📘 সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে বিদআত > 📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে শাইখ সালেহ বিন ফাওযান (হাফি.) এর ফতোয়া

📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে শাইখ সালেহ বিন ফাওযান (হাফি.) এর ফতোয়া


সউদী আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের সদস্য শাইখ সালেহ বিন ফাওযান বিদ'আত প্রসঙ্গে নসিহত করতে গিয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থ বিদায়াত থেকে সাবধান নামক গ্রন্থে বলেছেন, যুগে যুগে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আলেমগণ বিদ'আতীদের বিদ'আতী কার্য-কলাপের সামনে কখনই চুপ থাকেননি। বরং সব সময়ই প্রতিবাদ করতঃ তাদের কর্মকান্ডে বাঁধা দিয়ে এসেছেন। পাঠক সমীপে এ সম্পর্কে কতিপয় দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হলোঃ
১) উম্মে দারদা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আবু দারদা রাগান্বিত অবস্থায় একদা আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি বললাম, ব্যাপার কি? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! জামাতে নামায আদায় ব্যতীত মুসলমানদের মধ্যে আমি নবী মুহাম্মাদের সুন্নাতের কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
২) আমর বিন ইয়াহয়া হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমার পিতাকে আমার দাদা হতে বর্ণনা করতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমরা একবার ফজরের নামাযের পূর্বে আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ ঘরের দরজার সামনে বসা ছিলাম। উদ্দেশ্য হল, তিনি যখন বের হবেন, আমরা তার সাথে পায়ে হেঁটে মসজিদের দিকে যাত্রা করব। এমন সময় আমাদের কাছে আবু মূসা আশআরী আগমন করে বললেন, আবু আব্দুর রাহমান (ইবনে মাসউদের উপনাম) কি বের হয়েছেন? আমরা বললাম, এখনও বের হন নি। তিনিও আমাদের সাথে বসে গেলেন। তিনি যখন বের হলেন, আমরা সকলেই তাঁর কাছে গেলাম। আবু মূসা আশআরী বললেন, হে আবু আব্দুর রাহমান! আমি মসজিদে এখনই একটি নতুন বিষয় দেখে আসলাম। আলহামদুলিল্লাহ, এতে খারাপ কিছু দেখিনি। ইবনে মাসউ'দ বললেন সেটি কি? আবু মূসা বললেন, আপনার হায়াত দীর্ঘ হলে আপনিও তা দেখতে পাবেন। আবু মূসা আশআরী বললেন, আমি দেখলাম, মসজিদে একদল লোক বৃত্তাকারে বসে নামাযের অপেক্ষা করছে। প্রত্যেক দলের মাঝখানে একজন লোক রয়েছে। আর সবার হাতে রয়েছে ছোট ছোট পাথর। মাঝখানের লোকটি বলছে, একশতবার আল্লাহু আকবার পাঠ কর। এতে সবাই একশতবার আল্লাহ্ আকবার পাঠ করে। তারপর বলে, একশতবার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ কর। এ কথা শুনে সবাই একশতবার আলহামদু লিল্লাহ পাঠ করে থাকে। তারপর লোকটি বলে, এবার একশতবার সুবহানাল্লাহ্ পাঠ কর। সবাই একশতবার সুবহানাল্লাহ্ পাঠ করে থাকে। এ কথা শুনে ইবনে মাসউদ বললেন, তুমি তাদেরকে তাদের পাপের কাজগুলো গণনা করে রাখতে বললে না কেন? আর এটা বললে না কেন যে, তাদের নেকীর কাজগুলো থেকে একটি নেকীও নষ্ট হবে না। কাজেই এগুলো হিসাব করে রাখার কোন দরকার নেই। অতঃপর ইবনে মাসউদ চলতে থাকলেন। আমরাও তার সাথে চললাম এবং একটি হালাকার (বৈঠকের) কাছে এসে উপস্থিত হলাম। তিনি তাদের কাছে দাড়িয়ে বললেন, একি করছো তোমরা? তারা সকলেই বলল, পাথরের মাধ্যমে গণনা করে আমরা তাকবীর, তাসবীহ্ ইত্যাদি পাঠ করছি। ইবনে মাসউদ বললেন, তাহলে তোমরা তোমাদের পাপের কাজগুলোর হিসাব কর। কারণ পাপের কাজগুলো হিসাব করে তা থেকে তাওবা করা দরকার। আমি এ ব্যাপারে জিম্মাদার হলাম যে তোমাদের ভাল কাজগুলোর একটি ভাল কাজও নষ্ট হবে না। এ কথা বলার কারণ এই যে আল্লাহর কাছে কারও আমল বিনষ্ট হয়না বরং একটি আমলের বিনিময়ে দশটি ছাওয়াব দেয়া হয় এবং দশ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়। তারপর তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ এর উম্মাত! অমঙ্গল হোক তোমাদের! কিসে তোমাদেরকে এত তাড়াতাড়ি ধ্বংস করল?!! এখনও নবী মুহাম্মাদের অসংখ্য সাহাবী জীবিত আছেন। এই তো রাসূল এর কাপড় এখনও পূরাতন হয়নি। তাঁর ব্যবহারকৃত থালা-বাসনগুলো এখনও ভেঙ্গে যায়নি। ঐ সত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তোমরা যে দ্বীন তৈরী করেছ তা কি মুহাম্মাদের দ্বীন হতে উত্তম? না তোমরা গোমরাহীর দ্বার উন্মুক্ত করেছ? তারা বলল, হে আবু আব্দুর রাহমান! আমরা এর মাধ্যমে কল্যাণ ছাড়া অন্য কোন ইচ্ছা করিনি। তিনি বললেন অনেক কল্যাণকামী আছে, সে তার উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না।
আল্লাহর নবী আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, একটি দল কুরআন তেলাওয়াত করবে, কিন্তু কুরআন তাদের গলদেশের ভিতরে প্রবেশ করবে না। আল্লাহর শপথ করে বলছি, মনে হয় তাদের অধিকাংশই তোমাদের মধ্য থেকে বের হবে। অতঃপর ইবনে মাসউদ তাদেরকে ছেড়ে চলে আসলেন। আমর ইবনু সালামা বলেন, আমরা তাদের অধিকাংশকেই দেখলাম, নাহ্ রাওয়ানের যুদ্ধে খারেজীদের সাথে আমাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছে।
৩) একজন লোক ইমাম মালেক (রহঃ) এর নিকট আগমন করে বলল, আমি কোথা হতে ইহরাম বাঁধব? তিনি বললেন, রসূল ইহ্রাম বাঁধার জন্য যে সমস্ত স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেখান থেকে ইহরাম বাঁধ। লোকটি বলল, আমি যদি রসূল এর নির্ধারিত স্থান থেকে আরো একটু দূর হতে ইহরাম বাঁধি, তাহলে কি বৈধ হবেনা? ইমাম মালেক (রহঃ) বললেন, আমি ইহাকে বৈধ মনে করি না। সে বলল, আপনি ইহার মধ্যে অপছন্দের কি দেখলেন? তিনি বললেন, আমি তোমার উপর ফিতনার ভয় করছি। সে বলল, ভাল কাজ বেশী করে করার ভিতর ফিত্নার কি আছে? ইমাম মালেক লোকটির এ কথা শুনে বললেন, আল্লাহ তাআ'লা বলেছেন,
فَلْيَحْذَرُ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
অর্থঃ অতএব, যারা তাঁর নবীর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, ফিতনা (বিপর্যয়) তাদেরকে গ্রাস করবে অথবা যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি তাদেরকে আক্রমণ করবে। (সূরা নূর: ৬৩) এর চেয়ে বড় মসিবত আর কি হতে পারে যে, তুমি এমন একটি ফযীলতের মাধ্যমে নিজেকে বৈশিষ্টমন্ডিত করতে চাচ্ছ যার মাধ্যমে স্বয়ং রসূল নিজেকে বৈশিষ্টমন্ডিত করেন নি। ৫৪
সউদী অরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের সদস্য শাইখ সালেহ বিন ফাওযান বিদ'আত প্রসঙ্গে নসিহত করতে গিয়ে বর্তমান প্রচলিত তাবলীগ জামআত সম্পর্কে বলেছেন, দাওয়াতের নাম ব্যবহার করে তাবলীগ জামায়াতের লোকেরা যা করে তা বিদ'আত; সাহাবী, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈ অর্থাৎ সালফে সালেহীনরা এভাবে দাওয়াত দেননি। এদের মাঝে অনেক বিদ'আত এবং ভ্রান্ত কুসংস্কার রয়েছে। এদের কর্মনীতি রসূল এর কর্মসূচী ও কর্মনীতির পরিপন্থী ও বিরোধী। এটি একটি বিদ'আতী সূফী জামায়াত, এদের সম্পর্কে সাবধান থাকা অপরিহর্য। তারা বিদ'আতী চিল্লা দেয়। তাদের দ্বারা ইসলামের কোন ফায়দা হবে না এবং কোন মুসলিমের জায়েয হবে না এ জামায়াতের সাথে সম্পর্ক রাখা এবং এদের সাথে চলা। ৫৫

টিকাঃ
৫৪ বিদায়াত থেকে সাবধান - শাইখ সালেহ ফাওজান, পৃঃ নংঃ ৩৭-৪৪
৫৫ তারিখ: ১৩/৫/১৪১৭ হিজরী, ফাতাওয়া ও চিঠিপত্র, শাইখ সালহ বিন ফাওযান, সউদী আরব এবং দাওয়াত ও ইলমের ব্যাপারে তিনটি বক্তব্য- শায়েখ ফাওযান।

📘 সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে বিদআত > 📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন এর ফতোয়া

📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন এর ফতোয়া


বিদ'আত পরিহার করে সম্পূর্ণরূপে রসূলের অনুকরণ ও অনুসরণ বলতে বুঝায় কুরআনের বক্তব্য মুতাবেক রসূল এর যেসব কাজ করেছেন ও তিনি নিজে যা সুন্নত করেছেন সে সব কাজ করা। রসূল জুম'আর খুতবায়ে ঘোষণা করেছেন,
أَمَّا بَعْدُ، فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ
“অতঃপর উত্তম হাদীস (কথা) হলো আল্লাহর কিতাব, আর উত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মদ এর হিদায়েত।” রসূলুল্লাহ তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন:
عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِنِّ
"তোমরা আমার সুন্নত ও আমার পরে হিদায়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের অনুসরণ করো, এগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরো।” এ ব্যাপারে আরো অনেক হাদীস এসেছে। কতিপয় দুর্ভাগা ও হতভাগারা বলে থাকে যে, “কুরআনে যা আছে শুধু তার উপরই আমল করতে হবে।” অথচ তারা নিজেরাই এর বিপরীত আমল করে থাকে। যেমন: যখন তারা বলে "শুধু কুরআনে যা আছে তাই মানতে হবে” তখন তাদেরকে বলা হবে, কুরআনই রাসূলের অনুসরণ করা ওয়াজিব করেছে। তুমি যা বলছ তা যদি সত্য হয় তবে অবশ্যই তোমাকে হাদীসে যে সব বিধান এসেছে তা গ্রহণ করতে হবে। রসূল এ ধরণের লোকদের সম্পর্কে আগেই সতর্ক করেছেন, তিনি বলেছেন:
قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِنَّا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ الْأَمْرُ مِنْ أَمْرِي مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لَا نَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ» «أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ
নবী বলেছেন, "আমি যেন তোমাদের মাঝে কাউকে এমন না পাই যে, সে তার খাটের উপর ঠেস দিয়ে বসে থাকবে, আর আমি যা আদেশ দিয়েছি বা যা থেকে নিষেধ করছি তা তার কাছে পৌঁছলে সে তখন বলবেঃ এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না, আমরা আল্লাহর কিতাবে যা পেয়েছি তারই অনুসরণ করি" জেনে রাখো, নিশ্চয় আমাকে কুরআন ও এর অনুরূপ একটি কিতাব (সুন্নাহ) দেয়া হয়েছে। ৫৬
সালাফে সালেহীনরা রসূলের সুন্নতের উপর আমল করতেন, এ ব্যাপারে তারা কোনো ধরনের ত্রুটি করতেন না, ছাড়ও দিতেন না। রসূল এর পক্ষ থেকে কোনো আদেশ আসলে আল্লাহ তা'আলার আদেশের মতই তারা তা গ্রহণ করতেন। সাহাবা কিরামদেরকে রসূল কোনো আদেশ দিলে তারা জিজ্ঞেস করতেন না এটা কি ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব? কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তারা তা পালন করতেন। খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কিছু লোক রসূল এর আদেশ শুনলে জিজ্ঞেস করে “এটা কি ফরয নাকি মুস্তাহাব?” সুবহানাল্লাহ!! কিভাবে এটা সম্ভব? কিভাবে আমরা এভাবে ব্যাখ্যা তালাশ করি?! অথচ আল্লাহ তা 'আলা বলেছেন:
﴿ أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ﴾
"তোমরা আল্লাহ, রসূল ও তোমাদের মধ্যকার উলিল আমরের অনুগত্য করো।"৫৭
তোমাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা পালন কর। যদি তা ফরযের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তুমি তোমার উপর অর্পিত দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলে, আর যদি মুস্তাহাব হয় তবে সাওয়াবের অধিকারী হবে। রসূল এর সুন্নতকে আঁকড়ে ধরলে বিদ'আতকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। কেননা রসূল বলেছেন,
خَيْرُ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ، وَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا
"সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব আর সর্বোত্তম হিদায়েত হলো রসূল এর হিদায়েত এবং সর্বনিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কার।"৫৮
এখানে নতুন অবিষ্কারকে সুন্নাতের বিপরীত বলা হয়েছে। ফলে মানুষ যতই সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে ততই বিদ'আত থেকে দূরে থাকবে। এভাবেই সে বিদ'আতকে প্রত্যাখ্যান করল। আল্লাহ তা'আলা যা শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত করেছেন তা ব্যতীত বান্দা ইবাদত করতে পারে না। কেননা সে সুন্নতের অনুসারী। এতে অনেক ফল রয়েছে। তা হলো: বিদ'আতকে নিঃশেষ করা, কেননা সে সুন্নতের অনুসারী। আর বিদ'আতকে নিঃশেষ ও অপছন্দ করা বান্দার উপর মহান আল্লাহ তা'আলার অশেষ নিয়ামত। বিদ'আতকে প্রত্যাখ্যান করা শির্ককে প্রত্যাখ্যান করার মতই। কেননা শির্ক মুক্ত হয়ে সহীহ ইখলাস ও বিদ'আত মুক্ত সঠিক অনুসরণ ব্যতীত ইবাদত কবুল হয় না।৫৯

টিকাঃ
৫৬ আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৪ ও ৪৬০৫
৫৭ সূরা নিসা: ৫৯
৫৮ ইবন মাযাহ, হাঃ ৪৫
৫৯ নবীর সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা ও তার প্রভাব - শাইখ মুহাম্মদ সালিহ আল-উসাইমীন ফতোয়া থেকে সংকলিত

📘 সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে বিদআত > 📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) এর ফতোয়া

📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) এর ফতোয়া


ইমাম আলবানী এর কাছে বিদ'আতকে বিদা'আতে হাসানাহ্ (ভাল বিদ'আহ্) বা বিদ'আতে ওয়াজিবাহ্ (ওয়াজিব বিদ'আত) কে ভাগ করা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, "কেউ কেউ কতিপয় বিদ'আতকে ওয়াজিব বলে থাকে। আর এ ব্যাপারে দৃষ্টান্ত পেশ করে বলে, আবু বাকার ও 'উমার কুরআনকে একত্রিত করেছেন। এটা ইসলামের মধ্যে বিদ'আত, কিন্তু ওয়াজিব বিদ'আত। আমরা বলি, "বিদ'আত" শব্দটিকে নিন্দার অর্থে প্রয়োগ করা হয়। যেমনটি হাদীসে বলা হয়েছে, প্রত্যেক বিদ'আতই পথভ্রষ্টতা। আবূ বাকার কর্তৃক কুরআ একত্রীকরণ সরাসরি ওয়াজিব, বিদ'আত নয়। তারা যদি বলে, এটা বিদ'আত। তবে এটাকে আভিধানিক অর্থে বিদ'আত বলতে হবে। শরীআতের পরিভাষায় এটাকে বিদ'আত বলা যাবে না।
সাহাবীদেরকে যে বিষয়টি কুরআন একত্র করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তা তোমরা জানো। তাঁদের কাছে একদিনে ৭০ জন ক্বারী সাহাবী নিহত হওয়ার সংবাদ আসল। তাঁরা কুরআন বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করলেন। তাই তাঁরা তাৎক্ষণিক কুরআনকে একত্রিত করলেন। 'আলিমদের নিকটে সর্বজন স্বীকৃত একটি মূলনীতি হল, "যা ব্যতিরেকে ওয়াজিব সম্পন্ন হয় না, সেটাও ওয়াজিব।" কুরআনকে হিফাযত করা ওয়াজিব। আর সে সময় কুরআনকে একত্রিত না করে এই ওয়াজিব কাজটিও সম্পন্ন হচ্ছিল না, বিধায় এটাও ওয়াজিব। অতএব কুরআন একত্র করাকে বিদ'আত বলা যাবে না। এটা অনেক বড় ভুল এবং জঘন্য কাজ।
তোমরা জানো, স্বহীহ্ বুখারী ও স্বহীহ্ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। নবী খাইবার দূর্গ জয় করলেন। তারপর কর প্রদানের শর্তে খাইবারবাসীদের সেখানে রাখলেন। আর তাদের সাথে তিনি এ ব্যাপারে একমত পোষণ করলেন যে, তাদের সেখানে থাকাটা মুসলিমদের ইচ্ছাধীন থাকবে। তিনি বলে দিলেন, আমরা যতদিন ইচ্ছা করব, ততদিন তোমাদেরকে এখানে থাকতে দিব। রসূল মারা গেলেন, তখন ইয়াহূদীরা খাইবারে ছিল। আবু বাকার মারা গেলেন, তখনও ইয়াহূদীরা খাইবারে ছিল। 'উমার এর শাসনামলে আল্লাহ যতদিন চাইলেন, ততদিন তারা খাইবারে থাকল। এরপর 'উমার ইয়াহূদীদেরকে খাইবার থেকে বিতাড়িত করলেন। এটা কি দ্বীনের ক্ষেত্রে বিদ'আত? কক্ষণো নয়। কারণ, তারা মুসলিমদের ইচ্ছাধীন ছিল। মুসলিমরা যতদিন ইচ্ছা করবে, ততদিন তারা সেখানে থাকতে পারবে। দ্বিতীয়ত, রসূল বলেছেন, "তোমরা 'আরব উপদ্বীপ থেকে ইয়াহূদীদের বিতাড়িত করো।" এটা সরাসরি ওয়া-জিব, বিদ'আত নয়।
'উমার'র খিলাফাত কালে তারা-বীহর স্বলাতে লোকদেরকে একত্রিত করা হয়। 'উমার ক্বারী সাহাবী উবাই বিন কা'ব কে তারা-বীহর সালাতে লোকদের ইমামতি করার নির্দেশ দিলেন। লোকদের একত্রে স্বলাত পড়া দেখে তিনি বলেছিলেন, কতই না উত্তম বিদ'আত! তাঁর এই কথাটির দ্বারাও তারা দলিল পেশ করে যে, ইসলামে বিদআতে হাসানাহ্ আছে। এক্ষেত্রে জবাব হল, 'উমার রসূল এর সুন্নাকে জিন্দা করেছিলেন। তিনি কোন বিদ'আত করেননি। যেহেতু স্বয়ং রসূল তিনদিন জামা'আতে তারা-বীহর সালাত আদায় করেছিলেন। তারপর তিনি ফারয হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আর পড়েননি। তাঁর মৃত্যুর পর এ আশঙ্কা না থাকায়, স্বলা-তুত তারা-বীহ্ জামা'আতে আদায় করায় কোন সমস্যা নেই। আর এটাকে বিদ'আতও বলা যাচ্ছে না। বরং এটা সুন্নাহর পুনরুজ্জীবন। বিদ'আতকে দুনিয়াবী বিদ'আত ও দ্বীনী বিদ'আত - এই দু'ভাগে ভাগ করা যায়। কতিপয় বাড়াবাড়িকারী চামচ দিয়ে খাওয়াকে প্রত্যাখ্যান করে। দ্বীনের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। তবে কেন তুমি প্রত্যাখ্যান করো? রসূল চামচ দিয়ে খাননি, এটা বিশুদ্ধ কথা। এতদ্ব্যতীত তিনি তো যানবাহন এবং বিমানেও চড়েননি। এখন কি একথা বলা যাবে যে, এগুলো বিদ'আত? বিদ'আত দ্বীনের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। তাই চামচ দিয়ে খাওয়া, বিমান ও যানবাহনে চড়া প্রভৃতি দুনিয়াবী বিষয়। এগুলো বিদ'আত নয়।" (ঈষৎ সংক্ষেপায়িত)।৬০
বিদ'আত প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন যে, বিদ'আত পরিহার করে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ ও রাসূলের অনুকরণ ও অনুসরণ এই (অনুসৃত) পথটাই হচ্ছে সর্বাধিক সঠিক পথ যার ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাহগণকে আদেশ প্রদান করেছেন এবং রাসূলগণের প্রধান আমাদের নবী মুহাম্মদ দেখিয়ে দিয়েছেন। আর এটাই সেই পথ যার অনুসরণ করেছেন সাহাবা, তাবিঈন ও তৎপরবর্তী সৎ পূর্বসূরীগণ, যাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম চতুষ্টয় যাদের নামে সৃষ্ট মাযহাবসমূহের সাথে আজকের জগতের বেশীরভাগ মুসলিম সম্পর্কযুক্ত। তাদের প্রত্যেকেই বিদ'আত পরিহার করে সুন্নাহ (হাদীস) আঁকড়ে ধরা ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করার অপরিহার্যতার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন এবং তার বিপরীত যে কোন কথাকে পরিত্যাগ করতেও একমত ছিলেন সে কথার প্রবক্তা যত বড় ই হোন না কেন, যেহেতু নবী -এর মর্যাদা হচ্ছে তাদের তুলনায় অনেক বেশী এবং তাঁর পথ সর্বাধিক সঠিক। তাই আমি তাঁদের পথ ধরে চলেছি, আর তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি এবং হাদীস আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে তাদেরই নির্দেশসমূহ মেনে চলি। যদিও হাদীসটি তাদের কথার বিপরীত হয়। তাদের এহেন নির্দেশনাবলীই সোজা পথে চলা ও অন্ধ অনুসরণ থেকে বিমুখ হওয়ার ব্যাপারে আমার উপর বিরাট প্রভাব ফেলেছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। ৬১

টিকাঃ
৬০ আলবানী, বিদ'আত ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নোত্তর - শীর্ষক লেকচার ক্লিপ থেকে সংগৃহীত
৬১ সলাত সম্পাদনের পদ্ধতি মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী এর ভূমিকা অধ্যায় থেকে সংকলিত

📘 সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে বিদআত > 📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী (রহ.) এর ফতোয়া

📄 বিদ‘আত প্রসঙ্গে সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী (রহ.) এর ফতোয়া


সমাজের অপ্রতিরোধ্য চাপের কাছে নতি স্বীকার করে উপরের সকল খেলাফে-সুন্নাত কর্মকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, বিভিন্ন ওজরখাহী করে, পূর্বে আলোচিত বিভিন্ন প্রকারে অপ্রাসঙ্গিক আয়াত ও হাদীসকে "অকাট্য দলিল” হিসাবে পেশ করে “জায়েয” বলেছেন কেউ কেউ। তবে কেউ বলেননি যে, এগুলো সুন্নাত বা রসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবীগণ কখনো এগুলো করেছেন। অপরদিকে অনেক আলেম সমাজের কাছে নতি স্বীকার করতে চাননি। তাঁরা চেষ্টা করেছেন যেন আমাদের সমাজ অন্য সকল বিষয়ের মতো এ বিষয়েও অবিকল সুন্নাত অনুযায়ী চলেন। যাতে সুন্নাত জীবিত হয় এবং মুসলিমগণ নিশ্চিতরূপে সাওয়াব ও বরকত লাভ করেন। এ সকল আলেম ও বুজুর্গগণের একজন সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী । তাঁর কিছু মূল্যবান নসহীত রয়েছে বিদ'আত সম্বন্ধে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলোঃ
প্রথমতঃ সকল মৃত বুজুর্গ ও আপনজনের ক্ষেত্রেই রসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণের সুন্নাত হুবহু পালন করা ও প্রতিষ্ঠা করাই সর্বোত্তম। এজন্য কাফন, দাফন, জানাযা ও মাসনূন তিন দিনের শোক প্রকাশের বাইরে শোক প্রকাশের অনুষ্ঠান করা যাবে না। বিবাহের ওলীমা ছাড়া সকল প্রকার খানাপিনার আয়োজন পরিত্যাগ করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র রসূলুল্লাহ -কেই আদর্শ মানতে হবে। তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে পারসিক, রোমীয়, মধ্য এশিয়, ভারতীয় ইত্যাদি সকল প্রথা পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ এগুলি সবই তাঁর ও তাঁর সাহাবীগণের প্রচলিত রীতি ও তাঁদের তরীকার অতিরিক্ত কর্ম। এগুলি বর্জন করতে হবে এবং এগুলির প্রতি নিজের ঘৃণা প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয়তঃ এ সকল রুসূমাতের মধ্যে নিয়্যাতগত ও কর্মগত অনেক গোনাহের কাজ রয়েছে যার ফলে কেয়ামতের দিন এ সকল রুসূমাত পালনকারীকে কঠিন বিপদে পড়তে হবে। কেউ যদি একান্তই খালেস নিয়‍্যাতে, খালেসভাবে কোনো রকম দিনতারিখ স্থান বা পদ্ধতি নির্ধারণ না-করে কিছু খাওয়া দাওয়া করান তাহলে হয়ত তিনি সাওয়াব পাবেন। তবে তাকে মনে রাখতে হবে যে, মৃতকে সাওয়াব পাঠনো খানাপিনা করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দু'আ ও দানই মৃতের সাওয়াব পাঠানোর সুন্নাত-সম্মত পদ্ধতি। খানাপিনা করানো দানের একটি প্রকার মাত্র।
সাহাবীগণ এ ক্ষেত্রে এই প্রকরণ ব্যবহার করেন নি বরং কূপ খনন, জমি বা বাগান ওয়াকফ করা ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে দানের সাওয়াব প্রেরণ করেছেন। আমাদেরও এ সকল পদ্ধতিতে দান করা উচিত।
তৃতীয়তঃ যদি আমরা এ সকল সুন্নাত বিরোধী পরিত্যাগ করতে না-পারি, তাহলে অন্তত সুন্নাতকে পূর্ণাঙ্গ মনে করতে হবে। কেউ যদি অবিকল সুন্নাত পদ্ধতিতে হুবহু রসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবীগণের মতো দু'আ ও দানে রত থাকেন এবং সকল প্রকার কুলখানী, ইসালে সাওয়াব, ওরশ ইত্যাদি অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করেন, তাহলে তাঁকে উত্তম ও পরিপূর্ণ সুন্নাতের অনুসারী বলে ভালোবাসতে হবে। এভাবে সকল বিষয়ে সুন্নাতকে পরিপূর্ণ ও বিশেষ প্রয়োজনে বা বাধ্য হয়ে করছি বলে মনে করতে হবে। ৬২
এ প্রসঙ্গে ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া আরো উল্লেখ করেন যে, মৃত ব্যক্তির জন্য করণীয় কাজসমূহের দ্বারা তার কাছে কী সাওয়াব পৌঁছে না কি সেটার অসীলা দ্বারা দো'আ করা হলে সেটা কাজে লাগে এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণের মধ্যে দু'টি মত পাওয়া যায়।
এক. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা, ইবনুল কাইয়্যিমসহ একদল আলেম মনে করেন যে তাদের কাছে সাওয়াব পৌছে। এ ব্যাপারে তারা তাদের গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
দুই. পক্ষান্তরে অধিকাংশ আলেম মনে করেন, সওয়াব কেউ কাউকে দিতে পারে না, বরং উচিত হবে সৎকাজ করে সেটার অসীলা দিয়ে দো'আ করা। শাইখুল আলবানীসহ অনেক বিদগ্ধ আলেম এমতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এ দ্বিতীয় মতটিকে আমি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের লেখককে মনে হচ্ছে প্রথম মতের প্রবক্তা। এ ব্যাপারে আমি তার মতামতের উপর হস্তক্ষেপ না করে বিষয়টি বর্ণনা করে দেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করেছি।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মতভেদটি দ্বান্দ্বিক নয় বরং প্রকারান্তিক। কারণ, সবাই মনে করেন যে শরী'আতে অনুমোদিত নয় এমন কোনো কাজ করলে সেটা বিদ'আত হবে। যেমন ওরস, চল্লিশা (চেহলাম), পঞ্চ দিনের অনুষ্ঠান, কিংবা খতমে তাহলীল, খতমে খাজেগান, নির্দিষ্ট দিনে দো'আ অনুষ্ঠান, কুলখানি ইত্যাদি সকল বিষয় বিদ'আত ও পথভ্রষ্টতা। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই। আল্লাহ আমাদেরকে সুন্নাতের উপর পরিপূর্ণভাবে আমল করার তাওফীক দিন। আমীন।

টিকাঃ
৬২ সিরাতে মুস্তাকীম (উদ্দ তরজমা), পৃঃ ৫০-৭৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00