📘 সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে বিদআত > 📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী (রহ.) এর ফতোয়া

📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী (রহ.) এর ফতোয়া


সমাজের অপ্রতিরোধ্য চাপের কাছে নতি স্বীকার করে উপরের সকল খেলাফে-সুন্নাত কর্মকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, বিভিন্ন ওজরখাহী করে, পূর্বে আলোচিত বিভিন্ন প্রকারে অপ্রাসঙ্গিক আয়াত ও হাদীসকে "অকাট্য দলিল” হিসাবে পেশ করে “জায়েয” বলেছেন কেউ কেউ। তবে কেউ বলেননি যে, এগুলো সুন্নাত বা রসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবীগণ কখনো এগুলো করেছেন। অপরদিকে অনেক আলেম সমাজের কাছে নতি স্বীকার করতে চাননি। তাঁরা চেষ্টা করেছেন যেন আমাদের সমাজ অন্য সকল বিষয়ের মতো এ বিষয়েও অবিকল সুন্নাত অনুযায়ী চলেন। যাতে সুন্নাত জীবিত হয় এবং মুসলিমগণ নিশ্চিতরূপে সাওয়াব ও বরকত লাভ করেন। এ সকল আলেম ও বুজুর্গগণের একজন সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী । তাঁর কিছু মূল্যবান নসহীত রয়েছে বিদ'আত সম্বন্ধে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলোঃ
প্রথমতঃ সকল মৃত বুজুর্গ ও আপনজনের ক্ষেত্রেই রসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণের সুন্নাত হুবহু পালন করা ও প্রতিষ্ঠা করাই সর্বোত্তম। এজন্য কাফন, দাফন, জানাযা ও মাসনূন তিন দিনের শোক প্রকাশের বাইরে শোক প্রকাশের অনুষ্ঠান করা যাবে না। বিবাহের ওলীমা ছাড়া সকল প্রকার খানাপিনার আয়োজন পরিত্যাগ করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র রসূলুল্লাহ -কেই আদর্শ মানতে হবে। তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে পারসিক, রোমীয়, মধ্য এশিয়, ভারতীয় ইত্যাদি সকল প্রথা পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ এগুলি সবই তাঁর ও তাঁর সাহাবীগণের প্রচলিত রীতি ও তাঁদের তরীকার অতিরিক্ত কর্ম। এগুলি বর্জন করতে হবে এবং এগুলির প্রতি নিজের ঘৃণা প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয়তঃ এ সকল রুসূমাতের মধ্যে নিয়্যাতগত ও কর্মগত অনেক গোনাহের কাজ রয়েছে যার ফলে কেয়ামতের দিন এ সকল রুসূমাত পালনকারীকে কঠিন বিপদে পড়তে হবে। কেউ যদি একান্তই খালেস নিয়‍্যাতে, খালেসভাবে কোনো রকম দিনতারিখ স্থান বা পদ্ধতি নির্ধারণ না-করে কিছু খাওয়া দাওয়া করান তাহলে হয়ত তিনি সাওয়াব পাবেন। তবে তাকে মনে রাখতে হবে যে, মৃতকে সাওয়াব পাঠনো খানাপিনা করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দু'আ ও দানই মৃতের সাওয়াব পাঠানোর সুন্নাত-সম্মত পদ্ধতি। খানাপিনা করানো দানের একটি প্রকার মাত্র।
সাহাবীগণ এ ক্ষেত্রে এই প্রকরণ ব্যবহার করেন নি বরং কূপ খনন, জমি বা বাগান ওয়াকফ করা ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে দানের সাওয়াব প্রেরণ করেছেন। আমাদেরও এ সকল পদ্ধতিতে দান করা উচিত।
তৃতীয়তঃ যদি আমরা এ সকল সুন্নাত বিরোধী পরিত্যাগ করতে না-পারি, তাহলে অন্তত সুন্নাতকে পূর্ণাঙ্গ মনে করতে হবে। কেউ যদি অবিকল সুন্নাত পদ্ধতিতে হুবহু রসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবীগণের মতো দু'আ ও দানে রত থাকেন এবং সকল প্রকার কুলখানী, ইসালে সাওয়াব, ওরশ ইত্যাদি অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করেন, তাহলে তাঁকে উত্তম ও পরিপূর্ণ সুন্নাতের অনুসারী বলে ভালোবাসতে হবে। এভাবে সকল বিষয়ে সুন্নাতকে পরিপূর্ণ ও বিশেষ প্রয়োজনে বা বাধ্য হয়ে করছি বলে মনে করতে হবে। ৬২
এ প্রসঙ্গে ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া আরো উল্লেখ করেন যে, মৃত ব্যক্তির জন্য করণীয় কাজসমূহের দ্বারা তার কাছে কী সাওয়াব পৌঁছে না কি সেটার অসীলা দ্বারা দো'আ করা হলে সেটা কাজে লাগে এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণের মধ্যে দু'টি মত পাওয়া যায়।
এক. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা, ইবনুল কাইয়্যিমসহ একদল আলেম মনে করেন যে তাদের কাছে সাওয়াব পৌছে। এ ব্যাপারে তারা তাদের গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
দুই. পক্ষান্তরে অধিকাংশ আলেম মনে করেন, সওয়াব কেউ কাউকে দিতে পারে না, বরং উচিত হবে সৎকাজ করে সেটার অসীলা দিয়ে দো'আ করা। শাইখুল আলবানীসহ অনেক বিদগ্ধ আলেম এমতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এ দ্বিতীয় মতটিকে আমি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের লেখককে মনে হচ্ছে প্রথম মতের প্রবক্তা। এ ব্যাপারে আমি তার মতামতের উপর হস্তক্ষেপ না করে বিষয়টি বর্ণনা করে দেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করেছি।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মতভেদটি দ্বান্দ্বিক নয় বরং প্রকারান্তিক। কারণ, সবাই মনে করেন যে শরী'আতে অনুমোদিত নয় এমন কোনো কাজ করলে সেটা বিদ'আত হবে। যেমন ওরস, চল্লিশা (চেহলাম), পঞ্চ দিনের অনুষ্ঠান, কিংবা খতমে তাহলীল, খতমে খাজেগান, নির্দিষ্ট দিনে দো'আ অনুষ্ঠান, কুলখানি ইত্যাদি সকল বিষয় বিদ'আত ও পথভ্রষ্টতা। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই। আল্লাহ আমাদেরকে সুন্নাতের উপর পরিপূর্ণভাবে আমল করার তাওফীক দিন। আমীন।

টিকাঃ
৬২ সিরাতে মুস্তাকীম (উদ্দ তরজমা), পৃঃ ৫০-৭৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00