📄 কুরআনের রহস্যময় জগৎ
আলিফ-লাম-র। এই কিতাব-যা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো পরাক্রমশালী সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে। সূরা ইবরাহিম : ১
কুরআন হলো আমার হৃদয়ের বসন্ত, অন্তরের আলো, দুঃখ দূরকারী, হতাশার উপশমকারী।৭৯
কুরআন আল্লাহর প্রেরণ করা এক ঐশী প্রেমপত্র। আল্লাহকে জানা ও ভালোবাসার আগেই তিনি আমাদের সামনে তাঁর ভালোবাসার পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর প্রতিটি কথা তাঁর অনুগ্রহের রঙে রাঙানো, তাঁর নিঃশর্ত ভালোবাসার সুগন্ধি দিয়ে সাজানো। তাঁর প্রতিটি কথায় যে করুণাধারা রয়েছে, তার প্রভাব মানুষের কর্মের ওপর নির্ভরশীল নয়। কুরআন কোনো দেয়াল নয়; বরং জানালা। কুরআন আমাদের তার দিকে ডাকে না; বরং আল্লাহ আমাদের কুরআনের জানালা দিয়ে তাঁর রহস্যময়তার দিকে ডাকেন। কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যেহেতু সৃষ্টিজগতের সবকিছুতে আল্লাহর ভালোবাসা দীপ্যমান, সেহেতু আমরাও তাঁর ভালোবাসা ও দয়ার সাগরের বাইরে নই।
কুরআন এমন এক অনন্য গ্রন্থ—যার পরতে পরতে পাঠকের প্রতি রচয়িতার প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে। মানবসৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহ মানুষকে শান্তির পথের দিশা দিতে ওহি প্রেরণ করেছেন। তাই কুরআন শুধু বিধিবিধানসংবলিত কোনো গ্রন্থ নয়; বরং একে বলা হয় আল ফুরকান বা মানদণ্ড। কারণ, কুরআন হলো মান নির্ণায়ক এমন এক আলো, যা আমাদের প্রেমময় (আল ওয়াদুদ) আল্লাহর পথ এবং ধ্বংস ও স্খলনের পথকে আলাদাভাবে চেনার শক্তি জোগায়।
কুরআন তিলাওয়াতের রহস্যময় শক্তি
কুরআন আমাদের আল্লাহর সর্বত্র বিরাজমানতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এক আল্লাহর সামনে সকল আত্মার জড়ো হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
কুরআন শব্দটি এসেছে কফ-রা-হামজা থেকে-যার অর্থ পাঠ করা, আবৃতি করা, জড়ো করা, সংগ্রহ করা, যোগ দেওয়া ইত্যাদি। সমগ্র কুরআন যে কেন্দ্রবিন্দুর ওপর ফোকাস করে রচিত, তা হলো তাওহিদ; যার শাব্দিক অর্থ-কোনো কিছুকে এক বানানো। কুরআন তিলাওয়াত এমন এক চাবির ভূমিকা পালন করে, দুনিয়ার মোহ হৃদয়ের ওপর যে তালা স্থাপন করে দেয়।
পবিত্র কুরআনকে আল্লাহ এমনভাবে ডিজাইন করেছেন যে, এটি আপনার কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, আপনার বৈষয়িকতার মুখোমুখি হবে, আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রে আপনার সংকোচকে তিরোহিত করবে, আল্লাহর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার ভেতরের সীমাবদ্ধতাগুলোকে চূর্ণ করবে এবং আল্লাহর পথে চলতে আপনাকে উজ্জীবিত করবে। কুরআন একটি আয়নার মতো-যা আপনি বহন করে চলেছেন, কুরআনে আপনি তা-ই দেখতে পাবেন। আপনি যদি হৃদয়ে ঘৃণা ও বিচ্ছেদ নিয়ে কুরআন পড়েন, তাহলে আপনার ঘৃণা আপনার ওপরই আপতিত হবে। আপনি যদি ভালোবাসা, অনুগ্রহ, দয়া ও মাহাত্ম্য নিয়ে কুরআন পাঠ করেন, তাহলে আপনি আল্লাহর সৌন্দর্যের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবেন।
'বৃষ্টির একটি ফোঁটা ঝিনুকের মুখে পড়তে পারে কিংবা পড়তে পারে সাপের মুখে। ঝিনুকের মুখে পড়লে তা মুক্তোয় পরিণত হয়, সাপের মুখে পড়লে তা বিষে পরিণত হয়।'-আলি
কুরআনে আপনি যা-ই পড়েন, তা আপনার চেতনার বর্তমান অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে। কুরআনের প্রতিটি শব্দ এমন এক প্রদীপের কাজ করে-যা আপনার ভয় ও সংশয়ের অন্ধকারকে দূরীভূত করে দেয়। কুরআনের শব্দগুলো আপনার অবচেতন মনের গুহায় প্রবেশ করে এবং গুহাকে আলোকিত করে দেয়।
পবিত্র কুরআন আমাদের হৃদয়ের সেই ক্ষতের উপশম করে, আল্লাহকে হৃদয় থেকে সরিয়ে যে ক্ষত আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কার্ল জাং বলেন-
'আলোর কল্পনা করলে কেউ আলোকিত হয় না, তবে অন্ধকার সম্পর্কে সচেতন হয়।'
কুরআনে উল্লেখিত বিভিন্ন ইবাদতের উদ্দেশ্য হলো-আমাদের হৃদয়ের গোপন অন্ধকার কুঠুরিগুলোর পর্দা উন্মোচন করা এবং সেগুলোকে আল্লাহর ক্ষমা ও ভালোবাসার আলো দিয়ে পূর্ণ করা। মহানবি মুহাম্মাদ -এর কন্যা ফাতিমা বলেছেন-
'কুরআনের প্রজ্ঞা মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর দিকে নিয়ে যায়।'
কুরআন আসল কোনো গ্রন্থ নয়
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ‘উম্মুল কিতাব’ বলে যা বুঝিয়েছেন, সেটিকে কুরআনের অন্যত্র ‘লাওহে মাহফুজ’ বলা হয়েছে। লাওহে মাহফুজ হলো এমন গ্রন্থ, যা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে সংরক্ষিত রয়েছে। সেখান থেকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও বক্তব্যসমূহ পবিত্র কুরআনের রহস্যময় পাতায় ঠাঁই পেয়েছে। যদিও আমরা কুরআনকে গ্রন্থ বলে থাকি, তবুও এটি কোনো লিখিত গ্রন্থ নয়; বরং আল্লাহর বক্তব্যগুলোর পঠিত রূপ।
কাগজে লিখিত শব্দমালার একটি নির্দিষ্ট ফোকাল পয়েন্ট থাকে, কিন্তু উচ্চারিত শব্দমালার কম্পনের তরঙ্গ সবগুলো দিকে প্রবাহিত হয়। কাগজে লিখিত শব্দমালাকে পাঠকের কাছ থেকে পৃথক করা যায়, কিন্তু উচ্চারিত শব্দমালা থেকে শ্রোতাকে পৃথক করা যায় না। কুরআন যেহেতু পঠিত শব্দের লিখিত রূপ, সেহেতু কুরআনের কথা বুঝতে হলে, কুরআনের সাথে নিজেকে সংযুক্ত করতে হলে প্রথমে আল্লাহর কথাগুলো নিজের হৃদয়ে প্রবেশ করাতে হবে, এরপর তা সশব্দে উচ্চারণ করতে হবে। এর পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু পড়ার চেয়ে সশব্দে বলা ও শ্রবণ করার সম্মিলিত কর্ম মানুষের স্মৃতিতে বেশি সময় স্থায়ী হয়ে থাকে।৮০
আল্লাহর কাছ থেকে মহানবি মুহাম্মাদ -এর ওপর অবতীর্ণ কুরআনের কথাগুলোকে লিখে গ্রন্থের রূপ দেওয়া হয়। একে মুসহাফ বলা হয়, যার অর্থ-আল্লাহর বার্তা সংরক্ষণ করা ও ছড়িয়ে দেওয়া। একেবারে সূচনা থেকে মহানবি -এর সাহাবিরা কুরআনের বাণীগুলোকে চামড়া, পাথর, পশুর হাড়, গাছের বাকলে লিখে রাখতেন। প্রিয়নবির মৃত্যুর বিশ বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কুরআন সংকলনের কাজ সমাপ্ত হয় এবং এটির অনুলিপি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে প্রেরণ করা হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-কুরআনের সূরাগুলো সেই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী সাজানো হয়নি, যে ধারবাহিকতায় কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, প্রতি রমজান মাসে মহানবি মুহাম্মাদ তখন পর্যন্ত অবতীর্ণ সমগ্র কুরআন জিবরাইল-কে পাঠ করে শোনাতেন এবং জিবরাইল রাসূল-কে বলে দিতেন, কুরআনের কোন অংশের পর কোন অংশ বসবে। অর্থাৎ কুরআনের বর্তমান ধারাবাহিকতা জিবরাইল-এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছ থেকে অনুমোদিত। কোনো কোনো স্কলারের মতে, কুরআনকে আল্লাহর নির্দেশে এ কারণে ভিন্ন ধারাবাহিকতা মোতাবেক সাজানো হয়েছে-যাতে মানুষ এটিকে কোনো গল্পের বই হিসেবে বিবেচনা না করে। আরও গভীর অর্থে, কুরআনের বর্তমান ধারাবাহিকতা, যেটি অবতীর্ণের ধারাবাহিকতা নয়-তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক একরৈখিক বা একমাত্রিক নয়। কেননা, আল্লাহর অবস্থান সময় ও স্থানের অনেক ঊর্ধ্বে।
যদিও লিখিত কুরআনের সম্মান ও মর্যাদা অনেক বেশি, তবুও কুরআনের কোনো কথার সাথে দুনিয়ার কোনো মানুষ যা-ই করুক না কেন, কুরআনের মর্যাদার ওপর তার কোনো প্রভাব পড়ে না। হাজারো সমুদ্র যেমন চাঁদের আলোকে নেভাতে পারে না (কারণ, চাঁদের আলোর উৎস চাঁদ নয়; সূর্য), তেমনি দুনিয়ার সব মানুষ মিলেও কুরআনের আলোকে নেভাতে পারে না। কারণ, কুরআনের আলোর উৎস কুরআন নয়; আল্লাহ। আয়নায় আঘাত করলে আয়না ভেঙে যায়; কিন্তু আয়নায় যার প্রতিবিম্ব পড়েছে, তার কোনো ক্ষতি হয় না। তেমনি দুনিয়াতে কুরআনকে পুড়িয়ে ফেলা যায়, ধ্বংস করা যায়, কিন্তু কুরআনে যার প্রতিবিম্ব পড়েছে, তাঁর কোনো ক্ষতি করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'বলো, সমুদ্রগুলো যদি আমার প্রতিপালকের কথা লেখার জন্য কালি হয়ে যায়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা লেখা শেষ হওয়ার আগেই সমুদ্র অবশ্যই নিঃশেষ হয়ে যাবে; আমি যদি এর সাহায্যের জন্য আরও অনুরূপ পরিমাণ সমুদ্র নিয়ে আসি তবুও।' সূরা কাহাফ: ১০৯
প্রথম ওহি : ইকরা
আসমানের সর্বোচ্চ স্তর থেকে আল্লাহর বাণীসমূহ কুরআন আকারে জিবরাইল-এর মাধ্যমে মহানবি-এর হৃদয়ের ভেতর প্রেরণ করা হয়েছে। ৬১০ সালে নবিজির বয়স যখন ৪০ বছর, তখন তাঁর ওপর প্রথম আল্লাহর ওহি অবতীর্ণ হয়। সেদিন তিনি আলোর পাহাড়ের (জাবাল আন-নুর) একটি গুহায় বসে ধ্যান করছিলেন। এমন সময় জিবরাইল ওহির আলোকবর্তিকা নিয়ে তাঁর কাছে এলেন। জিবরাইল বললেন-'পড়ন', দ্বিতীয়বার বললেন-'পড়ুন' এবং অবশেষে তৃতীয়বার বললেন-
'পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট বাঁধা রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ুন, আপনার রব বড়োই অনুগ্রহশীল; যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলম দিয়ে। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে-যা সে জানত না।' সূরা আলাক : ১-৫
রাসূল ঐশী কম্পনে প্রকম্পিত হলেন। তাঁর হৃদয়ের চক্ষু খুলে গেল। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারলেন-এমন কিছু অপার্থিব বাণীসমষ্টি তাঁর চেতনার ভেতর গভীর ছাপ অঙ্কন করেছে, যা ঐশী আলোতে পরিপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'এই কিতাব যা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো, পরাক্রমশালী সর্ব প্রশংসিতের পথের দিকে।' সূরা ইবরাহিম : ১
পবিত্র কুরআন হলো মানুষের ভেতরের সহজাত কল্যাণময়তার বীজের পরিচর্যার পথ। কিছু স্কলারের মতে, আল্লাহ কুরআনের যেখানে বৃষ্টির কথা বলেছেন, সেখানে তিনি তা বলেছেন রূপক অর্থে; যার প্রকৃত অর্থ আল্লাহর অনুগ্রহ এবং যেখানে শুষ্কতার কথা বলেছেন, সেখানে তিনি প্রকৃতপক্ষে মানুষের হৃদয়ের শুষ্কতার কথা বুঝিয়েছেন। মেঘ থেকে পড়া বৃষ্টি যেমন মৃত ভূমিতে প্রাণের সঞ্চার করে, তেমনি আল্লাহর কাছ থেকে আগত কুরআন মানুষের মৃত হৃদয়ে জীবনে সঞ্চার করে।
'তোমরা ভূমিকে দেখ শুষ্ক, মৃত। অতঃপর আমি যখন তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তাতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়, আর তা উদ্গত করে সকল নয়ন জুড়ানো উদ্ভিদ।' সূরা হজ: ৫
কুরআনের বার্তা
কুরআনের মূল বক্তব্য হলো-তাওহিদ তথা নিরেট একেশ্বরবাদ। আল্লাহর একত্ববাদ হলো ওহির বাগানের ভিত্তি, যার ওপর সমগ্র কুরআন দাঁড়িয়ে আছে। যুগে যুগে নবিদের দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে দুটি কাজ দিয়ে; আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং দুনিয়াতে আল্লাহর বাণীর বাস্তব সাক্ষী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা। তাই দেখা যায়, সব নবির বক্তব্যগুলো ছিল একই রকম; যদিও তাঁরা জন্ম নিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন যুগে, দুনিয়ার ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে।
যদিও কুরআনের সবকিছু আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্ববাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, তবুও এখানে আরও কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে— আল্লাহ কে, মানুষ সৃষ্টির ঘটনা, শয়তানের ভূমিকা, অদৃশ্য জগৎ, ফেরেশতা, আখিরাতের জীবন, জান্নাত, জাহান্নাম, বিভিন্ন নবির ঘটনা, ওহির গভীরতম অর্থ, ইসলামের স্তম্ভসমূহ, প্রকৃতিতে আল্লাহর নিদর্শন, ইবাদতের পদ্ধতি, আত্মশুদ্ধি, হৃদয় ও আত্মার পরিচর্যা, নৈতকতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, পেশায় নৈতিকতা, সমাজবদ্ধ জীবন এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে জীবনযাপনের উপায় ইত্যাদি।
কুরআনে শুধু তত্ত্ব ও ধারণা উল্লেখিত হয়নি; বরং বাস্তব জীবনের নানা ঘটনা, জয়-পরাজয়, উত্থান-পতন, পাপ-মুক্তি, নিপীড়ন-ন্যায়বিচার, অন্ধকার-আলো, দুনিয়ার ধ্বংসশীলতা ও আখিরাতের স্থায়িত্ব ইত্যাদির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, কুরআন তাদের জন্য সুসংবাদ দান করেছে। আর যারা দুনিয়াতে মতে, আল্লাহ কুরআনের যেখানে বৃষ্টির কথা বলেছেন, সেখানে তিনি তা বলেছেন রূপক অর্থে; যার প্রকৃত অর্থ আল্লাহর অনুগ্রহ এবং যেখানে শুষ্কতার কথা বলেছেন, সেখানে তিনি প্রকৃতপক্ষে মানুষের হৃদয়ের শুষ্কতার কথা বুঝিয়েছেন। মেঘ থেকে পড়া বৃষ্টি যেমন মৃত ভূমিতে প্রাণের সঞ্চার করে, তেমনি আল্লাহর কাছ থেকে আগত কুরআন মানুষের মৃত হৃদয়ে জীবনে সঞ্চার করে।
'তোমরা ভূমিকে দেখ শুষ্ক, মৃত। অতঃপর আমি যখন তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তাতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়, আর তা উদ্গত করে সকল নয়ন জুড়ানো উদ্ভিদ।' সূরা হজ: ৫
কুরআনের বার্তা
কুরআনের মূল বক্তব্য হলো-তাওহিদ তথা নিরেট একেশ্বরবাদ। আল্লাহর একত্ববাদ হলো ওহির বাগানের ভিত্তি, যার ওপর সমগ্র কুরআন দাঁড়িয়ে আছে। যুগে যুগে নবিদের দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে দুটি কাজ দিয়ে; আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং দুনিয়াতে আল্লাহর বাণীর বাস্তব সাক্ষী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা। তাই দেখা যায়, সব নবির বক্তব্যগুলো ছিল একই রকম; যদিও তাঁরা জন্ম নিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন যুগে, দুনিয়ার ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে।
যদিও কুরআনের সবকিছু আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্ববাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, তবুও এখানে আরও কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে— আল্লাহ কে, মানুষ সৃষ্টির ঘটনা, শয়তানের ভূমিকা, অদৃশ্য জগৎ, ফেরেশতা, আখিরাতের জীবন, জান্নাত, জাহান্নাম, বিভিন্ন নবির ঘটনা, ওহির গভীরতম অর্থ, ইসলামের স্তম্ভসমূহ, প্রকৃতিতে আল্লাহর নিদর্শন, ইবাদতের পদ্ধতি, আত্মশুদ্ধি, হৃদয় ও আত্মার পরিচর্যা, নৈতকতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, পেশায় নৈতিকতা, সমাজবদ্ধ জীবন এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে জীবনযাপনের উপায় ইত্যাদি।
কুরআনে শুধু তত্ত্ব ও ধারণা উল্লেখিত হয়নি; বরং বাস্তব জীবনের নানা ঘটনা, জয়-পরাজয়, উত্থান-পতন, পাপ-মুক্তি, নিপীড়ন-ন্যায়বিচার, অন্ধকার-আলো, দুনিয়ার ধ্বংসশীলতা ও আখিরাতের স্থায়িত্ব ইত্যাদির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, কুরআন তাদের জন্য সুসংবাদ দান করেছে। আর যারা দুনিয়াতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, কুরআনে তাদের সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
'রাসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী, যাতে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাতের সুযোগ না থাকে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।' সূরা নিসা: ১৬৫
কুরআন আমাদের দেখায়, কেবল আল্লাহর ইবাদতই হলো আল্লাহর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা ও মুক্তির একমাত্র পথ।
ওহি আমাদের কেবল আল্লাহকে অনুভবের শিক্ষা দেয় না; বরং আল্লাহর সাথে সংযুক্ত হওয়ার পথ দেখায়। কুরআন আল্লাহর করুণা, ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করে। ফলে একদিকে তা আমাদের মহৎ গুণাবলির ধারক হতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যদিকে সত্য প্রত্যাখ্যান করলে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ভয় দেখায়।
পবিত্র কুরআনে যুগ-যুগান্তরের সেই সব মানুষের গল্প বলা হয়েছে, যারা বহু বিপদাপদের মুখোমুখি হয়েছেন এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার হাতিয়ার দিয়ে সে বিপদগুলোকে জয় করেছেন। ওই ঘটনাগুলো আমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়—বিপদ যত কঠিন হোক না কেন, আল্লাহর ওপর আস্থা ও নির্ভরতা সকল বিপদ দূর করার জন্য যথেষ্ট। কুরআন আমাদের দেখায়, দুনিয়াতে সবকিছু আমাদের পরিকল্পনা মাফিক ঘটে না। আমাদের নিয়ে আল্লাহরও একটি পরিকল্পনা থাকে এবং সে পরিকল্পনার ভেতর কুরআনে নবি ইউসুফ-এর জীবন পরিক্রমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইউসুফ-কে তাঁর হিংসুক ভাইয়েরা একটি কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এরপর সেখান থেকে তাঁকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়, মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং অবশেষে তিনি সেখান থেকে মিশরের বাদশার সবচেয়ে ক্ষমতাবান উপদেষ্টার পদ অলংকৃত করেন। ইউসুফ কল্পনাও করতে পারেননি, তাঁকে নিয়ে রচিত আল্লাহর বিশেষ পরিকল্পনা তাঁকে কোথায় নিয়ে চলেছে। কুরআনে নবি ইবরাহিম-এর ঘটনা পাওয়া যায়। ইবরাহিম-কে ভয়াবহ আগুনের ভেতর নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে সে আগুনের শিখা শীতল হয়ে যায় এবং জায়গাটি তাঁর জন্য বাগানে পরিণত হয়। কুরআনে বলা হয়েছে-
'আমি বললাম-হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।' সূরা আম্বিয়া: ৬৯
মুসা-এর ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে পাওয়া যায়। মুসা-এর সামনে যখন লোহিত সাগর এবং পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, তখন আল্লাহ মুসা-কে রক্ষা করলেন। কারণ, মুসা তাঁর চক্ষু নিবদ্ধ করেছিল আল্লাহর দিকে; প্রতিবন্ধকতার দিকে নয়। আল্লাহ লোহিত সাগরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিলেন এবং মুসা-কে রক্ষা করলেন। আর সেই সাগরে ফেরাউন ও তার বাহিনী ডুবে মারা গেল। কুরআনে কুমারী মাতা মরিয়ম-এর কথা বলা হয়েছে; গর্ভধারণ যার জীবনকে বিপদসংকুল করে তুলেছিল এবং তাঁর চরিত্রের সুনামকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে মরিয়ম আল্লাহর ওপর নির্ভর করলেন এবং আল্লাহর নির্দেশে তিন দিন পর্যন্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকলেন। ঈসা জন্মগ্রহণ করলেন এবং দোলনা থেকে তাঁর মায়ের পক্ষে কথা বললেন।
প্রতিটি ভাঙা হৃদয়, প্রতিটি ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে কুরআন মনে করিয়ে দেয়, তার জন্য আল্লাহর আশ্রয় ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনা অপেক্ষা করছে।
'যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে তোমাদের ওপর কেউ-ই বিজয়ী হতে পারবে না এবং যদি তিনি তোমাদের সাহায্য না করেন, সে অবস্থায় এমন কে আছে-যে তোমাদের সাহায্য করবে? মুমিনদের আল্লাহর ওপর নির্ভর করা উচিত।' সূরা আলে ইমরান : ১৬০
যে কারণে কুরআন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে
একটি বীজের ভেতর বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। ইসলামের অনেক স্কলার মনে করেন, সমগ্র কুরআনের বীজ লুকিয়ে আছে মহিমান্বিত রজনিতে (লাইলাতুল কদর), যে রাতে কুরআন সর্বোচ্চ আসমান থেকে সর্বনিম্ন আসমানে অবতীর্ণ হয়। একটি বীজের যেমন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হতে সময় লাগে, তেমনি সর্বনিম্ন আসমান থেকে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে কুরআনকে এ পার্থিব জগতে প্রেরণ করা হয়। অবশ্য শুধু কুরআন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়নি; বরং জগতের সবকিছুকে আল্লাহ অস্তিত্বশীল করেছেন পর্যায়ক্রমে। এটি পবিত্র কুরআনে খুব সুন্দরভাবে উল্লেখিত হয়েছে-
'আমি শপথ করি সন্ধ্যাকালীন লালিমার আর রাত্রির এবং তা যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার; আর চাঁদের, যখন তা পূর্ণ চাঁদে পরিণত হয়। নিশ্চয়ই তোমরা (আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সর্বক্ষেত্রে) স্তরে স্তরে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ঊর্ধ্বে উঠে আসবে।' সূরা ইনশিক্বাক : ১৬-১৯
মুহাম্মাদ -এর জীবনে সংঘটিত নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অথবা লোকদের নানা প্রশ্নের জবাবে পবিত্র কুরআন একটু একটু করে অবতীর্ণ হয়েছে। এর মানে হলো, পবিত্র কুরআন সুসংগঠিত অবস্থায় প্রথম আসমানে সংরক্ষিত ছিল; বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ঘটনায় তা অবতীর্ণ হয়েছে মাত্র। মহানবি -কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-'কেন কুরআন একত্রে অবতীর্ণ হলো না?' জবাবে কুরআন বলেছে-'তোমার হৃদয়কে সুদৃঢ় করার জন্য।' সূরা ফুরকান: ৩২
পর্বতারোহণের সময় আরোহীকে যেমন নতুন উচ্চতার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু সময় নিতে হয়, ডুবুরিকে যেমন গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রা ও পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে একটু সময় নিতে হয়, তেমনি কুরআনের গভীর অর্থবোধক কথাগুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে মহানবি এবং জগতের সকল মানুষের অবকাশের প্রয়োজন ছিল।
তাহলে এও বলা যায়-ওহির বিরতির যে সময়, সেটাও ওহিরই অংশ। কারণ, ওই নীরবতা ছাড়া আমরা ওহির প্রকৃত মর্ম বুঝতে পারতাম না। একটি বাক্যের শব্দগুলোর মাঝে যেমন ফাঁকা জায়গা থাকে, কথা বলার সময় যেমন আমরা একটু করে থামি, তেমনি কুরআনের বাণীগুলোর মাঝেও এমন নীরবতা অপরিহার্য ছিল। ওহির বিরতির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের আরও একটি বার্তা দিয়েছেন এমন যে, নীরবতার ভেতরেও তাঁর করুণাধারা আমাদের জন্য সদা উপস্থিত।
আলিফ-লাম-মিমের গোপন রহস্য
কুরআনের প্রতিটি কথা আল্লাহর পরিকল্পিত বক্তব্য, আমরা তা বুঝতে পারি বা না পারি। কুরআনের অনেক সূরা শুরু হয়েছে কিছু আরবি বর্ণসমষ্টি দিয়ে। যেমন-আলিফ-লাম-মিম। শত শত বছর ধরে স্কলাররা এগুলোর বিষয়ে নানা মত দিয়েছেন। কিছু স্কলার মনে করেন, এ বর্ণগুলোর ভেতর কিছু গাণিতিক মান রয়েছে-যার ভেতর অলৌকিক রহস্য লুকিয়ে আছে। কিছু স্কলার মনে করেন, ওই বর্ণগুলো কিছু শব্দের আদ্যাক্ষর। তাঁরা বলতে চান, 'আলিফ' বর্ণ দিয়ে আল্লাহ, 'মিম' বর্ণ দিয়ে মুহাম্মাদ, 'নুন' বর্ণ দিয়ে নুর (আল্লাহর আলো)-এ রকম বোঝানো হয়েছে।
অবশ্য বেশিরভাগ স্কলারের মতে, এ বর্ণসমষ্টির অর্থ কেবল আল্লাহই জানেন এবং এগুলোর অর্থ আমাদের কাছে অজ্ঞাত রেখে আল্লাহ তাঁর সর্বজ্ঞ গুণের নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন। সারকথা হলো-একেবারে শুরু থেকে আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সঠিক পথের দিশা পেতে হলে আমাদের বিনয়ের সাথে নিজের অজ্ঞতা ও জ্ঞানের স্বল্পতার স্বীকৃতি দিতে হবে। তাই দেখা যায়, কুরআনের যেখানেই আল্লাহ এমন বিচ্ছিন্ন বর্ণসমষ্টি প্রকাশ করেছেন, ঠিক তারপরেই তাঁর প্রজ্ঞা, ক্ষমতা, ও ওহির রহস্যময়তার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আলিফ-লাম-মিম। এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যা মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত।' সূরা বাকারা: ১-২
মজার ব্যাপার হলো, পবিত্র কুরআনের ২৯টি জায়গায় এমন রহস্যময় বর্ণসমষ্টির উল্লেখ আছে, অন্যদিকে আরবি ভাষার মোট বর্ণ সংখ্যাও ২৯টি। দুটি সংখ্যার এমন মিলকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একটি ব্যাখ্যা এমন-একজন মানুষের শরীরের সবগুলো উপাদান কাউকে দিয়ে যদি একজন মানুষ সৃষ্টি করতে বলা হয়-তাহলে সে যেমন ব্যর্থ হবে, তেমনি ২৯টি আরবির বর্ণ সবার সামনে থাকা সত্ত্বেও কুরআনের মতো কোনো গ্রন্থ রচনা করতে মানুষ ব্যর্থ হবে। মানুষের ভেতরে যে প্রাণ রয়েছে-তা সৃষ্টির একমাত্র সক্ষমতা যেমন কেবল আল্লাহর রয়েছে, তেমনি কুরআন সৃষ্টির সক্ষমতাও কেবল আল্লাহরই রয়েছে।
কুরআনের ভাষাগত নির্ভুলতা সত্ত্বেও আল্লাহ আমাদের পরোক্ষভাবে নয়; বরং সরাসরি কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। যারা কুরআনকে মুহাম্মাদ -এর রচিত গ্রন্থ বলত, তাদের জবাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মতো কেনো সূরা এনে দাও। আর যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহ্বান করো।' সূরা বাকারা : ২৩
১৪০০ বছর আগে আল্লাহ যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, আজ পর্যন্ত কেউ তা গ্রহণ করতে পারেনি। কুরআনের ভাষাশৈলী এত অনন্য যে, আরবি ভাষাবিদরাও এর গভীরতা দেখে হতবাক হয়ে যান। এমনকী কুরআনের আবৃত্তি বা তিলাওয়াত এতই শক্তিশালী যে, এর ঐশীগ্রন্থ হওয়ার প্রমাণ শবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায়।
কুরআনের শক্তি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমি যদি এ কুরআনকে পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তুমি আল্লাহর ভয়ে তাকে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। এসব উদাহরণ আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।' সূরা হাশর: ২১
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বিশাল পাহাড় আল্লাহর বাণীর ভারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলেও মানুষের হৃদয়কে আল্লাহ এতখানি শক্তিশালী করে তৈরি করেছেন যে, তা ঠিকই আল্লাহর বাণীর ভার বইতে পারে।
হৃদয় দিয়ে কুরআন পাঠ
আমরা যখন কুরআনের সংস্পর্শে আসি, তখন মূলত বিশ্বজগতের স্রষ্টার সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হই। কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহের বারিধারায় সিক্ত হয়। মহানবি বলেছেন-
'যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের একটি বর্ণ পাঠ করল, সে যেন একটি সৎকর্ম করল এবং একটি সৎকর্মের পুরস্কার হবে দশগুণ বেশি। আমি বলছি না যে আলিফ-লাম-মিম একটি শব্দ; বরং আলিফ একটি শব্দ, লাম একটি শব্দ এবং মিম একটি শব্দ।'
কুরআনের কথাগুলো এত শক্তিশালী ছিল-যখন মহানবি -এর ওপর তা অবতীর্ণ হতো, তখন তিনি ঘেমে-নেয়ে উঠতেন। উটের পিঠে চেপে সফরের সময় মহানবি -এর ওপর ওহি অবতীর্ণ হলে ওহির ভারে তাঁর উট মাটিতে নুয়ে পড়ত।
দুনিয়াবাসীর জন্য অনুগ্রহ ও আলোকবর্তিকা হিসেবে কুরআনকে প্রেরণ করা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব।' সূরা মায়েদা : ১৫
পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আলোকে সাথে নিয়ে। কেননা, অন্ধকারে কুরআন পড়া যায় না। কোনো কিছু দেখার জন্য যেমন আলো প্রয়োজন, তেমনি আল্লাহর কথাকে অনুভব করতে হলে আধ্যাত্মিক আলোর প্রয়োজন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-আমাদের কাছে একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক হিসেবে রাসূল এসেছিলেন; যিনি ওহির রহস্যময়তার ব্যাখ্যা আমাদের সামনে উপস্থাপন করে গেছেন, যাতে আমরা সহজে তা অনুধাবন করতে পারি। যেকোনো অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ কুরআন পড়তে পারে, কিন্তু সবাই কুরআনের গভীরতম অর্থ উপলব্ধি করতে পারে না। কুরআন আল্লাহর জীবন্ত কথামালা। কুরআনের একই আয়াতের অর্থ এর পাঠকের কাছে একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ধরা দেয় না। কুরআনের উচ্চ প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য এর আগ্রহী পাঠকের হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পাঠকের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়।
আমরা মূলত কুরআন পড়ি না, কুরআনই আমাদের পড়ে। কুরআন আমাদের হৃদয়ের তলদেশ পর্যন্ত প্রবেশ করে এবং আমাদের সংকল্পের বিশুদ্ধতা ও চেতনার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজের রহস্যময়তার উন্মোচন ঘটনায় বা গোপন করে।
জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-
'কুরআন হলো লজ্জাশীলা কনের মতো। আপনাকে এর কাছে আসতে হবে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সাথে, যাতে এটি সহজে আপনার কাছে নিজেকে উন্মোচিত করে।'
মহানবি মুহাম্মাদ -এর অধিকাংশ সাহাবি অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন না। আপনি কতটা দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জন করেছেন, কুরআনের গভীরতম অর্থ বোঝার জন্য তা জরুরি বিষয় নয়; জরুরি বিষয় হলো-আপনি কতটা আন্তরিকতা ও বিনয়ের সাথে কুরআনের সংস্পর্শে এসেছেন। এ কারণে সুফি সাধকরা জিহ্বার জ্ঞান থেকে হৃদয়ের জ্ঞানের দিকে যাত্রা করতে বলেছেন। কেননা, মন কখনো আল্লাহর নুর অনুভব করতে পারে না। আল্লাহর নুর অনুভব করতে পারে কেবল সেই হৃদয়, যার দুয়ার আল্লাহর মহত্ত্বকে ধারণ করার জন্য প্রস্তুত। সম্ভবত এ কারণে আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে বলেছেন- 'যে ভয় করে, তার জন্য উপদেশস্বরূপ।' সূরা ত্ব-হা: ৩
হৃদয় থেকে কুরআন পাঠের যাত্রা শুরু হয় অনুশোচনাপূর্ণ অন্তর থেকে। আমাদের ব্যক্তিগত মতামত ও পক্ষপাতিত্বকে বিসর্জন না দেওয়া পর্যন্ত আমরা কুরআনকে কুরআনের রূপে দেখতে পারব না; বরং নিজ ভুল চিন্তা-কাঠামোর ফিল্টারেই কুরআন আমাদের সামনে প্রতিভাত হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'এটি সেই গ্রন্থ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যা মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক।' সূরা বাকারা: ২
কুরআন সব রকম ত্রুটির ঊর্ধ্বে। কুরআন সম্পর্কে মানুষের ব্যাখ্যার মধ্যে ত্রুটি থাকতে পারে, কিন্তু কুরআনে কোনো ত্রুটি নেই। এ কারণে কুরআন খোলার আগেই কুরআন আমাদের শুধু বাহ্যিকভাবেই পবিত্রতা অর্জন করতে বলেনি; বরং হৃদয়কেও বিশুদ্ধ করতে বলেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'অবশ্যই তা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক সুরক্ষিত গ্রন্থে। যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না।' সূরা ওয়াকিয়া: ৭৭-৭৯
কুরআনের সংস্পর্শে আসতে হলে আপনাকে অবশ্যই বিশুদ্ধ হৃদয়, পবিত্র-বিনয়ী অন্তর ও শূন্যচিত্ত নিয়ে আসতে হবে। কারণ, বহুত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে এক আল্লাহকে অনুভব করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর কুরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে, সুবিন্যস্ত ও স্পষ্টভাবে।' সূরা মুজ্জাম্মিল: ৪
আমরা যদি কুরআন পাঠ থেকে লাভবান হতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই আল্লাহকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগের সাথে শ্রবণ করো আর নীরবতা বজায় রাখো, যাতে তোমাদের প্রতি রহম করা হয়।' সূরা আ'রাফ: ২০৪
'নিশ্চয়ই যে সুন্দরভাবে ও ধীরে ধীরে কুরআন পাঠ করবে, সে থাকবে আনুগত্যপরায়ণ মহান ফেরেশতাদের সাথে এবং যে ব্যক্তি অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও তোতলাতে তোতলাতে কিংবা ভেঙে ভেঙে কুরআন পাঠ করবে, সে দ্বিগুণ পুরস্কার পাবে।'
একটি বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের চেতনা কিন্তু ওহির সাথে পূর্বপরিচিত। কারণ, দুটোই এসেছে একই উৎস থেকে; আল্লাহ থেকে। তাই এটি আল্লাহর-ই মহিমা যে, কুরআন পাঠের সময় আমাদের বিক্ষিপ্ত হৃদয় অবশেষে বিশ্রাম ও শান্তির জায়গা খুঁজে পায়। যখন আমরা আরবি ভাষায় কুরআন পাঠের ভেতর ডুবে যাই, তখন আমাদের সমগ্র সত্তা আল্লাহর জ্যোতির চাদরের নিচে আশ্রয় গ্রহণ করে।
আমাদের হৃদয়ের সাথে আল্লাহর যোগাযোগ সর্বদা অব্যাহত থাকে। কিন্তু আমাদের মনের ভেতরের শোরগোল এ যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায়। বৃষ্টির ফোঁটাকে গ্রহণ করার জন্য যেমন একটি বীজকে ফেটে যেতে হয়, তেমনি আল্লাহর বার্তাকে আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করাতে আমাদের কুপ্রবৃত্তির খোলসকে ভেঙে ফেলতে হয়।
কুরআনের রূপান্তরের শক্তি
কুরআনের অনন্য শক্তি বুঝতে একটি গল্পের কথা উল্লেখ করা যাক-
এক লোক একদিন এক সুফির কাছে এসে প্রশ্ন করল- 'কুরআনের সবটা তো আমরা বুঝতে পারি না, তাহলে শুধু শুধু এটি পড়ে কী লাভ? একই কুরআন বারবার পড়ার তো কোনো মানে হয় না!' জবাবে সুফি কিছু না বলে একটি কয়লা ভরা কাপড়ের ব্যাগ নিলেন এবং লোকটিকে সাথে নিয়ে একটি কুয়ার কাছে গেলেন। এরপর কয়লাগুলো মাটিতে ফেলে তিনি ব্যাগটি খালি করলেন। এবার লোকটিকে বললেন-'কুয়ার পানি দিয়ে কাপড়ের ব্যাগটি ভরে ফেলো।' লোকটি বলল-'কিন্তু এটি তো কাপড়ের ব্যাগ। এখানে পানি ঢাললে তো সব পানি গড়িয়ে পড়ে যাবে।' সুফি বললেন- 'আমি যা বলি, তা-ই করো।' এ কথা বলে সুফি চলে গেলেন।
পরের কয়েক ঘণ্টা লোকটি ব্যাগটির ভেতর বালতির পর বালতি পানি ঢেলে চলল, কিন্তু ব্যাগ ভর্তি হওয়ার নাম নেই; সব পানি পড়ে যেতে থাকল ব্যাগ থেকে। কিছু সময় পর সুফি ফিরে এলেন। দেখলেন, লোকটি পানি ঢালতে ঢালতে ক্লান্ত-শ্রান্ত ও হতাশ হয়ে পড়েছে। সুফি তাকে দেখে মৃদু হাসলেন। লোকটি জিজ্ঞেস করল- 'আপনি হাসছেন কেন? আমি তো ব্যাগে একটুও পানি ভরতে পারিনি।'
জবাবে সুফি বললেন-'তুমি হয়তো ব্যাগে পানি ভরতে পারোনি, কিন্তু বারবার পানি ঢালার কারণে কয়লার ময়লা লেগে যাওয়া ব্যাগটি ধবধবে পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং এখন ব্যাগটিকে নতুনের মতো লাগছে। প্রথম যেদিন ব্যাগটি কিনেছিলাম, সেদিনের মতো এটি সুন্দর হয়ে গেছে। কুরআনের বিষয়টিও ঠিক এ রকম। তুমি হয়তো সমগ্র কুরআন ধারণ করতে পারবে না, কিন্তু যতই কুরআন পাঠ করবে, ততই এটি তোমার হৃদয়কে প্রকম্পিত করবে এবং হৃদয় ততই পরিুদ্ধ হবে। কুরআন তোমাকে এমন কিছু দেওয়ার জন্য আসেনি, যা তোমার ভেতর নেই; বরং কুরআন তোমার হৃদয়ের চক্ষুর সামনের সেই আবরণকে সরাতে এসেছে, যে আবরণ সরালে তোমার হৃদয় বিশুদ্ধ হবে এবং তুমি আল্লাহকে ঠিকমতো অনুভব করতে পারবে।'
আমরা হৃদয়ের ভেতর জান্নাতের পথকে বহন করে চলেছি। ওহি হলো সেই আলোকবর্তিকা, যা আমাদের হৃদয়ের সেই গোপন অধ্যায়ের সন্ধান দেয়। ১৪০০ বছর ধরে কুরআনের কথাগুলো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, কুরআনে তাদের সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
'রাসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী, যাতে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাতের সুযোগ না থাকে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।' সূরা নিসা: ১৬৫
কুরআন আমাদের দেখায়, কেবল আল্লাহর ইবাদতই হলো আল্লাহর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা ও মুক্তির একমাত্র পথ।
ওহি আমাদের কেবল আল্লাহকে অনুভবের শিক্ষা দেয় না; বরং আল্লাহর সাথে সংযুক্ত হওয়ার পথ দেখায়। কুরআন আল্লাহর করুণা, ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করে। ফলে একদিকে তা আমাদের মহৎ গুণাবলির ধারক হতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যদিকে সত্য প্রত্যাখ্যান করলে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ভয় দেখায়।
পবিত্র কুরআনে যুগ-যুগান্তরের সেই সব মানুষের গল্প বলা হয়েছে, যারা বহু বিপদাপদের মুখোমুখি হয়েছেন এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার হাতিয়ার দিয়ে সে বিপদগুলোকে জয় করেছেন। ওই ঘটনাগুলো আমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়—বিপদ যত কঠিন হোক না কেন, আল্লাহর ওপর আস্থা ও নির্ভরতা সকল বিপদ দূর করার জন্য যথেষ্ট। কুরআন আমাদের দেখায়, দুনিয়াতে সবকিছু আমাদের পরিকল্পনা মাফিক ঘটে না। আমাদের নিয়ে আল্লাহরও একটি পরিকল্পনা থাকে এবং সে পরিকল্পনার ভেতর কুরআনে নবি ইউসুফ-এর জীবন পরিক্রমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইউসুফ-কে তাঁর হিংসুক ভাইয়েরা একটি কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এরপর সেখান থেকে তাঁকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়, মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং অবশেষে তিনি সেখান থেকে মিশরের বাদশার সবচেয়ে ক্ষমতাবান উপদেষ্টার পদ অলংকৃত করেন। ইউসুফ কল্পনাও করতে পারেননি, তাঁকে নিয়ে রচিত আল্লাহর বিশেষ পরিকল্পনা তাঁকে কোথায় নিয়ে চলেছে।৮১ কুরআনে নবি ইবরাহিম-এর ঘটনা পাওয়া যায়। ইবরাহিম-কে ভয়াবহ আগুনের ভেতর নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে সে আগুনের শিখা শীতল হয়ে যায় এবং জায়গাটি তাঁর জন্য বাগানে পরিণত হয়। কুরআনে বলা হয়েছে-
'আমি বললাম-হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।' সূরা আম্বিয়া: ৬৯
মুসা-এর ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে পাওয়া যায়। মুসা-এর সামনে যখন লোহিত সাগর এবং পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, তখন আল্লাহ মুসা-কে রক্ষা করলেন। কারণ, মুসা তাঁর চক্ষু নিবদ্ধ করেছিল আল্লাহর দিকে; প্রতিবন্ধকতার দিকে নয়। আল্লাহ লোহিত সাগরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিলেন এবং মুসা-কে রক্ষা করলেন। আর সেই সাগরে ফেরাউন ও তার বাহিনী ডুবে মারা গেল।৮২ কুরআনে কুমারী মাতা মরিয়ম-এর কথা বলা হয়েছে; গর্ভধারণ যার জীবনকে বিপদসংকুল করে তুলেছিল এবং তাঁর চরিত্রের সুনামকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে মরিয়ম আল্লাহর ওপর নির্ভর করলেন এবং আল্লাহর নির্দেশে তিন দিন পর্যন্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকলেন। ঈসা জন্মগ্রহণ করলেন এবং দোলনা থেকে তাঁর মায়ের পক্ষে কথা বললেন।৮৩
প্রতিটি ভাঙা হৃদয়, প্রতিটি ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে কুরআন মনে করিয়ে দেয়, তার জন্য আল্লাহর আশ্রয় ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনা অপেক্ষা করছে।
'যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে তোমাদের ওপর কেউ-ই বিজয়ী হতে পারবে না এবং যদি তিনি তোমাদের সাহায্য না করেন, সে অবস্থায় এমন কে আছে-যে তোমাদের সাহায্য করবে? মুমিনদের আল্লাহর ওপর নির্ভর করা উচিত।' সূরা আলে ইমরান : ১৬০
যে কারণে কুরআন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে
একটি বীজের ভেতর বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। ইসলামের অনেক স্কলার মনে করেন, সমগ্র কুরআনের বীজ লুকিয়ে আছে মহিমান্বিত রজনিতে (লাইলাতুল কদর), যে রাতে কুরআন সর্বোচ্চ আসমান থেকে সর্বনিম্ন আসমানে অবতীর্ণ হয়। একটি বীজের যেমন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হতে সময় লাগে, তেমনি সর্বনিম্ন আসমান থেকে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে কুরআনকে এ পার্থিব জগতে প্রেরণ করা হয়। অবশ্য শুধু কুরআন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়নি; বরং জগতের সবকিছুকে আল্লাহ অস্তিত্বশীল করেছেন পর্যায়ক্রমে। এটি পবিত্র কুরআনে খুব সুন্দরভাবে উল্লেখিত হয়েছে-
'আমি শপথ করি সন্ধ্যাকালীন লালিমার আর রাত্রির এবং তা যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার; আর চাঁদের, যখন তা পূর্ণ চাঁদে পরিণত হয়। নিশ্চয়ই তোমরা (আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সর্বক্ষেত্রে) স্তরে স্তরে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ঊর্ধ্বে উঠে আসবে।' সূরা ইনশিক্বাক : ১৬-১৯
মুহাম্মাদ -এর জীবনে সংঘটিত নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অথবা লোকদের নানা প্রশ্নের জবাবে পবিত্র কুরআন একটু একটু করে অবতীর্ণ হয়েছে। এর মানে হলো, পবিত্র কুরআন সুসংগঠিত অবস্থায় প্রথম আসমানে সংরক্ষিত ছিল; বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ঘটনায় তা অবতীর্ণ হয়েছে মাত্র। মহানবি -কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-'কেন কুরআন একত্রে অবতীর্ণ হলো না?' জবাবে কুরআন বলেছে-'তোমার হৃদয়কে সুদৃঢ় করার জন্য।' সূরা ফুরকান: ৩২
পর্বতারোহণের সময় আরোহীকে যেমন নতুন উচ্চতার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু সময় নিতে হয়, ডুবুরিকে যেমন গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রা ও পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে একটু সময় নিতে হয়, তেমনি কুরআনের গভীর অর্থবোধক কথাগুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে মহানবি এবং জগতের সকল মানুষের অবকাশের প্রয়োজন ছিল।
তাহলে এও বলা যায়-ওহির বিরতির যে সময়, সেটাও ওহিরই অংশ। কারণ, ওই নীরবতা ছাড়া আমরা ওহির প্রকৃত মর্ম বুঝতে পারতাম না। একটি বাক্যের শব্দগুলোর মাঝে যেমন ফাঁকা জায়গা থাকে, কথা বলার সময় যেমন আমরা একটু করে থামি, তেমনি কুরআনের বাণীগুলোর মাঝেও এমন নীরবতা অপরিহার্য ছিল। ওহির বিরতির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের আরও একটি বার্তা দিয়েছেন এমন যে, নীরবতার ভেতরেও তাঁর করুণাধারা আমাদের জন্য সদা উপস্থিত।
আলিফ-লাম-মিমের গোপন রহস্য
কুরআনের প্রতিটি কথা আল্লাহর পরিকল্পিত বক্তব্য, আমরা তা বুঝতে পারি বা না পারি। কুরআনের অনেক সূরা শুরু হয়েছে কিছু আরবি বর্ণসমষ্টি দিয়ে। যেমন-আলিফ-লাম-মিম। শত শত বছর ধরে স্কলাররা এগুলোর বিষয়ে নানা মত দিয়েছেন। কিছু স্কলার মনে করেন, এ বর্ণগুলোর ভেতর কিছু গাণিতিক মান রয়েছে-যার ভেতর অলৌকিক রহস্য লুকিয়ে আছে। কিছু স্কলার মনে করেন, ওই বর্ণগুলো কিছু শব্দের আদ্যাক্ষর। তাঁরা বলতে চান, 'আলিফ' বর্ণ দিয়ে আল্লাহ, 'মিম' বর্ণ দিয়ে মুহাম্মাদ, 'নুন' বর্ণ দিয়ে নুর (আল্লাহর আলো)-এ রকম বোঝানো হয়েছে।
অবশ্য বেশিরভাগ স্কলারের মতে, এ বর্ণসমষ্টির অর্থ কেবল আল্লাহই জানেন এবং এগুলোর অর্থ আমাদের কাছে অজ্ঞাত রেখে আল্লাহ তাঁর সর্বজ্ঞ গুণের নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন।৮৪ সারকথা হলো-একেবারে শুরু থেকে আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সঠিক পথের দিশা পেতে হলে আমাদের বিনয়ের সাথে নিজের অজ্ঞতা ও জ্ঞানের স্বল্পতার স্বীকৃতি দিতে হবে। তাই দেখা যায়, কুরআনের যেখানেই আল্লাহ এমন বিচ্ছিন্ন বর্ণসমষ্টি প্রকাশ করেছেন, ঠিক তারপরেই তাঁর প্রজ্ঞা, ক্ষমতা, ও ওহির রহস্যময়তার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আলিফ-লাম-মিম। এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যা মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত।' সূরা বাকারা: ১-২
মজার ব্যাপার হলো, পবিত্র কুরআনের ২৯টি জায়গায় এমন রহস্যময় বর্ণসমষ্টির উল্লেখ আছে, অন্যদিকে আরবি ভাষার মোট বর্ণ সংখ্যাও ২৯টি। দুটি সংখ্যার এমন মিলকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একটি ব্যাখ্যা এমন-একজন মানুষের শরীরের সবগুলো উপাদান কাউকে দিয়ে যদি একজন মানুষ সৃষ্টি করতে বলা হয়-তাহলে সে যেমন ব্যর্থ হবে, তেমনি ২৯টি আরবির বর্ণ সবার সামনে থাকা সত্ত্বেও কুরআনের মতো কোনো গ্রন্থ রচনা করতে মানুষ ব্যর্থ হবে। মানুষের ভেতরে যে প্রাণ রয়েছে-তা সৃষ্টির একমাত্র সক্ষমতা যেমন কেবল আল্লাহর রয়েছে, তেমনি কুরআন সৃষ্টির সক্ষমতাও কেবল আল্লাহরই রয়েছে।৮৫
কুরআনের ভাষাগত নির্ভুলতা সত্ত্বেও আল্লাহ আমাদের পরোক্ষভাবে নয়; বরং সরাসরি কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। যারা কুরআনকে মুহাম্মাদ -এর রচিত গ্রন্থ বলত, তাদের জবাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মতো কেনো সূরা এনে দাও। আর যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহ্বান করো।' সূরা বাকারা : ২৩
১৪০০ বছর আগে আল্লাহ যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, আজ পর্যন্ত কেউ তা গ্রহণ করতে পারেনি। কুরআনের ভাষাশৈলী এত অনন্য যে, আরবি ভাষাবিদরাও এর গভীরতা দেখে হতবাক হয়ে যান। এমনকী কুরআনের আবৃত্তি বা তিলাওয়াত এতই শক্তিশালী যে, এর ঐশীগ্রন্থ হওয়ার প্রমাণ শবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায়।
কুরআনের শক্তি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমি যদি এ কুরআনকে পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তুমি আল্লাহর ভয়ে তাকে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। এসব উদাহরণ আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।' সূরা হাশর: ২১
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বিশাল পাহাড় আল্লাহর বাণীর ভারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলেও মানুষের হৃদয়কে আল্লাহ এতখানি শক্তিশালী করে তৈরি করেছেন যে, তা ঠিকই আল্লাহর বাণীর ভার বইতে পারে।
হৃদয় দিয়ে কুরআন পাঠ
আমরা যখন কুরআনের সংস্পর্শে আসি, তখন মূলত বিশ্বজগতের স্রষ্টার সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হই। কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহের বারিধারায় সিক্ত হয়। মহানবি বলেছেন-
'যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের একটি বর্ণ পাঠ করল, সে যেন একটি সৎকর্ম করল এবং একটি সৎকর্মের পুরস্কার হবে দশগুণ বেশি। আমি বলছি না যে আলিফ-লাম-মিম একটি শব্দ; বরং আলিফ একটি শব্দ, লাম একটি শব্দ এবং মিম একটি শব্দ।'৮৬
কুরআনের কথাগুলো এত শক্তিশালী ছিল-যখন মহানবি -এর ওপর তা অবতীর্ণ হতো, তখন তিনি ঘেমে-নেয়ে উঠতেন। উটের পিঠে চেপে সফরের সময় মহানবি -এর ওপর ওহি অবতীর্ণ হলে ওহির ভারে তাঁর উট মাটিতে নুয়ে পড়ত।৮৭
দুনিয়াবাসীর জন্য অনুগ্রহ ও আলোকবর্তিকা হিসেবে কুরআনকে প্রেরণ করা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব।' সূরা মায়েদা : ১৫
পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আলোকে সাথে নিয়ে। কেননা, অন্ধকারে কুরআন পড়া যায় না। কোনো কিছু দেখার জন্য যেমন আলো প্রয়োজন, তেমনি আল্লাহর কথাকে অনুভব করতে হলে আধ্যাত্মিক আলোর প্রয়োজন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-আমাদের কাছে একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক হিসেবে রাসূল এসেছিলেন; যিনি ওহির রহস্যময়তার ব্যাখ্যা আমাদের সামনে উপস্থাপন করে গেছেন, যাতে আমরা সহজে তা অনুধাবন করতে পারি। যেকোনো অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ কুরআন পড়তে পারে, কিন্তু সবাই কুরআনের গভীরতম অর্থ উপলব্ধি করতে পারে না। কুরআন আল্লাহর জীবন্ত কথামালা। কুরআনের একই আয়াতের অর্থ এর পাঠকের কাছে একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ধরা দেয় না। কুরআনের উচ্চ প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য এর আগ্রহী পাঠকের হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পাঠকের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়।
আমরা মূলত কুরআন পড়ি না, কুরআনই আমাদের পড়ে। কুরআন আমাদের হৃদয়ের তলদেশ পর্যন্ত প্রবেশ করে এবং আমাদের সংকল্পের বিশুদ্ধতা ও চেতনার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজের রহস্যময়তার উন্মোচন ঘটনায় বা গোপন করে।
জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-
'কুরআন হলো লজ্জাশীলা কনের মতো। আপনাকে এর কাছে আসতে হবে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সাথে, যাতে এটি সহজে আপনার কাছে নিজেকে উন্মোচিত করে।'
মহানবি মুহাম্মাদ -এর অধিকাংশ সাহাবি অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন না। আপনি কতটা দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জন করেছেন, কুরআনের গভীরতম অর্থ বোঝার জন্য তা জরুরি বিষয় নয়; জরুরি বিষয় হলো-আপনি কতটা আন্তরিকতা ও বিনয়ের সাথে কুরআনের সংস্পর্শে এসেছেন। এ কারণে সুফি সাধকরা জিহ্বার জ্ঞান থেকে হৃদয়ের জ্ঞানের দিকে যাত্রা করতে বলেছেন। কেননা, মন কখনো আল্লাহর নুর অনুভব করতে পারে না। আল্লাহর নুর অনুভব করতে পারে কেবল সেই হৃদয়, যার দুয়ার আল্লাহর মহত্ত্বকে ধারণ করার জন্য প্রস্তুত। সম্ভবত এ কারণে আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে বলেছেন- 'যে ভয় করে, তার জন্য উপদেশস্বরূপ।' সূরা ত্ব-হা: ৩
হৃদয় দিয়ে কুরআন পড়তে হলে কুরআনের প্রতি আপনার শ্রদ্ধা ও সংকল্পের ব্যাপারটি আগে ঠিক করে নিতে হবে। যখন কেউ অন্যদের সঙ্গে বিতর্ক করার বাসনা থেকে কুরআন পাঠ করে, তখন সে মূলত কুরআনে সেই জিনিসই খুঁজে পায়-যা তার মন চায়; আল্লাহ যা বলতে চান, সেদিকে তখন তার দৃষ্টি পড়ে না। কুরআনের যে অংশগুলোর প্রতি আপনার সমর্থন রয়েছে, কেবল সেগুলো পড়লে এবং যে অংশগুলোর প্রতি আপনার সমর্থন নেই, সেগুলোকে অগ্রাহ্য করে চললে বিষয়টি এমন দাঁড়ায়-আপনাকে গড়ে তোলার সুযোগ আপনি কুরআনকে দিচ্ছেন না; বরং আপনি আপনার পছন্দ-অপছন্দ মাফিক কুরআনকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন!
কুরআনের বক্তব্য সেই হৃদয় গ্রহণ করতে পারে না, যে হৃদয় আত্মপূজা ও আত্ম-অহংয়ের চেতনায় বুঁদ হয়ে থাকে। জাগ্রত ও বিনয়ী হৃদয়ই কেবল কুরআনের বার্তা গ্রহণের জন্য উপযুক্ততা অর্জন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার অনুধাবন করার মতো হৃদয় রয়েছে অথবা যে নিবিষ্ট চিত্তে শ্রবণ করে।' সূরা ক্বাফ: ৩৭
হৃদয় থেকে কুরআন পাঠের যাত্রা শুরু হয় অনুশোচনাপূর্ণ অন্তর থেকে। আমাদের ব্যক্তিগত মতামত ও পক্ষপাতিত্বকে বিসর্জন না দেওয়া পর্যন্ত আমরা কুরআনকে কুরআনের রূপে দেখতে পারব না; বরং নিজ ভুল চিন্তা-কাঠামোর ফিল্টারেই কুরআন আমাদের সামনে প্রতিভাত হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'এটি সেই গ্রন্থ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যা মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক।' সূরা বাকারা: ২
কুরআন সব রকম ত্রুটির ঊর্ধ্বে। কুরআন সম্পর্কে মানুষের ব্যাখ্যার মধ্যে ত্রুটি থাকতে পারে, কিন্তু কুরআনে কোনো ত্রুটি নেই। এ কারণে কুরআন খোলার আগেই কুরআন আমাদের শুধু বাহ্যিকভাবেই পবিত্রতা অর্জন করতে বলেনি; বরং হৃদয়কেও বিশুদ্ধ করতে বলেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'অবশ্যই তা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক সুরক্ষিত গ্রন্থে। যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না।' সূরা ওয়াকিয়া: ৭৭-৭৯
কুরআনের সংস্পর্শে আসতে হলে আপনাকে অবশ্যই বিশুদ্ধ হৃদয়, পবিত্র-বিনয়ী অন্তর ও শূন্যচিত্ত নিয়ে আসতে হবে। কারণ, বহুত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে এক আল্লাহকে অনুভব করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর কুরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে, সুবিন্যস্ত ও স্পষ্টভাবে।' সূরা মুজ্জাম্মিল: ৪
আমরা যদি কুরআন পাঠ থেকে লাভবান হতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই আল্লাহকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগের সাথে শ্রবণ করো আর নীরবতা বজায় রাখো, যাতে তোমাদের প্রতি রহম করা হয়।' সূরা আ'রাফ: ২০৪
'নিশ্চয়ই যে সুন্দরভাবে ও ধীরে ধীরে কুরআন পাঠ করবে, সে থাকবে আনুগত্যপরায়ণ মহান ফেরেশতাদের সাথে এবং যে ব্যক্তি অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও তোতলাতে তোতলাতে কিংবা ভেঙে ভেঙে কুরআন পাঠ করবে, সে দ্বিগুণ পুরস্কার পাবে।'৮৮
একটি বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের চেতনা কিন্তু ওহির সাথে পূর্বপরিচিত। কারণ, দুটোই এসেছে একই উৎস থেকে; আল্লাহ থেকে। তাই এটি আল্লাহর-ই মহিমা যে, কুরআন পাঠের সময় আমাদের বিক্ষিপ্ত হৃদয় অবশেষে বিশ্রাম ও শান্তির জায়গা খুঁজে পায়। যখন আমরা আরবি ভাষায় কুরআন পাঠের ভেতর ডুবে যাই, তখন আমাদের সমগ্র সত্তা আল্লাহর জ্যোতির চাদরের নিচে আশ্রয় গ্রহণ করে।
আমাদের হৃদয়ের সাথে আল্লাহর যোগাযোগ সর্বদা অব্যাহত থাকে। কিন্তু আমাদের মনের ভেতরের শোরগোল এ যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায়। বৃষ্টির ফোঁটাকে গ্রহণ করার জন্য যেমন একটি বীজকে ফেটে যেতে হয়, তেমনি আল্লাহর বার্তাকে আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করাতে আমাদের কুপ্রবৃত্তির খোলসকে ভেঙে ফেলতে হয়।
কুরআনের রূপান্তরের শক্তি
কুরআনের অনন্য শক্তি বুঝতে একটি গল্পের কথা উল্লেখ করা যাক-
এক লোক একদিন এক সুফির কাছে এসে প্রশ্ন করল- 'কুরআনের সবটা তো আমরা বুঝতে পারি না, তাহলে শুধু শুধু এটি পড়ে কী লাভ? একই কুরআন বারবার পড়ার তো কোনো মানে হয় না!' জবাবে সুফি কিছু না বলে একটি কয়লা ভরা কাপড়ের ব্যাগ নিলেন এবং লোকটিকে সাথে নিয়ে একটি কুয়ার কাছে গেলেন। এরপর কয়লাগুলো মাটিতে ফেলে তিনি ব্যাগটি খালি করলেন। এবার লোকটিকে বললেন-'কুয়ার পানি দিয়ে কাপড়ের ব্যাগটি ভরে ফেলো।' লোকটি বলল-'কিন্তু এটি তো কাপড়ের ব্যাগ। এখানে পানি ঢাললে তো সব পানি গড়িয়ে পড়ে যাবে।' সুফি বললেন- 'আমি যা বলি, তা-ই করো।' এ কথা বলে সুফি চলে গেলেন।
পরের কয়েক ঘণ্টা লোকটি ব্যাগটির ভেতর বালতির পর বালতি পানি ঢেলে চলল, কিন্তু ব্যাগ ভর্তি হওয়ার নাম নেই; সব পানি পড়ে যেতে থাকল ব্যাগ থেকে। কিছু সময় পর সুফি ফিরে এলেন। দেখলেন, লোকটি পানি ঢালতে ঢালতে ক্লান্ত-শ্রান্ত ও হতাশ হয়ে পড়েছে। সুফি তাকে দেখে মৃদু হাসলেন। লোকটি জিজ্ঞেস করল- 'আপনি হাসছেন কেন? আমি তো ব্যাগে একটুও পানি ভরতে পারিনি।'
জবাবে সুফি বললেন-'তুমি হয়তো ব্যাগে পানি ভরতে পারোনি, কিন্তু বারবার পানি ঢালার কারণে কয়লার ময়লা লেগে যাওয়া ব্যাগটি ধবধবে পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং এখন ব্যাগটিকে নতুনের মতো লাগছে। প্রথম যেদিন ব্যাগটি কিনেছিলাম, সেদিনের মতো এটি সুন্দর হয়ে গেছে। কুরআনের বিষয়টিও ঠিক এ রকম। তুমি হয়তো সমগ্র কুরআন ধারণ করতে পারবে না, কিন্তু যতই কুরআন পাঠ করবে, ততই এটি তোমার হৃদয়কে প্রকম্পিত একই রকম রয়েছে এবং আজও আমরা জীবনের যে পর্যায়ে থাকি না কেন, কুরআন আমাদের সাথে বিভিন্নভাবে সংযুক্ত হয়ে থাকে।
আমাদের বারবার কুরআন পড়তে বলা হয়েছে এ কারণে নয় যে, কুরআনের কথাগুলো বদলে যায়; বরং এ কারণে, আমরাই বদলে যাই। তাই কুরআনের একই বার্তা আল্লাহর পথে আধ্যাত্মিক যাত্রাপথে আমাদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্নভাবে সংযুক্ত হয়। এজন্যই বলা হয়, কুরআনের সৌন্দর্য হলো-আপনি এর বক্তব্যকে বদলাতে পারবেন না, কিন্তু এর বক্তব্য আপনাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
আপনি যেখানেই থাকুন, কুরআন আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করবে
কুরআন নির্দিষ্ট কোনো সময়ের মানুষের সাথে কথা বলে না; এটি কথা বলে সময়ের সীমা ছাড়ানো সকল মানুষের সাথে। কুরআন কেবল অতীতের ঘটনাবলি আমাদের সামনে উপস্থিত করে না; বর্তমানের জরুরি বিষয়গুলোও আমাদের সামনে তুলে ধরে এবং ভবিষ্যতের কর্মের জন্য আমাদের সচেতন করে তোলে।
কুরআন কোনো সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবতীর্ণ হয়নি। এটি যুগ-যুগান্তরের মানুষের জন্য পথনির্দেশ। রূপক অর্থ ও অলংকারপূর্ণ ভাষার মাধ্যমে প্রতিটি ঘটনা, যুদ্ধ, বিজয় ইত্যাদির বর্ণনাতে কুরআন আমাদের সাথে সরাসরি কথা বলে। তাই কুরআনকে সাধারণভাবে পাঠ করবেন না; বরং কুরআনে উল্লেখিত প্রতিটি চরিত্রের ভেতর ডুব দিন। কুরআনকে শুধু বোঝার চেষ্টা করবেন না; বরং আপনার সকল অনুভূতি দিয়ে এর স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করুন। এভাবেই জীবন্ত কুরআন জাগ্রত হয় এবং আপনার দৃষ্টির সাথে একাত্ম হয়ে যায়। এভাবে কুরআন পাঠ আপনার জীবনে পরোক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কুরআনের স্বাদ পেতে হলে আপনাকে ওহির ইকোসিস্টেমের ভেতর প্রবেশ করতে হবে, এর সমুদ্রে ডুব দিয়ে মণি-মুক্তোর সন্ধান করতে হবে।
কুরআন পড়ার সময় খেয়াল রাখুন, কুরআনের প্রতিটি আয়াত আপনার সাথে সরাসরি কথা বলছে। মনোযোগ দিয়ে শুনুন, এ গ্রন্থে আপনার কথাই বলা হয়েছে। কুরআন যার বিরোধিতা করে, যার দিকে আহবান করে, যা মনে করিয়ে দেয়—সবই আপনি একসময় জানতেন, কিন্তু হয়তো ভুলে গেছেন।
কুরআন কথা বলে সবার সাথে। বিজ্ঞানী থেকে রাখাল পর্যন্ত, শিল্পী থেকে ব্যবসায়ী পর্যন্ত, কবি থেকে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত এ গ্রন্থে সকলের জন্য রয়েছে বার্তা। প্রত্যেক মানুষ এই মুহূর্তে তার আধ্যাত্মিক যাত্রাপথের ঠিক যে বিন্দুতে অবস্থান করছে, কুরআন ঠিক সে বিন্দুতে তার ক্ষুধা মেটানোর জন্য অপেক্ষমাণ। তবে কিছু স্কলারের মতে—কুরআনের প্রতিটি আয়াতের রয়েছে সাত স্তরের গভীরতা এবং এর সর্বশেষ স্তরের অর্থ কেবল আল্লাহ জানেন; যেটিকে কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে—
'আল্লাহ ছাড়া এর মর্ম কেউ জানে না।' সূরা আলে ইমরান: ৭
রূপক ও প্রতীকী আয়াতের শক্তি
কুরআনের বেশিরভাগ আয়াত সরাসরি ও সুস্পষ্ট। এগুলোকে মুহকামাত বলা হয়। আবার কুরআনের অনেক অস্পষ্ট আয়াত রয়েছে—যা রূপক ও প্রতীকী অর্থসংবলিত। এগুলোকে বলা হয় মুতাশাবিহাত (সূরা আলে ইমরান: ৭)। এ অস্পষ্ট আয়াতগুলো কুরআনকে সময়ের সীমাকে অতিক্রম করিয়েছে। কারণ, কুরআন এমন এক গ্রন্থ—যা প্রতীকীকরণের মাধ্যমে সর্বযুগের এবং জ্ঞানের সর্বস্তরের মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে।
কুরআনে প্রচুর প্রতীক, উদাহরণ ও শক্তিশালী গদ্যের পাশাপাশি রয়েছে অনেক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সূত্র। কিন্তু কুরআন বিজ্ঞানের (Science) কোনো গ্রন্থ নয়; বরং এটি নিদর্শনের (Signs) গ্রন্থ। স্রষ্টার কাছে আমাদের ফিরে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে কুরআন তার সৌন্দর্য ও মহিমা আমাদের সামনে মেলে ধরে।
দুনিয়ার অন্যান্য গ্রন্থসমূহ লেখা হয় দুনিয়ার বাস্তবতা সম্পর্কে লেখকের দৃষ্টি ও অনুধাবনের ভিত্তিতে। কিন্তু কুরআন যেহেতু নিরেট আল্লাহর বাণী, সেহেতু কুরআনে নিখুঁতভাবে আল্লাহর পরম সত্য ও গভীর মমতার প্রতিফলন ঘটেছে।
'আল্লাহর কথা অন্যান্যদের কথার চেয়ে তেমনই শ্রেষ্ঠ, যেমন আল্লাহ অন্যান্য সৃষ্টির তুলনায় শ্রেষ্ঠ।'
কুরআনের কথাগুলো মানুষের ব্যাখ্যা থেকে রচিত নয়। কুরআনে সরাসরি আল্লাহর কথা বর্ণিত হয়েছে মানুষের বোধগম্য ভাষায়। কুরআনের প্রতিটি পঙক্তিকে 'আয়াত' বলা হয়, যার অর্থ-নিদর্শন। কুরআনের প্রতিটি শব্দ একেকটি সাইনপোস্ট, যা আল্লাহর দিকনির্দেশক। যদিও আমরা আল্লাহকে সরাসরি দেখতে পাই না, তবুও সমগ্র সৃষ্টিজগতে তাঁর নামের প্রতিফলন দেখে আমরা তাঁকে অনুভব করতে পারি। সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে যদি আল্লাহর পাণ্ডুলিপি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে কুরআনকে সৃষ্টি রহস্যের আধ্যাত্মিক সূত্র বলা যেতে পারে। এ কারণে আমাদের কুরআনকে শুধু পড়তে বলা হয়নি; এর নিদর্শনের ভেতর ডুব দিতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।' সূরা সোয়াদ: ২৯
কুরআনের কোনো আয়াতকে বুঝতে হলে সমগ্র কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর অনুগ্রহ ও ভালোবাসার বার্তার সাথে মিলিয়ে তা বুঝতে হবে। একজন মানুষের হৃৎপিণ্ডকে যদি সমগ্র শরীর থেকে আলাদা করে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে যেমন তা অসম্পূর্ণ হবে, তেমনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সামগ্রিক বার্তাকে অগ্রাহ্য করে কুরআন থেকে পছন্দমতো একটি আয়াত বাছাই করে সেটিকে বোঝার চেষ্টা করলেও তা আমাদের কাছে অসম্পূর্ণ হয়ে ধরা দেবে।
কুরআনের উপশম ক্ষমতা
কীভাবে আল্লাহকে পাওয়া যায়? আত্মার এমন প্রশ্নের উত্তর রয়েছে কুরআনের ভেতর। কুরআন কেবল বিধিবিধানসংবলিত কোনো গ্রন্থ নয়। আলি -এর মতে, কুরআন হলো-
'একটি মহাসাগর, যার গভীরতার সীমাহীন; একটি ঝরনা, যার ভান্ডার অফুরন্ত। কুরআন তার জন্য শান্তি, যে কুরআনের ভেতর বসবাস করে। তার জন্য পথপ্রদর্শক, যে এটির অনুসরণ করে। কুরআন এমন এক নিরাময়, যার সংস্পর্শে এলেই মানুষ আরোগ্য লাভ করে। প্রত্যেক আশ্রয়প্রার্থীর জন্য কুরআন একটি আশ্রয়। কুরআন এমন আলো, যা অন্ধকার দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয় না।'
কুরআনের কথা আমাদের চেতনাকে প্রশান্ত ও সন্তুষ্ট করে দেয়। এটি আমাদের প্রবৃত্তির জন্য একটি জাগরণী ডাক হিসেবে কাজ করে। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক আলোর ঝলকানি, যা আমাদের হৃদয়ের অলিগলি থেকে সব অন্ধকারকে দূর করে দেয়। একটি বীজ চারাগাছে রূপান্তরিত হওয়ার আগে যেমন খোলস ভেঙে এর ভেতর আলো প্রবেশের সুযোগ দেয়, তেমনি আমাদের হৃদয়ের আবরণকে সরিয়ে সেখানে কুরআনের আলো প্রবেশের সুযোগ করে দিলেই কেবল আমরা প্রকৃত মানুষ হতে পারব।
কুরআন হলো দৃশ্যমান জগতের সাথে সর্বোচ্চ আসমানি জগতের একটি সেতুবন্ধন। কুরআন হলো দুনিয়ার সকল মানুষের কাছে লেখা আল্লাহর খোলাচিঠি, যে চিঠির মাধ্যমে তিনি মানুষকে তাঁর কাছে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কুরআনের কথাগুলো কেবল অর্থবহ কিছু শব্দসমষ্টি নয়; বরং কুরআন হলো মহান আল্লাহর বলা কথার কম্পনের ধারক, যা রহস্যময়ভাবে মানুষের চেতনাকে উন্মোচিত করে এবং প্রেমময় আল্লাহর (আল ওয়াদুদ) সাথে বান্দার মিলনের সকল বাধা অপসারণ করে।
মানুষের ওপর কুরআনের গভীর প্রভাবের বিষয়টি নিচের ঘটনায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে-
'এক ধনী বণিকের কন্যা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি কন্যার জন্য একজন ডাক্তার ও একজন শাইখকে ডেকে আনলেন। বণিক প্রথমে শাইখকে তার কন্যার জন্য দুআ করতে বললেন। শাইখ বললেন-“আমি আপনার মেয়ের জন্য কুরআন পাঠ করব এবং তারপর আল্লাহর কাছে তার আরোগ্যের জন্য দুআ করব, যাতে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।” এ কথা শুনে ডাক্তার বললেন-“আপনি কি পাগল? বিজ্ঞান কোথায় গেছে, সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে? কথা দিয়ে কারও রোগ ভালো হয় না; রোগ ভালো হয় ওষুধ দিয়ে।” জবাবে শাইখ চিৎকার করে বললেন- “আপনি একটা স্টুপিড লোক। আল্লাহর কথার উপশম ক্ষমতা সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে?" ডাক্তার শাইখের এমন জবাবে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। চেহারা তার রাগে লাল বর্ণ ধারণ করল। প্রচন্ড ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে চিৎকার করে বললেন-“আপনি কোন সাহসে আমাকে স্টুপিড বললেন?"
এবার শাইখ নরম হয়ে বললেন-“দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। কিন্তু আপনি কি লক্ষ করছেন, একটি সাধারণ কথা আপনাকে কীভাবে রাগিয়ে দিয়েছে? যদি একজন অপরিচিত লোকের কথা আপনার চোখকে লাল করে দিতে পারে, আপনার হৃৎস্পন্দনকে দ্রুত করতে পারে, রক্তনালিগুলোকে সংকুচিত করতে পারে এবং আপনার রক্তচাপ বৃদ্ধি করতে পারে, তাহলে নিশ্চিত থাকুন, আল্লাহর ত্রুটিহীন ঐশী বাণীরও উপশমের ক্ষমতা রয়েছে।”
কুরআন যেহেতু এসেছে মহামহিম আল্লাহর নিকট থেকে, সেহেতু এর কথামালা আমাদের কল্পনার চাইতেও বেশি শক্তিশালী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আল্লাহর কথার মাধ্যমেই মানবসৃষ্টির সূচনা হয়েছে এবং জগতের সকল সৃষ্টি অস্তিত্বশীল হয়েছে তাঁর কথাতেই। কাজেই মহান আল্লাহর কথার সরাসরি ও প্রত্যক্ষ প্রভাব না থাকার কোনো কারণ নেই।
হও! এবং তা হয়ে যায়
ওহির ক্ষমতার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় কুরআন থেকে, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে তাঁর একটি কথা দিয়ে-
كُنْ فَيَكُونُ 'হও! আর তা হয়ে যায়।' সূরা ইয়াসিন: ৮২
আল্লাহ একটি মাত্র শব্দ 'কুন' বলা মাত্র জগতের সবকিছু অস্তিত্বশীল হয়েছে। কুন; আমরা এখানে। কুন; আমরা নেই। কুন বলার মাধ্যমেই সৃষ্টি, কুন বলার মাধ্যমেই ধ্বংস। এটিই ওহির গোপন ক্ষমতা। কুরআনের কথাগুলো সূর্যের আলোকরশ্মির মতো; যার ওপরই এটি আপতিত হয়, সেটিই রূপান্তরিত হয়ে যায়।
যদিও বিভিন্ন ভাষায় কুরআনের অনুবাদ থাকায় আমরা লাভবান হয়েছি, তবুও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হলো-আরবি ভাষায় অবতীর্ণ মূল কুরআনের ছন্দ, সুর, ভাষার লালিত্য ও সৌন্দর্যের যে স্বাদ, তা কুরআনের কোনো অনুবাদের ভেতর পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের বুঝতে হবে-কুরআন কেবল কিছু বর্ণ ও শব্দসমষ্টি নয়; বরং কুরআন হলো এমন কিছু শব্দ-তরঙ্গের মেলা, যা আরবি বর্ণসমষ্টি দিয়ে সাজিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ। তাই কুরআন আত্মার ক্ষতের এক অব্যর্থ ওষুধ।
কখনো কখনো জিবরাইল মানুষের বেশে এসে রাসূল-এর কাছে ওহি পৌঁছে দিতেন। আবার কখনো কখনো রাসূল-এর কাছে ওহি আসত 'ঘণ্টাধ্বনির মতো কণ্ঠস্বর' আকারে। ঘণ্টাধ্বনির কম্পন শুধু শব্দসমষ্টির চাইতেও অনেক বেশি কিছু ছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর আমি কুরআন অবতীর্ণ করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত; কিন্তু জালিমদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।' সূরা বনি ইসরাইল: ৮২
আজ বিজ্ঞানীরা কথার কম্পনের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার বিষয়টি আবিষ্কার করেছেন। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন E=MC2 সূত্রের মাধ্যমে কম্পনের ক্ষমতার বিষয়টি উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে শক্তি ও বস্তু একে অপরের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। আইনস্টাইনের আবিষ্কৃত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কেউ কেউ বলেছেন, কথার কম্পমান ও শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য তাত্ত্বিকভাবে বস্তুকে প্রভাবিত করতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব হেলসিংকি ইন ফিনল্যান্ডের সাড়া জাগানো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, তরঙ্গ ও কম্পন মানুষের DNA বদলে দিতে পারে।
আমরা যখন কুরআনের সূরার মূর্ছনা কান পেতে শুনি, তখন আমাদের মাথায় থাকা অগ্নিস্ফুলিঙ্গগুলো স্থান ত্যাগ করে এবং আমাদের হৃদয় আল্লাহর সাথে সংযোগের পথ খুঁজে পেয়ে শান্তি অনুভব করে। আলি-এর মতে- 'আল্লাহর কথাগুলো হলো হৃদয়ের ওষুধ।'
আমাদের হৃদয় হলো সৌরবিদ্যুতের মতো। সৌরবিদ্যুৎ যেমন সূর্য থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে, আমাদের হৃদয়ও তেমনি কুরআন থেকে আলো সংগ্রহ করে।
জগতের সর্বত্র আল্লাহর কথার প্রতিফলন বিদ্যমান
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি তাদেরকে আমার নির্দশনাবলি দেখাব দূর দিগন্তে আর তাদের নিজেদের মধ্যেও-যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ কুরআন সত্য। এটি কি যথেষ্ট নয় যে তোমার প্রতিপালক সবকিছুরই সাক্ষী?' সূরা হা-মিম সিজদা : ৫৩
আমাদের শুধু কুরআনের কথাগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে বলা হয়নি; বরং জগতে দৃশ্যমান সকল কিছুর ওপর কুরআনের প্রতিফলনের দিকে দৃষ্টি দিতে বলা হয়েছে। বহির্জগতের কুরআনের পৃষ্ঠায় উল্লেখিত আল্লাহর করুণাধারার দিকে শুধু নয়; বরং আমাদের হৃদয়ের অন্তর্জগতে লুকায়িত আল্লাহর প্রেমের দিকেও দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। মহাসাগরের প্রতিটি ঢেউকে আল্লাহর নিদর্শন, প্রতিটি বায়ু প্রবাহকে আল্লাহর আয়াত, প্রতিটি মানুষকে একেকটি সূরা, প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহকে জানার সুযোগ হিসেবে কল্পনা করলে আল্লাহকে অনুভব করা সহজ হয়ে যায়। কারণ, জগতের সবকিছুই মহাবিজ্ঞানী আল্লাহর সৃষ্টিকুশলতার একেকটি অংশ মাত্র।
কুরআন একটি অলৌকিক গ্রন্থ
কুরআন লিখিত আকারে মহানবি মুহাম্মাদ-এর ওপর অবতীর্ণ হয়নি, কিন্তু এটিকে বিস্ময়করভাবে নির্ভুল ও সুসংগঠিত আকারে সংকলন করা হয়েছে। অনেক উৎস থেকে জানা যায়-রাসূল যেভাবে কুরআন পাঠ করতেন, সেভাবে তা লেখকদের লিখে রাখার নির্দেশ দিতেন। তবে অধিকাংশ স্কলারের মতে, রাসূল নিজে পড়তে জানতেন না। এটির সত্যতা পবিত্র কুরআন নিশ্চিত করে-
'কাজেই তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর প্রেরিত সেই উম্মি (অক্ষরজ্ঞানহীন) নবির প্রতি, যে নিজে আল্লাহর প্রতি ও তাঁর যাবতীয় বাণীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। আর তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে।' সূরা আ'রাফ: ১৫৮
আজকের যুগে অক্ষরজ্ঞান না থাকলে বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু মহানবি-এর অক্ষজ্ঞানহীনতা ছিল তাঁর জন্য একটি সুবিধা-যা এ কারণে যে, তিনি ওহির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন। তাঁর পড়ার অক্ষমতার কারণে তিনি বহির্বিশ্বের জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করতে ছিলেন অপারগ। আইডিয়ালস অ্যান্ড রিয়েলিটিজ অব ইসলাম গ্রন্থে সাঈদ হোসেন নাসর প্রিয় নবিজির অক্ষরজ্ঞান না থাকার বিষয়টিকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন-'ইসলামে আল্লাহর কথা হলো কুরআন। খ্রিষ্টধর্মে আল্লাহর কথা হলো ঈসা। খ্রিষ্টধর্মে ঐশী বাণীর বাহক ছিলেন কুমারী মাতা মরিয়ম। ইসলামে ঐশী বাণীর বাহক ছিলেন মুহাম্মাদ-এর হৃদয়। যে কারণে কুমারী মাতা মরিয়ম-এর কুমারী থাকা ছিল অনিবার্য; একই কারণে মুহাম্মাদ-এর অক্ষরজ্ঞানহীন থাকা ছিল অনিবার্য। আল্লাহর বার্তার বাহককে অবশ্যই বিশুদ্ধ ও অমলিন হতে হবে। কেননা, আল্লাহর বাণী কেবল খাঁটি ও বিশুদ্ধ মানুষই গ্রহণ করতে পারে।' মুহাম্মাদ মানবীয় জ্ঞান ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দ্বারা প্রভাবিত হননি। কারণ, তিনি সরাসরি আল্লহর জ্ঞানের ঝরনা থেকে পানি পান করেছেন।
যদি কুরআন কোনো মানুষের লেখা গ্রন্থ হতো, তাহলে ২৩ বছর ধরে নির্মিত কুরআনে ২৩ বছরের পরিপক্বতার পর্যায়গুলো একে একে দৃশ্যমান হতো; যেমনটি দুনিয়ার লেখকদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। কিন্তু কুরআনের কথাগুলো সময়ের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এবং একটির সঙ্গে অপর যেকোনো আয়াত বা প্রথম দিকের আয়াতের সঙ্গে শেষ দিকের যেকোনো আয়াত এতই সামঞ্জস্যশীল ও সুসংগঠিত যে, এটিকে কোনো মানুষের লেখা বলার সুযোগ নেই।
রাসূল-এর যুগে কোনো অনলাইন ডাটাবেজ ছিল না, ছিল না কোনো সার্চ ইঞ্জিন, তবুও কুরআনে ডজন ডজন পরস্পর সামঞ্জস্যশীল শব্দসমষ্টি বা আয়াতসমষ্টি পাওয়া যায়। কোনো মানুষের পক্ষে তথ্যভান্ডার ব্যবহার করা ছাড়া ২৩ বছর ধরে পরস্পর সাযুজ্যপূর্ণ কথা জাগদ্বাসীর সামনে উপস্থাপন করা অসম্ভব। কুরআনের আয়াতগুলোর পরস্পরের সাথে সামঞ্জস্যশীলতার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক: কুরআনে 'এই জীবন' কথাটি উল্লেখিত হয়েছে ১১৫ বার। 'পরবর্তী জীবন' কথাটিও উল্লেখিত হয়েছে ১১৫ বার। 'ফেরেশতা' শব্দটির উল্লেখ আছে ৮৮ বার। 'শয়তান' শব্দটির উল্লেখ আছে ৮৮ বার। কুরআনে 'তারা বলল' কথাটি ৩৩২ বার এসেছে এবং '(তুমি) বলো' শব্দটিও ৩৩২ বার করে এসেছে। সমগ্র কুরআনে এমন কয়েক ডজন গাণিতিক সাযুজ্যতা রয়েছে, যেখানে আল্লাহর কথার গভীরতা ও নির্ভুলতার অলৌকিক প্রকাশ ঘটেছে।
২৩ বছর ধরে একটু একটু করে অবতীর্ণ কুরআন এমন ভারসাম্যপূর্ণ ও সাযুজ্যতাপূর্ণ অবস্থায় সুসংগঠিত হয়েছে যে, যে কেউ সহজেই বুঝতে পারে- কোনো একক বা বহু মানুষের পক্ষে এমন গ্রন্থ তৈরি করা অসম্ভব এবং একমাত্র মহাবিজ্ঞানী আল্লাহর জ্ঞানকুশলতাই কুরআনের পেছনের মূল কারিগর।
কুরআন মানবজাতির কাছে নতুন কোনে বার্তা নিয়ে আসেনি; বরং কুরআন হলো এমন এক আলো, যে আলো আল্লাহ আমাদের আগেই দান করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তিনি সত্য সহকারে তোমার ওপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা পূর্বতন কিতাবের সমর্থক এবং তিনি তাওরাত ও ইনজিল অবতীর্ণ করেছেন।' সূরা আলে ইমরান: ৩
মহানবি -কে যেমন 'বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে' প্রেরণ করা হয়েছে, তেমনি কুরআনকেও শুধু মুসলিমদের জন্য নয়; বরং 'বিশ্বজগতের জন্য উপদেশবাণী' (সূরা সোয়াদ: ৮৭) হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।
ইনজিল, তাওরাত বা অন্যান্য আসমানি কিতাবকে প্রতিস্থাপন করার জন্য কুরআন অবতীর্ণ হয়নি; বরং কুরআন হলো ওহির ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সংস্করণ। নবিরা হলেন ভিন্ন ভিন্ন নদীর মতো, যে নদীগুলো একই সমুদ্রে মিলিত হয়েছে।
কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
'বলো, আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের ওপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁদের বংশধরদের ওপর। আর যা প্রদান করা হয়েছে মুসা ও ঈসাকে এবং যা প্রদান করা হয়েছে তাঁদের রবের পক্ষ থেকে নবিগণকে। আমরা তাঁদের মধ্যে তারতম্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত।' সূরা বাকারা: ১৩৬
বিভিন্ন নবির ওপর অবতীর্ণ কিতাবগুলোর মধ্যকার প্রধান পার্থক্য এর বার্তার ভেতর নয়; রয়েছে বিভিন্ন যুগের মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতায় ও ব্যাখ্যার যোগ্যতায়। কুরআন নিজেকে ইবরাহিম-এর ওপর অবতীর্ণ বার্তার প্রতিস্থাপন হিসেবে দাবি করেনি; বরং ইবরাহিম, মুসা ও ঈসা-এর ওপর অবতীর্ণ বার্তার রিমাইন্ডার হিসেবে দাবি করেছে।
মহান আল্লাহ বলেন- 'আমি সত্য বিধানসহ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী ও সংরক্ষক।' সূরা মায়েদা : ৪৮
কুরআনের অতুলনীয় ভাষাগত সম্পূর্ণতা, অসংখ্য গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, গভীরভাবে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এবং মানুষের আত্মার ক্ষুধা মেটানোর সক্ষমতা দেখে এটিকে অলৌকিক ঐশীগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে পারা যায় না। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-আল্লাহ তাঁর নবিদের কাছে অপরিকল্পিতভাবে ওহি প্রেরণ করেননি; বরং বিভিন্ন নবির যুগে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং শ্রোতাদের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে একটু একটু করে ওহি প্রেরণ করেছেন।
এর একটি উদাহরণ মুসা। ফেরাউনের যুগটি ছিল জাদুর যুগ। সে সময়ের লোকেরা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। তাই মুসা-কে যে নিদর্শন দিয়ে প্রেরণ করা হয়, তা সেই জাদুর ক্ষমতাকে ম্লান করে দিয়েছিল। লাঠি সাপে পরিণত হওয়া এবং লোহিত সাগরকে দ্বিখণ্ডিত করা ছিল মুসা-কে দেওয়া আল্লাহর সেই নিদর্শনেরই অংশ। ঈসা-কে যে নিদর্শনগুলো দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল, সেগুলো ছিল অসুস্থকে সুস্থ করা, মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করা, অন্ধকে দৃষ্টিশক্তি দান করা ইত্যাদি। ঈসা-এর যুগের লোকেরা ছিল ওষুধ ও চিকিৎসাশাস্ত্রে অনেক উন্নত। তাই ঈসা-কে আল্লাহ ওই বিষয়ের দক্ষতা দান করেছিলেন।
মহানবি মুহাম্মাদ-এর যুগের লোকেরা জাদুবিদ্যা বা চিকিৎসাশাস্ত্রে পারদর্শী ছিল না, তারা ছিল ভাষার ওপর অসাধারণ দক্ষ। তাই আল্লাহ নবিজিকে যে অলৌকিক কিতাব দান করেন, তা ছিল অসাধারণ ভাষাশৈলীর জীবন্ত প্রকাশ। এটি না গদ্য, না পদ্য। কুরআন এমন এক অপ্রচলিত সাহিত্য নিয়ে আরববাসীর সামনে উপস্থিত হলো, যার সৌন্দর্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় তাদের সামনে ছিল না। যেখানে কুরআন পঠিত হতো, লোকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো কান পেতে কুরআন শুনত। কবিদের লিখিত কবিতায় থাকে আবেগ, স্বপ্ন ও কল্পনা। অথচ কুরআনের উপস্থাপিত সাহিত্য ছিল নিরেট সত্যের ওপর দাঁড়ানো। আরব কবিরা যে সাহিত্য রচনা করত, কুরআনের সাহিত্যের সামনে সেগুলোর দাঁড়ানোর যোগ্যতা ছিল না। কুরআনের সবচেয়ে বড়ো বিশেষত্ব হলো- এটির অবস্থান সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। কুরআন তার সময়ের শ্রোতাদের মনে যে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম ছিল, আজকের কিংবা ভবিষ্যতের যেকোনো শ্রোতার মনেও একই আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম।
টিকাঃ
৭৯. আহমাদ
৮০. Forrin, Noah D., and Colin M. Macleod. "This Time It's Personal: The Memory Benefit of Hearing Oneself.' Memory. vol. 26. no. 4, 2017, pp. 574-579. Doi: 10.1080/09658211.2017.1383434
৮১. সূরা ইউসুফ: ৪-১০১
৮২. সূরা শুআরা: ৬৩-৬৬
৮৩. সূরা মারইয়াম: ১৬-৩৩
৮৪. Khan, Nouman Ali. 'Alif Lam Mim.' 2012
৮৫. Naik, Zakir. 'What Is the Meaning of Alif Laam Meem?' 2011
৮৬. তিরমিজি
৮৭. Zakariya, Abu. The Eternal Challenge: A Journey through the Miraculous Qur'an. One Reason, 2015
৮৮. বুখারি, মুসলিম
৮৯. আবু দাউদ
৯০. বুখারি
৯১. Koberlein, Brian. 'How Are Energy and Matter the Same?' Universe Today, December 23, 2015. www.universetoday.com/116615/how-are-energy-and-matterthe-same/
৯২. 'Scientist Proves DNA Can Be Reprogrammed by Words and Frequencies.' Collective Evolution, August 27, 2013
৯৩. Nasr, Seyyed Hossein. Ideals and Realities of Islam. The Islamic Texts Society, 2006
৯৪. Khan, Nouman Ali. ‘Miracle Word Count’. 2014
৯৫. সূরা আম্বিয়া: ১০৭
📄 ইসলামের আধ্যাত্মিক মাত্রা
ইসলামকে সংক্ষেপে তিনটি বাক্যে বর্ণনা করা যায়: সৃষ্টিকে বাদ দিয়ে স্রষ্টার সাথে মিলিত হওয়া। অহং পরিত্যাগ করে সৃষ্টির সেবায় আত্মনিয়োগ করা। অন্যদের জন্য তা-ই কামনা করা, যা নিজের জন্য পছন্দনীয়।
-শাইখ জাকারিয়া আল সিদ্দিকি
ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়; এটি একটি জীবনাচার-যা একজন মানুষকে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে বদলে দেয়। আল্লাহ মহানবি (সা)-কে নতুন কোনো ধর্ম প্রবর্তনের জন্য প্রেরণ করেননি; বরং আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ককে নতুন করে সচল করার জন্য তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিল। অবশ্য কুরআন আমাদের শুধু আল্লাহর সাথে সম্পর্কের কথাই বলে না; বরং সৃষ্টিজগতের সকল সৃষ্টির সাথে আমাদের কেমন সম্পর্ক থাকা চাই-সে ব্যাপারেও পথনির্দেশ করে। কুরআন আমাদের দয়ার গুণাবলি অর্জনের শিক্ষা দেয়, অন্যদের প্রতি অনুগ্রহের হাত বাড়িয়ে দিতে বলে, সকল সৃষ্টির প্রতি মমতা প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দেয়।
'তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন, তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ করো।' সূরা কাসাস : ৭৭
ইসলাম হলো ভালোবাসার সাথে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হওয়ার একটি ভ্রমণপথ। কেননা, আল্লাহ আমাদের যে জীবন দিয়ে ধন্য করেছেন, তা আমরা অর্জন করে নিইনি। আমাদের জীবন হলো আল্লাহর দেওয়া ঋণস্বরূপ। আরবি ‘দ্বীন’ শব্দটি এসেছে যে মূল শব্দ থেকে, তার অর্থ হলো ঋণ। দ্বীন অর্থ ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা। দ্বীন ইসলামের পথে চলাকে তাই বলা যেতে পারে-আল্লাহর ঋণ পরিশোধের চেষ্টা। আল্লাহ আমাদের জীবন দান করে ঋণী করেছেন। [৯৬]
অবশ্য আল্লাহ এ কারণে তাঁর ইবাদত করার জন্য আমাদের বলেন না যে, আল্লাহর কোনো কিছুর অভাব রয়েছে; বরং তিনি আমাদের চেতনার প্লাগকে আল্লাহর স্মরণের সকেটে এ কারণে প্রবেশ করাতে বলেন, যাতে আমাদের চেতনার ব্যাটারি রিচার্জ হয়।
অনেকেই এই ভুল করে থাকেন-ধর্ম হলো এমন এক পথ, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে খুঁজে পায়। কিন্তু সত্য হলো-ইসলাম এমন এক ভ্রমণপথ, যার মাধ্যমে মানুষ তার সাথে ইতোমধ্যে থাকা আল্লাহর অস্তিত্বের ওপর পড়া আবরণকে সরিয়ে আল্লাহর দেখা পায়। আমরা হয়তো সরাসরি আল্লাহকে অনুধাবন করতে পারি না, কিন্তু জগতের সবকিছুর ওপর তাঁর প্রতিফলন রয়েছে।
ইসলাম আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের কোনো পথ নয়; বরং ইসলাম হলো ইতোমধ্যে আমাদের ভেতর যা রয়েছে তা আবিষ্কারের পথ। ইসলাম একগুচ্ছ ইবাদত ও অনুশীলনের নাম নয়। ইসলাম হলো এমন এক আলো, যে আলোতে আমাদের হৃদয়ের ভেতরে থাকা বীজের অঙ্কুরোদ্গম ঘটে। ইসলাম কেবল কিছু বিধিবিধানের প্রতি বাহ্যিক আনুগত্যের নাম নয়, এটি হলো আমাদের ভেতরে থাকা ঈমানের পরিচর্যার নাম। কেবল সঠিকের উদ্যাপন ও ভুলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নাম ইসলাম নয়; বরং ইসলাম হলো আমাদের কথা, কাজ ও চিন্তায় দয়া, অনুগ্রহ, সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব আনয়ন। ইসলাম আপনাকে দেখিয়ে দেবে-কীভাবে আপনি আপনার আপনাতে পরিণত হবেন।
আমরা প্রত্যেকেই আধ্যাত্মিকতার পাখা নিয়ে জন্ম নিই; ইসলাম কেবল আমাদের মনে করিয়ে দেয়-কীভাবে উড়তে হবে।
মানুষ সহজাতভাবেই উত্তম
বাহ্যিক কিছু ইবাদতসমষ্টির নাম ইসলাম নয়। আমাদের ওপর আল্লাহর সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের প্রতিফলনের পর্দা উন্মোচনের নাম ইসলাম। কুরআন বলেছে, সকল মানুষের ভেতর সহজাতভাবে ভালো বা কল্যাণের বীজ রোপিত থাকে, আরবিতে একে ফিতরাত বলা হয়। এই উত্তম বা কল্যাণময়তার প্রকৃতি সব সময় আমাদের ভালো, উত্তম ও সঠিক কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সুপ্ত অবস্থায় থাকা একটি বীজ যেমন অঙ্কুরোদ্গমের জন্য অপেক্ষমাণ থাকে, আমাদের চেতনার ভেতরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা আল্লাহর ভালোবাসাও তেমনি বিকাশের জন্য অপেক্ষমাণ থাকে। ইসলাম আমাদের শেখায়-আল্লাহর ভালোবাসার সুপ্ত বীজের অঙ্কুরোদ্গমের জন্য কীভাবে পানি সিঞ্চন করতে হয়।
ইসলামের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো-আমাদের ভেতরের সহজাত কল্যাণময়তার উন্মোচন ঘটানো। আমাদের এ কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য দুনিয়াতে নবি-রাসূলদের পাঠানো হয়েছিল যে, আমরা ইতোমধ্যে তা হয়ে গেছি- যা আমরা হতে চাই। আল্লাহর পথে প্রতিটি পদক্ষেপই গন্তব্য। আমাদের যে সংস্করণটি আল্লাহর নৈকট্যশীল, তার আবাস বাইরের দুনিয়াতে নয়; বরং আমাদের ভুল ধারণার চাদরের নিচে। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা সংক্ষেপে বলেছেন-
'নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট দ্বীন হচ্ছে ইসলাম-আত্মসমর্পণ।' সূরা আলে ইমরান: ১৯
কেননা, কেবল তখনই আমরা আল্লাহর ভালোবাসাকে উপলব্ধি করার যোগ্যতা অর্জন করি, যখন আমরা আমাদের সবকিছু নিয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি।
পবিত্র কুরআনে মুসা (আ)-এর বহুল পরিচিত সেই ঘটনা থেকেও এ বিষয়টির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে মুসা (আ)-কে আল্লাহ বললেন-আল্লাহর ওহিকে গ্রহণ করতে হলে তাঁকে অবশ্যই দুনিয়াবি অনুরাগগুলোকে পরিত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ মুসা (আ)-কে বললেন-
'হে মুসা! নিশ্চয়ই আমি তোমার রব; সুতরাং তোমার জুতা জোড়া খুলে ফেলো, নিশ্চয়ই তুমি পবিত্র তুওয়া উপত্যকায় রয়েছ। আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি; কাজেই যা ওহি হিসেবে তোমাকে পাঠানো হচ্ছে, তা মনোযোগ দিয়ে শোনো।' সূরা ত্ব-হা: ১১-১৩
ইসলামের প্রথিতযশা অনেক স্কলার মনে করেন, মুসা (আ)-কে জুতা খুলতে বলা হয়েছে রূপক অর্থে। যার মানে হলো-মুসা (আ)-কে দুনিয়াবি সকল সংশ্লিষ্টতা পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের ইসলামের ইবাদত করতে বলা হয়নি; একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে বলা হয়েছে। আমাদের ধর্ম আমাদের গন্তব্য নয়; বরং আমাদের ইবাদত ও ইসলামের শিক্ষাগুলো হলো আল্লাহর পথের একেকটি বন্দোবস্ত মাত্র।
ইসলাম: শান্তির প্রতি আত্মসমর্পণ
ইসলামে আত্মসমর্পণের তিনটি পর্যায় রয়েছে: ইসলাম, ঈমান ও ইহসান। ইসলামের প্রাথমিক ফোকাস হলো সেই সব কর্মকাণ্ড, যা আল্লাহর বিধানের (শরিয়াহ) সাথে সম্পৃক্ত। ইসলাম শরিয়াহর ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শরিয়াহ মানে কেবল বিধিবিধান বা আইন-কানুন নয়।
শরিয়াহর আভিধানিক অর্থ হলো-কোনো গর্তকে পানি দিয়ে পূরণের পথ। এ অর্থে শরিয়াহর মানে হলো-মানুষকে সেই পথ দেখানো, যে পথ তাকে অজ্ঞতার মরুভূমি থেকে ঈমানের মরূদ্যানের দিকে নিয়ে যায়।
শরিয়াহকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হলো-ইসলামের স্তম্ভগুলোর অনুশীলনসংক্রান্ত বিধান। দ্বিতীয়টি হলো-মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের বিধান। যদিও শরিয়াহর অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা রয়েছে, তবুও শরিয়াহর মৌলিক কয়েকটি নীতিমালা হলো-দ্বীনের সংরক্ষণ, জীবনের পবিত্রতার সুরক্ষা, জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার প্রতিপালন, পরিবারের পবিত্রতার সংরক্ষণ এবং সম্পদের সুরক্ষা।
শরিয়াহর ভিত্তি হলো কুরআন, রাসূল (সা)-এর হাদিস এবং যুগে যুগে জন্ম নেওয়া ইসলামের প্রথিতযশা আলিমগণের ব্যাখ্যা, যাদের পরস্পরের ব্যাখ্যার মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। তবে সকল আলিমের উদ্দেশ্য একটাই আর তা হলো-যা কিছু ভালো তা গ্রহণ করা এবং যা কিছু মন্দ তা পরিত্যাগ করা। শরিয়াহ হলো একটি ফ্লাশলাইটের মতো, যা আমাদের সংশয় ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে সোজা পথ প্রদর্শন করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে-আমরা যেমন মানচিত্র অনুসরণ করি; কিন্তু মানচিত্রের ইবাদত করি না, তেমনি আমরা শরিয়াহ অনুসরণ করি, কিন্তু শরিয়াহর ইবাদত করি না। শরিয়াহ হলো আল্লাহর বিছিয়ে দেওয়া পথ, যে পথ ধরে চললে আমরা পথভ্রষ্ট ও বিচ্যুত হব না।
ইসলামের যাত্রা শুরু হয় আল্লাহর নির্দেশের প্রতি বাহ্যিক ও শারীরিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে!
'ইসলাম হলো এই সাক্ষ্য দেওয়া-আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, নামাজ পড়া, যাকাত প্রদান করা, রমজান মাসে রোজা রাখা এবং সামর্থ্য থাকলে হজ করা।' [৯৭]
ইসলাম শব্দটির অর্থ হলো-আত্মসমর্পণ করা, নিজেকে নিবেদন করা। ইসলাম শব্দটি এসেছে তিন বর্ণের ধাতু সিন-লাম-মিম থেকে, যার অর্থ হলো-কল্যাণ, সম্পূর্ণতা, স্বাধীনতা, শান্তি ইত্যাদি। আভিধানিক অর্থে ইসলাম শব্দের অর্থ হলো-শান্তির প্রতি আত্মসমর্পণ। কারণ, যখন আমরা দাস হিসেবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি, কেবল তখনই কুপ্রবৃত্তির শৃঙ্খল থেকে স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করি।
আত্মসমর্পণের মানে কোনো কিছু দেওয়া বা পরিত্যাগ করা বা হারানো নয়; বরং এর মানে হলো-আল্লাহ আপনার জন্য যা লিখে রেখেছেন, সন্তুষ্টচিত্তে, কৃতজ্ঞতা ও পূর্ণ আস্থা নিয়ে তার সাথে একাত্ম হওয়া। কেননা, 'আল্লাহ সর্বোত্তম কৌশলী (সূরা আলে ইমরান: ৫৪)।' আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের যাত্রা শুরু হয় আমাদের সেই চেতনা দিয়ে, যে চেতনা সন্তুষ্টচিত্তে এ স্বীকৃতি দেয়-আমাদের দেওয়া প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার।
'যা কিছু তোমার, তা তোমার কাছে পৌঁছাবে; যদিও তা দুই পর্বতের নিচে লুকায়িত থাকে। যা কিছু তোমার নয়, তা তোমার কাছে পৌঁছাবে না; যদিও তা তোমার দুই ঠোঁটের মাঝখানে থাকে।' -ইমাম আল গাজালি
আল্লাহই সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী-এটিকে পূর্ণভাবে বিশ্বাস করার মানে এই নয় যে, আমরা নিজেকে উন্নত পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা বন্ধ করে দেবো। রাসূল বলেছেন-'আল্লাহর ওপর ভরসা করো, কিন্তু তোমার উটটি বেঁধে রাখো।' [৯৮] এর মানে হলো-আমাদের আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধিকে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে, দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বান্তকরণে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মহানবি স্পষ্টভাবে নিপীড়কের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলেছেন-
'যদি কোনো অন্যায় হতে দেখ, তাহলে তোমার হাত দিয়ে তা বদলে দাও। যদি তা করতে সক্ষম না হও, তাহলে নিজ জিহ্বা দিয়ে তার প্রতিবাদ করো। যদি তাও করতে না পারো, তাহলে মন থেকে তার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করো এবং এটি হলো ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।' [৯৯]
আল্লাহর ওপর নির্ভর করা ও আত্মসমর্পণ করার মানে এই না যে, আমরা ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের কাজ বন্ধ করে দেবো, সকল প্রচেষ্টা থেকে নিজের হাত গুটিয়ে নেবো; বরং এর মানে হলো-এমন দৃঢ় বিশ্বাস লালন করা যে, আমাদের গৃহীত পদক্ষেপের ফলাফল সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর। আত্মসমর্পণের মাধ্যমে কোনো জিনিস কেমন হওয়া উচিত ছিল-সে চিন্তা আমরা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলি। কেননা, যা কিছু ঘটে, তা তো আল্লাহর সিদ্ধান্তে ঘটে থাকে। ফলে সংঘটিত কোনো কিছু নিয়ে আমাদের মনে আর কোনো খেদ থাকে না। এটাই আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা।
আপনার আত্মসমর্পণের মানে হলো, আপনি এমন এক বালুকণা, যা পাহাড়ে পরিণত হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ অথবা এমন এক বৃষ্টির ফোঁটা, যা সমুদ্রে পরিণত হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ।
ঈমান: বিশ্বাসের পথে যাত্রা
ইসলাম কর্মের জগৎ নিয়ে কাজ করে, কিন্তু ঈমান কাজ করে আল্লাহ ও পরকাল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানগত অনুধাবন নিয়ে। ইসলামের অবস্থান বাহ্যিক, দৃশ্যমান ও স্পষ্ট। ঈমানের অবস্থান অভ্যন্তরীণ, অদৃশ্য ও গোপনীয়। ঈমান হলো ইবাদতের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য। ঈমান হলো আমাদের হৃদয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব ও প্রজ্ঞার চর্চা, যা আমাদের বাহ্যিক কর্মকে মহিমান্বিত করে। ঈমান আল্লাহর ভালোবাসার জন্য আমাদের হৃদয়ের দরজাকে উন্মুক্ত করে দেয়।
'আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, বিচার দিবস এবং ভালো ও মন্দ ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার নাম ঈমান।' [১০০]
ঈমান হলো অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের নাম ঈমান। ঈমান মানে আন্তরিকভাবে এই বিশ্বাস লালন করা—আল্লাহ আমার জন্য যা কিছু ঠিক করে রেখেছেন, সেটা তাঁর রহমত হোক বা পরীক্ষা হোক, তা আমাকে নিয়ে আল্লাহর মহাপরিকল্পনারই একটি অংশ মাত্র। আল্লাহর প্রতি ভরসার ওপর ভিত্তি করে আমাদের ঈমানের বীজ বিকশিত হয়। আল্লাহর জিকির ও ধ্যানের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঈমানের বীজে পানি সিঞ্চন করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, আমরা কুরআনের এই আয়াতটি বারবার পড়তে পারি: 'হাসবুনাল্লাহি ওয়া নি'মাল ওয়াকিল (সূরা আলে ইমরান: ১৭৩)।' যার অর্থ—'আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।' এই জিকিরটিকে নিয়মিত অনুশীলন করলে আমাদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসা ও নুরকে ধারণ করার জন্য ক্রমেই প্রশস্ত হতে থাকবে এবং ফলে আমাদের ভেতরে ঈমানের বীজের পরিচর্যার কাজও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে।
ইসলামের প্রাজ্ঞ মনীষীরা বলেছেন—'ঈমানের অর্ধেক হলো ধৈর্য, অপর অর্ধেক হলো কৃতজ্ঞতা।' ঈমানের পরিচর্যার জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন। কেননা, অনেক সময় আল্লাহর ইচ্ছার পূর্ণ প্রকাশ ঘটতে সময় লাগে। ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ঐকান্তিক নির্ভরতা আমাদের আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়। কারণ, যখন আমরা অনুভব করতে পারি-আল্লাহ সব সময় আমাদের কল্যাণ চান, তখন আমাদের হৃদয় এমনিতেই কৃতজ্ঞতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ঈমানের মানে হলো-এই বিশ্বাস করা, আমরা হয়তো ভবিষ্যৎ জানি না, কিন্তু আল্লাহকে তো জানি। ঈমানের ঘোষণার মধ্যে এই বার্তা লুকিয়ে আছে-যদিও আমরা জানি না আগামীকাল কী ঘটবে, কিন্তু এটি ঠিকই জানি, আগামীকালও আল্লাহ থাকবেন; যেমনটি অতীতে তিনি ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি আছেন এবং আমাদের অবিরত রক্ষা করে চলেছেন।
'তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহ তায়ালার ওপর নির্ভরশীল হতে, তাহলে পাখিদের যেভাবে রিজিক দেওয়া হয়, সেভাবে তোমাদেরও রিজিক দেওয়া হতো। পাখিরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যাবেলা ভরা পেটে ফিরে আসে।' [১০১]
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে তিনি পথ প্রদর্শন করেন।' সূরা আশ-শূরা: ১৩
ঈমানের চর্চার যাত্রা শুরু হয় আল্লাহর কাছে তাঁর ভালোবাসা অনুভবের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ তাকেই কেবল পথ প্রদর্শন করেন, যাকে তিনি পথ দেখাবেন বলে ইচ্ছা করেন এবং যে আল্লাহর কাছে পথের দিশা চায়। আমাদের ঈমানের সামনে আল্লাহ নন; আমাদের কুপ্রবৃত্তিই প্রধান বাধা। আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এ কারণে যে, আমরা আল্লাহর ওপর নয়; নিজের কিংবা অপর কোনো মানুষের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করি।
ঈমানের পরিচর্যা করতে হলে আমাদের লক্ষ করতে হবে যে, আমরা অতীতের পক্ষপাতমূলক অনুধাবন, বর্তমানের অসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং অজানা ভবিষ্যতের ভিত্তিতে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'আর তোমাদের অতি সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।' সূরা বনি ইসরাইল : ৮৫
যেহেতু আল্লাহর জ্ঞান সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে, সেহেতু তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সবকিছু জানেন। আমরা যখন এ কথা উপলব্ধি করতে পারি, আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় আমাদের জ্ঞান অতি সামান্য, তখন অবধারিতভাবেই আমরা আল্লাহর নির্ভুল জ্ঞানের কাছে নিজের তুচ্ছতাকে অনুভব করতে পারি। ঈমান এমনিতেই বিকশিত হয় তখন, যখন আমরা কুপ্রবৃত্তির দেয়ালকে সরাতে সক্ষম হই। ঈমান এমন কিছু নয়-যাকে খুঁজে পেতে হয়; বরং ঈমান হলো এমন কিছু, যা বিকশিত হওয়ার অপেক্ষায় আমাদের ভেতরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে।
আমার যখন এই স্বীকৃতি দিই-আল্লাহ আমার জন্য যা করেছেন, তা আমার ভালোর জন্যই করেছেন, তখন আমাদের ঈমান বেড়ে উঠতে শুরু করে। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এ কথা বলতে শিখিয়েছেন-
'আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই, তাঁর ওপরই আমি ভরসা করি, তিনি হলেন মহান আরশের মালিক।' সূরা তাওবা : ১২৯
হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা শুরু করলেই কেবল ঈমান তার স্বরূপে বেড়ে উঠতে শুরু করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ একদল বেদুইনের ঈমান সম্পর্কে বলেছেন-
'বেদুইনরা বলল-আমরা ঈমান এনেছি। বলো-তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো-আমরা আত্মসমর্পণ করেছি। আর এখন পর্যন্ত তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি।' সূরা হুজুরাত : ১৪
কুরআনের এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, বাহ্যিক ঘোষণা দিলেই কেবল ঈমান আনা হয় না। অন্তর থেকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সর্বান্তকরণে সঁপে দিলেই কেবল ঈমানের বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। আন্তরিকতাপূর্ণ হৃদয় ও ভালোবাসাহীন অন্তর ছাড়া আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করলে তা যেমন নিষ্ফল হয়ে যায়, তেমনি কেউ যদি বলে যে সে আল্লাহকে ভালোবাসে, কিন্তু আল্লাহ যা করতে বলেছেন তা করতে অস্বীকার করে, তাহলেও এটি তার কপট চরিত্রের পরিচায়ক হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের বাহ্যিক কর্মকাণ্ড আমাদের ভেতরের প্রকৃত অবস্থার লিটমাস টেস্ট, আবার ভেতরের অবস্থা বাহ্যিক কাজের লিটমাস টেস্ট। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, আধ্যাত্মিকতার পথে আমাদের ভ্রমণের মধ্যে চড়াই-উতরাই ও আপ-ডাউন থাকে। আমাদের নিশ্বাস যেমন বেরিয়ে যায় আবার প্রবেশ করে এবং সমুদ্রের ঢেউ যেমন ফুলে উঠে আবার পড়ে যায়, তেমনি আমাদের ঈমানেরও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। প্রতিটি পাহাড়ের একটি পাদদেশ ও একটি শীর্ষবিন্দু থাকে। আপনি যতদিন জীবিত আছেন, আপনার ঈমানের যাত্রাপথেও তেমনি চূড়া ও খাদ থাকবে। আপনার ঈমান যদি চির অপরিবর্তিত থেকে যায়, তাহলে ধরে নেবেন-আপনি আল্লাহর সঙ্গে যথার্থভাবে একাত্ম হতে পারেননি। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমাদের ঈমানের পরীক্ষা নেওয়া হবে।
'লোকেরা কি মনে করে, "আমরা ঈমান এনেছি” বললেই তাদের অব্যাহতি দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?' সূরা আনকাবুত : ২
মুসলিম হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো ঈমানের ঘোষণা। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আপনার বিশ্বাসকে কর্মে পরিণত না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি প্রকৃত অর্থে ঈমানদার নন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'প্রত্যেকের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার কৃতকর্ম অনুসারে।' সূরা আহকাফ : ১৯
ঈমান এমন কোনো জিনিস নয়, যেটিকে ব্যাংকের লকারে তালাবদ্ধ করে রাখা যায়। ঈমান আবদ্ধ ও স্থির কোনো বস্তু নয়; বরং এটি জীবন্ত ও নদীর মতো প্রবহমান। আল্লাহ যেমন অসীম, ঈমানের পথে যাত্রাও তেমনি সীমাহীন। ঈমানের পথে যাত্রার দুটি বিধান হলো: শুরু করুন এবং চলতে থাকুন।
দুনিয়াতে এমন কোনো সীমারেখা নেই, যেটি স্পর্শ করলে ঈমানের যাত্রা শেষ বলে গণ্য হয়। এমন কোনো লক্ষ্যবিন্দু নেই, যেখানে পৌঁছলে সামনে এগোনোর জন্য কোনো প্রচেষ্টার প্রয়োজন নেই। একজন বডিবিল্ডার যেমন ব্যায়াম বন্ধ করে দিলে তার মাংশপেশি হারাতে থাকে, (যা সে দীর্ঘ সময় ধরে অর্জন করেছিল) তেমনি ঈমানের চর্চা বন্ধ করে দিলে ঈমানও দুর্বল হতে থাকে। শরীর গঠনের জন্য যেমন কোনো জাদুকরি ওষুধ নেই-যা খেলে আপনাআপনি শরীর সুগঠিত হয়ে যাবে, ঈমানকে শক্তিশালী করারও তেমনি কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই।
ইসলামের পথে যাত্রা শুরুর মানে এই না যে, আপনাকে সম্পূর্ণ নির্ভুল হতে হবে। ইসলামের পথে যাত্রা শুরুর মানে হলো, আল্লাহর সামনে নিজ ভুলের স্বীকৃতি দেওয়া। যখন আপনি বুঝবেন-আপনার ত্রুটির কারণেই আপনি আল্লাহর ভালোবাসা অনুভব করতে পারছেন না, তখন আপনি এও বুঝবেন যে, আপনার মানবীয় বৈশিষ্ট্য ও ত্রুটি প্রবণতার মধ্য দিয়েই আল্লাহ আপনাকে তাঁর দিকে ডাকছেন। হৃদয়ের কারিগরের দেখা পেতে হলে কখনো কখনো হৃদয়ের ভেতর ফাটল সৃষ্টি হওয়া উচিত। ডাক্তারের দেখা পেতে হলো তো অসুস্থ হওয়া চাই। আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করবেন না, তিনি আপনাকে ভুলে যাবেন না; বরং আপনার রব আপনার দুঃখ-ক্লেশ ও সংগ্রামের মাধ্যমেই আপনাকে তাঁর দিকে ডেকে চলেছেন।
ঈমান শব্দটির আভিধানিক অর্থ 'বিশ্বাস' বলা হলেও এটির আমানা মূল শব্দ থেকে, যার অর্থ কোনো কিছুকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত করা। এ দৃষ্টিতে ঈমানের মানে হলো-আল্লাহর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ভেতর নিজের অবস্থান নিশ্চিত করা।
আলি বলেছেন-
'ঈমান হলো জিহ্বা দিয়ে স্বীকৃতি, হৃদয় দিয়ে নিশ্চিতকরণ এবং শরীর দিয়ে কাজে প্রমাণের নাম।'
শুধু বিশ্বাসের পরোক্ষ ঘোষণা নয়; বরং শারীরিক কাজের প্রত্যক্ষ প্রমাণের মাধ্যমে ঈমান নিশ্চিত হয়। প্রকৃত ঈমানের প্রকাশ ঘটে মানুষের সেই আচরণের মাধ্যমে, যা সে কেবল স্রষ্টাকেই নয়, বরং মানুষকেও উপহার দেয়।
'তোমাদের মধ্যে সেই লোকই শ্রেষ্ঠ, যে অপর লোকদের কল্যাণে কাজ করে।' [১০২]
আমরা যতই দুনিয়াতে আল্লাহর বিধান মেনে চলব, আমাদের ঈমানের ধারণক্ষমতা ততই বৃদ্ধি পাবে। ইসলাম ছাড়া যেমন ঈমানকে ধারণ করা যায় না, তেমনি ঈমান ছাড়া ইসলাম হলো একটি প্রাণহীন শরীর। ইসলাম বা বাহ্যিক আনুগত্য এবং অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস বা ঈমান একে অপরকে শক্তিশালী করে; একটি ছাড়া অপরটির কোনো মূল্য নেই।
মোল্লা নাসিরুদ্দিনের একটি ঘটনায় আমাদের হৃদয়ের ভেতর ঈমানের মণি-মুক্তা বহন করার বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
এক রাতে মোল্লা নাসিরুদ্দিন তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তার আলোর নিচে হাঁটু গেড়ে কী যেন খুঁজছিলেন। কয়েকজন প্রতিবেশী এ দৃশ্য দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল- 'আপনি কী খুঁজছেন এখানে?' মোল্লা নাসিরুদ্দিন জবাবে বললেন-'আমার চাবি হারিয়ে গেছে, সেটাই এখানে খুঁজছি।' লোকেরা তাঁর সাহায্যে এগিয়ে এলো। সবাই মিলে চাবি খুঁজতে লাগল, কিন্ত চাবি খুঁজে পাওয়া গেল না। অবশেষে একজন মোল্লাকে জিজ্ঞেস করল-'শেষ যখন চাবিটি দেখেছিলেন, তখন সেটি কোথায় ছিল?' মোল্লা জবাবে বলল-'আমার বাড়িতে।' লোকগুলো মোল্লার জবাব শুনে থমকে গেল। একজন জিজ্ঞেস করল-'তাহলে এখানে বাড়ির বাইরে চাবি খুঁজছেন কেন আপনি?'
মোল্লা জবাবে বললেন-'কারণ, এখানে আলো আছে। আমার বাড়ি এখন রাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত।' প্রতিবেশীরা এ কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল। এবার মোল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন-'যে চাবি আপনার ভেতরেই আছে, সেটি খোঁজার জন্য কেন আপনি দুনিয়ায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? যে প্রশ্নের উত্তর আপনার হৃদয়ের ভেতর রয়েছে, তার সন্ধানে দুনিয়াতে বেরিয়ে পড়ার কোনো মানে হয় না। প্রশ্ন ও উত্তর উভয়ের উৎস একই জায়গা। আপনি সাহস করে ভেতরে ডুব দিয়েই দেখুন, অনেক চাবি ও মূল্যবান মণি-মুক্তো আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।'
আমরা যা চাই, তা আমাদের ভেতরেই রয়েছে। এটি বাহ্যিক দুনিয়াতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেমনটি রুমি বলেছেন- 'কেন তুমি সব দরজায় টোকা দিয়ে চলেছ? যাও, নিজের হৃদয়ের দরজায় টোকা দাও।'
ইহসান: সর্বত্র আল্লাহর দর্শন
আমাদের বাহ্যিক ইবাদতের (ইসলাম) সাথে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস (ঈমান) যথার্থভাবে যুক্ত হলে আমরা ইহসানের রহস্যময় জগতে প্রবেশ করি। ইহসানকে আধ্যাত্মিকতার উচ্চতর পর্যায় বলা হয়। যখন আমরা আমাদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় অংশকে যুগপৎভাবে উন্নত অবস্থানে নেওয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করি, তখনই কেবল ইহসান অর্জন করতে পারি এবং সর্বত্র এক আল্লাহর উপস্থিতিকে অনুভব করতে পারি।
এটি তখনই ঘটে, যখন আমাদের কুপ্রবৃত্তির সূর্য অস্ত যায় এবং আত্মার সহজাত সৌন্দর্যের সূর্যের উদয় হয়। ইহসান সম্পর্কে রাসূল বলেছেন-
'এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তাহলে যেন তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন।' [১০৩]
আধ্যাত্মিকতার উন্নততর স্তরের আমাদের দৃষ্টি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু আমাদের ত্রুটি প্রবণতা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়ার মানে হলো- আমরা সেই আল্লাহর ওপর নির্ভর করছি, যার দৃষ্টি ত্রুটিপূর্ণ নয় এবং যিনি সর্বাবস্থায় আমাদের দেখতে পাচ্ছেন। আপনি তখনই ইহসানের পর্যায়ে আছেন বলে বুঝতে পারবেন, যখন আল্লাহর সর্বত্র বিরাজমান ভালোবাসার প্রতি সার্বক্ষণিক সচেতন থাকতে সক্ষম হবেন। যখন আমরা অনুভব করতে পারি- আমরা আল্লাহকে দেখতে না পেলেও তিনি ঠিকই আমাদের দেখতে পাচ্ছেন, তখন মূলত আমরা এই স্বীকৃতি দিই-আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ ও ভালোবাসা মূলত তাঁর সর্বদ্রষ্টা (আল বাসির) গুণেরই অনিবার্য ফল।
ইহসানের স্তরের অনুগ্রহপ্রার্থী যেন এক দয়ার্দ্র বাদশাহর বিশ্বস্ত গোলাম, যে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলে হিসাব করে, প্রতিটি কথা বলে ভেবে-চিন্তে, বাদশাহর প্রাসাদে আমন্ত্রণ পেয়ে যার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে আসে, ফলে সে প্রতিটি কাজকে সর্বোচ্চ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা করে। আভিধানিকভাবে ইহসান মানে হলো- 'কোনো কিছুকে সুন্দর করা'। আমরা যখন আল্লাহর সর্বব্যাপী কল্যাণময়তার বিষয়টি ঠিকমতো অনুধাবন করতে পারি, তখন আমরা আল্লাহর সৌন্দর্যের প্রতিফলন ঘটানোর জন্য যোগ্য হয়ে উঠি।
ইহসান হলো কল্যাণময়তার সেই স্তর, যেখানে মানুষ সৃষ্টিজগতের কারও ওপর নির্ভরশীলতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে যায়। যারা ইহসানের স্তরে উন্নীত হয়। তারা বিশ্বজগতের সবকিছুকে দেখে স্রষ্টার প্রতিফলন হিসেবে।
একজন মুহসিন (যিনি ইহসান স্তরে রয়েছেন) পথের দিশা পাওয়ার উদ্দেশ্যে নামাজ ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরতে থাকেন এবং সৃষ্টির সেবা করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন।
অষ্টম শতকের বিশিষ্ট সাধক ও রাসূল (সা)-এর বংশধর জাফর আস-সাদিক (রহ.) তাঁর ছাত্রদের বলতেন- 'মানুষ তিন রকমভাবে আল্লাহর ইবাদত করে। একদল লোক আল্লাহর শাস্তির ভয়ে তাঁর ইবাদত করে; এটি হলো দাসের ইবাদত। আরেক একদল লোক পুরস্কারের আশায় আল্লাহর ইবাদত করে; এটি হলো ব্যবসায়ীর ইবাদত। আরেক একদল লোক ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা থেকে আল্লাহর ইবাদত করে, এটি হলো মুক্ত ইবাদত এবং এটিই শ্রেষ্ঠ ইবাদত।' যখন আমরা আল্লাহর ভালোবাসায় উদ্বেলিত হয়ে তাঁর ইবাদতে মগ্ন হতে পারব, কেবল তখনই আমাদের ইবাদত আমাদের সমগ্র সত্তায় প্রবাহিত হবে। আধ্যাত্মিকতার এই পর্যায়টি হলো ইহসান।
ইসলামের ফোকাস হলো আমাদের বাহ্যিক কর্মকাণ্ডের ওপর, ঈমানের ফোকাস হলো আমাদের হৃদয়ের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের ওপর, কিন্তু ইহসানের ফোকাস হলো আমাদের সংকল্পের ওপর। যা কিছুই আমরা করি না কেন, তা হতে হবে আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালোবাসা থেকে উৎসারিত। যেমনটি মহানবি বলেছেন-'প্রতিটি কাজের প্রতিদান দেওয়া হবে কাজটির পেছনের সংকল্পের ভিত্তিতে।' [১০৪] এ কথাটির অর্থ হলো-আমাদের সংকল্প যত আন্তরিক ও পবিত্র হবে, আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আমাদের আত্মসমর্পণও তত মূল্যবান হিসেবে গণ্য হবে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
'যে নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেছে, সে সৎকর্মশীল (মুহসিন), তার জন্য রয়েছে তার রবের নিকট প্রতিদান। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।' সূরা বাকারা: ১১২
দুনিয়াতে না পাওয়ার দুঃখ ও ভবিষ্যতের ভয় আমাদের জীবনকে গ্রাস করে এবং আল্লাহর পথে এগোতে বাধা দেয়। দুনিয়াতে একজন মুহসিন যেহেতু আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে দেয় এবং আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করে জীবনযাপন করে, সেহেতু মৃত্যুপরবর্তী জীবনে তাকে কোনো দুঃখ ও ভয় স্পর্শ করবে না।
ইসলামের প্রকাশ ঘটে বস্তুগত জগতে, ঈমান অবস্থান করে হৃদয়ে এবং ইহসান কাজ করে আধ্যাত্মিক মাত্রায়। আরও সহজ করে বলতে গেলে- ইসলাম হলো এমন কাজ, যা চোখ দিয়ে দেখা যায়। ঈমান হলো এমন বিশ্বাস- যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। আর ইহসান হলো বাহ্যিকতা ও অভ্যন্তরীণতাকে ছাড়িয়ে আল্লাহর ভালোবাসার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়ার নাম।
টিকাঃ
৯৬. আল্লাহর ঋণ পরিশোধ এককালীন কোনো ঘটনা নয়। আল্লাহর পথে ধারাবাহিকভাবে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। কেননা, আল্লাহর ততখানি ইবাদত আমরা কখনোই করতে পারব না, তাঁর ঋণ পরিশোধের জন্য যতখানি ইবাদত আমাদের করা উচিত।
৯৭. বুখারি, মুসলিম
৯৮. তিরমিজি
৯৯. মুসলিম
১০০. মুসলিম
১০১. তিরমিজি
১০২. দারে কুতনি
১০৩. বুখারি
১০৪. বুখারি, মুসলিম
📄 তওবা : ক্ষমা প্রার্থনা এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসা
আর তোমরা তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁরই নিকট ফিরে এসো। নিশ্চয়ই আমার রব পরম দয়ালু, অতীব স্নেহময়। সূরা হুদ: ৯০
হে আদমসন্তান! আমাকে বেশি বেশি করে ডাকো এবং আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো এবং কিছু মনে করব না। হে আদমসন্তান! তোমার পাপ যদি আকাশের মেঘ পর্যন্ত পৌঁছে যায় আর আমার কাছে ক্ষমা চাও, তবুও তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। এমনকী যদি এক পৃথিবী সমান পাপ নিয়েও আমার কাছে আসো এবং এমন অবস্থায় আসো—তুমি আমার সাথে কাউকে শরিক করোনি, তাহলে তোমার সামনে আমি এক পৃথিবী সমান ক্ষমা নিয়ে হাজির হব। [১০৫]
আমরা যতই নষ্ট হয়ে যাই না কেন, আল্লাহর কাছ থেকে যত দূরেই চলে যাই না কেন, অতীতে যা-ই করে থাকি না কেন, আমাদের পাপের বোঝা যত ভারীই হোক না কেন, আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমা ও অনুগ্রহ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তওবার চর্চা আমাদের জন্য দেওয়া আল্লাহর সবচেয়ে বড়ো উপহার। তওবা শব্দের অর্থ অনুশোচনা হলেও শব্দটির আভিধানিক অর্থ- ফিরে আসা। তওবা হলো প্রত্যাশার সাথে এ কথা স্মরণ করা-আমাদের অমর আত্মা পার্থিব কোনো ভুলের মাধ্যমে বিকৃত হতে পারে না।
আমরা যখন ক্ষমা প্রার্থনার জন্য আল্লাহর দিকে ফিরি, তখন আমাদের হৃদয় সেই অবস্থানে চলে যায়, পাপের কারণে যে অবস্থানের ওপর আবরণ পড়ে গিয়েছিল। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'চক্ষু অন্ধ হয় না; বরং বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়ে যায়।' সূরা হজ: ৪৬
তওবা আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে দেয়, যাতে আল্লাহর নুর সেখানে প্রবেশ করতে পারে। তওবা আমাদের ভেতরে ঐশী অন্তর্দৃষ্টি এনে দেয়। ফলে আমাদের চেতনার দৃষ্টি সৃষ্টিজগৎ থেকে সরে এসে আল্লাহর ভালোবাসার প্রতি নিবদ্ধ হয়।
আমরা যখন আন্তরিকভাবে তওবা করি, তখন আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাই এবং আমাদের পাপগুলো আল্লাহর অনুগ্রহ দিয়ে মুছে দেওয়ার প্রার্থনা জানাই। অর্থাৎ তওবা আমাদের আল্লাহর অনুগ্রহ ও ভালোবাসার সাথে যুক্ত করে দেয়।
ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহর পথনির্দেশের শুরু ও সমাপ্তি
মানুষের প্রথম প্রার্থনা ছিল আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। আদম ও মা হাওয়া (আ) যখন নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেলেন এবং বুঝতে পারলেন তাঁরা ভুল করেছেন, তখন প্রার্থনা করলেন-
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন আর দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।' সূরা আ'রাফ: ২৩
আল্লাহ তাঁদের ডাকে সাড়া দিলেন এবং তাঁদের ক্ষমা করে দিলেন। কুরআনে বিষয়টি এভাবে এসেছে-
'অতঃপর আদম তাঁর রবের পক্ষ থেকে কিছু বাণী পেল, ফলে আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করলেন। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী, অতি দয়ালু।' সূরা বাকারা: ৩৭
মানব সৃষ্টির সূচনা থেকে আমাদের যে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে, তা হলো- আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং পরকালের বিচার দিবসেও আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাই করব। জান্নাতে প্রবেশের সময় আমরা এভাবে প্রার্থনা করব-
'হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।' সূরা আত-তাহরিম : ৮
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই; বরং আল্লাহ চান, আমরা যেন তাঁর কাছে ক্ষমা চাই।
'তোমার যে ভালো কর্ম তোমাকে অহংকারী করে, তার চেয়ে হাজারগুণ ভালো তোমার সেই মন্দ কর্ম, যা জন্য তোমাকে অনুতপ্ত করে।' -আলি (রা)
ক্ষমা প্রার্থনার আরবি হলো ইস্তেগফার এবং এটি 'আল মিগফার' শব্দের সাথে সংশ্লিষ্ট, যার অর্থ-ক্ষতিকর কোনো কিছু থেকে মাথা ঢেকে রাখা। অন্য কথায়, ইস্তেগফার আপনার পাপগুলোকে আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহ দিয়ে ঢেকে রাখে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তুমি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না এবং যখন তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে-এরূপ অবস্থায়ও আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না।' সূরা আনফাল : ৩৩
আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা আমাদের কৃতকর্মের পরিণাম থেকে আল্লাহর সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ইস্তেগফার কেবল পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাই নয়; বরং আমরা যথেষ্ট ইবাদত করতে পারছি না- সেজন্যও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। মানুষ হিসেবে আমরা আল্লাহর যত ইবাদতই করি না কেন, তা আল্লাহর অনুগ্রহের সাথে তুলনা করলে কোনো মতেই যথেষ্ট নয়। তাই আমরা আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ইবাদতের অসম্পূর্ণতার কারণে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।
'তোমরা কেন আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো না, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও?' সূরা নামল: ৪৬
আমরা যখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, তখন আল্লাহ আমাদের উচ্চতর স্থানে উন্নীত করেন। যেমনটি নুহ (আ) বলেছিলেন-
'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর অনুশোচনাভরে তাঁর দিকেই ফিরে যাও। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের শক্তিকে আরও শক্তি দিয়ে বৃদ্ধি করে দেবেন; আর অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।' সূরা হুদ: ৫২
আমরা যখন ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরি, তখন আল্লাহ জবাবে তাঁর ক্ষমা, করুণা ও দয়ার বৃষ্টি দিয়ে আমাদের সিক্ত করেন। ত্রুটিমুক্ত হয়ে নয়; ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমেই কেবল আল্লাহর অনুগ্রহের সমুদ্রের সন্ধান পাওয়া সম্ভব।
আল্লাহর এককত্বের কাছে ফেরা
আমাদের হৃদয়ের ভেতরে এক আল্লাহর সামনে যে মিথ্যা খোদাগুলোকে আমরা স্থাপন করেছি, ক্ষমা প্রার্থনার মানে হলো- সেগুলোর অপসারণ। আমরা পাপ করি যা কিছু পাওয়ার বাসনা থেকে, তা একমাত্র আল্লাহই আমাদের দিতে পারেন। তাই এক একটা পাপ করার সাথে সাথে আমাদের হৃদয়ে এক একটি মিথ্যা খোদা তৈরি হয়। ক্ষমা প্রার্থনা মিথ্যা খোদাগুলোকে একে একে সরিয়ে দেয়।
আল্লাহ যখন আমাদের কোনো পাপের কথা মনে করিয়ে দেন, তখন এর মাধ্যমে মূলত তিনি আমাদের শাস্তি দেন না; বরং তাঁর দিকে আমাদের আহ্বান করেন। অষ্টম শতকের সাধক রাবেয়া বসরিকে এক লোক প্রশ্ন করেছিল- 'আমি অনেক পাপ করেছি। যদি আমি তওবা করি, আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?'
রাবেয়া বসরি জবাবে বলেছিলেন- 'বিষয়টি এর ঠিক উলটো। আল্লাহ যদি তোমাকে ক্ষমা করেন, তবেই তুমি তওবা করতে সক্ষম হবে।'
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তিনি তোমাদের আহ্বান করেন তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করার জন্য।' সূরা ইবরাহিম: ১০
তওবা অর্থ ফিরে আসা। এর মানে হলো, প্রতিটি মুহূর্তেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। তওবা আমাদের হৃদয়ের ভেতর আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহকে ধারণ করার জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়।
শুরু করুন এখনই
আল্লাহর দিকে ফিরে আসার যাত্রা সেখান থেকে শুরু হয়, যেখানে আমরা আছি। ঈমানে ফিরে আসার জন্য অন্য কোনো যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজন নেই; আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্তিই হলো এর জন্য প্রয়োজনীয় একমাত্র যোগ্যতা। অন্যকথায়, কোনো কিছুই এতখানি ভেঙে যায় না বা এতখানি নষ্ট হয় না যে, সেই আল্লাহ একে শুধরে দিতে বা মেরামত করতে পারবেন না; যিনি জগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-'পানি ময়লাকে বলল, আমার কাছে এসো। ময়লা বলল-আমি লজ্জা পাচ্ছি। পানি বলল-আমি ছাড়া কে আছে তোমার লজ্জা ধুয়ে দেবে?' এমনকী যদি আমরা একই অপরাধ বারবারও করি, তবুও আল্লাহ বারবার তাঁর অনুগ্রহের পানি দিয়ে আমাদের অপরাধগুলো ধৌত করে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। জেনে রাখুন, আপনার পাপের বোঝা যত বড়োই হোক না কেন, তা আল্লাহর করুণার চেয়ে বড়ো নয়।
'হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' সূরা জুমার: ৫৩
মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন- 'শয়তান বলল-"আপনার সত্তার শপথ হে প্রভু! আমি আদমের সন্তানদের বিভ্রান্ত করেই যাব, যতক্ষণ না তাদের আত্মা তাদের শরীর ত্যাগ করবে।” আল্লাহ বললেন- “আমার সত্তা ও গৌরবের শপথ! আমি তাদের ক্ষমা করেই যাব, যতক্ষণ তারা আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে থাকবে। "' [১০৬]
প্রকৃতপক্ষে সে-ই সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগা, যে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনাহীন জীবনযাপন করে। আল্লাহ হলেন 'আফউ' বা ক্ষমাকারী, যাঁর ক্ষমাশীলতা মহাসাগরের চাইতেও বিশাল। তিনি আমাদের পাপের সকল রেকর্ড এমনভাবে মুছে দেন, যেন ওই রেকর্ডে কোনো কালে কিছুই ছিল না।
'তোমার রবের সপ্রশংস তাসবিহ পাঠ করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী।' সূরা নাসর: ৩
যদি আপনি দেখেন-আপনি কুপ্রবৃত্তির সেই প্ররোচনায় আবার পড়েছেন, যে প্ররোচনাকে আপনি আগেই জয় করেছেন বলে ভেবেছিলেন, তাহলে হতাশ হবেন না। ভুল করা ও ফিরে আসার প্রক্রিয়াটি অনেকটা স্পাইরালের মতো। আপনি হয়তো ভাবছেন, আপনি পেছনে চলে গেছেন; কিন্তু আপনি জানেন না, আপনি আরও গভীরে প্রবেশ করেছেন। তওবার চর্চা হলো আপনার ভেতকার এমন আধ্যাত্মিক সংশোধন, যার মাধ্যমে আপনি আপনার হৃদয় ও সংকল্পকে আবার আল্লাহর সাথে যুক্ত করতে পারেন।
অন্তরের কুপ্ররোচনাকে প্রার্থনায় পরিণত করুন
আধ্যাত্মিকতার পথে এগিয়ে যাওয়া ও আল্লাহওয়ালা (মুত্তাকি) হয়ে যাওয়ার মানে এই নয় যে, আমাদের আর পরীক্ষা করা হবে না এবং আমরা আর মনের কুপ্ররোচনার শিকার হব না; বরং বিষয় হলো-আপনি আধ্যাত্মিকতার পথে যতই এগিয়ে যাবেন, অন্ধকার ও পাপ ততই আপনাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে থাকবে। আকাশে নক্ষত্র সব সময় থাকে, কেবল রাতের অন্ধকারেই আমরা সেগুলো দেখতে পাই। কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের ডাক তেমন সব সময়ই বিরাজ করে। কুপ্ররোচনার শিকার হওয়া না হওয়ার মধ্যে আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দা ও আল্লাহর দূরবর্তী বান্দার মধ্যকার পার্থক্য সূচিত হয় না; পার্থক্য সূচিত হয় উভয়ের মনোযোগ নিবদ্ধের স্থান নির্বাচনের মধ্যে।
আমরা যতই আল্লাহর নুরের দিকে ফিরি, আমাদের মনের আকাশ ততই উজ্জ্বল হতে থাকে এবং কুপ্রবৃত্তির নক্ষত্রগুলো ততই নিষ্প্রভ ও বিলীন হতে থাকে। কুপ্ররোচনাকে জয় করার জন্য নিজের ওপর নির্ভর করতে নয়, আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়তে বলা হয়েছে। শয়তান আমাদের ত্রুটি প্রবণতাকে ব্যবহার করে বোঝায় যে, আমরা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য উপযুক্ত নই। তাই মনে রাখতে হবে, আমরা যদি শয়তানের সাথে একা লড়াই করি, তাহলে আমরা সব সময় পরাজিত হব। শয়তানকে পরাজিত করার একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর সাহায্য নেওয়া।
'নিশ্চয়ই যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, শয়তানের স্পর্শে তাদের মনে কুমন্ত্রণা জাগলে তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন তাদের দৃষ্টি খুলে যায়।' সূরা আ'রাফ: ২০১
শয়তানের কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে লড়াই করার পূর্বে আপনার কর্তব্য হলো-আগে আল্লাহর কাছে ধরনা দেওয়া। যখনই আপনি কোনো কুমন্ত্রণা অনুভব করবেন, আপনার মন যখন আপনাকে এমন কোনো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করবে-যা আল্লাহর নির্দেশের লঙ্ঘন কিংবা আপনি যে কাজটি করার সংকল্প করেছেন, কিন্তু আপনি দ্বিধাগ্রস্ত যে কাজটি সঠিক কি না, এমতাবস্থায় সাথে সাথে আল্লাহর কাছে দুআ করুন, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে সুরক্ষা কামনা করুন।
শয়তানের কথাগুলো সাধারণত এমন হয়-তুমি তো যথেষ্ট আল্লাহওয়ালা মানুষ নও... ত্রুটি-বিচ্যুতি তো তোমার হয়েই থাকে... তুমি তো পাপী লোক... কাজটি তেমন বড়ো কোনো পাপের কাজ নয়... একবার শুধু কাজটি করো, পরে কখনো আর এমনটি করো না... আল্লাহ এতে তেমন কিছু মনে করবেন না... তুমি যত খারাপ কাজই করো না কেন, তিনি তোমার কোনো ক্ষতি করবেন না... অতএব, তোমার মন যা চায় তা করো।
আপনি শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব করলে এর বিরুদ্ধে লড়তে যাবেন না কিংবা এর ভেতর ডুবে যাবেন না; বরং আল্লাহর কাছে দুআ করুন এবং লড়াইটা আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিন। শয়তান যদি আপনাকে কোনো কিছুর প্রলোভন দেখায়, আপনার প্রার্থণাকে আরও গভীর করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করুন। শয়তান যদি আপনাকে প্রার্থনা বন্ধ করতে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহকে বলুন, তিনি যেন নামাজে আপনার মনোযোগ বৃদ্ধি করে দেন। শয়তান যদি আপনার ত্রুটিগুলোর কারণে আপনাকে লজ্জা দেয়, তাহলে আল্লাহর কাছে আপনার সংকল্পকে পবিত্র করার সাহায্য প্রার্থনা করুন। শয়তান যখনই আপনার দুর্বল জায়গায় আঘাত হানবে, তখনই আপনি ঈমান মজবুত করার বাসনায় আল্লাহর কাছে আসার চেষ্টা করবেন।
আমরা যখন আল্লাহর নুর থেকে আড়ালে চলে যাই (যেমনটি সূর্যের আলো থেকে পৃথিবী আড়ালে চলে যায়), তখন আমরা আধ্যাত্মিকভাবে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাই। আল্লাহর শাস্তির কারণে অন্ধকার আমাদের গ্রাস করে না। অন্ধকার গ্রাস করে এ কারণে যে, ইচ্ছার স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও আমরা সত্যের আলো থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবশ্য এ অন্ধকার একটি মায়া বা বিভ্রম মাত্র। আল্লাহ আমাদের ফুসফুসের ভেতরের নিশ্বাসের চাইতেও নিকটে অবস্থান করেন।
তওবার সবচেয়ে বড়ো মহিমা হলো তওবার মাধ্যমে পাপগুলো পুণ্যে পরিণত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তারা ছাড়া; যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' সূরা ফুরকান: ৭০
আল্লাহ ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। তিনি চান আমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাই। তওবা হলো আল্লাহর সীমাহীন দয়ার মহাসমুদ্রে প্রবেশের একমাত্র পথ।
'আমাদের প্রতিপালক প্রতিরাতের শেষ তৃতীয়াংশে সর্বনিম্ন আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন- “কে আছ আমাকে ডাকার, যার ডাকে আমি সাড়া দেবো? কে আছ আমার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার, যা আমি তাকে দান করব? কে আছ আমার ক্ষমা চাওয়ার, যাকে আমি ক্ষমা করব?” [১০৭]
আল্লাহর দিকে ফেরা
আমরা যখন তওবা করি, তখন আমরা একদিকে আমাদের পাপসমূহ থেকে ফিরে আসি এবং অন্যদিকে আল্লাহর সরল-সঠিক পথের সাথে নিজেকে একাত্ম করে দিই। আমাদের অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে, তবে সাথে সাথে অবশ্যই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে যেতে হবে।
'আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।' সূরা রা'দ: ১১
পাপ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর নুরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে সবকিছুই বদলে যায়। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন-
'যে দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যার সৃষ্টি, একই দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটির সমাধান অসম্ভব।'
তওবা আমাদের হৃদয়ের অবস্থান বদলে দেয়, আমাদের চেতনাকে নিজের অহং থেকে সরিয়ে আল্লাহর স্মরণের সাথে যুক্ত করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন, ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও।' সূরা বাকারা: ২২২
তওবা পাপের মায়াজাল ছিন্ন করে আমাদের আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ পাইয়ে দেয়।
আল্লাহর ক্ষমার অসীম ক্ষমতা
মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর ক্ষমার একটি বিস্ময়কর ঘটনা তাঁর সাহাবিদের শুনিয়েছেন-
'এক লোক ৯৯ জন মানুষকে হত্যার পর হঠাৎ অনুশোচনা বোধ করল এবং আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ সন্ধান করতে শুরু করল। একজন আলিম ব্যক্তিকে খুঁজে পেয়ে সে তাকে জিজ্ঞেস করল-যদি সে তওবা করে, আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করবেন কি না। আলিম ভুল করে জবাবে বলল-তার ক্ষমা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। লোকটি রাগান্বিত হয়ে তাকেও হত্যা করল।
এরপর লোকটি একজন বিখ্যাত আলিমকে খুঁজে বের করে বলল-সে ১০০ জন মানুষকে হত্যা করেছে, তার কি ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না। আলিম ব্যক্তিটি জানতেন, ওই লোকটির পরিবর্তনের জন্য তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজন। অতএব, সে জবাবে বলল- “তুমি ও তোমার তওবার মাঝে কে আছে? তুমি ওই জায়াগায় যাও, যেখানকার লোকেরা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে। তাদের সাথে যোগ দিয়ে ইবাদত করতে থাকো। আর তোমার নিজ ভূমিতে ফিরে এসো না। কেননা, এ জায়গা নষ্ট হয়ে গেছে।"
লোকটি আন্তরিকভাবে তওবা করল এবং ঈমানদার লোকদের পবিত্র ভূমির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছার আগেই লোকটি মারা গেল। তার মৃত্যুর পর রহমতের ফেরেশতা ও শাস্তির ফেরেশতা উভয়ই এলো এবং তার আত্মা নেওয়ার জন্য বিতর্কে লিপ্ত হলো। রহমতের ফেরেশতা বলল-"লোকটি আল্লাহর কাছে এসেছে তওবাযুক্ত হৃদয় নিয়ে।" শাস্তির ফেরেশতা বলল-“সে তার সারাজীবনে একটি পুণ্যের কাজও করেনি।"
তখন আল্লাহ বিষয়টির মীমাংসা করার জন্য মানুষের বেশে তৃতীয় একজন ফেরেশতাকে সেখানে পাঠালেন। মধ্যস্থতাকারী ফেরেশতা বললেন-“দুটি ভূমির মধ্যকার দূরত্ব মাপো। লোকটির মৃতদেহ থেকে যে ভূমির দূরত্ব কম হবে, সে অনুযায়ী তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে।” ফেরেশতার দূরত্ব মেপে দেখলেন, লোকটির অবস্থান পুণ্যময় ভূমির নিকটে। অতএব, রহমতের ফেরেশতা তার আত্মা নিয়ে গেল (কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে-দূরত্বের পরিমাপ প্রথমে লোকটির বিপক্ষে গিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ দিয়ে লোকটির পক্ষে জমিনকে প্রসারিত করে দিয়েছেন)।' [১০৮]
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-শেষ বিচারের দিবসে যারা অন্যায় করেছে, অপরকে কষ্ট দিয়েছে বা হত্যা করেছে, তাদের ওপর পূর্ণ ন্যায়বিচার করা হবে। উপরিউক্ত ঘটনা থেকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ঠিক হবে না যে, আমরা যা ইচ্ছা করব এবং এরপর পরোক্ষভাবে ক্ষমা চেয়ে নেব; বরং এ ঘটনার শিক্ষা হলো-আমরা যদি আন্তরিকভাবে ফিরে আসি, তাহলে আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহপ্রাপ্ত হব এবং চরম মাত্রার অপরাধ করার পরও আল্লাহর কাছে ফিরে এলে তিনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আরও শিক্ষা হলো, আমাদের মানুষকে আশার আলো দেখাতে হবে, হতাশ করা যাবে না। ভয় দেখিয়ে বা লজ্জা দিয়ে কোনোদিন কাউকে বদলানো যায় না। মানুষকে বদলে দেওয়া যায় তার সামনের পথকে সহজ করে উপস্থাপনের মাধ্যমে। আল্লাহর ভালোবাসা ও প্রেমের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করেই মানুষকে বদলে দিতে হয়।
ইমাম গাজালি বলেছেন-
'ধর্মে মানুষের অবিশ্বাসের অর্ধেক কারণ হলো-সেই সব ধার্মিক মানুষ, যারা নিজেদের ভয়ানক আচরণ ও বিপজ্জনক কথাবার্তার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার প্রতি মানুষের মনে ঘৃণার চাষাবাদ করে চলেছে।'
মানুষের বিচার করা আমাদের কাজ নয়; বরং ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের ভেতরের সম্ভাবনা বিকাশের চেষ্টা করাই আমাদের কাজ।
'সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও বীতশ্রদ্ধ করো না।' [১০৯]
নিজেকে মুক্ত করার জন্য অপরকে ক্ষমা করুন
তওবা মানে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টির কাছেও আল্লাহর দয়া, করুণা, অনুগ্রহ ও ক্ষমার প্রতিবিম্ব হিসেবে ফিরে আসা। আপনি যখন অপরকে ক্ষমা করেন, তখন আপনার আয়নায় একটি ফ্লাশলাইট জ্বলে ওঠে। ফলে যে রহমত আপনি অপরের প্রতি প্রেরণ করছেন, একই রহমত আপনি নিজের জন্যও ফিরে আসছে।
'আর ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো তা দ্বারা, যা উৎকৃষ্টতর। ফলে তোমারও যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে, সে যেন হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।' সূরা হা-মিম সিজদা : ৩৪
ক্ষমা তখনই করা সম্ভব হয়, যখন আপনি মানুষের ভেতকার সহজাত কল্যাণময়তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং মানুষের অসৎকর্মের বিষয়গুলোকে অগ্রাহ্য করে চলেন। যে আপনার সাথে মন্দ আচরণ করেছে, তার প্রতি মন্দ আচরণ উপহার দেওয়া হলো জঙ্গলে জ্বলে উঠা আগুন নেভানোর জন্য সে আগুনে পেট্রোল ঢালার মতো। বিশ্ববিখ্যাত মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন-
'অন্ধকার কখনো অন্ধকার দূর করতে পারে না; একমাত্র আলোই পারে অন্ধকার দূর করতে। ঘৃণা কখনো ঘৃণাকে মিটিয়ে দিতে পারে না; একমাত্র ভালোবাসাই পারে ঘৃণাকে মিটিয়ে দিতে।' [১১০]
ক্ষমা একদিকে অপরকে তার ভুলের খাঁচা থেকে মুক্ত করে দেয়, অন্যদিকে আমাদের নিজেদেরও দোষারোপের কারাগার থেকে মুক্ত করে দেয়। যখন আমরা অপরকে ক্ষমা করে দিই, তখন আমাদের মাথার ওপর চেপে বসা অপরের সীমালঙ্ঘনের বোঝা নামিয়ে দিয়ে হালকা হয়ে যাই।
মহানবি (সা) বলেছেন-
'যে তোমার সাথে মন্দ আচরণ করে, তার সাথে মন্দ আচরণ করো না; বরং তার সাথে ক্ষমাশীলতা ও দয়ার্দ্র আচরণ করো।' [১১১]
এমনকী কেউ যদি ক্ষমা না চায়, 'স্যরি' না বলে কিংবা ক্ষমা চাইলেও তা যদি আন্তরিক না হয়, তবুও তাকে ক্ষমা করতে বলা হয়েছে। এ কারণে ক্ষমা করতে বলা হয়নি যে, তার ক্ষমা প্রয়োজন; বরং এ কারণে ক্ষমা করতে বলা হয়েছে, আমাদের নিজেদের হৃদয়ের শান্তি প্রয়োজন। আমরা যখন অপরকে শান্তি দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে নিজের ভেতর ক্রোধ ও রাগ পুষে রাখি, তখন আমরা অপরের চেয়ে নিজেরই বেশি ক্ষতি করি। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন-'অপরের প্রতি রাগ পুষে রাখার মানে হলো-নিজে বিষ পান করা এবং আশা করা যে, অপর লোকটি মারা যাবে।' অপরকে ক্ষমা করে দেওয়ার মানে হলো-নিজের রাগের শৃঙ্খল থেকে নিজেকে মুক্ত করে দেওয়া। আধ্যাত্মিক পথের বেলায় অপরের প্রতি অনুগ্রহশীল হওয়া হলো আল্লাহর অনুগ্রহ প্রাপ্তির সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন মাধ্যম।
'যে অপরের প্রতি দয়া করে, দয়ময় আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন।' [১১২]
অপরের প্রতি ক্ষমা করার সুযোগ হলো, আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের দেওয়া উপহারস্বরূপ। কেননা, সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য, স্নেহ-মমতা ও দয়াশীলতার গুণাবলি দিয়ে আমাদের তাঁর নিকটস্থ হওয়ার আহ্বান জানান। অপরকে ক্ষমা করলে একদিকে যেমন আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনি বিনিময়ে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়া যায়। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয়, সে পাপ থেকে পবিত্র হয়ে যায়।' সূরা মায়েদা : ৪৫
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যখন আমরা অপরকে ক্ষমা করে দিই, তখন বিনিময়ে আল্লাহ আমাদের সেই সব পাপ ক্ষমা করে দেন, যেগুলো আমাদের হৃদয়কে ভারী করে রেখেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিক? আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল, বড়োই দয়ালু।' সূরা নুর: ২২
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, আল্লাহ আমাদের ন্যায়বিচার চাওয়ার অধিকার দিয়েছেন। তবুও আমাদের সাথে অন্যায় করা হলে আমরা নিজেকে প্রশ্ন করে দেখতে পারি-ক্ষমা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে আমরা নিজেরা আল্লাহর ক্ষমার স্বাদ পাওয়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছি না তো? আল্লাহ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধগুলোকেও ক্ষমা করতে বলেছেন। কেননা, আল্লাহ স্বয়ং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধগুলোকে অবিরতভাবে ক্ষমা করে চলেছেন।
একজন সুফি সাধক বলেছেন- 'ফুলের মতো হও, ফুল সবার কাছে তার সুগন্ধ ছড়িয়ে চলেছে; এমনকী তার কাছেও, যে নিজ হাতে ফুলকে নষ্ট করে।' আমাদের সাথে কেউ অন্যায় করলেও বিনিময়ে আমরা তার প্রতি অন্যায় করব না। কেননা, আল্লাহর প্রেমিক হিসেবে আমাদের আল্লাহর প্রেমের গুণাবলি নির্বিশেষে সকল সৃষ্টির প্রতি প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। ক্ষমা মানে এই নয় যে, আমরা অপরের কাছ থেকে তার দায়িত্ব বুঝে নেব না; বরং ক্ষমা মানে হলো-দয়া, স্নেহ, মমতা ও অনুগ্রহের চর্চা।
সার্বক্ষণিক ক্ষমা প্রার্থনা
মহানবি দিনে বহুবার আসতাগফিরুল্লাহ পাঠ করতেন, যার অর্থ-'আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি।' রাসূল বলেছেন-
'যদি কেউ অবিরতভাবে ক্ষমা চেয়ে থাকে, আল্লাহ তার প্রতিটি হতাশা দূর করার জন্য এবং প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য পথ বের করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। [১১৩]
যদিও আসতাগফিরুল্লাহ হলো ক্ষমা চাওয়ার সবচেয়ে সাধারণ দুআ, তবুও ক্ষমা চাওয়ার আরও একটি গভীর ও সুপরিচিত দুআ রয়েছে। এটি হলো- 'আসতাগফিরুল্লাহিল আজিম আল লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম ওয়া আতুবু ইলাইহি।' এর অর্থ হলো-'আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি, তিনি সর্বশক্তিমান। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী। আমি ক্ষমার জন্য তাঁর দিকেই ফিরে আসি।'
মহানবি বলেছেন-
'আমরা যদি এ দুআ পাঠ করাকে আমাদের অভ্যাসে পরিণত করতে পারি, তাহলে আমাদের পাপগুলো যদি দুনিয়ার সমুদ্রের ফেনারাশির মতো বেশিও হয়, তবুও আল্লাহ তাঁর অসীম রহমত দিয়ে আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। ' [১১৪]
আল্লাহর ভালোবাসার দিকে ফিরে আসা
ক্ষমা প্রার্থনার মানে হলো, আল্লাহর ভালোবাসার পথে ফিরে আসা। ক্ষমার মাধ্যমে আমরা অনুতাপের আগুনে পুড়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তুলি, যাতে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার আমাদের আকৃষ্ট করতে না পারে।
'খাঁটি তওবা হলো-হৃদয় থেকে অনুশোচনা অনুভব করা, জিহ্বা দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং অপরাধটির পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় সংকল্প করা।'
প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে ফিরে আসার এক একটি সুযোগ। রাসূল বলেছেন-
'আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন সত্তরবারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর দিকে ফিরে আসি।' [১১৫]
ক্ষমা প্রার্থনা ও জিকির আমাদের হৃদয়ের আয়নার ওপর পরা মরিচাকে পরিষ্কার করে দেয়। আমাদের হৃদয়ে প্রতিনিয়ত বর্ষিত আল্লাহর সৌন্দর্যকে অবলোকনের সুযোগ করে দেয়। ক্ষমা প্রার্থনার মানে হলো, হৃদয়ের ভার মুক্তি এবং আল্লাহর সীমাহীন করুণার স্বাদ আস্বাদন। এক সুফি-সাধক বলেছেন-
'সমুদ্র কোনো নদীকেই ফিরিয়ে দেয় না। অসীম দয়ার আধার আল্লাহ কী করে পাপীকে ফিরিয়ে দেবেন?'
আল্লাহ এভাবে ক্ষমা চেয়ে শিখিয়েছেন-
'হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন। আর আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।' সূরা মুমিনুন: ১১৮
টিকাঃ
১০৫. হাদিসে কুদসি
১০৬. আহমাদ
১০৭. বুখারি
১০৮. বুখারি, মুসলিম
১০৯. বুখারি
১১০. King, Martin Luther. 'Love Your Enemies.' November 17, 1957, Dexter Baptist Church, 'Dexter Baptist Church'
১১১. বুখারি
১১২. তিরমিজি
১১৩. আবু দাউদ
১১৪. আবু দাউদ, তিরমিজি
১১৫. বুখারি
📄 শাহাদাহ : একত্ববাদের সৌধ
আশহাদু আল্লা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল।
একজন মানুষ মুসলিমে পরিণত হয় যে ঘোষণা দিয়ে, তাকে বলা হয় শাহাদাহ। ইসলামের মহাসমুদ্রে প্রবেশের প্রথম দরজা হলো শাহাদাহ। শাহাদাহ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ার কাঠামো বিনির্মাণ করে। শাহাদাহর প্রথম অংশ হলো সকল মিথ্যা খোদা এবং জগতের সবকিছুর সাথে সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করে আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে সাক্ষ্য দান করা। শাহাদাহর দ্বিতীয় অংশ হলো-মুহাম্মাদ (সা)-কে আল্লাহর রাসূল (বার্তাবাহক) হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করা, যার সারকথা হলো-তাঁর সকল পদক্ষেপকে অনুসরণের সংকল্প করা। যখন কোনো মানুষ হৃদয়ের গভীর থেকে 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল'-ঘোষণাটি দেয়, তখন সে মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঈমান এমন কিছু নয়-যা অর্জনযোগ্য; বরং ঈমান হলো ইতোমধ্যে আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন, তা উন্মোচনের পথে যাত্রা। যে কুফরি করে অর্থাৎ আল্লাহকে মানতে অস্বীকার করে, তাকে বলা হয় কাফির। কাফির শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো এমন ব্যক্তি, যে সত্যকে ঢেকে রাখে। এ অর্থে কৃষক তার বীজ মাটিতে পুঁতে রাখে বলে কৃষককে আরবিতে কাফির বলা হয়। আধ্যাত্মিক অর্থে কাফির হলো সেই ব্যক্তি, যে তার হৃদয়ে থাকা ঈমানের মহামূল্যবান রত্নকে ঢেকে রাখে। পবিত্র কুরআনে শোকর বা কৃতজ্ঞতার বিপরীত শব্দ হিসেবে কুফর ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলাম এবং বলেছিলাম-আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয় আর কেউ অকৃতজ্ঞ (কাফারা) হলে আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।' সূরা লোকমান: ১২
মুসলিমদের কাছে কাফির সে নয়, যে আন্তরিকভাবে সত্যের সন্ধান করে চলেছে; বরং সেই কাফির, যে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও অহংকার, দম্ভ ও অকৃতজ্ঞতার কারণে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করে। অন্যকথায়, কাফিরদের মানসিক অবস্থা হলো মানবীয় স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীত।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো-আপনি কাউকে ইসলাম গ্রহণ করতে বা ইসলামের বার্তাগুলোকে মেনে নিতে বাধ্য করতে পারেন না। ঈমান স্বীকৃতি লাভ করে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীন প্রয়োগের মাধ্যমে। মানুষ যখন তার ইচ্ছার স্বাধীনতাকে পূর্ণভাবে ব্যবহার করে আল্লাহর অস্তিত্ব ও প্রভুত্বকে মেনে নেবে, তখনই সে ঈমানদার বলে বিবেচিত হবে। এ কারণে কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- 'দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো জবরদস্তি (বাধ্যবাধকতা) নেই।' সূরা বাকারা: ২৫৬
জগতের প্রতিটি মানুষ তার হৃদয়ে ঈমানের বীজ বহন করে চলেছে। এই বীজ কীভাবে বেড়ে উঠবে, তা নির্ভর করে আল্লাহ তার জন্য কী পরিকল্পনা করে রেখেছেন এবং সে আধ্যাত্মিকতার পথে কতটুকু চেষ্টা-সাধনা করবে তার ওপর।
'যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, আল্লাহ তার হৃদয়কে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।' সূরা তাগাবুন: ১১
শাহাদাহর প্রথম অংশ
আল্লাহকে বাইরের জগতে খুঁজে বের করা আমাদের কাজ নয়, আমাদের কাজ হলো নিজের ভেতরের দিকে দৃষ্টি দেওয়া এবং আল্লাহ ইতোমধ্যে কতখানি আমাদের নিকটে অবস্থান করছেন, তা স্মরণ করা। শাহাদাহ শব্দের অর্থ কেবল 'সাক্ষ্য দেওয়া' নয়; বরং কোনো কিছুর চাক্ষুষ সাক্ষী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া। এ অর্থে শাহাদাহর মাধ্যমে আমরা রুহের জগতের দৃশ্যমান চাক্ষুষ সাক্ষ্যের ঘোষণা দিয়ে থাকি। [১১৬] আমরা যখন বর্তমানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিই, তার মানে মূলত আমরা রুহের জগতের সেই সাক্ষ্যেরই পুনরাবৃত্তি করি। যখন আমরা বলি-'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তখন আমরা শুধু এ কথাই বলি না যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; বরং এ কথাও বলি যে, আল্লাহ ছাড়া জগতের কোনো কিছুরই সত্যিকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ, তিনি সৃষ্টিজগতের সবকিছুরই একাধারে উৎস ও গন্তব্য।
যেকোনো সংখ্যাকে অসীম দিয়ে ভাগ দিলে যেমন শূন্য হয়, তেমনি যেকোনো সসীম সৃষ্টি ও অসীম আল্লাহর ভাগফলও শূন্য হয়।
'পৃথিবীপৃষ্ঠে যা কিছু আছে-সবই ধ্বংসশীল। কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা (সত্তা); যিনি মহীয়ান, গরীয়ান।' সূরা আর-রহমান: ২৭
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো লক্ষ্য, পরিণাম বা গন্তব্যের জন্য বিনিয়োগ করা হলো অনেকটা মরুভূমিতে বরফ বিনিয়োগ করার মতো; যে বিনিয়োগের পরিণামে লোকসান অনিবার্য। আমরা যদি আমাদের পার্থিব কামনা-বাসনাগুলোকে আমাদের খোদা বানিয়ে ফেলি, তাহলে নিরন্তর অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা আমাদের গ্রাস করে রাখে। কেননা, আমাদের আবেগ ও ইচ্ছা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল।
'আসমান ও জমিনে যদি আল্লাহ ছাড়া আরও অনেক উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই (আসমান ও জমিন) ধ্বংস হয়ে যেত। কাজেই আরশের অধিপতি আল্লাহ মহান ও পবিত্র সেসব থেকে, যা তারা তাঁর প্রতি আরোপ করে।' সূরা আম্বিয়া: ২২
যেখানেই পৃথকীকরণ, সেখানে মতের ভিন্নতা; যার অনিবার্য পরিণাম দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ দৃষ্টান্ত পেশ করছেন: এক ব্যক্তির প্রভু অনেক, যারা পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক প্রভুর অনুগত-এ দুজনের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।' সূরা জুমার : ২৯
আপনি যদি এ বিশ্বজগৎকে আপনার প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে আপনি সৃষ্টির সবকিছুর দাসে পরিণত হবেন। কিন্তু আপনি যদি এক আল্লাহকে আপনার একমাত্র প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সৃষ্টিজগতের সবকিছু আপনার দাসত্ব করবে। আল্লাহর ভালোবাসা ও দয়ার প্রবাহ সকল সৃষ্টির মধ্যে সঞ্চারিত করাই হবে আপনার মিশন।
সকল নবি ও রাসূলকে আল্লাহর এককত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের একই বার্তা দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
‘আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং পরিহার করো তাগুতকে। অতঃপর, তাদের মধ্যে আল্লাহ কাউকে হিদায়াত দান করেছেন এবং তাদের মধ্য থেকে কারও ওপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা জমিনে ভ্রমণ করো-অতঃপর দেখ, অস্বীকারকারীদের কী পরিণতি হয়েছে।' সূরা নাহল : ৩৬
আমাদের হৃদয় কেবল তখনই পরম শান্তির স্বাদ অনুভব করতে পারে, যখন আমরা আমাদের সকল কামনা-বাসনাকে এক আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সোপর্দ করত সক্ষম হই। মহানবি বিষয়টিকে এভাবে তুলে ধরেছেন-
'যে ব্যক্তি এর ওপর মৃত্যুবরণ করল-সে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য সম্পর্কে জানে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' [১১৭]
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাক্যটির দুটি অংশ রয়েছে; লা ইলাহা অর্থ-কোনো উপাস্য (ইলাহ) নেই। ইল্লাল্লাহ অর্থ-আল্লাহ ছাড়া। এখান থেকে জানা যায়, আল্লাহ চান তাঁর স্বীকৃতি দেওয়ার পূর্বে আমরা যেন সকল উপাস্যকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিই। যখন হতাশা বা একাকিত্ব আমাদের গ্রাস করে, ভাবি-কেন মানুষ দুনিয়া ত্যাগ করে, কেন কোনো কিছুই স্থায়ী হয় না, কেন আমাদের চারদিকে যা ছড়িয়ে আছে-তাকে মিথ্যা মোহ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না, তখন আমরা লা ইলাহা পর্যায়ে থাকি; যতক্ষণ না ইল্লাল্লাহর দিকে হাঁটা শুরু করি। আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নিলে আমাদের যাবতীয় ব্যথা-বেদনা ও শূন্যতা দূর হয়ে যায়। হৃদয় অনাবিল শান্তিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা হওয়ার উপযুক্ত নই-এই ভেবে আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করা পুরো মাত্রায় ভুল কাজ। মনে রাখতে হবে, আমরা পুরোপুরি নির্ভুল হয়ে যাই-এমনটি আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে আশা করেন না। তিনি চান আমরা আমাদের সকল ত্রুটি-বিচ্যুতিকে সাথে নিয়েই যেন তাঁর কাছে ফিরে আসি। আমরা যখন আমাদের দারিদ্র্য, অভাব ও শূন্যতাগুলোকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিই, তখন তিনি তাঁর দানশীলতা (আল কারিম), পরাক্রমশীলতা (আস-সামাদ) ও ঐশ্বর্যময়তা (আল গানি) দিয়ে সেগুলোকে পূর্ণ করে দেন। আমাদের ঘরকে আলোকিত করতে হলে আমরা যেমন দরজা-জানালা খুলে দিই-যাতে সূর্যের আলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে, তেমনি আমাদের হৃদয়ের ঘরকে আলোকিত করতে হলেও হৃদয়ে দরজা খুলে দিতে হবে, যাতে আল্লাহর নুর সেখানে প্রবেশ করতে পারে।
আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা একটি বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাদের সাথে থাকেন। তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আল্লাহর সাথে আমাদের দূরত্ব তৈরি হয় তাঁকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থেকে। এ কারণে আমরা যখন আমরা অনিশ্চয়তা, সংশয় বা আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করি, তখন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র জিকির আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। এই জিকির আমাদের ভেতরে আল্লাহর নুর প্রবেশ করায়। ফলে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করি এবং আমাদের ভেতরকার ঈমান বিকশিত হতে শুরু করে।
কোনো কিছুকে অস্তিত্বে আনতে হলে সেটির জন্য আগে জায়গা খালি করতে হয়। 'লা ইলাহা'র মাধ্যমে আমরা আগে শূন্যতা তৈরি করি, তারপর 'ইল্লাল্লাহ'র মাধ্যমে সেই শূন্য স্থানকে পূর্ণ করি। লা ইলাহা'র মাধ্যমে আমরা সকল মিথ্যা খোদা, বস্তুগত সম্পদ, দুনিয়ার প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান মানুষ, নিজের লোভ-লালসা ইত্যাদিকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিই। নতুন সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে যেমন পুরোনো ভার্সনকে আনইনস্টল করতে হয়, তেমনি আল্লাহকে হৃদয়ে ইনস্টল করতে পুরোনো সকল খোদাকে আনইনস্টল করতে হয়। অন্য কথায়, ইল্লাল্লাহ'র পূর্বশর্তই হলো-'লা ইলাহা'। আল্লাহকে একমাত্র প্রভু হিসেবে মেনে নিতে হলে আপনাকে দুনিয়াবি সকল খোদা বা খোদাসদৃশ সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করেই আসতে হবে; অন্যথায় আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও সে ঘোষণা হবে কৃত্রিম ও নিষ্ফল।
আপনি যখন আল্লাহর প্রভুত্বকে নিজের ভেতর সত্যিকারার্থে ধারণ করতে পারবেন, তখন যেদিকে আপনি মুখ ফেরাবেন (পূর্ব বা পশ্চিম), কেবল আল্লাহর চেহারাই দেখতে পাবেন। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া ছাড়া কোনো কিছুরই অস্তিত্ব আপনার চোখে পড়বে না। নিচের ঘটনায় এই চিত্র সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে-
'এক সুফি একদিন দেখলেন, একটি বালক জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সুফি ঠিক করলেন, বালকটিকে জীবন সম্পর্কে কিছু শিক্ষা দান করবেন। তিনি বালকটিকে জিজ্ঞেস করলেন- "এ আলো কোথা থেকে এসেছে?” বালকটি প্রথমে আলোর দিকে তাকাল, তারপর তাকাল সুফির দিকে। এরপর আচমকা সে ফুঁ দিয়ে আলো নিভিয়ে দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল- “কিন্তু আলোটা গেল কোথায়?"
ঘটনার আকস্মিকতায় সুফি নির্বাক হয়ে গেলেন। বালকটি যে মহাসত্য উন্মোচন করল, তা হলো-যে উৎস থেকে আলো আসে, অবশেষে একই জায়গায় আলো ফিরে যায়।'
পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে সে কথাই ফুটে উঠেছে- 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন-নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' সূরা বাকারা: ১৫৬
আল্লাহর এককত্বের ভেতর তিনিই শুরু, তিনিই শেষ; তিনিই অতীত, তিনিই বর্তমান, তিনিই ভবিষ্যৎ। আল্লাহর অস্তিত্বের সামনে সব বিচ্ছেদ বিলীন হয়ে যায়, জগতের সবকিছু অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে।
শাহাদাহর দ্বিতীয় অংশ
একজন মানুষ যখন আল্লাহর অস্তিত্বকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর আত্মার সহজাত জ্ঞানকে বাস্তবে পরিণত করে, তখন অনিবার্যভাবে যে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, তা হলো-এ জ্ঞান দিয়ে সে কী করবে? মুসলিমদের জন্য মুহাম্মাদ (সা) হলেন এ প্রশ্নের উত্তর। কুরআনের কথাগুলো লিখিত আকারে আসেনি; বরং ২৩ বছর ধরে নবিজির ওপর কুরআন ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হয়েছে। সাহাবিরা যখন কুরআনের কথা ভাবতেন, তখন তাঁদের কল্পনায় রাসূল (সা)-এর মুখ ও তাঁর কণ্ঠের তিলাওয়াতই ভেসে আসত। এ দৃষ্টিতে আল্লাহর বার্তা ও বার্তাবাহক পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। মুহাম্মাদ (সা) হলেন ইসলামের কালিমার মৌলিক একটি অংশ। কারণ, তিনি আল্লাহর এককত্বের বিশ্বাসকে কাজে পরিণত করে দেখিয়েছেন। তাঁকে পবিত্র কুরআনে 'বিশ্ববাসীর জন্য রহমত' এবং 'উজ্জ্বল প্রদীপ' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি শুধু একজন বার্তাবাহকই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন, আল্লাহর একত্ববাদের সূর্য থেকে সংগৃহীত আলোর পূর্ণিমার চাঁদ। [১১৮] তিনি ছিলেন দুনিয়াতে আল্লাহর দাস ও আল্লাহর প্রতিনিধি-এ দুটি পরিচয়ের সংক্ষিপ্তসার। তাঁর চলার পথ অনুসরণ করার মাধ্যমেই আমরা কেবল সত্য ও বিভ্রমের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারি।
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদ (সা)-কে 'খাতামুন নাবিয়্যিন' [১১৯] বা নবিদের সিলমোহর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি নবুয়তের বিশাল গ্রন্থের শেষ অধ্যায় ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এ গ্রন্থের বাঁধাই (বাইন্ডিং)। তাঁর কাছে যে বার্তাগুলো প্রেরণ করা হয়েছিল, তা ছিল সকল নবি-রাসূলের কাছে প্রেরিত বার্তার নির্যাস। পবিত্র কুরআনে মুসলিমদের বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-
'আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না।' সূরা বাকারা: ২৮৫
যদি প্রত্যেক নবিকে নবুয়তের এক একটি 'পাজল পিস' হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে মুহাম্মাদ হবেন সেই পাজলের চূড়ান্ত পিস-যা নবুয়তের ধারাবাহিকতাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছে। তিনি ফেরেশতা বা অতিমানব ছিলেন না; ছিলেন আমাদের মতোই মরণশীল মানুষ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'বলো, আমি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। আমার নিকট ওহি প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ।' সূরা কাহাফ : ১১০
বর্ণিত আছে, তিনি যখন নামাজ পড়তেন, তখন এতখানি শূন্য হৃদয়ে নামাজ পড়তেন, যেন আল্লাহর স্মরণ ছাড়া জগতে আর কিছুর অস্তিত্ব নেই। তিনি কেবল খাদ্য ও পানি থেকে বিরত থেকেই রোজা করতেন না; বরং তাঁর ও আল্লাহর মধ্যকার যাবতীয় কিছু থেকে বিরত থেকেই রোজা করতেন। তিনি তাঁর অর্থ ও সম্পদ দিয়েই কেবল অভাবগ্রস্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসতেন না; বরং তাঁর সমগ্র অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিতেন।
মহানবি তাঁর নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে পূর্ণভাবে সঁপে দিয়ে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র প্রকৃত অর্থকে বাস্তবে রূপায়িত করেছেন। তাই মহানবি (সা)-এর কার্যক্রম হলো দুনিয়াতে আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন। আল্লাহ তায়ালা এ কথাটি এভাবে বলেছেন-
'আমি তাঁর কান, যা দিয়ে সে শোনে, তাঁর চোখ-যা দিয়ে সে দেখে, তাঁর হাত-যা দিয়ে সে ধরে, তাঁর পা-যা দিয়ে সে হাঁটে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাকে তা দান করি। সে আমার কাছে কোনো কিছু থেকে পানাহ চাইলে আমি তা মঞ্জুর করি।' হাদিসে কুদসি
মহানবি কেবল আল্লাহর পথনির্দেশনার মানচিত্র প্রেরণের বাহনই ছিলেন না; বরং তিনি স্বয়ং ছিলেন সেই মানচিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।' সূরা নিসা : ৮০
মহানবি ছিলেন আল্লাহর নিখাদ আয়না, আল্লাহর ইচ্ছার প্রয়োগের খাঁটি পাত্র। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যারা তোমার কাছে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহর কাছেই আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। তাদের হাতের ওপর রয়েছে আল্লাহর হাত।' সূরা ফাতহ: ১০
আল্লাহ তাঁর অন্যান্য রাসূলদের মতো মুহাম্মাদ (সা)-কে আমাদের জন্য 'সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী' [১২০] হিসেবে প্রেরণ করেছেন।
তিনি বাদশাহ বা শাসক হিসেবে দুনিয়াতে আসেননি; বরং তিনি এসেছিলেন নিরাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবতার জন্য আশার আলো হিসেবে, ভয়ার্ত মানুষের জন্য নিরাপত্তা হিসেবে, দরিদ্র মানুষের জন্য দাতা হিসেবে এবং হতাশাগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রেরণা হিসেবে। তিনি মন্দ মানুষকে ভালো মানুষ বানানোর জন্য আসেননি; তিনি এসেছেন এমন ঝরনা হয়ে, যা ঈমানের মৃত বীজে প্রাণের সঞ্চার করে।
কে ছিলেন মুহাম্মাদ
মুহাম্মাদ-এর বংশধারা ওপরের দিকে ইবরাহিম (আ)-এর সাথে যুক্ত হয়েছে, যিনি ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম তিন জাতির একত্ববাদের জনক। [১২১] মুহাম্মাদ ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬২ বছর বয়সে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ৪০ বছর বয়সে ফেরেশতা জিবরাইল-এর মাধ্যমে প্রথম ওহিপ্রাপ্ত হন।
প্রথম কিছুদিন তিনি গোপনে আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত বার্তাগুলো পরিচিত মহলের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন এবং একপর্যায়ে আল্লাহর নির্দেশে বহুবাদী মক্কার মানুষের কাছে একত্ববাদের ধারণা উপস্থাপন করেন। মক্কার অভিজাত ও নেতৃত্বস্থানীয় বংশ কুরাইশদের নেতাদের কাছে তিনি ঘোষণা করলেন, আল্লাহ তাঁকে বার্তাবাহক (রাসূল) হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি বললেন— ‘হে কুরাইশগণ! আমি যদি বলি—পাহাড়ের পেছনে একটি বড়ো সেনাবাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাহলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?’ মানুষের ভিড় থেকে বলা হলো—‘হ্যাঁ। কেননা, আমরা তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি।’ [১২২]
মক্কার লোকেরা মহানবি (সা)-কে এত বিশ্বাস করত যে, তাঁকে আস-সাদিক বা সত্যবাদী ও আল আমিন বা নির্ভরযোগ্য বলে ডাকত। তাঁর সততার আকাশচুম্বী সুনাম থাকা সত্ত্বেও মক্কার অধিকাংশ লোক তাঁর রাসূল মনোনীত হওয়ার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করল। তবুও মক্কার কুরাইশদের শত্রু ও সহিংস প্রতিরোধের মুখে মুহাম্মাদ তাঁর বার্তা প্রচার চালিয়ে গেলেন।
তেরো বছর ধরে মক্কাবাসীর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন সহ্য করার পর অবশেষে মহানবি মদিনায় হিজরত করলেন। মদিনার লোকেরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করল এবং তিনি মদিনায় একটি নতুন ইসলামি সমাজ বিনির্মাণ করলেন। সেখানে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আল্লাহর একত্ববাদের ধারণা এতখানি জনপ্রিয়তা অর্জন করল যে, মক্কার কুরাইশদের অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব হুমকির সম্মুখীন হলো।
কয়েকটি সংঘাত সংঘর্ষের পর অবশেষে বড়ো যুদ্ধ এড়াতে মুসলিম ও মক্কাবাসীদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হলো—যার নাম হুদাইবিয়ার সন্ধি। আপাত দৃষ্টিতে এ সন্ধি ছিল মক্কার অনুকূলে; কিন্তু এ চুক্তির পর মুসলিমরা স্বাধীনভাবে তাদের বার্তা সম্প্রসারণ ও সামাজিক ভিত্তি মজবুত করার দিকে মনোনিবেশের সুযোগ পেল। ফলে দলে দলে লোকেরা ইসলামের সুমহান আহ্বানে সাড়া দিতে থাকল। ওই সন্ধি সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে— ‘নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।’ সূরা ফাতাহ: ১
হুদাইবিয়ার চুক্তি স্বাক্ষরের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মক্কার কুরাইশরা চুক্তিভঙ্গ করল, ফলে এই চুক্তি অকার্যকর হয়ে গেল। ফলে রাসূল ১০ হাজার অনুসারী নিয়ে মক্কা অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে মক্কার নিয়ন্ত্রণ লাভ করলেন। তিনি প্রচলিত সকল নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করে পরাজিতপক্ষের লোকদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। যারা বছরের পর বছর ধরে নিপীড়ন চালিয়ে তাঁর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, তারা রাসূল-এর ক্ষমা পেয়ে অভিভূত হয়ে গেল।
জীবনের শেষ বছরগুলোতে মহানবি মুসলিম বিশ্বের সীমানা সংরক্ষণ, আরবের গোত্রীয় সংঘাত নিরসন এবং ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণের দিকে তাঁর মনোযোগ নিবদ্ধ করলেন। নবিজি তাঁর মৃত্যুর বছর (৬৩২ সালে) জীবনের প্রথম ও শেষ হজ সম্পাদন করেন। মহানবি (সা)-এর মৃত্যুর ১৪০০ বছর পরও তাঁর ক্ষমা, দয়া, বিশ্বাস ও ধৈর্যের শিক্ষা দুনিয়ার আনাচে-কানাচে কোটি মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
মুহাম্মাদ (সা)-এর জীবনের কয়েকটি ঘটনা বিরল সততা ও পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত দুটি পক্ষের ভেতর শান্তি স্থাপনের বিস্ময়কর ক্ষমতার জন্য দুনিয়াজুড়ে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে রাসূল বিশেষ সম্মানের পাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছেন। নিচের ঘটনায় এ রকম একটি চমৎকার উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছিলেন-
একবার কাবার একটি অংশ আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল। তখন কাবা ঘরে কয়েকশো মূর্তি ছিল। মক্কায় হজ করতে আসা বিভিন্ন গোত্রের হাজিরা এ মূর্তিগুলোকে কাবা ঘরে এনে স্থাপন করেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত কাবা ঘর সংস্কার করা শেষ হলে বিভিন্ন গোত্রের নেতারা কাবার দেয়ালে স্থাপিত পবিত্র কালো পাথর (হাজরে আসওয়াদ) সরানোর উদ্যোগ নিল। কিন্তু মক্কার বিভিন্ন গোত্রের নেতারা পাথরটিকে সরানোর সম্মানসূচক কাজ কে করবে, তা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলো; এমনকী এ নিয়ে সংঘাতের সূত্রপাতও হলো। একজন বয়স্ক লোক বিবাদমান পক্ষগুলোকে থামিয়ে একটি সমঝোতায় পৌছাল। ঠিক হলো-পরবর্তী সময়ে যে ব্যক্তি প্রথম কাবায় প্রবেশ করবে, তাঁর সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিষয়টির সুরাহা হবে। তখনও পর্যন্ত নবুয়ত লাভ না করা মুহাম্মাদ প্রথম কাবায় প্রবেশ করলেন। তিনি সবটা শুনে একটি চমৎকার সমাধান দিলেন।
প্রথমে তিনি একটি বড়ো চাদর আনতে বললেন, এরপর পাথরটিকে চাদরের মধ্যে রাখলেন, এরপর প্রতিটি গোত্রের একজন করে নেতাকে চাদরের একেকটি প্রান্ত ধরতে বললেন। সকলে মিলে নতুন স্থানে পাথরটিকে নিয়ে গেলে। এবার মুহাম্মাদ নিজ হাতে পাথরটিকে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করে দিলেন। এভাবে একটি সংঘাতমূলক পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান হলো।
নবুয়ত প্রাপ্তির আগে থেকেই রাসূল (সা)-এর মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনের অসাধারণ সৃজনশীলতা কার্যকর ছিল। একেবারে ছেলেবেলা থেকে তিনি সমাজে শান্তি স্থাপনের উপায় খুঁজে বেড়াতেন।
ক্ষমতা, সম্পদ বা সুনাম অর্জন মহানবি নবিজির লক্ষ্য ছিল না। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তোষ অর্জন। এমনকী মহানবি (সা)-এর একজন অনুসারী একবার তাঁর কুটির ঘরের দারিদ্র্য দশা স্বচক্ষে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। রাসূল তাঁর কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন-যখন রোম ও পারস্যের সম্রাটরা আরাম-আয়েশ ও জাঁকজমকভাবে জীবনযাপন করছে, তখন আল্লাহর রাসূল এমন শক্ত মাদুরে শুয়ে রাত্রিযাপন করছে যে, তাঁর শরীরে মাদুরের দাগ ফুটে উঠছে। এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তিনি কাঁদছেন। রাসূল জবাবে বলেছিলেন, এ দুনিয়ার আরাম-আয়েশের কোনো মূল্য তাঁর কাছে নেই। রাসূল (সা)-এর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল পরকালের ওপর, যেখানকার আরাম-আয়েশ হবে সীমাহীন, যেখানকার সৌন্দর্য হবে অতুলনীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সেখানে তিনি থাকবেন তাঁর প্রভুর সবচেয়ে নিকটে। [১২৩]
এমনকী ইসলামের বিজয়ের পর বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ তাঁর হস্তগত হলেও তিনি সেখান থেকে নিজের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য কোনো সম্পদ গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন শান্ত ও বিনয়ী একজন মানুষ। তিনি কারও ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করেননি; যদিও তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ রাসূল, মুসলিম বিশ্বের নেতা ও শাসক। তিনি ছাগলের দুধ দোহাতেন, [১২৪] নিজের ছেঁড়া কাপড়ে তালি জুড়ে দিতেন এবং দৈনন্দিন সাংসারিক কাজ করতেন। [১২৫]
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।' সূরা আহজাব: ২১
রাসূল (সা)-এর রেখে যাওয়া উদাহরণের মাধ্যমেই আমরা কুরআনের শিক্ষা বাস্তবে রূপায়িত করার প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকি। মহানবি তাঁর সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রুর প্রতিও দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শন করতেন। তাঁর জীবনের একটি বিখ্যাত ঘটনা ছিল এমন-
রাসূল (সা)-এর প্রতিবেশী ছিলেন এক বৃদ্ধা মহিলা। বৃদ্ধা রাসূল (সা)-এর দিকে প্রতিদিন ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করতেন। কারণ, তিনি রাসূল (সা)-এর প্রচারিত বক্তব্যের সাথে একমত ছিলেন না। একদিন রাসূল লক্ষ করলেন, বৃদ্ধাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তিনি বৃদ্ধাকে খুঁজতে বের হলেন এবং জানতে পারলেন, বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। রাসূল অসুস্থ বৃদ্ধাকে দেখতে গেলেন। বৃদ্ধা যখন জানতে পারলেন রাসূল তাকে দেখতে এসেছেন, তখন তিনি রাসূল (সা)-এর বদান্যতায় অভিভূত হয়ে গেলেন এবং অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করলেন। [১২৬]
অন্য একটি ঘটনা। মক্কার মূর্তিপূজারিদের অত্যাচার যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন একবার রাসূল (সা)-এর সাহাবিরা রাসূল (সা)-কে বললেন- তিনি যেন শত্রুদের প্রতি অভিসম্পাত করেন, যাতে তারা ধ্বংস হয়ে যায়। রাসূল জবাবে বললেন- 'নিশ্চয়ই আমি অভিশাপ দেওয়ার জন্য প্রেরিত হইনি; আমি কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি। [১২৭] রাসূল যখন তায়েফ নগরীতে ইসলামের আহ্বান নিয়ে গেলেন, তখন তায়েফের লোকেরা তাঁর প্রতি পাথর নিক্ষেপ করল এবং তাঁকে অপদস্থ করল। এমন নাজুক মুহূর্তেও রাসূল তায়েফবাসীর ধ্বংস কামনা করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেননি; বরং তিনি তাদের জন্য দুআ করেছেন এই আশায় যে, তাদের বংশধররা হয়তো ইসলামের বক্তব্য গ্রহণ করবে। [১২৮]
রাসূল বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ের ভেতরে কল্যাণময়তার বীজ বসবাস করে এবং আল্লাহ ইচ্ছা করলে যেকোনো মুহূর্তে এ বীজ বিকশিত হতে পারে। রাসূল-এর চোখ ছিল আধ্যাত্মিকতার গভীরতাসম্পন্ন। ফলে তিনি কোনো কিছুর বাহ্যিক দিকগুলোর পাশাপাশি অন্তর্নিহিত দিকগুলোর প্রতিও দৃষ্টিপাত করতে পারতেন। তিনি বীজের ভেতর ফুল দেখতে পেতেন, রাতের ভেতর ভোর দেখতে পেতেন, বাঁকা চাঁদের ভেতর পূর্ণিমা দেখতে পেতেন। তিনি মানুষের সর্বোচ্চ সুন্দর রূপটি দেখতে পেতেন। মানুষের সবচেয়ে বড়ো সম্ভাবনাগুলো তাঁর চোখে পড়ত। তিনি ভালোবাসা ও অন্তর্ভেদী কথা দিয়ে মানুষের ভেতরের সৃজনশীলতাকে পরিচর্যা করতেন।
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদ-এর নাম বিশেষ মর্যাদার সাথে উচ্চারিত হয়েছে। সূর্যের আলোকে বোঝাতে কুরআনে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, মুহাম্মাদ (সা)-এর আলো দানকারী প্রকৃতিকে বোঝাতে একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সূর্যের আলো সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'কতই না কল্যাণময় তিনি; যিনি আসমানে নক্ষত্ররাজির সমাবেশ ঘটিয়েছেন এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সিরাজান) আর আলো বিকিরণকারী চন্দ্র!' সূরা ফুরকান: ৬১
মুহাম্মাদ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও আলোকদীপ্ত প্রদীপ (ওয়া সিরাজান) হিসেবে।' সূরা আহজাব : ৪৬
সূর্য যেমন অস্ত গেলেও হারিয়ে যায় না, তেমনি মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষার আলো তাঁর অগণিত অনুসারীর হৃদয়কে আলোকিত করে চলেছে।
রাসূল খোদা নন; কেবল একজন মানুষই ছিলেন। তাই তাঁর মানবীয় বৈশিষ্ট্য তাঁর জীবন ও সকল মানুষের জীবনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করে। আপনি যদি শরণার্থী হয়ে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন-মুহাম্মাদ আপনার ব্যথা বোঝেন। কেননা, তিনিও একজন শরণার্থী ছিলেন, যাকে তাঁর দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আপনি যদি প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাতর হয়ে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন-মুহাম্মাদ আপনার কষ্ট অনুভব করতে পারেন। কেননা, তিনি জীবদ্দশায় তাঁর প্রিয় স্ত্রী ও তিন শিশুপুত্রকে হারিয়েছেন। আপনি যদি ইয়াতিম হয়ে জন্ম নিয়ে থাকেন অথবা আপনি যদি জীবদ্দশায় আপনার বাবা-মা-কে হারিয়ে থাকেন, তাহলে জানুন-মুহাম্মাদ আপনার দুঃখ বোঝেন। কেননা, তিনি জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছেন, মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন। আপনি যদি আপনার বন্ধুমহল ও পরিবারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে জানুন-তিনি আপনার সমব্যথী। কেননা, তিনি তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের দ্বারা মানসিক ও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন। যদি দুনিয়ার কেউ আপনাকে গুরুত্ব না দেয় বা অবহেলা করে, তাহলে জেনে রাখুন-মহানবি আপনার কষ্ট বুঝতে পারেন। কেননা, তিনি মানুষকে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা বোঝাতে তাঁর বহু বছর লেগেছে।
আপনি যে অবস্থায় নিপতিত হন না কেন, রাসূল আপনার সে অবস্থার অনুভূতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেছেন এবং আপনি যে উচ্চতর অবস্থানে যেতে চান না কেন, তিনি সেই শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। আপনার সবচেয়ে বড়ো সাফল্য বা সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতার মুহূর্তেও তাঁকে আপনি দৃষ্টান্ত ও পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। কেননা, তাঁর জীবন এমন এক কম্পাস-যা আপনাকে জান্নাতের চূড়ায় পৌছে দিতে পারে।
মুহাম্মাদ আমাদের মনে করিয়ে দেন আমরা কে
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মহানবি (সা)-কে এভাবে সম্মানিত করেছেন-'আর নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত। [১২৯] অনেক বিশ্লেষকের মতে, আল্লাহ যখন রাসূল (সা)-কে 'তুমি' বলে সম্বোধন করেন, তখন তিনি মানবজাতির প্রত্যেকের বক্ষস্থিত হৃদয়কেও সম্বোধন করে থাকেন। কারণ, সকল মানুষ এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্ট। সূরা আ'রাফ: ১৮৯
আমরা যখন মুহাম্মাদ (সা)-এর কথা আলোচনা করি এবং তাঁর জন্য দরুদ পাঠ করি, তখন আমরা মূলত আল্লাহর ইবাদতেই লিপ্ত হই। কেননা, আমরা আল্লাহর নির্দেশেরই অনুসরণ করছি। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবির প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবির জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো।' সূরা আহজাব: ৫৬
মহানবি (সা)-এর নবুয়তি আলোর (নুর মুহাম্মাদ) স্মরণ আমাদের ভেতরের কল্যাণময়তার বীজকে বিকাশে সাহায্য করে। আমরা যখন রাসূল (সা)-এর প্রতি সালাম প্রেরণ করি, তখন আমরা মূলত নিজের প্রতিও সেই সালাম প্রেরণ করে থাকি।
আমরা যতই মানবীয় মনস্তত্ত্ব আবিষ্কার করছি, ততই দেখতে পাচ্ছি-মানবীয় সীমাবদ্ধতার দেয়ালকে ভাঙতেই দুনিয়াতে নবি-রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। দৌড়বিদ রজার ব্যানিস্টার-এর উদাহরণ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যেতে পারে-
১৯৫৪ সালে রজার ব্যানিস্টার নামে এক দৌড়বিদ মানবেতিহাসে প্রথমবারের মতো চার মিনিটের কম সময়ে এক মাইল দূরত্ব অতিক্রমের রেকর্ড স্থাপন করে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ব্যানিস্টারের এ রেকর্ড গড়ার কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকজন দৌড়বিদ চার মিনিটের কম সময়ের মধ্যে এক মাইল দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ব্যানিস্টার মূলত কোনো রেকর্ড ভাঙেননি, তিনি শুধু মানুষের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে দেখিয়ে দিয়েছেন-মানুষের পক্ষে কী করা সম্ভব! [১৩০] একইভাবে আল্লাহ তাঁর নবি-রাসূলদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন আধ্যাত্মিকতার সামনের বাধা অপসারণের জন্য, যাতে মানুষ তার নিজের সম্ভাবনা বিকাশের জন্য উপযুক্ত দৃষ্টান্ত চোখের সামনে দেখতে পায়।
সূর্যের সাথে তুলনা করলে মহানবি (সা)-কে পূর্ণিমার চাঁদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। কেননা, তিনি আল্লাহর পরম সত্যের দিকে মুখ করে আছেন এবং আমাদের আত্মার ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করে চলেছেন। তিনি আল্লাহর বার্তার সাথে নিজের বিনয়, নম্রতা, দয়া, ভালোবাসা ও ক্ষমার গুণকে একীভূত করেছেন। তাঁর কাজ ওহির চেতনার পর্দাকে উন্মোচিত করেছে, তাঁর কথা মানুষের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণার অপনোদন করেছে, তাঁর চরিত্র ইবাদতের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং তাঁর পুরো জীবন আল্লাহর একত্ববাদ ধারণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে। রাসূল আমাদের শিখিয়েছেন-কী করে হিংসা, কাম, ক্রোধ, লোভ, অহংকারের মতো কুপ্রবৃত্তিগুলো থেকে বেঁচে থাকা যায়, কী করে তওবা ও জিকিরের মাধ্যমে নিজের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে তোলা যায়। রাসূল আমাদের শিখিয়েছেন, জগতে যা কিছু আমরা দেখি-তা হলো সেই জিনিসের প্রতিফলন, যা আমরা নিজের ভেতর বহন করে চলেছি। কাজেই আমাদের জীবনকে বদলাতে হলে আমাদের হৃদয়কে বদলানোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
পচে যাওয়া হৃদয়ের সাথে সৎকর্ম একটি কপটতা এবং পবিত্র হৃদয়ের সাথে সৎকর্মহীনতা একটি বিভ্রম। মহানবি আমাদের শিখিয়েছেন-কীভাবে অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধি ও বাহ্যিক আনুগত্যের সমন্বয় সাধান করে আধ্যাত্মিক পূর্ণতার যাত্রাপথে এগিয়ে যেতে হয়। মহানবি বলেছেন- 'আমি মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পূর্ণতা সাধনের জন্য দুনিয়াতে এসেছি।' [১৩১]
রাসূল দেখিয়ে গেছেন, নেতৃত্ব মানে কর্তৃত্ব নয়; বরং নেতৃত্ব মানে ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে অনুপ্রাণিত করা।
টিকাঃ
১১৬. এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে, সকল মানুষের রুহ সৃষ্টির পর সব রুহকে আল্লাহ জিজ্ঞেস করেছিলেন-'আমি কি তোমাদের রব নই?' সবগুলো রুহ জবাবে বলেছিল- 'নিশ্চয়ই, এ ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।' সূরা আ'রাফ: ১৭২
১১৭. তিরমিজি
১১৮. মহানবি -এর স্ত্রী আযিশা বলেছেন-'নিশ্চয়ই করআনই ছিল প্রিয়নবির চরিত্র।'
১১৯. সূরা আহজাব: ৪০
১২০. সূরা বাকারা: ১১৯
১২১. মুসা ছিলেন ইবরাহিম-এর দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক-এর বংশধর এবং মুহাম্মাদ ছিলেন ইবরাহিম-এর প্রথম পুত্র ইসমাইল-এর বংশধর।
১২২. বুখারি, মুসলিম
১২৩. বুখারি, মুসলিম
১২৪. আহমাদ
১২৫. বুখারি
১২৬. Arbil, Majd. 'The Compassion of the Prophet Towards Those Who Abused Him.' IslamiCity, June 26, 2018
১২৭. মুসলিম
১২৮. বুখারি, মুসলিম
১২৯. সূরা কালাম: ৪
১৩০. Taylor, Bill. 'What Breaking the Four-Minute Mile Taught Us About the Limits of Conventional Thinking.' Harvard Business Review. April 10, 2018
আশহাদু আল্লা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল।
একজন মানুষ মুসলিমে পরিণত হয় যে ঘোষণা দিয়ে, তাকে বলা হয় শাহাদাহ। ইসলামের মহাসমুদ্রে প্রবেশের প্রথম দরজা হলো শাহাদাহ। শাহাদাহ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ার কাঠামো বিনির্মাণ করে। শাহাদাহর প্রথম অংশ হলো সকল মিথ্যা খোদা এবং জগতের সবকিছুর সাথে সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করে আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে সাক্ষ্য দান করা। শাহাদাহর দ্বিতীয় অংশ হলো-মুহাম্মাদ (সা)-কে আল্লাহর রাসূল (বার্তাবাহক) হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করা, যার সারকথা হলো-তাঁর সকল পদক্ষেপকে অনুসরণের সংকল্প করা। যখন কোনো মানুষ হৃদয়ের গভীর থেকে 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল'-ঘোষণাটি দেয়, তখন সে মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঈমান এমন কিছু নয়-যা অর্জনযোগ্য; বরং ঈমান হলো ইতোমধ্যে আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন, তা উন্মোচনের পথে যাত্রা। যে কুফরি করে অর্থাৎ আল্লাহকে মানতে অস্বীকার করে, তাকে বলা হয় কাফির। কাফির শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো এমন ব্যক্তি, যে সত্যকে ঢেকে রাখে। এ অর্থে কৃষক তার বীজ মাটিতে পুঁতে রাখে বলে কৃষককে আরবিতে কাফির বলা হয়। আধ্যাত্মিক অর্থে কাফির হলো সেই ব্যক্তি, যে তার হৃদয়ে থাকা ঈমানের মহামূল্যবান রত্নকে ঢেকে রাখে। পবিত্র কুরআনে শোকর বা কৃতজ্ঞতার বিপরীত শব্দ হিসেবে কুফর ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলাম এবং বলেছিলাম-আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয় আর কেউ অকৃতজ্ঞ (কাফারা) হলে আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।' সূরা লোকমান: ১২
মুসলিমদের কাছে কাফির সে নয়, যে আন্তরিকভাবে সত্যের সন্ধান করে চলেছে; বরং সেই কাফির, যে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও অহংকার, দম্ভ ও অকৃতজ্ঞতার কারণে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করে। অন্যকথায়, কাফিরদের মানসিক অবস্থা হলো মানবীয় স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীত।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো-আপনি কাউকে ইসলাম গ্রহণ করতে বা ইসলামের বার্তাগুলোকে মেনে নিতে বাধ্য করতে পারেন না। ঈমান স্বীকৃতি লাভ করে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীন প্রয়োগের মাধ্যমে। মানুষ যখন তার ইচ্ছার স্বাধীনতাকে পূর্ণভাবে ব্যবহার করে আল্লাহর অস্তিত্ব ও প্রভুত্বকে মেনে নেবে, তখনই সে ঈমানদার বলে বিবেচিত হবে। এ কারণে কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- 'দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো জবরদস্তি (বাধ্যবাধকতা) নেই।' সূরা বাকারা: ২৫৬
জগতের প্রতিটি মানুষ তার হৃদয়ে ঈমানের বীজ বহন করে চলেছে। এই বীজ কীভাবে বেড়ে উঠবে, তা নির্ভর করে আল্লাহ তার জন্য কী পরিকল্পনা করে রেখেছেন এবং সে আধ্যাত্মিকতার পথে কতটুকু চেষ্টা-সাধনা করবে তার ওপর।
'যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, আল্লাহ তার হৃদয়কে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।' সূরা তাগাবুন: ১১
শাহাদাহর প্রথম অংশ
আল্লাহকে বাইরের জগতে খুঁজে বের করা আমাদের কাজ নয়, আমাদের কাজ হলো নিজের ভেতরের দিকে দৃষ্টি দেওয়া এবং আল্লাহ ইতোমধ্যে কতখানি আমাদের নিকটে অবস্থান করছেন, তা স্মরণ করা। শাহাদাহ শব্দের অর্থ কেবল 'সাক্ষ্য দেওয়া' নয়; বরং কোনো কিছুর চাক্ষুষ সাক্ষী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া। এ অর্থে শাহাদাহর মাধ্যমে আমরা রুহের জগতের দৃশ্যমান চাক্ষুষ সাক্ষ্যের ঘোষণা দিয়ে থাকি। [১১৬] আমরা যখন বর্তমানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিই, তার মানে মূলত আমরা রুহের জগতের সেই সাক্ষ্যেরই পুনরাবৃত্তি করি। যখন আমরা বলি-'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তখন আমরা শুধু এ কথাই বলি না যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; বরং এ কথাও বলি যে, আল্লাহ ছাড়া জগতের কোনো কিছুরই সত্যিকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ, তিনি সৃষ্টিজগতের সবকিছুরই একাধারে উৎস ও গন্তব্য।
যেকোনো সংখ্যাকে অসীম দিয়ে ভাগ দিলে যেমন শূন্য হয়, তেমনি যেকোনো সসীম সৃষ্টি ও অসীম আল্লাহর ভাগফলও শূন্য হয়।
'পৃথিবীপৃষ্ঠে যা কিছু আছে-সবই ধ্বংসশীল। কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা (সত্তা); যিনি মহীয়ান, গরীয়ান।' সূরা আর-রহমান: ২৭
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো লক্ষ্য, পরিণাম বা গন্তব্যের জন্য বিনিয়োগ করা হলো অনেকটা মরুভূমিতে বরফ বিনিয়োগ করার মতো; যে বিনিয়োগের পরিণামে লোকসান অনিবার্য। আমরা যদি আমাদের পার্থিব কামনা-বাসনাগুলোকে আমাদের খোদা বানিয়ে ফেলি, তাহলে নিরন্তর অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা আমাদের গ্রাস করে রাখে। কেননা, আমাদের আবেগ ও ইচ্ছা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল।
'আসমান ও জমিনে যদি আল্লাহ ছাড়া আরও অনেক উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই (আসমান ও জমিন) ধ্বংস হয়ে যেত। কাজেই আরশের অধিপতি আল্লাহ মহান ও পবিত্র সেসব থেকে, যা তারা তাঁর প্রতি আরোপ করে।' সূরা আম্বিয়া: ২২
যেখানেই পৃথকীকরণ, সেখানে মতের ভিন্নতা; যার অনিবার্য পরিণাম দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ দৃষ্টান্ত পেশ করছেন: এক ব্যক্তির প্রভু অনেক, যারা পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক প্রভুর অনুগত-এ দুজনের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।' সূরা জুমার : ২৯
আপনি যদি এ বিশ্বজগৎকে আপনার প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে আপনি সৃষ্টির সবকিছুর দাসে পরিণত হবেন। কিন্তু আপনি যদি এক আল্লাহকে আপনার একমাত্র প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সৃষ্টিজগতের সবকিছু আপনার দাসত্ব করবে। আল্লাহর ভালোবাসা ও দয়ার প্রবাহ সকল সৃষ্টির মধ্যে সঞ্চারিত করাই হবে আপনার মিশন।
সকল নবি ও রাসূলকে আল্লাহর এককত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের একই বার্তা দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
‘আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং পরিহার করো তাগুতকে। অতঃপর, তাদের মধ্যে আল্লাহ কাউকে হিদায়াত দান করেছেন এবং তাদের মধ্য থেকে কারও ওপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা জমিনে ভ্রমণ করো-অতঃপর দেখ, অস্বীকারকারীদের কী পরিণতি হয়েছে।' সূরা নাহল : ৩৬
আমাদের হৃদয় কেবল তখনই পরম শান্তির স্বাদ অনুভব করতে পারে, যখন আমরা আমাদের সকল কামনা-বাসনাকে এক আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সোপর্দ করত সক্ষম হই। মহানবি বিষয়টিকে এভাবে তুলে ধরেছেন-
'যে ব্যক্তি এর ওপর মৃত্যুবরণ করল-সে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য সম্পর্কে জানে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' [১১৭]
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাক্যটির দুটি অংশ রয়েছে; লা ইলাহা অর্থ-কোনো উপাস্য (ইলাহ) নেই। ইল্লাল্লাহ অর্থ-আল্লাহ ছাড়া। এখান থেকে জানা যায়, আল্লাহ চান তাঁর স্বীকৃতি দেওয়ার পূর্বে আমরা যেন সকল উপাস্যকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিই। যখন হতাশা বা একাকিত্ব আমাদের গ্রাস করে, ভাবি-কেন মানুষ দুনিয়া ত্যাগ করে, কেন কোনো কিছুই স্থায়ী হয় না, কেন আমাদের চারদিকে যা ছড়িয়ে আছে-তাকে মিথ্যা মোহ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না, তখন আমরা লা ইলাহা পর্যায়ে থাকি; যতক্ষণ না ইল্লাল্লাহর দিকে হাঁটা শুরু করি। আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নিলে আমাদের যাবতীয় ব্যথা-বেদনা ও শূন্যতা দূর হয়ে যায়। হৃদয় অনাবিল শান্তিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা হওয়ার উপযুক্ত নই-এই ভেবে আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করা পুরো মাত্রায় ভুল কাজ। মনে রাখতে হবে, আমরা পুরোপুরি নির্ভুল হয়ে যাই-এমনটি আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে আশা করেন না। তিনি চান আমরা আমাদের সকল ত্রুটি-বিচ্যুতিকে সাথে নিয়েই যেন তাঁর কাছে ফিরে আসি। আমরা যখন আমাদের দারিদ্র্য, অভাব ও শূন্যতাগুলোকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিই, তখন তিনি তাঁর দানশীলতা (আল কারিম), পরাক্রমশীলতা (আস-সামাদ) ও ঐশ্বর্যময়তা (আল গানি) দিয়ে সেগুলোকে পূর্ণ করে দেন। আমাদের ঘরকে আলোকিত করতে হলে আমরা যেমন দরজা-জানালা খুলে দিই-যাতে সূর্যের আলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে, তেমনি আমাদের হৃদয়ের ঘরকে আলোকিত করতে হলেও হৃদয়ে দরজা খুলে দিতে হবে, যাতে আল্লাহর নুর সেখানে প্রবেশ করতে পারে।
আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা একটি বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাদের সাথে থাকেন। তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আল্লাহর সাথে আমাদের দূরত্ব তৈরি হয় তাঁকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থেকে। এ কারণে আমরা যখন আমরা অনিশ্চয়তা, সংশয় বা আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করি, তখন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র জিকির আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। এই জিকির আমাদের ভেতরে আল্লাহর নুর প্রবেশ করায়। ফলে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করি এবং আমাদের ভেতরকার ঈমান বিকশিত হতে শুরু করে।
কোনো কিছুকে অস্তিত্বে আনতে হলে সেটির জন্য আগে জায়গা খালি করতে হয়। 'লা ইলাহা'র মাধ্যমে আমরা আগে শূন্যতা তৈরি করি, তারপর 'ইল্লাল্লাহ'র মাধ্যমে সেই শূন্য স্থানকে পূর্ণ করি। লা ইলাহা'র মাধ্যমে আমরা সকল মিথ্যা খোদা, বস্তুগত সম্পদ, দুনিয়ার প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান মানুষ, নিজের লোভ-লালসা ইত্যাদিকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিই। নতুন সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে যেমন পুরোনো ভার্সনকে আনইনস্টল করতে হয়, তেমনি আল্লাহকে হৃদয়ে ইনস্টল করতে পুরোনো সকল খোদাকে আনইনস্টল করতে হয়। অন্য কথায়, ইল্লাল্লাহ'র পূর্বশর্তই হলো-'লা ইলাহা'। আল্লাহকে একমাত্র প্রভু হিসেবে মেনে নিতে হলে আপনাকে দুনিয়াবি সকল খোদা বা খোদাসদৃশ সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করেই আসতে হবে; অন্যথায় আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও সে ঘোষণা হবে কৃত্রিম ও নিষ্ফল।
আপনি যখন আল্লাহর প্রভুত্বকে নিজের ভেতর সত্যিকারার্থে ধারণ করতে পারবেন, তখন যেদিকে আপনি মুখ ফেরাবেন (পূর্ব বা পশ্চিম), কেবল আল্লাহর চেহারাই দেখতে পাবেন। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া ছাড়া কোনো কিছুরই অস্তিত্ব আপনার চোখে পড়বে না। নিচের ঘটনায় এই চিত্র সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে-
'এক সুফি একদিন দেখলেন, একটি বালক জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সুফি ঠিক করলেন, বালকটিকে জীবন সম্পর্কে কিছু শিক্ষা দান করবেন। তিনি বালকটিকে জিজ্ঞেস করলেন- "এ আলো কোথা থেকে এসেছে?” বালকটি প্রথমে আলোর দিকে তাকাল, তারপর তাকাল সুফির দিকে। এরপর আচমকা সে ফুঁ দিয়ে আলো নিভিয়ে দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল- “কিন্তু আলোটা গেল কোথায়?"
ঘটনার আকস্মিকতায় সুফি নির্বাক হয়ে গেলেন। বালকটি যে মহাসত্য উন্মোচন করল, তা হলো-যে উৎস থেকে আলো আসে, অবশেষে একই জায়গায় আলো ফিরে যায়।'
পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে সে কথাই ফুটে উঠেছে- 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন-নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' সূরা বাকারা: ১৫৬
আল্লাহর এককত্বের ভেতর তিনিই শুরু, তিনিই শেষ; তিনিই অতীত, তিনিই বর্তমান, তিনিই ভবিষ্যৎ। আল্লাহর অস্তিত্বের সামনে সব বিচ্ছেদ বিলীন হয়ে যায়, জগতের সবকিছু অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে।
শাহাদাহর দ্বিতীয় অংশ
একজন মানুষ যখন আল্লাহর অস্তিত্বকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর আত্মার সহজাত জ্ঞানকে বাস্তবে পরিণত করে, তখন অনিবার্যভাবে যে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, তা হলো-এ জ্ঞান দিয়ে সে কী করবে? মুসলিমদের জন্য মুহাম্মাদ (সা) হলেন এ প্রশ্নের উত্তর। কুরআনের কথাগুলো লিখিত আকারে আসেনি; বরং ২৩ বছর ধরে নবিজির ওপর কুরআন ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হয়েছে। সাহাবিরা যখন কুরআনের কথা ভাবতেন, তখন তাঁদের কল্পনায় রাসূল (সা)-এর মুখ ও তাঁর কণ্ঠের তিলাওয়াতই ভেসে আসত। এ দৃষ্টিতে আল্লাহর বার্তা ও বার্তাবাহক পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। মুহাম্মাদ (সা) হলেন ইসলামের কালিমার মৌলিক একটি অংশ। কারণ, তিনি আল্লাহর এককত্বের বিশ্বাসকে কাজে পরিণত করে দেখিয়েছেন। তাঁকে পবিত্র কুরআনে 'বিশ্ববাসীর জন্য রহমত' এবং 'উজ্জ্বল প্রদীপ' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি শুধু একজন বার্তাবাহকই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন, আল্লাহর একত্ববাদের সূর্য থেকে সংগৃহীত আলোর পূর্ণিমার চাঁদ। [১১৮] তিনি ছিলেন দুনিয়াতে আল্লাহর দাস ও আল্লাহর প্রতিনিধি-এ দুটি পরিচয়ের সংক্ষিপ্তসার। তাঁর চলার পথ অনুসরণ করার মাধ্যমেই আমরা কেবল সত্য ও বিভ্রমের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারি।
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদ (সা)-কে 'খাতামুন নাবিয়্যিন' [১১৯] বা নবিদের সিলমোহর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি নবুয়তের বিশাল গ্রন্থের শেষ অধ্যায় ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এ গ্রন্থের বাঁধাই (বাইন্ডিং)। তাঁর কাছে যে বার্তাগুলো প্রেরণ করা হয়েছিল, তা ছিল সকল নবি-রাসূলের কাছে প্রেরিত বার্তার নির্যাস। পবিত্র কুরআনে মুসলিমদের বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-
'আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না।' সূরা বাকারা: ২৮৫
যদি প্রত্যেক নবিকে নবুয়তের এক একটি 'পাজল পিস' হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে মুহাম্মাদ হবেন সেই পাজলের চূড়ান্ত পিস-যা নবুয়তের ধারাবাহিকতাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছে। তিনি ফেরেশতা বা অতিমানব ছিলেন না; ছিলেন আমাদের মতোই মরণশীল মানুষ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'বলো, আমি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। আমার নিকট ওহি প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ।' সূরা কাহাফ : ১১০
বর্ণিত আছে, তিনি যখন নামাজ পড়তেন, তখন এতখানি শূন্য হৃদয়ে নামাজ পড়তেন, যেন আল্লাহর স্মরণ ছাড়া জগতে আর কিছুর অস্তিত্ব নেই। তিনি কেবল খাদ্য ও পানি থেকে বিরত থেকেই রোজা করতেন না; বরং তাঁর ও আল্লাহর মধ্যকার যাবতীয় কিছু থেকে বিরত থেকেই রোজা করতেন। তিনি তাঁর অর্থ ও সম্পদ দিয়েই কেবল অভাবগ্রস্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসতেন না; বরং তাঁর সমগ্র অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিতেন।
মহানবি তাঁর নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে পূর্ণভাবে সঁপে দিয়ে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র প্রকৃত অর্থকে বাস্তবে রূপায়িত করেছেন। তাই মহানবি (সা)-এর কার্যক্রম হলো দুনিয়াতে আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন। আল্লাহ তায়ালা এ কথাটি এভাবে বলেছেন-
'আমি তাঁর কান, যা দিয়ে সে শোনে, তাঁর চোখ-যা দিয়ে সে দেখে, তাঁর হাত-যা দিয়ে সে ধরে, তাঁর পা-যা দিয়ে সে হাঁটে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাকে তা দান করি। সে আমার কাছে কোনো কিছু থেকে পানাহ চাইলে আমি তা মঞ্জুর করি।' হাদিসে কুদসি
মহানবি কেবল আল্লাহর পথনির্দেশনার মানচিত্র প্রেরণের বাহনই ছিলেন না; বরং তিনি স্বয়ং ছিলেন সেই মানচিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।' সূরা নিসা : ৮০
মহানবি ছিলেন আল্লাহর নিখাদ আয়না, আল্লাহর ইচ্ছার প্রয়োগের খাঁটি পাত্র। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যারা তোমার কাছে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহর কাছেই আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। তাদের হাতের ওপর রয়েছে আল্লাহর হাত।' সূরা ফাতহ: ১০
আল্লাহ তাঁর অন্যান্য রাসূলদের মতো মুহাম্মাদ (সা)-কে আমাদের জন্য 'সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী' [১২০] হিসেবে প্রেরণ করেছেন।
তিনি বাদশাহ বা শাসক হিসেবে দুনিয়াতে আসেননি; বরং তিনি এসেছিলেন নিরাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবতার জন্য আশার আলো হিসেবে, ভয়ার্ত মানুষের জন্য নিরাপত্তা হিসেবে, দরিদ্র মানুষের জন্য দাতা হিসেবে এবং হতাশাগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রেরণা হিসেবে। তিনি মন্দ মানুষকে ভালো মানুষ বানানোর জন্য আসেননি; তিনি এসেছেন এমন ঝরনা হয়ে, যা ঈমানের মৃত বীজে প্রাণের সঞ্চার করে।
কে ছিলেন মুহাম্মাদ
মুহাম্মাদ-এর বংশধারা ওপরের দিকে ইবরাহিম (আ)-এর সাথে যুক্ত হয়েছে, যিনি ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম তিন জাতির একত্ববাদের জনক। [১২১] মুহাম্মাদ ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬২ বছর বয়সে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ৪০ বছর বয়সে ফেরেশতা জিবরাইল-এর মাধ্যমে প্রথম ওহিপ্রাপ্ত হন।
প্রথম কিছুদিন তিনি গোপনে আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত বার্তাগুলো পরিচিত মহলের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন এবং একপর্যায়ে আল্লাহর নির্দেশে বহুবাদী মক্কার মানুষের কাছে একত্ববাদের ধারণা উপস্থাপন করেন। মক্কার অভিজাত ও নেতৃত্বস্থানীয় বংশ কুরাইশদের নেতাদের কাছে তিনি ঘোষণা করলেন, আল্লাহ তাঁকে বার্তাবাহক (রাসূল) হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি বললেন— ‘হে কুরাইশগণ! আমি যদি বলি—পাহাড়ের পেছনে একটি বড়ো সেনাবাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাহলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?’ মানুষের ভিড় থেকে বলা হলো—‘হ্যাঁ। কেননা, আমরা তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি।’ [১২২]
মক্কার লোকেরা মহানবি (সা)-কে এত বিশ্বাস করত যে, তাঁকে আস-সাদিক বা সত্যবাদী ও আল আমিন বা নির্ভরযোগ্য বলে ডাকত। তাঁর সততার আকাশচুম্বী সুনাম থাকা সত্ত্বেও মক্কার অধিকাংশ লোক তাঁর রাসূল মনোনীত হওয়ার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করল। তবুও মক্কার কুরাইশদের শত্রু ও সহিংস প্রতিরোধের মুখে মুহাম্মাদ তাঁর বার্তা প্রচার চালিয়ে গেলেন।
তেরো বছর ধরে মক্কাবাসীর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন সহ্য করার পর অবশেষে মহানবি মদিনায় হিজরত করলেন। মদিনার লোকেরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করল এবং তিনি মদিনায় একটি নতুন ইসলামি সমাজ বিনির্মাণ করলেন। সেখানে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আল্লাহর একত্ববাদের ধারণা এতখানি জনপ্রিয়তা অর্জন করল যে, মক্কার কুরাইশদের অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব হুমকির সম্মুখীন হলো।
কয়েকটি সংঘাত সংঘর্ষের পর অবশেষে বড়ো যুদ্ধ এড়াতে মুসলিম ও মক্কাবাসীদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হলো—যার নাম হুদাইবিয়ার সন্ধি। আপাত দৃষ্টিতে এ সন্ধি ছিল মক্কার অনুকূলে; কিন্তু এ চুক্তির পর মুসলিমরা স্বাধীনভাবে তাদের বার্তা সম্প্রসারণ ও সামাজিক ভিত্তি মজবুত করার দিকে মনোনিবেশের সুযোগ পেল। ফলে দলে দলে লোকেরা ইসলামের সুমহান আহ্বানে সাড়া দিতে থাকল। ওই সন্ধি সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে— ‘নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।’ সূরা ফাতাহ: ১
হুদাইবিয়ার চুক্তি স্বাক্ষরের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মক্কার কুরাইশরা চুক্তিভঙ্গ করল, ফলে এই চুক্তি অকার্যকর হয়ে গেল। ফলে রাসূল ১০ হাজার অনুসারী নিয়ে মক্কা অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে মক্কার নিয়ন্ত্রণ লাভ করলেন। তিনি প্রচলিত সকল নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করে পরাজিতপক্ষের লোকদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। যারা বছরের পর বছর ধরে নিপীড়ন চালিয়ে তাঁর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, তারা রাসূল-এর ক্ষমা পেয়ে অভিভূত হয়ে গেল।
জীবনের শেষ বছরগুলোতে মহানবি মুসলিম বিশ্বের সীমানা সংরক্ষণ, আরবের গোত্রীয় সংঘাত নিরসন এবং ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণের দিকে তাঁর মনোযোগ নিবদ্ধ করলেন। নবিজি তাঁর মৃত্যুর বছর (৬৩২ সালে) জীবনের প্রথম ও শেষ হজ সম্পাদন করেন। মহানবি (সা)-এর মৃত্যুর ১৪০০ বছর পরও তাঁর ক্ষমা, দয়া, বিশ্বাস ও ধৈর্যের শিক্ষা দুনিয়ার আনাচে-কানাচে কোটি মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
মুহাম্মাদ (সা)-এর জীবনের কয়েকটি ঘটনা বিরল সততা ও পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত দুটি পক্ষের ভেতর শান্তি স্থাপনের বিস্ময়কর ক্ষমতার জন্য দুনিয়াজুড়ে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে রাসূল বিশেষ সম্মানের পাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছেন। নিচের ঘটনায় এ রকম একটি চমৎকার উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছিলেন-
একবার কাবার একটি অংশ আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল। তখন কাবা ঘরে কয়েকশো মূর্তি ছিল। মক্কায় হজ করতে আসা বিভিন্ন গোত্রের হাজিরা এ মূর্তিগুলোকে কাবা ঘরে এনে স্থাপন করেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত কাবা ঘর সংস্কার করা শেষ হলে বিভিন্ন গোত্রের নেতারা কাবার দেয়ালে স্থাপিত পবিত্র কালো পাথর (হাজরে আসওয়াদ) সরানোর উদ্যোগ নিল। কিন্তু মক্কার বিভিন্ন গোত্রের নেতারা পাথরটিকে সরানোর সম্মানসূচক কাজ কে করবে, তা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলো; এমনকী এ নিয়ে সংঘাতের সূত্রপাতও হলো। একজন বয়স্ক লোক বিবাদমান পক্ষগুলোকে থামিয়ে একটি সমঝোতায় পৌছাল। ঠিক হলো-পরবর্তী সময়ে যে ব্যক্তি প্রথম কাবায় প্রবেশ করবে, তাঁর সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিষয়টির সুরাহা হবে। তখনও পর্যন্ত নবুয়ত লাভ না করা মুহাম্মাদ প্রথম কাবায় প্রবেশ করলেন। তিনি সবটা শুনে একটি চমৎকার সমাধান দিলেন।
প্রথমে তিনি একটি বড়ো চাদর আনতে বললেন, এরপর পাথরটিকে চাদরের মধ্যে রাখলেন, এরপর প্রতিটি গোত্রের একজন করে নেতাকে চাদরের একেকটি প্রান্ত ধরতে বললেন। সকলে মিলে নতুন স্থানে পাথরটিকে নিয়ে গেলে। এবার মুহাম্মাদ নিজ হাতে পাথরটিকে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করে দিলেন। এভাবে একটি সংঘাতমূলক পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান হলো।
নবুয়ত প্রাপ্তির আগে থেকেই রাসূল (সা)-এর মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনের অসাধারণ সৃজনশীলতা কার্যকর ছিল। একেবারে ছেলেবেলা থেকে তিনি সমাজে শান্তি স্থাপনের উপায় খুঁজে বেড়াতেন।
ক্ষমতা, সম্পদ বা সুনাম অর্জন মহানবি নবিজির লক্ষ্য ছিল না। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তোষ অর্জন। এমনকী মহানবি (সা)-এর একজন অনুসারী একবার তাঁর কুটির ঘরের দারিদ্র্য দশা স্বচক্ষে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। রাসূল তাঁর কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন-যখন রোম ও পারস্যের সম্রাটরা আরাম-আয়েশ ও জাঁকজমকভাবে জীবনযাপন করছে, তখন আল্লাহর রাসূল এমন শক্ত মাদুরে শুয়ে রাত্রিযাপন করছে যে, তাঁর শরীরে মাদুরের দাগ ফুটে উঠছে। এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তিনি কাঁদছেন। রাসূল জবাবে বলেছিলেন, এ দুনিয়ার আরাম-আয়েশের কোনো মূল্য তাঁর কাছে নেই। রাসূল (সা)-এর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল পরকালের ওপর, যেখানকার আরাম-আয়েশ হবে সীমাহীন, যেখানকার সৌন্দর্য হবে অতুলনীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সেখানে তিনি থাকবেন তাঁর প্রভুর সবচেয়ে নিকটে। [১২৩]
এমনকী ইসলামের বিজয়ের পর বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ তাঁর হস্তগত হলেও তিনি সেখান থেকে নিজের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য কোনো সম্পদ গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন শান্ত ও বিনয়ী একজন মানুষ। তিনি কারও ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করেননি; যদিও তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ রাসূল, মুসলিম বিশ্বের নেতা ও শাসক। তিনি ছাগলের দুধ দোহাতেন, [১২৪] নিজের ছেঁড়া কাপড়ে তালি জুড়ে দিতেন এবং দৈনন্দিন সাংসারিক কাজ করতেন। [১২৫]
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।' সূরা আহজাব: ২১
রাসূল (সা)-এর রেখে যাওয়া উদাহরণের মাধ্যমেই আমরা কুরআনের শিক্ষা বাস্তবে রূপায়িত করার প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকি। মহানবি তাঁর সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রুর প্রতিও দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শন করতেন। তাঁর জীবনের একটি বিখ্যাত ঘটনা ছিল এমন-
রাসূল (সা)-এর প্রতিবেশী ছিলেন এক বৃদ্ধা মহিলা। বৃদ্ধা রাসূল (সা)-এর দিকে প্রতিদিন ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করতেন। কারণ, তিনি রাসূল (সা)-এর প্রচারিত বক্তব্যের সাথে একমত ছিলেন না। একদিন রাসূল লক্ষ করলেন, বৃদ্ধাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তিনি বৃদ্ধাকে খুঁজতে বের হলেন এবং জানতে পারলেন, বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। রাসূল অসুস্থ বৃদ্ধাকে দেখতে গেলেন। বৃদ্ধা যখন জানতে পারলেন রাসূল তাকে দেখতে এসেছেন, তখন তিনি রাসূল (সা)-এর বদান্যতায় অভিভূত হয়ে গেলেন এবং অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করলেন। [১২৬]
অন্য একটি ঘটনা। মক্কার মূর্তিপূজারিদের অত্যাচার যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন একবার রাসূল (সা)-এর সাহাবিরা রাসূল (সা)-কে বললেন- তিনি যেন শত্রুদের প্রতি অভিসম্পাত করেন, যাতে তারা ধ্বংস হয়ে যায়। রাসূল জবাবে বললেন- 'নিশ্চয়ই আমি অভিশাপ দেওয়ার জন্য প্রেরিত হইনি; আমি কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি। [১২৭] রাসূল যখন তায়েফ নগরীতে ইসলামের আহ্বান নিয়ে গেলেন, তখন তায়েফের লোকেরা তাঁর প্রতি পাথর নিক্ষেপ করল এবং তাঁকে অপদস্থ করল। এমন নাজুক মুহূর্তেও রাসূল তায়েফবাসীর ধ্বংস কামনা করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেননি; বরং তিনি তাদের জন্য দুআ করেছেন এই আশায় যে, তাদের বংশধররা হয়তো ইসলামের বক্তব্য গ্রহণ করবে। [১২৮]
রাসূল বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ের ভেতরে কল্যাণময়তার বীজ বসবাস করে এবং আল্লাহ ইচ্ছা করলে যেকোনো মুহূর্তে এ বীজ বিকশিত হতে পারে। রাসূল-এর চোখ ছিল আধ্যাত্মিকতার গভীরতাসম্পন্ন। ফলে তিনি কোনো কিছুর বাহ্যিক দিকগুলোর পাশাপাশি অন্তর্নিহিত দিকগুলোর প্রতিও দৃষ্টিপাত করতে পারতেন। তিনি বীজের ভেতর ফুল দেখতে পেতেন, রাতের ভেতর ভোর দেখতে পেতেন, বাঁকা চাঁদের ভেতর পূর্ণিমা দেখতে পেতেন। তিনি মানুষের সর্বোচ্চ সুন্দর রূপটি দেখতে পেতেন। মানুষের সবচেয়ে বড়ো সম্ভাবনাগুলো তাঁর চোখে পড়ত। তিনি ভালোবাসা ও অন্তর্ভেদী কথা দিয়ে মানুষের ভেতরের সৃজনশীলতাকে পরিচর্যা করতেন।
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মাদ-এর নাম বিশেষ মর্যাদার সাথে উচ্চারিত হয়েছে। সূর্যের আলোকে বোঝাতে কুরআনে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, মুহাম্মাদ (সা)-এর আলো দানকারী প্রকৃতিকে বোঝাতে একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সূর্যের আলো সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'কতই না কল্যাণময় তিনি; যিনি আসমানে নক্ষত্ররাজির সমাবেশ ঘটিয়েছেন এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সিরাজান) আর আলো বিকিরণকারী চন্দ্র!' সূরা ফুরকান: ৬১
মুহাম্মাদ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও আলোকদীপ্ত প্রদীপ (ওয়া সিরাজান) হিসেবে।' সূরা আহজাব : ৪৬
সূর্য যেমন অস্ত গেলেও হারিয়ে যায় না, তেমনি মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষার আলো তাঁর অগণিত অনুসারীর হৃদয়কে আলোকিত করে চলেছে।
রাসূল খোদা নন; কেবল একজন মানুষই ছিলেন। তাই তাঁর মানবীয় বৈশিষ্ট্য তাঁর জীবন ও সকল মানুষের জীবনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করে। আপনি যদি শরণার্থী হয়ে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন-মুহাম্মাদ আপনার ব্যথা বোঝেন। কেননা, তিনিও একজন শরণার্থী ছিলেন, যাকে তাঁর দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আপনি যদি প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাতর হয়ে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন-মুহাম্মাদ আপনার কষ্ট অনুভব করতে পারেন। কেননা, তিনি জীবদ্দশায় তাঁর প্রিয় স্ত্রী ও তিন শিশুপুত্রকে হারিয়েছেন। আপনি যদি ইয়াতিম হয়ে জন্ম নিয়ে থাকেন অথবা আপনি যদি জীবদ্দশায় আপনার বাবা-মা-কে হারিয়ে থাকেন, তাহলে জানুন-মুহাম্মাদ আপনার দুঃখ বোঝেন। কেননা, তিনি জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছেন, মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন। আপনি যদি আপনার বন্ধুমহল ও পরিবারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে জানুন-তিনি আপনার সমব্যথী। কেননা, তিনি তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের দ্বারা মানসিক ও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন। যদি দুনিয়ার কেউ আপনাকে গুরুত্ব না দেয় বা অবহেলা করে, তাহলে জেনে রাখুন-মহানবি আপনার কষ্ট বুঝতে পারেন। কেননা, তিনি মানুষকে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা বোঝাতে তাঁর বহু বছর লেগেছে।
আপনি যে অবস্থায় নিপতিত হন না কেন, রাসূল আপনার সে অবস্থার অনুভূতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেছেন এবং আপনি যে উচ্চতর অবস্থানে যেতে চান না কেন, তিনি সেই শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। আপনার সবচেয়ে বড়ো সাফল্য বা সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতার মুহূর্তেও তাঁকে আপনি দৃষ্টান্ত ও পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। কেননা, তাঁর জীবন এমন এক কম্পাস-যা আপনাকে জান্নাতের চূড়ায় পৌছে দিতে পারে।
মুহাম্মাদ আমাদের মনে করিয়ে দেন আমরা কে
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মহানবি (সা)-কে এভাবে সম্মানিত করেছেন-'আর নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত। [১২৯] অনেক বিশ্লেষকের মতে, আল্লাহ যখন রাসূল (সা)-কে 'তুমি' বলে সম্বোধন করেন, তখন তিনি মানবজাতির প্রত্যেকের বক্ষস্থিত হৃদয়কেও সম্বোধন করে থাকেন। কারণ, সকল মানুষ এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্ট। সূরা আ'রাফ: ১৮৯
আমরা যখন মুহাম্মাদ (সা)-এর কথা আলোচনা করি এবং তাঁর জন্য দরুদ পাঠ করি, তখন আমরা মূলত আল্লাহর ইবাদতেই লিপ্ত হই। কেননা, আমরা আল্লাহর নির্দেশেরই অনুসরণ করছি। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবির প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবির জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো।' সূরা আহজাব: ৫৬
মহানবি (সা)-এর নবুয়তি আলোর (নুর মুহাম্মাদ) স্মরণ আমাদের ভেতরের কল্যাণময়তার বীজকে বিকাশে সাহায্য করে। আমরা যখন রাসূল (সা)-এর প্রতি সালাম প্রেরণ করি, তখন আমরা মূলত নিজের প্রতিও সেই সালাম প্রেরণ করে থাকি।
আমরা যতই মানবীয় মনস্তত্ত্ব আবিষ্কার করছি, ততই দেখতে পাচ্ছি-মানবীয় সীমাবদ্ধতার দেয়ালকে ভাঙতেই দুনিয়াতে নবি-রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। দৌড়বিদ রজার ব্যানিস্টার-এর উদাহরণ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যেতে পারে-
১৯৫৪ সালে রজার ব্যানিস্টার নামে এক দৌড়বিদ মানবেতিহাসে প্রথমবারের মতো চার মিনিটের কম সময়ে এক মাইল দূরত্ব অতিক্রমের রেকর্ড স্থাপন করে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ব্যানিস্টারের এ রেকর্ড গড়ার কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকজন দৌড়বিদ চার মিনিটের কম সময়ের মধ্যে এক মাইল দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ব্যানিস্টার মূলত কোনো রেকর্ড ভাঙেননি, তিনি শুধু মানুষের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে দেখিয়ে দিয়েছেন-মানুষের পক্ষে কী করা সম্ভব! [১৩০] একইভাবে আল্লাহ তাঁর নবি-রাসূলদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন আধ্যাত্মিকতার সামনের বাধা অপসারণের জন্য, যাতে মানুষ তার নিজের সম্ভাবনা বিকাশের জন্য উপযুক্ত দৃষ্টান্ত চোখের সামনে দেখতে পায়।
সূর্যের সাথে তুলনা করলে মহানবি (সা)-কে পূর্ণিমার চাঁদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। কেননা, তিনি আল্লাহর পরম সত্যের দিকে মুখ করে আছেন এবং আমাদের আত্মার ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করে চলেছেন। তিনি আল্লাহর বার্তার সাথে নিজের বিনয়, নম্রতা, দয়া, ভালোবাসা ও ক্ষমার গুণকে একীভূত করেছেন। তাঁর কাজ ওহির চেতনার পর্দাকে উন্মোচিত করেছে, তাঁর কথা মানুষের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণার অপনোদন করেছে, তাঁর চরিত্র ইবাদতের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং তাঁর পুরো জীবন আল্লাহর একত্ববাদ ধারণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে। রাসূল আমাদের শিখিয়েছেন-কী করে হিংসা, কাম, ক্রোধ, লোভ, অহংকারের মতো কুপ্রবৃত্তিগুলো থেকে বেঁচে থাকা যায়, কী করে তওবা ও জিকিরের মাধ্যমে নিজের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে তোলা যায়। রাসূল আমাদের শিখিয়েছেন, জগতে যা কিছু আমরা দেখি-তা হলো সেই জিনিসের প্রতিফলন, যা আমরা নিজের ভেতর বহন করে চলেছি। কাজেই আমাদের জীবনকে বদলাতে হলে আমাদের হৃদয়কে বদলানোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
পচে যাওয়া হৃদয়ের সাথে সৎকর্ম একটি কপটতা এবং পবিত্র হৃদয়ের সাথে সৎকর্মহীনতা একটি বিভ্রম। মহানবি আমাদের শিখিয়েছেন-কীভাবে অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধি ও বাহ্যিক আনুগত্যের সমন্বয় সাধান করে আধ্যাত্মিক পূর্ণতার যাত্রাপথে এগিয়ে যেতে হয়। মহানবি বলেছেন- 'আমি মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পূর্ণতা সাধনের জন্য দুনিয়াতে এসেছি।' [১৩১]
রাসূল দেখিয়ে গেছেন, নেতৃত্ব মানে কর্তৃত্ব নয়; বরং নেতৃত্ব মানে ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে অনুপ্রাণিত করা।
টিকাঃ
১১৬. এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে, সকল মানুষের রুহ সৃষ্টির পর সব রুহকে আল্লাহ জিজ্ঞেস করেছিলেন-'আমি কি তোমাদের রব নই?' সবগুলো রুহ জবাবে বলেছিল- 'নিশ্চয়ই, এ ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।' সূরা আ'রাফ: ১৭২
১১৭. তিরমিজি
১১৮. মহানবি -এর স্ত্রী আযিশা বলেছেন-'নিশ্চয়ই করআনই ছিল প্রিয়নবির চরিত্র।'
১১৯. সূরা আহজাব: ৪০
১২০. সূরা বাকারা: ১১৯
১২১. মুসা ছিলেন ইবরাহিম-এর দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক-এর বংশধর এবং মুহাম্মাদ ছিলেন ইবরাহিম-এর প্রথম পুত্র ইসমাইল-এর বংশধর।
১২২. বুখারি, মুসলিম
১২৩. বুখারি, মুসলিম
১২৪. আহমাদ
১২৫. বুখারি
১২৬. Arbil, Majd. 'The Compassion of the Prophet Towards Those Who Abused Him.' IslamiCity, June 26, 2018
১২৭. মুসলিম
১২৮. বুখারি, মুসলিম
১২৯. সূরা কালাম: ৪
১৩০. Taylor, Bill. 'What Breaking the Four-Minute Mile Taught Us About the Limits of Conventional Thinking.' Harvard Business Review. April 10, 2018