📄 1:1
'আর রাহমান' এবং 'আর রাহীম' শব্দদ্বয় সূরা ফাতিহার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ্র এ দু'টো গুণ আল-কুরআনে যথাক্রমে ৫৭ ও ৯৫ বার উল্লিখিত হয়েছে। কাজেই, কোন অনুসন্ধিৎসু মন এ দু'টো গুণের তাৎপর্য অনুধাবনের চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক।
যেসব অগণিত দান ও নেয়ামতের মধ্য দিয়ে দয়াবান-মেহেরবান আল্লাহ্ তাঁর 'রহমত'-এর বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন এবং তাঁর আলোচ্য গুণাবলির সত্যতা ও যথার্থতা প্রতিপন্ন করেছেন, বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ঐ সব গুণাবলির কয়েকটিমাত্র নিম্নে তুলে ধরা হল:
১. মাতৃগর্ভে মানুষের জীবনের ইতিহাস নিয়েই শুরু করা যায়। মাতৃগর্ভনামক এই স্থানটি এক ধরনের তরল পদার্থের পরিপূর্ণ এক আবদ্ধপ্রায় কক্ষ বিশেষ। এটি এক অভিনব কলাকৌশলও বটে। যার মধ্যে আল্লাহর সীমাহীন করুণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কেননা, এতে রয়েছে তরল পদার্থে নিমজ্জিত ভ্রূণকে বহিঃস্থ আঘাত এবং ক্ষতিকর জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্যে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই আদর্শ পরিবেশে ভ্রূণটি পুষ্টিপ্রাপ্ত হয় এবং গর্ভধারণকৃত ক্ষুদ্র ডিম্বাণু সুনির্দিষ্ট আকৃতিসহ বড় হয়ে একটি পূর্ণ শিশুতে পরিণত হয়। মাতৃগর্ভে শ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়াই একটি শিশুর বেঁচে থাকা আরেক বিস্ময়। ৪ থেকে ৮ পাউন্ড ওজন বিশিষ্ট একটি শিশুর এক সংকীর্ণ পথে নিরাপদে ভূমিষ্ট হওয়াও আল্লাহ্ করুণাপূর্ণ কৌশলসমূহের আরেক দৃষ্টান্ত।
২. পরম করুণাময় আল্লাহ্ তা'আলাই পিতা-মাতার হৃদয়ে অপরিমেয় ভালবাসা সৃষ্টি করেন যা ব্যতিরেকে এই বিশ্বের এক অজানা-অচেনা ঋরিবেশে একটি শিশুর বেঁচে থাকার কথা চিন্তাই করা যায় না। এ ধরনের সন্তান স্নেহ-বাৎসল্য সকল জীবের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়।
৩. একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েই তার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বোত্তম আদর্শ পুষ্টি তার মায়ের বুকের দুধের মধ্যে আগে থেকেই প্রস্তুত অবস্থায় পায়।
৪. জন্মগ্রহণের সাথে সাথেই একটি শিশু আল্লাহর মেহেরবাণী হিসেবে বিনা ব্যয়ে প্রচুর পরিমাণে বায়ু, পানি (আর্দ্রতা), তাপ এবং আলো পেয়ে থাকে, যা ছাড়া পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব অসম্ভব হয়ে পড়ত। উল্লেখ্য যে, বায়ু অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, আর্দ্রতা এবং কার্বন-ডাইঅক্সাইড-এর সঠিক অনুপাত বিশিষ্ট একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ মিশ্রণ, যা স্বাভাবিক জীবনের গতিপ্রবাহ ও কার্যক্রমের নিয়ামক। বাতাসের উপাদানসমূহের ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতিও আল্লাহ্ কর্তৃক প্রায় অপরিবর্তনীয়ভাবে রক্ষিত হয়ে থাকে যে প্রক্রিয়ায় ক্রিয়াশীল রয়েছে গাছ-পালা, মানুষ, জীবজন্তু এবং অতি ক্ষুদ্রদেহী অণুজীবের মধ্যকার স্বনিয়ন্ত্রিত চক্র।
৫. এছাড়া, আল্লাহ্ মানবদেহে বিভিন্ন আকারে বহু প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা দান করেছেন। সেগুলো নিম্নরূপঃ
ক. অনমনীয় অথচ নরম চামড়ার আবরণী, যার রয়েছে বিস্ময়কর সৃষ্ট নব নব পুনর্নির্মাণ ও মেরামত ক্ষমতা এবং অসংখ্য সংজ্ঞাবহ স্নায়ু প্রান্তসীমা।
খ. চোখের পাপড়ির খোলা ও বন্ধ হওয়া এবং অশ্রু গঠন ক্ষমতা, যা বহিঃস্থ বস্তু বিদূরণ এবং চোখের কর্ণিয়াকে আর্দ্র রাখতে সহায়ক।
গ. চোখের উপরিস্থিত ভ্রু, যা ধাঁধানো আলো থেকে চোখকে ছায়া দিয়ে রক্ষা করে।
ঘ. হাত ও পায়ের নখ, যা দৃঢ়তা দান করে।
ঙ. বৃদ্ধাঙ্গুলি, যার রয়েছে মুষ্টিবদ্ধ করার ক্ষমতা।
চ. মূত্রনালি এবং মলদ্বারস্থ গোলাকৃতির নিয়ন্ত্রক পেশী, যা মলমূত্রের বেগ ধারণের অক্ষমতা রোধ করে।
ছ. অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ প্রতিরোধে সঠিক মাপে রক্তের জমাট বাঁধার ক্ষমতা।
৬. দেহাভ্যন্তরস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যাবলি যথা: হৃদপিণ্ড, যা রক্ত পাম্প করে; ফুসফুস, যা অক্সিজেন গ্রহণ ও কার্বন-ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে এবং রক্ত পরিশোধন করে; ক্ষুদ্রান্ত্র, যা (খাদ্য) হজম করে এবং পুষ্টি শোষণ করে; যকৃৎ, যা প্রধানত ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যাদির বিষক্রিয়া রোধ করে; বৃক্কদ্বয়, যা রক্ত শোধন করে থাকে; এবং মস্তিষ্ক, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সচেতন প্রয়াস ছাড়াই দেহের ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃত কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে থাকে; এসবই আমাদের প্রতি আল্লাহ্র করুণার আরেক প্রমাণ।
৭. রোগ-ব্যাধি সৃষ্টিকারী জীবাণু এবং অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আত্মরক্ষার জন্যে মানবদেহ ব্যবস্থার অভ্যন্তরে প্রতিরক্ষা বস্তুর উৎপাদনও আল্লাহর করুণার স্বাক্ষর বহন করে।
৮. দয়াবান, মেহেরবান আল্লাহই মেহেরবানী করে ফল, শস, শাকসব্জি, মাছ-মাংস ইত্যাদি আকারে মানবজাতির জন্যে, বস্তুত সকল জীবের জন্যেই হরেক রকম পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্যের ব্যবস্থা করেছেন।
৯. সূর্য আমাদের পৃথিবীর শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সূর্য থেকে আগত বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বিকিরণসমূহের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য, বেতার তরঙ্গ, বর্ণালীর প্রান্ত-বহির্ভূত রশ্মি, দৃশ্যমান আলো, হৃস্বতর অতি বেগুনী রশ্মি এবং রঞ্জন রশ্মি। সূর্যের বহির্দেশীয় বায়ুমণ্ডল থেকে সৃষ্ট সৌর ঝড়ে রয়েছে স্কুলাণু আইওন ও ইলেক্ট্রোন, যা ঘন্টায় নয় লাখ মাইল বেগে পৃথিবীতে আঘাত হানে। কখনও কখনও সূর্যের পরিপার্শ্বস্থ সৌর কলংক এলাকায় এমন সুতীব্র ঘটনাবলি ঘটে যায় যাতে সূর্য দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। এ ধরনের দহনকালে বর্ণালির উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কণা, রঞ্জন-রশ্মি এবং অন্যান্য বিকিরণ পৃথিবীতে এসে পড়ে। যেসব মহাজাগতিক রশ্মি অবিরাম পৃথিবীর বহিঃস্থ বায়ুমণ্ডলে আঘাত হানে সেগুলো হচ্ছে সুতীব্র বেগে ছুটন্ত অণুসমূহের নিউক্লিয়াস। এগুলোর অধিকাংশের উৎপত্তি হয় সূর্য থেকে এবং সম্ভবত তারকা-বিস্ফোরণের কারণে। মহাজাগতিক রশ্মি যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপর ক্রিয়া করে, তখন মারাত্মক রঞ্জন-রশ্মি এবং অতি বেগুনী রশ্মি সৃষ্টিকারী সৌর কর্মকাণ্ড ছাড়াও এগুলো রঞ্জন রশ্মিও সৃষ্টি করে। রঞ্জন-রশ্মি 'পালসার' নামে এক ধরনের (আন্তঃ তারকামণ্ডলীয়) নিউট্রন তারকা বিপুল পরিমাণ প্রাণঘাতী রঞ্জন রশ্মি তৈরি করে। সৌর ঝড়, মহাজাগতিক রশ্মিমালা, অতি বেগুনী রশ্মি এবং রঞ্জন রশ্মির তীব্রতা পৃথিবীতে জীবনের জন্যে ভয়ঙ্কর প্রমাণিত হতে পারত, যদি না মেহেরবান আল্লাহর বিভিন্ন রশ্মি প্রতিরোধক বায়ুমণ্ডল তথা আয়নোস্কেয়ারে স্বয়ং ক্রিয়া-কৌশলের ব্যবস্থা রাখতেন এবং পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের (ম্যাগনেটোস্ফেয়ার) সাহায্যে ইলেক্ট্রন ও আয়নের জন্যে এক ধরনের ফাঁদের ব্যবস্থা যদি না করতেন, যা দ্বারা এ সকল প্রাণঘাতী বিকিরণ এবং কণা আমাদের পৃথিবীতে এসে পড়া ঠেকানো যায়।
১০. অপর এক অনন্য সৃষ্টির মধ্য দিয়েও আল্লাহ্ তাঁর নিয়ামত প্রকাশ করেছেন। আর তা হলো পানি। জীবজগতের অস্তিত্বের ব্যাপারে পানির ভূমিকা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। সম্ভবত জলজ জীবের হিমায়িত হয়ে মারা পড়া থেকে রক্ষার ব্যাপারে পানি যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা খানিকটা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এটাই একমাত্র জানা পদার্থ যা তরল অবস্থায় ৪ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড (সঠিকভাবে বলতে গেলে ৩.৯৮ সেন্টিগ্রেড কিংবা তারও কম) তাপমাত্রা থেকে ০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় এটি কঠিন বরফ অবস্থা ধারণ করে এবং তখনকার তুলনায় অধিক ঘন থাকে। ফলে, ০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড কিংবা
তারও কম তাপমাত্রাবিশিষ্ট বরফখণ্ড পানিতে ভেসে থাকে। বলা যেতে পারে, এই বরফের পাতগুলোই আবার তাপ অপরিবাহীর ভূমিকা পালন করে, যে কারণে উদাহরণস্বরূপ, বরফপাতগুলোর উপরের বা বাইরের তাপমাত্রা দীর্ঘদিন ধরে হিমাঙ্কের নীচে থাকলেও সম্পূর্ণ হ্রদের পানি হিমায়িত হয়ে কঠিন পদার্থে পরিণত হয় না।
অপরদিকে, বরফ যদি পানির চেয়ে ভারী হত, তাহলে তা তলায় ডুবে যেত এবং সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে উঁচু স্তূপে পরিণত হত। এভাবে, হিমমণ্ডলীয় হ্রদ, নদী, পুকুর ইত্যাদি অঞ্চলের এবং সুমেরু সাগর হিমায়িত হয়ে কঠিন বরফে পরিণত হত। পরিণামে, প্রায় সমস্ত জলজ জীবই হিমায়িত হয়ে মারা পড়ত। পানি হিমায়িত হয়ে বরফ আকারে পানির উপরে ভেসে থাকার যে অনন্য গুণ বা ধর্ম, তার মধ্য দিয়েই এমনকি প্রতিকূল হিমমণ্ডলীয় অঞ্চলেও জীবনের টিকে থাকা এবং সফলতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের অপার মহিমা প্রকাশ লাভ করছে। এভাবে, সৃষ্টিজগত নিয়ে গভীরভা? চিন্তা করলে আল্লাহর করুণা ও দানের অগণিত দৃষ্টান্ত আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়।
তথ্যসূত্র:
1. Baqi. M. F. A.. Al-Mu'jamul Mufahras II-Alfazil Quran 1364/1940.
p. 307.
📄 1:2
'রাব্বুল আলামিন'-এর অর্থ এই যে, আল্লাহ্ সমগ্র জগতসমূহের লালন ও পালনকর্তা। প্রচলিত অর্থে 'জগৎ' শব্দের বহুবাচনিক ব্যবহার করা হয়েছে উদ্ভিদ জগত, প্রাণী জগত, মানব জগত এবং বস্তুজগত বুঝাতে। বহুবাচনিক রূপ তথা জগৎসমূহ-এর ব্যবহারের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে, আমাদের পরিচিত জগতের ভিতরে ও বাইরে আরো জগৎ রয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আমাদেরকে এ সকল জগতকে দৈর্ঘ্য পরিমাপক এককের ভিত্তিতে শ্রেণী-বিন্যাস করতে সাহায্য করে।
এই পরিমাপক এককটি কত বিশাল কিংবা কত ক্ষুদ্র? প্রোটনের মত মৌলিক কণার ক্ষেত্রে এই এককটি ১০-১৩ সেন্টিমিটার কিংবা তারও কম। অপরদিকে, এই বিশ্বের জ্ঞাত অংশের আকার হচ্ছে প্রায় ১০২৮ সেঃ মিঃ।১ আজ পর্যন্ত জ্ঞাত আল্লাহ্ তা'আলার ক্ষুদ্রতম ও বৃহত্তম সৃষ্টির মধ্যে কী বিশাল ব্যবধান। এই বিশাল পরিমাপককে চারটি সুবিধাজনক ধরনের অংশ বা আকারে বিভক্ত করা যেতে পারে। যেমন:
১. প্রোটন থেকে বিশালাকার অণুর জগত।
২. বিশাল অণু থেকে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত (অর্থাৎ ১০-৫ সেঃ মিঃ থেকে ১০+৫ সেঃ মিঃ)।
৩. আমাদের গ্রহ পৃথিবী (১০৯ সেঃ মিঃ)।
৪. আমাদের এই পৃথিবী থেকে বিশ্বজগতের জ্ঞাত অংশ (অর্থাৎ ১০৯ সেঃ মিঃ থেকে ১০২৮ সেঃ মিঃ)।
দৈর্ঘ্য পরিমাপকের উপরোক্ত ৪ ভাগে বিভক্তকরণ একতরফা বা বিধি বহির্ভূত হতে পারে। তবে, এ সকল অংশ চারটি ভিন্ন ধরনের জগতের প্রতিনিধিত্ব করে। মজার ব্যাপার হলো যে, বস্তুর দৈর্ঘ্য পরিমাপক বিভিন্ন অঞ্চলে
১. সংখ্যাটির অর্থ হলো ১ (এক)-এর পর ২৮টি শূন্য বসাতে হবে। অর্থাৎ ১০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০। সংখ্যাটি কত বিশাল তা বুঝার জন্য চিন্তা করুন যে, এই দূরত্ব অতিক্রম করতে ৩০১০১০ সেঃ মিঃ/সেঃ (অর্থাৎ ১,৮৬,০০০ মাইল/সেকেন্ড) বেগে পরিভ্রমণকারী আলোর সময় লাগবে মোট ১ হাজার বছরেরও বেশী
(১ বিলিয়ন = ১০৯ বছর)।
ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে থাকে। নিম্নে আলোচিত বিভিন্ন জগতের সহজাত বৈশিষ্ট্য থেকে এ বিষয়টি পরিষ্কার হবে:
আকার-১ ভুক্ত জগতসমূহ: অতি সূক্ষ্ম সৃষ্টি তথা মৌলিক কণা,
পরমাণু-কেন্দ্র, অণু ইত্যাদি জগতসমূহের কথা বিবেচনা করা যাক। এই সব জগতের নিয়ম বিধান আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা সরাসরি বোধগম্য হয় না। এ জগতের গঠন-উপাদানসমূহ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তু আমরা কেন দেখতে পাই না তা বুঝতে হলে পর্যবেক্ষণ ব্যাপারটা আসলে কী রকম তা অনুধাবন করা দরকার। আমরা যখন কোন বস্তু দেখি, তখন আলোক তরঙ্গ ঐ বস্তু থেকে ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাদের চোখের মধ্যে প্রবেশ করে। এখন যদি একটা আলোকতরঙ্গ কোন বস্তুর উপর পতিত হয় এবং তা বস্তুটিকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন বা গ্রাস করে তাহলে স্পষ্টতই তা থেকে আলো ছড়িয়ে পড়তে পারে না। এভাবে, কোন বস্তু থেকে আলো ছড়িয়ে পড়তে হলে বস্তুটির আকার তার উপর আপতিত দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গের তুলনায় অবশ্যই বড় হতে হবে। একটি পরমাণুর আকার দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গের তুলনায় অনেক বড় বিধায় যখন কোন পরমাণুর উপর একটা আলোকতরঙ্গ এসে আপতিত হয় তখন এটা সমগ্র পরমাণুটিকেই ঢেকে ফেলে। ফলত এ থেকে আলোক বিচ্ছুরিত হতে পারে না। আর এ কারণেই পরমাণু দৃষ্টিগোচর হতে পারে না। পরমাণু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হলে আমাদেরকে পরমাণুর আকার অপেক্ষা ক্ষুদ্র আলোকতরঙ্গ ব্যবহার করতে হবে।
কিন্তু এ সকল তরঙ্গ আমাদের চোখে দৃষ্টিগোচর হয় না। এগুলো হচ্ছে রঞ্জনরশ্মি কিংবা আরো বেশি শক্তিশালী গামা রশ্মি। দৃশ্যমান আলোকতরঙ্গের তুলনায় এই সব হ্রস্ব তরঙ্গ অনেক বেশী তেজস্বী। এ সকল তেজস্বী তরঙ্গের মাধ্যমে পরমাণু পর্যবেক্ষণে একটা সমস্যা রয়েছে। তাহলো কোন কণা সম্পর্কে কোন নির্দিষ্ট মুহূর্তে তথ্য সংগ্রহ করার অর্থ আমাদেরকে অবশ্যই ঐ কণার অবস্থান এবং গতিও নির্ণয় করতে হবে। কিন্তু, উদাহরণস্বরূপ ইলেক্ট্রনের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য যখন শক্তিশালী বিকিরণ ব্যবহার করা হয় (অর্থাৎ ইলেক্ট্রনটি কোথায় এবং এটি কী করছে অর্থাৎ এর অবস্থান ও গতি), তখন বিকিরণটির প্রবাহ ইলেক্ট্রনটিকে প্রবলভাবে ধাক্কা বা ঝাঁকুনি দেয় এবং এতে ইলেক্ট্রনটির অবস্থান ও গতি উভয়ই বিঘ্নিত হয়। বিচ্ছুরিত বা অপরিবর্তিত বিকিরণ অবশ্য ইলেক্ট্রনটির অবস্থান ও গতি সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রদান করে বটে, কিন্তু বিকিরণ প্রবাহ দ্বারা বিঘ্নিত না হলে ইলেক্ট্রনটির অবস্থান ও গতি যা থাকত, এই অবস্থান ও গতি তা নয়। কাজেই, যে সময়ে বিকিরণ প্রবাহ ইলেক্ট্রনে প্রবেশ করে তখনকার তথ্য সম্পর্কে খানিকটা অনিশ্চয়তা থাকে বৈকি। অবশ্য, ইলেক্ট্রনের
অবস্থান ও গতির পরিমাপের অনিশ্চয়তা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। বস্তুত, এ সকল অনিশ্চয়তার গুণফলের মান 'এইচ' (h) পর্যায়ের (প্ল্যাঙ্ক-এর স্বতঃসিদ্ধ ধ্রুবক)। এটি হাইসেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি নামে পরিচিত। এই সব কিছু এটাই স্পষ্ট করে তুলছে যে, শক্তিশালী বিকিরণ প্রয়োগ করে আমরা ইলেক্ট্রনের অবস্থা সম্পর্কে যে সত্য খুঁজে পাই তা শুধু আপেক্ষিক বা অপ্রকৃত সত্য মাত্র, আসল বা প্রকৃত সত্য নয়। প্রকৃত সত্য থেকে অপকৃত সত্য কতখানি ভিন্ন হবে তা নির্ভর করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ করার সময় সংশ্লিষ্ট বস্তুটিকে কতটা বিঘ্নিত বা বিক্ষুব্ধ করা হয়েছে তার উপর। ব্যাপারটা সূক্ষ্ম জগতের দার্শনিক দিক সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয় অর্থাৎ এ ধরনের জগতে পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রমটাই একটা বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ব্যাপার এবং প্রতিটি পদক্ষেপই পর্যবেক্ষণাধীন বস্তুর উপর ক্রিয়া করে। এটা এমন একটা ব্যাপার যা আজ পর্যন্ত বিশালতর বস্তুজগতে দেখা যায়নি। সত্যি বলতে কি, সূক্ষ্ম জগত 'কোয়ান্টাম মেকানিক্স' নামে ভিন্ন এক ধরনের বলবিদ্যা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যা বৃহত্তর পরিমাপের বস্তুর গতি নিয়ন্ত্রক প্রচলিত বলবিদ্যা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ক্ষুদ্র বস্তুর গতি সূত্র আর বৃহৎ বস্তুর গতি সূত্র নাটকীয়ভাবে পরস্পর থেকে ভিন্ন। ব্যাপারটা দৈর্ঘ্য পরিমাপের ভিত্তিতে বিভিন্ন জগতের শ্রেণী বিন্যাসের প্রতি অধিকতর সমর্থন যোগায় বটে।
আকার-২ ভুক্ত জগতসমূহ: এ সব জগতের বস্তু সরাসরি আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। আমরা এগুলো দেখতে পাই এবং মজার ব্যাপার হলো, আমরা যখন এগুলো দেখি তখন আমরা এসবের উপর কোন বিঘ্ন সৃষ্টি করি না, যা আমরা সূক্ষ্মতম বস্তুজগতের ক্ষেত্রে করে থাকি। কেন আমরা এক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণাধীন বস্তুকে বিক্ষুব্ধ করি না তা একটি পিঁপড়াকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট করে তোলা যায়। পিপীলিকার আকার দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যের তুলনায় অনেক বেশী বড়। কাজেই, পিপীলিকা হতে আলো সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে যে কারণে একটি পিপীলিকা সহজেই দৃশ্যমান হয়। সত্য বটে, পিপীলিকার উপর আপতিত (আলোক কণা) ফোটন পিপীলিকার উপর ঝাঁকুনি দেয় বৈকি, কিন্তু তা ইতিপূর্বে সূক্ষ্ম জগতের আচরণ সম্পর্কিত আলোচনাপর্বে বিবেচিত ইলেক্ট্রনের ভরের তুলনায় তেমন একটা ধর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে না। যেহেতু পর্যবেক্ষণ কর্ম পর্যবেক্ষণকৃত বস্তুর অবস্থান ও গতির উপর কোন পরিবর্তন সূচিত করে না, তাই এ সকল জগতে পর্যবেক্ষক এখানকার কোন ঘটনায় প্রভাব বিস্তার করে না। অর্থাৎ পর্যবেক্ষক বা পরিমাপক পরিমাপকৃত বস্তুকে বিচলিত বা বিক্ষুব্ধ করে না। আবার, এ জগতসমূহে গতিবিদ্যা বিষয়ক আচরণ বর্ণনার জন্য প্রচলিত বল-বিদ্যাই নিখুঁতভাবে উপযুক্ত বলে মনে হয়।
আকার-৩ ভুক্ত জগতসমূহঃ দৈর্ঘ্য পরিমাপক ভিত্তিতে জগতসমূহের শ্রেণী বিন্যাসে আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহটিকে এক অনন্যসাধারণ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এমনটি করার কারণ এই যে, আল্লাহর প্রতিনিধি মানুষ সহ বহু জীবের জীবন ও পরিবেশকে আল্লাহ্ বায়ুমণ্ডল, মাধ্যাকর্ষণীয় ক্ষেত্র এবং পৃথিবীর গতি ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল করে দিয়েছেন। পৃথিবীর নিজ অক্ষের চারদিকে ঘুর্ণন এবং সূর্যের চারদিকে আবর্তনের কারণে আমরা একটা প্রমাণ সময় পাই। যথাযথভাবে ক্ষুদ্রতর বিভাগে পৃথিবীর ব্যাস আমাদেরকে দেয় দৈর্ঘ্যের মান। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টান পৃথিবী পৃষ্ঠের সকল জীবনের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীর ভূমি, পানি এবং বায়ু ব্যবস্থাসমূহ পৃথিবী নামক এই গ্রহস্থিত সর্ব আকারের প্রাণের অস্তিত্বের পক্ষে সূক্ষ্ম প্রতিবেশীয় ভারসাম্য স্থাপন করে। এই গ্রহটি তার নিজ আকার-আয়তনের তুলনায় বিশ্বজগতের বিশালতার ব্যাপ্তি কতটুকু তা বুঝতেও আমাদেরকে খানিকটা হলেও সাহায্য করে। এভাবে, অনেক দিক বিবেচনায়, পৃথিবী গ্রহটি নিজেই একটা জগত হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার মত যথেষ্ট বিশেষ মর্যাদাজনক স্থান অধিকারের দাবী রাখে। এ গ্রহটির গতি প্রচলিত বলবিদ্যা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা আগে থেকে অনুধাবনযোগ্যও বটে।
আকার-৪ ভুক্ত জগতসমূহ: এবার আমরা এসে পড়েছি বহু যোজন দূরে
মহাকাশে এবং বহু ক্ষেত্রেই আমাদের আলোচ্য বিষয় বিশাল বিশাল দূরত্ব আর বিপুল ভরবিশিষ্ট তারকারাজি। এ ধরনের বস্তুর গতির ক্ষেত্রে নিউটনীয় পদার্থবিদ্যার সূত্র ও ধারণাসমূহ প্রয়োগ করা হয়ে থাকলেও গতির সঠিক বর্ণনার জন্য বিশেষ ও সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ উভয়ই এ বিষয়ে জড়িত। বিশাল বিশাল দূরত্বের কারণে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সব মহাজাগতিক বস্তু সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয় সাধারণত বেতার সংকেতের সাহায্যে। আকার-৪ এর 'ব্যাপ্তি-বিস্তৃতি অত্যন্ত ব্যাপক হওয়ায় বিপুল সংখ্যক জগতকে এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। বস্তুত বিস্ময়কর বৈচিত্র্য সহ এ ধরনের বহু জগত (জীব ও জড়) মহাবিশ্বের অন্যত্র থাকতে পারে, যাদের আকার-আকৃতি আমাদের এই বিশ্বেরই অনুরূপ, কিংবা হতে পারে এ থেকে একেবারেই ভিন্নতর কিছু।
পৃথিবীটা সূর্য নামক নক্ষত্রেরই একটি গ্রহ। সূর্য নামক এই নক্ষত্রটি আবার ছায়াপথ নামক গ্যালাক্সির অন্তর্ভুক্ত এক সদস্য। আর, মহাবিশ্বে প্রায় ১০ কোটি ছায়াপথের সন্ধান এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
নক্ষত্রসমূহের রয়েছে সূর্যের সাথে তুলনীয় ধর্ম-তাদের ভর, উপরিভাগের তাপমাত্রা, আলোর তীব্রতা, স্থিতিশীল অবস্থায় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বয়স (প্রধান ধারা অনুক্রমে) ইত্যাদি ক্ষেত্রে। আর সম্ভবত এ ধরনের নক্ষত্রের রয়েছে তাদের চারদিকে আবর্তনশীল গ্রহসমূহ যাদের বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর অনুরূপ। ছায়াপথ নামীয়
গ্যালাক্সীর এক-চতুর্থাংশ গ্রহেরই এ ধরনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একমাত্র আমাদের ছায়াপথেই যুগ্ম ও যৌগিক নক্ষত্র মিলে প্রায় দু'হাজার কোটি নক্ষত্র রয়েছে বলে প্রাক্কলন করা হয়।
ইতোমধ্যে শনাক্তকৃত বা আবিষ্কৃত ১০ কোটি গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করলে এবং সব ধরনের সীমাবদ্ধতার বিষয় মেনে নিলেও নিঃসন্দেহে ১০০ কোটি নক্ষত্রে প্রাণী আছে বলে যে হিসাব করা হয় তাকে খুবই সতর্কতাপূর্ণ হিসাব বলে মানতেই হবে।১
পৃথিবীতে প্রাণ-রসায়ন নির্ভর করে দু'টি জিনিসের উপর। এক, জটিল কার্বন (অঙ্গার) যৌগের উৎপাদন এবং দুই, দ্রাবক হিসেবে তরল পানির উপস্থিতি। অন্য নক্ষত্রসমূহের বাসযোগ্য গ্রহগুলোতে প্রাণ-রসায়ন পৃথিবীর মত হুবহু একও হতে পারে, কিংবা হতে পারে ভিন্ন রকম কিছুও। দৃষ্টান্তস্বরূপ, মৌলিক প্রাণ-রসায়ন উপাদান হিসেবে সিলিকন তথা বালু কণা হতে পারে কার্বন বা অঙ্গারের বিকল্প, তেমনি তরল এমোনিয়া হতে পারে দ্রাবকের ভূমিকা পালনকারী ইত্যাদি।
বর্তমানে যেভাবে হিসাব করা হয় তাতে স্থিতিশীল অবস্থায় শত শত কোটি বছর আয়ু বিশিষ্ট (প্রধান ধারা অনুক্রমে) সূর্যের মত নক্ষত্রগুলোর অন্তত একটা করে এমন গ্রহ আছে যেখানে প্রাণের সঞ্চার ও বিস্তার লাভ ঘটেছে। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত আন্তঃতারকামণ্ডলীয় অঞ্চলে ফরমালডিহাইড এবং সেলুলোজ ইত্যাদির মত রাসায়নিক অণু সহ ৪০ টি বিভিন্ন ধরনের জটিল অণুর সন্ধান পাওয়া গেছে। বিশ্বজগতের অন্যত্রও যে প্রাণের উন্মেষ ঘটে থাকতে পারে, এটা তার এক জোরালো ইঙ্গিত বহন করে।
বিভিন্ন ধরনের জগতের উপর উপরোক্ত আলোচনা এ সত্যের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে যে, আল্লাহ্ যদি নিজকে জগতসমূহের পালনকর্তা হিসেবে ঘোষণা না করে শুধু এই বিশ্বের পালনকর্তা ঘোষণা করতেন, তাহলে বিভিন্ন জগতের এইসব সূক্ষ্ম জটিলতা ও বৈশিষ্ট্যসমূহের তেমন কোন অর্থ থাকত না। বস্তুত বিভিন্ন ধরনের যেসব জগতকে আমরা দৈর্ঘ্য পরিমাপকের ভিত্তিতে শ্রেণীবিন্যাস করেছি, যা কিনা একমাত্র মৌলিক জিনিস এবং যার পরিমাপে আমরা সক্ষম হয়েছি, সেগুলো সবদিক দিয়েই ভিন্ন। প্রত্যেক ধরনের জগতেরই রয়েছে নিজস্ব গঠন-কাঠামো, রয়েছে অনুসন্ধানী কৌশল এবং বলবিদ্যা। আর একমাত্র আল্লাহই সকল জগতসমূহের সার্বিক তথ্যাদি অবগত আছেন।
উপরে আলোচিত বস্তুগত জগতসমূহ এবং তাদের শ্রেণীবিন্যাস ছাড়াও আধ্যাত্মিক জগতও এক বিস্ময় বটে। যাহোক, আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যা
কিছু অস্ত্র ও কলাকৌশল আমাদের হাতে রয়েছে তা দিয়েও আধ্যাত্মিক জগতকে সেভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয় যেমনটা সম্ভব জীবজগত ও জড় জগতের ক্ষেত্রে। হতেই পারে যে, বস্তুর উপর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের জন্যে বর্তমানে যেসব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে তা আধ্যাত্মিক জগতের রহস্য উন্মোচনে একেবারেই অনুপযুক্ত। এ কারণেই আমরা আধ্যাত্মিক জগত সম্পর্কে তথ্যাদি দিতে বা বিস্তারিত আলোকপাত করতে পারছি না, যা শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অনুধাবন করা সম্ভব।
জগতসমূহের লালন-পালন: এ পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন জগতের
গঠন-কাঠামো আলোচনা করেছি মাত্র। এবার আসা যাক তাদের লালন-পালন প্রসঙ্গে। জগতটা ক্ষুদ্রই হোক আর বিশালই হোক, আল্লাহ্ সংশ্লিষ্ট জগতের সকল অধিবাসীকে লালন-পালনের চমৎকার আয়োজন করে রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে সূক্ষ্ম জগতের কথাই বিবেচনা করা যাক। বিপুল সংখ্যক অণুজীব আমাদের জীবন ও পরিবেশ বেষ্টন করে আছে। এদের মধ্যে এমনও অনেকগুলো আছে যাদের ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হত। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, আণুবীক্ষণিক ছত্রাক এত ক্ষুদ্রাকৃতির যে শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া এদেরকে খালি চোখে দেখাই যায় না। এই সকল অণু-জীবকে অত্র আলোচনার শুরুতে উল্লিখিত প্রথম ও দ্বিতীয় পরিমাপকের মধ্যবর্তী একটা জগতে স্থান দেয়া যেতে পারে। এই সব জীব নানান প্রকৃতির এবং সে কারণে এদের খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা ও পদ্ধতিও নতুন ধরনের। এদের কতক খাদ্য সংগ্রহ করে মাটি থেকে, কতক উদ্ভিদ দেহ থেকে আবার কতক খাদ্য সংগ্রহ করে প্রাণীদেহ থেকে। আর এরা সকলেই খাদ্য মজুদ করে থাকে। আল্লাহ্ এ সকল অণুজীবের মাধ্যমে গাছপালা এবং উন্নত প্রাণীদের লালন-পালনের ব্যবস্থাও করেছেন। এ সকল অণুজীবকে সৈন্যের সাথে তুলনা করা যায়-আল্লাহ্ তাদেরকে যুদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়েছেন, দিয়েছেন বিস্তার লাভের ক্ষমতাও। এই বিস্তার যদি হয় ব্যাপকতর এবং তা কোন জীবনের জন্য যদি হয়ে দাড়ায় হুমকিস্বরূপ, তাহলে প্রকৃতিতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে এসব অণুজীবের সংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা রোধ করতে আল্লাহ্ জীব বৈজ্ঞানিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। সূক্ষ্ম-জগত থেকে এখন যদি আমরা পোকা-মাকড়, পক্ষীকুল, পশু, গাছপালা এবং মানুষের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাই, তাহলে জীবনের এ সকল উন্নত আকার বা স্তরের বিরাজমান বিস্ময়কর বৈচিত্র্যও সহজেই আমাদের নজর কাড়ে। প্রত্যেক আকারের প্রাণের রয়েছে নিজস্ব খাদ্য, নিজস্ব যোগযোগ সংকেত, আছে নিজস্ব ঘরদোরের ধরন, আর বংশবৃদ্ধির ব্যবস্থা। তবে লক্ষ্য করার মত বিস্ময়কর ব্যাপারটা হলো যে, আল্লাহ্ কাউকেই পাদ্য, আশ্রয় আর প্রতিক্ষা ব্যবস্থাহীন অবস্থায় রাখেন নি। সূক্ষ্ম জগতের অধিবাসীই হোক কি বৃহৎ জগতের, তাদের জন্যে রয়েছে জীবিকা অর্জনের উপায়; আর আল্লাহই তাদের রিযিকদাতা।
অবশ্য, রাব্বুল আলামিন বলতে আমরা যদি আল্লাহ্ জীব জগতসমূহের লালন-পালনকর্তাই বুঝি, তাহলে কাহিনীটা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। জগতের পালনকর্তা বলতে আসলে জীবন ও জড় উভয় জগতকেই বুঝায়। জীব জগতের লালন-পালনের ব্যাপারের সাথে আমরা পরিচিত হলেও জড়বস্তুর লালন পালনের বিষয়টি আমাদের কাছে খানিকটা অদ্ভুৎ লাগতে পারে। বাস্তব সত্য হলো যে, জড় বস্তুর টিকে থাকার ব্যবস্থা না থাকলে জীবের অস্তিত্ব বজায় রাখাই সম্ভব হতো না। আল্লাহ্ প্রাণের অস্তিত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে মৌলিক পদার্থসমূহের স্থিতিশীলতার ব্যবস্থা করেছেন। বস্তু নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের মধ্য দিয়ে এই স্থিতিশীলতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরমাণু যদি স্থিতিশীল না হত, তাহলে সৌরজগৎ ব্যবস্থাও স্থিতিশীল হত না। বস্তুর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আল্লাহ্ চারটি বলের প্রবর্তন করেছেন, যথা: আণবিক বল, দুর্বল আণবিক বল, ত্বড়িৎ-চৌম্বকীয় বল এবং মাধ্যাকর্ষণ বল। প্রথম তিন ধরনের বল ক্রিয়াশীল রয়েছে ইতিপূর্বে আলোচিত আকার-১ এবং আকার-২ ব্যাপ্তি জুড়ে আর চতুর্থ বল যদিও সর্বজনীন, এটি আকার-২, আকার-৩ এবং আকার-৪ এর অন্তর্ভুক্ত বৃহৎ বস্তুর মধ্যে ক্রিয়াশীল। মজার ব্যাপার হলো, সূর্য ও তার গ্রহসমূহ সমন্বয়ে যেমন বৃহৎ সৌর ব্যবস্থা অস্তিত্বমান রয়েছে, তেমনি রয়েছে নিউক্লিয়াস এবং এর চতুর্দিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান ইলেক্ট্রন নিয়ে সূক্ষ্ম সৌর ব্যবস্থার অস্তিত্ব। বৃহৎ সৌরজগত একটি আকর্ষণধর্মী মাধ্যাকর্ষণীয়, বিপরীতমুখী বর্গীয় বল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, অর্থাৎ দু'টো বস্তুর মধ্যকার দূরত্বের বিপরীত বর্গের আনুপাতিক বল। সূক্ষ্ম সৌর ব্যবস্থাটি একটা আকর্ষণধর্মী বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা Coulomb বল নামে পরিচিত। এ বলটিও একটি বিপরীত বর্গীয় বল। এ দু'টি জগত মাপের বিচারে বিশালভাবে আলাদা, এদেরকে নিয়ন্ত্রণকারী বলদ্বয় শক্তিতে আকাশ পাতাল ফারাক (বস্তুত মাধ্যাকর্ষণ বল বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বলের তুলনায় ১০+৩৮ গুণ দুর্বল)। তথাপি, বলগুলোর দূরত্ব সাপেক্ষতা একই থাকছে। কী অপূর্ব বস্তু সংগঠন যাতে প্রমাণ করা যায় যে, সূক্ষ্মতম বিধৃতিও হতে পারে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি বস্তু যদি এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হয় কিংবা বস্তু যদি শক্তিতে এবং শক্তি যদি বস্তুতে রূপান্তরিত হয় তাহলে এই রূপান্তর প্রক্রিয়া এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে, আজ পর্যন্ত জানা মতে, সকল প্রকার জীব ও তাদের পরিবেশের সাথে খাপ খায় প্রকৃতির এমন প্রতিবেশিক ভারসাম্য সংরক্ষিত।
অত্যন্ত মজার ব্যাপার যে, আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে জীব ও জড় উভয় প্রকারের নতুন নতুন জগত আবিষ্কৃত হচ্ছে। জানা যায় যে, চৌদ্দ শতাধিক বছর আগে আল্লাহ্ আল-কুরআনে বিভিন্ন আয়াতে জগত শব্দটির বহবচন ব্যবহারের মাধ্যমে এ ধরনের সমস্ত জগত সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছেন।
উপসংহারে এ কথা বলা যায় যে, জীব ও জড় বস্তুর বিভিন্ন ধরনের যে সকল জগতের কথা এ পর্যন্ত আলোচিত হল, সে সবই আল্লাহ্ কর্তৃক চমৎকার এক বিধানসমষ্টি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিচালিত ও লালিত-পালিত হয়ে থাকে। বস্তুত আল্লাহই জগতসমূহের লালন ও পালনকর্তা।
তথ্যসূত্র:
1. Barnard Lovell, In the Centre of Immensities 1971, Hutchinson, London.
📄 2:3
যারা (যারা আল্লাহকে ভয় করে) অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, সালাত কায়েম করে ও তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।
অদৃশ্যে বিশ্বাস: এই সূরায় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন 'অদৃশ্যে' বিশ্বাসের বিরাট গুরুত্ব আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ্র নিকট থেকে হিদায়েত পেতে হলে তাকওয়ার পরেই অদৃশ্যে বিশ্বাস এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ আবশ্যকীয় শর্ত।
এ ধরনের বিশ্বাস কি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অযৌক্তিক? বাস্তবে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। স্যার আর্থার এডিংটন ফ্লার বিখ্যাত ক্যামব্রিজ বক্তৃতামালায় দেখিয়েছেন যে, পদার্থবিদ্যার সকল মৌলিক সূত্র এবং ধ্রুবক স্পষ্টতই পূর্বানুমান নির্ভর মূলনীতি থেকে গৃহীত। বস্তুগত জগতের ব্যাখ্যায় এ সকল সূত্র অত্যন্ত সফল। কাজেই তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, 'যুক্তিতর্কের যুগেও বিশ্বাসের স্থান সর্বোচ্চেই রয়ে যায়। কেননা, যুক্তি হচ্ছে বিশ্বাসেরই অন্যতম ভিত্তি।
কিছু কিছু দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিষয়টা পরিষ্কার করা যাক্। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা যাত্রাই শুরু করে আলোকরশ্মি বহনকারী ফোটন নামে এক অদ্ভুত কণার অস্তিত্ব কল্পনা করে। কণার কোন মাত্রা কিংবা বিদ্যুৎশক্তি নেই। অন্য কোন ভৌত বস্তুর মত এর কোন ধর্মও নেই। স্থির অবস্থায় এর ভর শূন্য আর চলন্ত অবস্থায় এর ভর অপরিমাপযোগ্য। বিজ্ঞানের যে শাখা এই অনুমানের গোড়াপত্তন করে সেটাকে মানব বুদ্ধিমত্তার অন্যতম বিরাট সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
ডি ব্রোগুলি (De Broglie) অনুমান করেন যে, চলন্ত অবস্থায় সকল আণুবীক্ষণিক কণাকেই একটি তরঙ্গের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে। এটাই বস্তু তরঙ্গ নামে পরিচিত। এটা যেহেতু একটা জটিল তরঙ্গ, এর কোন সাদৃশ্য বা উপমা নেই এবং এর প্রকৃতি সম্পূর্ণরূপে বস্তু নিরপেক্ষ। তরঙ্গ দৈর্ঘ্য, স্পন্দন সংখ্যা এবং গতিবেগ এই তিনটি রাশির যে কোন দু'টি পরিমাপের মাধ্যমে কোন তরঙ্গ সম্পূর্ণরূপে নির্ধারিত হয়। সুপরিচিত বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় এবং যান্ত্রিক তরঙ্গের এ সবগুলো রাশির ধ্রুবক পরিমাপ করা সম্ভব। কিন্তু বস্তু তরঙ্গের ক্ষেত্রে, কোন যন্ত্র দিয়ে স্পন্দন সংখ্যা এবং তরঙ্গ গতি কখনোই নির্ধারণ করা যায় না। বস্তুতরঙ্গ একটি গাণিতিক কৌশল, পর্যবেক্ষণ দ্বারা যাকে সঠিকভাবে বর্ণনা করা
যায় না। তথাপি, এই বস্তুতরঙ্গে বিশ্বাস দ্বারা আণবিক ও পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার জটিল সমস্যাসমূহের সমাধান করা যায়। এভাবে দেখা যাচ্ছে যে, আধুনিক পদার্থবিদ্যায় বস্তুতরঙ্গ একটি বিশ্বাসের বিষয়বস্তু।
একটি চলমান কণা একটি তরঙ্গের ন্যায় আচরণ করে-এ হচ্ছে একটা বিশ্বাস। আর তরঙ্গ বলবিদ্যা এই বিশ্বাসেরই উপর ভিত্তিশীল। হেইসেনবার্গের অনিশ্চয়তা মূলনীতির বক্তব্য অনুযায়ী একটা কণার অবস্থান ও গতি একই সাথে সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায় না এবং এ সকল পরিমাপের অনিশ্চয়তার গুণফলও একটা নির্দিষ্ট ন্যূনতমের চেয়ে কম হতে পারে না। এই সর্বনিম্ন সীমার অস্তিত্ব প্রথমদিকে বিশ্বাসের বিষয় ছিল যার ফলে ধারণা করা হত যে, ক্রিয়ার ক্ষুদ্রতম একক আছে। এই বিশ্বাস পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হলে ক্রিয়ার ক্ষুদ্রতম একক পাওয়া যায়: h=৬.৬৩ × ১০-৩৪ joule-sec যা প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক নামে পরিচিত।১
আপেক্ষিকতাবাদে স্থানের সাথে সময়ের উপর নির্ভরশীল ফলাফলকে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মতবাদটি স্বয়ং অনুমান নির্ভর। বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদগণ আজ পর্যন্ত সকল পর্যবেক্ষকের সাধারণ বর্গীয় বৈশিষ্ট্যসমূহের আত্মমুখী প্রভাব দূর করতে সক্ষম হননি। আপেক্ষিকতাবাদ আবারো মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার এক বিশাল বিজয় হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে।
আধুনিককালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের 'একীভূত ক্ষেত্র মতবাদ' সম্পর্কিত ঘোষণার মধ্যেও বিশ্বাসের ভূমিকা স্পষ্ট বোঝা যায়। এই মহান বিজ্ঞানী তাঁর জীবনের শেষ ৩০ টি বছর ব্যয় করেছেন মহাকর্ষবল আর ত্বড়িৎ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রকে একত্রে যুক্তকারী কোন বৃহত্তর সূত্র আছে কিনা তার সন্ধানে। তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার এই বিশ্বাসের উপর স্থির ছিলেন যে, এ রকম একটা সূত্র আছেই। প্রফেসর ডঃ আবদুস সালাম সহ বিজ্ঞানীরা আংশিক সফলতা সহ এর উপর এখন পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছেন। সালামের গবেষণার বিষয়বস্তু হচ্ছে বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটা 'মহা সমন্বয় মতবাদ' খুঁজে বের করা। এ সবের মধ্যে রয়েছে: মাধ্যাকর্ষণ, ত্বড়িৎ-চৌম্বকীয়, দুর্বল আণবিক শক্তি ও শক্তিশালী আণবিক শক্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। এ সকল দৃশ্যত বিচ্ছিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে সমন্বিত করার প্রচেষ্টা কেন? মোটের উপর, এ সকল বলের সমন্বয় ছাড়াও তো প্রকৃতিকে বুঝতে আমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। আসলে, এই সকল বলকে একটি বলে সমন্বিত করার অভিপ্রায় বিজ্ঞানীদের মধ্যে জমেছে এই বিশ্বাস থেকে যে, এ বলগুলো একটি একক
১. এই ধ্রুবককে স্পন্দনসংখ্যা দ্বারা গুণ করা হলে ফোটন নামক প্রতিটি আলো প্রবাহের সাথে
সংশ্লিষ্ট ন্যূনতম শক্তির পরিমাণ পাওয়া যায়।
সত্ত্বারই ভিন্ন ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বোঝা যায়, ত্বড়িৎ-চৌম্বকীয় এবং দুর্বল আণবিক বলদ্বয়কে সমন্বিত করার ব্যাপারে সালামের প্রচেষ্টা ও সফলতার মূলে ছিল সূরা আল-মূলক-এর ৩য় ও ৪র্থ আয়াতদ্বয়ের প্রেরণা যা তাঁর মধ্যে সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা ও সঙ্গতি সম্পর্কে অনড় বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
কাজেই, সূত্রসমূহের মধ্যে বিশিষ্ট কোন নমুনা অনুসন্ধানের২ অর্থই হলো আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের মহাপরিকল্পনায় বিশ্বাস। বস্তুত বিজ্ঞানের জগতে আরো বহু বিষয় আছে যেগুলোর ভিত্তি হলো 'বিশ্বাস'।
আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে উপরোক্ত আলোচনাগুলো জ্ঞানজগতে মানুষের অগ্রগতির পিছনে বিশ্বাসের ভূমিকার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। কাজেই, আল্লাহ্ দাবীকৃত 'অদৃশ্যে' বিশ্বাস অযৌক্তিক নয়। কেননা, অদৃশ্য বস্তু আমাদের বোধগম্যতার বাইরে থাকে আমাদের বর্গীয় সীমাবদ্ধতার কারণে। এখানে যা কিছু বলা হয়েছে তা এ বিষয়টির উপরই জোর দিচ্ছে যে, অদৃশ্যের বিশ্বাস বস্তুগত জগত সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ নাও হতে পারে।
তথ্যসূত্রঃ
1. The Philosophy of the Physical Science. The University of Michigan Press, 1958.
2. The Structure of Scientific Revolutions, Encyclopaedia of Unified Science. The University of Chicago Press, 1974.
যারা (যারা আল্লাহকে ভয় করে) অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, সালাত কায়েম করে ও তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।
অদৃশ্যে বিশ্বাস: এই সূরায় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন 'অদৃশ্যে' বিশ্বাসের বিরাট গুরুত্ব আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ্র নিকট থেকে হিদায়েত পেতে হলে তাকওয়ার পরেই অদৃশ্যে বিশ্বাস এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ আবশ্যকীয় শর্ত।
এ ধরনের বিশ্বাস কি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অযৌক্তিক? বাস্তবে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। স্যার আর্থার এডিংটন ফ্লার বিখ্যাত ক্যামব্রিজ বক্তৃতামালায় দেখিয়েছেন যে, পদার্থবিদ্যার সকল মৌলিক সূত্র এবং ধ্রুবক স্পষ্টতই পূর্বানুমান নির্ভর মূলনীতি থেকে গৃহীত। বস্তুগত জগতের ব্যাখ্যায় এ সকল সূত্র অত্যন্ত সফল। কাজেই তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, 'যুক্তিতর্কের যুগেও বিশ্বাসের স্থান সর্বোচ্চেই রয়ে যায়। কেননা, যুক্তি হচ্ছে বিশ্বাসেরই অন্যতম ভিত্তি।
কিছু কিছু দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিষয়টা পরিষ্কার করা যাক্। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা যাত্রাই শুরু করে আলোকরশ্মি বহনকারী ফোটন নামে এক অদ্ভুত কণার অস্তিত্ব কল্পনা করে। কণার কোন মাত্রা কিংবা বিদ্যুৎশক্তি নেই। অন্য কোন ভৌত বস্তুর মত এর কোন ধর্মও নেই। স্থির অবস্থায় এর ভর শূন্য আর চলন্ত অবস্থায় এর ভর অপরিমাপযোগ্য। বিজ্ঞানের যে শাখা এই অনুমানের গোড়াপত্তন করে সেটাকে মানব বুদ্ধিমত্তার অন্যতম বিরাট সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
ডি ব্রোগুলি (De Broglie) অনুমান করেন যে, চলন্ত অবস্থায় সকল আণুবীক্ষণিক কণাকেই একটি তরঙ্গের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে। এটাই বস্তু তরঙ্গ নামে পরিচিত। এটা যেহেতু একটা জটিল তরঙ্গ, এর কোন সাদৃশ্য বা উপমা নেই এবং এর প্রকৃতি সম্পূর্ণরূপে বস্তু নিরপেক্ষ। তরঙ্গ দৈর্ঘ্য, স্পন্দন সংখ্যা এবং গতিবেগ এই তিনটি রাশির যে কোন দু'টি পরিমাপের মাধ্যমে কোন তরঙ্গ সম্পূর্ণরূপে নির্ধারিত হয়। সুপরিচিত বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় এবং যান্ত্রিক তরঙ্গের এ সবগুলো রাশির ধ্রুবক পরিমাপ করা সম্ভব। কিন্তু বস্তু তরঙ্গের ক্ষেত্রে, কোন যন্ত্র দিয়ে স্পন্দন সংখ্যা এবং তরঙ্গ গতি কখনোই নির্ধারণ করা যায় না। বস্তুতরঙ্গ একটি গাণিতিক কৌশল, পর্যবেক্ষণ দ্বারা যাকে সঠিকভাবে বর্ণনা করা
যায় না। তথাপি, এই বস্তুতরঙ্গে বিশ্বাস দ্বারা আণবিক ও পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার জটিল সমস্যাসমূহের সমাধান করা যায়। এভাবে দেখা যাচ্ছে যে, আধুনিক পদার্থবিদ্যায় বস্তুতরঙ্গ একটি বিশ্বাসের বিষয়বস্তু।
একটি চলমান কণা একটি তরঙ্গের ন্যায় আচরণ করে-এ হচ্ছে একটা বিশ্বাস। আর তরঙ্গ বলবিদ্যা এই বিশ্বাসেরই উপর ভিত্তিশীল। হেইসেনবার্গের অনিশ্চয়তা মূলনীতির বক্তব্য অনুযায়ী একটা কণার অবস্থান ও গতি একই সাথে সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায় না এবং এ সকল পরিমাপের অনিশ্চয়তার গুণফলও একটা নির্দিষ্ট ন্যূনতমের চেয়ে কম হতে পারে না। এই সর্বনিম্ন সীমার অস্তিত্ব প্রথমদিকে বিশ্বাসের বিষয় ছিল যার ফলে ধারণা করা হত যে, ক্রিয়ার ক্ষুদ্রতম একক আছে। এই বিশ্বাস পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হলে ক্রিয়ার ক্ষুদ্রতম একক পাওয়া যায়: h=৬.৬৩ × ১০-৩৪ joule-sec যা প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক নামে পরিচিত।১
আপেক্ষিকতাবাদে স্থানের সাথে সময়ের উপর নির্ভরশীল ফলাফলকে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মতবাদটি স্বয়ং অনুমান নির্ভর। বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদগণ আজ পর্যন্ত সকল পর্যবেক্ষকের সাধারণ বর্গীয় বৈশিষ্ট্যসমূহের আত্মমুখী প্রভাব দূর করতে সক্ষম হননি। আপেক্ষিকতাবাদ আবারো মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার এক বিশাল বিজয় হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে।
আধুনিককালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের 'একীভূত ক্ষেত্র মতবাদ' সম্পর্কিত ঘোষণার মধ্যেও বিশ্বাসের ভূমিকা স্পষ্ট বোঝা যায়। এই মহান বিজ্ঞানী তাঁর জীবনের শেষ ৩০ টি বছর ব্যয় করেছেন মহাকর্ষবল আর ত্বড়িৎ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রকে একত্রে যুক্তকারী কোন বৃহত্তর সূত্র আছে কিনা তার সন্ধানে। তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার এই বিশ্বাসের উপর স্থির ছিলেন যে, এ রকম একটা সূত্র আছেই। প্রফেসর ডঃ আবদুস সালাম সহ বিজ্ঞানীরা আংশিক সফলতা সহ এর উপর এখন পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছেন। সালামের গবেষণার বিষয়বস্তু হচ্ছে বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটা 'মহা সমন্বয় মতবাদ' খুঁজে বের করা। এ সবের মধ্যে রয়েছে: মাধ্যাকর্ষণ, ত্বড়িৎ-চৌম্বকীয়, দুর্বল আণবিক শক্তি ও শক্তিশালী আণবিক শক্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। এ সকল দৃশ্যত বিচ্ছিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে সমন্বিত করার প্রচেষ্টা কেন? মোটের উপর, এ সকল বলের সমন্বয় ছাড়াও তো প্রকৃতিকে বুঝতে আমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। আসলে, এই সকল বলকে একটি বলে সমন্বিত করার অভিপ্রায় বিজ্ঞানীদের মধ্যে জমেছে এই বিশ্বাস থেকে যে, এ বলগুলো একটি একক
১. এই ধ্রুবককে স্পন্দনসংখ্যা দ্বারা গুণ করা হলে ফোটন নামক প্রতিটি আলো প্রবাহের সাথে
সংশ্লিষ্ট ন্যূনতম শক্তির পরিমাণ পাওয়া যায়।
সত্ত্বারই ভিন্ন ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বোঝা যায়, ত্বড়িৎ-চৌম্বকীয় এবং দুর্বল আণবিক বলদ্বয়কে সমন্বিত করার ব্যাপারে সালামের প্রচেষ্টা ও সফলতার মূলে ছিল সূরা আল-মূলক-এর ৩য় ও ৪র্থ আয়াতদ্বয়ের প্রেরণা যা তাঁর মধ্যে সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা ও সঙ্গতি সম্পর্কে অনড় বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
কাজেই, সূত্রসমূহের মধ্যে বিশিষ্ট কোন নমুনা অনুসন্ধানের২ অর্থই হলো আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের মহাপরিকল্পনায় বিশ্বাস। বস্তুত বিজ্ঞানের জগতে আরো বহু বিষয় আছে যেগুলোর ভিত্তি হলো 'বিশ্বাস'।
আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে উপরোক্ত আলোচনাগুলো জ্ঞানজগতে মানুষের অগ্রগতির পিছনে বিশ্বাসের ভূমিকার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। কাজেই, আল্লাহ্ দাবীকৃত 'অদৃশ্যে' বিশ্বাস অযৌক্তিক নয়। কেননা, অদৃশ্য বস্তু আমাদের বোধগম্যতার বাইরে থাকে আমাদের বর্গীয় সীমাবদ্ধতার কারণে। এখানে যা কিছু বলা হয়েছে তা এ বিষয়টির উপরই জোর দিচ্ছে যে, অদৃশ্যের বিশ্বাস বস্তুগত জগত সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ নাও হতে পারে।
তথ্যসূত্রঃ
1. The Philosophy of the Physical Science. The University of Michigan Press, 1958.
2. The Structure of Scientific Revolutions, Encyclopaedia of Unified Science. The University of Chicago Press, 1974.
📄 2:19
অথবা তাদের দৃষ্টান্ত এরূপ যে, আকাশে বৃষ্টির পানি ভরা মেঘপুঞ্জ, এর সাথে ভীষণ অন্ধকার, মেঘ গর্জন ও বিদ্যুতের ঝলকও রয়েছে; এরা বজ্রের গর্জন শুনে মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেয়, কিন্তু আল্লাহ্ এই অবিশ্বাসীদেরকে সকল দিক দিয়ে বেষ্টন করে নিয়েছেন।
বৃষ্টিভরা মেঘমালা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলীয় বাষ্পের পুঞ্জ যা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এ ধরণের মেঘমালা, যার সঙ্গে গর্জন ও বিদ্যুৎ চমকও থাকে তাকে 'cumulo nimbus' অথবা thunder-heads বলা হয়। এসব দেখতে বড় বড় পাহাড়ের মত-মেঘরাজি, যার বিস্তৃতি ১০ থেকে ১০০ বর্গমাইল এবং উচ্চতায় ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ ফুট হয়ে থাকে। এই মেঘপুঞ্জ পৃথিবীর খুব নিকট থেকে অর্থাৎ প্রায় ৬৫০০ ফুট উপর থেকে শুরু হয়। এই বিরাট উচ্চতার বা গভীরতার জন্য এই মেঘপুঞ্জ অন্ধকারময় হয়। সূর্যের আলো মেঘমালায় প্রবেশ করে পানি ও বরফ কণায় প্রতিহত হয়ে ফিরে যায়। ফলে খুব সামান্য আলো এই মেঘপুঞ্জ ভেদ করে পৃথিবীতে পৌঁছতে পারে। তাই এই পানিভরা মেঘপুঞ্জকে নিচ থেকে কালো দেখায়। এই মেঘপুঞ্জের অন্ধকার সর্বক্ষেত্রে একরূপ নয়; উপরের দিকে সামান্য অন্ধকার কিন্তু নিচের দিকে ক্রমেই এই অন্ধকারের গাঢ়ত্ব বাড়তে থাকে এবং সর্বনিম্নে গভীর অন্ধকারে পরিণত হয়। সুতরাং এই মেঘপুঞ্জের অভ্যন্তরে বিভিন্ন গভীরতার অন্ধকার এই মেঘপুঞ্জে আর একটি ব্যাপার ঘটিয়ে থাকে, তাহলো এতে বিদ্যুৎশক্তি সঞ্চিত হয়ে থাকে। তবে এতে বিদ্যুৎশক্তি (electric charge) সম্পন্ন কণার সংখ্যা এবং মেঘমালার অভ্যন্তরে এদের গতির সঠিক পরিসংখ্যান জানা নেই। এ সম্বন্ধে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে বিশেষ করে এই বিদ্যুৎশক্তির উৎস এবং বিদ্যুতায়িত এলাকা সম্পর্কে। সবচেয়ে প্রধান মতবাদ হলো-মেঘের অভ্যন্তরে বিদ্যুতায়িত কণাগুলো, ion capture, contact electrification, বরফ হয়ে যাওয়া (freezing) এবং drop break up পদ্ধতিতে থিতিয়ে যাওয়ার ফলেই বিদ্যুতায়িত হয়।১ অন্য এক মত হলো-বিদ্যুতায়িত কণাগুলোর মেঘের অভ্যন্তরে উপরে ও নিচে ধাবিত হবার ফলে মেঘের মধ্যে বিভিন্ন শক্তির বিদ্যুতায়িত এলাকার সৃষ্টি হয়। অন্য আর একটি মৃতে বিদ্যুতায়িত কণা ও বৃষ্টির কণা বাতাসের প্রবল বেগে উঠানামা
করার ফলে মেঘপুঞ্জের হিমায়িত এলাকায় পৌঁছে গেলে পানির কণাগুলো বরফ কণায় পরিণত হয়। এই বরফে পরিণত হওয়ার সময় কণাগুলো ফেটে যায় এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বরফ কণা ছিটকে পড়ে। এই বরফের ক্ষুদ্র কণাগুলো ধনাত্মক বিদ্যুৎ শক্তি বহন করে নিয়ে যায় এবং সেখানে ঋণাত্মক বিদ্যুৎ এলাকা সৃষ্টি করে।
ধনাত্মক বিদ্যুৎ শক্তি সম্পন্ন ক্ষুদ্র বরফকণাগুলো হালকা উর্দ্ধগামী বায়ুর সাহায্যে মেঘপুঞ্জের উপরের দিকে উঠে যায়। আর ভারী ঋণাত্মক বিদ্যুৎসম্পন্ন বরফকণাগুলো মেঘপুঞ্জের নিচের দিকে অবস্থান করে। এর ফলে মেঘপুঞ্জের অভ্যন্তরে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক বিদ্যুৎ এলাকা পৃথক হয়ে যায়। যখন এই বিপরীত বিদ্যুৎ শক্তি এতটা বৃদ্ধি পায় যে, মধ্যবর্তী বাতাস এই দুই শক্তিকে পৃথক করে রাখতে পারে না, তখন এক বিরাট অগ্নিস্ফুলিঙ্গ এই দুই এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে সংঘটিত হয়। এই দু'য়ের মধ্যে অথবা এদের যে কোন একটা ও পৃথিবীর মধ্যে ভোল্টেজ পার্থক্য (শক্তির পার্থক্য) প্রায় ১০০ কোটি ভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে। এই স্ফুলিঙ্গ মেঘপুঞ্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে অথবা এক মেঘমালা থেকে অন্য মেঘমালায় বা মেঘমালা থেকে পৃথিবীতে বিস্তৃত হতে পারে। এই স্ফুলিঙ্গগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলক। আকাশের বিদ্যুৎ চমক ও বজ্রপাত এই স্ফুলিঙ্গেরই বহিঃপ্রকাশ।
মেঘমালার এই বজ্রপাত প্রচণ্ড উত্তাপ সৃষ্টি করে (১০,০০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড); বাতাসের প্রবল সম্প্রসারণ (expansion) ঘটে এবং প্রচণ্ড শব্দ তরঙ্গ ভেসে আসে যা আমরা বজ্রধ্বনি হিসেবে শুনতে পাই।
সুতরাং বৃষ্টিভরা মেঘপুঞ্জে রয়েছে: (ক) বিভিন্ন স্তরের অন্ধকার, এবং (খ) বিদ্যুৎ শক্তির সঞ্চয় যা একই সঙ্গে বিদ্যুৎ-চমক বা lightning এবং প্রচণ্ড বিস্ফোরণ যা আমরা বজ্রধ্বনি হিসেবে শুনতে পাই।
উপরে বর্ণিত মেঘমালা সৃষ্টির পদ্ধতি এবং বিদ্যুৎ চমক ও বজ্রপাতের আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যায় বক্ষ্যমাণ আয়াতের বর্ণনা 'মেঘের অন্ধকার, বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমক ইত্যাদির পারস্পরিক সম্পর্ক বেশ ভালভাবে বোধগম্য হয়।,
তথ্যসূত্র:
1. Encyclopaedia of Science and Technology, McGraw Hill, 1977, p. 688
2. World Book of Encyclopaedia, vol.7.1966, p. 432