📄 বিদ‘আতী কাজের পরিধি ও সতর্কতা অবলম্বন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলোচনা
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 বিদ‘আত চেনার ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
সাধারন ভাবে সুন্নতের বিপীরত বিষয়কে বিদ'আত বলে। আর শার'ঈ ভাবে বিদ'আত হলো "আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে ধর্মের নামে নতুন কোন প্রথা বা ইবাদতের প্রচলন করা যা শরীয়াতের কোন সহীহ দলীল-প্রমানের উপর ভিত্তি শীল নয়। আর এ ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ নিয়ম হল এ কথা বলা যে, মানুষ নতুন করে কোনো কিছু তখনই উদ্ভাবন করে, যখন তারা সেটাকে যথাযথ ও কল্যাণকর মনে করে, কেননা তারা যদি বিশ্বাস করত যে, তাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কিছু আছে, তাহলে তারা তা উদ্ভাবন করত না; সুতরাং যখন মানুষ কোনো কিছুকে যথাযথ ও কল্যাণকর মনে করবে, তখনি সেটার কারণের প্রতিও নজর দিতে হবে; অতঃপর যদি কারণটি এমন বিষয় হয়, যার উদ্ভব হয়েছে নবী এর পরে, তাহলে প্রয়োজনের দাবি অনুযায়ী নতুন বিষয় উদ্ভাবন করা বৈধ হবে। যেমন - দলিল-প্রমাণ গ্রন্থবদ্ধ করা; কেননা, এর প্রয়োজনীয় কারণ হল ভ্রান্ত দল ও গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ; সুতরাং তারা যখন নবী এর যুগে আত্মপ্রকাশ করেনি, তখন তার প্রয়োজন হয়নি। আর যদি এই ধরনের কাজের চাহিদা নবী এর যুগে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু এমন অস্থায়ী কারণে তা পরিত্যাগ করা হয়, যা তাঁর মৃত্যুর কারণে দূর হয়ে গেছে, তাহলে অনুরূপভাবে তা উদ্ভাবন করা বৈধ হবে, যেমন - কুরআন সংকলন করা; কারণ, নবী এর জীবদ্দশায় এই কাজের প্রতিবন্ধকতা ছিল ওহী অবতীর্ণ অব্যাহত থাকা, কেননা আল্লাহ তা'আলা তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তা পরিবর্তন করতেন; অতঃপর নবী এর মৃত্যুর মাধ্যমে এই প্রতিবন্ধকতার অবসান ঘটে।
📄 বিদ‘আতী কাজের পরিধি
বিদ'আতী কাজের পরিণতি ৩টি, যথাঃ
(১) ঐ বিদ'আতী কাজ বা আমল আল্লাহর দরবারে কখনোই গৃহীত হবে না।
(২) বিদ'আতী কাজ বা আমলের ফলে মুসলিম সমাজে গোমরাহী বিস্তার লাভ করে এবং
(৩) এ গোমরাহীর চূড়ান্ত ফলাফল হলো বিদ'আত কার্য সম্পাদনকারীকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَةٌ، متفق عليه
যে ব্যক্তি আমাদের শরী'আতে এমন নতুন কিছু সৃষ্টি করল যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। ১৭১
রসূল ﷺ আরও বলেছেন, আর তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করা থেকে সাবধান থেকো! নিশ্চয়ই প্রত্যেক নতুন সংযোজন বিদ'আত। আর প্রত্যেক বিদ'আত গোমরাহীর পথে পরিচালিত করে আর প্রত্যেক গোমরাহীর পরিণাম হলো জাহান্নাম। ১৭২
টিকাঃ
১৭১ বুখারী, হা: ২৬৯৭, মুসলিম, হাঃ ১৭১৮, ৪৫৯০, আবু দাউদ, হা: ৪৬০৭, ইবনু মাজাহ, ১৪, আহমাদ, হাঃ ২৩৯২৯, ২৪৬০৪, ২৪৯৪৪, ২৫৫০২, ২৫৬৫৯, ২৫৭৯৭, হাদীস সম্ভার, হাঃ ১৪৩
১৭২ আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৭
📄 বিদ‘আতের ভয়াবহতা
বিদ'আতের ভয়াবহতার কারণ হল, অপরাধী ব্যক্তি জানে যে, সে অপরাধের সাথে জড়িত, ফলে তার পক্ষ থেকে আশা করা যায় যে সে তা থেকে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করবে। কিন্তু বিদ'আতের অনুসারী বিশ্বাস করে যে, সে আনুগত্য ও ইবাদতের মধ্যেই আছে, ফলে সে তাওবা করে না এবং ক্ষমাও প্রার্থনা করে না। আর এটাই ইবলিস থেকে বর্ণনা করা হয় যে, সে বলে: "আমি আদম সন্তানদের পিঠ ভেঙ্গে দেই অপরাধ ও পাপরাশি দ্বারা, আরা তারা আমার পিঠ ভেঙ্গে দেয় তাওবা ও ইস্তিগফারের (ক্ষমা প্রার্থনা করার) দ্বারা; তাই আমি তাদের জন্য এমন কতগুলো অপরাধের প্রবর্তন করি যার থেকে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে না এবং তার থেকে তারা তাওবাও করে না আর সেগুলো হল ইবাদতের আকৃতিতে বিদ'আত।” [একটি সন্দেহ অপনোদন]। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের পক্ষ থেকে এর দ্বারা যুক্তি প্রদর্শন শুদ্ধ হবে, নাকি অশুদ্ধ হবে? [উত্তর] কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ যা আলোচনা করেছেন, তার উপর ভিত্তি করে এর জবাব হলঃ এই যুক্তি প্রদর্শন বিশুদ্ধ নয়, আর হাদীসটি তাদের বিপক্ষে দলিল, তাদের পক্ষে নয়; কারণ, তা ইবনু মার্স'উদ থেকে বর্ণিত মাওকুফ। হাদীসের অংশবিশেষ, যা আহমদ, বায্যার, তাবারানী, তায়ালাসী ও আবূ নু'আইম বর্ণনা করেছেন; হাদীসটি এই রকমঃ
إن الله نظر في قلوب العباد فوجد قلب محمد صلى الله عليه و سلم خير قلوب العباد فاصطفاه لنفسه فابتعثه برسالته ثم نظر في قلوب العباد بعد قلب محمد
فوجد قلوب أصحابه خير قلوب العباد فجعلهم وزراء نبيه يقاتلون على دينه فما رأى المسلمون حسنا فهو عند الله حسن و ما رأوا سيئاً فهو عند الله سيئ أخرجه أحمد )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের অন্তরসমূহের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন, অতঃপর তিনি বান্দাদের অন্তরসমূহের মধ্যে মুহাম্মদ এর অন্তরকে সর্বোত্তম পেয়েছেন, অতঃপর তাঁকে তিনি তাঁর নিজের জন্য নির্বাচন করেছেন, অতঃপর তাঁকে তিনি তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন; অতঃপর তিনি মুহাম্মদ এর অন্তরের পর (বাকি) বানাদাদের অন্তরসমূহের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন, তারপর তিনি বানাদাদের অন্তরসমূহের মধ্যে তাঁর সাহাবীদের অন্তরসমূহকে সর্বোত্তম পেয়েছেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে তাঁর নবীর উজির বা সাহায্যকারী বানালেন, যারা তাঁর দীনের জন্য লড়াই করবে; সুতরাং মুসলিমগণ যা উত্তম বলে মনে করবে, তা আল্লাহর নিকট উত্তম; আর মুসলিমগণ যা মন্দ বলে মনে করবে, তা আল্লাহর নিকট মন্দ।” কোনো সন্দেহ নেই যে, المسلمون শব্দের মধ্যে "আল" টি সাধারণভাবে গোটা (মুসলিম) জাতিকে বুঝানোর জন্য নয়; কারণ, হাদীসটি তখন নবী এর বাণীর বিরোধী হয়ে যাবে। হাদীসে এসেছে -
মু'আবিয়াহ ইবনু আবু সুফিয়ান সূত্রে বর্ণিত। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, জেনে রাখো! তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাব বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে এবং এ উম্মত অদূর ভবিষ্যতে তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। এর মধ্যে বাহাত্তর দল জাহান্নামে যাবে এবং একটি জান্নাতে যাবে। আর সে দল হচ্ছে আল-জামা'আত। ইবনু ইয়াহইয়া ও আমর (রহঃ) বলেন, "বিষয়টি হলো, আমার উম্মাতের মধ্যে এমন এমন দলের আর্বিভাব ঘটবে যাদের সর্বশরীরে (বিদ'আতের) প্রবৃত্তি এমনভাবে অনুপ্রবেশ করবে যেমন পাগলা কুকুর কামড়ালে জলাতঙ্ক রোগীর সর্বশরীরে সঞ্চারিত হয়।" ১৭৩ তাহক্বীক: আহমাদ, হাকিম, ইবনু আবূ আসিম 'আস-সুন্নাহ। ইমাম হাকিম ও যাহাবী বলেন: সহীহ। কেননা, উম্মতের প্রতিটি ফিরকা বা দলই মুসলিম, সে তার মাযহাবকে উত্তম মনে করে, সুতরাং যদি সবার ভালো মনে করা ও সবার কথাই গ্রহণযোগ্য হয় তবে তো কোনো দলই জাহান্নামী না হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে। যা হাদীসের ভাষ্যের পরিপন্থী। অনুরূপভাবে মুসলিমদের কেউ কেউ কোনো জিনিসকে উত্তম মনে করে, আবার তাদের কেউ কেউ সেই জিনিসটিকেই মন্দ মনে করে, এমতাবস্থায় (যদি সবার কথাই গ্রহণযোগ্য হয়, তবে) তো উত্তম থেকে মন্দ আলাদা না করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। যা হাদীসের ভাষ্যের পরিপন্থী।
টিকাঃ
১৭৩ আবু দাউদ, হাঃ ৪৫৯৭