📘 সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে বিদআত > 📄 বিদ‘আতের অপকারিতা

📄 বিদ‘আতের অপকারিতা


বিদ'আতের অপকারিতা সমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ
আল্লাহ বিদ'আতীকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন: আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেনঃ
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দেব; অবশেষে তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করব। আর তা কতই না মন্দ আবাস !১৫৩
যে হিদায়াত সুস্পষ্ট মূলত তা-ই সুন্নাত। এ সুন্নাতই হিদায়াতের একমাত্র রাজপথ। যারা রসূলুল্লাহ এর আদর্শ অনুসরণ করে চলতে প্রস্তুত হয় না এবং মুমিনদের অনুসৃত আদর্শকে বাদ দিয়ে অপর কোন আদর্শ অনুসরণ করে চলে, তারাই বিদ'আতী। এদের পরিণام জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু নয়। অতএব রসূলুল্লাহ এর সুন্নাতকে অনুসরণ করে চলাই কল্যাণ ও মুক্তি লাভের একমাত্র উপায়।
বিদ'আতী আমল যতই সুন্দর হোক কোন কাজে আসবে না: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا - الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
তাদেরকে বলে দাও, আমি কি তোমাদেরকে আমলের দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সম্পর্কে সংবাদ দেব? তারা তো ঐসব লোক, পার্থিব জীবনে যাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে; অথচ তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্মই করছে। ১৫৪
অত্র আয়াতে বিদ'আতের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ মূলত যাবতীয় কাজকর্ম ভুল ভিত্তিতে সম্পাদিত হওয়া সত্ত্বেও যারা নিজেদের কাজকে খুবই ভালো ও খুবই ন্যায়সঙ্গত বা সাওয়াবের কাজ বলে মনে করে, অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লোক। বিদ'আতপন্থীরাও ঠিক তেমনি। তারা যেসব কাজ করে, আসলে তা আল্লাহর দেয়া নীতির ভিত্তিতে নয়। তা সত্ত্বেও তারা এসব সাওয়াবের কাজ বলে মনে করে। এ আয়াত সাধারণভাবে এমন সব লোকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যারা আল্লাহর ইবাদাত করে আল্লাহর পছন্দনীয় পন্থার বিপরীত পন্থায়। তারা যদিও মনে করছে যে, তারা ঠিক কাজই করছে এবং আশা করছে যে, তাদের আমল আল্লাহর নিকট স্বীকৃত ও গৃহীত হবে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা ভুল নীতির অনুসারী এবং তাদের আমল আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدُّ
যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনে নতুন কিছু সংযোজন করবে, যা মূলত তাতে নেই, সেটি পরিত্যাজ্য। ১৫৫
উপরোক্ত হাদীসে রসূলুল্লাহ (أَمْرِنَا هَذَا) (আমার) বলতে ইসলামকেই বুঝিয়েছেন। এ দ্বীন এক পরিপূর্ণ দ্বীন। এ দ্বীন বা দ্বীনের কোন মৌলিক খুঁটিনাটি দিকও লুকায়িত নেই। এখন যদি কেউ এতে দ্বীন-বহির্ভূত কোন জিনিস বৃদ্ধি করতে চায় অথবা কোন দ্বীন বহির্ভূত বিষয়কে দ্বীনী বিষয় হিসেবে চালিয়ে দিতে চায় তাহলে সে গোটা দ্বীনকেই বিনষ্ট করে দেবে।
বিদ'আত থেকে দূরে থাকার জন্য নবী কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন : রসূল বলেন,
فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْمَهْدِيِّينَ فَتَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ
তোমাদের উপর আবশ্যক হলো আমার সুন্নাত ও আমার খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত ধারণ করা। তোমরা একে শক্তভাবে ধারণ করো এবং তোমাদের মাড়ির দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধরো। সাবধান! ইবাদাতের নামে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে তৈরি করা সকল নব উদ্ভাবিত কাজ থেকে বিরত থাকো। ১৫৬
সকল বিদ'আতই গোমরাহী : হাদীসে এসেছে যে -
عَنْ عِرْبَاضِ بْنِ سَارِيَةً قَالَ .. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
ইবরায বিন সারিয়া হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল বলেছেন, তোমাদের উপর আবশ্যক হচ্ছে, তোমরা প্রত্যেক নব আবিষ্কৃত বিষয় থেকে দূরে থাকবে। কেননা প্রত্যেক নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদ'আত এবং প্রত্যেক বিদ'আতই গোমরাহী। ১৫৭
এ হাদীসে রসূলুল্লাহ বলেছেন, প্রত্যেক বিদ'আতই গোমরাহী। এটি দ্বীনের একটি বিশেষ মূলনীতি। সুতরাং যে কেউ নতুন কিছু উদ্ভাবন ও প্রবর্তন করবে এবং তাকে দ্বীনের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করবে, সেটিই গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা। দ্বীন এ সকল বস্তু থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। অনেকে বিদ'আতকে হাসানাহ ও সাইয়্যেআহ- এভাবে ভাগ করে থাকেন। কিন্তু এভাবে ভাগ করার কোন প্রয়োজন নেই। হাদীসে সকল বিদ'আতকেই গোমরাহী বলা হয়েছে। সুতরাং বিদ'আতকে ভাগ করা হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। বিদ'আতে হাসানাহ বলতে যা বুঝানো হয়েছে তা মূলত বিদ'আতের সংজ্ঞায় পড়ে না।
বিশ্বনবী মুহাম্মাদ এর সাহাবীরা বিদ'আতকে সহ্য করেননি: আমর ইবনে ইয়াহইয়া বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন,
عَنْ عُمَرِو بْنِ يَحْيَى ، قَالَ : سَمِعْتُ أَبِي يُحَدِّثُ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ : كُنَّا نَجْلِسُ عَلَى بَابِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَبْلَ صَلَاةِ الْغَدَاةِ فَإِذَا خَرَجَ مَشَيْنَا مَعَهُ إِلَى الْمَسْجِدِ فَجَاءَنَا أَبُو مُوسَى الْأَشْعَرِيُّ فَقَالَ أَخَرَجَ إِلَيْكُمْ أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ بَعْدُ قُلْنَا لَا بَعْدُ فَجَلَسَ مَعَنَا حَتَّى خَرَجَ فَلَمَّا خَرَجَ قُمْنَا إِلَيْهِ جَمِيعًا فَقَالَ لَهُ أَبُو مُوسَى يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ إِنِّي رَأَيْتُ فِي الْمَسْجِدِ انِفًا أَمْرًا أَنْكَرْتُهُ وَلَمْ أَرَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ إِلَّا خَيْرًا . قَالَ فَمَا هُوَ فَقَالَ إِنْ عِشْتَ فَسَتَرَاهُ ، قَالَ : رَأَيْتُ فِي الْمَسْجِدِ قَوْمًا حِلَقًا جُلُوسًا يَنْتَظِرُونَ الصَّلَاةَ فِي كُلِّ حَلْقَةٍ رَجُلٌ وَفِي أَيْدِيهِمْ حَصًى فَيَقُولُ : كَبِرُوا مِائَةً فَيُكَبِّرُونَ مِائَةً فَيَقُولُ : هَلِلُوا مِائَةً فَيُهَلِّلُونَ مِائَةً وَيَقُولُ : سَبِّحُوا مِائَةً فَيُسَبِّحُوْنَ مِائَةً قَالَ فَمَاذَا قُلْتَ لَهُمْ قَالَ مَا قُلْتُ لَهُمْ شَيْئًا انْتِظَارَ رَأْيِكَ ، أَوِ انْتِظَارَ أَمْرِكَ قَالَ أَفَلَا أَمَرْتَهُمْ أَنْ يَعُدُّوا سَيِّئَاتِهِمْ وَضَمِنْتَ لَهُمْ أَنْ لَا يَضِيعَ مِنْ حَسَنَاتِهِمْ ، ثُمَّ مَضَى وَمَضَيْنَا مَعَهُ حَتَّى آتى حَلَقَةً مِنْ تِلْكَ الْحِلَقِ فَوَقَفَ عَلَيْهِمْ فَقَالَ مَا هُذَا الَّذِي أَرَاكُمْ تَصْنَعُوْنَ قَالُوا : يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ حَتَّى نَعُتُ بِهِ التَّكْبِيرَ وَالتَّهْلِيلَ وَالتَّسْبِيحَ قَالَ فَعُدُّوا سَيِّئَاتِكُمْ فَأَنَا ضَامِنْ أَنْ لَا يَضِيعَ مِنْ حَسَنَاتِكُمْ شَيْءٌ وَيُحَكُمْ يَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ مَا أَسْرَعَ هَلَكَتَكُمْ هُؤُلَاءِ صَحَابَةُ نَبِيِّكُمْ مُتَوَافِرُوْنَ وَهُذِهِ ثِيَابُهُ لَمْ تَبْلَ وَانِيَتُهُ لَمْ تُكْسَرُ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّكُمْ لَعَلَى مِلَّةٍ هِيَ أَهْدَى مِنْ مِلَّةِ مُحَمَّدٍ ﷺ أَوْ مُفْتَتِحُوا بَابِ ضَلَالَةٍ قَالُوا وَاللَّهِ يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ مَا أَرَدْنَا إِلَّا الْخَيْرَ قَالَ وَكَمْ مِنْ مُرِيدٍ لِلْخَيْرِ لَنْ يُصِيبَهُ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ حَدَّثَنَا أَنَّ قَوْمًا يَقْرَؤُونَ الْقُرْآنَ لَا يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ وَايْمُ اللَّهِ مَا أَدْرِي لَعَلَّ أَكْثَرَهُمْ مِنْكُمْ ، ثُمَّ تَوَلَّى عَنْهُمْ
একদা আমরা ফজরের সালাতের পূর্বে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর দরজায় বসা ছিলাম। অতঃপর তিনি মসজিদের দিকে হেটে বের হলেন। এমন সময় আবু মুসা আশআরী (রাঃ) ও আমাদের কাছে আসলেন এবং বললেন, আবু আবদুর রহমান কি তোমাদের নিকট এসেছে? আমরা বললাম, না- আসেনি। অতঃপর তিনি আবু আবদুর রহমান না আসা পর্যন্ত আমাদের সাথে বসলেন। পরে যখন তিনি আসলেন তখন আমরা সকলে তার দিকে অগ্রসর হলাম। অতঃপর আবু মুসা (রাঃ) বললেন, হে আবু আবদুর রহমান! আমি এখনি মসজিদের মধ্যে এমন কিছু দেখতে পেলাম, যা আমি পছন্দ করিনি এবং ইতোপূর্বে আমি তা কখনো দেখিনি। তবে আমি এর মধ্যে ভালো ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তিনি বললেন, সেটা কি? আবু মুসা (রাঃ) বললেন, তুমি বেঁচে থাকলে দেখতে পাবে। এরপর বললেন, আমি মসজিদে দেখলাম যে, কিছু লোক একসাথে বসে আছে। তারা সালাতের অপেক্ষা করছে আর তাদের প্রত্যেকের হাতে পাথরকণা রয়েছে এবং প্রত্যেক হালকাতে একজন লোক রয়েছে যে বলছে, তোমরা একশ' বার সুবহানাল্লাহ, একশ' বার আল্লাহু আকবার এবং একশ' বার লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ পড়। তাই তারা এ পাথর দ্বারা তাসবীহ পাঠ করছিল। এটা শুনে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাদেরকে কী বলেছ? আবু মুসা (রাঃ) বললেন, আপনার মতামত জানার আগে আমি কিছুই বলিনি। তিনি বললেন, তুমি কি তাদেরকে এটা বলতে পারলে না যে, তারা যেন তাদের পাপসমূহ গণনা করে। আর তাদের নেক আমলসমূহ নষ্ট না হওয়ার জন্য তুমি জামিন হতে পারলে না? এরপর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাদের সামনে আসলেন এবং আমরাও তার সাথে গেলাম। তিনি বললেন, আমি তোমাদের মধ্যে এটা কী দেখতে পেলাম। তারা বলল, হে আবু আবদুর রহমান! এগুলো হলো পাথরকণা, যা দ্বারা আমরা তাসবীহ গণনা করি। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি এভাবে তোমাদের নেক আমলগুলো নষ্ট করতে শুরু করেছ। আমি জামিন হচ্ছি যে, তোমাদের কোন নেক আমল নষ্ট হবে না। শুন, হে রসূল (সঃ)-এর উম্মত! তোমরা এত দ্রুত কীভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছ। অথচ নবীর সাহাবীরা এখনো জীবিত, তার পোষাকগুলো এখনো নষ্ট হয়ে যায়নি, তার বাসনগুলো এখনো ভেঙ্গে যায়নি। আল্লাহর কসম! তোমরা মুহাম্মাদের আদর্শের চেয়ে উত্তম কোন আদর্শ পেয়ে বসেছ? নাকি তোমরা কোন গোমরাহীর দরজা খুলে দিচ্ছ? তখন তারা বলল, হে আবু আবদুর রহমান! আমরা তো এর দ্বারা ভালো ছাড়া অন্য কিছু চাইনি। তিনি বললেন, শুন! অনেক কল্যাণকামী আছে কল্যাণের আকাংখা করে কিন্তু সে মূলত কল্যাণ পায় না। নিশ্চয় রসূল (সঃ) আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, নিশ্চয় এমন একটি সম্প্রদায় আসবে, যারা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালীর নিচে পৌঁছবে না। আল্লাহর কসম! আমি জানি না যে, তাদের মধ্যে কি তোমাদের সংখ্যা বেশি হবে? এরপর তিনি তাদের থেকে সরে গেলেন।১৫৮
যেখানেই কোন বিদ'আত শুরু হয় সেখান থেকে সমপরিমাণ সুন্নাত উঠে যায়: হাদীসে এসেছ -
عَنِ ابْنِ سِيرِينَ قَالَ : مَا أَخَذَ رَجُلٌ بِبِدْعَةٍ فَرَاجَعَ سُنَّةً
ইবনে সীরীন (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি যে পরিমাণ বিদ'আত করে সেই পরিমাণ সুন্নাত তার থেকে বিলিন হয়ে যায়।১৫৯
সুন্নাতের উপর সীমাবদ্ধ থাকা বিদ'আতে কষ্ট স্বীকার করার চেয়ে উত্তম : হাদীসে এসেছে - আবদল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ ﷺ قَالَ : الْقَصْدُ فِي السُّنَّةِ خَيْرٌ مِنَ الْاجْتِهَادِ فِي الْبِدْعَةِ
সুন্নাতের উপর আমল করে প্রতিষ্ঠিত থাকা বিদ'আতের উপর প্রচেষ্টা করার চেয়ে অনেক উত্তম। ১৬০
বিদ'আত মুহাম্মাদ এর শাফা'আত প্রাপ্তি হতে বাঁধা প্রদান করবে: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ
আমি অবশ্যই তোমাকে (হওযে) কাউসার (বা প্রভূত কল্যাণ) দান করেছি। ১৬১
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা যায় যে, كوثر শব্দটির উৎপত্তি كثرة থেকে। এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। ইবনে কাসীর 'প্রভূত কল্যাণ' অর্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ এই অর্থ নেওয়াতে এমন ব্যাপকতা রয়েছে, যাতে অন্যান্য অর্থ শামিল হয়ে যায়। সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, 'এটা একটি নদী যা বেহেস্তে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম - কে দান করা হবে'। কোন কোন হাদীসে কাওসার বলতে 'হওয' বুঝানো হয়েছে। যে হওয হতে ঈমানদাররা জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে নবী - এর মুবারক হাতে পানি পান করবে। জান্নাতের ঐ নদী থেকেই পানি সেই হাওযের মধ্যে আসতে থাকবে। অনুরূপ দুনিয়ার বিজয়, নবী -এর মর্যাদা ও খ্যাতি, চিরস্থায়ীভাবে তাঁর সুনাম এবং আখেরাতের প্রতিদান ও বিনিময় ইত্যাদি সমস্ত জিনিসই 'প্রভূত কল্যাণ'- এ শামিল হয়ে যায়। ১৬২ অথচ যারা দুনিয়ার বুকে বিদ'আতে লিপ্ত থাকবে তাদেরকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লামের শাফা'আত প্রাপ্তি হতে বাঁধা প্রদান করা হবে।
কারণ হাদীসের মধ্যে বলা হয়েছে যে, বিদ'আতীকে হাওযে কাওসারের পানি পান করা হতে বঞ্চিত করা হবে। তিনি তাদের দূর হয়ে যেতে বলবেন। এটি প্রমাণ করছে যে তারা তাঁর শাফা'আত হতেও বঞ্চিত হবে। এখানে শাতেবী একটি দূর্বল হাদীস দিয়ে দলীল গ্রহণ করে, সেটির অর্থকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন। সেটি হচ্ছে 'বিদ'আতী ছাড়া আমার উম্মতের সবাই আমার শাফা'আত পাবে'। ১৬৩ হাদীসে এসেছে - আবু হাসেম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি সাহালকে বলতে শুনেছি তিনি রসূল কে বলতে শুনেছেন, "আমি তোমাদের পূর্বেই হাওযে কাওসারের নিকট পৌঁছে যাব। যে ব্যক্তি সেখানে নামবে এবং তার পানি পান করবে সে আর কখনও পিপাসিত হবে না। কতিপয় লোক আমার নিকট আসতে চাইবে, আমি তাদেরকে চিনি আর তারাও আমাকে চেনে। অতঃপর আমার ও তাদের মধ্যে পর্দা পড়ে যাবে। রসূল বলবেন তারা তো আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত। তাকে বলা হবে আপনি জানেন না আপনার পরে তারা কি আমল করেছে। তখন যে ব্যক্তি আমার পরে (দ্বীনকে) পরিবর্তন করেছে তাকে আমি বলবো: দূর হয়ে যাহ্, দূর হয়ে যাহ্।”১৬৪
বিদ'আত সহীহ সুন্নাহকে বিতাড়িত করে তার স্থলাভিষিক্ত হয়: বাস্তব নমুনায় এর বিরাট প্রমাণ। সলাত শেষে জামা'বদ্ধ হয়ে হাত তুলে দু'আ করলে, সালাতের পরে পঠিতব্য মুতাওয়াতির সূত্রের সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত দু'আ ও যিকিরগুলো পড়া হয় না। এছাড়া ইসলামের বিভিন্ন ইবাদাতের মধ্যে দূর্বল হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এরূপ বহু আমল আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যা সরাসরি সহীহ হাদীসর বিপরীত আমল। বিজ্ঞ পাঠকবৃন্দে নিকট এর চেয়ে আর বেশী কিছু বলা প্রয়োজন মনে করছি না। অতএব দূর্বল বা জাল হাদীসের উপর আমল করলে সহীহ সুন্নাহ বিতাড়িত হবেই।
বিদ'আত পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত বিদ'আতীর কোন প্রকার তওবাহ করার সুযোগ জুটবে না: "আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক বিদ'আতির বিদ'আতকে পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তাওবার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন।"১৬৫
বিদ'আতীর কোন আমল কবুল করা হবে না: রসূল বলেছেন: "যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করবে বা কোন বিদআতীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ এবং সকল ফেরেশতা ও মানুষের অভিশাপ তার ফরয ইবাদাত বা তাওবাহ, নফল ইবাদাত বা ফিদইয়া কবুল করা হবে না।”১৬৬
ইমাম আওযা'ঈ বলেন, কোন কোন বিশেষজ্ঞ আলেম বলেছেন: বিদ'আতীর সলাত, সিয়াম, সাদাকাহ, জিহাদ, হাজ্জ, উমরাহ, কোন ফরয ইবাদাত বা তাওবাহ, নফল ইবাদাত বা ফিদইয়া গ্রহণযোগ্য হবে না। অনুরূপ কথা হিশাম ইবনু হাসানও বলেছেন। আইউব আস-সুখতিয়ানী বলেন: বিদ'আতী তার প্রচেষ্টা যতই বৃদ্ধি করবে আল্লাহর নিকট হতে তার দূরত্ব ততই বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া যে বিদ'আতকে পছন্দ করে তার ধারণা শরীয়ত পূর্ণ নয়, অথচ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিয়েছি।”১৬৭ কেননা তার নিকট যদি দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে যেয়েই থাকে তাহলে সে শরীয়তের মধ্যে নতুন কিছুর প্রবেশ ঢুকাবে কেন বা তাকে অবহিত করার পরেও কেনই বা বিদ'আতের উপর আমল করবে।
বিদ'আতীর উপর দুনিয়াতে লাঞ্ছনা আর আখেরাতে আল্লাহর ক্রোধ চাপিয়ে দেয়া হবে: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ سَيَنَالُهُمْ غَضَبٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَذِلَّةٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُفْتَرِينَ
"অবশ্যই যারা গাভীর বাচ্চাকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে দুনিয়াতেই ক্রোধ ও লাঞ্ছনা এসে পড়বে। মিথ্যারোপকারীদেরকে আমি অনুরূপ শাস্তি দিয়ে থাকি।”১৬৮
সামেরীর প্ররোচনায় গাভীর বাচ্চা দ্বারা তারা পথভ্রষ্ট হয়েছিল এমনকি তারা তার ইবাদাতও করেছিল। আল্লাহ তা'আলা আয়াতের শেষে বলেছেনঃ “মিথ্যারোপকারীদেরকে আমি অনুরূপ শাস্তি দিয়ে থাকি এটি ব্যাপকভিত্তিক কথা। এর সাথে বিদ'আতেরও সাদৃশ্যতা আছে। কারণ সকল প্রকার বিদ'আতও আল্লাহর উপর মিথ্যারোপের শামিল। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা নিজ সন্তানদেরকে নির্বুদ্ধিতাবশতঃ বিনা জ্ঞানে হত্যা করেছে এবং আল্লাহ তাদেরকে যেসব রিযিক দিয়েছিলেন, সেগুলোকে আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে হারাম করে দিয়েছে। নিশ্চয় তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং সুপথগামী হয়নি।"১৬৯
অতএব আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে যে ব্যক্তিই বিদ'আত সৃষ্টি করবে তাকেই তার বিদ'আতের কারণে লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হতে হবে। তাবেঈ'দের যুগে বাস্তবে বিদ'আতীদের ভাগ্যে এমনটিই ঘটেছিল। তাদেরকে তাদের বিদ'আত নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। রসূল এ প্রসঙ্গে তাই বলেছেন: “যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিস্কার করবে বা কোন নব-আবিস্কারকারীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ এবং সকল ফেরেশতা ও মানুষের অভিশাপ।”১৭০

টিকাঃ
১৫৩ সূরা নিসা: ১১৫
১৫৪ সূরা কাহফঃ ১০৩, ১০৪
১৫৫ সহীহ বুখারী, হাঃ ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাঃ ৪৫৮৯; আবু দাউদ, হা: ৪৬০৬; ইবনে মাজাহ, হাঃ ১৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/২৬; মুসনাদে আহমাদ, হাঃ ২৬০৩৩।
১৫৬ আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৭; সুনানে বায়হাকী আল কুবরা, হাঃ ২০১২৫; দারেমী, হাঃ ৯৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাঃ ৫; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাঃ ৩২৯; মুসনাদে আহমাদ, হা: ১৭১৪৫।
১৫৭ আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৭; দারেমী, হাঃ ৯৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাঃ ৫; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাঃ ৩৩২; মুসনাদে আহমাদ, হাঃ ১৭১৪৪।
১৫৮ মুসনাদুদ দারেমী, হাঃ ২১০।
১৫৯ মুসনাদুদ দারেমী, হাঃ ২১৪।
১৬০ মুসনাদুদ দারেমী, হাঃ ২২৩
১৬১ সূরা কাওসার: ১
১৬২ ইবনে কাসীর, ১৮ খন্ড, পৃঃ নং: ২৯৪ এছাড়াও আরও দেখুন- তাফসীর আহসানুল বায়ান, আল্লামা হাফিয সালাহুদ্দীন ইউসুফ, সম্পাদনা: আব্দুল হামীদ ফাইযী আল-মাদানী, পৃঃ নংঃ ১২৫২
১৬৩ আল-ইতিসাম ১/১৫৯
১৬৪ মুসলিম, হাঃ ৪২৪৩
১৬৫ সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব পৃঃ ১/১৩০, হাঃ ৫৪
১৬৬ বুখারী, হাঃ ৩১৮০
১৬৭ সূরা মায়েদা: ৩
১৬৮ সূরা আরাফ: ১৫২
১৬৯ সূরা আন'আম: ১৪০
১৭০ বুখারী, হাঃ ৩১৮০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00