📄 সুৎরা বা আড়াল ও তার ওয়াজিব হওয়া প্রসঙ্গ
নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুতরার নিকটবর্তী হয়ে (ছলাতে) দাঁড়াতেন। তাঁর ও দেয়ালের মধ্যে তিন হাতের ব্যবধান থাকত। (১) তাঁর সাজদার স্থান ও দেয়ালের মধ্যে একটি বকরী অতিক্রম করার মত ব্যবধান থাকত। (২) তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন: لا تصل إلا إلى سترة ولا تدع أحدا يمر بين يديك فإن أبى فلتقاتله، فإن معه القرين
সুতরা ব্যতীত ছলাত পড়বে না, আর তোমার সম্মুখ দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে দিবে না, যদি সে অগ্রাহ্য করে তবে তার সাথে লড়াই করবে, কেননা তার সাথে ক্বারীন (শয়ত্বান) রয়েছে। (৩)
নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলতেন: إذا صلى أحدكم إلى سترة فليدن منها لا يقطع الشيطان عليه صلاته তোমাদের কেউ যখন সুতরার অভিমুখে ছলাত পড়তে দাঁড়ায় তখন যেন তার নিকটবর্তী হয় (যাতে) শয়ত্বান তার ছলাত বিনষ্ট না করতে পারে। (৪) কোন কোন সময় তিনি তাঁর মসজিদে অবস্থিত স্তম্ভের নিকট ছলাত পড়ার চেষ্টা করতেন। (৫)
তিনি যখন [মরু ভূমিতে ছলাত পড়তেন যেখানে সুতরা (আড়াল) করার কিছুই নেই]। তখন তাঁর সামনে একটি বর্শা গেড়ে তার দিকে ছলাত পড়তেন এবং লোকজন তাঁর পিছনে (ছলাত পড়তে) থাকত। (১) আবার কখনো তিনি আড়াআড়িভাবে স্বীয় বাহনকে রেখে ওর দিকে ছলাত আদায় করতেন। (২)
এটা উট রাখার স্থানে ছলাত পড়ার বিধানের বিপরীত। (৩) কেননা সেখানে ছলাত পড়তে তিনি নিষেধ করেছেন। (৪)
কখনো বা বাহন ধরে তাকে সোজা করে তার পিছনের কাঠ খণ্ডের দিকে ছলাত পড়তেন। (৫) তিনি বলতেন:
«إذا وضع أحدكم بين يديه مثل مؤخرة الرحل فليصل ولا يبالي من مر وراء ذلك»
তোমাদের কেউ যখন বাহনের পিছনের কাঠখণ্ড সদৃশ কোন বস্তু সামনে রাখে তখন এর পিছন দিক দিয়ে কে অতিক্রম করে এর পরোয়া না করে নিঃসঙ্কোচে তার দিকে মুখ করে ছলাত আদায় করবে। (৬)
একবার তিনি একটি বৃক্ষের দিকে মুখ করে ছলাত পড়েছেন। (৭) কখনোবা তিনি খাট (পালঙ্ক) এর দিকে মুখ করে ছলাত পড়তেন অথচ আইশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তার উপর কাৎ হয়ে (স্বীয় চাদরের নীচে) শুয়ে থাকতেন। (৮)
নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর এবং সুতরার মধ্য দিয়ে কোন বস্তুকে অতিক্রম করতে দিতেন না। এক সময় তিনি ছলাত পড়তে ছিলেন হঠাৎ একটি ছাগল তার সম্মুখ দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল। তিনি তার সাথে পাল্লা দিয়ে তার পেটকে দেয়ালে লাগিয়ে দিলেন (ফলে সে তাঁর পিছন দিয়ে অতিক্রম করে)। (১)
কোন এক ফরয ছলাত পড়াকালীন অবস্থায় স্বীয় হাত জড় করে ফেললেন যখন ছলাত শেষ করলেন ছাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ছলাতে কি কিছু ঘটেছে? তিনি বললেন, না, তবে শয়তান আমার সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করতে চেয়েছিল তাই আমি তার গলা চেপে ধরেছিলাম এমনকি আমি তার
জিহ্বার শীতলতা আমার হাতে অনুভব করেছি। আল্লাহর শপথ তার ব্যাপারে যদি আমার ভাই সুলাইমান (আঃ) আমাকে অতিক্রম না করতেন (অর্থাৎ জ্বিন-শয়তান আয়ত্ব করার ক্ষমতা শুধু তাকে দেয়া হোক এ মর্মে দু'আ না করতেন) তবে তাকে মসজিদের কোন খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হত এমনকি মদীনার শিশুরা তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। [ সুতরাং যে ব্যক্তির ক্বিবলা ও তার মধ্যে কেউ অন্তরায় না হোক এ ব্যাপারে ক্ষমতা রাখে সে যেন তা করে]। (১) তিনি বলেছেন:
«إذا صلى أحدكم إلى شيء يستره من الناس فأراد أحد أن يجتاز بين يديه فليدفع في نحره ( وليدراً ما استطاع ) ( وفي رواية : فليمنعه مرتين فإن أبي فليقاتله فإنما هو شیطان )
তোমাদের কেউ যখন এমন বস্তুর দিকে মুখ করে ছলাত পড়ে যা তাকে লোকজন থেকে আড়াল করে এরপরও কেউ যদি তার সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করতে চায় তবে যেন তার বক্ষ ধরে তাকে প্রতিহত করে, [ এবং সাধ্যমত তাকে বাধা প্রদান করে। অপর বর্ণনায় : তাকে যেন দু'বার বাধা দেয়, তাও যদি সে অমান্য করে তবে যেন তার সাথে লড়াই করে কেননা সে হচ্ছে শয়তান। (২)
টিকাঃ
(১) বুখারী ও আহমাদ।
(২) বুখারী ও মুসলিম।
(৩) ইবনু খুযাইমা স্বীয় "ছহীহ” গ্রন্থে (১/৯৩/১) উত্তম সনদে।
(৪) আবু দাউদ, বায্যার (৫৪ পৃঃ যাওয়াইদ) হাকিম; তিনি একে ছহীহ বলেছেন এবং যাহাবী ও নববী তার সমর্থন দিয়েছেন।
(৫) আমি বলি: ইমাম ও একাকী উভয়ের ক্ষেত্রেই সুতরা জরুরী। যদিও তা বিশাল মসজিদে হয়। ইবনু হানী ইমাম আহমাদ থেকে স্বীয় মাসা-ইল গ্রন্থে বলেন (১/৬৬)ঃ "আমাকে আবু আব্দিল্লাহ (অর্থাৎ ইমাম আহমাদ) একদা আমার সম্মুখে সুতরাবিহীন অবস্থায় ছলাত পড়তে দেখেন, আমি তার সাথে জামে মসজিদে ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন: কোন কিছু দিয়ে আড়াল কর, আমি একটি লোক দ্বারা আড়াল করলাম।"
আমি বলব : এ ঘটনায় এ কথার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইমাম সাহেবের মতে সুতরার বেলায় বড় মসজিদ আর ছোট মসজিদের মধ্যে কোন ব্যবধান নেই। আর এটাই হকু কথা। অথচ যতগুলো দেশ ভ্রমণ করেছি তাতে দেখেছি অধিকাংশ ইমাম ও মুছল্লীগণ এ বিষয়ে ত্রুটি করেন। ঐসব দেশের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, যা ভ্রমণে প্রথম বারের মত সুযোগ হয়েছিল ১৪১০ হিজরী রাজাব মাসে। তাই আলিম সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হবে লোকজনকে এ বিষয়ে অবগত করা, তাদেরকে উৎসাহ দান করা এবং তাদেরকে এর বিধান বর্ণনা করা। আর এ বিধান দুই হারামকেও (অর্থাৎ মক্কা ও মদীনার মসজিদকেও) শামিল করে।
(১) বুখারী, মুসলিম ও ইবনু মাজাহ।
(২) বুখারী ও আহমাদ।
(৩) বুখারী ও আহমাদ।
(৪) অর্থাৎ উটের বাসস্থান ও গোয়ালে।
(৫) মুসলিম, ইবনু খুযাইমাহ (২/৯২) ও আহমাদ।
(৬) মুসলিম ও আবু দাউদ।
(৭) নাসাঈ ও আহমাদ, ছহীহ সনদে।
(৮) বুখারী, মুসলিম, আবু ইয়ালা (৩/১১০৭) আল-মাকতাবুল ইসলামী ফটোস্ট্যাট কপি।
(৯) ইবনু খুযাইমা স্বীয় "ছহীহ” (১/৯৫/১) এবং ত্বাবারানী (৩/১৪০/৩) এবং হাকিম তিনি একে ছহীহ বলেছেন আর যাহাবী তার সমর্থন দিয়েছেন।
(১) আহমাদ, দারাকুত্বনী ও ত্বাবরানী ছহীহ সনদে। এই হাদীছের মর্ম বুখারী, মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবে একদল ছাহাবা থেকে বর্ণিত হয়েছে। এটি সেই সব অসংখ্য হাদীছের একটি যেগুলোকে কাদিয়ানীরা অস্বীকার করে। কেননা তারা কুরআন সুন্নাহয় উল্লেখিত জ্বিন (দানব) জগৎকে বিশ্বাস করে না। কুরআন হাদীছের বাণী প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে তাদের কৌশল সবারই জানা। যদি কুরআনের বাণী হয় তবে তার অর্থ পরিবর্তন করে ফেলে যেমন আল্লাহর বাণী قل أوحي إلى أنه استمع نفر من الجن অর্থ : বলো (হে নবী!) আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল (কুরআন) শ্রবণ করেছে। তারা বলে জিন অর্থ মানব। তারা "জিনকে" "ইনস" এর সমার্থবোধক গণ্য করে যেমন "বাশার" শব্দ "ইনস" এর অর্থ দেয়। এ ধরনের অর্থ করার মাধ্যমে তারা অভিধান এবং শরীয়ত থেকে বেরিয়ে আছে। আর যদি তা (দলীল) হাদীছ হয় তাহলে অপব্যাখ্যা দ্বারা পরিবর্তন করা সম্ভব হলে তাই করে। আর তা না হলে একে বাত্বিল বলে দেয়া তাদের নিকট অতি সহজ ব্যাপার- যদিও হাদীছ শাস্ত্রের সব ইমাম এবং তাঁদের সাথে উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তি এর ছহীহ হওয়ার উপর বরং মুতাওয়াতির হওয়ার উপর একমত হয়ে যায়। আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত দিন।
(২) বুখারী ও মুসলিম।
📄 যা ছালাত ভঙ্গ করে
নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন:
يقطع صلاة الرجل إذا لم يكن بين يديه كآخرة الرحل : المرأة ( الحائض ) والحمار والكلب الأسود قال أبو ذر : قلت يا رسول الله ! مابال الأسود من الأحمر ؟ فقال : الكلب الأسود شيطان »
কোন ব্যক্তির সম্মুখে বাহনের পিছনের কাষ্ঠ খণ্ডের ন্যায় কিছু (সুতরা) না থাকলে (সাবালিকা) মহিলা (২), গাধা ও কাল কুকুরের অতিক্রমণ তার ছলাত ভঙ্গ করে ফেলে। আবু যর বলেন, আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, লাল কুকুর ও কাল কুকুরের মধ্যে ব্যবধান হল কেন? তিনি বললেন: “কাল কুকুর হচ্ছে শয়ত্বান।” (৩)
টিকাঃ
(১) বুখারী, মুসলিম ও ইবনু খুযাইমাহ্ (১/৯৪/১)।
(২) ( الحائض ) শব্দ দ্বারা সাবালিকা মহিলা উদ্দেশ্য। আর ছালাত ভঙ্গ বলতে বাত্বিল হওয়া উদ্দেশ্য; পক্ষান্তরে لا يقطع الصلاة شيء অর্থ : কোন কিছুই ছালাত ভঙ্গ করেনা উক্ত হাদীছটি দুর্বল, আমি تمام المنة কিতাবের ৩০৬ পৃষ্ঠায় ও অন্যান্য কিতাবে এর তথ্য তুলে ধরেছি।
(৩ ও ৪) মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনু খুযাইমাহ (১/৯৫/২), আরো দেখুন আমার স্বরচিত أحكام الجنائز وبدعها • تحذير الساجد من اتخاذ القبور المساجد
📄 কুবরের দিকে ছালাত (এর বিধান)
তিনি কবরের দিকে মুখ করে ছলাত পড়তে নিষেধ করতেন। তিনি বলতেন : « لا تصلوا إلى القبور، ولا تجلسوا عليها » তোমরা কবরের দিকে (মুখ করে) ছলাত পড়বে না এবং তার উপর বসবেও না। (৪)
টিকাঃ
(৩ ও ৪) মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনু খুযাইমাহ (১/৯৫/২), আরো দেখুন আমার স্বরচিত أحكام الجنائز وبدعها • تحذير الساجد من اتخاذ القبور المساجد
📄 নিয়ত প্রসঙ্গ
তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন: إنما الأعمال بالنيات وإنما لكل امرىء ما نوى )
অর্থ: আমলসমূহ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করবে। (২)
টিকাঃ
(১) ইমাম নববী ( روضة الطالبين )১/২২৪) এ বলেন: নিয়ত অর্থ ইচ্ছা করা। তাই মুছাল্লী স্বীয় অন্তরে ছলাত ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি যেমন যহর, ফরয ইত্যাদি উপস্থিত করবে অতঃপর মনে মনে প্রথম তাকবীর (তাকবীর তাহরীমাহ)-এর সাথে সংযুক্ত করবে ঐসব বিষয়ের সংকল্পকে।
{প্রকাশ থাকে যে, কোন কোন সমাজে মুছাল্লায় দাঁড়িয়ে মুছাল্লাহর দু'আ হিসাব "ইন্নী অজ্জাহতু...." পাঠ করা হয়। নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাত আদায়ের পদ্ধতিতে তাকবীরের পূর্বে এ দু'আ পাঠের কোন নিয়ম নেই। অতএব, ইহা নাবীর তরীকা বহির্ভূত নবাবিষ্কৃত বিদ'আত। হাঁ তবে ছহীহ হাদীছসমূহে শুরুর (ছানার) বহু দু'আর মধ্যে অজ্জাহতু অজহিয়া... এ দু'আটি রয়েছে যা তাকবীরের পরে পাঠযোগ্য, পূর্বে নয়। দেখুন আবু দাউদ ও তিরমিযী। অনুরূপভাবে তাকবীরের পূর্বে বা যে কোন আমল ও ইবাদতের পূর্বে জনৈক মৌলভী সাহেবদের রচিত গদবাধা আরবী বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমে নিয়ত পড়ার যে প্রচলন দেখা যায় যেমন "নাঅয়তু আন উছল্লিয়া...... আতাঅয্যাআ.... ইত্যাদিও দ্বীনের ভিতর নতুন আবিষ্কৃত বিদআত। প্রচলিত নিয়ত পড়ার নিয়ম কুরআন হাদীছে নেই। নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), ছাহাবাগণ, তাবিঈগণ, চারজন ইমামসহ ইমসলামে নির্ভরযোগ্য কোন আলিম পড়েননি। অনুরূপভাবে ইমামের "আনা ইমামুল লিমান হাযারা অমান ইয়াহ্যুর" বলাও নবাবিষ্কৃত বিদ'আত। মূলতঃ নিয়ত বলতে ও পড়তে হয় না। নিয়ত করতে হয়।} (সম্পাদক)
(২) বুখারী, মুসলিম ইত্যাদি। হাদীছটি الإرواء তে উদ্ধৃত হয়েছে (২২)।