📘 সালাত সম্পাদনের পদ্ধতি > 📄 গ্রন্থ প্রণয়নের কারণ

📄 গ্রন্থ প্রণয়নের কারণ


আমি যেহেতু এ বিষয়ে পরিপূর্ণ কোন কিতাবের সন্ধান পাইনি, তাই আমি ইবাদতের ক্ষেত্রে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পথ অনুসরণে আগ্রহী মুসলিম ভাইদের জন্য এমন একটি কিতাব লিখা নিজের উপর অনিবার্য মনে করলাম, যে কিতাবে তাকবীর থেকে সালাম পর্যন্ত যথাসম্ভব নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাতের পূর্ণ বিবরণী সন্নিবেশিত হবে যাতে করে সত্যিকার অর্থে যারা নবীপ্রেমিক তাদের যে কেউ এ কিতাব খানা পেলে সহজভাবে পূর্বোক্ত হাদীছের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে পারে। (হাদীছটি এরূপ)
( صلوا كما رأيتموني أصلي)
অর্থঃ "তোমরা আমাকে যেমনভাবে ছলাত পড়তে দেখ ঠিক ঐভাবে ছলাত পড়।” এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমি দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করলাম এবং এ সম্পর্কীয় হাদীছ মন্থন করতে শুরু করলাম, হাদীছের বিভিন্ন গ্রন্থরাজি থেকে। সে চেষ্টারই ফসল হলো (হে পাঠক) আপনার সামনে উপস্থিত এই কিতাবটি। আমি নিজের উপর শর্ত করে নিয়েছি যে, এতে কেবল ঐ হাদীছগুলিই সন্নিবেশিত করব যেগুলির সূত্র হাদীছ শাস্ত্রের ব্যাকরণ ও মূলনীতি অনুসারে সুসাব্যস্ত। আর যে হাদীছ সূত্রের কোন পর্যায়ে অপরিচিত অথবা দুর্বল রাবী একা পড়ে যায় সে হাদীছ আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। চাই তা অবস্থা বর্ণনার ক্ষেত্রে হোক অথবা যিক্র সংক্রান্ত হোক অথবা ফযীলত বা অন্য কোন বিষয়ে হোক। যেহেতু আমি বিশ্বাস করি যে, সুসাব্যস্ত (১) ছহীহ্ হাদীছই যঈফ হাদীছ ব্যতীত যথেষ্ট। যঈফ হাদীছ নির্বিবাদে কেবল ধারণা বা অপ্রাধান্যযোগ্য ধারণার উপকারিতা দিতে সক্ষম, আর তা আল্লাহর বাণী অনুযায়ী لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شيئًا হক থেকে মোটেও অমুখাপেক্ষী করতে পারে না। (২)
নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
إياكم والظن فإن الظن أكذب الحديث
অর্থ: তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে চল, কেননা ধারণা হচ্ছে সর্বাধিক মিথ্যা কথা। (১)
তাইতো আল্লাহ পাক আমাদেরকে এর উপর আমল করার জন্য বাধ্য করেননি, বরং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ থেকে আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন:
اتقوا الحديث عني إلا ما علمتم *
অর্থ: তোমরা আমার থেকে কেবল যা জান তা ব্যতীত অন্য কিছু বর্ণনা করা থেকে বিরত থাক। (২) আর যখন তিনি যঈফ হাদীছ বর্ণনা করতে নিষেধ করলেন তখন এর উপর আমল করতে নিষেধ করবেন এটাই অতি স্বাভাবিক।

টিকাঃ
(১) সুসাব্যস্ত হাদীছ বলতে মুহাদ্দিছগণের নিকট ছহীহ এবং হাসান হাদীছের উভয় প্রকার যথা নিজগুণে ছহীহ ও পরের গুণে ছহীহ এবং নিজগুণে হাসান ও পরের গুণে হাসান সবকে বুঝায়।
(২) সূরা আন-নাজম ২৮ আয়াত।
(১) বুখারী ও মুসলিম, এটা আমার কিতাব غاية المرام في تخريج أحاديث الحلال والحرام উদ্ধৃত হয়েছে হাদীছ নং ৪১২।
(২) হাদীছটি ছহীহ আখ্যায়িত করেছেন তিরমিযী, আহমাদ ও ইবনু আবী শাইবাহ। শাইখ মুহাম্মাদ সাঈদ আল-হালাবী স্বীয় গ্রন্থ مسلسلات মুসাল সালাতে এটিকে বুখারীর দিকেও সম্পর্কিত করেছেন। যাতে তিনি প্রমাদে পতিত হয়েছেন।
পরবর্তীতে আমার নিকট পরিস্ফুটিত হয়েছে যে, হাদীছটি যঈফ। (পূর্বে) ইবনু আবী শাইবাহর সানাদকে ছহীহ প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানাবীর অনুসরণ করেছিলাম। অতঃপর এর সম্পর্কে নিজের পক্ষেই জানা সহজ হয়ে যায় যে, এটি স্পষ্ট দুর্বল আর এটি স্বয়ং তিরমিযী ও অন্যান্যদের সনদ। দেখুন আমার কিতাব "সিলসিলাতুল আহাদীছিছু ছহীহাহ্" (হাদীছ নং ১৭৮৩)-এর স্থলাভিসিক্ত ছহীহ হাদীছটি এই-
من حدث عني بحديث يرى أنه كذب فهو أحد الكاذبين ( رواه مسلم وغيره ) যে ব্যক্তি আমার উদ্ধৃতিতে কোন হাদীছ বর্ণনা করে যার সম্পর্কে সে জানে (বা ধারণা করা হয়) যে এটি মিথ্যা সে ব্যক্তি মিথ্যাবাদীদেরই একজন' এটি মুসলিম ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। দেখুন আমার কিতাব সিলসিলাতুল আহাদীছিয যাঈফাহ এর ভূমিকা (প্রথম খণ্ড)। বরং উক্ত হাদীছ থেকে প্রয়োজন মুক্ত করে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ বর্ণাটিও:
إياكم وكثرة الحديث عني من قال علي فلا يقولن الاحقا أو صدقا، فمن قال علي مالم أقل فليتبوأ مقعده من النار ، ابن أبي شيبة ( ٨ / ٧٦٠ ) وأحمد وغيرهما، و هو مخرج في الصحيحة ( ١٧٥٣ )
তোমরা সাবধান হও! আমার থেকে বেশী বেশী হাদীছ বর্ণনা করা থেকে। যে ব্যক্তি আমার উদ্ধৃতিতে কথা বলে সে যেন ন্যায় ও সত্য ছাড়া কিছু না বলে, যে ব্যক্তি আমার উদ্ধৃতিতে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি তবে সে জাহান্নামে তার স্থান নির্ধারণ করে নেয়। এটি সংকলন করেছেন ইবনু আবী শাইবাহ (৮/৭৬০) আহমাদ ও তারা দু'জন ব্যতীত অন্যান্যরা। আর এটি "আছছহীহা"তেও উদ্ধৃত হয়েছে। (১৭৫৩)

📘 সালাত সম্পাদনের পদ্ধতি > 📄 কিতাবটির সংকলন পদ্ধতি

📄 কিতাবটির সংকলন পদ্ধতি


কিতাবটির বিষয় যেহেতু নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাত সংক্রান্ত নির্দেশনার বর্ণনা দান, তাই স্বভাবতই আমি পূর্বোল্লিখিত কারণে কোন নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুকরণ করবো না। বরং এতে কেবল ঐ হাদীছগুলিই উদ্ধৃত করব যা নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে সাব্যস্ত। যেমনটি, অতীত ও বর্তমানের। (১) মুহাদ্দিছীনের (২) অনুসৃত পথ।
নিঃসন্দেহে সুন্দর বলেছেন যে ব্যক্তি (নিম্নোক্ত) কথাটি বলেছেন: لم يصحبوا نفسه أنفاسه صحبوا * أهل الحديث هم أهل النبي وإن অর্থ: আহলুল হাদীছগণ নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আপনজন, তারা যদিও তাঁর সংস্রব পায়নি তবে তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাসের সংস্রব পেয়েছে। (১) অর্থাৎ তারা তাঁর বাণীর সাথী হয়েছে, যে দিকে তাঁর বানী নির্দেশ করে তারা সে দিকে যায়।
আর এজন্যই মাযহাবগত তারতম্য থাকা সত্ত্বেও কিতাবটি হাদীছ ও ফিকুহ-এর কিতাবাদিতে বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিক্ষিপ্ত মাসআলাগুলোর সম্মিলন সাধন করবে ইনশাআল্লাহ। বলতে কি এই কিতাবে যে পরিমাণ হকু কথার সমাহার ঘটেছে অন্য কোন কিতাব বা মাযহাবে ঘটেনি।
আর এই কিতাব অনুযায়ী আমলকারী ইনশাআল্লাহ ঐ সব লোকের অন্তর্ভুক্ত হবেন যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত করেছেন: لَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّهُ يَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ * স্বীয় ইচ্ছায় সেই সত্যের জন্যে যাতে তারা মতভেদ করেছে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। (২)
আমি যখন নিজের জন্য এই নীতি নির্ধারণ করি যে, শুধু বিশুদ্ধ হাদীছ অবলম্বন করব এবং বাস্তবেও এই কিতাবসহ অন্য কিতাবাদিতে এই নীতি অবলম্বন করেছি। যেগুলো অচিরেই মানুষের মাঝে বিস্তার লাভ করবে ইনশাআল্লাহ তা'আলা। তখন থেকেই আমি একথা জানতাম যে, আমার এই কাজ সব দল ও মাযহাব (এর লোক)-কে সন্তুষ্ট করতে পারবে না। বরং অচিরেই তাদের কেউ কেউ বা অনেকেই আমার প্রতি আঘাতমূলক কণ্ঠ ও দোষারোপের কলম ছুড়ে মারবে। তবে এতে আমার অসুবিধা নেই। কেননা আমি এটাও জানি যে, সকল মানুষের সন্তুষ্টি লাভ দুর্লভ ব্যাপার। আর নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: من أرضى الناس بسخط الله وكله الله إلى الناس * অর্থ: যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার মাধ্যমে মানুষকে সন্তুষ্ট করে
আল্লাহ তাকে মানুষের দায়িত্বে অর্পণ করেন। (১) আল্লাহ! কবি কত সুন্দর না বলেছেন:
ولست بناج من مقالة طاعن ولو كنت في غار على جبل وعر * ومن ذا الذي ينجو من الناس سالما ولوغاب عنهم بين خافيتي نسر *
তুমি দোষারোপকারীর কথার গ্লানি থেকে নিষ্কৃতি পাবেই না, যদিও বা দুর্গম পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেও। আর কে আছে মানবের দোষারোপ থেকে মুক্তি পাওয়ার মত যদিও বা শকুনের ডানার তলে আড়াল হয় না কেন।
আমার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, এই (অনুসৃত) পথটাই হচ্ছে সর্বাধিক সঠিক পথ যার ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাহগণকে আদেশ প্রদান করেছেন এবং রাসূলগণের প্রধান আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দেখিয়ে দিয়েছেন। আর এটাই সেই পথ যার অনুসরণ করেছেন ছাহাবা, তাবিঈন ও তৎপরবর্তী সৎ পূর্বসুরীগণ, যাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম চতুষ্টয় যাদের নামে সৃষ্ট মাযহাবসমূহের সাথে আজকের জগতের বেশীরভাগ মুসলিম সম্পর্কযুক্ত। তাঁদের প্রত্যেকেই সুন্নাহ্ (হাদীছ) আঁকড়ে ধরা ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করার অপরিহার্যতার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন এবং তার বিপরীত যে কোন কথাকে পরিত্যাগ করতেও একমত ছিলেন- সে কথার প্রবক্তা যত বড়ই হোন না কেন, যেহেতু নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মর্যাদা হচ্ছে তাদের তুলনায় অনেক বেশী এবং তাঁর পথ সর্বাধিক সঠিক। তাই আমি তাঁদের পথ ধরে চলেছি, আর তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি এবং হাদীছ আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে তাদেরই নির্দেশসমূহ মেনে চলি। যদিও হাদীছটি তাদের কথার বিপরীতও হয়। তাদের এহেন নির্দেশনাবলীই সোজা পথে চলা ও অন্ধ অনুসরণ থেকে বিমুখ হওয়ার ব্যাপারে আমার উপর বিরাট প্রভাব ফেলেছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

টিকাঃ
(১) ইমাম সুবকী "ফাতাওয়া" ১ম খণ্ড ১৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন: অতঃপর মুসলিমদের প্রধান বিষয় হচ্ছে ছলাত, প্রতিটি মুসলিমের পক্ষে এর উপর বিশেষভাবে মনোযোগ দেয়া উচিত এবং নিয়মিত তা পালন করা প্রয়োজন। তার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো (ফরয রুকনগুলো) প্রতিষ্ঠিত করা। তাতে কিছু কাজ এমন রয়েছে যা সর্বসম্মতিক্রমে পালনীয় তা থেকে বিরত থাকার কোন উপায় নেই। আর কিছু কাজ ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, এক্ষেত্রে সঠিক পথ হচ্ছে দু'টি যথাঃ (১) যদি সম্ভব হয় তবে মতভেদ এড়াতে চেষ্টা করবে, অথবা (২) নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ হাদীছে যা এসেছে তা আঁকড়ে ধরবে। যখন এ কাজ করবে তখন তার ছলাত বিশুদ্ধ ও উপযুক্ত হয়ে উঠবে এবং আল্লাহর এ বাণীর আওতাভুক্ত হবে:
ফামান কা-না ইয়ারজুউ লিক্ব-আ রব্বিহী ফাল্ ইয়া'মাল 'আমালান স-লিহান
অর্থঃ "যে ব্যক্তি স্বীয় প্রতিপালকের সাক্ষাতের আশা রাখে সে যেন নেক আমল করে আর স্বীয় প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে অংশিদার না করে।" (সূরা কাহাফ: ১১০)
আমি বলছি: দ্বিতীয় পন্থাটাই ভাল বরং অপরিহার্য, কেননা প্রথম পন্থাটি অনেক বিষয়ে তার বাস্তবতা অসম্ভব হওয়া সত্ত্বেও তাতে নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই নির্দেশটি প্রতিফলিত হয় না। صلوا كما رأيتموني أصلي অর্থ: "তোমরা আমাকে যেভাবে ছলাত পড়তে দেখ ঠিক ঐভাবে ছলাত পড়", কেননা এমতাবস্থায় তার ছলাতে নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাতের বিপরীত হওয়া অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। অতএব বিষয়টি অনুধাবন করুন।
(২) আবুল হাসনাত লক্ষ্ণৌ ইমাম الكلام فيما يتعلق بالقراءة خلف الإمام কিতাবের ১৫৬ পৃষ্ঠায় বলেন: যে ব্যক্তি ইনছাফের দৃষ্টিতে চিন্তা করবে এবং কোন রূপ গোড়ামি ব্যতিরেকে ফিক্হ ও মূলনীতির সাগরে ডুব দিবে সে সুনিশ্চিতভাবে একথা জানতে পারবে যে, আলিমগণের মতভেদকৃত বেশীরভাগ মৌলিক ও অমৌলিক মাসআলায় অন্যদের তুলনায় মুহাদ্দিছগণের মাযহাবই শক্তিশালী। আমি যখন বিতর্কিত বিষয়ের শাখা প্রশাখায় ঘুরে বেড়াই তখন মুহাদ্দিছদের মাযহাবকে অন্যদের মাযহাব অপেক্ষা অধিকতর ইনছাফভিত্তিক পাই। আল্লাহ তা'আলা কতইনা ভাল করেছেন এবং এর উপরে তাদের কতনা শুকরিয়া-(প্রধান বক্তব্যে একথা এভাবেই এসেছে) আর কেনইবা এমন হবে না? তারা যে নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রকৃত উত্তরাধিকারী এবং তাঁর শরীয়তের সত্যিকার প্রতিনিধি। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁদের দলভুক্ত করে হাশর করুন এবং তাদের ভালবাসা ও চরিত্রের উপর রেখে মৃত্যু দান করুন।
(১) হাফিয যিয়াউদ্দীন আল-মাকুদিসী তার ফাদলুল হাদীস ওয়া আহলিহি কিতাবে উল্লেখ করেন যে, এর রচয়িতা হচ্ছেন কবি হাসান বিন মুহাম্মাদ আল নাসাবী।
(২) সূরা আল-বাকারা ২১৩ আয়াত।
(১) তিরমিযী, কুযা'ঈ, ইবনু বিশরান ও অপরাপরগণ (বর্ণনা করেছেন)। উক্ত হাদীছ ও তার সূত্রগুলোর উপর شرح العقيدة الطحاوية কিতাবের হাদীছ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আলোকপাত করেছি। অতঃপর سلسلة الأحاديث الصحيحة ২৩১১ নম্বরেও আলোচনা করেছি এবং বলেছি যে, একে যারা ছাহাবী পর্যন্ত ঠেকিয়েছেন (মাওকুফভাবে বর্ণনা করেছেন) এর ফলে তার কোন ক্ষতি সাধিত হবে না। আর একে ইবনু হিব্বান ছহীহ বলেছেন।

📘 সালাত সম্পাদনের পদ্ধতি > 📄 কায়মূদদ হওয়া

📄 কায়মূদদ হওয়া


আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখনই ছলাতে দাঁড়াতেন তখন ফরয হোক আর নফল হোক উভয় অবস্থায়ই কা'বার দিকে মুখ করতেন। (১) এবং তিনি এ ব্যাপারে নির্দেশও দিয়েছেন।
তাইতো ছলাতে ত্রুটিকারী ব্যক্তিকে তিনি বলেন: "إذا قمت إلى الصلاة فأسبغ الوضوء، ثم استقبل القبلة فكبر"
"যখন তুমি ছলাতে দাঁড়াবে, তখন পরিপূর্ণরূপে উযু করবে, অতঃপর ক্বিবলামুখী হয়ে তাকবীর বলবে।” (২)
তিনি নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফরে স্বীয় বাহনের উপর নফল ছলাত পড়তেন এবং তার উপরে বিত্রও পড়তেন, সে তাকে নিয়ে পূর্ব পশ্চিম যেদিকে মন সে দিকে নিয়ে যেত। (৩)
এ ব্যাপারেই আল্লাহর বাণী নাযিল হয়: فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهُ অর্থ: তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাওনা কেন সেখানেই আল্লাহর চেহারা বিদ্যমান। (৪) আবার (কখনও) স্বীয় উটনীর উপর নফল পড়তে চাইলে তাকে ক্বিবলামুখী করে তাকবীর বলতেন, অতঃপর সে যে দিকেই তাঁকে নিয়ে যেত সেদিকেই ছলাত পড়তেন। (৫)
"তিনি স্বীয় বাহনের উপর মাথার ইঙ্গিত দ্বারা রুকু ও সাজদাহ করতেন, সাজদাহকে রুকুর তুলনায় অধিক নিম্নমুখী করতেন।" (৬)
"ফরয ছলাত পড়ার ইচ্ছা করলে অবতরণ করে ক্বিবলামুখী হতেন।” (৭)
তবে মারাত্মক ভয়ভীতির সময় নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর উম্মতের জন্য আদর্শ রেখে গেছেন যে, তারা স্বীয় পদব্রজে অথবা আরোহী অবস্থায়, ক্বিবলামুখী হয়ে অথবা অন্যমুখী হয়ে ছলাত পড়তে পারবে। (১) তিনি আরো বলেছেনঃ
হুম ইযাখতলাতূ ফাইন্নামা-হুওয়াত্ তাকবীরু অল ইশা-রাতু বিররা'সি
অর্থ: যখন তারা (দু'পক্ষ) সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন কেবল তাকবীর ও মস্তকের ইঙ্গিতই যথেষ্ট। (২) তিনি আরো বলেন:
মা বায়নাল মাশরিকি অল মাগরিব ক্বিবলাহ
অর্থ: পূর্ব ও পশ্চিম এর মাঝেই ক্বিবলা রয়েছে। (৩) জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: "আমরা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে কোন সফর বা জিহাদী কাফেলায় ছিলাম। অতঃপর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ার কারণে আমরা ক্বিবলা নিয়ে মতানৈক্যে পড়ে যাই। প্রত্যেকে পৃথকভাবে ছলাত আদায় করি এবং ছলাতের অবস্থান জানার জন্য আমাদের একেকজন নিজের সম্মুখে দাগ কেটে রাখে। পরক্ষণে যখন প্রভাত হল তখন দাগ দেখলাম তাতে প্রমাণিত হল যে, আমরা ক্বিবলা ভুল করে অন্যদিকে ছলাত পড়েছি। আমরা এ ঘটনা নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জানালাম, (তিনি আমাদেরকে পুনরায় ছলাত পড়তে বলেননি) বরং বললেন: (তোমাদের ছলাত যথেষ্ট হয়েছে)"। (৪) তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (কাবাকে সামনে রেখে) বাইতুল মাকুদিসের দিকে ছলাত পড়তেন যে পর্যন্ত এই আয়াত অবতীর্ণ হয়নি:
ক্বাদ নারা- তাক্বাল্লুবা ওয়াজহিকা ফিছ ছামায়ি ফালানুবাল্লিয়্যান্নাকা ক্বিবলাতান তারযা-হা- ফাওয়াল্লি ওয়াজহাকা শাত্বরাল মাসজিদিল হারা-মি
অর্থ: অবশ্যই (হে নবী) আমি তোমার মুখমণ্ডলকে আকাশ পানে বারবার ফিরাতে দেখছি, আমি অবশ্য অবশ্যই তোমাকে তোমার পছন্দনীয় ক্বিবলার দিকে ফিরিয়ে দিব। অতএব, তোমার মুখমণ্ডলকে মাসজিদুল হারামের অভিমুখে ফিরিয়ে দাও। (৫)
যখন এ আয়াত নাযিল হল তখন তিনি কাবামুখী হয়ে গেলেন। কুবাবাসীরা মসজিদে ফজরের ছলাত আদায়রত ছিল এমতাবস্থায় হঠাৎ এক আগন্তুক এসে বলল: আল্লাহর রাসূলের উপর গত রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে তাঁকে কাবামুখী হওয়ার জন্য আদেশ করা হয়েছে। সুতরাং তোমরাও তার দিকে মুখ ফিরাও। তাদের মুখগুলো তখন সিরিয়ার দিকে ছিল। খবর শ্রবণান্তে তারা সবাই ঘুরে গেল আর ইমামই তাদেরকে নিয়ে (বর্তমান) ক্বিবলার দিকে ঘুরেছিলেন। (১)

টিকাঃ
(১) এ বিষয়টি বহু সূত্রে অব্যাহত ধারায় চূড়ান্তরূপে জানাশুনা, বিধায় উদ্ধৃতি নিষ্প্রয়োজন; এ ছাড়া যে তথ্য আসছে তাতে এর নির্দেশ রয়েছে।
(২) বুখারী, মুসলিম, সাররাজ। প্রথমটি الإرواء কিতাবে এসেছে (২৮৭)।
(৩) ইমাম মুসলিম এটা বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী একে ছহীহ বলেছেন।
(৪) আবু দাউদ, ইবনু হিব্বান الثقات এর (১/১২) পৃষ্ঠায়, যিয়া المختارة তে হাসান সনদে এটা বর্ণনা করেছেন আর ইবনুস্ সাকান একে ছহীহ বলেছেন, ইবনুল মুলাক্বিনও خلاصة البدر المنير এর (১/২২) তে একে ছহীহ বলেছেন। আবার আব্দুল হক্ব আল ইশবীলী তাদের পূর্বেই তাঁর لأحكام কিতাবে ছহীহ বলে রেখেছেন যা আমার যাচাইকৃত মুদ্রণের (১৩৯৪নং হাদীছ) ইবনু হানী ইমাম আহমাদ থেকে তাঁর مسائل গ্রন্থের (১/৬৭) পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন তাতে ইমাম আহমাদের মতও এটাই।
(৫) আহমাদ, তিরমিযী; তিরমিযী একে ছহীহ বলেছেন।
(৬) বুখারী ও আহমাদ।
(১) বুখারী ও মুসলিম। এ হাদীছটি لإرواء। ৫৮৮ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত হয়েছে।
(২) বুখারী ও মুসলিমের সনদে বাইহাক্বী।
(৩) তিরমিযী, হাকিম; তারা উভয়ে একে ছহীহ বলেছেন। আমি মানারুস্ সাবীল কিতাবের )تخریج তাখরীজ) বা হাদীছ যাচাইমূলক উদ্ধৃতি গ্রন্থ إرواء الغليل এর ২৯২ নং হাদীছে উল্লেখ করেছি।
(৪) দারাকুতনী, হাকিম, বায়হাক্বী, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহতে এর সাক্ষ্য মূলক বর্ণনা রয়েছে, অপর আরেক সাক্ষ্য ত্বাবরানীতে রয়েছে الإرواء ২৯৬।
(৫) সূরা আল-বাক্বারা ১৪৪ আয়াত।

📘 সালাত সম্পাদনের পদ্ধতি > 📄 ক্বিয়াম বা দাঁড়ানো

📄 ক্বিয়াম বা দাঁড়ানো


নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফরয ও নফল ছলাতে সোজা হয়ে দাঁড়াতেন আল্লাহ তা'আলার এই বাণীর অনুসরণে: وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ ﴾
অর্থ: তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনয় ভরে দাঁড়াও। (২)
তবে সফরে নফল ছলাত তিনি বাহনের উপর পড়তেন এবং স্বীয় উম্মতের জন্য প্রচণ্ড ভীতির সময় পায়ে হাঁটা অথবা আরোহী অবস্থায় ছলাত পড়ার রীতি রেখে যান। যেমনটি ইতিপূর্বে উল্লেখ হয়েছে। আর তা হচ্ছে আল্লাহর এ বাণী অবলম্বনে- حفِظُوا عَلَى الصَّلَوَٰتِ وَالصَّلوةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ فَنِتِينَ فَإِنْ خِفْتُمْ فَرِجَالًا أَوْ رُكْبَانًا فَإِذَا أَمِنْتُمْ فَاذْكُرُوا اللهَ كَمَا عَلَّمَكُمْ مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ ﴾
অর্থ: তোমরা ছলাতসমূহ, বিশেষ করে মধ্যবর্তী ছলাত (৩) পূর্ণ নিয়মানুবর্তিতার সাথে পালন কর এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনয় সহকারে দাঁড়াও, যদি ভীতিগ্রস্ত হও তবে পদব্রজে অথবা আরোহী অবস্থায় (ছলাত পড়)। অতঃপর যখন নিরাপদ হও তখন তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমরা (আগে) জানতে না। (৪)
নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মৃত্যুর রোগকালীন অবস্থায় বসে ছলাত আদায় করেছেন। (১)
ইতিপূর্বেও তিনি যখন অসুস্থ হয়েছিলেন তখন আরো একবার বসে ছলাত আদায় করেন। লোকেরা তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে ছলাত পড়ছিল তিনি তাদেরকে ইঙ্গিতে বললেন বস, তখন তারা সবাই বসে যায়। ছলাত শেষ করে বললেন: إن كدتم آنفا لتفعلون فعل فارس والروم يقومون على ملوكهم وهم قعود فلا تفعلوا إنما جعل الإمام ليؤتم به فإذا ركع فاركعوا وإذا رفع فارفعوا وإذا صلى جالساً فصلوا جلوسا ( أجمعون ) )
কিছুক্ষণ পূর্বে তোমরা পারস্য ও রোম সম্প্রদায়ের কাজ করতে শুরু করেছিলে। তারা তাদের রাজা-বাদশাদেরকে উপবিষ্ট অবস্থায় রেখে নিজেরা দাঁড়িয়ে থাকে। তোমরা এমনটি করো না। ইমামকে কেবল অনুকরণের জন্যই নিয়োগ করা হয়। তাই তিনি যখন রুকু করেন তখন তোমরা রুকু কর, আর তিনি যখন মাথা উঠান তখন তোমরাও মাথা উঠাও, তিনি যখন বসে ছলাত আদায় করেন তখন তোমরা সবাই বসে ছলাত আদায় কর। (২)

টিকাঃ
(১) বুখারী, মুসলিম, আহমাদ, আস্সাররাজ ও তাবরানী (৩/১০৮/২), ইবনু সা'দ (১/২৪৩), এটা الإرواء (২৯০) রয়েছে।
(২) সূরা আল-বাকারাহ ২৩৮ আয়াত।
(৩) অধিকাংশ উলামার বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী সে ছলাতটি হচ্ছে আছরের ছলাত। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম আবু হানীফা এবং তাঁর সাথীদ্বয়, এ বিষয়ে অনেক হাদীছ রয়েছে। হাফিয ইবনু কাছীর এগুলোকে তাঁর তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
(৪) সূরা আল-বাকারাহ ২৩৮-২৩৯ আয়াত।
(১) তিরমিযী একে বর্ণনা করে ছহীহ বলেছেন, আহমাদও এটি বর্ণনা করেন।
(২) বুখারী, মুসলিম; এটি আমার কিতাব إرواء الغليل এর ৩৯৪নং হাদীছের আওতায় উদ্ধৃত হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00