📄 নবী (ﷺ) এর প্রতি ছালাত পাঠ এবং তার স্থান ও শব্দাবলী
নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উপর ছালাত পাঠ করতেন প্রথম তাশাহহুদ ও শেষ তাশাহহুদে। (২)
আর উম্মাতের জন্য এটা পাঠ করা বিধিবদ্ধ করেছেন, তিনি তাদেরকে তার প্রতি সালাম প্রদানের পরে ছালাত (দরুদ) পাঠ করারও নির্দেশ দিয়েছেন। (৩)
নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে তাঁর প্রতি ছালাত পাঠ করার বিভিন্ন শব্দ শিক্ষা দিয়েছেন:
আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিন, অ'আলা- আহ্লি বাইতিহী, অ'আলা- আযওয়া-জিহী, অ যুররিয়্যাতিহী, কামা- ছল্লাইতা 'আলা- ইবরা-হীমা, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদুন, অ বা-রিক 'আলা- মুহাম্মাদিন, অ'আলা- আহ্লি বাইতিহী, অ'আলা- আযওয়া-জিহী, অ যুররিয়্যাতিহী, কামা- বা-রাকতা 'আলা- আ-লি ইবরা-হীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদুন।
অ হা-যা- কা-না ইয়াদ'উ বিহী হুওয়া নাফসুহু ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি অসাল্লামা *
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার পরিজন, পত্নীকূল ও সন্তানবর্গকে ছালাতে (১) (প্রশংসা ও মান মর্যাদায়) ভূষিত কর যেমনভাবে ছালাতে ভূষিত করেছ ইবরাহীম নাবীর বংশধরকে, নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত মহিমান্বিত। আর বরকত (১) নাযিল কর মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবার পরিজন, পত্নিকুল ও সন্তানবর্গের উপর যেমনভাবে বরকত নাযিল করেছো ইব্রাহীম নাবীর বংশধরের উপর। নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত মহিমান্বিত।
নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত শব্দাবলী বিশিষ্ট দু'আ (ছালাত) নিজের প্রতি পাঠ করতেন। (২) আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন, কামা- সল্লাইতা 'আলা- ইবরা-হীম অ 'আলা- আ-লি ইবরা-হীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদুন, আল্লাহুম্মা বা-রিক 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- বা-রাকতা 'আলা- ইবরা-হীম অ 'আলা- আ-লি ইবরা-হীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদুন।
হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও তার বংশধরকে ছালাতে ভূষিত কর যেমনভাবে ইবরাহীম নাবী ও তার বংশ ধরকে ছালাতে ভূষিত করেছ, নিশ্চয়ই তুমি অতি প্রশংসিত মহিমান্বিত।
হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধর এর উপর বরকত নাযিল কর যেমনভাবে ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরের উপর বরকত নাযির করেছ, নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত মহিমান্বিত। (১)
আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন, কামা- সল্লাইতা 'আলা- ইবরা-হীম অ আ-লি ইবরা-হীম ইন্নাকা হামীদুম মাজীদুন, অ বা-রিক 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন, কামা- বা-রাকতা 'আলা- ইবরা-হীম অ আ-লি ইবরা-হীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদুন *
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরকে সম্মান ও মর্যাদা দান কর যেমনভাবে ইবরাহীম নবী ও তাঁর বংশধরকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেছ, নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত, অতি মহিমান্বিত। আর মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরের উপর বরকত দান কর যেমনভাবে বরকত দান করেছ ইবরাহীম নবী ও তাঁর বংশরের উপর নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত, অতি মহিমান্বিত। (২)
আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিনিন নাবীয়্যিল উম্মী অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- সল্লাইতা অ বা-রিক 'আলা- মুহাম্মাদিনিন নাবীয়্যিল উম্মী অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- বা-রাকতা 'আলা- {আ-লি} ইবরা-হীম ফীল 'আ-লামীন ইন্নাকা হামীদুম মাজীদুন
হে আল্লাহ! নিরক্ষর নাবী মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশধরকে ছালাত দান কর যেমনভাবে ছালাত দান করেছ ইবরাহীম নাবীকে এবং ইবরাহীম নাবীর বংশধরকে নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত অতি মহিমান্বিত। আর নিরক্ষর নাবী মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশধরকে বরকত দান কর যেমনভাবে বরকত দান করেছ ইবরাহীম নাবী ও ইবরাহীম নাবীর বংশধরকে সমগ্র জগতের ভিতর। নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত অতি মহিমান্বিত। (১)
আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিন 'আবদিকা অ রাসূ-লিকা কামা- সল্লাইতা 'আলা- আ-লি } ইবরা-হীম, অ বা-রিক 'আলা- মুহাম্মাদিন { 'আবদিকা অ রাসূ-লিকা } অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন} কামা- বা-রাকতা 'আলা- আ-লি ইবরা-হীম { আ-লি ইবরা-হীম } )
হে আল্লাহ! তোমার বান্দা ও তোমার রসূল মুহাম্মাদকে ছালাত দান কর, যেমনভাবে ছালাত দান করেছ ইবরাহীম নাবীর বংশধরকে। আর বরকত দান কর তোমার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদকে এবং মুহাম্মাদের বংশধরকে যেমনভাবে বরকত দান করছে ইবরাহীম নাবী ও তাঁর বংশধরকে। (২)
আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আযওয়া-জিহী অ যুররিয়্যাতিহী কামা- সল্লাইতা 'আলা- আ-লি } ইবরা-হীম, অ বা-রিক 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আযওয়া-জিহী অ যুররিয়্যাতিহী কামা- বা-রাকতা 'আলা- আ-লি } ইবরা-হীম ইন্নাকা হামীদুম মাজীদুন *
হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ, তার পত্নীকুল ও সন্তানবর্গের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি কর যেমনভাবে ইবরাহীম নাবীর বংশধরের মান মর্যাদা বৃদ্ধি করেছ এবং বরকত দান কর মুহাম্মাদ, তাঁর স্ত্রীপরিজন ও তাঁর সন্তানবর্গের উপর যেমনভাবে বরকত দান করেছ ইবরাহীম নাবী ও তাঁর বংশধরের উপর, নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত অতি মহিমান্বিত। (১)
আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন , অ বা-রিক 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন ৯১ কামা- সল্লাইতা অ বা-রাকতা 'আলা- ইবরা-হীম আ-লি ইবরা-হীম ইন্নাকা হামীদুম মাজীদুন
হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশধরের মান মর্যাদা বৃদ্ধি কর এবং মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশধরকে বরকত দান কর যেমনভাবে মান-মর্যাদা ও বরকত দান করেছ ইবরাহীম নাবী ও তার বংশধরকে নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত মহিমান্বিত। (২)
১। প্রথম তথ্যঃ লক্ষ্য করা যায় যে, নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ছালাত পাঠের শব্দাবলীর অধিকাংশ প্রকারেই ইবরাহীম নাবীকে তার বংশধর «» থেকে বিচ্ছিন্নরূপে স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করা হয়নি বরং তাতে এই শব্দ উল্লেখ হয়েছে- কামা- সল্লাইতা 'আলা- আ-লি ইবরা-হীম যেভাবে, ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি সম্মান ও রহমত দান করেছ।
এর কারণ হলো আরবী ভাষায় কোন ব্যক্তির বংশধর বলতে গেলে সে ব্যক্তিও তাদের মধ্যে পরিগণিত হয় যেমনভাবে পরিগণিত হয় তারা যারা তার সাথে সম্বন্ধ যুক্ত। যেমনটি আল্লাহর এই বাণীতে এসেছে-
ইন্নাল্লাহাছ ত্বাফা- আ-দামা অ নূহান অ আ-লা ইবরা-হীম অ আ-লা 'ইমরানা 'আলাল 'আ-লামীন [আ-লি 'ইমরান ]
নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরকে বিশ্বের ভিতর থেকে বাছাই করেছেন- (আলু-ইমরান- ৩৩ আয়াত)।
আল্লাহ তা'আলার এই বাণীতেও- ইল্লা- আ-লা লূতিল্ নাজ্জাইনাহুম বিসাহরিন (আল ক্বামার : ৩৪ )
শুধু দূত নাবীর বংশধরকে প্রভাতকালে পরিত্রাণ দান করেছি। (আল-কামার- ৩৪ আয়াত)
এরই পর্যায়ভুক্ত হলো নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই বাণী- আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- আ-লি আবী আউফা-
হে আল্লাহ! সম্মান ও রহমত দান কর আবূ আউফার বংশধরের প্রতি।
আর এরূপই আহলুল বাইত )আহলুল বাইত) শব্দের অবস্থা। যেমন আল্লাহর এ বাণীতে এসেছে- আল বাইতি রাহমাতুল্লা-হি অ বারা-কা-তুহু 'আলাইকুম আহ্লা আল্লাহর রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক তোমাদের উপর হে (ইবরাহীমের) গৃহের সদস্যবৃন্দ অর্থাৎ পরিবার বর্গ- (সূরা হুদ- ৭৩ আয়াত)। ইবরাহীম নবীও তাদের বংশধরের মধ্যে গণ্য।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেছেন: এজন্যই অধিকাংশ শব্দের ভিতর এসেছে- কামা- সল্লাইতা 'আলা- আ-লি ইবরা-হীম যেমনভাবে ইবরাহীম নবীর বংশধর এর উপর রহমত ও সম্মান দান করেছ। এমনিভাবে এসেছে- বা-রাকতা 'আলা- আ-লি ইবরা-হীম ) অবতীর্ণ করেছ। আবার কোন শব্দে স্বয়ং »ইবরা-হীম« ইবরাহীম এসেছে, কারণ সম্মান ও পরিশুদ্ধির এ দু'আয় তিনিই মূল এবং তার সমস্ত বংশধর আনুষঙ্গিকভাবে এটা প্রাপ্ত হয়। আর কোন শব্দে এরূপ ও কোন শব্দে ঐরূপ এসেছে এই দুই অবস্থার ব্যাপারে সচেতন করার জন্যই (এ আলোচনার অবতারণা করা হলো)।
পাঠক যখন এটা জানলেন তখন আরেকটি বিষয়ে জানুন, আলিম সমাজের মাঝে একটি প্রশ্ন প্রসিদ্ধি লাভ করেছে তা হচ্ছে- কামা- সল্লাইতা আল্খ« )যেমনভাবে সম্মান ও রহমত দান করেছ..... শেষ পর্যন্ত) এর ভিতর উপমার কারণ নিয়ে।
আর তা এই জন্য যে, যা উপমিত বিষয় তাকে যার সাথে উপমা দেয়া হয় তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হয়। অথচ এখানে বাস্তবে তার বিপরীত। কারণ মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইবরাহীম নবীর চেয়ে উত্তম। অতএব তার উত্তম হওয়ার দাবী এই যে, তার জন্য কাম্য ছালাত অতীতে প্রাপ্ত ও ভবিষ্যতে প্রাপ্য সকল ছালাত অপেক্ষা উত্তম হওয়া উচিত।
আলিমগণ এর অনেকগুলো উত্তর দিয়েছেন যার অনেকগুলো আপনি ফাতহুল বারী ও জালাউল আফহান গ্রন্থে পাবেন। সেখানে প্রায় দশটির কাছাকাছি উক্তি রয়েছে। যার একটা আর একটার চেয়ে অধিক দুর্বল- কেবল একটি মাত্র উক্তি ছাড়া। সেটিই কেবল শক্তিশালী- আর এটাকে পছন্দ করেছেন ইবনুল তাইমিয়াহ ও তার শিষ্য ইবনুল কাইয়িম (রহ) আর তা হচ্ছে এই উক্তিটি- 'নিশ্চয় ইবরাহীম নবীর বংশধরের মধ্যে বহু নবী রয়েছে যাদের মত কোন ব্যক্তি মুহাম্মাদ এর বংশধরের মধ্যে নেই। অতএব, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর বংশ ধরের জন্য যদি ঐ ধরনের ছালাত কামনা করা হয় যে ছালাতের অধিকারী নবী ইবরাহীম ও তার বংশধর ছিল যাদের মধ্যে অনেক নবীও রয়েছেন তাহলে মুহাম্মাদের বংশধরের জন্য এমন মর্যাদা উপার্জিত হচ্ছে যা তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ তারা (যত কৃতিত্বই অর্জন করুক) নবীগণের স্তরে পৌঁছতে পারে না। (১) সুতরাং নবীগণের জন্য (যাদের ভিতর ইবরাহীম নবীও) প্রযোজ্য অতিরিক্ত মর্যাদার অধিকারী মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এথেকেই তার এমন মর্যাদা অর্জিত হচ্ছে যা অন্য কারো জন্য অর্জিত হয় না।
ইবনুল ক্বায়ইম (রহঃ) বলেছেন: এ উক্তিটি পূর্বোক্ত উক্তিগুলোর ভিতর সর্বোত্তম। আর এর চেয়ে উত্তম হলো একথা বলা যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবরাহীম নাবীর বংশধরের অন্তর্ভুক্ত বরং তিনি ইবরাহীম নাবীর বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। যেমনটি বর্ণনা করেছেন আলী বিন জ্বালহাহ- ইবনু আব্বাস থেকে আল্লাহর এ বাণীর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে-
ইন্নাল্লাহাছ ত্বাফা- আ-দামা অ নূহান অ আ-লা ইবরা-হীম অ আ-লা 'ইমরানা 'আলাল 'আ-লামীন
(আ-লি 'ইমরান ৩৩ ) নিশ্চয় আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীম ও ইমরানের বংশধরকে সমগ্র জগতের মধ্যে বাছাই করে নিয়েছেন। (সূরা: আলু ইমরান ৩৩ আয়াত)
ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন: মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবরাহীমের বংশের অন্তর্ভুক্ত। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, ইবরাহীমের সন্তান সন্ততির অভ্যন্তরস্থ নাবীগণ যদি তার বংশধরের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া আরো অগ্রাধিকারযোগ্য। অতএব আমাদের কথা:
কামা- সল্লাইতা 'আলা- আ-লি ইবরা-হীম )
তাঁকে (মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও ইবরাহীম নাবীর বংশস্থ সকল নাবীকে শামিল করছে।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি বিশেষভাবে ঐ পরিমাণ ছালাত প্রদান করি- যে পরিমাণ ছালাত প্রদান করি তাঁর উপর সাধারণভাবে ইবরাহীম নাবীর বংশধরের সাথে সম্পৃক্ত করে।
আর তাঁর বংশধরের জন্য এই পরিমাণ ছালাত অর্জিত হচ্ছে যা তাদের জন্য প্রযোজ্য এবং অবশিষ্ট সম্পূর্ণ নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাপ্য। নিঃসন্দেহে ইবরাহীমের বংশধরের জন্য প্রাপ্য ছালাত যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রয়েছেন এটা ঐ ছালাত অপেক্ষা পরিপূর্ণ যা তাদেরকে সংযুক্ত না করে শুধু তার জন্য কাম্য হয়। তাঁর জন্য উক্ত প্রকার ছালাত থেকে ঐ সুমহান বিষয়টিই কাম্য যা নিঃসন্দেহে ইবরাহীম নাবীর জন্য প্রাপ্য বিষয়ের চেয়ে উত্তম। আর তখনই প্রকাশ পায় উপমা আর মূল অর্থে একে ব্যবহার করার উপকারিতা।
সুতরাং এই শব্দের মাধ্যমে তার জন্য কাম্য ছালাত অন্য শব্দের মাধ্যমে কাম্য ছালাত অপেক্ষা আরো মহান। দু'আর মাধ্যমে যদি ঐ ব্যক্তির অনুরূপ কাম্য হয় যার সাথে উপমা দেয়া হয়েছে »আল মুশাব্বাহু বিহী« অর্থাৎ ইবরাহীম ও তাঁর বংশধর তবে তার জন্য তা থেকেও পরিপূর্ণ অংশ সাব্যস্ত, সুতরাং উপমিত » আল মুশাব্বাহু« অর্থাৎ মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য যা কাম্য হচ্ছে তা ইব্রাহীম ও অন্যান্যদের চেয়ে বেশী। উপরন্তু এর সাথে যোগ হয়েছে যার সাথে উপমা দেয়া হয়েছে তার (ইবরাহীম) থেকে এমন এক অংশ যা অন্য আর কারো জন্য অর্জিত হয় না।
এ থেকেই ইবরাহীম নাবী ও তাঁর বংশধরের চেয়ে ('যাদের মধ্যে অনেক নবী রয়েছেন) তাঁর (আমাদের নাবীর) মর্যাদা ও সম্মান প্রস্ফুটিত হচ্ছে যা তার জন্য উপযোগী। এ ছালাত (দরূদ) এ মর্যাদার প্রতিই নির্দেশকারী এবং তা অনিবার্যকারী ও তার দাবীদার বিষয়াদির একটি বিষয়।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর বংশধরকে মর্যাদা, রহমত ও শান্তি প্রদান করুন এবং তাঁকে তারচেয়েও উত্তম প্রতিদান দান করুন যে কোন নাবীকে তাঁর উম্মাতের পক্ষ থেকে যে প্রতিদান দান করেছেন।
অতএব হে আল্লাহ! রহমত ও মর্যাদা দান কর মুহাম্মাদের প্রতি এবং মুহাম্মাদের বংশধরের প্রতি যেমনভাবে রহমত ও মর্যাদা দান করেছ ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি, নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংসিত মহিমান্বিত। আর বরকত দান কর মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশধরের প্রতি যেমনভাবে বরকত দান করেছ ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি, নিশ্চয় তুমি অতি প্রশংশিত মহিমান্বিত।
দ্বিতীয় উপকারী তথ্য
সম্মানিত পাঠক! আপনি দেখে থাকবেন যে ছালাত এর বিভিন্ন প্রকার শব্দের প্রত্যেকটির ভিতর নাবীর সাথে তাঁর বংশধর, তাঁর পত্নীকূল ও সন্তান সন্ততির উপর ছালাত প্রেরণের কথা উল্লেখ আছে। সুতরাং যে ব্যক্তি শুধু «আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদ » হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছালাত দান কর বলে ক্ষান্ত হবে সে নাবীর নির্দেশ পালনকারী হবেনা ও তার এরূপ বলা সুন্নাহ সম্মত হবে না। বরং অবশ্যই এ সমস্ত শব্দের যে কোন একটি পরিপূর্ণভাবে আনতে হবে যেভাবে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এসেছে। এক্ষেত্রে প্রথম তাশাহ্হুদ ও দ্বিতীয় তাশাহ্হুদের মাঝে কোন তফাত নেই। আর এটাই ইমাম শাফিঈর স্বীয় 'আল-উম্' গ্রন্থের (১/১০২) স্পষ্ট উক্তি। তিনি বলেছেন: প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকের তাশাহ্হুদের শব্দ এক ও অভিন্ন। আর আমার কথায় 'তাশাহ্হুদ' বলতে তাশাহ্হুদ ও নাবীর প্রতি ছালাত পাঠ উভয়ই উদ্দেশ্য, একটি অন্যটি ছাড়া যথেষ্ট নয়।
কান্না লা- ইয়াযিদু ফির রাক'আতাইনি 'আলাত তাশাহ্হুদি
ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'রাক্'আতের বৈঠকে তাশাহ্হুদের অতিরিক্ত কিছু পাঠ করতেন না- এটি মুনকার বা পরিত্যাজ্য হাদীছ- যেমনটি সিলসিলাহ যঈফাহ গ্রন্থে তদন্ত করে দেখিয়েছি- (হাদীছ নং ৫৮১৬)।
এযুগের আশ্চর্যজনক বিষয় এবং ইলমী বিপর্যয় ও বিশৃংখলার নমুনাসমূহের একটি নমুনা হচ্ছে এই যে, জনৈক ব্যক্তি- যিনি হচ্ছেন উস্তায মুহাম্মাদ ইস'আফ আন্নাশাশীবী। তিনি তার 'আল-ইসলামুছ্ছহীহ' নামক গ্রন্থে নাবীর উপর ছালাত পাঠ করতে যেয়ে বংশধরের প্রতি ছালাত পাঠ করা অস্বীকার করার ধৃষ্টতা পোষণ করেছেন। অথচ ছহীহ বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থে একদল ছাহাবাহ থেকে তা সাব্যস্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কা'ব বিন উজরাহ, আবূ হুমাইদ সাইদী, আবূ সাঈদ খুদরী, আবু মাসউদ আনছারী, আবূ হুরাইরাহ, জ্বালহাহ বিন উবাইদুল্লাহ প্রমুখগণ। তাদের বর্ণিত হাদীছগুলোতে এসেছে যে, তাঁরা নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কাইফাস সলা-তু 'আলাইকা আপনার প্রতি কিভাবে ছালাত পাঠ করব? তখন তিনি তাদেরকে এসব শব্দ শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর অস্বীকার করার পিছনে যুক্তি এই যে, আল্লাহ সল্লূ- 'আলাইহি অসাল্লিমূ- তাসলীমা- - তোমরা তাঁর প্রতি ছালাত পাঠ কর ও যথারীতি সালাম প্রদান কর- এতে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আর কাউকেই উল্লেখ করেননি।
অতঃপর তিনি ছাহাবাগণ কর্তৃক নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উক্ত প্রশ্ন করাকে দারুণভাবে অস্বীকার করেছেন- এই যুক্তিতে যে, ছালাত অর্থ তাদের জানা ছিল আর তা হচ্ছে দু'আ। তাহলে কিভাবে তারা তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারেন? এটা তাঁর (নাশাশীবীর) অত্যন্ত স্পষ্ট একটা ভুল ধারণা। কারণ তাদের প্রশ্ন ছালাতের অর্থ জানার ব্যাপারে ছিলনা- যাতে উক্ত যুক্তি আসতে পারে বরং তাদের প্রশ্ন ছিল তাঁর প্রতি ছালাত পাঠের পদ্ধতি সম্পর্কে যেমনটি উল্লিখিত সমস্ত বর্ণনাতে এসেছে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, তারা তাঁকে শরঈ পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। যা সেই প্রজ্ঞাপূর্ণ ও অতি জ্ঞানী শারি' (শরীয়ত প্রবর্তক মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে জানা ছাড়া সম্ভব নয়।
আর তাদের এ প্রশ্নটি হচ্ছে আল্লাহর বাণী অআক্বীমূছ সলা-তা আর তোমরা ছালাত কায়িম কর এর মাধ্যমে ফরয কৃত ছালাতের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সমতুল্য। কারণ তাদের ছালাত-এর আভিধানিক মূল অর্থ জানাটা এর শরঈ পদ্ধতি জানার ব্যাপারে তাদেরকে জিজ্ঞাসা মুক্ত করতে পারে না। আর এটা অত্যন্ত স্পষ্ট কথা যাতে অস্পষ্টতার কিছু নেই।
আর তার উল্লেখিত যুক্তিটি মোটেও ধর্তব্যের বিষয় নয়, কারণ সকল মুসলিমের জানা আছে যে, নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বাণীর বর্ণনাকারী ও ব্যাখ্যাদাতা। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন- অআনযালনা- ইলাইকায যিকরা লিতুবাইয়্যিনা লিন্না-সি মা- নুযযিলা ইলাইহিম আর আপনার উপর যিক্র (কুরআন) নাযিল করেছি যাতে লোকদেরকে বর্ণনা করে দেন যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে- (সূরা আন-নাহালঃ ৪৪ আয়াত)।
তাইতো নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রতি ছালাত পাঠের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন যার ভিতর তার বংশধরের উল্লেখ এসেছে। অতএব তাঁর থেকে এটা গ্রহণ করা অনিবার্য। কারণ আল্লাহ বলেছেন: অমা- আ-তা-কুমুর রাসূ-লু ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি অসাল্লামা ফাখুযূহু অমা- নাহা-কুম 'আনহু ফানতাহূ- তোমাদেরকে যা প্রদান করেন তা তোমরা গ্রহণ কর আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত হও- (সূরা: আল্-হাশ্র- ৭ আয়াত)।
আর প্রসিদ্ধ ছহীহ হাদীছেও নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী রয়েছে:
আ-লা- ইন্নী উতীতুল কুরআ-না অ মিছলুহু মা'আহু অ ম althoughরাজুন ফী তাখরীজিল মিশকা-তি *
জেনে রেখ আমাকে আল-কুরআন প্রদান করা হয়েছে এবং তার সাথে তারই অনুরূপ একটি জিনিস প্রদান করা হয়েছে। মিশকাতের তাখরীজ গ্রন্থে উদ্ধৃত করা হয়েছে- (হাদীছ নং ১৬৩ ও ৪২৪৭)।
আমার জানতে ইচ্ছে হয় যে, নাশাশীবী ও যারা তার চাকচিক্যপূর্ণ কথায় প্রবঞ্চিত হতে পারেন তারা কী বলবেন ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যে অচিরেই ছালাতের ভিতর তাশাহহুদ পাঠ অস্বীকার করবে অথবা ঋতু অবস্থায় ঋতুবতীর ছলাত ও ছওম ত্যাগ করা অস্বীকার করবে এই যুক্তিতে যে, আল্লাহ তা'আলা কুরআনে তাশাহ্হুদ উল্লেখ করেননি বরং শুধু কিয়াম, রুকু ও সাজদাহ উল্লেখ করেছেন। আর যেহেতু আল্লাহ তা'আলা ঋতুবতীর জন্য কুরআনে ছালাত ও ছওম মাফ করেননি, অতএব তার উপর তা পালন করা ওয়াজিব। তারা কি এই অস্বীকারকারীর অস্বীকৃতির উপর একমত হবেন- নাকি তার প্রতিবাদ করবেন। যদি প্রথম অবস্থা (একমত) হয় যা- আমাদের কাম্য নয় তাহলে তো তারা অনেক দূরবর্তী ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হলো এবং মুসলিম জামা'আত থেকে বহিষ্কৃত হলো। আর যদি অন্য অবস্থা (প্রতিবাদ) হয় তাহলে তারা তাওফীক প্রাপ্ত হলো ও সঠিক করলো। তারা উপরোক্ত অস্বীকারকারীর যার মাধ্যমে প্রতিবাদ করবেন নাশাশীবীর বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদও তাই। হে পাঠক আপনার নিকট এর কারণও তুলে ধরলাম।
অতএব হে মুসলিম আপনি সাবধান হোন! সুন্নাত থেকে স্বাধীন হয়ে কুরআন বুঝার চেষ্টা করা থেকে। কারণ আপনি কস্মিনকালেও তা পারবেন না যদিও আপনি ভাষা-জ্ঞানে নিজের যুগের সীবৃত্তয়াহ্ও (একজন মহান আরবী ভাষাবিদ) হোন না কেন আর তার দৃষ্টান্ত এইতো আপনার সামনেই।
এই নাশাশীবী বর্তমান যুগের বড় ভাষাবিদদের অন্যতম একজন অথচ আপনি দেখছেন- তিনি তার ভাষা জ্ঞান নিয়ে ধোঁকায় পড়েছেন, পথভ্রষ্ট হয়ে গেছেন। তিনি কুরআন বুঝার জন্য সুন্নাহর সাহায্য নেননি। বরং তিনি তা অস্বীকার করেছেন যেমনটি আপনি জানলেন। আমরা যা বলছি এর অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে এই পরিসরে তা উল্লেখ করে সংকুলান করা যাবে না। ইতিপূর্বে যা উল্লেখ করা হয়েছে এতেই যথেষ্ট। আর আল্লাহই তাওফিকদাতা।
তৃতীয় তথ্য পাঠক আরো লক্ষ্য করে থাকবেন যে, ছালাতের শব্দাবলীর কোনটিতে আসসিয়া-দাহ বা সাইয়িদ (যার অর্থ সরদার) উল্লেখ করা হয়নি। তাই পরবর্তী বিদ্বানগণ ছালাতে ইবরাহিমিয়াহর ভিতর উক্ত শব্দ বৃদ্ধির শরীয়ত সম্মত হওয়ার ব্যাপারে মতানৈক্য করেছেন। এখানে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই। আর তাদের নামও উল্লেখ করার অবকাশ নেই যারা নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক উম্মতকে শিক্ষা দেয়া পদ্ধতির অনুসরণ করতে যেয়ে উক্ত বৃদ্ধিকে শরীয়ত গর্হিত বলার পক্ষে গেছেন।
নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ করতঃ এ কথার মাধ্যমে জবাব দিয়েছিলেন: "তোমরা বল হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ এর প্রতি ছালাত দান কর.....।"
তবে আমি এ সম্পর্কে সম্মানিত পাঠকদের সমীপে হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ)-এর মত সংকলন করছি: এজন্য যে, তিনি শাফিঈ মাযহাবের ঐ সকল বড় আলিমদের একজন যারা হাদীছ ও ফিক্বহ্ উভয় শাস্ত্রে পারদর্শী। কেননা পরবর্তী শাফিঈ আলিমদের নিকট নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই পূত শিক্ষার বিপরীত বিষয় প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।
হাফিয মুহাম্মদ বিন মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ আল-গারাবিলী (৭৯০-৮৩৫) যিনি ইবনু হাজার (রহঃ)-এর সংস্পর্শে থাকতেন তিনি বলেছেন এবং আমি তার হস্তলিখনী থেকে সংকলন করেছি: ইবনু হাজারকে (রহঃ আল্লাহ তাকে তার হায়াত দ্বারা উপকৃত করুন) ছালাতের ভিতরে ও ছালাতের বাইরে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ছালাত পাঠের পদ্ধতির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- এতে কি নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সরদার গুণে গুনান্বিত করা শর্ত; চাই তাকে ওয়াজিব বলা হোক আর চাই মুস্তাহাব বলা হোক, যথা এরূপ বলা যে, "হে আল্লাহ! ছালাত প্রদান কর আমাদের সরদার (নেতা) মুহাম্মাদের প্রতি অথবা সৃষ্টির সরদারের প্রতি অথবা আদম সন্তানের নেতার প্রতি?" নাকি তাঁর বাণী "হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের প্রতি ছালাত প্রেরণ করুন" এর উপর ক্ষান্ত থাকতে হবে। কোল্টি অধিক উত্তম- সরদার বা সাইয়িদ আসসিয়া-দাহ শব্দ উল্লেখ করে যেহেতু তা হচ্ছে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্থায়ী গুণ অথবা তা উল্লেখ না করে এই জন্য যে, হাদীছে তার উল্লেখ নেই?
ইবনু হাজার (রহঃ) উত্তরে বলেছিলেন: হ্যাঁ হাদীছে বর্ণিত শব্দের অনুসরণ করাই প্রাধান্যযোগ্য। এমনটিও বলা যাবে না যে, নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা নমনীয়তার খাতিরে ছেড়ে দিয়েছেন। যেমনভাবে তিনি নিজের নাম উল্লেখ করার সময় 'ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন না' অথচ উম্মাতকে তা বলতে বলা হয়েছে- যখনই তাঁর নাম উল্লেখ করা হবে। আমরা এজন্য এটা বলছি যে, সাইয়িদ গুণের উল্লেখ যদি প্রাধান্যযোগ্য হতো তাহলে ছাহাবায়ে কিরাম অতঃপর তাবিঈদের থেকে তার অস্তিত্ব পাওয়া যেতো, কিন্তু ছাহাবাহ ও তাবিঈগণের একজনেরও বর্ণিত কোন হাদীছ থেকে এটা জানতে পারিনি। অথচ তাদের থেকে এবিষয়ে অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। এই তো ইমাম শাফিঈ (রহঃ) আল্লাহ তাঁর মর্যাদা উঁচু করুন। তিনি নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অধিক সম্মান দান কারীদের একজন ছিলেন। তিনি তাঁর প্রণীত কিতাবের ভূমিকায় লিখেছেন- যেকিতাব তার মাযহাবের অনুসারীদের প্রামাণ্য গ্রন্থরূপে পরিগৃহীত। 'আল্লাহুম্মা ছল্লি আলা মুহাম্মাদ' দিয়ে শুরু করে তার ইজতিহাদ নিঃসৃত শব্দাবলীর শেষ পর্যন্ত। আর তা হচ্ছে- «কুল্লামা- যাক্বারাহুয যা-কিরূনা , অ কুল্লামা- গাফালা 'আন যিকরিহিল গা-ফিলূনা» উদাসীনরা তাঁকে উল্লেখ করা থেকে উদাসীন থাকে। যেন তিনি এসব শব্দাবলী এই ছহীহ হাদীছ থেকে নিঃসারণ করেছেন যার ভিতর রয়েছে- «সুবহানাল্লা-হি 'আদাদা খালক্বিহী» আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছি তার সৃষ্টির সংখ্যা পরিমাণ। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, কোন উম্মুল মুমিনীনকে বেশী পরিমাণ ও দীর্ঘক্ষণ তাসবীহ্ পাঠ করতে দেখে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন "তোমার পরে আমি কিছু শব্দ বলেছি সেগুলোকে যদি তুমি (এ যাবৎ) যা বলেছ তার সাথে ওজন করা হয় তবে সেগুলোই ভারী হবে" অতঃপর উক্ত শব্দের দু'আটি বললেন। নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাপক অর্থবোধক দু'আ বলা পছন্দ করতেন।
ক্বাযী 'ইয়ায তার 'আশিফা' নামক কিতাবে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ছালাত পাঠ প্রসঙ্গে অধ্যায় রচনা করেছেন এবং এর ভিতর ছাহাবা ও তাবিঈগণের এক গোষ্ঠী থেকে মারফুভাবে (সরাসরি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে) হাদীছ সংকলন করেছেন। উক্ত হাদীছের কোনটিতেই ছাহাবা ও অন্যান্য কারো থেকেই সাইয়িদিনা বা আমাদের সরদার শব্দ পাওয়া যায় না।
উপরোক্ত শব্দাবলীর অনুরূপ কিছু আলী (রাযিঃ)-এর হাদীছে আছে। তিনি লোকদেরকে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ প্রতি ছালাতের পদ্ধতি শিক্ষা দিতেন এই বলে:
আল্লাহুম্মা দা-হিয়াল মাদহূওয়াত, অ বা-রিয়াল মাছমূহকা-ত আজ'আল সাওয়া-বিক্বা সলা-ওয়া-তিকা, অনাওয়া-মী বারা-কা-তিকা, অযাইয়্যিদা তাহিয়্যাতিকা, 'আলা- মুহাম্মাদিন 'আবদিকা অ রাসূ-লিকা আল-ফা-ইহি লিমা- আগলিক্বা)
হে আল্লাহ! সমস্ত বস্তুর প্রশস্তদানকারী, উঁচু বস্তুসমূহের সৃষ্টিকর্তা তোমার সম্মান ও রহমতের অগ্রাংশ, ক্রমবর্ধমান বরকত, বাড়তি সংবর্ধনা ও অভ্যর্থনা মুহাম্মাদের প্রতি দান কর যিনি তোমার বান্দা ও রাসূল- যা কিছু রুদ্ধ ছিল তিনি তার উন্মোচনকারী।
আলী (রাযিঃ) থেকে আরো এসেছে তিনি বলতেন- সলা-ওয়া-তুল্লা-হিল বাররিল রাহীমি অল মালাইকাতিল মুক্বরাবীন, অন্নাবিয়্যীন অসসিদ্দিক্বীন অশশুহাদা-ই অসসা-লিহীন অমা- সাব্বাহা লাকা মিন শাইয়িন ইয়া- রাব্বাল আ-লামীন 'আলা- মুহাম্মাদিবনি 'আবদিল্লাহি খা-তামিন নাবিয়্যীন অ ইমা-মিল মুত্তাক্বীন ..... আল হাদীছ )
সদাচার পরায়ন অতি দয়ালু আল্লাহর রহমত ও সম্মান, নৈকট্যশীল ফেরোমণ্ডলী, নাবীকুল, অধিক সত্যবাদী, শহীদগণ, সৎকর্মশীল বান্দাগণ ও যা কিছু আপনার পবিত্রতা জ্ঞাপন করে তাদের সকলের পক্ষ থেকে উচ্ছ্বসিত ছালাত বর্ষণ কর সর্বশেষ নাবী ও আল্লাহভীরু (মুত্তাকী) বান্দাগণের নেতা মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহর প্রতি- হে সমগ্র জগতের পালনকর্তা।..... হাদীছের শেষ পর্যন্ত।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন: আল্লাহুম্মাজ'আল সলা-ওয়া-তিকা অ বারা-কা-তিকা অ রাহমাতিকা 'আলা- মুহাম্মাদিন 'আবদিকা অ রাসূ-লিকা ইমা-মিল খাইরি অ রাসূ-লির রাহমাতি ..... আল হাদীছ )
হে আল্লাহ! তোমার সম্মান, বরকত ও রহমত দান কর তোমার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদের প্রতি যিনি রহমতের রাসূল এবং কল্যাণের নেতা, হাদীছের শেষ পর্যন্ত.....।
হাসান বাছরী থেকে বর্ণিত; তিনি বলতেন: যে ব্যক্তি মুছত্বফা ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাউযে কাউছারে তুষ্টিপ্রদ সুধার গ্লাস পান করতে চায় সে যেন বলেঃ আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আ-লিহী অ আসহা-বিহী অ আযওয়া-জিহী অ আওলা-দিহী অ যুররিয়্যাতিহী অ আহলি বাইতিহী অ আসহারিহী অ আনসা-রিহী অ আশইয়া'ইহী অ মুহিব্বিহী )
হে আল্লাহ! তুমি ছালাত প্রদান কর মুহাম্মাদের প্রতি এবং তাঁর বংশধর, সহচরবৃন্দ, পত্নীকূল, পুত্র-পুত্রী, সন্তান-সন্ততি, বাটিস্থ পরিবার পরিজন, আত্মীয়স্বজন, সাহায্যকারী, স্বদলীয় ও মুহাব্বাতকারীদের প্রতি।
এগুলো হলো ছাহাবা ও তৎপরবর্তীগণ থেকে বর্ণিত, নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ছালাত পাঠের বিভিন্ন রূপ সংক্রান্ত শব্দাবলী যা আমি "আশিফা” নামক গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করছি যার- ভিতর উক্ত শব্দ সাইয়েদ নেই।
হ্যাঁ তবে ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত একটি হাদীছে এসেছে যে, তিনি নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ছালাত পাঠ করতেন এ ভাষায়: আল্লাহুম্মাজ'আল ফাযা-ইলা সলা-ওয়া-তিকা অ রাহমাতিকা অ বারা-কা-তিকা 'আলা- সাইয়্যিদিল মুরসালীন .....
হে আল্লাহ! তোমার বাড়তি সম্মান-প্রতিপত্তি, রহমত ও বরকতসমূহ দান কর নাবীকুলের সরদারের প্রতি,..... হাদীছের শেষ পর্যন্ত। হাদীছটি ইবনু মাজাহ বর্ণনা করেছেন কিন্তু এর সনদ দুর্বল।
পূর্বোল্লিখিত আলী (রাযিঃ)-এর হাদীছটি ত্ববরানী বর্ণনা করেছেন যার সনদে কোন অসুবিধা নেই। তাতে কিছু অপরিচিত শব্দ এসেছে যার ব্যাখ্যা সহ বর্ণনা করেছি আবুল হাসান ইবনুল ফারিস প্রণীত "ফাযলুন্ননাবী" নামক গ্রন্থে।
শাফিঈগণ উল্লেখ করেছেন যে, কোন ব্যক্তি যদি এই শপথ করে যে, আমি নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সর্বোত্তম ছালাত পাঠ করবো তাহলে তার মুক্ত হওয়ার পথ হলো নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি এই ছালাত পাঠ করা- আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন, কামa- সল্লাইতা 'আলা- ইবরা-হীম
হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ছালাত (সম্মান প্রতিপত্তি) দান কর যখনই স্মরণকারীরা তাঁকে স্মরণ করে এবং যখনই উদাসীনরা তাঁর স্মরণ থেকে উদাসীন থাকে। ইমাম নব্বী বলেন, দৃঢ়তার সাথে যে শব্দে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ছালাত পাঠকে সঠিক বলা যায় তা হচ্ছে-
আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিন অ 'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- সল্লাইতা 'আলা- ইবরা-হীম ......
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের প্রতি ও তাঁর বংশধরের প্রতি ছালাত প্রদান কর যেমনভাবে ইবরাহীমের প্রতি ছালাত প্রদান করেছেন,..... হাদীছের শেষ পর্যন্ত।
পরবর্তীদের একটি দল তাঁর বিরূপ মন্তব্য করেছে এই বলে যে, সংকলনগত দিক দিয়ে উক্ত পদ্ধতিদ্বয়ের ভিতর উত্তম হওয়ার প্রতি নির্দেশকারী কিছু নেই। তবে অর্থগত দিক দিয়ে প্রথম পদ্ধতির উত্তম হওয়াটা পরিস্ফুটিত।
মাসআলাটি ফিকহের কিতাবাদির ভিতর একটি প্রসিদ্ধ মাসআলাহ। মুখ্য উদ্দেশ্য এই যে, যে সকল ফিক্ববিদগণ এই মাসআলাটি উল্লেখ করেছেন তাদের একজনেরও বক্তব্যে (সাইয়্যিদুনা) সাইয়িদিনা) শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায় না। যদি এ বর্ধিত শব্দ পছন্দনীয় হতো তাহলে সেটা তাদের সকলের নিকটে গোপন থাকতো না এবং তারা বেখেয়ালও হতেন না। যাবতীয় কল্যাণ রয়েছে ইত্তিবা' তথা দলীল ভিত্তিক অনুসরণের ভিতর (এটাই আমাদের কথা)। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
আমি বলেছি হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ) যে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সরদার গুণে গুণান্বিত করা শরীয়ত সম্মত না হওয়ার মতালম্বী হয়েছেন তা মহান নির্দেশের অনুসরণার্থে, এ মতের উপরে রয়েছে (প্রকৃত) হানাফীগণ। আর এমতই অবলম্বন করা উচিত। কারণ এটাই হচ্ছে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মুহাব্বাত করার সত্যিকার প্রমাণ।
(ক্বুল ইন কুনতুম তুহিব্বূনাল্লাহা ফাত্তাবি'ঊনী ইউহবিবকুমুল্লাহু )
বলুন হে রাসূল! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবেসে থাক তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন-' (আলু ইমরান ৩১)।
এজন্যেই ইমাম নব্বী "আররাওযাহ্” গ্রন্থে (১/২৬৫) বলেছেন: নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সবচেয়ে পরিপূর্ণ ছালাত পাঠ এই আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদ« হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের প্রতি ছালাত প্রদান করুন। পূর্বোক্ত তৃতীয় প্রকার ছালাত অনুযায়ী, তাতে আসসিয়া-দাহ সাইয়িদ বা সরদার শব্দের উল্লেখ নেই।
চতুর্থ তথ্য
হে পাঠক অবগত হোন যে, নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ছলাত পাঠের শব্দাবলীর প্রথম প্রকার ও চতুর্থ প্রকার শব্দ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ছাহাবাগণকে শিক্ষা দিয়েছিলেন যখন তারা তাকে তার প্রতি ছালাত পাঠের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। এর দ্বারাই এ মর্মে দলীল গ্রহণ করা হয় যে, এগুলোই হচ্ছে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ছালাত পাঠের উত্তম পদ্ধতি। কারণ তিনি তাদের জন্য ও নিজের জন্য ঐ পদ্ধতিটিই তো পছন্দ করবেন যেটি অধিক উন্নত ও অধিক উত্তম। এজন্য ইমাম নব্বী "আররাওযাহ" গ্রন্থে একথাকে সঠিক বলেছেন যে, কোন ব্যক্তি যদি কসম করে যে, সে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর সর্বোত্তম ছালাত পাঠ করবে- তবে ঐ ব্যক্তি উক্ত কসম থেকে মুক্ত হতে পারবে না সেই পদ্ধতিটি ছাড়া। সুকী এর কারণ দর্শিয়েছেন এই ভাবে যে, যে ব্যক্তি উক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করলো ঐ ব্যক্তি দ্বিধাহীনভাবে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ছালাত পাঠ করলো। আর যে ব্যক্তিই এতদভিন্ন অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করবে সে সন্দেহযুক্তভাবে কাম্য ছালাত পাঠ করবে। কারণ তারা তো বলেছিলেন কিভাবে আমরা আপনার উপর ছালাত পাঠ করব? তখন তিনি বলেছিলেন ... ক্বুলূ- অর্থাৎ তোমরা বল......। তাদের এরূপ বলাকেই তাঁর প্রতি ছালাত পাঠ বলে গণ্য করেছেন।
হায়তামী "আদ্দুররুল মানন্দ" গ্রন্থে (ক্বাফ ২৫/২) অতঃপর (ক্বাফ ২৫/১) উল্লেখ করেছেন যে, ঐ সকল পদ্ধতির দ্বারা উদ্দেশ্য হাছিল হয়ে যাবে যেগুলো বিভিন্ন ছহীহ হাদীছে এসেছে।
পঞ্চম তথ্য পাঠক জেনে রাখুন যে, একই ছালাতের ভিতর উল্লিখিত প্রকার সমষ্টি থেকে কোন শব্দ সংযোজন করা শরীয়ত সম্মত নয়। অনুরূপ বলা হবে পূর্বোল্লিখিত তাশাহহুদের শব্দাবলী সম্পর্কেও। বরং এরূপ করা দ্বীনের ভিতর বিদ'আত বলে গণ্য হবে। সুন্নাত হলো কখনো এটা বলা আর কখনো অন্যটা বলা। যেমনটি বলেছেন, ইবনু তাইমিয়াহ (রহঃ) তাঁর দুই ঈদের তাকবীর সংক্রান্ত আলোচনায় "মাজমূ" (১/২৫৩/৬৯)।
ষষ্ঠ তথ্য আল্লামাহ ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালী তার "নুযুলু আবরার বিল 'ইলমিল মা'ছুর মিনাল আদইয়াতি অল-আস্কার" গ্রন্থে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ছালাত পাঠ ও বেশী বেশী পাঠের ব্যাপারে বেশ কিছু হাদীছ সংকলন করে (১৬১ পৃঃ) বলেছেন: এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মুসলিম সমাজের ভিতর আহলুল হাদীছগণ (হাদীছ শাস্ত্রবিদগণ) ও পবিত্র সুন্নাহর বর্ণনাকারীগণ নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর বেশী ছালাত পাঠকারী, কারণ এ সম্মানিত বিদ্যা চর্চার নির্ধারিত কার্যাদির আওতাভুক্ত কাজ হলো প্রত্যেক হাদীছের পূর্বে তাঁর প্রতি ছালাত পাঠ করা। সর্বদাই তাদের জিহ্বা তাঁর স্মরণসুধায় রসাভিষিক্ত থাকে। যে কোন ধরনের সুন্নাহ গ্রন্থ ও হাদীছ সংগ্রহের ভাণ্ডার হোক না কেন যেমন "জাওয়ামি”, (১) “মাসানীদ” (২) "মাআজিম” (৩) "আজ্যা" (৪) ইত্যাদিতে হাজার হাজার হাদীছের সমাহার ঘটেছে।
ইমাম সুযুত্বী (রহঃ) সংকলিত সংক্ষিপ্ত কলেবরের একটি কিতাব "আল-জামিউচ্ ছাগীর"- এ দশ হাজার হাদীছ রয়েছে। এর উপরই কিয়াস (অনুমান) করুন নাবীর হাদীছ সম্বলিত অন্যান্য কিতাবকে। অতএব এরাই হচ্ছে নাজাতপ্রাপ্ত হাদীছী দল যারা কিয়ামতের দিন নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (উদ্দেশ্যে উৎসর্গ হোক আমাদের পিতা-মাতা) বেশী নৈকট্যশীল এবং তাঁর শাফাআত লাভে অধিক ধন্য হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষদের কেউই তাদের সমকক্ষ হতে পারবে না, একমাত্র ঐ ব্যক্তিদের ছাড়া যারা এর চেয়েও উত্তম আমল নিয়ে আসতে পারবে, এছাড়া অসম্ভব। অতএব হে কল্যাণকামী, ক্ষতিহীন নাজাত অন্বেষী- আপনার কর্তব্য মুহাদ্দিছ হওয়া বা মুহাদ্দিছগণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করা, অন্যথায় উক্ত মর্যাদা লাভ করতে পারবেন না, এতদভিন্ন কোন পথ আপনার প্রতি কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
আমি (আলবানী) বলি, "আল্লাহর নিকট আকুল প্রার্থনা তিনি যেন আমাকে ঐ সকল মুহাদ্দিছগণের দলভুক্ত করেন যারা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সকল মানুষ অপেক্ষা তাঁর নিকটতম। মনে হয় এ কিতাবখানা সে ব্যাপারে প্রমাণসমূহের অন্যতম প্রমাণ।
সুন্নাহর ইমাম- ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল কবিতা আবৃত্তি করেছেন, আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।
নাবী মুহাম্মাদের দ্বীন- হাদীছ যুবকের উত্তম বাহন, হাদীছ ও তার পন্থী থেকে বিমুখ না হও কদাচন হাদীছ হলো দিন এবং রায় অন্ধকার। হিদায়াতের পথ হারালে যুবক সূর্য উঠে বিকীর্ণ করে আলো দিয়ে তার।
সপ্তম তথ্য {অনেক বিদআতপন্থী নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ছালাত (দরুদ) পাঠের নির্দেশ ও ফযীলতমূলক দলীলগুলো দিয়ে প্রচলিত মিলাদ অনুষ্ঠান বা মিলাদ মাহফিল সাব্যস্ত করে। এটা মহা অন্যায়, এতে কোন সন্দেহ নেই। কুরআনে ও হাদীছে উল্লেখিত দরুদ ও মিলাদের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। প্রচলিত মিলাদ মাহফিল জঘন্যতম বিদআত ও পাপের কাজ এবং কুরআন হাদীছে উল্লিখিত দরুদ ইবাদাত ও পুণ্যের কাজ। আর দুরূদ তখনই ইবাদত ও পুণ্যের কাজ হবে যখন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিখানো ভাষা-ভঙ্গি ও পদ্ধতি অনুযায়ী হবে, অন্যথায় তা জঘন্যতম বিদআতে পরিণত হবে। এই আশঙ্কার জন্যই তো ছাহাবাগণ রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: কাইফাস সলা-তু 'আলাইকা আপনার প্রতি কিভাবে দরুদ পাঠ করবো? তিনি উত্তরে বলেছিলেন : ক্বুলূ- .... আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদ তোমরা বলবে আল্লাহুম্মা ছল্লি আলা মুহাম্মাদ.... (দরুদে ইবরাহীমের শেষ পর্যন্ত)। পদ্ধতি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল অথচ তার উত্তরে তিনি শুধু দরুদে ইবরাহীম বলার নির্দেশ দিয়েছেন। কাউকেও তিনি নিজের নির্বাচিত বা বানানো ভাষায় দরুদ পড়ার অধিকার দেননি। আর মুখে সরল সোজাভাবে বলা ছাড়া কোন বাড়তি পদ্ধতি যেমন দলবদ্ধভাবে, সমস্বরে, সুর ঝংকারের সাথে আনুষ্ঠানিকতার ভিতর দিয়ে বা দরুদের আগে পিছে বিভিন্ন আরবী, ফার্সী, উর্দু, বাংলায় নবীর শানে অতিরঞ্জিত প্রশংসামূলক কবিতা ও কাহিনী আবৃত্তি করার মোটেও অধিকার দেননি যেমনটি তথাকথিত বড় বড় পীর-মুর্শিদ, আলিম-ওলামাগণ করে থাকেন ও শিখিয়ে থাকেন। প্রচলিত মিলাদ বা এভাবে দরুদ পড়ার অস্তিত্ব নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ছাহাবা, তাবে'ঈগণের যুগে
ছিল না। চার ইমামসহ কোন মুহাক্কিক সত্যিকার আলিম কোন যুগে এ মিলাদ পড়েননি এবং পড়েনও না যারা পড়ে তারা প্রচলিত আলিম, প্রকৃত নয়।
ইসলামের আবির্ভাব ভূমি তথা মক্কা-মদীনায় আজও এ বিদআতের অস্তিত্ব নেই। এ বিদআতের প্রথম বীজ বপণ করে মিসরের শিআহ ফাতিমী বংশের ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দ চতুর্শতক হিজরী সনে। আর জাঁকজমকভাবে এই বিদআতকে প্রতিষ্ঠিত করে ইরাকের আরবেল এলাকার গভর্নর মুযাফফারুদ্দীন কৌকাবরী ৬০৪ হিজরী সনে। আল্লাহ সকলকে মীলাদ নামক এ বিদ'আতটি পরিহার করার তাওফীকু দান করুন। 'আমীন।'} (অনুবাদক)
টিকাঃ
(২) আবূ আওয়ানাহ তার ছহী গ্রন্থে (২/৩২৪) বর্ণনা করেছেন এবং নাসাঈও।
(৩) ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন- হে আল্লাহর রাসূল আমরা তো জেনেছি কিভাবে আপনার উপর সালাম প্রদান করবো (তাশাহহুুদের ভিতর) কিন্তু কিভাবে আপনার উপর ছালাত পাঠ করবো? রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: "তোমরা বল আল্লাহুম্মা ছল্লিআলা মুহাম্মাদ...." হাদীছের শেষ পর্যন্ত। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোন তাশাহহুদকে কোন তাশাহহুদ ব্যতীত ছালাত বা দরুদের জন্য বিশিষ্ট করেননি। এর ভিতরেই প্রমাণ নিহিত রয়েছে প্রথম তাশাহহুদেও ছালাত বা দরূদ পাঠ শরীয়ত সম্মত হওয়ার বিষয়টি, আর এটা ইমাম শাফিঈর মতও বটে, যেমনটি ব্যক্ত করেছেন স্বীয় কিতাব 'আল-উম্ম' এর ভিতর। আর ছাহাবীবর্গের নিকট এটা সঠিক যেমনটি ব্যক্ত করেছেন ইমাম নূবী আল-মাজ'মূ গ্রন্থে (৩/৪৬০) আর এটাই ব্যাক্ত করেছেন 'আররাওযাহ' গ্রন্থে (১/২৬৩, আল মাকতাবুল ইসলামী প্রকাশনী)। আর এ মতই গ্রহণ করেছেন আল-অযীর বিন হুবাইরাহ হাম্বলী 'আল-ইফছাহ' গ্রন্থে যেমনটি সংকলন করে সমর্থন দিয়েছেন ইবনু রাজাব যাইলুত্ ত্ববাকাত গ্রন্থে (১/২৮০)। বহু হাদীছই এসেছে তাশাহহুদে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর ছালাত পাঠ করার ব্যাপারে, তার কোনটিতেই এক তাশাহহুদ ব্যতীত অন্য তাশাহহুদের সাথে এর উল্লিখিত বিশিষ্টতা নেই। বরং তা প্রত্যেক তাশাহহুদকে ব্যাপকভাবে শামিল করে। মূল গ্রন্থের টীকায় ঐ সকল হাদীছ উদ্ধৃত করেছি, মূল কিতাবে এর কিছু==অংশও উদ্ধৃত করিনি। কারণ মূল কিতাবে তা উল্লেখ করা আমাদের শর্ত বহির্ভূত। যদিও তার একেকটি অন্যটিকে শক্তিশালী করে। কিন্তু নিষেধকারী বিরুদ্ধ পক্ষের নিকট কোন প্রামাণ্য ছহীশুদ্ধ দলীলই নেই। যেমনটি মূল কিতাবে বর্ণনা করেছি। অনুরূপভাবে একথাও ভিত্তিহীন ও প্রমাণ শূন্য যে, প্রথম তাশাহহুদে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর ছলাত পাঠের ক্ষেত্রে 'আল্লাহুম্মা ছাল্লিআলা মুহাম্মাদ' এর চেয়ে বেশী বলা মাকরুহ। বরং আমরা মনে করি যে, এরূপকারী নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পূর্বোল্লিখিত নির্দেশ ক্বুলূ- আল্লাহুম্মা ছল্লি 'আলা- মুহাম্মাদিন অ'আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন তোমরা বল- "হে আল্লাহ মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরের উপর ছালাত (দয়া) বর্ষণ কর......" শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করেনি। এ গবেষণা কার্যের পরিশিষ্ট রয়েছে যা মূল গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছি।