📄 বিদ‘আত পরিচিতি
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 প্রারম্ভিকা
সুন্নাতের বিপরীত যা তা-ই হচ্ছে বিদ'আত। বিদ'আত কাকে বলে? সাইয়েদ জামালউদ্দীন আল কাসেমী লিখেছেনঃ বিদ'আত বলতে বুঝায় দ্বীন পূর্ণ পরিণত হওয়ার পর দ্বীনের মধ্যে কোনো নতুন জিনিসের উদ্ভব হওয়া। আর তা হচ্ছে এমন সব জিনিস যার অস্তিত্ব নবী করীম এর যুগে বাস্তব কাজ, কথা বা সমর্থন অনুমোদনের আকারেও বর্তমান ছিল না এবং শরীয়তের নিয়ম বিধানের দৃষ্টিতেও যে বিষয়ে কোনো অনুমতি পাওয়া যায় না। আর অস্বীকৃতিও পাওয়া যায়না।
'আল্লামা শাওকানীর (মৃঃ ১২৫৫ হি./ ১৮৩৪ খৃঃ) কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি লিখেছেনঃ
البدعة أصلها ما أحدث على غير مثال سابق، ويهلق في الشرع على مقابلة السنة فتكون مذمومة
"বিদ'আত মূলতঃ এমন নতুন উদ্ভাবিত বিষয় পূর্ববর্তী সমাজে যার কোন দৃষ্টান্তই পাওয়া যায় না। আর শরী'য়াতের পরিভাষায় এটি হলো সুন্নাতের বিপরীত। অতএব তা অবশ্যই নিন্দনীয়।” এ সংজ্ঞার দৃষ্টিতে যার অস্তিত্ব সাহাবায়ে কিরামের যুগের কথা, কাজ বা অনুমতি পর্যায়ে কোনো ইজমা হওয়ারও সন্ধান পাওয়া যায়না, তাও বিদ'আত। কেননা দ্বীনে কোনো নতুন জিনিস উদ্ভব করার অধিকারই কারো থাকতে পারে না।
বস্তুতঃ দ্বীন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর তাতে কোনো জিনিসের বৃদ্ধি করা বা কোনো নতুন জিনিসকে দ্বীন মনে করে তদনুযায়ী আমল করা-আমল করলে সওয়াব হবে বলে মনে করা এবং আমল না করলে আল্লাহর আজাব হবে বলে ভয় করাই হচ্ছে বিদয়াতের মূল কথা। যে বিষয়েই এরূপ অবস্থা হবে, তা-ই হচ্ছে বিদয়াত। কেননা, এরূপ করা হলে স্পষ্ট মনে হয় যে, তা পূর্ণ নয়, অপূর্ণ এবং তাতে অনেক কিছুরই অভাব ও অপূর্ণতা রয়েছে। আর এই ভাব ধারাটা কুরআনের নিম্নোক্ত ঘোষণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কুরআন মজীদে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেছেনঃ
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
আজকের দিনে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ পরিণত করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমাদের নিয়ামতকে সম্যকভাবে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম-মনোনীত করলাম।
উক্ত আয়াত থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণ। অথচ বর্তমান সমাজে বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা আছে যে, যা আল্লাহর রসূল এর যুগে যা ছিল না তা-ই বিদ'আত। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে বর্তমানে প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতি একটি বিদ'আত, বিমানে হজ্জে যাওয়া বিদ'আত, মাইকে আজান দেয়া বিদ'আত ইত্যাদি। এ সকল দিক পর্যালোচনা করে তারা বিদ'আতকে নিজেদের মত করে দুই ভাগ করেছে এবং তারা কোনটাকে হাসানাহ (ভাল বিদ'আত) আবার কোনটাকে সাইয়্যেআহ (মন্দ বিদ'আত) বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। সত্যিকারভাবে বিদ'আত সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে এ সব বিষয়ে নিয়ে সংশয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। আর এসব কারনেই বিষয়টিকে পাশ কাটানোর জন্য বিদ'আতকে দু'ভাগে ভাগ করার চেষ্টা করেন। যেমনঃ
(১) বিদ'আতে হাসানাহ ও (২) বিদ'আতে সাইয়্যেআহ।
সত্যি কথা হলো বিদ'আতকে এভাবে ভাগ করাটা হল আরেকটি বিদ'আত এবং তা হাদীসে রসূল এর পরিপন্থী। বিদ'আতে হাসানায় বিশ্বাসীরা যা কিছু বিদ'আতে হাসানাহ হিসাবে দেখাতে চান সেগুলো হয়ত শাব্দিক অর্থে বিদ'আত, শরয়ী অর্থে নয় অথবা সেগুলো সুন্নাতে হাসানাহ। রসূল বলেছেনঃ
مَنْ سَنَ فِي الإِسْلَامِ سُنَةٌ حَسَنَةً فَعُمِلَ بِهَا بَعْدَهُ كُتِبَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِ مَنْ عَمِلَ بِهَا وَلَا يَنْقُصُ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ وَمَنْ سَنَّ فِي الإِسْلَامِ سُنَةٌ سَيِّئَةً فَعُمِلَ بِهَا بَعْدَهُ كُتِبَ عَلَيْهِ مِثْلُ وِزْرٍ مَنْ عَمِلَ بِهَا وَلَا يَنْقُصُ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٍ " .
অর্থঃ জারীর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল বলেছেন, যে ব্যাক্তি কোন উত্তম পন্থার প্রচলন করলো এবং লোকে তদনুযায়ী কাজ করলো, তার জন্য তার নিজের পুরস্কার রয়েছে, উপরন্তু যারা তদনুযায়ী কাজ করেছে তাদের সমপরিমাণ পুরস্কারও সে পাবে, এতে তাদের পুরস্কার মোটেও হ্রাস পাবে না। আর যে ব্যাক্তি কোন মন্দ প্রথার প্রচলন করলো এবং লোকেরা তদনুযায়ী কাজ করলো, তার জন্য তার নিজের পাপ তো আছেই, উপরন্তু যারা তদনুযায়ী কাজ করেছে, তাদের সমপরিমাণ পাপও সে পাবে, এতে তাদের পাপ থেকে মোটেও হ্রাস পাবে না। তাহক্বীক্ব: হাদীসের মানঃ সহীহ।
রসূলুল্লাহ আরও বলেছেন যেঃ إِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنْ كُلِّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
সকল নব-আবিষ্কৃত (দ্বীনের মধ্যে) বিষয় হতে সাবধান! কেননা প্রত্যেকটি নব-আবিষ্কৃত বিষয় বিদ'আত, আর প্রত্যেকটি বিদ'আত হল ভ্রষ্টতা।"
নবী তাঁর এক খুতবায় আরও বলেছেন: إِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلالَةٌ وَكُلُّ ضَلالَةٍ فِي النَّارِ. رواه مسلم والنسائي واللفظ للنسائي
"নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদ -এর আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল (দ্বীনের মধ্যে) নব উদ্ভাবিত বিষয়। আর নব উদ্ভাবিত প্রত্যেক বিষয় বিদ'আত এবং প্রত্যেক বিদ'আত হল ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম।
ফিক্বহী পরিভাষায় বিদ'আতের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয় তা উল্লেখ করা হল:
"البدعة طريقة في الدين مخترعة تضاهي الشرعية يقصد بالسلوك عليها ما يقصد بالطريقة الشرعية". (الاعتصام، الباب الأول في تعريف البدع وبيان معناها
"বিদ'আত হচ্ছে, দীনের মধ্যে আবিষ্কৃত পদ্ধতি যা শরয়ী পদ্ধতির সামঞ্জস্য, এই পদ্ধতির উপর চলার সেই উদ্দেশ্য যা শরয়ী পদ্ধতির উপর চলার উদ্দেশ্য।”৭। কেউ কেউ বলেনঃ “দীনের মধ্যে আবিষ্কৃত পদ্ধতি যা শরয়ী পদ্ধতির সামঞ্জস্য, এই পদ্ধতির উপর চলার উদ্দেশ্য হলোঃ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ইবাদতের মধ্যে বৃদ্ধি করা।"৮
সুতরাং, দ্বীনের ক্ষেত্রে ইসলামে রসূলুল্লাহ যত কিছু আমাদের দিয়েছেন তাতেই ইসলাম সয়ং সম্পূর্ণ। রসূলুল্লাহ এর ইন্তেকালের পর দ্বীন ইসলামের নামে সাওয়াবের আশায়ে যে কোন নতুন প্রথা, রসম-রেওয়াজ প্রচলন করার নামই হলো বিদ'আত। আর এ কারনেই আল্লাহ তা'আলা নিজেই বলেন:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلَامَ دِينًا 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণ করে দিলাম।" রসূল
বিদ'আত প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন যে,
إِذَا خَطَبَ احْمَرَّتْ عَيْنَاهُ وَعَلا صَوْتُهُ وَاشْتَدَّ غَضَبُهُ كَأَنَّهُ مُنْذِرُ جَيْشٍ يَقُولُ " صَبَّحَكُمْ مَسَاكُمْ " . وَيَقُولُ " بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةَ كَهَاتَيْنِ " . وَيَقْرِنُ بَيْنَ إِصْبَعَيْهِ السَّبَّابَةِ وَالْوُsْطَى ثُمَّ يَقُولُ " أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ خَيْرَ الْأُمُورِ كِتَابُ اللَّهِ وَخَيْرَ الْهَدْيِ هَدَى مُحَمَّدٍ وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
জাবির বর্ণনা করেন, রসূলে আকরাম যখন বক্তৃতা করতেন, তখন তাঁর চোখ দু'টি লাল বর্ণ ধারণ করত, তাঁর কণ্ঠস্বর বুলন্দ হয়ে যেত এবং তাঁর রাগ বৃদ্ধি পেত; (তখন মনে হতো) তিনি যেন কোনো সেনাবাহিনীকে সতর্ক করে দিচ্ছেন। তিনি বলতেন, 'আল্লাহ তোমাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় (দিবা-রাত্র) ভালো রাখুক।' তিনি আরো বলতেন: 'আমাকে এবং কিয়ামতকে এই দুই আঙ্গুলের ন্যায় পাঠানো হয়েছে।' একথা বলেই তিনি তাঁর মধ্যমা ও তর্জনী একত্র করলেন এবং বললেন: অতপর সবচেয়ে ভালো বাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। আর সবচেয়ে ভালো নিয়ম হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়ম। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হলো (দ্বীনের ব্যাপারে) বিদ'আত বা নতুন কিছু সৃষ্টি করা। আর প্রতিটি বিদ'আত (নতুন সৃষ্টিই) হলো ভ্রষ্টতা। এরপর তিনি বলতেন, 'আমি প্রতিটি মুমিনের জন্য তার নিজের চেয়ে উত্তম।১০ অতএব, বলা যায় যে, রসূল এর যুগে যা ছিল না তাই বিদ'আত। বিদ'আতে হাসানাহ ও বিদ'আতে সাইয়্যেআহ বলে ইসলামে কোন প্রকার ভাগ নেই বললেই চলে। আর এ কারণেই আল্লাহর রসূল যা বলেছেন আমরা তাই বলব যে, সকল প্রকার বিদ'আত গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথ ভ্রষ্টতার স্থান জাহান্নাম।
টিকাঃ
১ আদ-দারিমী, আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুর রহমান, সুনানুদ দারিমী (বৈরুত: দারুল কিতাবী আরাবী, ১৪০৭ হিঃ, খন্ড ১, পৃঃ ২৬৬)
২. সুন্নাত ও বিদায়াত - মাওলানা আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, ঢাকা, পৃঃ নংঃ ৩০
৩. সূরা মায়েদা: ৩
৪ মুসলিম, হা: ৬৬৯৩, নাসাঈ, হাঃ ২৫৫৪, ইবনে মাজাহ, হা: ২০৩, তিরমিযী, হাঃ ২৬৭৫, আহমাদ, হাঃ ১৮৬৭৫, ১৮৬৯৩, ১৮৭০১; দারিমী, হাঃ ৫১২, ত্বাবারানীর কাবীর, হা: ১৭৬৪৫, সহীহ তারগীব, হাঃ ৬২, হাদীস সম্ভার, হাঃ ১৬২৩
৫ সহীহুল বুখারী, হা: ২৬৯৭, মুসলিম, হাঃ ১৭১৮, আবু দাউদ, হাঃ ৪৬০৭, ইবনু মাজাহ, হাঃ ১৪, আহমাদ, হাঃ ২৩৯২৯, ২৪৬০৪, ২৪৯৪৪, ২৫৫০২, ২৫৬৫৯, ২৫৭৯৭
৬ সহীহ মুসলিম, হাঃ ১৫৩৫, সুনান আন-নাসায়ী, হাঃ ৫৬৬৩
৭ আবু ইসহাকু ইবরাহিম ইবনু মুসা আশ-শাত্বিবী আল-মালিকী, প্রথম অনুচ্ছেদ, ১/২৬।
৮ প্রাগুক্ত।
৯ সূরা মায়েদা: ৩
১০ ইবনে মাজাহ, হা: ৪৫, নাসাঈ, হাঃ ১৫৭৮, ১৯৬২, আবু দাউদ, হাঃ ২৯৫৪, আহমাদ, হাঃ ১৩৭৪৪, ১৩৯২৪, ১৪০২২, ১৪২১৯, ১৪৫৬৬, দারিমী, হাঃ ২০৬, হাদীস সম্ভার, হাঃ ৪৫
📄 বিদ‘আতের সংজ্ঞা - শাব্দিক অর্থে বিদ‘আত
বিদ'আত (بدع) এর শাব্দিক অর্থ হলো অভূতপূর্ব ও নতুন কোন বিষয়। অর্থাৎ বিদ'আত শব্দের শাব্দিক অর্থ নব উদ্ভাবন।” এ শব্দটি শাব্দিক অর্থে সাধারণত কর্তার পূর্ণতা ও সৃষ্টিশীল বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিতবহ। (بَدِيع) শব্দের অর্থ হলো অভিনব ও নজীরবিহীন। এ শব্দটি যখন মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হলো মহান আল্লাহ বিশ্বকে কোন পূর্ববর্তী নজীর ছাড়াই কারো সাহায্য ব্যতীত ও কোন প্রাথমিক উপাদান ভিন্নই সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ তিনি সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোন নমুনারই অনুসরণ করেননি। (অভিধান গ্রন্থসমূহ দ্রষ্টব্য - আল আইন, মুফরাদাত লি রাগিব ইসফাহানী, লিসানুল আরাব প্রভৃতি, 'برع' ধাতু)। বিদ'আত শব্দের মূল ধাতু হলো 'بدع' এর অর্থ কোন উপমা ছাড়াই নতুন কিছু সৃষ্টি করা।১২ যেমন কুরআনে এসেছে: بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ - অর্থঃ আসমান ও যমীন সৃষ্টিকারী।১৩ মূলতঃ শাব্দিক অর্থে বিদ'আত (البدع) থেকে উদ্ভূত। তাছাড়া 'আরবী "বিদ'উন” ধাতু থেকে "বিদ'আহ” বা “বিদ'আতুন” শব্দটি গৃহীত।
“বিদ'উন” অর্থ হলো - পূর্ববর্তী কোন নমুনা অনুসরণ ব্যতীত নব-আবিষ্কার বা নব-উদ্ভাবন। সুতরাং, এখানেও বিদ'আতের আভিধানিক অর্থ প্রযোজ্য।
অতএব, উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, “বিদ'উন” থেকে উদ্ভূত “বিদ'আত” শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো - অপূর্ব আবিষ্কৃত বিষয়, পূর্ববর্তী কোন নমুনা অনুসরণ ব্যতীত নতুন আবিষ্কৃত বিষয় কিংবা প্রথম আবিষ্কৃত বিষয়। প্রচলন আছেঃ ابتد عفلا نبدعة অর্থাৎ এমন পদ্ধতি শুরু করেছে যা ইতিপূর্বে কেউ করেনি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বলেছেন যে, “রসূল তোমাদের জন্যে যা এনেছেন বিনাশর্তে গ্রহণ কর, আর তা থেকে বিরত থাক যা তিনি নিষেধ করেছেন।” ১৪ পবিত্র কুরআনের আয়াতটি সহীহ হাদীসেও এসেছে। নিম্নে হাদীসটি উপস্থাপন করা হলোঃ-
عَنْ أَبِي صَالِحٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে যা আদেশ দেই, তোমরা তা গ্রহণ করো এবং যে বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করি তা থেকে বিরত থাকো। তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। ১৫
বিদ'আত শব্দটি হাদীস গ্রন্থসমূহে সাধারণত শরীয়ত ও সুন্নাতের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ এমন কিছু করা যা ইসলামী শরীয়ত ও মহানবী -এর সুন্নাতের পরিপন্থী বলে গণ্য। আলী বলেছেন: অর্থাৎ ‘মানুষ দু' ধরনের হয় যেমন: শরীয়তের অনুসারী, নতুবা ধর্মের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভাবক’। ১৬ অন্যত্র তিনি মহানবীর নবুওয়াত সম্পর্কে বলেছেনঃ
إظهر بها لشرائع المجعولة وقمعبها لبد عالمدخولة
‘মহান আল্লাহ মহানবীর মাধ্যমে মানব জাতিকে তাদের অজানা ও ভুলে যাওয়া শরীয়তের সাথে পরিচিত করিয়েছেন (অজানা বিধানসমূহকে তাদের সামনে প্রকাশ করেছেন) এবং পূর্ববর্তী শরীয়তসমূহের মধ্যে যে বিদ'আত ও নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ সংযোজিত হয়েছিল তা হতে পরিশুদ্ধ করেছেন।'১৭ অন্যত্র আলী বলেছেনঃ
ما أحدثتبدعة إلا تركبها سنة এমন কোন বিদ'আতই (নব উদ্ভাবিত বিষয়ই) শরীয়তে প্রবেশ করেনি যার দ্বারা কোন না কোন সুন্নাত উপেক্ষিত ও পদদলিত না হয়েছে।১৮ যেমন সারা রাত জেগে নিদ্রা পরিহার করে কিয়ামুল লাইল এর মাধ্যমে এবং ভঙ্গ না করে সারা বছর সাওম রাখার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা এবং অনুরূপভাবে স্ত্রী, পরিবার ও সংসার ত্যাগ করে বৈরাগ্যবাদের ব্রত গ্রহন করা। হাদীসে এসেছে -
أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ يَقُوْلُ جَاءَ ثَلَاثَةُ رَهْطٍ إِلى بُيُوتِ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا أُخْبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُوْهَا فَقَالُوا وَأَيْنَ نَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَدْ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ, وَمَا تَأَخَّرَ قَالَ أَحَدُهُمْ أَمَّا أَنَا فَإِنِّي أُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَدًا وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَصُوْمُ الدَّهْرَ وَلَا أُفْطِرُ وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوَّجُ أَبَدًا فَجَاءَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِلَيْهِمْ فَقَالَ أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ اللَّهِ : وَأَتْقَاكُمْ لَهُ لَكِنِّي أَصُوْمُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي.
আনাস ইবনু মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী এর 'ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা 'ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবী এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক'রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রসূলুল্লাহ্ তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, "তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহ্ কে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশি অনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়।"১৯ তাহক্বীক: হাদীসের মান: সহীহ।
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে -
১. নতুন ভাবে প্রচলন অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে এর কোন প্রচলন ছিল না এবং এর কোন নমুনাও ছিল না।
২. এ নব প্রচলিত বিষয়টিকে দ্বীনের মধ্যে সংযোজন করা এবং ধারণা করা যে, এটি দ্বীনের অংশ।
৩. নব প্রচলিত এ বিষয়টি শরীয়তের কোন 'আম বা খাস দলীল ছাড়াই চালু ও উদ্ভাবন করা।
অতএব, এ তিনটি বিষয়ের একত্রিত রূপ হল বিদ'আত, যা থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ শরীয়তে এসেছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞার এ বিষয়টি হাদীসে বারবার উচ্চারিত হয়েছে।
টিকাঃ
১১ ইবনু ফারিস, মুজাম মাকায়ীসুল লুগাত ১/২০৭, ইবনু মানযুর, লিসানুল আরব ৮/৬, আল-ফাউমী, আল-মিসবাহুল মুনীর, পৃঃ নংঃ ১/৩৮
১২ আল-ইতিসাম - শাতেবী (রঃ): ১/৪৯
১৩ সূরা আনআম: ১০১
১৪ সূরা হাশর: ৭
১৫ বুখারী, হাঃ ৭২৮৮, মুসলিম, হাঃ ১৩৩৭, তিরমিযী, হাঃ ২৬৭৯, আহমাদ, হাঃ ৭৩২০, ৭৪৪৯, ৮৪৫০, ৯২২৯, ৯৪৮৮, ৯৫৭৭, ২৭২৫৮, ৯৮৯০, ২৭৩১২, ১০২২৯, ইবনু মাজাহ, হাঃ ১
১৬ নাহজুল বালাগা, খুঃ নদীঠ
১৭ প্রাগুক্ত, খুঃ নং ১৬১
১৮ প্রাগুক্ত, খুঃ নংঃ ১৪৫
১৯ সহীহ বুখারী, হাঃ ৫০৬৩, ইবনে মাজাহ, হাঃ ১৮৯৬, আহমদ, হা: ১৩৫৩৪
📄 শরীয়তের পরিভাষায় বিদ‘আত
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।