📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা

📄 একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা


অতঃপর আমার বক্তব্য এই যে, আমার আশংকা হয়, কতক অজ্ঞ কট্টরপন্থী ব্যক্তিরা উক্ত সহীহ হাদীস (তথা শাফায়াতের বড় হাদীসটি) যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ- সলাত আদায় করা ফরয এ বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও অলসতাবশত সলাত ত্যাগকারী আল্লাহর তা'আলার বাণী- )وَيَغْفِرُ دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ﴿ আর এ (শিরক) ব্যতীত যে কোনো গুনাহ আল্লাহ ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন) এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করবে। যেমন ১৪০৭ হিজরীর শেষাংশে কতক ব্যক্তি তা করেছিল।
(এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই) তা হলো- দু'জন ছাত্র একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা করত- তাদের একজন হল সৌদিয়ান অন্যজন মিসরী। তারা উভয়ে (সিলসিলাহ আহাদিস আস সহীহার) শুরু অংশের একশটি হাদীসের ব্যাপারে আমার পেছনে লেগে গেল। তার মধ্যে একটি হলো- হুযাইফাহ বিন ইয়ামান এর হাদীস (সিলসিলাহ : ৮৭ নং) যার শব্দ নিম্নরূপ-
يَدْرُسُ الْإِسْلَامُ كَمَا يَدْرُسُ وَشِيَ القَوْبِ حَتَّى لَا يَدْرِي مَا صِيَامٌ وَلَا صَلَاةٌ وَلَا نُسُكْ وَلَا صَدَقَةٌ وَلَيُسْرَى عَلَى كِتَابِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فِي لَيْلَةٍ فَلَا يَبْقِي فِي الْأَرْضِ مِنْهُ آيَةٌ وَ تَبْقِي طَوَائِفٌ مِنْ النَّاسِ : الشَّيْخُ الْكَبِيرُ وَ الْعَجُوْزُ ، يَقُوْلُوْنَ : أَدْرَكْنَا آبَاءَنَا عَلَى هَذِهِ الْكَلِمَةِ : " لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ فَنَحْنُ نَقُوْلُهَا".
ইসলাম পুরাতন হয়ে যাবে, যেমন কাপড়ের উপরের কারুকার্য পুরাতন হয়ে যায়। শেষে এমন অবস্থা হবে যে কেউ জানবেনা-সিয়াম (রোজা) কী, সলাত (নামায) কী, কুরবানী কী, যাকাত কী? একরাতে পৃথিবী থেকে মহান আল্লাহর কিতাব বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং একটি আয়াতও অবশিষ্ট থাকবে না। মানুষের (মুসলমানদের) কতক দল অবশিষ্ট থাকবে। তাদের বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা বলবে, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমার উপর পেয়েছি। সুতরাং আমরাও সেই বাক্য বলতে থাকবো।
সিলাহ বিন যুফার হুযায়ফা কে বললেন, "لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ« কালিমা তাদের কি কাজে আসবে? যেহেতু তারা জানবে না- সলাত, সিয়াম, কুরবানী এবং সাদাকা কী জিনিস?
এ কথা শুনে হুযায়ফা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সিলাহ বিন যুফার এ কথাটি তার সামনে তিনবার উপস্থাপন করলেন, আর তিনি প্রত্যেকবারই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তৃতীয়বারের পর হুযায়ফাহ তার দিক অগ্রসর হয়ে বললেন : হে সিলাহ! যাও তুমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর। (তিনবার)
আমি (আলবানী ঐ দু'জন ছাত্রকে) বললাম, আমি যে এ হাদীসটি সহীহ বলে অভিহিত করেছি তার প্রতিবাদে তোমরা দু'জনে মিলে এ হাদীস দুর্বল হওয়ার পক্ষে তিন পৃষ্ঠার একটি খসড়া প্রস্তুত করে নিয়ে আস। কিন্তু তারা দু'জনে এ হাদীস দুর্বল প্রমাণ করার মতো কিছুই পেল না। তবে, তারা যা পেল তা এই যে, উক্ত হাদীসটি আবূ মু'আবিয়াহ মুহাম্মাদ বিন হাযিম যারীর থেকে বর্ণিত। তিনি একজন মুরজিয়া মতবাদে বিশ্বাসী, অর্থাৎ আমল না করে জান্নাত পাওয়ার আশায় বিশ্বাসী। আর এ হাদীসটি মুরজিয়াদের বিদ'আতীমূলক কাজের পক্ষাবলম্বন করছে।
তাদের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ মূর্খতার পরিচয়। এখানে বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন নেই। শুধু এতটুকু বলতে চাই, আবূ মু'আবিয়াহ তথা নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী রাবী এবং ইমাম বুখারী ও মুসলিমের মতে তার বর্ণিত হাদীস দিয়ে দলীল গ্রহণ করা যাবে। কেননা, তিনি তাঁর মতো শক্তিশালী রাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি মুরজিয়া মতবাদের সাথে কোনোভাবেই সম্পর্ক রাখে না।
তারা দু'জনে এ দাবি করেছে তাদের অজ্ঞতার কারণে। তাদের এ দাবি কী করে সঠিক হতে পারে? অথচ ইমাম হাকিম ও ইমাম যাহাবী এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। অনুরূপ ইমাম ইবনু তাইমিয়া, ইবনু হাজার আসকালানী এবং বুসীরীও সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন।
তাদের দু'জনের জ্ঞানে যদি এটা ধরে যে, ঐ সকল আলেম এ হাদীসকে সহীহ বলার ক্ষেত্রে ভুল করেছেন, তাহলে তাদের দু'জনের নিকট এমন জ্ঞানের সমাবেশ ঘটেনি যাতে তারা উভয়ে বিশ্বাস করবে যে তাঁরা সকলে এমন হাদীসকে সহীহ বলে অভিহিত করেছেন যা মুরজিয়া মতবাদকে শক্তিশালী করছে?
আল্লাহর শপথ! তারা এমন বড় মাপের আলেমের জ্ঞানের সাথে পাল্লা দিচ্ছে এবং তাদের কর্তৃক সহীহ হাদীসকে যঈফ বলছে এমন ব্যক্তি যার নিকট ঐসব লোকদের মতো ভাল বিদ্যা নেই।
উক্ত সহীহ হাদীস থেকে এ উপকার পাওয়া যায় যে, কতক মানুষ অজ্ঞতার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। তাদের অবস্থা এই হবে যে, তারা কালিমার সাক্ষ্যদান ব্যতীত ইসলামের কোনো জ্ঞান রাখবে না। বিষয়টি এমন নয় যে, তারা সলাতের ওয়াজিবসমূহ এবং অন্যান্য আরকান সম্পর্কে জ্ঞান রাখবে অথচ সে অনুযায়ী আমল করবে না। কক্ষনো নয়; উক্ত হাদীসে এ জাতীয় কোনো বিষয়ই নেই। বরং তাদের অবস্থা হলো মরুবাসী বেদুঈন এবং কুফর রাষ্ট্রে নওমুসলিমের মতো যারা শাহাদাতাইন তথা দু' কালেমা ছাড়া আর কিছুই জানে না।
এরকম ঘটনা কোনো এক শহরে ঘটেছিল। ফলে একজন আমাকে এক মহিলা সম্পর্কে ফোন করে জানতে চাইলো যে, জনৈক মহিলা বিবাহ করেছে অথচ সহবাসের পর ফরয গোসল করা ছাড়াই সে সলাত আদায় করতো। এর কিছুদিন পর এক মসজিদের ইমাম জিজ্ঞাসা করলেন যে, সে মনে করে যে, তার নিকট এমন কতক বিষয় জানা আছে যা আলেমদের সাথে সাংঘর্ষিক। সে তার পুত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করলো, সে জুনুবী তথা স্বপ্নদোষ হওয়ার পর নাপাক অবস্থায় সলাত আদায় করে। কেননা, সে নাপাকীর গোসলের ওয়াজিবসমূহ সম্পর্কে অজ্ঞ।

📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ-এর অভিমত

📄 ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ-এর অভিমত


ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ তাঁর মাজমূ' ফাতাওয়ার ২২ খণ্ড ৪১ পৃষ্ঠায় বলেছেন : “যে ব্যক্তি জানতে পারল যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ; অতঃপর তাঁর প্রতি ঈমান আনল অথচ মুহামম্মাদ- যে শারী‘আত নিয়ে এসেছেন তার অধিকাংশ বিধানই সে অবগত নয়। তাহলে তার কাছে যে বিধানের জ্ঞান পৌঁছেনি সে বিধান না পালন করার জন্য তাকে আল্লাহ তা'আলা শাস্তি দিবেন না। আল্লাহ তা'আলা কারো প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর ঈমান পরিত্যাগ করার কারণেই যদি শাস্তি না দেন তবে এ কতক পালন না করার কারণে শাস্তি দিবেন না। এটা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত এবং উত্তম কথা। আর রাসূলুল্লাহ এর সুন্নাতে এরূপ অনেক দৃষ্টান্ত বিদ্যমান.....।
অতঃপর ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ একটি অত্যন্ত সুন্দর উদাহরণ পেশ করেছেন। তা এই যে, একজন মুসতাহাযাহ (যে মহিলার হায়েয শুরু হয়ে আর বন্ধ হয় না, বরং তা চলতেই থাকে) মহিলা রাসূলুল্লাহ-কে বললেন, আমার খুব কঠিন ও প্রচুর হায়েয হয়ে থাকে যা আমাকে সলাত ও সিয়াম হতে বিরত রাখে। [রাসূলুল্লাহ তার এ কথা শ্রবণ করে] উক্ত মহিলাকে ইস্তিহাযার রক্ত চলাকালে সলাত আদায় করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু যে সব সলাত আদায় করা হয়নি তা আর কাযা করার নির্দেশ দিলেন না।
আমি (আলবানী) বলছি : উক্ত মহিলা হলেন ফাতিমা বিনতে আবী হুবাইশ। বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য কিতাবে তার হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। আর সহীহ আবু দাউদের ২৮১ নং এ উল্লিখিত হয়েছে।
অনুরূপ আরেকজন মহিলা ছিলেন। তিনি হলেন উম্মু হাবীবাহ বিনতে জাহশ। তিনি আব্দুর রহমান বিন আওফ এর স্ত্রী। তার হায়েয একটানা সাত বছর পর্যন্ত চালু ছিল। এ হাদীসটিও ইমাম বুখারী, মুসলিম বর্ণনা করেছেন। আর সহীহ আবু দাউদের ২৮৩ নং এ আলোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয় মহিলা হলেন হামনা বিনতে জাহশ । ইবনু তাইমিয়া এঁর প্রতিই ইশারা করেছেন। কেননা, তাঁর হাদীসে রয়েছে,
إِنِّي أَسْتَحَاضُ حَيْضَةً شَدِيدَةً تَمْنَعُنِي الصَّلَاةَ وَالصَّوْمَ؟ فَأَمَرَهَا بِالصَّلَاةِ زَمَنَ دَمِ الْإِسْتِحَاضَةِ وَلَمْ يَأْمُرْهَا بِالْقَضَاءِ»
“আমার কঠিন ও অত্যন্ত বেশি হায়েয হয়। তা আমাকে সলাত ও সওম হতে বিরত রাখে। ফলে [রাসূলুল্লাহ তাকে সলাত আদায় করে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন। (রাসূলুল্লাহ উক্ত রক্তকে ইস্তিহাযা (যা এক প্রকার রোগ বিশেষ) মনে করলেন।) তাই তাকে ইস্তিহাযা চলাকালীন সময়ে ছুটে যাওয়া সলাতকে কাযা করে আদায় আদেশ করলেন না।

📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 আহমাদ বিন হাম্বালের অভিমত

📄 আহমাদ বিন হাম্বালের অভিমত


আহমাদ বিন হাম্বালের হতেও একটি উক্তি রয়েছে যা পূর্বে বর্ণিত বিষয়সমূহের সাথে খুব ভাল সম্পর্ক রয়েছে এবং পূর্বের ঐ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, সাধারণভাবে সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হয় না।
আব্দুল্লাহ বিন ইমাম আহমাদ তাঁর মাসায়েল গ্রন্থের ৫৬ ও ১৯৫ পৃষ্ঠায় বলেছেন : “আমি আমার পিতাকে দু'মাস যাবৎ সলাত ত্যাগকারী এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, সে বর্তমানে উক্ত দু'মাসের সলাতসমূহ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে আদায় করে নিবে। ঐ ওয়াক্তের শেষ পর্যন্ত সেই ওয়াক্তের নির্ধারিত সলাত আদায় করবে যেগুলো সে ছেড়ে দিয়েছে। জীবনে ২য় বার আর এমন করবে না। অতঃপর পরের ওয়াক্তের ছুটে যাওয়া সলাত আদায় করবে।
তবে যদি ছুটে যাওয়া সলাতের পরিমাণ বেশি হয় এবং সে জীবিকা অন্বেষণে ব্যস্ত থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করতে না পারে। তাহলে সেই সলাত পুনরায় আদায় করবে যেমন সলাতরত অবস্থায় কোনো কিছু ছুটে যাওয়ার কথা স্মরণ হলে তা পরে আদায় করা হয়।
প্রিয় পাঠক! আপনি ইমাম আহমাদ এর বক্তব্য শ্রবণ করলেন যা পূর্বের কথা প্রমাণ করে যে, সাধারণভাবে সলাত বর্জন করলে একজন মুসলিম ইসলাম থেকে খারিজ বা বের হয়ে যায় না বরং একাধারে দু'মাস সলাত আদায় না করলেও নয়। বরং যে ব্যক্তি জীবিকা অন্বেষণে ব্যস্ত থাকে তার জন্য পূর্বের কাযা সলাতসমূহকে পরে আদায় করে নেয়ার অনুমতি দিলেন। তার এ উক্তি থেকে আমার কাছে দু'টি বিষয় প্রমাণিত হয় :
প্রথমত : পূর্বে যা বলেছেন সে কথাই অর্থাৎ সে ইসলামের উপরই থাকবে। যদিও সে ছুটে যাওয়া সকল সলাত আদায় করে দায়িত্বমুক্ত না হয়।
দ্বিতীয়ত : কাযা সলাতের হুকুমটি নির্ধারিত ওয়াক্ত বা সময়মত সলাত আদায়ের হুকুমের মত নয়। কেননা, আমি বিশ্বাস করি না যে, জীবিকা উপার্জনের তাকিদে কেবল ইমাম আহমাদ কেন বরং তার চেয়ে আরো নিম্নস্তরের বিদ্বানও নির্দিষ্ট সময় আদায় না করে পরে কাযা করে নেয়ার অনুমতি দিবেন। কেননা, নির্ধারিত ওয়াক্তে সলাত আদায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া আ'আলা অধিক জ্ঞাত।
মুসলিম ভ্রাতৃমণ্ডলী! জেনে রাখুন, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল এর উক্ত বর্ণনা এবং এ সম্পর্কে আরো যে সব রেওয়ায়েত পাওয়া যায় সেগুলোর উপর প্রত্যেক মুসলিমকে প্রথমত : নিজের এবং দ্বিতীয়ত : ইমাম আহমাদের বিশেষত্বের কারণে নির্ভর করা উচিত। কেননা তাঁর প্রসিদ্ধ উক্তি হলো »إِذَا صَحَ الْحَدِيثُ فَهُوَ مَذْهَيْ« “যখন কোনো হাদীস সহীহ বলে প্রমাণিত হবে তখন সেটাই আমার মাযহাব।” আর তাঁর থেকে অন্যান্য যে সব উক্তি বর্ণিত আছে সেগুলো পূর্বে বর্ণিত বিষয়ের সাথে যথেষ্ট সাংঘর্ষিক ও গোলমালে। আর এ বিষয়ে দেখতে পাওয়া যাবে ইনসাফ গ্রন্থের ১ম খণ্ড ৩২৭-৩২৮ পৃ. এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে।
তাতে গোলমাল দেখা গেলেও তার মধ্যে এমন কোনো স্পষ্ট কথা নেই যে, সাধারণভাবে সলাত পরিত্যাগ করলেই কেউ কাফের হয়ে যাবে।
এমতাবস্থায় তাঁর উদ্দেশ্যর দিকে লক্ষ্য করে তাঁর ও স্পষ্টতর বর্ণনার উপর প্রাধান্য দেয়া জরুরী। উক্ত সাধারণ বর্ণনা তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে।
যদিও আমরা মেনে নেই যে, সাধারণভাবে সলাত ত্যাগ করার কারণে কাফের হওয়ার পক্ষে তাঁর থেকে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে তবুও তাঁর অন্যান্য রেওয়ায়েতে সলাত পরিত্যাগকারীকে তার ঈমানের জন্য এমনকি সরিষা দানা পরিমাণ ঈমানের কারণে জাহান্নাম হতে বের করে আনার সহীহ শুদ্ধ স্পষ্ট হাদীসের সাথে মিল থাকার কারণে সেগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক হয়ে গেছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাম্বালী মাযহাবের অনেক মুহাক্কিক উলামা এ বিষয়টিকে স্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ইবনু কুদামা আল-মাকদেসীও রয়েছেন। যার আলোচনা ইবনু আবিল ফারয এর বর্ণনায় গত হয়েছে।
ইবনু কুদামা এর উক্তি হলো :
وَإِنْ تَرَكَ شَيْئًا مِنْ الْعِبَادَاتِ الْخَمْسَةِ تَهَاوُنًا لَمْ يَكْفُرُ»
"যদি কোন ব্যক্তি পাঁচটি ইবাদতের মধ্যে কোনটি অবহেলাবশত ছেড়ে দেয় সে কাফের বলে গণ্য হবে না। তাঁর লেখা আল-মুকুনি' গ্রন্থে এবং আল-মুগনির ২য় খণ্ড ২৯৮-৩০২ পৃষ্ঠায় লম্বা আলোচনা করেছেন। তাতে মতভেদ ও সকল পক্ষের দলীলও উল্লেখ করেছেন। অতঃপর তাঁর আল-মুক্বনি'তে নিম্নে উল্লেখিত উক্তির মাধ্যমে আলোচনা শেষ করেছেন।
وَهُوَ الْحَقُ الَّذِي لَا رَيْبَ فِيْهِ وَعَلَيْهِ مُتَلِفًا الشَّرْحُ الْكَبِيرَ وَ الْإِنْصَافِ" كَمَا تَقَدَّمَ)
সন্দেহাতীতভাবে এটাই সত্য কথা, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আর এ মতের উপর রয়েছেন শারহুল কাবীর ও ইনসাফ গ্রন্থ প্রণেতা, যার বর্ণনা পূর্বে গত হয়েছে।
(প্রিয় পাঠক!) যখন আপনি আহমাদ বিন হাম্বলের কথাকে সঠিক বলে জানবেন, তখন সুবকী ইমাম শাফেয়ীর এর আলোচনায় যা বর্ণনা করেছেন সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করবেন না।
সুবকী তাঁর তাবাকাতুশ শাফিয়ী আল-কুবরার ১ম খণ্ড ২২০ পৃষ্ঠায় বলেছেন : “কথিত আছে, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ইমাম শাফেয়ী এর সাথে সলাত পরিত্যাগকারী সম্পর্কে পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হলেন। ইমাম আহমাদকে ইমাম শাফেয়ী বললেন, হে আহমাদ! আপনি কি বলছেন যে, সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হয়ে যাবে? আহমাদ বললেন, হ্যাঁ। শাফেয়ী বললেন, যদি সে কাফের হয়ে যায় তবে মুসলিম হবে কিভাবে?
আহমাদ বললেন, সে »لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ« বলবে। শাফেয়ী বললেন, সে তো এ কালিমার উপর অটল রয়েছে; সে তো তা ছেড়ে দেয়নি। আহমাদ বললেন, সে মুসলিম হবে যদি সলাত আদায় করে। শাফেয়ী বললেন, কাফিরের সলাত বৈধ নয় এবং এর দ্বারা তাকে মুসলিমও বলা যায় না। ইমাম শাফেয়ীর এমন জবাবে আহমাদ তর্ক বন্ধ করে চুপ হয়ে গেলেন।”
আমি (আলবানী) বলতে চাই, এ ঘটনাকে ইমাম আহমাদের সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে না। এর দু'টি কারণ রয়েছে।
প্রথমত : ঘটনাটি প্রমাণিত নয়। ইমাম সুবকী স্বয়ং তার কথাতেই এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। কেননা, তিনি বলেছেন, (حُ) 'কথিত আছে'। এটা মুনকাতে' বা বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত।
দ্বিতীয়ত : তিনি (সুবকী) এ কথাকে এর উপর ভিত্তি করে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আহমাদ একজন মুসলিমকে শুধু সলাত ত্যাগ করার কারণে কাফের বলেছেন, অথচ এমন কথা তাঁর থেকে প্রমাণিত নয়। যার বর্ণনা পূর্বে গত হয়েছে।
বরং এ বর্ণনাকে কতক ঐসব শায়খের সাথে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে যারা সব সময় বলে থাকেন যে, সলাত পরিত্যাগকারী কাফের। আমি আশা রাখি তারা সেই সহীহ হাদীস অবগত হওয়ার পর এ অভিমত থেকে ফিরে আসবে, যে হাদীসের উপর ভিত্তি করে আমার এই পুস্তিকা লেখা। এবং তারা প্রত্যাবর্তন করবে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল-এর এবং হাম্বালী মাযহাবের বড় বড় ই+মামের অভিমতের দিকে যাঁরা ইমাম সাহেবের অনুরূপ অভিমত পোষণ করে থাকেন।
কেননা, এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী মুসলিমকে তার কোনো আমলের কারণে কাফের বলে ফতোয়া কেবল সে দিতে পারে, যে মনে করে সলাতের দিকে আহ্বান করার পর তা না মানলে হত্যা করা হবে। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত তার পক্ষ হতে আল্লাহ নির্ধারিত শরীয়তের কোনো বিষয় অস্বীকার করা প্রমাণিত না হয়; ততক্ষণ পর্যন্ত তার উপরে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না। যদিও তা কিছু অংশ হোক না কেন।
উপর্যুক্ত আলোচনার পর আমাকে আশ্চর্য করে যা হাফেয ইবনু হাজার আসকালানী তাঁর ফাতহুল বারী'র ১২তম খণ্ডের ৩০০ পৃষ্ঠায় গাযালী হতে বর্ণনা করেছেন। গাযালী বলেন, আমাদের উচিত, যে কোন মূল্যে কাফের সাব্যস্ত করা থেকে বেঁচে থাকা। কেননা, তাওহীদে বিশ্বাসী মুসলিমের রক্তপাত' গর্হিত কাজ। একজন মুসলিমের রক্তপাত করার পাপ থেকে এক হাজার কাফেরকে বেঁচে রাখার পাপ তুচ্ছ।
যেখানে বিষয়টি এরকম সেখানে আমার নিকটে এ খবর এসেছে যে, তাদের কেউ কেউ এ হাদীস অনুযায়ী এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যা কাফেরদের সাথে চিরস্থায়ী জাহান্নামে অবস্থান করা হতে সলাত পরিত্যাগকারী মুসলিমকে রক্ষা পাওয়ার দলীল গ্রহণের ব্যাপারে আপনাকে সন্দেহে নিপতিত করে দেবে। তারা মনে করেন সলাত পরিত্যাগকারীর এমন কোনো হিতাকাঙ্ক্ষী থাকবে না যা তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আনবে।
এ যেন এক আশ্চর্যজনক প্রতিযোগিতা যা আমাদেরকে কট্টর মাযহাবপন্থীদের প্রতিযোগিতাকে স্মরণ করে দেয়। তারা তাদের মাযহাবের সমর্থনে প্রমাণিত সত্যকেও প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। কেননা, হাদীসের বক্তব্য সুস্পষ্ট যে, প্রাথমিক স্তরেই ঐসকল লোকেরা জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবে যাদের চেহারায় (সলাত আদায়ের) এমন চিহ্ন থাকবে যা জাহান্নামের আগুন তা খেয়ে ফেলতে পারবে না। সুতরাং পরবর্তী ধাপগুলোতে যাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কোনো সলাত আদায়কারী থাকবে না।
এমন স্পষ্ট কথাও যদি কতক কঠিন তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণকারীর জন্য কাজে না আসে তাহলে আমাদের পক্ষে এতটুকু ব্যতীত আর কিছুই বলার থাকে না-
سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ»
“তোমাদের প্রতি সালাম, মূর্খদের সাথে আমাদের (বিতর্কের) কোনো প্রয়োজন নেই।”³⁵

📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 সারকথা

📄 সারকথা


পূর্বে বর্ণিত হাদীসটি অর্থাৎ শাফা'আতের হাদীসটি এ বিষয়ের প্রমাণ গ্রহণের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাদীস। এ হাদীসটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, সলাত আদায় করা ফরয এর প্রতি ঈমান থাকা সত্ত্বেও সলাত ত্যাগকরার কারণে মিল্লাত তথা দীন ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে না এবং কাফের ও মুশরিকদের সাথে চিরস্থায়ী জাহান্নামীও হবে না।
সুতরাং আমি একান্তই আশা রাখি যে, এ বইয়ে সন্নিবেশিত হাদীস এবং অনুরূপ অর্থবোধক হাদীসসমূহ সম্পর্কে যারাই অবগত হবেন তারা সলাত পরিত্যাগকারীগণকে সলাতের প্রতি বিশ্বাস এবং এক আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার উপর ঈমান থাকার কারণে তাদেরকে কাফের বলার অভিমত থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন। কেননা, মুসলিমকে কাফের বলা অত্যন্ত গর্হিত ও পাপের কাজ। যা ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
(প্রকৃতপক্ষে) সলাত পরিত্যাগকারীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য এই যে, কুরআনুল কারীম, রাসূলুল্লাহ এর হাদীস এবং সালফে সালেহীনদের থেকে সলাতের মহত্ব ও গুরুত্ব বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে এমন হাদীস দ্বারা তাদেরকে উপদেশ ও দাওয়াত দেয়া। কেননা, দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, আলেমদের হাত থেকে খেলাফত ও রাজত্ব চলে গেছে। সুতরাং তারা একজন সলাত ত্যাগকারীর উপর কাফিরের নির্দেশ জারি করে তাকে হত্যা করার ক্ষমতা রাখেন না। আর সকল সলাত পরিত্যাগকারীর ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া এ বিধান মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতেই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়; সুতরাং অমুসলিম রাষ্ট্রে আরো অসম্ভব নয় কি?
দাওয়াত দেয়ার পরও সলাত পরিত্যাগকারী সলাত আদায় না করলে তাকে হত্যা করা স্পষ্ট হিকমতপূর্ণ। তাহলো সে যদি মু'মিন হয়ে থাকে তাহলে হয়তো দাওয়াত দেয়ার পর তাওবা করে সলাত আদায় করবে। কিন্তু যখন হত্যা করার বিধানকে গ্রহণ করা বে তখন প্রমাণিত হবে যে, সে অস্বীকারবশত সলাত বর্জন করেছে, ফলে সে মারা যাবে। এমতাবস্থায় মারা গেলে সে প্রকৃতপক্ষে কাফের বলে গণ্য হবে যা ইবনু তাইমিয়া হতে পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এ অবস্থায় সলাত অস্বীকার করাটাই প্রমাণ করবে যে, সে দ্বীন থেকে বের হয়ে গেছে। দুঃখজনক হলেও এমন মুহূর্তে তার বিষয়ে এ ফায়সালা দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
এহেন পরিস্থিতিতে উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গি এটাই হওয়া উচিত- 'সলাতের প্রতি বিশ্বাস থাকা অবস্থায় তা বর্জনকারী কাফের হবে না।'
আমরা সহীহ হাদীসসমূহ থেকে যে সব দলীল আদিল্লাহ পেশ করেছি তা একেবারে অকাট্য। সুতরাং এরপর কোনো আপত্তি পেশ করার অবকাশ থাকে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ)
“কাজেই যারা তার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, তাদের উপর পরীক্ষা নেমে আসবে কিংবা তাদের উপর নেমে আসবে ভয়াবহ শাস্তি।”³⁶

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00