📄 সুন্নাতের অনুসারীদের বৈশিষ্ট্য
সুন্নাতের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি সুন্নাত পালনে প্রতিবন্ধকতাও ব্যাপক। সে যুগে যেমন ইসলাম কবুল করার কারণে মর্মান্তিকভাবে নির্যাতিত হ'তে হয়েছিল, এ যুগেও তেমনি সুন্নাত পালনের কারণে নানাবিধ নির্যাতন ভোগ করতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও সুন্নাত পালন করার মাধ্যমে সুন্নাতের অনুসারীদের কতিপয় বৈশিষ্ট রয়েছে যা নিম্নে আলোচনা করা হলো -
১. কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা: কুরআন ও হাদীস এমন ভাবে আঁকড়ে ধরা যেমন ভাবে মাড়ির দাঁত দিয়ে কোন কিছু আঁকড়ে ধরা হয়, যা সহজে ছুটে না। অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, দ্বীনের মৌলিক বিধানাবলী ও তার শাখা- প্রশাখার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীস অনুসরণ করা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও - যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। ৭৮
উক্ত বিষয়টি হাদীসেও অনুরূপ নির্দেশনা এসেছ। যেমন - বিদায় হজ্জের ভাষণে রসূল দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন,
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّلْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
'আমি তোমাদের নিকটে দু'টি বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা ঐ দু'টি বস্তুকে মযবুতভাবে ধরে থাকবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না; সে দু'টি বস্তু হ'ল আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাত'। অতএব, বলা যায় যে, যে ব্যক্তি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে যত আঁকড়ে ধরবে তার পক্ষে বিদ'আত থেকে দূরে থাকা তত বেশি সহজ হবে।
২. বিদ'আত অনুসারীদের ঘৃণা করা : বিদ'আতীদের সাথে চলাফেরা করা একজন মুমিনের জন্য খুবই বিপজ্জনক। কেননা বিদ'আতীরা এমন ধরনের কাজ করে ফেলে তাতে তার আমল বরবাদ হয়ে যায় যা সে যত বেশি ভালো কাজই করুক না কেন। তাই সুন্নাতের অনুসারীদের ভালবাসা ও বিদ'আতের অনুসারীদের ঘৃণা করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ
أُولئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُلْ لَهُمْ فِي أَنْفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغًا
ওরা হল সেসব লোক, যাদের অন্তরে কি আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও এবং তাদেরকে সদুপদেশ দাও। আর তাদেরকে তাদের নিজদের ব্যাপারে মর্মস্পর্শী কথা বল। ৮০
৪. সর্বত্র সুন্নাতের অনুসরন : সুন্নাতের অনুসারীরা সংখ্যায় কম হলেও নিজেকে একাকী না ভাবা। কেননা সততা মুমিনের হারানো সম্পদ। সে সত্যকে গ্রহণ করে যদিও মানুষ তার বিরোধিতা করে। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস উল্লেখ না করলেই নয়। যেমন, আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূল বলেছেন,
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ
'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হ'তে পারবে না যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমার আনীত দীন ও শরী'আতের অধীন হবে'। ৮১
৫. সত্যাশ্রয়ী হওয়া: কুরআন ও হাদীসের আদর্শ বাস্তবায়নের নিমিত্তে কথা ও কাজে সত্যাশ্রয়ী হওয়া। আর এ ক্ষেত্রে জাল ও যঈফ হাদীসের উপর নির্ভর না করা উচিত। কেননা বিদ'আতী আমল সমূহের মূল উৎসই হলো জাল ও যঈফ হাদীসের উপর নির্ভরশীল হওয়া যা কোনভাবেই প্রকৃত মুমিন বান্দার পক্ষে তা সম্ভব নয়। সুতরাং, বিদ'আত থেকে বাঁচতে হলে জাল ও যঈফ হাদীস বর্জন করতে হবে এবং সত্যাশ্রয়ী হয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসের অনুশীলন ও চর্চা করে যেতে হবে।
৬. সুন্নাতের আদর্শ মাপকাঠি নির্ধারন: রসূল কেই একমাত্র আদর্শের মাপকাঠি হিসেবে মেনে নেয়া। কারণ, তার চরিত্রই হচ্ছে আল-কুরআনের প্রতিচ্ছবি। ৮২ অতএব বলা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা একমাত্র রসূল -কে উসওয়াতুন হাসানা বা দ্বীনের মাপকাঠি বানিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম রসূলের সবচেয়ে বেশী অনুসরন করেছেন বলেই রসূলের আনুগত্যের ব্যাপারে তারা শ্রেষ্ঠ আদর্শ। কিন্তু রসূল যেমন নিজেই আদর্শ সাহাবায়ে কেরام সে হিসেবে রসূলের সমান মর্যাদার অধিকিরী নন। এমন কি সব সাহাবী এক মানের নন। চার খলিফার সবাইও এক মানের নন। তাই দ্বীনের একমাত্র মাপকাঠি রসূল এবং সবাইকে একমাত্র রসূলকেই অনুসরন করার চেষ্টা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
রসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর। ৮৩
৭। বিদ'আত রসূলের আনুগত্যের পরিপন্থী : বিদ'আত চর্চা করার আরেক অর্থ হলো রসূলের আনুগত্যের গন্ডি থেকে বেরিয়ে পড়া। কেননা রাসূলের আনুগত্য করাকে ইসলামী শরীয়াতে সুন্নাত নামে অভিহিত করা হয়। আর বিদ'আত যেহেতু সুন্নাতের বিপরীত, তাই বিদ'আতের অনুসরণের অর্থই হলো সুন্নাতের বৈপরিত্য অবলম্বন করা। এ কারণেই মহান রাববুল 'আলামীন তাঁর হাবীবকে শরী'য়াতের সুস্পষ্ট বিধান বলে দিয়ে কেবল ঐ বিধানেরই আনুগত্য করতে আদেশ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ
ثم جعلناك على شريعة من الأمر فأتبعها ولا تتبع أهواء الذين لا يعلمون
“অতঃপর আমি আপনাকে শরী'য়াতের এক বিশেষ পন্থার উপর রেখেছি। অতএব আপনি এর অনুসরণ করুন এবং যারা জানে না তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করবেন না।”৮৪
রসূল নিজেও তাই একদিকে যেমন আমাদেরকে তাঁর সুন্নাতের অনুকরণের তাকীদ করেছেন, অপরদিকে বিদ'আতকে পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। 'উসমান ইবনে হাযির আযাদী বলেনঃ একবার আমি হযরত 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'আববাসের সমীপে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম যে, 'আপনি আমাকে একটি উপদেশ দান করুন। তদুত্তরে তিনি বলেনঃ
عليك بتقوى الله والاستقامة ، واتبع ولا تبتدع
“তোমার উচিত তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করা এবং এর উপর অটল অবিচল থাকা। (যার পন্থা হলো এই যে) আমার আদর্শের অনুসরণ কর, কিন্তু কিছুতেই বিদ'আতের অনুকরণ করো না।”৮৫
রসূলের সাহাবীগণ তাই সুন্নাতের অনুকরণের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। কোন প্রকার যুক্তি-তর্ক কিংবা বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে কখনোই তারা সুন্নাতের সামান্যতম ব্যত্যয় ঘটানোর কথা মনে আনতেন না। ইবনে 'আববাসের নিম্নোক্ত হাদীসটি রসূলের সুন্নাহর ব্যাপারে তাঁদের এরূপ অনমনীয় মনোভাবেরই সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
عن ابن عباس أنه سئل : ما بال المسافر يصلي ركعتين إذا انفرد، وأربعا إذا انتم بمقيم؟ فقال: تلك السنة. وفي لفظ أنه قال له موسى بن سلمة: إنا إذا كنا معكم صلينا أربعاً، وإذا رجعنا صلينا ركعتين . فقال: تلك سنة أبي القاسم صلى الله عليه وسلم
"ইবন 'আববাস থেকে বর্ণিত, মুসাফিরের সালাত সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে যে, সে যখন একা নামায পড়ে তখন দুই রাকা'আত পড়ে, আর যখন মুকিমের পেছনে ইক্তেদা করে তখন কেন চার রাকা'আত পড়ে? তখন তিনি বললেন, এটিই হলো সুন্নাত (রসূলের অনুসৃত পন্থা)। অন্য এক বর্ণণায় এভাবে এসেছে যে, মূসা বিন সালামাহ তাঁকে জিজ্ঞেস করলো যে, আমরা যখন আপনার সাথে থাকি তখন চার রাকা'আত নামায পড়ি, আর যখন নিজেদের মাঝে চলে যাই, তখন দুই রাকা'আত পড়ি কেন? তখন তিনি বললেনঃ এটিই হলো আবুল কাসিমের সুন্নাত। ৮৬
'আলী ইবন আবি তালিবের নিম্নোক্ত উক্তিটিও অনুরূপ প্রমাণ বহন করে। তিনি বলেছিলেনঃ
لو كان الدين بالرأي لكان أسفل الخفين أولى بالمسح من أعلاه
"দীনের বিধান যদি বুদ্ধিবৃত্তি তথা যুক্তিতর্কের মাধ্যমেই নির্ধারিত হত, তাহলে মোজার উপরের অংশ মসেহ করার চেয়ে নিচের অংশ মাসেহ করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত হত।"৮৭
সুতরাং, বলা যায় যে, শেষ যামানায় সুন্নাত পালন করা হবে খুবই কঠিন। তবে আশার কথা হ'ল এরূপ নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে সুন্নাত পালনকারীদের জন্যই রয়েছে মহা পুরস্কার। একটি সুন্নাত দৃঢ়ভাবে ধারণের মর্যাদা হবে ৫০ জন শহীদের সমান।
যেমন এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস উল্লেখ করা যায় যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ হ'তে বর্ণিত রসূল এরশাদ করেন,
إِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ زَمَانَ صَبْرٍ لِلْمُتَمَسِّكِ فِيْهِ أَجْرُ خَمْسِيْنَ شَهِيدًا مِنْكُمْ
'তোমাদের পরে এমন একটা কঠিন সময় আসছে, যখন সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে ধারণকারী ব্যক্তি তোমাদের মধ্যকার পঞ্চাশ জন শহীদের সমান নেকী পাবে'।"
মানুষের সামগ্রিক জীবনকে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসের নিকটে সমর্পণ করতে হবে যা উক্ত মানদন্ডের সাথে মিলে যাবে তা গ্রহণযোগ্য হবে। আর যা মিলবে না তা প্রত্যাখ্যাত হবে।
টিকাঃ
৭৮ সূরা নিসা: ৫৯
৭৯ মুওয়াত্ত্বা, হাঃ ১৬২৮; মিশকাত, হাঃ ১৮৬
৮০. সূরা নিসা: ৬৩
৮১ শারহুস্ সুন্নাহ; মিশকাত, হাঃ ১৬৭
৮২ আকীদাতুস সালফ ও আসহাবুল হাদীস- ইমাম আবু উসমান ইসমাঈল ইবনে আব্দুর রহমান ঃ পৃঃ ২৬৪
৮৩ সূরা হাশর: ৭
৮৪ সূরা আল-জাসিয়া: ১৮
৮৫ আদ দারিমী, আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুর রহমান, সুনানু দারিমী, (বৈরুত দারুল, কিতাবিল আরাবী, ১৪০৭ হিঃ), খন্ডঃ ১, পৃঃ নংঃ ৬৫
৮৬ মুসনাদ আহমাদ, হাঃ ১৮৬২
৮৭ আবু দাউদ, হাঃ ১৬২
৮৮ ত্বাবারাণী কাবীর, হাঃ ১০২৪০; সহীহুল জামে, হাঃ ২২৩
📄 বিদ‘আতের অনুসারীদের অবস্থান
বিদ'আতের অনুসারীরা মৃত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয়ের অধিকারী। আল্লাহ্ তা'আলা অবিশ্বাসীকে মৃত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মৃত ও অন্ধকার হৃদয় সম্পন্ন ব্যক্তি আল্লাহ ও দ্বীনের পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ। তাই তাদের কবরও হবে অন্ধকারময়। যখন কিয়ামতের দিন পুলসিরাত পার হওয়ার জন্য মানুষের মাঝে নূর বন্টন করা হবে, তখনও তাদের অন্ধকারের মধ্যেই রাখা হবে। এ নূর তারা পাবে না। তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখান। আর যার কল্যাণ কামনা করেন না। তাকে অন্ধকারের মধ্যেই রেখে দেন। ৮৯ এ প্রসঙ্গে আল্লামা সারাখসী লিখেনঃ১০
وَمَا تَرَدَّدَ بَيْنَ الْبِدْعَةِ وَالسُّنَّةِ يَتْرُكُهُ لِأَنَّ تَرْكَ الْبِدْعَةِ لَازِمٌ وَأَدَاءُ السُّنَّةِ غَيْرُ لَازِمٍ
"আর যে বিষয়টি বিদ'আতও হতে পারে আবার সুন্নাতও হতে পারে বলে উভয় সম্ভাবনা রয়েছে এমন বিষয় পরিত্যাগ করবে, কেননা বিদ'আত পরিত্যাগ করা অপরিহার্য জরুরী, আর সুন্নাত পালন করা অপরিহার্য নয়।"৯১ তিনি অন্যত্র লিখেনঃ
وَمَا تَرَدَّدَ بَيْنَ الْمُبَاحِ وَالْبِدْعَةِ لَا يُؤْتَى بِهِ فَإِنَّ التَّحَرُّزَ عَنِ الْبِدْعَةِ وَاجِبٌ... وَمَا تَرَدَّدَ بَيْنَ السُّنَّةِ وَالْبِدْعَةِ لَا يُؤْتَى بِهِ
"যে বিষয়টি বৈধও হতে পারে আবার বিদ'আত হতে পারে বলে উভয় সম্ভাবনা রয়েছে এমন বিষয়ের উপর আমল করা যাবে না, কেননা বিদ'আত পরিহার করে চলা ওয়াজিব ... এবং যে কাজ সুন্নাতও হতে পারে আবার বিদ'আতও হতে পারে বলে উভয় সম্ভাবনা রয়েছে এমন কাজ করা যাবে না। ১২”
অতএব, বিদ'আতপন্থীদের অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হলে বিনা দ্বিধায় এ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ যথাযথভাবে মেনে নেওয়া অপরিহার্য। আর এটিই হচ্ছে কিতাব ও সুন্নাতের অধিকার বা দাবী। কেননা কুরআন এমন এক গ্রন্থ, যার শুরুতেই আল্লাহ চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন,
ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ
'এটি এমন এক কিতাব, যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। আল্লাহভীরুদের জন্য এটি হিদায়াত বা পথ প্রদর্শনকারী। '৯৩ অন্যত্র মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন- 'নিশ্চয়ই কুরআন এক মর্যাদাশীল গ্রন্থ। সম্মুখ বা পশ্চাত কোন দিক দিয়েই এতে বাতিল কিছুরই প্রবেশাধিকার নেই। এটি মহাজ্ঞানী ও চির প্রশংসিত সত্তার পক্ষ হ'তে অবতীর্ণ। ৯৪
টিকাঃ
৮৯ ইজতিমাউল জুয়ুশিল ইসলামিয়াহ আলা গাজওয়াল মুআত্তালা ওয়াল জাহমিয়া - ইবনে কাইয়্যিম (রঃ): ২/৩৮-৪১
৯০ শামসুল আয়িম্মাহ মুহাম্মদ ইবন আহমদ ইবন সাহাল আস্-সার্খাসি, হানাফী মাযহাবের অন্যতম মুজতাহিদ আলেম। ওফাত: ৪৮৩ হিজরী, মোতাবেক ১০৮০ ঈসায়ী। (আল-আ'লাম: ৫/৩১৫)
৯১ সার্থাসী, আল-মাবসূত, ২/১৪৬।
৯২ প্রাগুক্ত, ৩/৩৫৭।
৯৩ সূরা বাক্বারাহঃ ২
৯৪ সূরা হামীম সাজদা : ৪১/৪১-৪২
📄 বিদ‘আত হারাম
ধর্মের মধ্যে নতুন কিছুর সংযোজন বা বিয়োজন করা বিদআত বা হারাম বলে বিবেচিত। কারণ শরীয়তের বিধান প্রণয়নের দায়িত্ব এককভাবে শুধুই আল্লাহর এবং তাঁর ইচ্ছা ও অনুমতি ব্যতীত শরীয়তের বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার কারো নেই। পবিত্র কুরআন ধর্মীয় পুরোহিতদের অন্ধ অনুসরণের কারণে ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং তাদের নিরঙ্কুশ কর্মবিধায়ক নির্ধারণ করার কারণে ভর্ৎসনা করে বলেছে,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ
তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সংসার বিরাগী পুরোহিতদের নিজেদের পালনকর্তা বলে গ্রহণ করেছে। ৯৫
যদিও ইহুদী আলেমরা তাঁদের অনুসারীদের নিজেদের উপাসনার দিকে আহ্বান করতেন না কিংবা তাঁদের অনুসারীরাও তাঁদের উপাসনা করত না, কিন্তু তাঁরা আল্লাহর হালাল করা বস্তুকে হারাম এবং হারাম করা বস্তুকে হালাল বলে ঘোষণা করতেন। জনসাধারণ তা জানা সত্ত্বেও তাঁদের আনুগত্য করত ও তাঁদের কথা শুনত। এ কারণেই এ আনুগত্যকে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিপালক গণ্যকারী বলেছেন যা প্রকৃতপক্ষে একরূপ উপাসনার নামান্তর। খ্রিস্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ
আর বৈরাগ্য, তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল যা আল্লাহ তাদের জন্য নির্ধারণ করেননি। ৯৬ সহীহ হাদীসসমূহেও কঠোরভাবে বিদ'আত কে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ إِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةً وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ وَكُلُّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ.
আল্লাহ্ যাকে হিদায়াত দান করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোন পথ প্রদর্শনকারী নেই। নিশ্চয়ই সর্বাধিক সত্যবাণী হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার কিতাবের বাণী। আর সর্বোত্তম পথ হলো মুহাম্মাদ কর্তৃক প্রদর্শিত পথ। আর মন্দ বিষয়গুলো হলো (দ্বীনের মধ্যে) নবসৃষ্ট আমল বা কাজ। প্রত্যেক নবসৃষ্ট আমলই বিদ'আত। প্রত্যেক বিদ'আতই ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণام জাহান্নাম।১৭ নিশ্চয়ই শরীয়তে সকল প্রকার বিদ'আত হারাম ও পথভ্রষ্টতা। এ প্রসঙ্গে রসূল বলেনঃ
وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ.
তোমরা নব্য সৃষ্ট বিষয় হতে বেঁচে থাক। কেননা সকল নবসৃষ্ট বস্তু বিদ'আত ও সকল বিদ'আত পথভ্রষ্টতা। ১৮ রসূল বলেনঃ
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ
যে আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু প্রবর্তন করে যা এর অন্তর্ভূক্ত নয় তা প্রত্যাখ্যাত। ১৯ অন্য বর্ণনায় রয়েছেঃ
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ.
অর্থঃ যে ব্যক্তি (ইবাদতের) নামে এমন কোন আমল করে যা আমাদের পক্ষ থেকে অনুমোদিত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ১০০
উভয় হাদীসে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, দ্বীনের মাঝে নবসৃষ্ট সকল বিষয় 'বিদ'আত এবং সকল বিদ'আতই ভ্রষ্টতা ও প্রত্যাখ্যাত। অতএব ইবাদতে বিদ'আত হারাম।
ইমাম শাতেবী বলেন, বিদ'আতপন্থীর গুনাহ একটির মধ্যে সীমিত থাকে না বরং বিভিন্ন দিকে শাখা বিস্তার করে। যেমন-
১। বিদ'আতী ব্যক্তি ইজতিহাদের দাবীদার হয় বা কারো তাকলীদ করে।
২। বিদ'আতপন্থী হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার মানসে বিদ'আত প্রবর্তন করে। যথা মান-সম্মান, ধন-দৌলত, ধর্ম, বুদ্ধি অথবা অন্য কোন স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে।
৩। বিদ'আতপন্থী স্বীয় কর্মকান্ড প্রকাশ্যে অথবা গোপনে করে।
৪। স্বীয় বিদ'আতের দিকে মানুষকে আহ্বান করে আবার কখনও করে না।
৫। সে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বহির্ভূত গণ্য হবে বা হবে না।
৬। সেটা মৌলিক বিদ'আত অথবা আপেক্ষিক বিদ'আত হবে।
৭। বিদ'আতটি স্পস্ট হবে অথবা অস্পষ্ট হবে।
৮। বিদ'আতটি কুফরী হবে বা হবে না।
৯। বিদ'আতটি একাধিকবার করা হবে বা হবে না। তিনি (ইমাম শাতেবী) বলেন, এ সকল দিক তথা কারণগুলোর ভিন্নতার ফলে গুনাহও বিভিন্ন ধরণের হয়। ১০১
অতএব বিদ'আত ও শরীয়তের দলিল দ্বারা সাব্যস্ত আমল এক হতে পারে না। আর যা মাকরুহ ও হারাম তা পুরোপুরিই বিদ'আত। ১০২ মোট কথা - ধর্মের কাজ নবীর তরীকা অনুযায়ী করলে নবীর সুন্নাত হবে আর ধর্মের কাজ নিজের ইচ্ছামত করলে বিদ'আত হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথের হেদায়ত দান করুন, আমীন।
টিকাঃ
৯৫ সূরা তাওবা: ৩১
৯৬ সূরা হাদীদ: ২৭
৯৭ মুসলিম, হাঃ ৮৬৭, ১৫৩৫, নাসাঈ, হাঃ ১৫৬০, ১৫৭৮
৯৮ আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৭, তিরমিযী, হাঃ ২৬৭৬
৯৯ সহীহুল বুখারী, হাঃ ২৬৯৭, মুসলিম, হা: ১৭১৮, আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৭, ইবনু মাজাহ, হাঃ ১৪, আহমাদ, হাঃ ২৩৯২৯, ২৪৬০৪, ২৪৯৪৪, ২৫৫০২, ২৫৬৫৯, ২৫৭৯৭
১০০ সহীহ মুসলিম, হাঃ ১৭১৮
১০১ আল-ইতিসাম - শাতেবী, পৃঃ নং: ১/২১৬-২২৪
১০২ আল-ইতিসাম- শাতেবী ১/২৪৬
📄 বিদ‘আতের প্রকারভেদ
দ্বীনের ভিতর সকল বিদ'আতই হারাম। যারা বিদ'আতকে হাসানাহ ও সাইয়্যেআহ বলে বিভক্ত করে, তারা ভুল করে থাকেন এবং রসূল ﷺ - এর বানী
فإنكلبدعة ضلالة.
নিশ্চয়ই প্রত্যেক বিদ'আত গোমরাহ এর বিরোধিতাকারী। ১০৩ অতএব, রসূলুল্লাহ ﷺ বিদ'আত প্রসঙ্গে রায় দিতে গিয়ে বলেছেন প্রত্যেক বিদ'আতই গোমরাহী আর বিদআতীরা বলছে, না প্রত্যেক বিদ'আত গোমরাহী নয় বরং কিছু বিদ'আত আছে হাসানাহ (ভাল)। আল্লামা হফেয ইবনে রজব বলেন: নবী আকরাম ﷺ - এর বাণী (كل بدعة ضلالة) (প্রত্যেক বিদ'আত গোমরাহী) একটি (جوامعالكلم) তথা ব্যাপক অর্থ বোধক বাক্য। কোন কিছুই তার বহির্ভূত নয়। সকল প্রকারই তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এটি দ্বীনের একটি বিশেষ মূলনীতি। এটি রসূলের নিম্নোক্ত বাণীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বক্তব্য। রসূল ﷺ বলেনঃ
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَةٌ.
(যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, সেটি পরিত্যাজ্য হবে)। ১০৪
আল্লামা সুযুতী তার ‘মিফতাহুল জান্নাহ ফিল ইহতিজাজ বিসূন্নাহ’ কিতাবে লেখেন - তোমরা জেনে রাখ! - আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করুন - যে ব্যক্তি রসূল এর হাদীস - চাই তা তার কথা হোক বা কর্ম হোক - দলীল হওয়াকে অস্বীকার করল, সে কুফরী করল, সে ইসলামের গন্ডী থেকে বের হয়ে গেল। তার হাশর ইয়াহূদী ও নাসারাদের সাথে হবে অথবা আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী কোনো কাফের দলের সাথে হবে।' সুতরাং যে কেউ নতুন কিছু উদ্ভাবন ও প্রবর্তন করবে এবং তাকে দ্বীনের দিকে নিসবত (সম্বন্ধ) করবে অথচ দ্বীনে তার কোন মূল ভিত্তি নেই যার দিকে সে ফিরতে পারে, সেটিই গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা। দ্বীন এ সকল বস্তু থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এ ক্ষেত্রে সকল বিষয় যথা আকীদাহ ও আমল সব সমান।
টিকাঃ
১০৩ মুসলিম, হাঃ ৮৬৭
১০৪ সহীহুল বুখারী, হাঃ ২৬৯৭, মুসলিম, হাঃ ১৭১৮, আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৭, ইবনু মাজাহ, হাঃ ১৪, আহমাদ, হাঃ ২৩৯২৯, ২৪৬০৪, ২৪৯৪৪, ২৫৫০২, ২৫৬৫৯, ২৫৭৯৭