📄 বিদ‘আত সম্পর্কে প্রখ্যাত আলেমদের সংজ্ঞা
নিম্নে বিদ'আত সম্পর্কে প্রখ্যাত আলেমদের দেয়া কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা উপস্থাপন করছিঃ
১। ইমাম নববী এ প্রসঙ্গে বলেছেন-
وفي الشرع احداث مالم يكن فى عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم : "ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিদয়াত হচ্ছে - এমনসব নব আবিষ্কৃত জিনিসের নাম, যা রসূল এর সময় ছিল না।"২৯
ইমাম নববী আয়েশা এর হাদীসের উপর একটি মূল্যবান কথা বলেছেন। তিনি বলেন, রসূল এর বাণীঃ
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ
অর্থঃ “যে ব্যক্তি আমাদের পক্ষ থেকে স্বীকৃত নয় এমন কোন আমলের প্রচলন করল, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।"৩০
হাদীসদ্বয়ে উল্লেখিত শব্দ সম্পর্কে আরবগণ বলেনঃ الرَّدُّ শব্দটা এখানে مردود তথা প্রত্যাখ্যাত অর্থে। যার প্রকৃত অর্থ হচ্ছেঃ যে আমল রসূল এর পক্ষ থেকে অনুমোদিত নয় তা বাতিল, প্রত্যাখ্যাত ও অগ্রহণযোগ্য। এ হাদীসটি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি উসূল বা মূলনীতি। এর মাধ্যমে সকল প্রকারের বিদ'আত, নব আবিষ্কৃত ও বানোয়াট বিষয়াবলীর মূলোৎপাটন করা হয়েছে। তবে আয়েশার বর্ণনা দু'টির প্রথমটিতে مَنْ أَحْدَثَ ও দ্বিতীয়টিতে مَنْ عَمِلَ শব্দ এসেছে। এ হাদীসদ্বয়ের মাধ্যমে সকল প্রকার বিদ'আতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন, কেউ পূর্ব প্রবর্তিত বিদ'আত অনুযায়ী আমল করল কিন্তু সে নিজে এর প্রবর্তক নয়, তাহলে তাকে দ্বিতীয় হাদীসের আওতাভুক্ত বলা হবে। মোট কথা সকল প্রকার বিদ'আত চাই সেটা আমল করা হোক বা প্রবর্তন করা হোক, সবই পথভ্রষ্টতার শামিল ও প্রত্যাখ্যাত। ৩১
২। ইমাম ইবন তাইমিয়া (৭২৮ হিজরী/ ১৩২৮ খৃষ্টাব্দ) বিদ'আতের সংজ্ঞায় লিখেছেনঃ
إِنَّ الْبِدْعَةَ فِي الدِّيْنِ هِيَ مَا لَمْ يَشْرَعْهُ اللهُ وَرَسُولُهُ وَهُوَ مَا لَمْ يَأْمُرْ بِهِ أَمْرَ إِيْجَابٍ وَّلَا اسْتِحْبَابٍ
“দীনের মধ্যে বিদ'আত হচ্ছে এমন জিনিস যার বিধান আল্লাহ এবং তাঁর রসূল দেননি, যে ব্যাপারে অবশ্যই করতে হবে বা করাটা উত্তম (মুস্তাহাব) এমন কোন আদেশ বা বিধান নেই।”৩২
৩। ইমাম ইবনুল জাওযী বলেন,
اَلْبِدْعَةُ عِبَارَةٌ عَنْ فِعْلٍ لَّمْ يَكُنْ فَابْتُدِعَ
'বিদ'আত বলতে বুঝায় এমন কাজকে যা ছিল না, অতঃপর তা উদ্ভাবন করা হয়েছে'। ৩৩
৪। আল্লামা শাতবী বলেনঃ বিদ'আত হচ্ছে, দ্বীনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত বিষয়াবলী, যা ইবাদতের সাদৃশ কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তা ইবাদত নয়। এর দ্বারা আল্লাহ্র ইবাদত বেশি পরিমাণে করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। ৩৪
সুতরাং, যারা স্বভাবগত কাজকে বিদ'আতের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না এ সংজ্ঞা তাদের মতামত অনুযায়ী। তারা শুধুমাত্র শরীয়ত বহির্ভূত কাজকেই ইবাদত হিসেবে পালন করাকে বিদ'আত বলে। যারা স্বভাবগত কাজকে বিদ'আতের অন্তর্ভুক্ত করে; তারা বলেন: বিদ'আত হল, দ্বীনের মাঝে নব আবিষ্কৃত বিষয় যা শরীয়তের কার্যক্রমের সাদৃশ্য এবং বিদ'আতী কার্যকলাপকে সাওয়াবের কাজ মনে করা। ৩০ অতঃপর তিনি আরও একটি সংজ্ঞা বর্ণনা করেন, স্বভাবগত কাজকে অভ্যাস হিসেবে আমল করলে তা বিদ'আত হবে না কিন্তু তা যদি ইবাদত হিসেবে করা হয় কিংবা ইবাদত হিসেবে নামকরণ করা হয় তাহলে বিদ'আত হবে। এখানে তিনি দু'টি সংজ্ঞাকে একত্রে এনেছেন। স্বভাবগত বিষয় যা করা ইবাদত। যেমন, ক্রয়-বিক্রয়, বিবাহ-তালাক ও ভাড়া দেয়া ইত্যাদি। কেননা এগুলোতে কিছু শর্ত ও নিয়মাবলী রয়েছে যে সম্পর্কে মানুষকে কোন স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। ৩৬
৫। হাফেয ইবনে রজব বলেন: বিদ'আত হচ্ছে, দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু বিষয় প্রচলন করা শরীয়তে যার কোন ভিত্তি নেই। শরীয়তে যার ভিত্তি আছে তা বিদ'আত হবে না।৩৭ এমন প্রত্যেক বস্তু যা দ্বীনের অংশ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয় অথচ ইসলামে এর কোন ভিত্তি নেই, তা স্পষ্ট ভ্রষ্টতা। দ্বীন ইসলাম এ সকল ভ্রষ্টতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। চাই সেটা বিশ্বাসগত হোক বা বক্তব্যধর্মী অথবা কর্মমূলক। মোট কথা দ্বীন নব আবিষ্কৃত বিদ'আত থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
সালফে সালেহীনের উক্তি মতে কতিপয় নব আবিষ্কৃত বিষয়কে উত্তম বলা হয়েছে। এর দ্বারা আভিধানিক বিদ'আত বুঝানো হয়েছে, শরীয়তে নিষিদ্ধ বিদ'আত বুঝানো হয়নি। যেমন- হাদীসে এসেছ -
وَعَنْ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَبْدِ الْقَارِيِّ أَنَّهُ قَالَ خَرَجْتُ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَابِ لَيْلَةً فِي رَمَضَانَ إِلَى الْمَسْجِدِ فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُونَ يُصَلِّي الرَّجُلُ لِنَفْسِهِ وَيُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّي بِصَلَاتِهِ الرَّهْطُ فَقَالَ عُمَرُ إِنِّي أَرَى لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلَاءِ عَلَى قَارِي وَاحِدٍ لَكَانَ أَمْثَلَ ثُمَّ عَزَمَ فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُتِيَ بْنِ كَعْبٍ ثُمَّ خَرَجْتُ مَعَهُ لَيْلَةً أُخْرَى وَالنَّاسُ يُصَلُّونَ بِصَلَاةِ قَارِئِهِمْ قَالَ عُمَرُ نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ وَالَّتِي يَنَامُونَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنْ الَّتِي يَقُومُونَ يُرِيدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ أَوَّلَهُ
'আবদুর রাহমান ইবনু 'আবদ আল-ক্বারী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রমাযানের এক রাতে 'উমর ইবনুল খাত্তাব - এর সাথে মসজিদে নাবাবীতে গিয়ে দেখি যে, লোকেরা এলোমেলোভাবে জামা'আতে বিভক্ত। কেউ একাকী সালাত আদায় করছে আবার কোন ব্যক্তি সালাত আদায় করছে এবং ইকতেদা করে একদল লোক সালাত আদায় করছে। 'উমর বললেন, আমি মনে করি যে, এই লোকদের যদি আমি একজন ক্বারীর (ইমামের) পিছনে জমা করে দেই, তবে তা উত্তম হবে। এরপর তিনি 'উবাই ইবনু 'কাব-এর পিছনে সকলকে জমা করে দিলেন। পরে আর এক রাতে আমি তাঁর ['উমর সাথে বের হই। তখন লোকেরা তাদের ইমামের সাথে সালাত আদায় করছিল। 'উমর বললেন, কত না সুন্দর এই নতুন ব্যবস্থা! তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাক তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম যে অংশে তোমরা সালাত আদায় কর, এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন, কেননা তখন রাতের প্রথমভাগে লোকেরা সালাত আদায় করত। ৩৮ উমর এর এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইতিপূর্বে এ ধরণের কাজ আর কখনো সংঘটিত হয়নি, অথচ এটা শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, দ্বীন নব আবিষ্কৃত বিদ'আত থেকে মুক্ত ও পবিত্র। সালফে সালেহীনের উক্তি মতে কতিপয় নব আবিষ্কৃত বিষয়কে উত্তম বলা হয়েছে। এর দ্বারা আভিধানিক বিদ'আত বুঝানো হয়েছে, শরীয়তে নিষিদ্ধ বিদ'আত বুঝানো হয়নি।
টিকাঃ
২৯ ইমাম নববী, তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত, পৃঃ নংঃ ৩/২২
৩০ সহীহুল বুখারী, হাঃ ২৬৯৭, মুসলিম, হাঃ ১৭১৮, আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৭, ইবনু মাজাহ, হাঃ ১৪, আহমাদ, হাঃ ২৩৯২৯, ২৪৬০৪, ২৪৯৪৪, ২৫৫০২, ২৫৬৫৯, ২৫৭৯৭
৩১ ইমাম নব্বীর শরহে মুসলিমঃ https://t.me/Islaminbangla2017/2668
৩২ আহমাদ ইবন তাইমিয়া, শাইখুল ইসলাম, মাজমুউল ফাতাওয়া, (রিয়াদ : দারু 'আলামিল কুতুব, ১৯৯১), খ. ৪, পৃঃ ১০৭-১০৮
৩৩ তালবীসু ইবলীস, পৃঃ নংঃ ১৬
৩৪ আল-ইতিসাম - শাতেবী: ১/৫৩
৩৫ আল-ইতিসাম, লেখক শাতেবী: ১/৫০-৫৬
৩৬ আল-ইতিসাম, লেখক শাতেরী : https://t.me/islaminbangla2017/2668
৩৭ জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ২/১২৭
৩৮ বুখারী, হাঃ ২০১০
📄 বিদ‘আত সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামদের অভিমত
বিদ'আত সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামদের যে সকল অভিমত সমূহ রয়েছে তা নিম্নরূপ আলোচনা করা হলোঃ-
১. ইবনে সা'দ আবু বকর সিদ্দিক হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ উপস্থিত জনতা! নিশ্চয়ই আমি সুন্নাতের অনুসারী বিদ'আতপন্থী নই। যদি আমি ভাল কাজ করি তাহলে আমাকে সাহায্য করবে, আর যদি ভুল করি তাহলে সংশোধন করে দিবে। ৩৯
২. ওমর ইবনে খাত্তাব বলেন, তোমরা তর্কবীদদের থেকে দূরে থাক। কেননা তারা সুন্নাতের দুশমন এবং হাদীস অনুযায়ী আমলে অক্ষম। তারা মনগড়া মতামত বা রায় দিয়ে নিজেরাও গোমরাহ হয় অন্যকেও গোমারাহ করে। ৪০
৩. আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ বলেন, তোমরা সুন্নাতের অনুসরণ কর, বিদ'আতের অনুসরণ করবে না। এটাই তোমাদের জন্য যথেষ্ট। কেননা সকল প্রকার বিদ'আতই ভ্রষ্টতা। ৪১
টিকাঃ
৩৯ আত-তাবাকাতুল কুবরা: ৩/১৩৬
৪০ সুনানে দারেমী, হাঃ ১২১
৪১ আল মুজামুল কাবীর: ৮৭৭
📄 বিদ‘আত সম্পর্কে তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীগণের অভিমত
বিদ'আত সম্পর্কে তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীগণের যে সকল অভিমত সমূহ রয়েছে তা নিম্নরূপ আলোচনা করা হলোঃ
১. ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এক ব্যক্তির নিকট চিঠি লিখেছিলেন, তিনি তাতে বলেছিলেন, আমি তোমাকে আল্লাহ্ ভয়, তাঁর হুকুমের ব্যাপারে মধ্যমপন্থা অবলম্বন, তাঁর নবীর সুন্নাতের অনুসরণ করা এবং কোন ব্যাপারে সুন্নাত প্রমাণিত হওয়ার পর তা ছেড়ে বিদ'আত গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিচ্ছি। ৪২
২. হাসান বসরী (রহঃ) বলেন, আমল ব্যতীত কোন কথা সহীহ হবে না, নিয়ত ব্যতীত কোন কথা ও আমল সহীহ হবে না এবং সুন্নাতের অনুসরণ ব্যতীত কোন নিয়ত, আমল ও কথা সহীহ হবে না। ৪৩
৩. ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, তর্কবীদদের ব্যাপারে আমার ফায়সালা হল খেজুরের ডাল দ্বারা তাদের প্রহার কর, উটের উপর আরোহন করাও, প্রতিটি গোত্রের মধ্যে প্রদক্ষিণ করার কালে একথা বলতে থাক যে, এরা কুরআন ও সুন্নাত ছেড়ে তর্কশাস্ত্র গ্রহণ করেছে। তাই এটাই এর উপযুক্ত বদলা। ৪৪
৪. ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, যে ইসলামে উত্তম মনে করে কোন বিদ'আত প্রচলন করল, সে যেন এ ধারণা পোষণ করল যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর রিসালতের দায়িত্বে খিয়ানত করেছেন। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ . আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম। ৪৫
অতএব এ যুগান্তকারী ঘোষণা কালে যে আমল দ্বীন হিসাবে স্বীকৃত ছিল না, তা আজও দ্বীন হতে পারে না। ৪৬
৫. ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, সুন্নাতের উসূল হল, রসূলের (সাঃ) সাহাবীগণ যা করেছেন তা গ্রহণ করা, তাদের অনুকরণ করা ও বিদ'আত পরিত্যাগ করা। কেননা সকল বিদ'আতই ভ্রষ্টতা। তাই ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করা, প্রবৃত্তির অনুসারীদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা, লৌকিকতা পরিহার করা এবং দ্বীনের ব্যাপারে বিতর্কে না জড়ানো উচিত। ৪৭
অতএব, হাদীস শাস্ত্র, প্রখ্যাত আলেম, সাহাবীদের অভিমত, সালফে সালেহীনদের সংজ্ঞা ও ফিকাহবিদদের বর্ণিত সংজ্ঞাসমূহ হতে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, বিদ'আত পারিভাষিক অর্থে দ্বীনের মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহর দলিল ব্যতিরেকে কোন নতুন বিধান সংযোজন বা বিয়োজন।
টিকাঃ
৪২ আবু দাউদ, হাঃ ৪৬১২
৪৩ শরহে উসূলে ই'তিকাদে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহঃ ১/৬৩ নং ১৮
৪৪ আল হিলইয়াহ - লেখক - আবু নাইমঃ ৯/১১৬
৪৫ সূরা মায়েদা: ৩
৪৬ আল-ইতিসাম, লেখক শাতেবী: ১/৬৫
৪৭ শরহে উসূলে ই'তিকাদে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহঃ ১/১৭৬