📄 প্রথম সংস্করণের ভূমিকা
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
সকল প্রশংসা ঐ আল্লাহর জন্য যিনি তাঁর বান্দাদের উপর ছলাত ফরয করেছেন এবং তাদেরকে এটি প্রতিষ্ঠিত করার ও সুন্দরভাবে সম্পাদন করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাকে খুশু' খুযুর সাথে আদায় করার মধ্যে সফলতা নিহিত করেছেন। ঈমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী এবং নির্লজ্জতা ও অন্যায় কাজ থেকে বারণকারী বলে গণ্য করেছেন।
ছলাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নাবী মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর যাকে আল্লাহ তা'আলা এই বলে সম্বোধন করেছেন: وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ ﴾
অর্থ: আমি (আল্লাহ) আপনার প্রতি যিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি যাতে করে আপনি মানুষকে তাদের প্রতি অবতীর্ণ বিষয় ব্যাখ্যা করে দেন। (১)
তিনি এই দায়িত্বকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পালন করে গেছেন। তিনি মানব জাতির জন্য কথা ও কাজের মাধ্যমে যেসব বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম বিষয় হচ্ছে ছলাত। একদা তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে এবং রুকু করে ছলাত পড়েন। অতঃপর (ছাহাবাদেরকে) বলেন: "আমি এমনটি করলাম এজন্য যাতে করে তোমরা আমার অনুকরণ করতে পার এবং আমার ছলাত শিখতে পার।” (২)
তিনি আমাদের উপর তাঁর অনুসরণ করা ওয়াজিব করেছেন। তাঁর বাণী হচ্ছেঃ صلوا كما رأيتموني أصلي *
অর্থ: তোমরা আমাকে যেভাবে ছলাত পড়তে দেখ ঠিক সেভাবে ছলাত পড়। ৩ যে ব্যক্তি তাঁর ছলাতের মত ছলাত পড়বে তাকে তিনি সুসংবাদ দিয়েছেন এ মর্মে যে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন বলে ওয়াদা করেছেন যেমন তিনি বলেন:
খমস সলাওয়াত ইফতারাযাহুন্নাল্লাহু আয্যাওয়া জাল, মান আহ্সানা অয়ুদ্বুউহুন্না, অ সল্লাহুন্না লিওয়াক্তিহুন্না, অ আতাম্মা রুক্বূ'আহুন্না অ সুজুদাহুন্না অ খুশূ'আহুন্না, কা-না লাহু 'আলাল্লাহি আহদুন আইয়্যাগ্ফিরা লাহু, অমাল লাম ইয়াফ'আল, ফালাইসা লাহু 'আলাল্লাহি আহদুন, ইন্ শা-আ গাফারা লাহু, অ ইন শা-আ 'আযযাবাতু
অর্থ: মহান আল্লাহ পাঁচ (ওয়াক্ত) ছলাত ফরয করেছেন, যে ব্যক্তি এগুলোর জন্য উযু সুন্দরভাবে সম্পাদন করবে, আর ঠিক সময় মত তা আদা করবে, এর রুকু, সাজদা ও খুশুখুযূ (বিনয়ভাব) পূর্ণমাত্রায় পালন করবে, আল্লাহ তার ব্যাপারে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি তাকে ক্ষমা করবেন, আর যে এমনটি করবেনা তার ব্যাপারে আল্লাহর কোন অঙ্গীকার নেই। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন আর তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন। (১)
আরো দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পুণ্যবান মুত্তাকী ছাহাবাদের উপর যারা আমাদের জন্য তাঁর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইবাদত, ছলাত, কথা এবং কাজগুলোর বিবরণী সংকলন করেছেন আর কেবল এগুলিকেই তাঁদের মাযহাব ও আদর্শ হিসাবে গণ্য করেছেন। এমনিভাবে যারা তাদের মত কাজ করবে ও তাদের পথ ধরে চলবে-প্রলয়কাল পর্যন্ত; তাদের উপরও বর্ষিত হোক দরুদ ও সালাম।
অতঃপর আমি যখন হাফিয মুনযিরী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর الترغيب والترهيب গ্রন্থের ছলাত অধ্যায়ের পঠন ও কিছু সালাফী ভাইদেরকে এর পাঠ দান শেষ করলাম- যা চার বৎসর যাবৎ চলেছিল- এ থেকে আমাদের প্রত্যেকের কাছে ইসলামে ছলাতের অবস্থান ও মর্যাদা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। আরও জানতে পারি, যে ব্যক্তি একে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে এবং সুন্দরভাবে সম্পন্ন করবে তার জন্য কি প্রতিদান, মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে। আর নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাতের সাথে এর মিল ও গরমিলের উপর পারিতোষিকে কম বেশি হয়। যেমন তিনি হাদীছে বলেন:
ইন্নাল 'আব্দা লাইউছাল্লীছ ছলা-তা মা ইয়াকতুবু লাহু মিনহা- ইল্লা 'আশরাহা-, তিস'আহা-, সুম্নাহা-, সুব'আহা-, সুদস-হা-, খুমসাহা-, রুব'আহা-, ছুলছাহা-, নিছফাহা-
অর্থ: নিশ্চয়ই (কিছু) বান্দাহ এমন ছলাতও পড়ে যার বিনিময়ে তার জন্য কেবল ছলাতের এক দশমাংশ, নবমাংশ, অষ্টমাংশ, সপ্তমাংশ, ষষ্ঠাংশ, পঞ্চমাংশ, চতুর্থাংশ, তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ লিখিত হয়। (২)
এজন্যই আমি ভ্রাতৃমণ্ডলীকে অবহিত করেছিলাম যে, এই ছলাতকে যথাযোগ্য বা তার কাছাকাছি রূপে সম্পন্ন করা আদৌ সম্ভব নয় যতক্ষণ না রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাত সম্পাদন পদ্ধতিকে বিশদভাবে জানতে পারব, যেমন ছলাতের ওয়াজিব ও আদাবসমূহ, তার অবস্থাদি, দু'আ ও যিকরসমূহ, তার পর বাস্তব জীবনে এগুলোকে রূপায়নে মনোযোগী হব। এসবের পর আমরা আশা করতে পারি যে, আমাদের ছলাত আমাদেরকে নির্লজ্জ কাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখবে এবং ছলাতের বিনিময়ে যেসব ছওয়াব ও প্রতিদান রয়েছে আমাদের জন্যে তা লিখা হবে। কিন্তু এসবের বিস্তারিত জ্ঞান লাভ বেশিরভাগ লোকের পক্ষে কষ্টসাধ্য ব্যাপার এমনকি অনেক আলিমদের উপর তা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়- নির্দিষ্ট কোন মাযহাবে আবদ্ধ থাকার কারণে। আর পবিত্র সুন্নাহ (হাদীছ) গ্রন্থের সেবা, সংকলন, অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি মাত্রই একথা জানেন যে, প্রত্যেক মাযহাবেই কিছু এমন সুন্নাত রয়েছে যা অন্য মাযহাবে নেই, আর সমস্ত মাযহাবের মধ্যেই কিছু কথা ও কাজ এমন রয়েছে যেগুলির সম্বন্ধ রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দিকে বিশুদ্ধরূপে সাব্যস্ত নয়।
এইসব অশুদ্ধ হাদীছ বেশির ভাগই পরবর্তীদের (মুতাআখিরীনদের) কিতাবাদিতে পাওয়া যায়। (১)
আমরা প্রায়ই তাদেরকে এ হাদীছকে দৃঢ়তার সাথে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম)-এর দিকে সম্বন্ধ করতে দেখতে পাই। (১) তাই হাদীছ বিশারদগণ হবে। লক্ষ্ণৌভী (রাহিমাহুল্লাহ( الآثار المرفوعة في الأخبار الموضوعة কিতাবে (উক্ত) হাদীছ উল্লেখ করে বলেন (৩১৫ পৃঃ)।
আলী আল-ক্বারী তাঁর الموضوعات الكبرى ও الموضوعات الصغرى কিতাবে বলেন: এটা সুনিশ্চিত বাত্বিল হাদীছ, কেননা এটা ইজমার পরিপন্থী। যেহেতু কোন ইবাদত বহু বৎসর যাবৎ ছুটে যাওয়া ছলাতের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। তাছাড়া আন্নিহায়াহ গ্রন্থের লিখকসহ হিদায়াহ গ্রন্থের অন্যান্য ভাষ্যকারদের উদ্ধৃতি ধর্তব্য নয় কেননা তাঁরা মুহাদ্দিছদের অন্তর্ভুক্ত নয়, আবার (এখানে) কোন হাদীছবেত্তার প্রতি তাঁরা এর সম্বন্ধও করেননি।
শাওকানী(রহঃ) তাঁর الفوائد المجموعة في الأحاديث الموضوعة কিতাবে এ হাদীছটি উপরোক্ত শব্দের কাছাকাছি শব্দে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন: "নিঃসন্দেহে এটি জাল হাদীছ আমি এটিকে ঐসব কিতাবাদিতে পাইনি যার লিখকগণ তাতে মাউযু হাদীছ সন্নিবেশিত করেছেন। তবে এটা বর্তমান যুগের صنعاء শহরের একদল ফক্বীহদের কাছে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে আর তাদের অনেকেই এর উপর আমল করতে শুরু করেছে। আমার জানা নেই কে তাদের জন্য এটা বানিয়েছে। আল্লাহ মিথ্যুকদের অপদস্ত করুন।” (উদ্ধৃতি শেষ) ৫৪ পৃষ্ঠা।
অতঃপর লক্ষ্ণৌভী বলেন: আমি হাদীছটি (জাল হওয়া সত্ত্বেও) দৈনন্দিন নিয়মিত পঠিতব্য অযীফাহ, যিকর ও দু'আর বইসমূহে সংকলন ভিত্তিক ও বিবেক ভিত্তিক প্রমাণাদিসহ দীর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত শব্দে পাওয়া যায় তাই তার জাল হওয়ার ব্যাপারে একটি পুস্তিকা রচনা করেছি যার নাম হচ্ছে : * ردع الإخوان عن محدثات آخر جمعة رمضان
উক্ত পুস্তিকায় অনেক উপকারী কথা সন্নিবেশিত করেছি যার মাধ্যমে মস্তিষ্ক প্রখর হবে এবং যেগুলো কান পেতে শুনার মত। তাই এ নিয়ে অধ্যয়ন করা উচিত যেহেতু এ বিষয়ে তা অতি সুন্দর ও মানগত দিক দিয়ে উন্নত।
আমি (আলবানী) বলছি: ফিকহের কিতাবগুলোতে এ ধরনের বাত্বিল হাদীছ উদ্ধৃত হওয়ায় তাতে বিদ্যমান ঐসব হাদীছের বিশ্বস্ততা হারিয়ে দেয় যেগুলোকে নির্ভরযোগ্য কোন কিতাব এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়নি। আলী আল ক্বারীর বক্তব্যে একথার প্রতিই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাই মুসলিম ব্যক্তির উচিত হবে হাদীছকে তার শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে গ্রহণ করা।
তাইতো অতীতের লোকেরা বলেছেন: "মক্কাবাসীগণ মক্কার রাস্তাঘাট সম্পর্কে সমধিক জ্ঞাত"। আর "ঘরের মালিক তাতে অবস্থিত জিনিস, সম্পর্কে সমধিক অভিজ্ঞ।"
(২) ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ( المجموع شرح المهذب এর প্রথম খণ্ডের ৬০ পৃষ্ঠায় বলেন যা সংক্ষেপে নিম্নরূপ: আহলুল হাদীছ ও অন্যান্য মুহাক্কিক বিদ্বানগণ বলেন: যঈফ হাদীছের ব্যাপারে একথা বলা যাবে না যে, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন অথবা তিনি করেছেন অথবা আদেশ দিয়েছেন বা নিষেধ করেছেন ইত্যাদি দৃঢ়তামূলক শব্দসমূহ। বরং এসব ক্ষেত্রে শুধু দুর্বলতামূলক শব্দ যেমন রসূল থেকে বর্ণনা করা হয়েছে বা উদ্ধৃত হয়েছে ইত্যাদি। তারা বলেন: দৃঢ়তা জ্ঞাপক শব্দাবলী ছহীহ ও হাসান হাদীছের জন্য প্রযোজ্য আর দুর্বলতা জ্ঞাপক শব্দগুলো অন্যান্য==
হাদীছের বেলায় প্রযোজ্য। আর তা এজন্য যে, দৃঢ়তা জ্ঞাপক শব্দ সম্বন্ধকৃতের পক্ষ থেকে বিশুদ্ধ হওয়ার দাবী রাখে, তাই বিশুদ্ধ হাদীছ ছাড়া এ শব্দের প্রয়োগ অনুচিত। অন্যথায় মানুষ রাসূলের উপর মিথ্যারোপকারীর শামিল হবে। অথচ এই আদব রক্ষায় মুহায্যাবের লিখকসহ আমাদের (শাফিয়ীদের) ও অন্যান্য মাযহাবের অধিকাংশ ফুক্বাহাগণ ত্রুটি করেছেন। বরং ঢালাওভাবে প্রত্যেক শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ এতে ত্রুটি করেছেন। কেবল হাদীছ শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞগণ এথেকে বেঁচে গেছেন। এটা জঘন্য ধরনের শিথিলতা। কারণ তারা প্রায়ই ছহীহ হাদীছের ক্ষেত্রে বলে থাকে- রাসূল থেকে বর্ণিত হয়েছে, আর যঈফ হাদীছের বেলায় বলেন অমুক বর্ণনা করেছেন। এটা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ারই নামান্তর।
(আল্লাহ তাঁদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করুন)-এসব কিতাবাদির কিছু প্রসিদ্ধ কিতাবের উপর অনুসন্ধান ও যাচাইমূলক কিছু গ্রন্থ রচনা করেন যা উক্ত কিতাবসমূহে উদ্ধৃত হাদীছগুলির ছহীহ, যঈফ ও জাল হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলে দেয়। যেমন: العناية بمعرفة أحاديث الهداية )হিদায়ার হাদীছ অনুসন্ধানমূলক কিতাব আল-'ইনাইয়াহ) গ্রন্থ এবং الطرق والوسائل في تخريج أحاديث خلاصة الدلائل )খুলাছাতুদ্দালায়িল গ্রন্থের হাদীছ অনুসন্ধানের গ্রন্থ আঙুরুকু অল ওয়াসায়িল) রচিত হয়েছে উভয়টাই শাইখ আব্দুল কাদির বিন মুহাম্মদ আল কুরাশী আল হানাফীর প্রণীত, আরো রয়েছে হাফিয যায়লাঈর )হিদায়ার হাদীছ অনুসন্ধানের কিতাব( نصب الراية لأحاديث الهداية হাফিয ইবনু হাজার আল আসক্বালানী কর্তৃক এরই সংক্ষেপায়িত গ্রন্থ الدراية। তাঁরই রয়েছে "রাফিঈল কাবীর” গ্রন্থের হাদীছ অনুসন্ধানের গ্রন্থ التلخيص الحبير في ا تخريج أحاديث الرافعي الكبير
এছাড়াও আরো অনেক গ্রন্থ রয়েছে যা উল্লেখ করতে গেলে কথা দীর্ঘায়িত হয়ে যাবে। আমি বলতে চাই: যেহেতু ছলাতের বিস্তারিত জ্ঞান লাভ বেশীর ভাগ লোকের উপর কষ্টসাধ্য ব্যাপার, তাই আমি তাদের জন্য এই গ্রন্থ সংকলন করলাম যাতে করে তারা নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাত পদ্ধতি জানতে পারে ও ছলাতে তাঁর নির্দেশনা মেনে চলতে পারে। আল্লাহর কাছে তারই আশা রাখি যার অঙ্গীকার তিনি তাঁর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যবানিতে আমাদের দিয়েছেন এই হাদীছে: من دعا إلى هدى كان له من الأجر مثل أجور من تبعه لا ينقص ذلك من أجورهم شيئا ....... অর্থ: যে ব্যক্তি হিদায়াতের দিকে ডাকে তার জন্যে এর পালনকারীদের সমপরিমাণ পুণ্য রয়েছে, এতে তাদের (পালনকারীদের) পুণ্য থেকে কিছুই কমবে না। (মুসলিম ও অন্যান্য, এটা الأحاديث الصحيحة ৮৬৩ পৃষ্ঠাতেও উদ্ধৃত হয়েছে।
টিকাঃ
(১) লিখক বলেন: এটি ছহীহ হাদীছ, একে একাধিক ইমাম ছহীহ বলেছেন, আমি একে ছহীহ আবু দাউদের (৪৫১ ও ১২৭৬) নম্বরে উদ্ধৃত করেছি।
(২) হাদীছটি ছহীহ, ইমাম ইবনুল মুবারক এটাকে الزهد কিতাবে উদ্ধৃত করেছেন, আবূ দাউদ ও নাসাঈ উত্তম সনদে তা বর্ণনা করেছেন আমি (লিখক) ছহীহ আবু দাউদে (৭৬১) নম্বরে তা উদ্ধৃত করেছি।
📄 গ্রন্থ প্রণয়নের কারণ
আমি যেহেতু এ বিষয়ে পরিপূর্ণ কোন কিতাবের সন্ধান পাইনি, তাই আমি ইবাদতের ক্ষেত্রে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পথ অনুসরণে আগ্রহী মুসলিম ভাইদের জন্য এমন একটি কিতাব লিখা নিজের উপর অনিবার্য মনে করলাম, যে কিতাবে তাকবীর থেকে সালাম পর্যন্ত যথাসম্ভব নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাতের পূর্ণ বিবরণী সন্নিবেশিত হবে যাতে করে সত্যিকার অর্থে যারা নবীপ্রেমিক তাদের যে কেউ এ কিতাব খানা পেলে সহজভাবে পূর্বোক্ত হাদীছের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে পারে। (হাদীছটি এরূপ)
( صلوا كما رأيتموني أصلي)
অর্থঃ "তোমরা আমাকে যেমনভাবে ছলাত পড়তে দেখ ঠিক ঐভাবে ছলাত পড়।” এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমি দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করলাম এবং এ সম্পর্কীয় হাদীছ মন্থন করতে শুরু করলাম, হাদীছের বিভিন্ন গ্রন্থরাজি থেকে। সে চেষ্টারই ফসল হলো (হে পাঠক) আপনার সামনে উপস্থিত এই কিতাবটি। আমি নিজের উপর শর্ত করে নিয়েছি যে, এতে কেবল ঐ হাদীছগুলিই সন্নিবেশিত করব যেগুলির সূত্র হাদীছ শাস্ত্রের ব্যাকরণ ও মূলনীতি অনুসারে সুসাব্যস্ত। আর যে হাদীছ সূত্রের কোন পর্যায়ে অপরিচিত অথবা দুর্বল রাবী একা পড়ে যায় সে হাদীছ আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। চাই তা অবস্থা বর্ণনার ক্ষেত্রে হোক অথবা যিক্র সংক্রান্ত হোক অথবা ফযীলত বা অন্য কোন বিষয়ে হোক। যেহেতু আমি বিশ্বাস করি যে, সুসাব্যস্ত (১) ছহীহ্ হাদীছই যঈফ হাদীছ ব্যতীত যথেষ্ট। যঈফ হাদীছ নির্বিবাদে কেবল ধারণা বা অপ্রাধান্যযোগ্য ধারণার উপকারিতা দিতে সক্ষম, আর তা আল্লাহর বাণী অনুযায়ী لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شيئًا হক থেকে মোটেও অমুখাপেক্ষী করতে পারে না। (২)
নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
إياكم والظن فإن الظن أكذب الحديث
অর্থ: তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে চল, কেননা ধারণা হচ্ছে সর্বাধিক মিথ্যা কথা। (১)
তাইতো আল্লাহ পাক আমাদেরকে এর উপর আমল করার জন্য বাধ্য করেননি, বরং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ থেকে আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন:
اتقوا الحديث عني إلا ما علمتم *
অর্থ: তোমরা আমার থেকে কেবল যা জান তা ব্যতীত অন্য কিছু বর্ণনা করা থেকে বিরত থাক। (২) আর যখন তিনি যঈফ হাদীছ বর্ণনা করতে নিষেধ করলেন তখন এর উপর আমল করতে নিষেধ করবেন এটাই অতি স্বাভাবিক।
টিকাঃ
(১) সুসাব্যস্ত হাদীছ বলতে মুহাদ্দিছগণের নিকট ছহীহ এবং হাসান হাদীছের উভয় প্রকার যথা নিজগুণে ছহীহ ও পরের গুণে ছহীহ এবং নিজগুণে হাসান ও পরের গুণে হাসান সবকে বুঝায়।
(২) সূরা আন-নাজম ২৮ আয়াত।
(১) বুখারী ও মুসলিম, এটা আমার কিতাব غاية المرام في تخريج أحاديث الحلال والحرام উদ্ধৃত হয়েছে হাদীছ নং ৪১২।
(২) হাদীছটি ছহীহ আখ্যায়িত করেছেন তিরমিযী, আহমাদ ও ইবনু আবী শাইবাহ। শাইখ মুহাম্মাদ সাঈদ আল-হালাবী স্বীয় গ্রন্থ مسلسلات মুসাল সালাতে এটিকে বুখারীর দিকেও সম্পর্কিত করেছেন। যাতে তিনি প্রমাদে পতিত হয়েছেন।
পরবর্তীতে আমার নিকট পরিস্ফুটিত হয়েছে যে, হাদীছটি যঈফ। (পূর্বে) ইবনু আবী শাইবাহর সানাদকে ছহীহ প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানাবীর অনুসরণ করেছিলাম। অতঃপর এর সম্পর্কে নিজের পক্ষেই জানা সহজ হয়ে যায় যে, এটি স্পষ্ট দুর্বল আর এটি স্বয়ং তিরমিযী ও অন্যান্যদের সনদ। দেখুন আমার কিতাব "সিলসিলাতুল আহাদীছিছু ছহীহাহ্" (হাদীছ নং ১৭৮৩)-এর স্থলাভিসিক্ত ছহীহ হাদীছটি এই-
من حدث عني بحديث يرى أنه كذب فهو أحد الكاذبين ( رواه مسلم وغيره ) যে ব্যক্তি আমার উদ্ধৃতিতে কোন হাদীছ বর্ণনা করে যার সম্পর্কে সে জানে (বা ধারণা করা হয়) যে এটি মিথ্যা সে ব্যক্তি মিথ্যাবাদীদেরই একজন' এটি মুসলিম ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। দেখুন আমার কিতাব সিলসিলাতুল আহাদীছিয যাঈফাহ এর ভূমিকা (প্রথম খণ্ড)। বরং উক্ত হাদীছ থেকে প্রয়োজন মুক্ত করে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ বর্ণাটিও:
إياكم وكثرة الحديث عني من قال علي فلا يقولن الاحقا أو صدقا، فمن قال علي مالم أقل فليتبوأ مقعده من النار ، ابن أبي شيبة ( ٨ / ٧٦٠ ) وأحمد وغيرهما، و هو مخرج في الصحيحة ( ١٧٥٣ )
তোমরা সাবধান হও! আমার থেকে বেশী বেশী হাদীছ বর্ণনা করা থেকে। যে ব্যক্তি আমার উদ্ধৃতিতে কথা বলে সে যেন ন্যায় ও সত্য ছাড়া কিছু না বলে, যে ব্যক্তি আমার উদ্ধৃতিতে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি তবে সে জাহান্নামে তার স্থান নির্ধারণ করে নেয়। এটি সংকলন করেছেন ইবনু আবী শাইবাহ (৮/৭৬০) আহমাদ ও তারা দু'জন ব্যতীত অন্যান্যরা। আর এটি "আছছহীহা"তেও উদ্ধৃত হয়েছে। (১৭৫৩)
📄 কিতাবটির সংকলন পদ্ধতি
কিতাবটির বিষয় যেহেতু নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাত সংক্রান্ত নির্দেশনার বর্ণনা দান, তাই স্বভাবতই আমি পূর্বোল্লিখিত কারণে কোন নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুকরণ করবো না। বরং এতে কেবল ঐ হাদীছগুলিই উদ্ধৃত করব যা নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে সাব্যস্ত। যেমনটি, অতীত ও বর্তমানের। (১) মুহাদ্দিছীনের (২) অনুসৃত পথ।
নিঃসন্দেহে সুন্দর বলেছেন যে ব্যক্তি (নিম্নোক্ত) কথাটি বলেছেন: لم يصحبوا نفسه أنفاسه صحبوا * أهل الحديث هم أهل النبي وإن অর্থ: আহলুল হাদীছগণ নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আপনজন, তারা যদিও তাঁর সংস্রব পায়নি তবে তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাসের সংস্রব পেয়েছে। (১) অর্থাৎ তারা তাঁর বাণীর সাথী হয়েছে, যে দিকে তাঁর বানী নির্দেশ করে তারা সে দিকে যায়।
আর এজন্যই মাযহাবগত তারতম্য থাকা সত্ত্বেও কিতাবটি হাদীছ ও ফিকুহ-এর কিতাবাদিতে বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিক্ষিপ্ত মাসআলাগুলোর সম্মিলন সাধন করবে ইনশাআল্লাহ। বলতে কি এই কিতাবে যে পরিমাণ হকু কথার সমাহার ঘটেছে অন্য কোন কিতাব বা মাযহাবে ঘটেনি।
আর এই কিতাব অনুযায়ী আমলকারী ইনশাআল্লাহ ঐ সব লোকের অন্তর্ভুক্ত হবেন যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত করেছেন: لَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّهُ يَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ * স্বীয় ইচ্ছায় সেই সত্যের জন্যে যাতে তারা মতভেদ করেছে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। (২)
আমি যখন নিজের জন্য এই নীতি নির্ধারণ করি যে, শুধু বিশুদ্ধ হাদীছ অবলম্বন করব এবং বাস্তবেও এই কিতাবসহ অন্য কিতাবাদিতে এই নীতি অবলম্বন করেছি। যেগুলো অচিরেই মানুষের মাঝে বিস্তার লাভ করবে ইনশাআল্লাহ তা'আলা। তখন থেকেই আমি একথা জানতাম যে, আমার এই কাজ সব দল ও মাযহাব (এর লোক)-কে সন্তুষ্ট করতে পারবে না। বরং অচিরেই তাদের কেউ কেউ বা অনেকেই আমার প্রতি আঘাতমূলক কণ্ঠ ও দোষারোপের কলম ছুড়ে মারবে। তবে এতে আমার অসুবিধা নেই। কেননা আমি এটাও জানি যে, সকল মানুষের সন্তুষ্টি লাভ দুর্লভ ব্যাপার। আর নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: من أرضى الناس بسخط الله وكله الله إلى الناس * অর্থ: যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার মাধ্যমে মানুষকে সন্তুষ্ট করে
আল্লাহ তাকে মানুষের দায়িত্বে অর্পণ করেন। (১) আল্লাহ! কবি কত সুন্দর না বলেছেন:
ولست بناج من مقالة طاعن ولو كنت في غار على جبل وعر * ومن ذا الذي ينجو من الناس سالما ولوغاب عنهم بين خافيتي نسر *
তুমি দোষারোপকারীর কথার গ্লানি থেকে নিষ্কৃতি পাবেই না, যদিও বা দুর্গম পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেও। আর কে আছে মানবের দোষারোপ থেকে মুক্তি পাওয়ার মত যদিও বা শকুনের ডানার তলে আড়াল হয় না কেন।
আমার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, এই (অনুসৃত) পথটাই হচ্ছে সর্বাধিক সঠিক পথ যার ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাহগণকে আদেশ প্রদান করেছেন এবং রাসূলগণের প্রধান আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দেখিয়ে দিয়েছেন। আর এটাই সেই পথ যার অনুসরণ করেছেন ছাহাবা, তাবিঈন ও তৎপরবর্তী সৎ পূর্বসুরীগণ, যাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম চতুষ্টয় যাদের নামে সৃষ্ট মাযহাবসমূহের সাথে আজকের জগতের বেশীরভাগ মুসলিম সম্পর্কযুক্ত। তাঁদের প্রত্যেকেই সুন্নাহ্ (হাদীছ) আঁকড়ে ধরা ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করার অপরিহার্যতার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন এবং তার বিপরীত যে কোন কথাকে পরিত্যাগ করতেও একমত ছিলেন- সে কথার প্রবক্তা যত বড়ই হোন না কেন, যেহেতু নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মর্যাদা হচ্ছে তাদের তুলনায় অনেক বেশী এবং তাঁর পথ সর্বাধিক সঠিক। তাই আমি তাঁদের পথ ধরে চলেছি, আর তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি এবং হাদীছ আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে তাদেরই নির্দেশসমূহ মেনে চলি। যদিও হাদীছটি তাদের কথার বিপরীতও হয়। তাদের এহেন নির্দেশনাবলীই সোজা পথে চলা ও অন্ধ অনুসরণ থেকে বিমুখ হওয়ার ব্যাপারে আমার উপর বিরাট প্রভাব ফেলেছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
টিকাঃ
(১) ইমাম সুবকী "ফাতাওয়া" ১ম খণ্ড ১৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন: অতঃপর মুসলিমদের প্রধান বিষয় হচ্ছে ছলাত, প্রতিটি মুসলিমের পক্ষে এর উপর বিশেষভাবে মনোযোগ দেয়া উচিত এবং নিয়মিত তা পালন করা প্রয়োজন। তার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো (ফরয রুকনগুলো) প্রতিষ্ঠিত করা। তাতে কিছু কাজ এমন রয়েছে যা সর্বসম্মতিক্রমে পালনীয় তা থেকে বিরত থাকার কোন উপায় নেই। আর কিছু কাজ ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, এক্ষেত্রে সঠিক পথ হচ্ছে দু'টি যথাঃ (১) যদি সম্ভব হয় তবে মতভেদ এড়াতে চেষ্টা করবে, অথবা (২) নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ হাদীছে যা এসেছে তা আঁকড়ে ধরবে। যখন এ কাজ করবে তখন তার ছলাত বিশুদ্ধ ও উপযুক্ত হয়ে উঠবে এবং আল্লাহর এ বাণীর আওতাভুক্ত হবে:
ফামান কা-না ইয়ারজুউ লিক্ব-আ রব্বিহী ফাল্ ইয়া'মাল 'আমালান স-লিহান
অর্থঃ "যে ব্যক্তি স্বীয় প্রতিপালকের সাক্ষাতের আশা রাখে সে যেন নেক আমল করে আর স্বীয় প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে অংশিদার না করে।" (সূরা কাহাফ: ১১০)
আমি বলছি: দ্বিতীয় পন্থাটাই ভাল বরং অপরিহার্য, কেননা প্রথম পন্থাটি অনেক বিষয়ে তার বাস্তবতা অসম্ভব হওয়া সত্ত্বেও তাতে নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই নির্দেশটি প্রতিফলিত হয় না। صلوا كما رأيتموني أصلي অর্থ: "তোমরা আমাকে যেভাবে ছলাত পড়তে দেখ ঠিক ঐভাবে ছলাত পড়", কেননা এমতাবস্থায় তার ছলাতে নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ছলাতের বিপরীত হওয়া অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। অতএব বিষয়টি অনুধাবন করুন।
(২) আবুল হাসনাত লক্ষ্ণৌ ইমাম الكلام فيما يتعلق بالقراءة خلف الإمام কিতাবের ১৫৬ পৃষ্ঠায় বলেন: যে ব্যক্তি ইনছাফের দৃষ্টিতে চিন্তা করবে এবং কোন রূপ গোড়ামি ব্যতিরেকে ফিক্হ ও মূলনীতির সাগরে ডুব দিবে সে সুনিশ্চিতভাবে একথা জানতে পারবে যে, আলিমগণের মতভেদকৃত বেশীরভাগ মৌলিক ও অমৌলিক মাসআলায় অন্যদের তুলনায় মুহাদ্দিছগণের মাযহাবই শক্তিশালী। আমি যখন বিতর্কিত বিষয়ের শাখা প্রশাখায় ঘুরে বেড়াই তখন মুহাদ্দিছদের মাযহাবকে অন্যদের মাযহাব অপেক্ষা অধিকতর ইনছাফভিত্তিক পাই। আল্লাহ তা'আলা কতইনা ভাল করেছেন এবং এর উপরে তাদের কতনা শুকরিয়া-(প্রধান বক্তব্যে একথা এভাবেই এসেছে) আর কেনইবা এমন হবে না? তারা যে নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রকৃত উত্তরাধিকারী এবং তাঁর শরীয়তের সত্যিকার প্রতিনিধি। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁদের দলভুক্ত করে হাশর করুন এবং তাদের ভালবাসা ও চরিত্রের উপর রেখে মৃত্যু দান করুন।
(১) হাফিয যিয়াউদ্দীন আল-মাকুদিসী তার ফাদলুল হাদীস ওয়া আহলিহি কিতাবে উল্লেখ করেন যে, এর রচয়িতা হচ্ছেন কবি হাসান বিন মুহাম্মাদ আল নাসাবী।
(২) সূরা আল-বাকারা ২১৩ আয়াত।
(১) তিরমিযী, কুযা'ঈ, ইবনু বিশরান ও অপরাপরগণ (বর্ণনা করেছেন)। উক্ত হাদীছ ও তার সূত্রগুলোর উপর شرح العقيدة الطحاوية কিতাবের হাদীছ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আলোকপাত করেছি। অতঃপর سلسلة الأحاديث الصحيحة ২৩১১ নম্বরেও আলোচনা করেছি এবং বলেছি যে, একে যারা ছাহাবী পর্যন্ত ঠেকিয়েছেন (মাওকুফভাবে বর্ণনা করেছেন) এর ফলে তার কোন ক্ষতি সাধিত হবে না। আর একে ইবনু হিব্বান ছহীহ বলেছেন।
📄 কায়মূদদ হওয়া
আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখনই ছলাতে দাঁড়াতেন তখন ফরয হোক আর নফল হোক উভয় অবস্থায়ই কা'বার দিকে মুখ করতেন। (১) এবং তিনি এ ব্যাপারে নির্দেশও দিয়েছেন।
তাইতো ছলাতে ত্রুটিকারী ব্যক্তিকে তিনি বলেন: "إذا قمت إلى الصلاة فأسبغ الوضوء، ثم استقبل القبلة فكبر"
"যখন তুমি ছলাতে দাঁড়াবে, তখন পরিপূর্ণরূপে উযু করবে, অতঃপর ক্বিবলামুখী হয়ে তাকবীর বলবে।” (২)
তিনি নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফরে স্বীয় বাহনের উপর নফল ছলাত পড়তেন এবং তার উপরে বিত্রও পড়তেন, সে তাকে নিয়ে পূর্ব পশ্চিম যেদিকে মন সে দিকে নিয়ে যেত। (৩)
এ ব্যাপারেই আল্লাহর বাণী নাযিল হয়: فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهُ অর্থ: তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাওনা কেন সেখানেই আল্লাহর চেহারা বিদ্যমান। (৪) আবার (কখনও) স্বীয় উটনীর উপর নফল পড়তে চাইলে তাকে ক্বিবলামুখী করে তাকবীর বলতেন, অতঃপর সে যে দিকেই তাঁকে নিয়ে যেত সেদিকেই ছলাত পড়তেন। (৫)
"তিনি স্বীয় বাহনের উপর মাথার ইঙ্গিত দ্বারা রুকু ও সাজদাহ করতেন, সাজদাহকে রুকুর তুলনায় অধিক নিম্নমুখী করতেন।" (৬)
"ফরয ছলাত পড়ার ইচ্ছা করলে অবতরণ করে ক্বিবলামুখী হতেন।” (৭)
তবে মারাত্মক ভয়ভীতির সময় নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর উম্মতের জন্য আদর্শ রেখে গেছেন যে, তারা স্বীয় পদব্রজে অথবা আরোহী অবস্থায়, ক্বিবলামুখী হয়ে অথবা অন্যমুখী হয়ে ছলাত পড়তে পারবে। (১) তিনি আরো বলেছেনঃ
হুম ইযাখতলাতূ ফাইন্নামা-হুওয়াত্ তাকবীরু অল ইশা-রাতু বিররা'সি
অর্থ: যখন তারা (দু'পক্ষ) সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন কেবল তাকবীর ও মস্তকের ইঙ্গিতই যথেষ্ট। (২) তিনি আরো বলেন:
মা বায়নাল মাশরিকি অল মাগরিব ক্বিবলাহ
অর্থ: পূর্ব ও পশ্চিম এর মাঝেই ক্বিবলা রয়েছে। (৩) জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: "আমরা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে কোন সফর বা জিহাদী কাফেলায় ছিলাম। অতঃপর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ার কারণে আমরা ক্বিবলা নিয়ে মতানৈক্যে পড়ে যাই। প্রত্যেকে পৃথকভাবে ছলাত আদায় করি এবং ছলাতের অবস্থান জানার জন্য আমাদের একেকজন নিজের সম্মুখে দাগ কেটে রাখে। পরক্ষণে যখন প্রভাত হল তখন দাগ দেখলাম তাতে প্রমাণিত হল যে, আমরা ক্বিবলা ভুল করে অন্যদিকে ছলাত পড়েছি। আমরা এ ঘটনা নাবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জানালাম, (তিনি আমাদেরকে পুনরায় ছলাত পড়তে বলেননি) বরং বললেন: (তোমাদের ছলাত যথেষ্ট হয়েছে)"। (৪) তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (কাবাকে সামনে রেখে) বাইতুল মাকুদিসের দিকে ছলাত পড়তেন যে পর্যন্ত এই আয়াত অবতীর্ণ হয়নি:
ক্বাদ নারা- তাক্বাল্লুবা ওয়াজহিকা ফিছ ছামায়ি ফালানুবাল্লিয়্যান্নাকা ক্বিবলাতান তারযা-হা- ফাওয়াল্লি ওয়াজহাকা শাত্বরাল মাসজিদিল হারা-মি
অর্থ: অবশ্যই (হে নবী) আমি তোমার মুখমণ্ডলকে আকাশ পানে বারবার ফিরাতে দেখছি, আমি অবশ্য অবশ্যই তোমাকে তোমার পছন্দনীয় ক্বিবলার দিকে ফিরিয়ে দিব। অতএব, তোমার মুখমণ্ডলকে মাসজিদুল হারামের অভিমুখে ফিরিয়ে দাও। (৫)
যখন এ আয়াত নাযিল হল তখন তিনি কাবামুখী হয়ে গেলেন। কুবাবাসীরা মসজিদে ফজরের ছলাত আদায়রত ছিল এমতাবস্থায় হঠাৎ এক আগন্তুক এসে বলল: আল্লাহর রাসূলের উপর গত রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে তাঁকে কাবামুখী হওয়ার জন্য আদেশ করা হয়েছে। সুতরাং তোমরাও তার দিকে মুখ ফিরাও। তাদের মুখগুলো তখন সিরিয়ার দিকে ছিল। খবর শ্রবণান্তে তারা সবাই ঘুরে গেল আর ইমামই তাদেরকে নিয়ে (বর্তমান) ক্বিবলার দিকে ঘুরেছিলেন। (১)
টিকাঃ
(১) এ বিষয়টি বহু সূত্রে অব্যাহত ধারায় চূড়ান্তরূপে জানাশুনা, বিধায় উদ্ধৃতি নিষ্প্রয়োজন; এ ছাড়া যে তথ্য আসছে তাতে এর নির্দেশ রয়েছে।
(২) বুখারী, মুসলিম, সাররাজ। প্রথমটি الإرواء কিতাবে এসেছে (২৮৭)।
(৩) ইমাম মুসলিম এটা বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী একে ছহীহ বলেছেন।
(৪) আবু দাউদ, ইবনু হিব্বান الثقات এর (১/১২) পৃষ্ঠায়, যিয়া المختارة তে হাসান সনদে এটা বর্ণনা করেছেন আর ইবনুস্ সাকান একে ছহীহ বলেছেন, ইবনুল মুলাক্বিনও خلاصة البدر المنير এর (১/২২) তে একে ছহীহ বলেছেন। আবার আব্দুল হক্ব আল ইশবীলী তাদের পূর্বেই তাঁর لأحكام কিতাবে ছহীহ বলে রেখেছেন যা আমার যাচাইকৃত মুদ্রণের (১৩৯৪নং হাদীছ) ইবনু হানী ইমাম আহমাদ থেকে তাঁর مسائل গ্রন্থের (১/৬৭) পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন তাতে ইমাম আহমাদের মতও এটাই।
(৫) আহমাদ, তিরমিযী; তিরমিযী একে ছহীহ বলেছেন।
(৬) বুখারী ও আহমাদ।
(১) বুখারী ও মুসলিম। এ হাদীছটি لإرواء। ৫৮৮ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত হয়েছে।
(২) বুখারী ও মুসলিমের সনদে বাইহাক্বী।
(৩) তিরমিযী, হাকিম; তারা উভয়ে একে ছহীহ বলেছেন। আমি মানারুস্ সাবীল কিতাবের )تخریج তাখরীজ) বা হাদীছ যাচাইমূলক উদ্ধৃতি গ্রন্থ إرواء الغليل এর ২৯২ নং হাদীছে উল্লেখ করেছি।
(৪) দারাকুতনী, হাকিম, বায়হাক্বী, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহতে এর সাক্ষ্য মূলক বর্ণনা রয়েছে, অপর আরেক সাক্ষ্য ত্বাবরানীতে রয়েছে الإرواء ২৯৬।
(৫) সূরা আল-বাক্বারা ১৪৪ আয়াত।