📄 বিদ‘আতের সংজ্ঞা - শাব্দিক অর্থে বিদ‘আত
বিদ'আত (بدع) এর শাব্দিক অর্থ হলো অভূতপূর্ব ও নতুন কোন বিষয়। অর্থাৎ বিদ'আত শব্দের শাব্দিক অর্থ নব উদ্ভাবন।” এ শব্দটি শাব্দিক অর্থে সাধারণত কর্তার পূর্ণতা ও সৃষ্টিশীল বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিতবহ। (بَدِيع) শব্দের অর্থ হলো অভিনব ও নজীরবিহীন। এ শব্দটি যখন মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হলো মহান আল্লাহ বিশ্বকে কোন পূর্ববর্তী নজীর ছাড়াই কারো সাহায্য ব্যতীত ও কোন প্রাথমিক উপাদান ভিন্নই সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ তিনি সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোন নমুনারই অনুসরণ করেননি। (অভিধান গ্রন্থসমূহ দ্রষ্টব্য - আল আইন, মুফরাদাত লি রাগিব ইসফাহানী, লিসানুল আরাব প্রভৃতি, 'برع' ধাতু)। বিদ'আত শব্দের মূল ধাতু হলো 'بدع' এর অর্থ কোন উপমা ছাড়াই নতুন কিছু সৃষ্টি করা।১২ যেমন কুরআনে এসেছে: بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ - অর্থঃ আসমান ও যমীন সৃষ্টিকারী।১৩ মূলতঃ শাব্দিক অর্থে বিদ'আত (البدع) থেকে উদ্ভূত। তাছাড়া 'আরবী "বিদ'উন” ধাতু থেকে "বিদ'আহ” বা “বিদ'আতুন” শব্দটি গৃহীত।
“বিদ'উন” অর্থ হলো - পূর্ববর্তী কোন নমুনা অনুসরণ ব্যতীত নব-আবিষ্কার বা নব-উদ্ভাবন। সুতরাং, এখানেও বিদ'আতের আভিধানিক অর্থ প্রযোজ্য।
অতএব, উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, “বিদ'উন” থেকে উদ্ভূত “বিদ'আত” শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো - অপূর্ব আবিষ্কৃত বিষয়, পূর্ববর্তী কোন নমুনা অনুসরণ ব্যতীত নতুন আবিষ্কৃত বিষয় কিংবা প্রথম আবিষ্কৃত বিষয়। প্রচলন আছেঃ ابتد عفلا نبدعة অর্থাৎ এমন পদ্ধতি শুরু করেছে যা ইতিপূর্বে কেউ করেনি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বলেছেন যে, “রসূল তোমাদের জন্যে যা এনেছেন বিনাশর্তে গ্রহণ কর, আর তা থেকে বিরত থাক যা তিনি নিষেধ করেছেন।” ১৪ পবিত্র কুরআনের আয়াতটি সহীহ হাদীসেও এসেছে। নিম্নে হাদীসটি উপস্থাপন করা হলোঃ-
عَنْ أَبِي صَالِحٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে যা আদেশ দেই, তোমরা তা গ্রহণ করো এবং যে বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করি তা থেকে বিরত থাকো। তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। ১৫
বিদ'আত শব্দটি হাদীস গ্রন্থসমূহে সাধারণত শরীয়ত ও সুন্নাতের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ এমন কিছু করা যা ইসলামী শরীয়ত ও মহানবী -এর সুন্নাতের পরিপন্থী বলে গণ্য। আলী বলেছেন: অর্থাৎ ‘মানুষ দু' ধরনের হয় যেমন: শরীয়তের অনুসারী, নতুবা ধর্মের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভাবক’। ১৬ অন্যত্র তিনি মহানবীর নবুওয়াত সম্পর্কে বলেছেনঃ
إظهر بها لشرائع المجعولة وقمعبها لبد عالمدخولة
‘মহান আল্লাহ মহানবীর মাধ্যমে মানব জাতিকে তাদের অজানা ও ভুলে যাওয়া শরীয়তের সাথে পরিচিত করিয়েছেন (অজানা বিধানসমূহকে তাদের সামনে প্রকাশ করেছেন) এবং পূর্ববর্তী শরীয়তসমূহের মধ্যে যে বিদ'আত ও নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ সংযোজিত হয়েছিল তা হতে পরিশুদ্ধ করেছেন।'১৭ অন্যত্র আলী বলেছেনঃ
ما أحدثتبدعة إلا تركبها سنة এমন কোন বিদ'আতই (নব উদ্ভাবিত বিষয়ই) শরীয়তে প্রবেশ করেনি যার দ্বারা কোন না কোন সুন্নাত উপেক্ষিত ও পদদলিত না হয়েছে।১৮ যেমন সারা রাত জেগে নিদ্রা পরিহার করে কিয়ামুল লাইল এর মাধ্যমে এবং ভঙ্গ না করে সারা বছর সাওম রাখার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা এবং অনুরূপভাবে স্ত্রী, পরিবার ও সংসার ত্যাগ করে বৈরাগ্যবাদের ব্রত গ্রহন করা। হাদীসে এসেছে -
أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ يَقُوْلُ جَاءَ ثَلَاثَةُ رَهْطٍ إِلى بُيُوتِ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا أُخْبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُوْهَا فَقَالُوا وَأَيْنَ نَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَدْ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ, وَمَا تَأَخَّرَ قَالَ أَحَدُهُمْ أَمَّا أَنَا فَإِنِّي أُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَدًا وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَصُوْمُ الدَّهْرَ وَلَا أُفْطِرُ وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوَّجُ أَبَدًا فَجَاءَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِلَيْهِمْ فَقَالَ أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ اللَّهِ : وَأَتْقَاكُمْ لَهُ لَكِنِّي أَصُوْمُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي.
আনাস ইবনু মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী এর 'ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা 'ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবী এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক'রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রসূলুল্লাহ্ তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, "তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহ্ কে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশি অনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়।"১৯ তাহক্বীক: হাদীসের মান: সহীহ।
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে -
১. নতুন ভাবে প্রচলন অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে এর কোন প্রচলন ছিল না এবং এর কোন নমুনাও ছিল না।
২. এ নব প্রচলিত বিষয়টিকে দ্বীনের মধ্যে সংযোজন করা এবং ধারণা করা যে, এটি দ্বীনের অংশ।
৩. নব প্রচলিত এ বিষয়টি শরীয়তের কোন 'আম বা খাস দলীল ছাড়াই চালু ও উদ্ভাবন করা।
অতএব, এ তিনটি বিষয়ের একত্রিত রূপ হল বিদ'আত, যা থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ শরীয়তে এসেছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞার এ বিষয়টি হাদীসে বারবার উচ্চারিত হয়েছে।
টিকাঃ
১১ ইবনু ফারিস, মুজাম মাকায়ীসুল লুগাত ১/২০৭, ইবনু মানযুর, লিসানুল আরব ৮/৬, আল-ফাউমী, আল-মিসবাহুল মুনীর, পৃঃ নংঃ ১/৩৮
১২ আল-ইতিসাম - শাতেবী (রঃ): ১/৪৯
১৩ সূরা আনআম: ১০১
১৪ সূরা হাশর: ৭
১৫ বুখারী, হাঃ ৭২৮৮, মুসলিম, হাঃ ১৩৩৭, তিরমিযী, হাঃ ২৬৭৯, আহমাদ, হাঃ ৭৩২০, ৭৪৪৯, ৮৪৫০, ৯২২৯, ৯৪৮৮, ৯৫৭৭, ২৭২৫৮, ৯৮৯০, ২৭৩১২, ১০২২৯, ইবনু মাজাহ, হাঃ ১
১৬ নাহজুল বালাগা, খুঃ নদীঠ
১৭ প্রাগুক্ত, খুঃ নং ১৬১
১৮ প্রাগুক্ত, খুঃ নংঃ ১৪৫
১৯ সহীহ বুখারী, হাঃ ৫০৬৩, ইবনে মাজাহ, হাঃ ১৮৯৬, আহমদ, হা: ১৩৫৩৪
📄 শরীয়তের পরিভাষায় বিদ‘আত
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় বিদ‘আতের সংজ্ঞা
ما أحدث في دين الله وليس له أصل عاما أو خاصا يدل عليه
'যা কিছু আল্লাহর দ্বীনে নতুন সৃষ্টি করা হয় অথচ এর সমর্থনে কোন দলীল প্রমাণ নেই।'২০ অর্থাৎ নব সৃষ্ট বিষয়টি অবশ্যই ধর্মীয় ব্যাপারে হতে হবে। যদি ধর্মীয় ব্যাপার ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে নব-আবিষ্কৃত কিছু দেখা যায় তা শরীয়তের পরিভাষায় বিদ'আত বলে গণ্য হবে না, যদিও শাব্দিক অর্থে তা বিদ'আত। এ প্রসঙ্গে আবুল হাসান আলী নদভী তার 'শিরক ও বিদ'আত' নামক কিতাবে বিদ'আতের সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন। তা হলঃ যে বিশ্বাস বা কাজ আল্লাহ ও তাঁর রসূল দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করেননি কিংবা পালন করার নির্দেশ দেননি সেই ধরনের বিশ্বাস বা কাজকে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করা, এর অঙ্গ বলে সাব্যস্ত করা, সওয়াব বা আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় মনে করে এই ধরনের কাজ করার নাম বিদ'আত।২১ ফিকাহ শাস্ত্রবিদ এবং মুহাদ্দিসগণ বিভিন্নভাবে বিদ'আতকে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
টিকাঃ
২০ আরবী ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম আবুল হুসাইন আহমদ ইবনু ফারিস ইবন যাকারিয়া আল-কাযবীনি আর-রাযি, ৩২৯-৩৯৫ হিজরী, ৯৪১-১০০৪ ঈসায়ী
📄 কুরআন ও হাদীসে ‘বিদ‘আত’ ও ‘সুন্নাত’ শব্দের উল্লেখ
কুরআন মজীদে 'বিদ'আত' শব্দটি তিনটি ক্ষেত্রে তিনভাবে উল্লেখিত হয়েছে। একঃ আল্লাহ সম্পর্কে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে দুটি আয়াতে। একটি আয়াতঃ
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ
আসমান জমিনের সম্পূর্ণ নবোদ্ভাবনকারী, নতুন সৃষ্টিকারী। তিনি যখন কোনো কাজের ফায়সালা করেন, তখন তাকে শুধু বলেনঃ হও। অমনি তা হয়ে যায়।২২ অপর আয়াতটি -
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنَّى يَكُونُ لَهُ وَلَدٌ وَلَمْ تَكُن لَّهُ صَاحِبَةٌ ۖ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ ۖ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
তিনি তো আসমান জমিনের নব সৃষ্টিকারী। তাঁর সন্তান হবে কোথেকে, কেমন করে হবে তাঁর স্ত্রী? তিনি-ই তো সব জিনিস সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি সর্ব বিষয়েই অবহিত।২৩ এ দুটো আয়াতেই আল্লাহ তা'আলাকে 'আসমান জমিনের বদীউন'- 'পূর্ব দৃষ্টান্ত, পূর্ব উপাদান ও পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সৃষ্টিকারী' বলা হয়েছে। দ্বিতীয়, রসূলে করীম এর জবানীতে তাঁর নিজের সম্পর্কে বলা একটি আয়াতে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এভাবেঃ
قُلْ مَا كُنتُ بِدْعًا مِّنَ الرُّسُلِ وَمَا أَدْرِي مَا يُفْعَلُ بِي وَلَا بِكُمْ ۖ
বলো, হে নবী! আমি কোনো অভিনব প্রেরিত ও নতুন কথার প্রচারক রসূল হয়ে আসিনি। আমি নিজেই জানিনে আমার সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হবে, তোমাদের সাথে কি করা হবে, তাও আমার অজ্ঞাত।২৪ আর তৃতীয়, এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে বনী ইসরাঈলের এক অংশের লোকদের বিশেষ ধরণের কথা বলতে গিয়ে। আয়াতটি নিম্নরূপঃ
وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَا هَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَا بِاللَّهِ
এবং অত্যধিক ভয়ের কারণে গৃহীত কৃচ্ছসাধনা ও বৈরাগ্যনীতি তারা নিজেরাই রচনা করে নিয়েছে। আমরা তাদের উপর এই নীতি ফরজ করে দিইনি বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি সন্ধানকেই তাদের জন্য লিপিবদ্ধ করে দিয়েছিলাম। ২৫ এখানে 'রাহবানিয়াত' (বৈরাগ্যনীতি) কে বিদ'আত বলা হয়েছে, যা আল্লাহ তা'আলা ব্যবস্থা করে দেননি, লোকেরা নিজেদের তরফ থেকে রচনা করে নিয়েছে। এখানে যে 'বিদ'আত' এর কথা বলা হয়েছে, সুন্নাত এর বিপরীত শব্দ হিসেবে, এ গ্রন্থে তা-ই আমাদের আলোচ্য বিষয়।
এ আয়াত হতে যে কথাটি স্পষ্ট হয়ে উঠে তা হলোঃ আল্লাহ বান্দাদের জন্য যে বিধি ও বিধান দেননি-বান্দারা নিজেদের ইচ্ছে মতো যা রচনা করে নিয়েছে, তা-ই 'বিদ'আত'। পক্ষান্তরে আল্লাহ যা কিছু লিখে দিয়েছেন, বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন, যা করতে আদেশ করেছেন, তা করা 'বিদ'আত' নয়। এখান হতেই 'বিদ'আত' সংক্রান্ত মূল সংজ্ঞা ও ভাবধারার স্পষ্ট আভাস পাওয়া গেল। সূরা 'আল কাহাফ' এর এক আয়াতে 'বিদ'আত' শব্দের এই অর্থের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায়। আয়াতটি হলোঃ
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُم بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
বলো (হে নবী)! আমলের দিক দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের কথা কি তোমাদের বলবো? তারা হচ্ছে এমন লোক যাদের যাবতীয় চেষ্টা সাধনাই দুনিয়ার জীবনে নষ্ট হয়ে গেছে। আর তারাই ধারণা করে যে তারা খুবই ভালো কাজ করেছে। ২৬
অর্থাৎ যাবতীয় কাজ কর্ম ভুলের ভিত্তিতে সম্পাদিত হওয়া সত্ত্বেও যারা নিজেদের কাজকে খুবই ভালো, খুবই ন্যায়সঙ্গত, খুবই সাওয়াবের কাজ বলে মনে করে, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লোক। বিদ'আত পন্থীরাও ঠিক এমনি। তারা যেসব কাজ করে, আসলে তা আল্লাহর দেয়া নীতির ভিত্তিতে নয়। তা সত্ত্বেও এই হচ্ছে বিদ'আতের সঠিক পরিচয়। সূরা আল-কাহাফের উপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেন, এ আয়াত সাধারণভাবে এমন সব লোকের বেলায়ই প্রযোজ্য, যারা আল্লাহর ইবাদত করে আল্লাহর পছন্দনীয় পন্থার বিপরীত পন্থা ও পদ্ধতিতে। তারা যদিও মনে করছে যে, তারা ঠিক কাজই করেছে এবং আশা করছে যে, তাদের আমল আল্লাহর নিকট স্বীকৃত ও গৃহীত হবে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা ভুল নীতির অনুসারী এবং এ পর্যায়ে তাদের আমল আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত। অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগীর কাজ-যা করলে সওয়াব হবে এবং যা না করলে গুনাহ হবে বলে মনে করা হবে-এমন সব কাজই হতে হবে আল্লাহর সন্তোষমূলক পন্থা ও পদ্ধতিতে। এই হচ্ছে সুন্নাত। আর তার বিপরীত রীতি ও নিয়মে হলে তা হবে সুস্পষ্ট বিদ'আত। কেননা তা সুন্নাত বিরোধী। ইমাম কুরতুবী তাই বিদ'আত বলেছেন এমন সব জিনিসকে যা আল্লাহর কিতাব বা রসূলের সুন্নাত অথবা সাহাবাদের আমলের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও তার অনুরূপ নয়। এ সম্পর্কে অধিক সুস্পষ্ট কথা বিবৃত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতটিতে -
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّn لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
আর যে রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাব যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ। ২৭
এ আয়াতটি সুন্নাতের কুরআনী দলীল সমূহের অন্যতম। যে হিদায়াতের সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে উঠার কথা এখানে বলা হয়েছে মূলত তা-ই 'সুন্নাত'। এ সুন্নাতই হিদায়াতের একমাত্র রাজপথ। কেননা আল্লাহর কালাম ও আল্লাহর অস্পষ্ট ওহী (ওহীয়ে খফী) অনুযায়ীই তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে সুন্নাতের এ আদর্শকেই তিনি উদ্ভাসিত করে তুলেছিলেন। রসূলের তৈরি সমাজের মুমিনগণ এই পথ অনুসরণ করেই চলতেন। এখন যদি কেউ রসূলের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে, রসূলের আদর্শ অনুসরণ করে চলতে প্রস্তুত না হয়, আর এ জন্যে মুমিন সমাজের অনুসৃত আদর্শকে বাদ দিয়ে অপর কোনো আদর্শকে অনুসরণ করে চলে, তবে তার পরিণাম জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু নয়। অতএব রসূলের 'সুন্নাত'কে অনুসরণ করে চলাই কল্যাণ ও মুক্তিলাভের একমাত্র উপায়। হাদীসে নবী করীমের ভাষায় 'সুন্নাত' কেই বলা হয়েছে 'আল-আমর'। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হয়েছে, নবী-করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেনঃ যে লোক আমার এই দ্বীনে এমন কোনো জিনিস নতুন শামিল বা উদ্ভাবন করবে, যা মূলতঃ এর জিনিসের অন্তর্ভূক্ত নয়, তা-ই প্রত্যাখাত হবে। ২৮ এই হাদীসে 'আমর' (অমর) বলে বুঝিয়েছেন মূল দ্বীন ইসলামকে, যা নবী করীম দুনিয়ায় উপস্থাপিত করেছেন। কেননা এই দ্বীন-ইসলামই তাঁর কর্মনীতি এবং তাঁর মান-মর্যাদা ও অবস্থার সাথে পূর্ণ সম্পৃক্ত।
উপরোক্ত হাদীসে রসূলে করীম 'আমার এই ব্যাপারে' বলে ইসলামকেই বুঝিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হলো যে, রসূলের দৃষ্টিতে এ দ্বীন এক পরিপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ ও পূর্ণ পরিমত দ্বীন এবং তা সর্বজন পরিচিত, ব্যাপক প্রচারিত ও অনুভবযোগ্য মাত্রায় সর্বাধিক প্রকাশিত। এ দ্বীন বা দ্বীনের কোনো মৌলিক খুঁটিনাটি দিকও কোনো দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির নিকট অজ্ঞাত, অপরিচিত বা লুকায়িত নেই। এখন কেউ যদি এতে দ্বীন বহির্ভূত কোনো বিষয় বৃদ্ধি করতে চায়, কোনো অ-দ্বীনি ব্যাপার বা কাজকে 'দ্বীনি' বলে চালিয়ে দিতে চায়, তাহলে সেতো গোটা দ্বীনকেই বিনষ্ট করে দিবে। কেননা সে তো মূল দ্বীনকেই আদৌ চিনতে বা বুঝতে পারেনি। এ জন্য বিদ'আতের পরিচয় দান করতে গিয়ে আল্লামা কান্দেলভী লিখেছেন বিদ'আত বলতে বোঝায় এমন জিনিস, যা দ্বীনের ক্ষেত্রে অভিনব, শরীয়তে যার কোনো ভিত্তি নেই, মৌলিক সমর্থন নেই। শরীয়তের পরিভাষায় তারই নাম হচ্ছে বিদ'আত। 'বিদ'আত' এর এ সংজ্ঞা হতে স্পষ্ট জানা গেল যে, ব্যবহারিক জীবনের কাজে কর্মে ও বৈষয়িক জীবন যাপনের নিত্য নতুন উদ্ভাবন এবং নবাবিষ্কৃত যন্ত্রপাতি নির্মাণের সঙ্গে শরীয়তী বিদ'আতের কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা তার কোনোটিই ইবাদত হিসেবে ও আল্লাহর কাছে সওয়াব পাওয়ার আশায় করা হয় না। অবশ্য এ পর্যায়েও শর্ত এই যে, তার কোনোটিই শরীয়তের মূল আদর্শের বিপরীত হতে পারবে না।
অনুরূপভাবে যেসব ইবাদত নবী কারীম কিংবা সাহাবায়ে কিরাম হতে কথার কিংবা কাজের বিবরণ এর মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে ও ইশারা ইঙ্গিতে প্রমাণিত, তাও বিদ'আত নয়। এই সঙ্গে এ কথাও জানা গেল যে, নবী করীম এর যুগে যে কাজ করার প্রয়োজন হয়নি; কিন্তু পরবর্তীকালে কোনো দ্বীনি কাজের জন্য দ্বীনি লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যেই তা করার প্রয়োজন দেখা দিবে, তা করাও বিদ'আত হিসেবে গণ্য হতে পারে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, প্রচলিত নিয়মে মাদ্রাসা শিক্ষা ও প্রচারমূলক সংস্থা ও দ্বীনি প্রচার বিভাগ কায়েম করা, কুরআন হাদীস বুঝাবার জন্যে আরবী ব্যাকরণ রচনা বা ইসলাম বিরোধীদের জবাব দেবার জন্য যুক্তিবিজ্ঞান ও দর্শন রচনা, জিহাদের জন্য আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও আধুনিক যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষাদান, দ্রুতগামী ও সুবিধাজনক যানবাহন ব্যবহার এসব জিনিস এক হিসেবে ইবাদতও বটে যদিও এগুলো হসুলে করীম এবং সাহাবায়ে কিরামের যুগে বর্তমান রূপে প্রচলিত হয়নি। তা সত্ত্বেও এগুলোকে বিদ'আত বলা যাবে না। কেননা এসবের এভাবে ব্যবস্থা করার কোনো প্রয়োজন সেকালে দেখা দেয়নি। কিন্তু পরবর্তীকালে এর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলেই তা করা হয়েছে এবং তা দ্বীনের জন্যই জরুরী। আর সত্য কথা এই যে, এসবই সেকালে ছিল সেকালের উপযোগী ও প্রয়োজনীয় রূপে। তাই এগুলো কোনোটিই 'বিদ'আত' নয়। এসব সম্পর্কে এ কথাও বলা চলে যে, এগুলো মূলত কোনো ইবাদত নয়। এগুলো করলে সওয়াব হয়, সে নিয়তেও তা কউ করে না। এগুলো হলো ইবাদতের উপায় ও মাধ্যম। তার মানে এগুলো এমন নয়, যাকে বলা যায় 'দ্বীনের মধ্যে নতুন জিনিসের উদ্ভাবন।' এবং এগুলো হচ্ছে- 'দ্বীনি পালন ও কার্যকরকরণের উদ্দেশ্যে নবোদ্ভাবিত জিনিস।'
আল কুরআন ও হাদীসের নিষিদ্ধ হলো দ্বীনের ভিতর দ্বীনরূপে নতুন জিনিস উদ্ভাবন করা। দ্বীনের বাস্তবায়নের জন্য নতুন জিনিস উদ্ভাবন তো নিষিদ্ধ নয়। কাজেই এ জিনিসকে না বিদ'আত বলা যাবে, না তা অবশ্যই অপরিহার্য বলে বিবেচিত হবে। কুরআনে বলা হয়েছে- যারা নিজেদের দ্বীনের মূলকে নানাভাগে ভাগ করে নানা দিকে যাওয়ার পথ বের করেছে এবং নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, হে নবী! তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। এ আয়াতের তাফসীরে আল্লামা খাজেন লিখেছেন, আবু হুরায়রার বর্ণনা অনুযায়ী এখানে বলা হয়েছে, এ উম্মতে মুসলিমার গোমরাহ লোকদের কথা। আর অপর এক হাদীস অনুযায়ী নবী বলেছেন, এ আয়াতে মুসলিম উম্মতের বিদ'আতপন্থী, সংশয়বাদী ও পথভ্রষ্ট লোকদের কথাই বলা হয়েছে। এ আলোচনার ফলে প্রমাণিত হয় যে, নবী করীম যে দ্বীন আল্লাহর নিকট হতে লাভ করেছেন, যা তিনি নিজে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করে চলেছেন এবং যা তিনি জনগণের সামনে উপস্থাপিত করেছেন ও অনুসরণ করে চলতে বলেছেন, এক কথায় একটি পরিভাষা হিসেবে তা-ই হচ্ছে সুন্নাত। আর তার বিপরীত যা কিছু-আকীদা, বিশ্বাস, আমল ও চরিত্র তা যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক তা-ই হলো 'বিদ'আত'। এ দৃষ্টিতে 'সুন্নাত' ও 'বিদ'আত' দুটি পরস্পর বিপরীত, পরস্পর বিরোধী মতাদর্শ, সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী চিন্তা-বিশ্বাস, জীবনধারা ও জীবন ব্যবস্থা। এ দুটো সরল রেখার মতো পরস্পর বিপরীতদিকে ধাবিত। যা সুন্নাত তা বিদ'আত নয়; যা বিদ'আত তা সুন্নাত নয়। অনুরূপভাবে সুন্নাত কখনো বিদ'আত হতে পারে না এবং বিদ'আত কোনোরূপেই এবং কারো কথাতেই সুন্নাতরূপে গৃহীত হতে পারে না।
টিকাঃ
২১ হাসান আলী নদভী রচিত 'শিরক ও বিদ'আত' গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।
২২ সূরা আল বাকারা: ১১৭
২৩ সূরা আল আনআম: ১০১
২৪ সূরা আল আহকাফ: ৯
২৫ সূরা আল হাদীদঃ ২৭
২৬ সূরা আল কাহাফ: ১০৩
২৭ সূরা আন নিসা: ১১৫
২৮ সহীহুল বুখারী, হাঃ ২৬৯৭, মুসলিম, হাঃ ১৭১৮, আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৭, ইবনু মাজাহ, হাঃ ১৪, আহমাদ, হাঃ ২৩৯২৯: https://t.me/Islaminbangla2017/2668