📄 জিকিরের ব্যক্তিগত পন্থা
আহনাফের দলীলসমূহ
অনুচ্ছেদ-১ : মারফু বর্ণনা
হাদীস-১ : আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা)-এর প্রতি সম্বন্ধিত একটি সরীহ মারফু বর্ণনা
নাভীর নিচে হাত বাঁধা সম্পর্কে হানাফী আলেমদের কাছে একটিও ‘সরীহ মারফু মুসনাদ’ বর্ণনা নেই। না সহীহ রয়েছে। আর না যঈফ। বরং পূর্বের যামানার কোন বড় কাযযাবও এমন একটি মারফু মুসনাদ বর্ণনা বানিয়ে যাননি। নাভীর নিচে হাত বাঁধা সম্পর্কে আহনাফের বানানো এ হাদীসটি লক্ষ্য করুন। যেমনটা ‘দিরহামুস সুরা’ গ্রন্থের লেখক লিখেছেন, ‘নাভীর নিচে হাত বাঁধার দলীলগুলির মধ্যে একটি দলীল এটাও যেটাকে সাহেবুল মুহীত আল-বুরহানী এবং সাহেবুল মাজমাউল বাহরাঈনের ব্যাখ্যা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভীর নিচে স্থাপন করা সুন্নত’।
আরয রইল যে, দুনিয়ার কোন গ্রন্থেই এ হাদীসের অস্তিত্ব নেই। এ হাদীসের জন্য যেই শারহু মাজমাউল বাহরাঈনের চারটি পান্ডুলিপি অধ্যয়ন করেছি, চারটি পান্ডুলিপিতেই এ হাদীসটি অনুরূপভাবে পেয়েছি। প্রতীয়মান হল যে, এটা নাসেখের ভুল নয়। বরং স্বীয় মাসলাকের সমর্থনে একে বানানো হয়েছে। এজন্য এ বর্ণনাটির কোন সনদ উল্লেখ করা হয় নি। অর্থাৎ সনদবিহীন। এ বর্ণনাটির মতনের উপর চিন্তা করলে দেখা যায় যে, এতে বলা হচ্ছে 'উভয় হাতকে বাম হাতের উপর রাখা'! মানুষের কি তিনটি হাত? এ সকল কথাই এ বিষয়টির দলীল যে, এ বর্ণনাটি বানোয়াট।
টিকাঃ
৫২২. দিরহামুস সুরাহ পৃ. ৩১; ফাওযুল কিরাম (পান্ডুলিপি) পৃ. ১৮।
৫২৪. দুর্রাহ ফী ইযহারি গশশি নাকদিস সুরাহ পৃ. ৬৬।
📄 সালাত (নামাজ)
তাবেঈনদের উক্তিসমূহ
আহনাফ যখন নিজেদের মাসলাক সম্পর্কে হাদীস পান না তখন তারা সাধারণ জনতার সরলতাকে পুঁজি করে তাবেঈনদের উক্তিসমূহ পেশ করে সেটি হাদীসের তালিকায় শামিল করেন। অথচ তাবেঈদের কথা ও কাজ ঐকমতানুসারে শারঈ হুজ্জত নয়। বরং খোদ ইমাম আবু হানীফা হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাবেঈদের কথা ও আমলকে হুজ্জত মানতেন না।
(১) তাবেঈ আবূ মিজলায রহিমাহুল্লাহ-এর উক্তি:
হাজ্জাজ বিন হাসান বলেছেন, আমি আবূ মিজলায হতে শুনলাম কিংবা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, আমি কিভাবে আমল করব? তখন তিনি বললেন, 'মুসল্লী তার ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর উল্টো পিঠে রেখে নাভীর নিচে রাখবে'।
আরয রইল, এটি একজন তাবেঈর উক্তি। যা ঐকমতানুসারে দলীল নয়। উপরন্তু অন্য তাবেঈদের থেকে এর বিপরীতে 'নাভীর উপরে' হাত বাঁধার স্পষ্ট বর্ণনা উদ্ধৃত আছে। বরং স্বয়ং আবূ মিজলায হতেও নাভীর উপরে হাত বাঁধার উক্তি বর্ণিত আছে। ইমাম বায়হাকী রহিমাহুল্লাহ সাঈদ বিন জুবায়ের (রা) হতে 'নাভীর উপর' হাত বাঁধার উক্তি উদ্ধৃত করেছেন।
(২) তাবেঈ ইবরাহীম নাখাঈ রহিমাহুল্লাহ্র উক্তি:
ইবরাহীম নাখাঈ রহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত আছে যে, 'একজন মানুষ নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভীর নিচে রাখবে'।
আরয রইল, এটি ইবরাহীম নাখাঈ হতে প্রমাণিতই নয়। কেননা এর সনদে রবী বিন সুবাইহ রয়েছেন। কতিপয় বিদ্বান তাকে সিকাহ বললেও কতিপয় তার উপর জারাহ করেছেন। মুহাদ্দিসগণ হিফয ও যবতের ক্ষেত্রে তাকে যঈফ-ই বলেছেন। প্রতীয়মান হল, ইবরাহীম নাখাঈ রহিমাহুল্লাহ হতে 'নাভীর নিচে'-এর কথাটি প্রমাণিত নেই।
টিকাঃ
৬৫১. ইবনু আব্দুল বার, আল-ইনতিফা পৃ. ১৪৪।
৬৫২. মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ১/৩৯০।
৬৫৩. বায়হাকী কুবরা ২/৪৭।
📄 মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক প্রস্তুতি
ইমাম চতুষ্টয়ের উক্তি
(১) ইমাম আবু হানীফা রহিমাহুল্লাহ : ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্য হতে কেবল ইমাম আবূ হানীফা রহিমাহুল্লাহ হতেই একটি উক্তি বর্ণিত আছে। আর তা এই যে, নাভীর নিচে হাত বাঁধতে হবে।
(২) ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ : ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ হতে হাত ছাড়ার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু অন্য মালেকীগণ ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ্র প্রতি এই নিসবতকে ভুল আখ্যা দিয়েছেন। আর ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ্ সহীহ উক্তি হিসেবে এটাই তারা নির্দেশ করেছেন যে, তিনিও হাত বাঁধার পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি মুওয়াত্তায় সাহল বিন সাদ আস-সায়িদীর হাদীস বর্ণনা করেছেন। যা দ্বারা বুকের উপর হাত বাঁধা প্রমাণিত হয়।
(৩) ইমাম শাফেঈ রহিমাহুল্লাহ : ইমাম শাফেঈ রহিমাহুল্লাহ হতে স্পষ্টভাবে বুকে হাত বাঁধার উক্তি বর্ণিত আছে। 'ইমাম শাফেঈর মাযহাব এটাই যে, ডান হাতকে বাম হাতের উপর রেখে বুকে রাখতে হবে। কেননা ইবনু খুযায়মাহ তার সহীহ গ্রন্থে ওয়ায়েল বিন হুজর (রা) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডান হাত বাম হাতের উপর বুকে রেখেছিলেন'। আল্লামা আইনী রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, 'আর ইমাম শাফেঈর মতে, নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধতে হবে'।
(৪) ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ : আল্লামা রুশদুল্লাহ রাশেদী রহিমাহুল্লাহর কথানুসারে শায়েখ আব্দুল হক দেহলবী রহিমাহুল্লাহ্ ও 'শারহু সিফরিস সাআদাহ' গ্রন্থে ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ হতে বুকের উপর হাত বাধার উক্তি উদ্ধৃত করেছেন।
টিকাঃ
৬৮৭. শারহু মুখতাসার আত-তাবরীযী আলা মাযহাব ইমাম শাফেঈ পৃ. ৯২।
৬৮৮. হিদায়া শরহে বিদায়াতুল মুবতাদী ১/৪৯।
৬৮৯. উমদাতুল কারী ৫/২৭৯।
📄 শারীরিক প্রস্তুতি
নারীদের বুকে হাত বাঁধার দলীল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দলীল
নারীরা নাভীর নিচে হাত বাঁধবে এবং পুরুষরা নাভীর নিচে হাত রাখবে মর্মে হানাফীরা যে পার্থক্য করেছেন তার পক্ষে কোন দলীল নেই। মাজমাউয যাওয়ায়েদ গ্রন্থে তাবারানীর একটি হাদীস রফউল ইদাইনের সাথে সম্পৃক্ত, হাত বাঁধার সাথে নয়। প্রতীয়মান হল, নারীদের বুকে হাত বাঁধা প্রসঙ্গে ইজমার দাবীটি প্রত্যাখ্যাত।
নাভীর নিচে হাত বাঁধার ব্যাপারে হানাফীদের যুক্তি ও তার খণ্ডন:
যুক্তি-১: 'নাভীর নিচে হাত বাঁধা লজ্জাস্থান আবৃত করার ও লুঙ্গিকে হেফাযত রাখার অধিক উত্তম উপায়'।
আরয রইল, সম্ভবত এমন কোন বিবেকবান মানুষ পাওয়া যাবে না যিনি এই যুক্তির সামনে নিজের বিবেকের উপর মাতম করবেন না। সলাতে এসে কাপড় খুলে যাওয়ার আশঙ্কা করা কোন বিবেক ও যুক্তির আলোকে হচ্ছে তা প্রতীয়মান নয়। মজার বিষয় এই যে, হানাফীরা নারীদের জন্য এই বৈধতা রেখেছেন যে, তারা বুকে হাত বাঁধবে। নারীদের কি সতর সামলানোর দরকার নেই?
যুক্তি-২: 'পুরুষ নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধলে নারীদের সাথে সাদৃশ্য স্থাপন আবশ্যক হয়ে যাবে'।
আরয রইল, বুকের উপর হাত বাঁধার প্রমাণ পুরুষদের সম্পর্কেই বলা হয়। আর নারীরা এ হুকুমের অনুগামী। এমতাবস্থায় যদি সাদৃশ্য দুর করা উদ্দেশ্য হত তাহলে হানাফীদের উচিত ছিল পুরুষদেরকে বুকের উপর হাত বাঁধতে বলা এবং নারীদেরকে তাদের অনুসারী হওয়া থেকে দুরে রাখা।
যুক্তি-৩: 'নাভীর নিচে হাত বাঁধা নম্রতা ও সম্মানের আলামত'।
আরয রইল, পুরো দুনিয়াতে কোথাও এই অবস্থানকে সম্মানের আলামত বলা হয় নি। বরং একে বেআদবী মনে করা হয়। এর বিপরীতে বুকে হাত বাঁধাকে অবশ্যই সম্মানের একটি পদ্ধতি গণ্য করা হয়।
টিকাঃ
৭২৩. মাজমাউয যাওয়ায়েদ ২/১০৩।
৭২৮. দিরহামুস সুর্বাহ পৃ. ৪৮।
৭২৯. দিরহামুস সুরা পৃ. ৪৫।