📄 সারকথা
পূর্বে বর্ণিত হাদীসটি অর্থাৎ শাফা'আতের হাদীসটি এ বিষয়ের প্রমাণ গ্রহণের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাদীস। এ হাদীসটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, সলাত আদায় করা ফরয এর প্রতি ঈমান থাকা সত্ত্বেও সলাত ত্যাগকরার কারণে মিল্লাত তথা দীন ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে না এবং কাফের ও মুশরিকদের সাথে চিরস্থায়ী জাহান্নামীও হবে না।
সুতরাং আমি একান্তই আশা রাখি যে, এ বইয়ে সন্নিবেশিত হাদীস এবং অনুরূপ অর্থবোধক হাদীসসমূহ সম্পর্কে যারাই অবগত হবেন তারা সলাত পরিত্যাগকারীগণকে সলাতের প্রতি বিশ্বাস এবং এক আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার উপর ঈমান থাকার কারণে তাদেরকে কাফের বলার অভিমত থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন। কেননা, মুসলিমকে কাফের বলা অত্যন্ত গর্হিত ও পাপের কাজ। যা ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
(প্রকৃতপক্ষে) সলাত পরিত্যাগকারীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য এই যে, কুরআনুল কারীম, রাসূলুল্লাহ এর হাদীস এবং সালফে সালেহীনদের থেকে সলাতের মহত্ব ও গুরুত্ব বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে এমন হাদীস দ্বারা তাদেরকে উপদেশ ও দাওয়াত দেয়া। কেননা, দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, আলেমদের হাত থেকে খেলাফত ও রাজত্ব চলে গেছে। সুতরাং তারা একজন সলাত ত্যাগকারীর উপর কাফিরের নির্দেশ জারি করে তাকে হত্যা করার ক্ষমতা রাখেন না। আর সকল সলাত পরিত্যাগকারীর ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া এ বিধান মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতেই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়; সুতরাং অমুসলিম রাষ্ট্রে আরো অসম্ভব নয় কি?
দাওয়াত দেয়ার পরও সলাত পরিত্যাগকারী সলাত আদায় না করলে তাকে হত্যা করা স্পষ্ট হিকমতপূর্ণ। তাহলো সে যদি মু'মিন হয়ে থাকে তাহলে হয়তো দাওয়াত দেয়ার পর তাওবা করে সলাত আদায় করবে। কিন্তু যখন হত্যা করার বিধানকে গ্রহণ করা বে তখন প্রমাণিত হবে যে, সে অস্বীকারবশত সলাত বর্জন করেছে, ফলে সে মারা যাবে। এমতাবস্থায় মারা গেলে সে প্রকৃতপক্ষে কাফের বলে গণ্য হবে যা ইবনু তাইমিয়া হতে পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এ অবস্থায় সলাত অস্বীকার করাটাই প্রমাণ করবে যে, সে দ্বীন থেকে বের হয়ে গেছে। দুঃখজনক হলেও এমন মুহূর্তে তার বিষয়ে এ ফায়সালা দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
এহেন পরিস্থিতিতে উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গি এটাই হওয়া উচিত- 'সলাতের প্রতি বিশ্বাস থাকা অবস্থায় তা বর্জনকারী কাফের হবে না।'
আমরা সহীহ হাদীসসমূহ থেকে যে সব দলীল আদিল্লাহ পেশ করেছি তা একেবারে অকাট্য। সুতরাং এরপর কোনো আপত্তি পেশ করার অবকাশ থাকে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ)
“কাজেই যারা তার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, তাদের উপর পরীক্ষা নেমে আসবে কিংবা তাদের উপর নেমে আসবে ভয়াবহ শাস্তি।”³⁶
📄 বিশেষ দ্রষ্টব্য-১
ইবনু কুদামাহ-এর বর্ণনায় ইতোপূর্বে সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, অলসতাবশত সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হবে না, যদিও অধিকাংশ বিদ্বান এ হাদীসটি উল্লেখ করেননি। কিন্তু আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তিনি এখানে আরও হাদীস উল্লেখ করেছেন। তা যদি সহীহ প্রমাণিত হয় তবে তা এ সম্পর্কে মত পার্থক্যের বিরুদ্ধে অকাট্য দলীল হিসেবে প্রমাণিত হবে। কেননা, উক্ত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, জনৈক আনসারীর এক দাস মারা গেল। সে কখনো সলাত আদায় করতো, আবার কখনো ছেড়ে দিত। তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ তাকে গোসল দেয়া, তার জানাযা পড়া ও দাফন করার নির্দেশ দিলেন।
ইবনু কুদামাহ যদিও এ হাদীসের হুকুম বর্ণনায় নিরবতা পালন করেছেন তথাপিও তিনি ত্রুটিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তা সনদসহ উল্লেখ করে ভাল করেছেন। সে হাদীসটি আমি অধ্যয়ন করার সুযোগ পেয়েছি এবং তা দুর্বল ও মুনকার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার 'সিলসিলাহ আহাদিস আযযঈফা'-র ৬০৩৬ নং এ উল্লেখ করেছি।
📄 বিশেষ দ্রষ্টব্য-২
এ পুস্তিকা লেখার কয়েকদিন পর আমার কতক দ্বীনি ভাই একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব আমার কাছে পেশ করলেন যা আতা বিন আব্দুল লতীফ আহমাদ এর লেখা, তাহল-
فَتْحٌ مِنَ الْعَزِيزِ الْغَفَّارِ بِإِثْبَاتِ أَنَّ تَارِكَ الصَّلَاةِ لَيْسَ مِنَ الْكُفَّارِ»
“ফাতহুম মিনাল আযীযিল গাফ্ফার বে-ইসবাতে আন্না তারিকাস সলাতি লাইসা মিনাল কুফফার” (পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল আল্লাহর বিজয় যে, সলাত পরিত্যাগকারী কাফের নয়)। বইটি যখন পাঠ করলাম এবং এর কয়েকটি অনুচ্ছেদ ভালভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলাম তখন আমি অত্যন্ত খুশি হলাম এবং আমার আনন্দ আরো বৃদ্ধি পেল। আমার কাছে তাঁর তাত্ত্বিক পদ্ধতি ও বিভিন্ন দলীল-দালায়েলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্ধতি পরিষ্কার হয়ে পড়ল। তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ হচ্ছে- তাখরীযুল আহাদীস তথা হাদীসসমূহ কোন্ গ্রন্থে কী অবস্থায় তা পরখকরণ, হাদীসসমূহের সনদ ও শাওয়াহেদসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ এবং দুর্বল হাদীস থেকে সহীহ হাদীসসমূহকে এমনভাবে পৃথক করেছেন যাতে করে সেগুলোর মধ্যে দুর্বল হাদীসসমূহকে বাদ দেয়া যায় এবং প্রমাণিত হাদীসসমূহের উপর নির্ভর করা যায়। অতঃপর সেগুলো থেকে দলীল গ্রহণ করা যায় ও এসব হাদীস শক্তিশালী হওয়ার ব্যাপারে ভিন্নমতাবলম্বীদের জবাব দেয়া যায়।
শ্রদ্ধেয় ভাই; যেসব লেখকগণ সহীহ শুদ্ধ হাদীসসমূহের দিকে মনোযোগী না হয়ে কেবল তাদের অভিমতকে শক্তিশালী করার হাদীসসমূহকে একত্রিত করেছেন- তাদের বিরোধিতায় যে অবদান রেখেছেন তার জন্য আল্লাহ তা'আলা তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। যেমন করেছেন মহিলার চেহারা দর্শন সংক্রান্ত মাস'আলার ক্ষেত্রে আমার মতামতকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য সৌদি, মিসরী ও অন্যান্য লেখকগণ।
বিপরীতপক্ষে শ্রদ্ধেয় ভাই (আতা) যা করেছেন, তা হচ্ছে তিনি সলাত বর্জনকারীকে কাফের সাব্যস্তকারীদের বিরোধিতায় জ্ঞানসমৃদ্ধ পদ্ধতির অনুসরণ করেছেন। তিনি বিরোধী পক্ষের দলীলসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং তাদের পক্ষে ও বিপক্ষের হাদীসসমূহ উল্লেখ করেছেন। অতঃপর তাদের বিপক্ষের দলীলসমূহকে তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে উল্লেখ করেছেন। তারপর তার পক্ষের ও বিপক্ষের দলীলসমূহের মধ্যে অত্যন্ত দৃঢ় ও শক্তিশালী পদ্ধতিতে সমতা বিধান করেছেন; যদিও কখনো তা নিজের বিরুদ্ধে গেছে।
তিনি কখনো হাদীসের শাওয়াহেদ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো হাদীসকে সহীহ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে অনেক শিথিলতা দেখিয়েছেন। অতঃপর সে হাদীস এবং যে হাদীস সলাত বর্জনকারীকে কাফের সাব্যস্ত করে সেসবের মধ্যে সমতা বিধানের চেষ্টা করেছেন। যেমনটি তিনি করেছেন আবূ দারদা হতে বর্ণিত, (...যে ব্যক্তি সলাত বর্জন করলো সে দ্বীন হতে বের হয়ে গেল) হাদীসের ক্ষেত্রে। কেননা, তিনি এ হাদীসের সমালোচনা করেছেন এবং এর সনদের দুর্বলতা বর্ণনা করার পর পুনরায় কয়েকটি শাহেদ তথা সমর্থক হাদীস পাওয়ার কারণে পুনরায় শক্তিশালী বলেছেন। মূলত সেই শাহিদগুলো শাওয়াহেদে ক্বাসেরাহ তথা অপূর্ণাঙ্গ শাহেদ বা সমর্থক হাদীস। ফলে তা এ হাদীসটিকে শক্তিশালী করতে পারে না। অতঃপর তিনি উক্ত হাদীসের "خُرُوجٌ" তথা বের হয়ে যাওয়াকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, خُرُوْجٌ دُوْنَ" "لْخُرُوْجِ। অর্থাৎ এ বের হওয়াটা একেবারে সম্পূর্ণরূপে বের হওয়া নয়।
এ ছাড়াও তাঁর হাদীসের ক্ষেত্র শিখিলতা ও ব্যাখ্যা করার আরো দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন সিলসিলাহ যঈফার ৬০৩৭ নং এ বর্ণিত হাদীস।
বাস্তব সত্য এই যে, তাঁর উক্ত বইটি অত্যন্ত উপকারী একটি বই। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কিছু আলোচনা করেছেন, তা ইতিবাচক হোক বা নেতিবাচক। কেউ তা গ্রহণ করুক বা না করুক। তিনি কোনো প্রকার গোঁড়ামীবশত একাট্টাভাবে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলেননি।
ঐ বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর বর্ণনা রয়েছে দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদে। সেই অনুচ্ছেদে তিনি অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন, “সলাত পরিত্যাগকারী ব্যক্তি দ্বীন থেকে বের না হওয়ার পক্ষে খাস দলীল”। এর সমর্থনে তিনি ১২টি হাদীস উল্লেখ করেছেন।
আমি তাঁর বইয়ের ভূমিকার বিষয়সমূহ পাঠ করার পর ধারণা করলাম যে, তাঁর এ বইয়ে শাফা'আতের হাদীসটি আলোচিত হয়েছে। কেননা, এ হাদীসটি এ বিষয়ের সকল বিবাদের নিরসনের অকাট্য দলীল। যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের কথা হচ্ছে যে, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল লেখকগণের মতো তিনিও হাদীসটি উল্লেখ করেননি।
আমি তাঁর বইয়ের উল্লিখিত দলীলসমূহের গুরুত্ব ও তাৎপর্যের কারণে এবং কাফের সাব্যস্তকারীদের অসতর্কতার প্রতি সাবধানতা অবলম্বনের জন্য যা উল্লেখ করতে চাই তা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাণী :
إِنَّ لِلْإِسْلَامِ صَوِيٌّ وَ مِنَارٌ كَمِنَارِ الطَّرِيقِ...
নিশ্চয়ই ইসলামেরও কতক দিকনির্দেশক স্তম্ভ বা সাইনবোর্ড রয়েছে, যেমন রয়েছে রাস্তার পরিচিতির জন্য। উক্ত হাদীস তাওহীদ, সলাত ছাড়াও ইসলামের প্রসিদ্ধ পাঁচটি রুকন বা স্তম্ভ ও ওয়াজিবসমূহের উল্লেখ রয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেন-
.... فَمَنْ انْتَقَصَ شَيْئًا مِنْهُنَّ فَهُوَ سَهُمْ مِنَ الْإِسْلَامِ تَرَكَهُ وَمَنْ تَرَكَهُنَّ فَقَدْ نَبَذَ الْإِسْلَامَ وَرَاءَهُ
“সুতরাং যে ব্যক্তি উক্ত (রুক্সসমূহের) মধ্যে কোন কিছু হ্রাস বা কম করলো সে ইসলামের একটি অংশকে ছেড়ে দিল। আর যে, ব্যক্তি সবগুলোকে ছেড়ে দিল সে ইসলামকে তার পশ্চাতে নিক্ষেপ করলো।
তিনি উক্ত হাদীসের উদ্দিষ্ট বিষয়সমূহকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তার সনদসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং সেগুলোর মধ্যে কতক সনদকে সহীহ বলেছেন। তারপর সলাত পরিত্যাগকারী যে কাফের নয় উক্ত হাদীসটি তার স্পষ্ট দলীল ও প্রমাণ হওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করেছেন।
আমি এ হাদীসকে ৩০ বছর পূর্বেই সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহায় (৩৩৩) সংকলন করেছি। আর তিনি তা থেকে উপকৃত হয়েছেন। যেমন পরবর্তীগণ পূর্ববর্তীদের থেকে উপকৃত হয়ে থাকে। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে সামান্যতম ইঙ্গিতও দেননি। তিনি এতে ভালই করেছেন। বিশেষ করে তিনি কতক হাদীসের ব্যাপারে আমার সমালোচনা করেছেন। তবে এতে আমার কোনো ক্ষতি হয়নি বরং উপকারই হয়েছে- আমি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে থাকি বা ভুল সিদ্ধান্তে। আর এখন তা বিস্তারিত আলোচনার সময় নয়।
পরিশেষে বলতে চাই যে, এ মাস'আলা সম্পর্কে যাদের অন্তরে সন্দেহ রয়েছে তারা যেন এ বইটি ভালভাবে অধ্যয়ন করেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা একক এবং সঠিক বিষয় বোঝার তাওফীকদাতা।
سُبْحَانَكَ اللهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ.
টিকাঃ
৩৫. সূরাহ আল-ক্বাসাস ২৮ : ৫৫
৩৬. সূরাহ আন্-নূর ২৪ : ৬৩