আল্লাহর এককত্বের বিশ্বাসকে কাজে পরিণত করে দেখিয়েছেন। তাঁকে পবিত্র কুরআনে 'বিশ্ববাসীর জন্য রহমত' এবং 'উজ্জ্বল প্রদীপ' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি শুধু একজন বার্তাবাহকই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন, আল্লাহর একত্ববাদের সূর্য থেকে সংগৃহীত আলোর পূর্ণিমার চাঁদ। [১১৮] তিনি ছিলেন দুনিয়াতে আল্লাহর দাস ও আল্লাহর প্রতিনিধি-এ দুটি পরিচয়ের সংক্ষিপ্তসার। তাঁর চলার পথ অনুসরণ করার মাধ্যমেই আমরা কেবল সত্য ও বিভ্রমের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারি।
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদ (সা)-কে 'খাতামুন নাবিয়্যিন' [১১৯] বা নবিদের সিলমোহর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি নবুয়তের বিশাল গ্রন্থের শেষ অধ্যায় ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এ গ্রন্থের বাঁধাই (বাইন্ডিং)। তাঁর কাছে যে বার্তাগুলো প্রেরণ করা হয়েছিল, তা ছিল সকল নবি-রাসূলের কাছে প্রেরিত বার্তার নির্যাস। পবিত্র কুরআনে মুসলিমদের বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-
'আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না।' সূরা বাকারা: ২৮৫
যদি প্রত্যেক নবিকে নবুয়তের এক একটি 'পাজল পিস' হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে মুহাম্মাদ হবেন সেই পাজলের চূড়ান্ত পিস-যা নবুয়তের ধারাবাহিকতাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছে। তিনি ফেরেশতা বা অতিমানব ছিলেন না; ছিলেন আমাদের মতোই মরণশীল মানুষ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'বলো, আমি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। আমার নিকট ওহি প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ।' সূরা কাহাফ : ১১০
বর্ণিত আছে, তিনি যখন নামাজ পড়তেন, তখন এতখানি শূন্য হৃদয়ে নামাজ পড়তেন, যেন আল্লাহর স্মরণ ছাড়া জগতে আর কিছুর অস্তিত্ব নেই। তিনি কেবল খাদ্য ও পানি থেকে বিরত থেকেই রোজা করতেন না; বরং তাঁর ও আল্লাহর মধ্যকার যাবতীয় কিছু থেকে বিরত থেকেই রোজা করতেন। তিনি তাঁর অর্থ ও সম্পদ দিয়েই কেবল অভাবগ্রস্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসতেন না; বরং তাঁর সমগ্র অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিতেন।
মহানবি তাঁর নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে পূর্ণভাবে সঁপে দিয়ে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র প্রকৃত অর্থকে বাস্তবে রূপায়িত করেছেন। তাই মহানবি (সা)-এর কার্যক্রম হলো দুনিয়াতে আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন। আল্লাহ তায়ালা এ কথাটি এভাবে বলেছেন-
'আমি তাঁর কান, যা দিয়ে সে শোনে, তাঁর চোখ-যা দিয়ে সে দেখে, তাঁর হাত-যা দিয়ে সে ধরে, তাঁর পা-যা দিয়ে সে হাঁটে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাকে তা দান করি। সে আমার কাছে কোনো কিছু থেকে পানাহ চাইলে আমি তা মঞ্জুর করি।' হাদিসে কুদসি
মহানবি কেবল আল্লাহর পথনির্দেশনার মানচিত্র প্রেরণের বাহনই ছিলেন না; বরং তিনি স্বয়ং ছিলেন সেই মানচিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।' সূরা নিসা : ৮০
মহানবি ছিলেন আল্লাহর নিখাদ আয়না, আল্লাহর ইচ্ছার প্রয়োগের খাঁটি পাত্র। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যারা তোমার কাছে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহর কাছেই আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। তাদের হাতের ওপর রয়েছে আল্লাহর হাত।' সূরা ফাতহ: ১০
আল্লাহ তাঁর অন্যান্য রাসূলদের মতো মুহাম্মাদ (সা)-কে আমাদের জন্য 'সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী' [১২০] হিসেবে প্রেরণ করেছেন।
তিনি বাদশাহ বা শাসক হিসেবে দুনিয়াতে আসেননি; বরং তিনি এসেছিলেন নিরাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবতার জন্য আশার আলো হিসেবে, ভয়ার্ত মানুষের জন্য নিরাপত্তা হিসেবে, দরিদ্র মানুষের জন্য দাতা হিসেবে এবং হতাশাগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রেরণা হিসেবে। তিনি মন্দ মানুষকে ভালো মানুষ বানানোর জন্য আসেননি; তিনি এসেছেন এমন ঝরনা হয়ে, যা ঈমানের মৃত বীজে প্রাণের সঞ্চার করে।
কে ছিলেন মুহাম্মাদ
মুহাম্মাদ-এর বংশধারা ওপরের দিকে ইবরাহিম (আ)-এর সাথে যুক্ত হয়েছে, যিনি ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম তিন জাতির একত্ববাদের জনক। [১২১] মুহাম্মাদ ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬২ বছর বয়সে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ৪০ বছর বয়সে ফেরেশতা জিবরাইল-এর মাধ্যমে প্রথম ওহিপ্রাপ্ত হন।
প্রথম কিছুদিন তিনি গোপনে আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত বার্তাগুলো পরিচিত মহলের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন এবং একপর্যায়ে আল্লাহর নির্দেশে বহুবাদী মক্কার মানুষের কাছে একত্ববাদের ধারণা উপস্থাপন করেন। মক্কার অভিজাত ও নেতৃত্বস্থানীয় বংশ কুরাইশদের নেতাদের কাছে তিনি ঘোষণা করলেন, আল্লাহ তাঁকে বার্তাবাহক (রাসূল) হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি বললেন— ‘হে কুরাইশগণ! আমি যদি বলি—পাহাড়ের পেছনে একটি বড়ো সেনাবাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাহলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?’ মানুষের ভিড় থেকে বলা হলো—‘হ্যাঁ। কেননা, আমরা তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি।’ [১২২]
মক্কার লোকেরা মহানবি (সা)-কে এত বিশ্বাস করত যে, তাঁকে আস-সাদিক বা সত্যবাদী ও আল আমিন বা নির্ভরযোগ্য বলে ডাকত। তাঁর সততার আকাশচুম্বী সুনাম থাকা সত্ত্বেও মক্কার অধিকাংশ লোক তাঁর রাসূল মনোনীত হওয়ার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করল। তবুও মক্কার কুরাইশদের শত্রু ও সহিংস প্রতিরোধের মুখে মুহাম্মাদ তাঁর বার্তা প্রচার চালিয়ে গেলেন।
তেরো বছর ধরে মক্কাবাসীর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন সহ্য করার পর অবশেষে মহানবি মদিনায় হিজরত করলেন। মদিনার লোকেরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করল এবং তিনি মদিনায় একটি নতুন ইসলামি সমাজ বিনির্মাণ করলেন। সেখানে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আল্লাহর একত্ববাদের ধারণা এতখানি জনপ্রিয়তা অর্জন করল যে, মক্কার কুরাইশদের অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব হুমকির সম্মুখীন হলো।
কয়েকটি সংঘাত সংঘর্ষের পর অবশেষে বড়ো যুদ্ধ এড়াতে মুসলিম ও মক্কাবাসীদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হলো—যার নাম হুদাইবিয়ার সন্ধি। আপাত দৃষ্টিতে এ সন্ধি ছিল মক্কার অনুকূলে; কিন্তু এ চুক্তির পর মুসলিমরা স্বাধীনভাবে তাদের বার্তা সম্প্রসারণ ও সামাজিক ভিত্তি মজবুত করার দিকে মনোনিবেশের সুযোগ পেল। ফলে দলে দলে লোকেরা ইসলামের সুমহান আহ্বানে সাড়া দিতে থাকল। ওই সন্ধি সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে— ‘নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।’ সূরা ফাতাহ: ১
হুদাইবিয়ার চুক্তি স্বাক্ষরের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মক্কার কুরাইশরা চুক্তিভঙ্গ করল, ফলে এই চুক্তি অকার্যকর হয়ে গেল। ফলে রাসূল ১০ হাজার অনুসারী নিয়ে মক্কা অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে মক্কার নিয়ন্ত্রণ লাভ করলেন। তিনি প্রচলিত সকল নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করে পরাজিতপক্ষের লোকদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। যারা বছরের পর বছর ধরে নিপীড়ন চালিয়ে তাঁর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, তারা রাসূল-এর ক্ষমা পেয়ে অভিভূত হয়ে গেল।
জীবনের শেষ বছরগুলোতে মহানবি মুসলিম বিশ্বের সীমানা সংরক্ষণ, আরবের গোত্রীয় সংঘাত নিরসন এবং ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণের দিকে তাঁর মনোযোগ নিবদ্ধ করলেন। নবিজি তাঁর মৃত্যুর বছর (৬৩২ সালে) জীবনের প্রথম ও শেষ হজ সম্পাদন করেন। মহানবি (সা)-এর মৃত্যুর ১৪০০ বছর পরও তাঁর ক্ষমা, দয়া, বিশ্বাস ও ধৈর্যের শিক্ষা দুনিয়ার আনাচে-কানাচে কোটি মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
মুহাম্মাদ (সা)-এর জীবনের কয়েকটি ঘটনা বিরল সততা ও পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত দুটি পক্ষের ভেতর শান্তি স্থাপনের বিস্ময়কর ক্ষমতার জন্য দুনিয়াজুড়ে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে রাসূল বিশেষ সম্মানের পাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছেন। নিচের ঘটনায় এ রকম একটি চমৎকার উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছিলেন-
একবার কাবার একটি অংশ আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল। তখন কাবা ঘরে কয়েকশো মূর্তি ছিল। মক্কায় হজ করতে আসা বিভিন্ন গোত্রের হাজিরা এ মূর্তিগুলোকে কাবা ঘরে এনে স্থাপন করেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত কাবা ঘর সংস্কার করা শেষ হলে বিভিন্ন গোত্রের নেতারা কাবার দেয়ালে স্থাপিত পবিত্র কালো পাথর (হাজরে আসওয়াদ) সরানোর উদ্যোগ নিল। কিন্তু মক্কার বিভিন্ন গোত্রের নেতারা পাথরটিকে সরানোর সম্মানসূচক কাজ কে করবে, তা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলো; এমনকী এ নিয়ে সংঘাতের সূত্রপাতও হলো। একজন বয়স্ক লোক বিবাদমান পক্ষগুলোকে থামিয়ে একটি সমঝোতায় পৌছাল। ঠিক হলো-পরবর্তী সময়ে যে ব্যক্তি প্রথম কাবায় প্রবেশ করবে, তাঁর সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিষয়টির সুরাহা হবে। তখনও পর্যন্ত নবুয়ত লাভ না করা মুহাম্মাদ প্রথম কাবায় প্রবেশ করলেন। তিনি সবটা শুনে একটি চমৎকার সমাধান দিলেন।
প্রথমে তিনি একটি বড়ো চাদর আনতে বললেন, এরপর পাথরটিকে চাদরের মধ্যে রাখলেন, এরপর প্রতিটি গোত্রের একজন করে নেতাকে চাদরের একেকটি প্রান্ত ধরতে বললেন। সকলে মিলে নতুন স্থানে পাথরটিকে নিয়ে গেলে। এবার মুহাম্মাদ নিজ হাতে পাথরটিকে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করে দিলেন। এভাবে একটি সংঘাতমূলক পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান হলো।
নবুয়ত প্রাপ্তির আগে থেকেই রাসূল (সা)-এর মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনের অসাধারণ সৃজনশীলতা কার্যকর ছিল। একেবারে ছেলেবেলা থেকে তিনি সমাজে শান্তি স্থাপনের উপায় খুঁজে বেড়াতেন।
ক্ষমতা, সম্পদ বা সুনাম অর্জন মহানবি নবিজির লক্ষ্য ছিল না। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তোষ অর্জন। এমনকী মহানবি (সা)-এর একজন অনুসারী একবার তাঁর কুটির ঘরের দারিদ্র্য দশা স্বচক্ষে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। রাসূল তাঁর কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন-যখন রোম ও পারস্যের সম্রাটরা আরাম-আয়েশ ও জাঁকজমকভাবে জীবনযাপন করছে, তখন আল্লাহর রাসূল এমন শক্ত মাদুরে শুয়ে রাত্রিযাপন করছে যে, তাঁর শরীরে মাদুরের দাগ ফুটে উঠছে। এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তিনি কাঁদছেন। রাসূল জবাবে বলেছিলেন, এ দুনিয়ার আরাম-আয়েশের কোনো মূল্য তাঁর কাছে নেই। রাসূল (সা)-এর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল পরকালের ওপর, যেখানকার আরাম-আয়েশ হবে সীমাহীন, যেখানকার সৌন্দর্য হবে অতুলনীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সেখানে তিনি থাকবেন তাঁর প্রভুর সবচেয়ে নিকটে। [১২৩]
এমনকী ইসলামের বিজয়ের পর বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ তাঁর হস্তগত হলেও তিনি সেখান থেকে নিজের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য কোনো সম্পদ গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন শান্ত ও বিনয়ী একজন মানুষ। তিনি কারও ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করেননি; যদিও তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ রাসূল, মুসলিম বিশ্বের নেতা ও শাসক। তিনি ছাগলের দুধ দোহাতেন, [১২৪] নিজের ছেঁড়া কাপড়ে তালি জুড়ে দিতেন এবং দৈনন্দিন সাংসারিক কাজ করতেন। [১২৫]
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।' সূরা আহজাব: ২১
রাসূল (সা)-এর রেখে যাওয়া উদাহরণের মাধ্যমেই আমরা কুরআনের শিক্ষা বাস্তবে রূপায়িত করার প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকি। মহানবি তাঁর সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রুর প্রতিও দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শন করতেন। তাঁর জীবনের একটি বিখ্যাত ঘটনা ছিল এমন-
রাসূল (সা)-এর প্রতিবেশী ছিলেন এক বৃদ্ধা মহিলা। বৃদ্ধা রাসূল (সা)-এর দিকে প্রতিদিন ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করতেন। কারণ, তিনি রাসূল (সা)-এর প্রচারিত বক্তব্যের সাথে একমত ছিলেন না। একদিন রাসূল লক্ষ করলেন, বৃদ্ধাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তিনি বৃদ্ধাকে খুঁজতে বের হলেন এবং জানতে পারলেন, বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। রাসূল অসুস্থ বৃদ্ধাকে দেখতে গেলেন। বৃদ্ধা যখন জানতে পারলেন রাসূল তাকে দেখতে এসেছেন, তখন তিনি রাসূল (সা)-এর বদান্যতায় অভিভূত হয়ে গেলেন এবং অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করলেন। [১২৬]
অন্য একটি ঘটনা। মক্কার মূর্তিপূজারিদের অত্যাচার যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন একবার রাসূল (সা)-এর সাহাবিরা রাসূল (সা)-কে বললেন- তিনি যেন শত্রুদের প্রতি অভিসম্পাত করেন, যাতে তারা ধ্বংস হয়ে যায়। রাসূল জবাবে বললেন- 'নিশ্চয়ই আমি অভিশাপ দেওয়ার জন্য প্রেরিত হইনি; আমি কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি। [১২৭] রাসূল যখন তায়েফ নগরীতে ইসলামের আহ্বান নিয়ে গেলেন, তখন তায়েফের লোকেরা তাঁর প্রতি পাথর নিক্ষেপ করল এবং তাঁকে অপদস্থ করল। এমন নাজুক মুহূর্তেও রাসূল তায়েফবাসীর ধ্বংস কামনা করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেননি; বরং তিনি তাদের জন্য দুআ করেছেন এই আশায় যে, তাদের বংশধররা হয়তো ইসলামের বক্তব্য গ্রহণ করবে। [১২৮]
রাসূল বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ের ভেতরে কল্যাণময়তার বীজ বসবাস করে এবং আল্লাহ ইচ্ছা করলে যেকোনো মুহূর্তে এ বীজ বিকশিত হতে পারে। রাসূল-এর চোখ ছিল আধ্যাত্মিকতার গভীরতাসম্পন্ন। ফলে তিনি কোনো কিছুর বাহ্যিক দিকগুলোর পাশাপাশি অন্তর্নিহিত দিকগুলোর প্রতিও দৃষ্টিপাত করতে পারতেন। তিনি বীজের ভেতর ফুল দেখতে পেতেন, রাতের ভেতর ভোর দেখতে পেতেন, বাঁকা চাঁদের ভেতর পূর্ণিমা দেখতে পেতেন। তিনি মানুষের সর্বোচ্চ সুন্দর রূপটি দেখতে পেতেন। মানুষের সবচেয়ে বড়ো সম্ভাবনাগুলো তাঁর চোখে পড়ত। তিনি ভালোবাসা ও অন্তর্ভেদী কথা দিয়ে মানুষের ভেতরের সৃজনশীলতাকে পরিচর্যা করতেন।
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদ-এর নাম বিশেষ মর্যাদার সাথে উচ্চারিত হয়েছে। সূর্যের আলোকে বোঝাতে কুরআনে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, মুহাম্মাদ (সা)-এর আলো দানকারী প্রকৃতিকে বোঝাতে একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সূর্যের আলো সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'কতই না কল্যাণময় তিনি; যিনি আসমানে নক্ষত্ররাজির সমাবেশ ঘটিয়েছেন এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সিরাজান) আর আলো বিকিরণকারী চন্দ্র!' সূরা ফুরকান: ৬১
মুহাম্মাদ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও আলোকদীপ্ত প্রদীপ (ওয়া সিরাজান) হিসেবে।' সূরা আহজাব : ৪৬
সূর্য যেমন অস্ত গেলেও হারিয়ে যায় না, তেমনি মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষার আলো তাঁর অগণিত অনুসারীর হৃদয়কে আলোকিত করে চলেছে।
রাসূল খোদা নন; কেবল একজন মানুষই ছিলেন। তাই তাঁর মানবীয় বৈশিষ্ট্য তাঁর জীবন ও সকল মানুষের জীবনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করে। আপনি যদি শরণার্থী হয়ে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন-মুহাম্মাদ আপনার ব্যথা বোঝেন। কেননা, তিনিও একজন শরণার্থী ছিলেন, যাকে তাঁর দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আপনি যদি প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাতর হয়ে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন-মুহাম্মাদ আপনার কষ্ট অনুভব করতে পারেন। কেননা, তিনি জীবদ্দশায় তাঁর প্রিয় স্ত্রী ও তিন শিশুপুত্রকে হারিয়েছেন। আপনি যদি ইয়াতিম হয়ে জন্ম নিয়ে থাকেন অথবা আপনি যদি জীবদ্দশায় আপনার বাবা-মা-কে হারিয়ে থাকেন, তাহলে জানুন-মুহাম্মাদ আপনার দুঃখ বোঝেন। কেননা, তিনি জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছেন, মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন। আপনি যদি আপনার বন্ধুমহল ও পরিবারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে জানুন-তিনি আপনার সমব্যথী। কেননা, তিনি তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের দ্বারা মানসিক ও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন। যদি দুনিয়ার কেউ আপনাকে গুরুত্ব না দেয় বা অবহেলা করে, তাহলে জেনে রাখুন-মহানবি আপনার কষ্ট বুঝতে পারেন। কেননা, তিনি মানুষকে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা বোঝাতে তাঁর বহু বছর লেগেছে।
আপনি যে অবস্থায় নিপতিত হন না কেন, রাসূল আপনার সে অবস্থার অনুভূতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেছেন এবং আপনি যে উচ্চতর অবস্থানে যেতে চান না কেন, তিনি সেই শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। আপনার সবচেয়ে বড়ো সাফল্য বা সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতার মুহূর্তেও তাঁকে আপনি দৃষ্টান্ত ও পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। কেননা, তাঁর জীবন এমন এক কম্পাস-যা আপনাকে জান্নাতের চূড়ায় পৌছে দিতে পারে।
মুহাম্মাদ আমাদের মনে করিয়ে দেন আমরা কে
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মহানবি (সা)-কে এভাবে সম্মানিত করেছেন-'আর নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত। [১২৯] অনেক বিশ্লেষকের মতে, আল্লাহ যখন রাসূল (সা)-কে 'তুমি' বলে সম্বোধন করেন, তখন তিনি মানবজাতির প্রত্যেকের বক্ষস্থিত হৃদয়কেও সম্বোধন করে থাকেন। কারণ, সকল মানুষ এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্ট। সূরা আ'রাফ: ১৮৯
আমরা যখন মুহাম্মাদ (সা)-এর কথা আলোচনা করি এবং তাঁর জন্য দরুদ পাঠ করি, তখন আমরা মূলত আল্লাহর ইবাদতেই লিপ্ত হই। কেননা, আমরা আল্লাহর নির্দেশেরই অনুসরণ করছি। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবির প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবির জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো।' সূরা আহজাব: ৫৬
মহানবি (সা)-এর নবুয়তি আলোর (নুর মুহাম্মাদ) স্মরণ আমাদের ভেতরের কল্যাণময়তার বীজকে বিকাশে সাহায্য করে। আমরা যখন রাসূল (সা)-এর প্রতি সালাম প্রেরণ করি, তখন আমরা মূলত নিজের প্রতিও সেই সালাম প্রেরণ করে থাকি।
আমরা যতই মানবীয় মনস্তত্ত্ব আবিষ্কার করছি, ততই দেখতে পাচ্ছি-মানবীয় সীমাবদ্ধতার দেয়ালকে ভাঙতেই দুনিয়াতে নবি-রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। দৌড়বিদ রজার ব্যানিস্টার-এর উদাহরণ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যেতে পারে-
১৯৫৪ সালে রজার ব্যানিস্টার নামে এক দৌড়বিদ মানবেতিহাসে প্রথমবারের মতো চার মিনিটের কম সময়ে এক মাইল দূরত্ব অতিক্রমের রেকর্ড স্থাপন করে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ব্যানিস্টারের এ রেকর্ড গড়ার কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকজন দৌড়বিদ চার মিনিটের কম সময়ের মধ্যে এক মাইল দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ব্যানিস্টার মূলত কোনো রেকর্ড ভাঙেননি, তিনি শুধু মানুষের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে দেখিয়ে দিয়েছেন-মানুষের পক্ষে কী করা সম্ভব! [১৩০] একইভাবে আল্লাহ তাঁর নবি-রাসূলদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন আধ্যাত্মিকতার সামনের বাধা অপসারণের জন্য, যাতে মানুষ তার নিজের সম্ভাবনা বিকাশের জন্য উপযুক্ত দৃষ্টান্ত চোখের সামনে দেখতে পায়।
সূর্যের সাথে তুলনা করলে মহানবি (সা)-কে পূর্ণিমার চাঁদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। কেননা, তিনি আল্লাহর পরম সত্যের দিকে মুখ করে আছেন এবং আমাদের আত্মার ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করে চলেছেন। তিনি আল্লাহর বার্তার সাথে নিজের বিনয়, নম্রতা, দয়া, ভালোবাসা ও ক্ষমার গুণকে একীভূত করেছেন। তাঁর কাজ ওহির চেতনার পর্দাকে উন্মোচিত করেছে, তাঁর কথা মানুষের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণার অপনোদন করেছে, তাঁর চরিত্র ইবাদতের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং তাঁর পুরো জীবন আল্লাহর একত্ববাদ ধারণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে। রাসূল আমাদের শিখিয়েছেন-কী করে হিংসা, কাম, ক্রোধ, লোভ, অহংকারের মতো কুপ্রবৃত্তিগুলো থেকে বেঁচে থাকা যায়, কী করে তওবা ও জিকিরের মাধ্যমে নিজের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে তোলা যায়। রাসূল আমাদের শিখিয়েছেন, জগতে যা কিছু আমরা দেখি-তা হলো সেই জিনিসের প্রতিফলন, যা আমরা নিজের ভেতর বহন করে চলেছি। কাজেই আমাদের জীবনকে বদলাতে হলে আমাদের হৃদয়কে বদলানোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
পচে যাওয়া হৃদয়ের সাথে সৎকর্ম একটি কপটতা এবং পবিত্র হৃদয়ের সাথে সৎকর্মহীনতা একটি বিভ্রম। মহানবি আমাদের শিখিয়েছেন-কীভাবে অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধি ও বাহ্যিক আনুগত্যের সমন্বয় সাধান করে আধ্যাত্মিক পূর্ণতার যাত্রাপথে এগিয়ে যেতে হয়। মহানবি বলেছেন- 'আমি মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পূর্ণতা সাধনের জন্য দুনিয়াতে এসেছি।' [১৩১]
রাসূল দেখিয়ে গেছেন, নেতৃত্ব মানে কর্তৃত্ব নয়; বরং নেতৃত্ব মানে ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে অনুপ্রাণিত করা।
টিকাঃ
১১৬. এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে, সকল মানুষের রুহ সৃষ্টির পর সব রুহকে আল্লাহ জিজ্ঞেস করেছিলেন-'আমি কি তোমাদের রব নই?' সবগুলো রুহ জবাবে বলেছিল- 'নিশ্চয়ই, এ ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।' সূরা আ'রাফ: ১৭২
১১৭. তিরমিজি
১১৮. মহানবি -এর স্ত্রী আযিশা বলেছেন-'নিশ্চয়ই করআনই ছিল প্রিয়নবির চরিত্র।'
১১৯. সূরা আহজাব: ৪০
১২০. সূরা বাকারা: ১১৯
১২১. মুসা ছিলেন ইবরাহিম-এর দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক-এর বংশধর এবং মুহাম্মাদ ছিলেন ইবরাহিম-এর প্রথম পুত্র ইসমাইল-এর বংশধর।
১২২. বুখারি, মুসলিম
১২৩. বুখারি, মুসলিম
১২৪. আহমাদ
১২৫. বুখারি
১২৬. Arbil, Majd. 'The Compassion of the Prophet Towards Those Who Abused Him.' IslamiCity, June 26, 2018
১২৭. মুসলিম
১২৮. বুখারি, মুসলিম
১২৯. সূরা কালাম: ৪
১৩০. Taylor, Bill. 'What Breaking the Four-Minute Mile Taught Us About the Limits of Conventional Thinking.' Harvard Business Review. April 10, 2018
আশহাদু আল্লা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল।
একজন মানুষ মুসলিমে পরিণত হয় যে ঘোষণা দিয়ে, তাকে বলা হয় শাহাদাহ। ইসলামের মহাসমুদ্রে প্রবেশের প্রথম দরজা হলো শাহাদাহ। শাহাদাহ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ার কাঠামো বিনির্মাণ করে। শাহাদাহর প্রথম অংশ হলো সকল মিথ্যা খোদা এবং জগতের সবকিছুর সাথে সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করে আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে সাক্ষ্য দান করা। শাহাদাহর দ্বিতীয় অংশ হলো-মুহাম্মাদ (সা)-কে আল্লাহর রাসূল (বার্তাবাহক) হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করা, যার সারকথা হলো-তাঁর সকল পদক্ষেপকে অনুসরণের সংকল্প করা। যখন কোনো মানুষ হৃদয়ের গভীর থেকে 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল'-ঘোষণাটি দেয়, তখন সে মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঈমান এমন কিছু নয়-যা অর্জনযোগ্য; বরং ঈমান হলো ইতোমধ্যে আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন, তা উন্মোচনের পথে যাত্রা। যে কুফরি করে অর্থাৎ আল্লাহকে মানতে অস্বীকার করে, তাকে বলা হয় কাফির। কাফির শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো এমন ব্যক্তি, যে সত্যকে ঢেকে রাখে। এ অর্থে কৃষক তার বীজ মাটিতে পুঁতে রাখে বলে কৃষককে আরবিতে কাফির বলা হয়। আধ্যাত্মিক অর্থে কাফির হলো সেই ব্যক্তি, যে তার হৃদয়ে থাকা ঈমানের মহামূল্যবান রত্নকে ঢেকে রাখে। পবিত্র কুরআনে শোকর বা কৃতজ্ঞতার বিপরীত শব্দ হিসেবে কুফর ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলাম এবং বলেছিলাম-আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয় আর কেউ অকৃতজ্ঞ (কাফারা) হলে আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।' সূরা লোকমান: ১২
মুসলিমদের কাছে কাফির সে নয়, যে আন্তরিকভাবে সত্যের সন্ধান করে চলেছে; বরং সেই কাফির, যে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও অহংকার, দম্ভ ও অকৃতজ্ঞতার কারণে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করে। অন্যকথায়, কাফিরদের মানসিক অবস্থা হলো মানবীয় স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীত।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো-আপনি কাউকে ইসলাম গ্রহণ করতে বা ইসলামের বার্তাগুলোকে মেনে নিতে বাধ্য করতে পারেন না। ঈমান স্বীকৃতি লাভ করে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীন প্রয়োগের মাধ্যমে। মানুষ যখন তার ইচ্ছার স্বাধীনতাকে পূর্ণভাবে ব্যবহার করে আল্লাহর অস্তিত্ব ও প্রভুত্বকে মেনে নেবে, তখনই সে ঈমানদার বলে বিবেচিত হবে। এ কারণে কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- 'দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো জবরদস্তি (বাধ্যবাধকতা) নেই।' সূরা বাকারা: ২৫৬
জগতের প্রতিটি মানুষ তার হৃদয়ে ঈমানের বীজ বহন করে চলেছে। এই বীজ কীভাবে বেড়ে উঠবে, তা নির্ভর করে আল্লাহ তার জন্য কী পরিকল্পনা করে রেখেছেন এবং সে আধ্যাত্মিকতার পথে কতটুকু চেষ্টা-সাধনা করবে তার ওপর।
'যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, আল্লাহ তার হৃদয়কে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।' সূরা তাগাবুন: ১১
শাহাদাহর প্রথম অংশ
আল্লাহকে বাইরের জগতে খুঁজে বের করা আমাদের কাজ নয়, আমাদের কাজ হলো নিজের ভেতরের দিকে দৃষ্টি দেওয়া এবং আল্লাহ ইতোমধ্যে কতখানি আমাদের নিকটে অবস্থান করছেন, তা স্মরণ করা। শাহাদাহ শব্দের অর্থ কেবল 'সাক্ষ্য দেওয়া' নয়; বরং কোনো কিছুর চাক্ষুষ সাক্ষী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া। এ অর্থে শাহাদাহর মাধ্যমে আমরা রুহের জগতের দৃশ্যমান চাক্ষুষ সাক্ষ্যের ঘোষণা দিয়ে থাকি। [১১৬] আমরা যখন বর্তমানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিই, তার মানে মূলত আমরা রুহের জগতের সেই সাক্ষ্যেরই পুনরাবৃত্তি করি। যখন আমরা বলি-'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তখন আমরা শুধু এ কথাই বলি না যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; বরং এ কথাও বলি যে, আল্লাহ ছাড়া জগতের কোনো কিছুরই সত্যিকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ, তিনি সৃষ্টিজগতের সবকিছুরই একাধারে উৎস ও গন্তব্য।
যেকোনো সংখ্যাকে অসীম দিয়ে ভাগ দিলে যেমন শূন্য হয়, তেমনি যেকোনো সসীম সৃষ্টি ও অসীম আল্লাহর ভাগফলও শূন্য হয়।
'পৃথিবীপৃষ্ঠে যা কিছু আছে-সবই ধ্বংসশীল। কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা (সত্তা); যিনি মহীয়ান, গরীয়ান।' সূরা আর-রহমান: ২৭
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো লক্ষ্য, পরিণাম বা গন্তব্যের জন্য বিনিয়োগ করা হলো অনেকটা মরুভূমিতে বরফ বিনিয়োগ করার মতো; যে বিনিয়োগের পরিণামে লোকসান অনিবার্য। আমরা যদি আমাদের পার্থিব কামনা-বাসনাগুলোকে আমাদের খোদা বানিয়ে ফেলি, তাহলে নিরন্তর অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা আমাদের গ্রাস করে রাখে। কেননা, আমাদের আবেগ ও ইচ্ছা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল।
'আসমান ও জমিনে যদি আল্লাহ ছাড়া আরও অনেক উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই (আসমান ও জমিন) ধ্বংস হয়ে যেত। কাজেই আরশের অধিপতি আল্লাহ মহান ও পবিত্র সেসব থেকে, যা তারা তাঁর প্রতি আরোপ করে।' সূরা আম্বিয়া: ২২
যেখানেই পৃথকীকরণ, সেখানে মতের ভিন্নতা; যার অনিবার্য পরিণাম দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ দৃষ্টান্ত পেশ করছেন: এক ব্যক্তির প্রভু অনেক, যারা পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক প্রভুর অনুগত-এ দুজনের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।' সূরা জুমার : ২৯
আপনি যদি এ বিশ্বজগৎকে আপনার প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে আপনি সৃষ্টির সবকিছুর দাসে পরিণত হবেন। কিন্তু আপনি যদি এক আল্লাহকে আপনার একমাত্র প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সৃষ্টিজগতের সবকিছু আপনার দাসত্ব করবে। আল্লাহর ভালোবাসা ও দয়ার প্রবাহ সকল সৃষ্টির মধ্যে সঞ্চারিত করাই হবে আপনার মিশন।
সকল নবি ও রাসূলকে আল্লাহর এককত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের একই বার্তা দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
‘আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং পরিহার করো তাগুতকে। অতঃপর, তাদের মধ্যে আল্লাহ কাউকে হিদায়াত দান করেছেন এবং তাদের মধ্য থেকে কারও ওপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা জমিনে ভ্রমণ করো-অতঃপর দেখ, অস্বীকারকারীদের কী পরিণতি হয়েছে।' সূরা নাহল : ৩৬
আমাদের হৃদয় কেবল তখনই পরম শান্তির স্বাদ অনুভব করতে পারে, যখন আমরা আমাদের সকল কামনা-বাসনাকে এক আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সোপর্দ করত সক্ষম হই। মহানবি বিষয়টিকে এভাবে তুলে ধরেছেন-
'যে ব্যক্তি এর ওপর মৃত্যুবরণ করল-সে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য সম্পর্কে জানে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' [১১৭]
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাক্যটির দুটি অংশ রয়েছে; লা ইলাহা অর্থ-কোনো উপাস্য (ইলাহ) নেই। ইল্লাল্লাহ অর্থ-আল্লাহ ছাড়া। এখান থেকে জানা যায়, আল্লাহ চান তাঁর স্বীকৃতি দেওয়ার পূর্বে আমরা যেন সকল উপাস্যকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিই। যখন হতাশা বা একাকিত্ব আমাদের গ্রাস করে, ভাবি-কেন মানুষ দুনিয়া ত্যাগ করে, কেন কোনো কিছুই স্থায়ী হয় না, কেন আমাদের চারদিকে যা ছড়িয়ে আছে-তাকে মিথ্যা মোহ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না, তখন আমরা লা ইলাহা পর্যায়ে থাকি; যতক্ষণ না ইল্লাল্লাহর দিকে হাঁটা শুরু করি। আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নিলে আমাদের যাবতীয় ব্যথা-বেদনা ও শূন্যতা দূর হয়ে যায়। হৃদয় অনাবিল শান্তিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা হওয়ার উপযুক্ত নই-এই ভেবে আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করা পুরো মাত্রায় ভুল কাজ। মনে রাখতে হবে, আমরা পুরোপুরি নির্ভুল হয়ে যাই-এমনটি আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে আশা করেন না। তিনি চান আমরা আমাদের সকল ত্রুটি-বিচ্যুতিকে সাথে নিয়েই যেন তাঁর কাছে ফিরে আসি। আমরা যখন আমাদের দারিদ্র্য, অভাব ও শূন্যতাগুলোকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিই, তখন তিনি তাঁর দানশীলতা (আল কারিম), পরাক্রমশীলতা (আস-সামাদ) ও ঐশ্বর্যময়তা (আল গানি) দিয়ে সেগুলোকে পূর্ণ করে দেন। আমাদের ঘরকে আলোকিত করতে হলে আমরা যেমন দরজা-জানালা খুলে দিই-যাতে সূর্যের আলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে, তেমনি আমাদের হৃদয়ের ঘরকে আলোকিত করতে হলেও হৃদয়ে দরজা খুলে দিতে হবে, যাতে আল্লাহর নুর সেখানে প্রবেশ করতে পারে।
আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা একটি বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাদের সাথে থাকেন। তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আল্লাহর সাথে আমাদের দূরত্ব তৈরি হয় তাঁকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থেকে। এ কারণে আমরা যখন আমরা অনিশ্চয়তা, সংশয় বা আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করি, তখন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র জিকির আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। এই জিকির আমাদের ভেতরে আল্লাহর নুর প্রবেশ করায়। ফলে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করি এবং আমাদের ভেতরকার ঈমান বিকশিত হতে শুরু করে।
কোনো কিছুকে অস্তিত্বে আনতে হলে সেটির জন্য আগে জায়গা খালি করতে হয়। 'লা ইলাহা'র মাধ্যমে আমরা আগে শূন্যতা তৈরি করি, তারপর 'ইল্লাল্লাহ'র মাধ্যমে সেই শূন্য স্থানকে পূর্ণ করি। লা ইলাহা'র মাধ্যমে আমরা সকল মিথ্যা খোদা, বস্তুগত সম্পদ, দুনিয়ার প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান মানুষ, নিজের লোভ-লালসা ইত্যাদিকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিই। নতুন সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে যেমন পুরোনো ভার্সনকে আনইনস্টল করতে হয়, তেমনি আল্লাহকে হৃদয়ে ইনস্টল করতে পুরোনো সকল খোদাকে আনইনস্টল করতে হয়। অন্য কথায়, ইল্লাল্লাহ'র পূর্বশর্তই হলো-'লা ইলাহা'। আল্লাহকে একমাত্র প্রভু হিসেবে মেনে নিতে হলে আপনাকে দুনিয়াবি সকল খোদা বা খোদাসদৃশ সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করেই আসতে হবে; অন্যথায় আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও সে ঘোষণা হবে কৃত্রিম ও নিষ্ফল।
আপনি যখন আল্লাহর প্রভুত্বকে নিজের ভেতর সত্যিকারার্থে ধারণ করতে পারবেন, তখন যেদিকে আপনি মুখ ফেরাবেন (পূর্ব বা পশ্চিম), কেবল আল্লাহর চেহারাই দেখতে পাবেন। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া ছাড়া কোনো কিছুরই অস্তিত্ব আপনার চোখে পড়বে না। নিচের ঘটনায় এই চিত্র সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে-
'এক সুফি একদিন দেখলেন, একটি বালক জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সুফি ঠিক করলেন, বালকটিকে জীবন সম্পর্কে কিছু শিক্ষা দান করবেন। তিনি বালকটিকে জিজ্ঞেস করলেন- "এ আলো কোথা থেকে এসেছে?” বালকটি প্রথমে আলোর দিকে তাকাল, তারপর তাকাল সুফির দিকে। এরপর আচমকা সে ফুঁ দিয়ে আলো নিভিয়ে দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল- “কিন্তু আলোটা গেল কোথায়?"
ঘটনার আকস্মিকতায় সুফি নির্বাক হয়ে গেলেন। বালকটি যে মহাসত্য উন্মোচন করল, তা হলো-যে উৎস থেকে আলো আসে, অবশেষে একই জায়গায় আলো ফিরে যায়।'
পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে সে কথাই ফুটে উঠেছে- 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন-নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' সূরা বাকারা: ১৫৬
আল্লাহর এককত্বের ভেতর তিনিই শুরু, তিনিই শেষ; তিনিই অতীত, তিনিই বর্তমান, তিনিই ভবিষ্যৎ। আল্লাহর অস্তিত্বের সামনে সব বিচ্ছেদ বিলীন হয়ে যায়, জগতের সবকিছু অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে।
শাহাদাহর দ্বিতীয় অংশ
একজন মানুষ যখন আল্লাহর অস্তিত্বকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর আত্মার সহজাত জ্ঞানকে বাস্তবে পরিণত করে, তখন অনিবার্যভাবে যে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, তা হলো-এ জ্ঞান দিয়ে সে কী করবে? মুসলিমদের জন্য মুহাম্মাদ (সা) হলেন এ প্রশ্নের উত্তর। কুরআনের কথাগুলো লিখিত আকারে আসেনি; বরং ২৩ বছর ধরে নবিজির ওপর কুরআন ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হয়েছে। সাহাবিরা যখন কুরআনের কথা ভাবতেন, তখন তাঁদের কল্পনায় রাসূল (সা)-এর মুখ ও তাঁর কণ্ঠের তিলাওয়াতই ভেসে আসত। এ দৃষ্টিতে আল্লাহর বার্তা ও বার্তাবাহক পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। মুহাম্মাদ (সা) হলেন ইসলামের কালিমার মৌলিক একটি অংশ। কারণ, তিনি আল্লাহর এককত্বের বিশ্বাসকে কাজে পরিণত করে দেখিয়েছেন। তাঁকে পবিত্র কুরআনে 'বিশ্ববাসীর জন্য রহমত' এবং 'উজ্জ্বল প্রদীপ' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি শুধু একজন বার্তাবাহকই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন, আল্লাহর একত্ববাদের সূর্য থেকে সংগৃহীত আলোর পূর্ণিমার চাঁদ। [১১৮] তিনি ছিলেন দুনিয়াতে আল্লাহর দাস ও আল্লাহর প্রতিনিধি-এ দুটি পরিচয়ের সংক্ষিপ্তসার। তাঁর চলার পথ অনুসরণ করার মাধ্যমেই আমরা কেবল সত্য ও বিভ্রমের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারি।
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদ (সা)-কে 'খাতামুন নাবিয়্যিন' [১১৯] বা নবিদের সিলমোহর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি নবুয়তের বিশাল গ্রন্থের শেষ অধ্যায় ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এ গ্রন্থের বাঁধাই (বাইন্ডিং)। তাঁর কাছে যে বার্তাগুলো প্রেরণ করা হয়েছিল, তা ছিল সকল নবি-রাসূলের কাছে প্রেরিত বার্তার নির্যাস। পবিত্র কুরআনে মুসলিমদের বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-
'আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না।' সূরা বাকারা: ২৮৫
যদি প্রত্যেক নবিকে নবুয়তের এক একটি 'পাজল পিস' হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে মুহাম্মাদ হবেন সেই পাজলের চূড়ান্ত পিস-যা নবুয়তের ধারাবাহিকতাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছে। তিনি ফেরেশতা বা অতিমানব ছিলেন না; ছিলেন আমাদের মতোই মরণশীল মানুষ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'বলো, আমি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। আমার নিকট ওহি প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ।' সূরা কাহাফ : ১১০
বর্ণিত আছে, তিনি যখন নামাজ পড়তেন, তখন এতখানি শূন্য হৃদয়ে নামাজ পড়তেন, যেন আল্লাহর স্মরণ ছাড়া জগতে আর কিছুর অস্তিত্ব নেই। তিনি কেবল খাদ্য ও পানি থেকে বিরত থেকেই রোজা করতেন না; বরং তাঁর ও আল্লাহর মধ্যকার যাবতীয় কিছু থেকে বিরত থেকেই রোজা করতেন। তিনি তাঁর অর্থ ও সম্পদ দিয়েই কেবল অভাবগ্রস্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসতেন না; বরং তাঁর সমগ্র অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিতেন।
মহানবি তাঁর নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে পূর্ণভাবে সঁপে দিয়ে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র প্রকৃত অর্থকে বাস্তবে রূপায়িত করেছেন। তাই মহানবি (সা)-এর কার্যক্রম হলো দুনিয়াতে আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন। আল্লাহ তায়ালা এ কথাটি এভাবে বলেছেন-
'আমি তাঁর কান, যা দিয়ে সে শোনে, তাঁর চোখ-যা দিয়ে সে দেখে, তাঁর হাত-যা দিয়ে সে ধরে, তাঁর পা-যা দিয়ে সে হাঁটে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাকে তা দান করি। সে আমার কাছে কোনো কিছু থেকে পানাহ চাইলে আমি তা মঞ্জুর করি।' হাদিসে কুদসি
মহানবি কেবল আল্লাহর পথনির্দেশনার মানচিত্র প্রেরণের বাহনই ছিলেন না; বরং তিনি স্বয়ং ছিলেন সেই মানচিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।' সূরা নিসা : ৮০
মহানবি ছিলেন আল্লাহর নিখাদ আয়না, আল্লাহর ইচ্ছার প্রয়োগের খাঁটি পাত্র। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যারা তোমার কাছে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহর কাছেই আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। তাদের হাতের ওপর রয়েছে আল্লাহর হাত।' সূরা ফাতহ: ১০
আল্লাহ তাঁর অন্যান্য রাসূলদের মতো মুহাম্মাদ (সা)-কে আমাদের জন্য 'সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী' [১২০] হিসেবে প্রেরণ করেছেন।
তিনি বাদশাহ বা শাসক হিসেবে দুনিয়াতে আসেননি; বরং তিনি এসেছিলেন নিরাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবতার জন্য আশার আলো হিসেবে, ভয়ার্ত মানুষের জন্য নিরাপত্তা হিসেবে, দরিদ্র মানুষের জন্য দাতা হিসেবে এবং হতাশাগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রেরণা হিসেবে। তিনি মন্দ মানুষকে ভালো মানুষ বানানোর জন্য আসেননি; তিনি এসেছেন এমন ঝরনা হয়ে, যা ঈমানের মৃত বীজে প্রাণের সঞ্চার করে।
কে ছিলেন মুহাম্মাদ
মুহাম্মাদ-এর বংশধারা ওপরের দিকে ইবরাহিম (আ)-এর সাথে যুক্ত হয়েছে, যিনি ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম তিন জাতির একত্ববাদের জনক। [১২১] মুহাম্মাদ ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬২ বছর বয়সে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ৪০ বছর বয়সে ফেরেশতা জিবরাইল-এর মাধ্যমে প্রথম ওহিপ্রাপ্ত হন।
প্রথম কিছুদিন তিনি গোপনে আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত বার্তাগুলো পরিচিত মহলের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন এবং একপর্যায়ে আল্লাহর নির্দেশে বহুবাদী মক্কার মানুষের কাছে একত্ববাদের ধারণা উপস্থাপন করেন। মক্কার অভিজাত ও নেতৃত্বস্থানীয় বংশ কুরাইশদের নেতাদের কাছে তিনি ঘোষণা করলেন, আল্লাহ তাঁকে বার্তাবাহক (রাসূল) হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি বললেন— ‘হে কুরাইশগণ! আমি যদি বলি—পাহাড়ের পেছনে একটি বড়ো সেনাবাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাহলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?’ মানুষের ভিড় থেকে বলা হলো—‘হ্যাঁ। কেননা, আমরা তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি।’ [১২২]
মক্কার লোকেরা মহানবি (সা)-কে এত বিশ্বাস করত যে, তাঁকে আস-সাদিক বা সত্যবাদী ও আল আমিন বা নির্ভরযোগ্য বলে ডাকত। তাঁর সততার আকাশচুম্বী সুনাম থাকা সত্ত্বেও মক্কার অধিকাংশ লোক তাঁর রাসূল মনোনীত হওয়ার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করল। তবুও মক্কার কুরাইশদের শত্রু ও সহিংস প্রতিরোধের মুখে মুহাম্মাদ তাঁর বার্তা প্রচার চালিয়ে গেলেন।
তেরো বছর ধরে মক্কাবাসীর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন সহ্য করার পর অবশেষে মহানবি মদিনায় হিজরত করলেন। মদিনার লোকেরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করল এবং তিনি মদিনায় একটি নতুন ইসলামি সমাজ বিনির্মাণ করলেন। সেখানে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আল্লাহর একত্ববাদের ধারণা এতখানি জনপ্রিয়তা অর্জন করল যে, মক্কার কুরাইশদের অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব হুমকির সম্মুখীন হলো।
কয়েকটি সংঘাত সংঘর্ষের পর অবশেষে বড়ো যুদ্ধ এড়াতে মুসলিম ও মক্কাবাসীদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হলো—যার নাম হুদাইবিয়ার সন্ধি। আপাত দৃষ্টিতে এ সন্ধি ছিল মক্কার অনুকূলে; কিন্তু এ চুক্তির পর মুসলিমরা স্বাধীনভাবে তাদের বার্তা সম্প্রসারণ ও সামাজিক ভিত্তি মজবুত করার দিকে মনোনিবেশের সুযোগ পেল। ফলে দলে দলে লোকেরা ইসলামের সুমহান আহ্বানে সাড়া দিতে থাকল। ওই সন্ধি সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে— ‘নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।’ সূরা ফাতাহ: ১
হুদাইবিয়ার চুক্তি স্বাক্ষরের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মক্কার কুরাইশরা চুক্তিভঙ্গ করল, ফলে এই চুক্তি অকার্যকর হয়ে গেল। ফলে রাসূল ১০ হাজার অনুসারী নিয়ে মক্কা অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে মক্কার নিয়ন্ত্রণ লাভ করলেন। তিনি প্রচলিত সকল নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করে পরাজিতপক্ষের লোকদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। যারা বছরের পর বছর ধরে নিপীড়ন চালিয়ে তাঁর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, তারা রাসূল-এর ক্ষমা পেয়ে অভিভূত হয়ে গেল।
জীবনের শেষ বছরগুলোতে মহানবি মুসলিম বিশ্বের সীমানা সংরক্ষণ, আরবের গোত্রীয় সংঘাত নিরসন এবং ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণের দিকে তাঁর মনোযোগ নিবদ্ধ করলেন। নবিজি তাঁর মৃত্যুর বছর (৬৩২ সালে) জীবনের প্রথম ও শেষ হজ সম্পাদন করেন। মহানবি (সা)-এর মৃত্যুর ১৪০০ বছর পরও তাঁর ক্ষমা, দয়া, বিশ্বাস ও ধৈর্যের শিক্ষা দুনিয়ার আনাচে-কানাচে কোটি মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
মুহাম্মাদ (সা)-এর জীবনের কয়েকটি ঘটনা বিরল সততা ও পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত দুটি পক্ষের ভেতর শান্তি স্থাপনের বিস্ময়কর ক্ষমতার জন্য দুনিয়াজুড়ে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে রাসূল বিশেষ সম্মানের পাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছেন। নিচের ঘটনায় এ রকম একটি চমৎকার উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছিলেন-
একবার কাবার একটি অংশ আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল। তখন কাবা ঘরে কয়েকশো মূর্তি ছিল। মক্কায় হজ করতে আসা বিভিন্ন গোত্রের হাজিরা এ মূর্তিগুলোকে কাবা ঘরে এনে স্থাপন করেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত কাবা ঘর সংস্কার করা শেষ হলে বিভিন্ন গোত্রের নেতারা কাবার দেয়ালে স্থাপিত পবিত্র কালো পাথর (হাজরে আসওয়াদ) সরানোর উদ্যোগ নিল। কিন্তু মক্কার বিভিন্ন গোত্রের নেতারা পাথরটিকে সরানোর সম্মানসূচক কাজ কে করবে, তা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলো; এমনকী এ নিয়ে সংঘাতের সূত্রপাতও হলো। একজন বয়স্ক লোক বিবাদমান পক্ষগুলোকে থামিয়ে একটি সমঝোতায় পৌছাল। ঠিক হলো-পরবর্তী সময়ে যে ব্যক্তি প্রথম কাবায় প্রবেশ করবে, তাঁর সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিষয়টির সুরাহা হবে। তখনও পর্যন্ত নবুয়ত লাভ না করা মুহাম্মাদ প্রথম কাবায় প্রবেশ করলেন। তিনি সবটা শুনে একটি চমৎকার সমাধান দিলেন।
প্রথমে তিনি একটি বড়ো চাদর আনতে বললেন, এরপর পাথরটিকে চাদরের মধ্যে রাখলেন, এরপর প্রতিটি গোত্রের একজন করে নেতাকে চাদরের একেকটি প্রান্ত ধরতে বললেন। সকলে মিলে নতুন স্থানে পাথরটিকে নিয়ে গেলে। এবার মুহাম্মাদ নিজ হাতে পাথরটিকে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করে দিলেন। এভাবে একটি সংঘাতমূলক পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান হলো।
নবুয়ত প্রাপ্তির আগে থেকেই রাসূল (সা)-এর মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনের অসাধারণ সৃজনশীলতা কার্যকর ছিল। একেবারে ছেলেবেলা থেকে তিনি সমাজে শান্তি স্থাপনের উপায় খুঁজে বেড়াতেন।
ক্ষমতা, সম্পদ বা সুনাম অর্জন মহানবি নবিজির লক্ষ্য ছিল না। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তোষ অর্জন। এমনকী মহানবি (সা)-এর একজন অনুসারী একবার তাঁর কুটির ঘরের দারিদ্র্য দশা স্বচক্ষে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। রাসূল তাঁর কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন-যখন রোম ও পারস্যের সম্রাটরা আরাম-আয়েশ ও জাঁকজমকভাবে জীবনযাপন করছে, তখন আল্লাহর রাসূল এমন শক্ত মাদুরে শুয়ে রাত্রিযাপন করছে যে, তাঁর শরীরে মাদুরের দাগ ফুটে উঠছে। এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তিনি কাঁদছেন। রাসূল জবাবে বলেছিলেন, এ দুনিয়ার আরাম-আয়েশের কোনো মূল্য তাঁর কাছে নেই। রাসূল (সা)-এর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল পরকালের ওপর, যেখানকার আরাম-আয়েশ হবে সীমাহীন, যেখানকার সৌন্দর্য হবে অতুলনীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সেখানে তিনি থাকবেন তাঁর প্রভুর সবচেয়ে নিকটে। [১২৩]
এমনকী ইসলামের বিজয়ের পর বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ তাঁর হস্তগত হলেও তিনি সেখান থেকে নিজের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য কোনো সম্পদ গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন শান্ত ও বিনয়ী একজন মানুষ। তিনি কারও ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করেননি; যদিও তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ রাসূল, মুসলিম বিশ্বের নেতা ও শাসক। তিনি ছাগলের দুধ দোহাতেন, [১২৪] নিজের ছেঁড়া কাপড়ে তালি জুড়ে দিতেন এবং দৈনন্দিন সাংসারিক কাজ করতেন। [১২৫]
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।' সূরা আহজাব: ২১
রাসূল (সা)-এর রেখে যাওয়া উদাহরণের মাধ্যমেই আমরা কুরআনের শিক্ষা বাস্তবে রূপায়িত করার প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকি। মহানবি তাঁর সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রুর প্রতিও দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শন করতেন। তাঁর জীবনের একটি বিখ্যাত ঘটনা ছিল এমন-
রাসূল (সা)-এর প্রতিবেশী ছিলেন এক বৃদ্ধা মহিলা। বৃদ্ধা রাসূল (সা)-এর দিকে প্রতিদিন ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করতেন। কারণ, তিনি রাসূল (সা)-এর প্রচারিত বক্তব্যের সাথে একমত ছিলেন না। একদিন রাসূল লক্ষ করলেন, বৃদ্ধাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তিনি বৃদ্ধাকে খুঁজতে বের হলেন এবং জানতে পারলেন, বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। রাসূল অসুস্থ বৃদ্ধাকে দেখতে গেলেন। বৃদ্ধা যখন জানতে পারলেন রাসূল তাকে দেখতে এসেছেন, তখন তিনি রাসূল (সা)-এর বদান্যতায় অভিভূত হয়ে গেলেন এবং অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করলেন। [১২৬]
অন্য একটি ঘটনা। মক্কার মূর্তিপূজারিদের অত্যাচার যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন একবার রাসূল (সা)-এর সাহাবিরা রাসূল (সা)-কে বললেন- তিনি যেন শত্রুদের প্রতি অভিসম্পাত করেন, যাতে তারা ধ্বংস হয়ে যায়। রাসূল জবাবে বললেন- 'নিশ্চয়ই আমি অভিশাপ দেওয়ার জন্য প্রেরিত হইনি; আমি কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি। [১২৭] রাসূল যখন তায়েফ নগরীতে ইসলামের আহ্বান নিয়ে গেলেন, তখন তায়েফের লোকেরা তাঁর প্রতি পাথর নিক্ষেপ করল এবং তাঁকে অপদস্থ করল। এমন নাজুক মুহূর্তেও রাসূল তায়েফবাসীর ধ্বংস কামনা করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেননি; বরং তিনি তাদের জন্য দুআ করেছেন এই আশায় যে, তাদের বংশধররা হয়তো ইসলামের বক্তব্য গ্রহণ করবে। [১২৮]
রাসূল বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ের ভেতরে কল্যাণময়তার বীজ বসবাস করে এবং আল্লাহ ইচ্ছা করলে যেকোনো মুহূর্তে এ বীজ বিকশিত হতে পারে। রাসূল-এর চোখ ছিল আধ্যাত্মিকতার গভীরতাসম্পন্ন। ফলে তিনি কোনো কিছুর বাহ্যিক দিকগুলোর পাশাপাশি অন্তর্নিহিত দিকগুলোর প্রতিও দৃষ্টিপাত করতে পারতেন। তিনি বীজের ভেতর ফুল দেখতে পেতেন, রাতের ভেতর ভোর দেখতে পেতেন, বাঁকা চাঁদের ভেতর পূর্ণিমা দেখতে পেতেন। তিনি মানুষের সর্বোচ্চ সুন্দর রূপটি দেখতে পেতেন। মানুষের সবচেয়ে বড়ো সম্ভাবনাগুলো তাঁর চোখে পড়ত। তিনি ভালোবাসা ও অন্তর্ভেদী কথা দিয়ে মানুষের ভেতরের সৃজনশীলতাকে পরিচর্যা করতেন।
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদ-এর নাম বিশেষ মর্যাদার সাথে উচ্চারিত হয়েছে। সূর্যের আলোকে বোঝাতে কুরআনে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, মুহাম্মাদ (সা)-এর আলো দানকারী প্রকৃতিকে বোঝাতে একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সূর্যের আলো সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'কতই না কল্যাণময় তিনি; যিনি আসমানে নক্ষত্ররাজির সমাবেশ ঘটিয়েছেন এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সিরাজান) আর আলো বিকিরণকারী চন্দ্র!' সূরা ফুরকান: ৬১
মুহাম্মাদ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও আলোকদীপ্ত প্রদীপ (ওয়া সিরাজান) হিসেবে।' সূরা আহজাব : ৪৬
সূর্য যেমন অস্ত গেলেও হারিয়ে যায় না, তেমনি মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষার আলো তাঁর অগণিত অনুসারীর হৃদয়কে আলোকিত করে চলেছে।
রাসূল খোদা নন; কেবল একজন মানুষই ছিলেন। তাই তাঁর মানবীয় বৈশিষ্ট্য তাঁর জীবন ও সকল মানুষের জীবনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করে। আপনি যদি শরণার্থী হয়ে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন-মুহাম্মাদ আপনার ব্যথা বোঝেন। কেননা, তিনিও একজন শরণার্থী ছিলেন, যাকে তাঁর দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আপনি যদি প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাতর হয়ে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন-মুহাম্মাদ আপনার কষ্ট অনুভব করতে পারেন। কেননা, তিনি জীবদ্দশায় তাঁর প্রিয় স্ত্রী ও তিন শিশুপুত্রকে হারিয়েছেন। আপনি যদি ইয়াতিম হয়ে জন্ম নিয়ে থাকেন অথবা আপনি যদি জীবদ্দশায় আপনার বাবা-মা-কে হারিয়ে থাকেন, তাহলে জানুন-মুহাম্মাদ আপনার দুঃখ বোঝেন। কেননা, তিনি জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছেন, মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন। আপনি যদি আপনার বন্ধুমহল ও পরিবারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে জানুন-তিনি আপনার সমব্যথী। কেননা, তিনি তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের দ্বারা মানসিক ও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন। যদি দুনিয়ার কেউ আপনাকে গুরুত্ব না দেয় বা অবহেলা করে, তাহলে জেনে রাখুন-মহানবি আপনার কষ্ট বুঝতে পারেন। কেননা, তিনি মানুষকে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা বোঝাতে তাঁর বহু বছর লেগেছে।
আপনি যে অবস্থায় নিপতিত হন না কেন, রাসূল আপনার সে অবস্থার অনুভূতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেছেন এবং আপনি যে উচ্চতর অবস্থানে যেতে চান না কেন, তিনি সেই শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। আপনার সবচেয়ে বড়ো সাফল্য বা সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতার মুহূর্তেও তাঁকে আপনি দৃষ্টান্ত ও পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। কেননা, তাঁর জীবন এমন এক কম্পাস-যা আপনাকে জান্নাতের চূড়ায় পৌছে দিতে পারে।
মুহাম্মাদ আমাদের মনে করিয়ে দেন আমরা কে
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মহানবি (সা)-কে এভাবে সম্মানিত করেছেন-'আর নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত। [১২৯] অনেক বিশ্লেষকের মতে, আল্লাহ যখন রাসূল (সা)-কে 'তুমি' বলে সম্বোধন করেন, তখন তিনি মানবজাতির প্রত্যেকের বক্ষস্থিত হৃদয়কেও সম্বোধন করে থাকেন। কারণ, সকল মানুষ এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্ট। সূরা আ'রাফ: ১৮৯
আমরা যখন মুহাম্মাদ (সা)-এর কথা আলোচনা করি এবং তাঁর জন্য দরুদ পাঠ করি, তখন আমরা মূলত আল্লাহর ইবাদতেই লিপ্ত হই। কেননা, আমরা আল্লাহর নির্দেশেরই অনুসরণ করছি। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবির প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবির জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো।' সূরা আহজাব: ৫৬
মহানবি (সা)-এর নবুয়তি আলোর (নুর মুহাম্মাদ) স্মরণ আমাদের ভেতরের কল্যাণময়তার বীজকে বিকাশে সাহায্য করে। আমরা যখন রাসূল (সা)-এর প্রতি সালাম প্রেরণ করি, তখন আমরা মূলত নিজের প্রতিও সেই সালাম প্রেরণ করে থাকি।
আমরা যতই মানবীয় মনস্তত্ত্ব আবিষ্কার করছি, ততই দেখতে পাচ্ছি-মানবীয় সীমাবদ্ধতার দেয়ালকে ভাঙতেই দুনিয়াতে নবি-রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। দৌড়বিদ রজার ব্যানিস্টার-এর উদাহরণ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যেতে পারে-
১৯৫৪ সালে রজার ব্যানিস্টার নামে এক দৌড়বিদ মানবেতিহাসে প্রথমবারের মতো চার মিনিটের কম সময়ে এক মাইল দূরত্ব অতিক্রমের রেকর্ড স্থাপন করে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ব্যানিস্টারের এ রেকর্ড গড়ার কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকজন দৌড়বিদ চার মিনিটের কম সময়ের মধ্যে এক মাইল দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ব্যানিস্টার মূলত কোনো রেকর্ড ভাঙেননি, তিনি শুধু মানুষের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে দেখিয়ে দিয়েছেন-মানুষের পক্ষে কী করা সম্ভব! [১৩০] একইভাবে আল্লাহ তাঁর নবি-রাসূলদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন আধ্যাত্মিকতার সামনের বাধা অপসারণের জন্য, যাতে মানুষ তার নিজের সম্ভাবনা বিকাশের জন্য উপযুক্ত দৃষ্টান্ত চোখের সামনে দেখতে পায়।
সূর্যের সাথে তুলনা করলে মহানবি (সা)-কে পূর্ণিমার চাঁদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। কেননা, তিনি আল্লাহর পরম সত্যের দিকে মুখ করে আছেন এবং আমাদের আত্মার ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করে চলেছেন। তিনি আল্লাহর বার্তার সাথে নিজের বিনয়, নম্রতা, দয়া, ভালোবাসা ও ক্ষমার গুণকে একীভূত করেছেন। তাঁর কাজ ওহির চেতনার পর্দাকে উন্মোচিত করেছে, তাঁর কথা মানুষের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণার অপনোদন করেছে, তাঁর চরিত্র ইবাদতের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং তাঁর পুরো জীবন আল্লাহর একত্ববাদ ধারণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে। রাসূল আমাদের শিখিয়েছেন-কী করে হিংসা, কাম, ক্রোধ, লোভ, অহংকারের মতো কুপ্রবৃত্তিগুলো থেকে বেঁচে থাকা যায়, কী করে তওবা ও জিকিরের মাধ্যমে নিজের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে তোলা যায়। রাসূল আমাদের শিখিয়েছেন, জগতে যা কিছু আমরা দেখি-তা হলো সেই জিনিসের প্রতিফলন, যা আমরা নিজের ভেতর বহন করে চলেছি। কাজেই আমাদের জীবনকে বদলাতে হলে আমাদের হৃদয়কে বদলানোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
পচে যাওয়া হৃদয়ের সাথে সৎকর্ম একটি কপটতা এবং পবিত্র হৃদয়ের সাথে সৎকর্মহীনতা একটি বিভ্রম। মহানবি আমাদের শিখিয়েছেন-কীভাবে অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধি ও বাহ্যিক আনুগত্যের সমন্বয় সাধান করে আধ্যাত্মিক পূর্ণতার যাত্রাপথে এগিয়ে যেতে হয়। মহানবি বলেছেন- 'আমি মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পূর্ণতা সাধনের জন্য দুনিয়াতে এসেছি।' [১৩১]
রাসূল দেখিয়ে গেছেন, নেতৃত্ব মানে কর্তৃত্ব নয়; বরং নেতৃত্ব মানে ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে অনুপ্রাণিত করা।
টিকাঃ
১১৬. এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে, সকল মানুষের রুহ সৃষ্টির পর সব রুহকে আল্লাহ জিজ্ঞেস করেছিলেন-'আমি কি তোমাদের রব নই?' সবগুলো রুহ জবাবে বলেছিল- 'নিশ্চয়ই, এ ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।' সূরা আ'রাফ: ১৭২
১১৭. তিরমিজি
১১৮. মহানবি -এর স্ত্রী আযিশা বলেছেন-'নিশ্চয়ই করআনই ছিল প্রিয়নবির চরিত্র।'
১১৯. সূরা আহজাব: ৪০
১২০. সূরা বাকারা: ১১৯
১২১. মুসা ছিলেন ইবরাহিম-এর দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক-এর বংশধর এবং মুহাম্মাদ ছিলেন ইবরাহিম-এর প্রথম পুত্র ইসমাইল-এর বংশধর।
১২২. বুখারি, মুসলিম
১২৩. বুখারি, মুসলিম
১২৪. আহমাদ
১২৫. বুখারি
১২৬. Arbil, Majd. 'The Compassion of the Prophet Towards Those Who Abused Him.' IslamiCity, June 26, 2018
১২৭. মুসলিম
১২৮. বুখারি, মুসলিম
১২৯. সূরা কালাম: ৪
১৩০. Taylor, Bill. 'What Breaking the Four-Minute Mile Taught Us About the Limits of Conventional Thinking.' Harvard Business Review. April 10, 2018
📄 নামাজ : আল্লাহর ভালোবাসাকে ধারণ
আরবি শব্দ সালাহ (নামাজ) এসেছে তিন বর্ণের মূল শব্দ, ص ل থেকে, যার অর্থ-মিনতি করা, কাছ থেকে অনুসরণ করা, সংযুক্ত হওয়া, বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ইত্যাদি। আমরা যখন নামাজ পড়ি, তখন আমরা জগতের সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করি এবং আল্লাহর পরম সত্যের (আল হাক্ক) সাথে নিজেকে যুক্ত করি। নামাজ হলো এমন এক ইবাদত-যেখানে বিনয়, ধ্যান ও কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষের শরীর, মন, চেতনা ও আত্মা একাকার হয়ে যায়। নামাজ হলো এমন এক চার্জিং স্টেশন, যেখান থেকে দৈনিক পাঁচবার আমরা আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর ভালোবাসার চার্জ দিয়ে পূর্ণ করি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমি জিন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি।' (সূরা জারিয়াত: ৫৬)। আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো-আল্লাহর নিঃশর্ত ভালোবাসার যন্ত্রে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে তাঁকে জানা, ভালোবাসা এবং তাঁর ইবাদতে মগ্ন হওয়া। নামাজ হলো একটি অ্যান্টেনার মতো, যে অ্যান্টেনা দিয়ে বিশ্বজগতে প্রচারিত (ব্রডকাস্ট) আল্লাহর ভালোবাসাকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করা যায়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সাথে আছেন।' (সূরা হাদিদ : ৪)। তিনি আরও বলেন- 'আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি। তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি থেকেও অধিক নিকটবর্তী।' (সূরা ক্বফ : ১৬)। তাই নামাজ মানে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া নয়; বরং আমরা আল্লাহর কতটা নিকটবর্তী সে কথা স্মরণ করা।
'যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটে। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায়, তারা সঠিক পথে চলবে।' (সূরা বাকারা: ১৮৬)। আমরা যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহকে ডাকি, তখন তিনি আমাদের ডাকে সাড়া দেন এবং তাঁর নৈকট্যকে আমাদের জন্য উন্মোচন করেন। আমরা যখন নিজেদের সত্তাকে পেছনে রেখে আল্লাহর দিকে ফিরি, তখন অনুভব করতে পারি যে, আমরা সৃষ্টিজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন নই। আল্লাহ দূর আকাশের বাসিন্দা নন; বরং আমাদের হৃদয় থেকে শুরু করে সৃষ্টিজগতের সবকিছুতে আল্লাহর ভালোবাসার প্রতিফলন অবিরতভাবে ঘটে চলেছে।
'ভালোবাসা খুঁজে বেড়ানো তোমার কাজ নয়। তোমার কাজ হলো- ভালোবাসার সামনে যে দেয়ালগুলো তুমি নির্মাণ করেছ, সেগুলো খুঁজে বের করা।' -জালালুদ্দিন রুমি। নামাজ কেবল কিছু শারীরিক অবস্থান পরিবর্তনের নাম নয়। কিছু প্রার্থনা-বাক্য উচ্চারণ ও বিনয় প্রদর্শনই নামাজের মূলকথা নয়। আমরা যখন নামাজে দাঁড়াই, তখন মূলত ভালোবাসার কক্ষপথে যুক্ত হই, নদীর সাথে প্রবাহিত হই, গাছের ঝিরঝিরে বাতাসের সাথে মিশে যাই, চাঁদের সঙ্গে নাচি এবং পাখিদের সাথে গান গাই। আমরা যখন নামাজ পড়ি, তখন জগতের অস্তিত্বশীল সেই সব সৃষ্টির সাথে যুক্ত হই-যারা অবিরতভাবে আল্লাহর প্রশংসা করে চলেছে।
'তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু রয়েছে আসমানসমূহে এবং যা কিছু রয়েছে জমিনে; সূর্য, চাঁদ, তারকারাজি, পর্বতমালা, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু ও মানুষের মধ্যে অনেকে। আবার অনেকের ওপর শাস্তি অবধারিত হয়ে আছে। আল্লাহ যাকে অপমানিত করেন, তাকে আর সম্মানিত করার কেউ নেই। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন।' (সূরা হজ: ১৮)। নামাজ কোনো শাস্তি নয়, নয় কোনো পুরস্কার; বরং নামাজ হলো আল্লাহর সাথে আমাদের সহজাত সংযুক্ততার একটি চর্চা। নামাজের গভীরতম উদ্দেশ্য কোনো লক্ষ্য অর্জন নয়; বরং নামাজ হলো আল্লাহর সাথে আন্তরিক কথোপকথনের একটি মাধ্যম মাত্র।
নামাজ আপনারই জন্য। আল্লাহর আমাদের প্রার্থনার কোনো প্রয়োজন নেই। তাই আমাদের প্রার্থনা আল্লাহর জন্য নয়; বরং আমাদের নিজেদের আত্মার সুরক্ষার জন্য। ১০০ আমরা যদি পাপ করার পর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা বন্ধ করে দিতাম, তাহলে জগতের কাউকে প্রার্থনারত দেখতে পাওয়া যেত না। মানুষ মাত্রই ভুল; পাপের ঊর্ধ্বে কেউ নেই। ঈমানদার সে নয়, যার কোনো পাপ নেই; বরং ঈমানদার সে, যে পথভ্রষ্ট হওয়ার পর আবার আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।
'এসো, তুমি যে-ই হও, চলে এসো। তুমি পর্যটক, প্রার্থনাকারী, প্রেমিক, পরিত্যাগকারী যে-ই হও-কোনো সমস্যা নেই। এটি হতাশার কাফেলা নয়। তুমি যদি তোমার ওয়াদা হাজারবারও ভেঙে থাকো, তবুও তুমি নির্ভয়ে চলে এসো। এসো, তুমি চলে এসো।' -জালালুদ্দিন রুমি।
প্রকৃতপক্ষে সে-ই সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগা, যে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনাহীন জীবনযাপন করে। আল্লাহ হলেন 'আফউ' বা ক্ষমাকারী, যাঁর ক্ষমাশীলতা মহাসাগরের চাইতেও বিশাল। তিনি আমাদের পাপের সকল রেকর্ড এমনভাবে মুছে দেন, যেন ওই রেকর্ডে কোনো কালে কিছুই ছিল না।
'তোমার রবের সপ্রশংস তাসবিহ পাঠ করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী।' (সূরা নাসর: ৩)। যদি আপনি দেখেন-আপনি কুপ্রবৃত্তির সেই প্ররোচনায় আবার পড়েছেন, যে প্ররোচনাকে আপনি আগেই জয় করেছেন বলে ভেবেছিলেন, তাহলে হতাশ হবেন না। ভুল করা ও ফিরে আসার প্রক্রিয়াটি অনেকটা স্পাইরালের মতো। আপনি হয়তো ভাবছেন, আপনি পেছনে চলে গেছেন; কিন্তু আপনি জানেন না, আপনি আরও গভীরে প্রবেশ করেছেন। তওবার চর্চা হলো আপনার ভেতকার এমন আধ্যাত্মিক সংশোধন, যার মাধ্যমে আপনি আপনার হৃদয় ও সংকল্পকে আবার আল্লাহর সাথে যুক্ত করতে পারেন।
নামাজ আমাদের আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও মানসিক উপশম দান করে। কয়েক ডজন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাটি বা মেঝেতে উবু হয়ে সিজদা করার মধ্যে অনেক উপকারিতা রয়েছে। খালি পা, হাত ও কপাল যখন মাটি স্পর্শ করে, তখন আমাদের শরীরের অনেক ক্ষতিকর বৈদ্যতিক চার্জ ডিসচার্জ হয়ে যায়। ১৩৮ শুধু শারীরিক উপকারিতা নয়, সিজদার মাধ্যমে আমরা অনেক আধ্যাত্মিক উপকারিতা পেয়ে থাকি। সিজদা আমাদের আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও নিজের তুচ্ছতার কথা মনে করিয়ে দেয়। মুসলিম শরিফে রাসূল ﷺ বলেছেন- 'আল্লাহর বান্দা তাঁর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয় তখন, যখন সে সিজদায় থাকে। অতএব, তোমরা আল্লাহর কাছে মিনতি করো।'
কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ ﷺ এত লম্বা সময় ধরে সিজদা করতেন যে, সেই সময়ে ৫০টি কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা যেত। ১৩৯ আমরা যখন সিজদা করি, তখন দুনিয়ার সকল দুশ্চিন্তার বোঝা আমাদের মাথা থেকে নেমে যায়। নদীর স্রোত যেমন সমুদ্রে প্রবেশ করে প্রশান্ত হয়ে যায়, আমাদের কষ্ট-বেদনা ও নানা সমস্যাও তেমনি আল্লাহর ভালোবাসার সমুদ্রে প্রবেশ করে প্রশমিত হয়ে যায়।
'নিশ্চয়ই যখন বান্দা নামাজে দাঁড়ায়, তখন তার পাপগুলো মাথায় অবস্থান করে। যতবার সে রুকু ও সিজদা করে, ততবার তার পাপগুলো ঝরে পড়ে যায়।' ১৪০
নামাজের বিধান নামাজই একমাত্র ইবাদত, যেটি জিবরাইল (আ)-এর মাধ্যমে নয়; মহানবি মুহাম্মাদ (সা)-কে আল্লাহ সরাসরি দান করেছেন। আল্লাহ মানুষের সাথে কথা বলেন তাঁর রাসূলদের কাছে পাঠানো ওহির মাধ্যমে আর মানুষ আল্লাহর সাথে কথা বলে নামাজের মাধ্যমে। এ কারণে, এমনকী আমরা যখন একাকী নামাজ পড়ি, তখনও বলি- 'আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।' (সূরা ফাতিহা : ৫)।
সময় আপেক্ষিক। আইনস্টাইন দেখিয়েছেন, কোনো বস্তু যখন আলোর গতির কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন সেই বস্তুর জন্য সময় ধীর হয়ে যায়। ১৩৫ মহাজগতে ভ্রমণ করে চলা একটি আলোকরশ্মি বাস করছে বর্তমান মুহূর্তে; যার কোনো অতীত নেই, নেই কোনো ভবিষ্যৎ। আমরা যদি কোনোভাবে সেই আলোকরশ্মিতে প্রবেশ করতে পারি, তাহলে সময় থেমে যাবে। এ কারণে যখন আমরা আন্তরিকভাবে সেই আল্লাহর উপস্থিতির সাথে যুক্ত হই- 'যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের আলো' ১৩৬ তখন সময় প্রসারিত হতে শুরু করে।
আজান ও অজু। দৈনিক পাঁচবার আজানের মাধ্যমে দুনিয়ার সবকিছু থেকে মনোযোগ সরিয়ে আমাদের এক আল্লাহর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়। আজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আমার হাতের কাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আল্লাহকে স্মরণ করা। আজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নামাজ হলো সাফল্যের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক উপলব্ধি (হাইয়া আলাল ফালাহ)। অজুর মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র করে নিতে হয়। মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন- 'নামাজের চাবি হলো অজু।' ১৪২
কাবার দিকে মুখ ফেরানো। আমাদের একতাবদ্ধ করার লক্ষ্যেই সবাইকে একটি ভৌগোলিক কেন্দ্রের দিকে মুখ ফেরাতে বলা হয়েছে। 'সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে; বরং বড়ো সৎকর্ম হলো এই যে, যারা ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর, কিয়ামত দিবসের ওপর, ফেরেশতাগণের ওপর এবং সমস্ত নবি-রাসূলগণের ওপর...' (সূরা বাকারা: ১৭৭)।
আল ফাতিহা : হৃদয়-উন্মোচক। প্রতিটি নামাজ শুরু হয় পবিত্র কুরআনের প্রথম সূরা ফাতিহা দিয়ে। ফাতিহা শব্দের অর্থ ভূমিকা, শুরু, সূচনা, উন্মোচক। এ সূরাটি আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর পথনির্দেশের আলোর সামনে উন্মোচন করে দেয়। ১৪৩
নামাজ ও আল্লাহর স্মরণের রহস্য। দিনে পাঁচবার নামাজ পড়া সহজ কাজ নয়, তবে খাঁটি মুমিনের কাছে এটি আল্লাহর আদেশের আনুগত্যের চাইতেও বেশি কিছু। নামাজ হলো আল্লাহর দয়ার সাগরে সাঁতার কাটা এবং আত্মার প্রতিটি অণুকে আল্লাহর কৃতজ্ঞতার সাগরে নিমজ্জিত করা।
'তোমার রবের সপ্রশংস তাসবিহ পাঠ করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী।' (সূরা নাসর: ৩)। যখন সমগ্র দুনিয়া তোমাকে ধাক্কা দিয়ে হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বসতে বাধ্য করে, তখন জেনে রেখ- সেটাই তোমার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার সবচেয়ে উপযুক্ত অবস্থান।
টিকাঃ
১০০. সুরা জাসিয়া: ১৫
১০৩. বুখারি, মুসলিম
১০৪. তিরমিজি
১৩৫. Redd. Nola Taylor. 'Einstein's Theory of General Relativity.' Space.com. November 8, 2017
১৩৬. সূরা নুর: ৩৫
১৩৭. Alban, Deane. 'How to Increase Blood Flow to the Brain.' Brain Fit, June 24, 2018
১৩৮. Chevalier, Gaetan, et al. 'Earthing: Health Implications of Reconnecting the Human Body to the Earth's Surface Electrons.' Journal of Environmental and Public Health.
১৩৯. বুখারি
১৪০. ইবনে হিব্বান
১৪১. সূরা আম্বিয়া: ৩০
১৪২. তিরমিজি
১৪৩. মুসলিম
📄 জাকাত : আল্লাহর দান বিতরণ
যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধন ও নিজেদের মনে (ঈমানের) দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের তুলনা সেই বাগানের ন্যায়-যা উচ্চভূমিতে অবস্থিত, তাতে মুষলধারে বৃষ্টিপাতের ফলে দ্বিগুণ ফল ধরে। যদি তাতে বৃষ্টিপাত না-ও হয়, তবে শিশিরবিন্দুই যথেষ্ট। তোমরা যা কিছুই করো, আল্লাহ তার সম্যকদ্রষ্টা। সূরা বাকারা : ২৬৫
তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করো।
যখন আপনার কাছে এমন কিছু আছে-যা অপর কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন, তখন সেই ব্যক্তির প্রার্থনার জবাব আল্লাহ আপনার মাধ্যমে দেন। যখন অপরের কোনো প্রয়োজন পূরণের প্রশ্নে আপনি 'হ্যাঁ' বলেন, তখন আপনি আল্লাহর ভালোবাসা, বদান্যতা, উদারতা ও প্রাচুর্যের উপকরণে পরিণত হয়ে যান। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তা ব্যয় করবে-যা তোমরা ভালোবাসো।' সূরা আলে ইমরান: ৯২
আল্লাহ আমাদের প্রিয়বস্তুগুলো দান করতে বলেছেন। কারণ, সৃষ্টিকে ভালোবাসা হলো আল্লাহকে ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
'সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।'
কেবল দুআ ও প্রশংসাবাণী উচ্চারণের মাধ্যমে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায় না; বরং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আপনাকে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দানশীল ও সহানুভূতিশীল হতে হবে। আল্লাহ কুরআনে দুই ধরনের দানের কথা বলেছেন: সাদাকা ও জাকাত। সাদাকা হলো সেই দান, যা আদায় করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। আর জাকাত হলো সেই দান, যা আদায় করা বাধ্যতামূলক।
সাদাকা হলো অপরের কল্যাণার্থে খাঁটি সংকল্পের ভিত্তিতে প্রদান করা উপহার। অন্যদিকে জাকাত হলো একটি বাধ্যতামূলক কাজ, যা শর্তহীনভাবে আল্লাহর বান্দাদের নিকট বিতরণ করতে হয়।
'একজন মুমিন কোনো গাছ রোপণ করলে বা কোনো বীজ বপন করলে সেই গাছ থেকে পাওয়া ফল যখন অন্য মানুষ ও পশুপাখি খায়, তখন সেটি মুমিনের দান হিসেবে গণ্য হয়।'
কেবল অর্থদানই সাদাকা নয়; বরং কল্যাণকর যেকোনো কাজ করা বা সেই কাজটিকে উৎসাহ দেওয়া বা কোনো কল্যাণকর কাজে অংশ নেওয়াও সাদাকা। তাই রাস্তা থেকে ক্ষতিকর কোনো কিছু সরিয়ে দেওয়া, বয়স্ক লোকদের সাথে ধৈর্যপূর্ণ আচরণ করা, অন্ধ লোককে পথ দেখানো-সবই সাদাকার অংশ। এমনকী মহানবি ﷺ বলেছেন-
'তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দেওয়াও একটি সাদাকা।'
হতাশ ব্যক্তিকে আশা দেওয়া, বেদনার্ত ব্যক্তির প্রতি মমতা প্রদর্শন করা, দুর্বলের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা, মজলুমের পক্ষে কণ্ঠ উচ্চকিত করা এবং নির্বিশেষে সকলের প্রতি হাসি ও আনন্দ উপহার দেওয়া-এ সবই সাদাকার অন্তর্ভুক্ত।
কথা বলার মাধ্যমে সাদাকা
মুহাম্মাদ ﷺ বলেছেন-'একটি সুন্দর কথা একটি সাদাকা।' আমাদের কথা বলার সক্ষমতা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি উপহার। কাজেই আমাদের জিহ্বাকে বাজে ও বেহুদা কথা, গিবত ও ক্ষতিকর কথা থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। সুফিরা বলেন-
'কোনো কথা বলার আগে কথাটিকে তিনটি দরজা দিয়ে অতিক্রম করাও। প্রথম দরজায় নিজেকে প্রশ্ন করো-এটি কি সত্য? দ্বিতীয় দরজায় নিজেকে প্রশ্ন করো-এটি কি প্রয়োজনীয়? এবং তৃতীয় দরজায় প্রশ্ন করো-এটি কি কল্যাণকর?'
আমাদের কথা বলার সক্ষমতাকে অবশ্যই অন্যদের প্রেরণা, উৎসাহ ও পথনির্দেশ প্রদানের কাজে ব্যয় করতে হবে। প্রতিটি কথারই একটি শক্তি রয়েছে। তাই তো আলি বলেন-
'কেবল তখনই কথা বলো, যখন তোমার বলা কথা নীরবতার চেয়ে বেশি সুন্দর হয়।'
সৃষ্টিজগতের সবকিছু অস্তিত্বশীল হয়েছে আল্লাহর কথা 'হও'-এর মাধ্যমে। অতএব খেয়াল রাখুন, আপনার জিহ্বা হলো একটি ছুরির মতো। এ জিহ্বা কাউকে হত্যা করতে পারে, আবার ডাক্তারের হাতে পড়লে তা দিয়ে কারও প্রাণ রক্ষাও পেতে পারে।
জাকাত : আপনার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের করো
প্রয়োজনমাফিক অভাবগ্রস্তদের প্রতি দানের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি, দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সামর্থ্যবান মুসলিমদের বছরে একবার সকল সম্পদের শতকরা ২.৫ ভাগ গরিবদের দান করার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তাকে জাকাত বলা হয়। এক্ষেত্রে একটি বিষয় হলো-জাকাত প্রদান করা তার জন্যই অবশ্য কর্তব্য, যার সারা বছরের ব্যয় মেটানোর পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকে। জাকাত কেবল ৮ ধরনের মানুষকে দেওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'জাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, জাকাত বিতরণের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য, ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারী ও মুসাফিরের জন্য। এ আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' সূরা তাওবা : ৬০
তবে জাকাত বা সাদাকা যা-ই হোক না কেন, তা অবশ্যই বৈধ পথে উপার্জিত (হালাল) হতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, নিজ পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূর্ণ করার পরই কেবল জাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক। এটি সাধারণ কোনো দান নয়; বরং আমাদের ওপর আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহের করো, যা সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাকাতের আরেকটি অর্থ হলো-'যা পরিশুদ্ধ করে'। শরীর থেকে যেমন বর্জ্য পদার্থ বেরিয়ে গেলে শরীর পবিত্র হয়, তেমনি জাকাত পুরো সম্পদকে পবিত্রতা দান করে।
'তোমাদের নিজেদের কল্যাণে ব্যয় করো। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।' সূরা আত-তাগাবুন: ১৬
কৃতজ্ঞতা ও ঈমানের শত্রু হলো লোভ। এজন্য রাসূলুল্লাহ বলেছেন- 'আমি এ ভয় করি না যে, আমার মৃত্যুর পর তোমরা অন্য কারও উপাসনা শুরু করে দেবে; বরং এ ভয় করি, তোমরা দুনিয়াবি সম্পদের জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।'
আমরা যখন অপরকে দান করি, তখন বস্তুগত দুনিয়ার প্রতি আমাদের আকর্ষণের বাঁধন ঢিল হতে শুরু করে। জাকাত সমাজে সম্পদ প্রদান ও গ্রহণের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। আমরা যদি নিশ্বাস গ্রহণ করি, কিন্তু না ছাড়ি, তাহলে আমাদের শরীরে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, জাকাত না প্রদান করলে সমাজে একই রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। জাকাত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি একটি অনুগ্রহ। কেননা, জাকাতের মাধ্যমে আমার আমাদের ধন-সম্পদকে পরিশুদ্ধ করি। আমরা আমাদের প্রবৃত্তিকে যত কম তৃপ্ত করব, আমাদের আত্মা ততই আধ্যাত্মিক পথে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের কাছে যা কিছু আছে, তার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হই না; বরং যা কিছু আমরা দান করি, তার মাধ্যমেই আল্লাহর নিকটবর্তী হই। যেহেতু আমাদের কাছে যা কিছু আছে তার সবই ধ্বংসশীল, সেহেতু যা কিছু আমরা দান করে দিই, কেবল তা-ই আমাদের জন্য থেকে যায়।
মুহাম্মাদ ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের মাধ্যমে এ কথাটি অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। একবার রাসূল -এর স্ত্রী একটি জবাই করা ভেড়ার গোশত বিলিয়ে দিলেন। রাসূল তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন-'কিছু কি বাকি আছে?' স্ত্রী জবাবে বললেন-'এটির ঘাড় ছাড়া কোনো কিছু আর অবশিষ্ট নেই।' রাসূল জবাবে বললেন-'এর সবকিছুই আছে (আল্লাহর হিসাবে), এর ঘাড়টি ছাড়া।' রাসূলুল্লাহ বলতে চেয়েছেন-যা কিছু আমরা আল্লাহর পথে দান করি, প্রকৃতপক্ষে সেগুলোই কেবল রয়ে যায়।
আমরা এ জগতে যে সৎকর্মের বীজ বপন করি, তা কখনো নষ্ট হয়ে যায় না; বরং সেগুলো মৃত্যুপরবর্তী জগতে আমাদের জন্য বিশাল সঞ্চয় হয়ে দেখা দেবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'অতএব, তোমাদের যা দেওয়া হয়েছে, তা পার্থিব জীবনের ভোগ মাত্র। আর যা আল্লাহর কাছে রয়েছে, তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। এগুলো তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের পালকর্তার ওপর ভরসা করে।' সূরা আশ-শূরা: ৩৬
আমরা যখন কবরে প্রবেশ করব, তখন আমাদের সঞ্চিত ধন-সম্পদ আমাদের সাথে যাবে না; বরং যে দান ও সৎ কাজ দুনিয়াতে করব, তা-ই আমাদের সাথে যাবে।
'দান সম্পদ কমায় না।'
জাকাত শব্দটির যে শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে, তার অর্থ-বৃদ্ধি, বহুগুণ ইত্যাদি। আমরা যখন আল্লাহর জন্য দান করি, তখন মূলত আমরা আল্লাহর উদারতা ও দয়ার জন্য নিজের দরজা খুলে দিই এবং আরও সম্পদ প্রাপ্তির জন্য নিজেকে উপযুক্ত করে তুলি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'বলো, আমার প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করে দেন, আর যার জন্য ইচ্ছা সীমিত করেন। তোমরা যা কিছু (সৎ কাজে) ব্যয় করো, তিনি তার বিনিময় দেবেন। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।' সূরা সাবা : ৩৯
এ আয়াতে আল্লাহ দানের বিনিময় দেবেন বলেছেন। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি বিনিময় হিসেবে বহুগুণ বেশি দান করবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'এমন কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে-ফলে তিনি তার জন্য বহুগুণে বাড়িয়ে দেবেন? আর আল্লাহ সংকীর্ণ ও প্রসারিত করেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।' সূরা বাকারা: ২৪৫
আপনার জাকাতের মালিক আপনি নন
প্রদানকারীকে নয়; বরং গ্রহণকারীকেই জাকাতের মালিক বলা হয়। কারণ, আল্লাহ অভাবগ্রস্তদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে চান। জাকাত কোনো দান নয়; বরং এটি গরিবের পাওনা। যতক্ষণ এটি পরিশোধ না করছেন, ততক্ষণ আপনি দায়মুক্ত নন। জাকাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যা কিছু উপার্জন করি, তার মালিক আমরা নই; বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া আমাদের জন্য ঋণ। যখন আমরা কাউকে কোনো কিছু দান করি, তখন নিজের থেকে দিই না; বরং আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে দিই। আমরা আমাদের সম্পদের মালিক নই; বরং আল্লাহর সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক মাত্র।
সুফি-সাধকরা বলেন, ‘ইসলামের চারটি মাত্রা রয়েছে। যথা— ১. যা আমার, তা আমার এবং যা তোমার, তা তোমার। ২. যা আমার, তা তোমার এবং যা তোমার, তাও তোমার। ৩. কোনো কিছুই আমার নয়, তোমারও নয়। ৪. আমার ও তোমার বলতে কিছু নেই; শুধু রয়েছে আমাদের।
কাজেই আপনি যদি আমাকে কিছু দান করেন, তবে প্রকৃতপক্ষে আপনি আমাকে দান করছেন না; বরং আল্লাহই আমাদের দান করছেন। দান গ্রহণের সময় আমি আল্লাহর আর রাজ্জাক নামের স্বাদ অনুভব করি, আর দান করার সময় আপনি আল্লাহর আল কারিম নামের স্বাদ অনুভব করেন।
নিজের উদারতার মালিকানা দাবি করবেন না। কেননা, আমাদের উদারতা হলো আল্লাহর উদারতারই বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তায়ালা বলেন— ‘হে ঈমানদারগণ! দানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা নিজেদের দানকে সে ব্যক্তির ন্যায় ব্যর্থ করে দিয়ো না, যে নিজের ধন ব্যয় করে লোক দেখানোর জন্য।’ সূরা বাকারা : ২৬৪
মনে রাখতে হবে, এ জগতের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে আল্লাহ আমাদের ধন্য করেছেন। আমাদের দানের তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই; বরং দান করার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা আমাদেরই প্রয়োজন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা উত্তম। আর যদি গোপনে করো এবং অভাবগ্রস্তদের দান করো, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম; অধিকন্তু তিনি তোমাদের কিছু গুনাহ মোচন করে দেবেন। বস্তুত যা কিছু তোমরা করছ, আল্লাহ তার খবর রাখেন।' সূরা বাকারা : ২৭১
গোপন দান দান-গ্রহীতার মর্যাদা সমুন্নত রাখে এবং দাতাকে অহংকার থেকে সুরক্ষা দেয়। দান করার সুযোগ পাওয়ার জন্য দাতারই উচিত আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা। যদি কেউ অভাবগ্রস্ত না হতো, তাহলে আমরা আল্লাহর উদারতা, মমতা ও ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ পেতাম না। তাই অভাবগ্রস্তদের দান করতে পারাই সৌভাগ্যের ব্যাপার।
আল্লাহ আমাদের যে অনুগ্রহ করেছেন, তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে অপরের প্রতি সেবামূলক কাজের মাধ্যমে। যখন আমরা অন্যের সেবা করি, তখন নিজের ভেতরের দয়া ও মমতার বীজে পানি সিঞ্চন করি। মহান আল্লাহ বলেন-
'তোমরা ভালো কাজ করলে নিজেদের কল্যাণের জন্যই তা করবে।' সূরা বনি ইসরাইল : ৭
আমরা যখন অপরকে দান করি, তখন মূলত নিজেকেই দান করি এবং আল্লাহর দৃষ্টিতে নিজের মর্যাদাকে সমুন্নত করি; যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে আদমসন্তন! তোমরা ব্যয় করো, আমি তোমাদের জন্য ব্যয় করব।'
দানের প্রতিটি কণাই মূল্যবান
দান করতে গিয়ে আমাদের মনে হতে পারে, মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় আমার সামর্থ্য তো নেহায়েত তুচ্ছ। সামান্য সামর্থ্য দিয়ে কী করে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসব! এমন অনুভূতি সৃষ্টি হলে খেয়াল করতে হবে, সবকিছুর সৃষ্টি খুব ক্ষুদ্র অবস্থা থেকেই হয়ে থাকে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাটির কণা থেকে পাহাড়ের সৃষ্টি হয়। অতি ক্ষুদ্রাকৃতির ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে মানবশিশু অস্তিত্ব লাভ করে। এমনকী যে বিগব্যাংয়ের মাধ্যমে মহাশূন্যে এ বিশ্বের অস্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তার আকৃতি একটি মটর দানার সমান। একটি খাঁটি হৃদয় ও নিষ্কলুষ সংকল্প থেকে আল্লাহ যা সৃষ্টি করতে পারেন-তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, তাকে অবমূল্যায়ন করবেন না। যেমনটি আলি বলেছেন-
'আল্লাহর সাথে ব্যাবসা করো, তুমি অবশ্যই লাভবান হবে।'
পবিত্র কুরআনে একই কথা ধ্বনিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা উৎপন্ন করল সাতটি শিষ; প্রতিটি শিষে রয়েছে একশো দানা। আর আল্লাহ যাকে চান, তার জন্য বাড়িয়ে দেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।' সূরা বাকারা: ২৬১
আল্লাহ আমাদের সাধ্য মোতাবেক দান করতে বলেছেন। মহান আল্লাহ বলেন- 'সচ্ছল ব্যক্তি তার সচ্ছলতা অনুসারে ব্যয় করবে। আর যার রিজিক সীমিত করা হয়েছে, সে ব্যয় করবে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে। আল্লাহ তাকে যতটা দিয়েছেন, তার অতিরিক্ত বোঝা তার ওপর চাপান না। আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেন।' সূরা তালাক: ৭
আজ যে ছোট্ট পদক্ষেপ আমরা ফেলছি, আগামীকাল তা কয়েক মাইল দূরের পথ পাড়ি দেবে। আপনার অর্থ দান করুন, সময় দান করুন। অর্থাৎ আপনার দান করা উচিত-এমন সবকিছু দান করুন। কেননা, আপনি কেবল শূন্য ও রিক্ত অবস্থায়ই আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহের স্বাদ অনুভব করতে পারবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তিনি তোমাদের সেসব কিছুই দান করেছেন, যা তোমরা চেয়েছ (তোমাদের প্রয়োজনের সবকিছু পেয়েছ)। আর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করতে চাইলে কখনো তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই বড়োই জালিম, বড়োই অকৃতজ্ঞ।' সূরা ইবরাহিম : ৩৪
মনে রাখা দরকার-যা কিছু আমরা আল্লাহর পথে দান করছি, তা ক্ষয়িষ্ণু ও ভঙ্গুর। কিন্তু বিনিময়ে আল্লাহ আমাদের যা কিছু দান করবেন, তা চিরস্থায়ী ও অসীম। বৃষ্টির একটি ফোঁটাকেও যেমন সাগর অভিবাদন জানায়, তেমনি আমাদের সামান্য দানেও আল্লাহ খুশি হন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অতএব, কেউ অণু পরিমাণও সৎ কাজ করলে সে তা দেখবে, আবার কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলেও সে তা দেখবে।' সূরা জিলজাল : ৭-৮
কাজেই কোনো ভালো কাজই তুচ্ছ নয়। আলি বলেন- 'তোমার দান যদি সামান্যও হয়, তুমি লজ্জা পেয়ো না। কারণ, অভাবগ্রস্তকে ফিরিয়ে দেওয়া আরও বেশি লজ্জার।'
আল্লাহর দৃষ্টিতে কোনো সৎকর্মই ছোটো নয়। মহানবি বলেছেন- 'প্রতিটি প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের পুরস্কার রয়েছে।'
আমরা হয়তো সামান্য দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দিতে পারব না, তবে আমরা যতই ভালোবাসা রোপণ করব, ততই সুগন্ধি ফুল ফুটতে থাকবে। তাই তো রাসূলুল্লাহ বলেছেন- 'জেনে রেখ, আল্লাহর কাছে তোমাদের সেই সৎকর্ম বেশি পছন্দনীয়- যা ছোটো, কিন্তু তোমরা নিয়মিত করে থাকো।'
দানের সুফলের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
দান কেবল আমাদের চেতনাকেই জাগ্রত করে না; বরং শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তিও এনে দেয়। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ-এর কিছু গবেষক আবিষ্কার করেছেন, দান মানুষের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টারকে উদ্দীপিত করে, যেটি Mesolimbic Pathway নামে পরিচিত। আমরা যখন অপরকে দান করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক থেকে Dopamine I Endorphins হরমোন নির্গত হয়, যা মস্তিষ্কে ব্যথার সিগন্যাল যেতে বাধা দেয় এবং সৎকর্মের সুখানুভূতি সৃষ্টি করে। ফলে আমরা গভীর প্রশান্তি বোধ করি। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দান করলে আমাদের আয়ু বৃদ্ধি পায়, মানসিক অবস্থা দৃঢ় হয়, সামাজিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক চাপ কমে যায়। উপরন্তু দান করলে এর প্রতি আকর্ষণ আমাদের চারপাশের অন্যান্য লোকের মধ্যেও দেখা যায়। ফলে পুরো সমাজের ওপরই দানের একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ কারণে যখন আমরা হতাশা বোধ করি, নিরুৎসাহিত হয়ে যাই, জীবনের মানে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হই, তখন বেশি বেশি দান করতে বলা হয়েছে—
যারা স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে, তাদের জন্য সেই দানের পুরস্কার রয়েছে তাদের প্রভুর কাছে। তাদের কোনো ভয় নেই, আর তারা চিন্তিতও হবে না। সূরা বাকারা : ২৭৪
আমাদের জীবনের অধিকাংশ দুশ্চিন্তার জন্ম হয় নিজের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্বারোপের গর্ভ থেকে। যেমনটি একজন স্কলার বলেছেন—
‘নিজেকে নিয়ে কম চিন্তা করার নাম বিনয় নয়; নিজেকে “কম” চিন্তা করার নামই বিনয়।’
যখন আমরা নিজের দৃষ্টিকে বৃহত্তর ক্যানভাসের ওপর নিবদ্ধ করি, তখন মাথা থেকে বিশাল বোঝাগুলো একে একে নেমে যেতে থাকে। তাই যখনই আমরা দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ বোধ করব, তখনই কিছু না কিছু দান করব। কারণ, আমরা যখন নিজেদের ওপর করা অনুগ্রহগুলোকে অপরের সাথে ভাগ করে নেব, তখন প্রকৃতপক্ষে নিজেরই উপকার করব। এজন্যই প্রবাদ আছে—
'If you want to go fast, go alone; but if you want to go far, go together. অর্থাৎ যদি দ্রুত যেতে চাও, তবে একাকী চলো; কিন্তু যদি অনেক দূর যেতে চাও, তাহলে অপরের সাথে চলো।'
মানুষের প্রশংসার জন্য দান নয়
আলি বলেছেন- 'দুনিয়াতে এমনভাবে বাস করো, যেন দুনিয়া তোমার ভেতর প্রবেশ করতে না পারে। কারণ, একটি নৌকা যখন পানির ওপর থাকে, তখন নৌকাটি ভালোভাবে চলে; কিন্তু নৌকার ভেতর পানি উঠলে সেটি ডুবে যায়।'
জাকাত ও সাদাকা হলো আমাদের হৃদয়ের জাহাজে অনুপ্রবেশ করা লোভ, কৃপণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে ফেলে দেওয়ার নামান্তর। যে ব্যক্তি খ্যাতি অর্জনের জন্য নয়; বরং আল্লাহর সামনে নিজেকে পরিশুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার জন্য দান করে, তার ঈমানের জাহাজ চলমান থাকে। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন-
'যে তার সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে, আর তার প্রতি কারও এমন কোনো অনুগ্রহ নেই-যার প্রতিদান দিতে হবে-কেবল তার মহান রবের সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়; আর অচিরেই সে সন্তোষ লাভ করবে।' সূরা লাইল: ১৮-২১
সুনাম ও খ্যাতি অর্জনের জন্য নয়; বরং আমাদের কেবল আল্লাহর ভালোবাসার প্রতিফলন হিসেবে দান করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তারা বলে-"আমরা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের খাদ্য দান করি। আমরা তোমাদের থেকে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কোনো শোকরও করি না।"' সূরা আদ-দাহর : ৯
সূর্য পৃথিবীকে যেভাবে দান করে
জাকাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহই একমাত্র দাতা এবং তিনিই একমাত্র চিরস্থায়ী। কারণ, 'আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর (সূরা আন-নুর: ৬৪)।' যেহেতু সবকিছু আল্লাহরই সৃষ্টি এবং সবকিছু আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে, তাহলে এ জগতের কোন জিনিসটির মালিক আমরা? আমরা এ দুনিয়ার তত্ত্বাবধায়ক মাত্র; এর বেশি কিছু নই। কোনো বৈষম্য না করে নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি আল্লাহ যে করুণা করেছেন, তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং অপরের সাথে তা ভাগাভাগি করে নেওয়াই আমাদের কাজ।
মহানবি বলেছেন- 'সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে তার উদরপূর্তি করে খায়, কিন্তু তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে।'
মুসলিম হিসেবে আমাদের দান করতে হবে তেমনভাবে, যেমনভাবে সূর্য পৃথিবীকে দান করে মুক্ত ও শর্তহীনভাবে। সূর্য কখনো পৃথিবীকে এ কথা বলে না যে, তুমি আমার কাছে ঋণী।
সকল মানুষ ও সৃষ্টজীব একটি শরীরের ভিন্ন ভিন্ন কোষের মতো। মহানবি বলেছেন- 'মুসলিম জাতি একটি শরীরের মতো। এর একটি অংশ বেদনা বোধ করলে সমগ্র শরীর বেদনা বোধ করে।'
এজন্যই পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- 'যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে, সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে।' সূরা মায়েদা : ৩২
মানুষের সেবা করা মানে আল্লাহরই সেবা করা আর মানুষকে অবহেলা করার মানে আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে মহানবি-এর একটি হাদিসে- 'আল্লাহ বলবেন-“হে আদমের সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে আসোনি।” মানুষ বলবে-“হে প্রভু! আমি কেমন করে আপনাকে দেখতে যেতাম, যেখানে আপনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রভু?” আল্লাহ বলবেন-“তুমি কি জানো না, আমার অমুক অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল, কিন্তু তুমি তাদের দেখতে যাওনি? তুমি কি জানতে না, যদি তাদের দেখতে যেতে, তাহলে তার সাথে আমাকেও পেয়ে যেতে? হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে খাদ্য দাওনি।” মানুষ বলবে-
"আমি আপনাকে কীভাবে খাওয়াব, যেখানে আপনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রভু?" আল্লাহ বলবেন-“তুমি কি জানো না, আমার অমুক অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে খাদ্য দাওনি? তুমি কি জানো না, যদি তাদের খাদ্য দিতে, তাহলে আমাকে সেখানে পেতে?” আল্লাহ বলবেন-“হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে পানি দাওনি।” মানুষ বলবে-“আমি আপনাকে কীভাবে পানি দেবো, যেখানে আপনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রভু?” আল্লাহ বলবেন- “তুমি কি জানো না, আমার অমুক অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে পানি দাওনি? তুমি কি জানো না, যদি তাদের পানি দিতে, তাহলে আমাকে সেখানে পেতে?”
এই হাদিসে আল্লাহ আমাদের স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন-যখন আমরা সৃষ্টির সেবা করি, তখন মূলত আল্লাহরই সেবা করি।
জীবন নিস্তরঙ্গ নয়; বরং সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। কখনো আমরা ঢেউয়ের চূড়ায় উঠে যাই, কখনো-বা পড়ে যাই গভীর খাদে। কখনো আনন্দ ও প্রাপ্তি জীবনকে রাঙিয়ে দেয়, কখনো বিপদ ও হতাশা জীবনকে গ্রাস করে ফেলে। জীবনের অন্ধকার রাতগুলোতে যখন আমরা ভেঙে পড়ি, অসহায় বোধ করি, চাকরি হারাই, অর্থসংকটে পড়ি, ঋণগ্রস্ত হই বা চরম বিপদে নিপতিত হই, তখন জাকাত ও সাদাকা আমাদের জন্য নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করে। আমাদের ভাইদের প্রদত্ত জাকাত ও সাদাকা আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে, আমাদের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখে।
'কোন কাজ সর্বোত্তম? কোনো মানুষের হৃদয়কে খুশি করে দেওয়া, ক্ষুধার্তকে আহার করানো, দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করা, দুঃখী মানুষের দুঃখ লাঘব করা, আহতের কষ্ট দূর করা।'
টিকাঃ
১৪৫. আবু দাউদ
১৪৬. মুসলিম
১৪৭. তিরমিজি
১৪৮. বুখারি, মুসলিম
১৪৯. বুখারি
১৫০. তিরমিজি
১৫১. মুসলিম
১৫২. Safi, Omid. Radical Love: Teachings from the Islamic Mystical Tradition, Yale University Press, 2018
১৫৩. বুখারি
১৫৪. মুসলিম
১৫৫. বুখারি, মুসলিম
১৫৬. Bea, Scott. 'Why Giving Is Good for Your Health.' Health Essentials from Cleveland
১৫৭. Suttie, Jill, and Jason Marsh. '5 Ways Giving Is Good for You.' Greater Good, December 13, 2010
১৫৮. Swalin, Rachel. '4 Health Benefits of Being Generous.' Health.com, December 2. 2014
১৫৯. আল কুবরা, ইবনে আব্বাস
১৬০. বুখারি, মুসলিম
১৬১. হাদিসে কুদসি। হাদিসে কুদসি হলো এমন হাদিস-যার মূল কথাগুলো আল্লাহর, কিন্তু বর্ণিত হয়েছে রাসূল-এর ভাষায়।