📄 আমলগত কুফরের কারণে কোনো মুসলিম ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না
এখন কথা হচ্ছে, সলাত আদায় করা ঈমান সহীহ হওয়ার শর্ত কিনা? আর এটাই হচ্ছে এ মাস'আলার মূল প্রতিপাদ্য ও বিবেচ্য বিষয়।
আমি বলছি, এর পর ইবনুল কায়্যিম সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের সাব্যস্তকারী দলের মতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন: এটা প্রমাণ করে যে, সলাত ব্যতীত বান্দার কোনো প্রকার আমলই কবুল করা হবে না।
অতএব আমি বলতে চাই : আমলগত কুফর ও আকীদাগত কুফর সম্পর্কে ইবনুল কায়্যিম এর বিস্তৃত আলোচনার পর আমার নিকট একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়েছে- তা হচ্ছে, আমলগত কুফরের কারণে কোনো মুসলিম ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না। সুতরাং কুফর সাব্যস্তকারী দলের হাতে প্রচুর দলীল থাকা সত্ত্বেও সলাত পরিত্যাগকারী ব্যক্তি ইসলাম হতে বের হয়ে যাওয়ার হুকুম লাগানো সম্ভব নয়। কেননা, এ সম্পর্কিত যত দলীল রয়েছে তার সবই আমলগত কুফর সম্পর্কিত, আক্বীদা বা বিশ্বাসগত নয়।
এ কারণেই তিনি শেষ পর্যায়ে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, এ ব্যক্তির ঈমান কি কোনো কাজে আসবে? আর ঈমান সহীহ হওয়ার জন্য কি সলাত আদায় শর্ত?
আমি বলতে চাই : যারাই তাঁর জওয়াবের প্রতি লক্ষ্য করবেন বুঝতে পারবেন যে, তিনি এ দিকে ফিরে এসেছেন যে, সলাত ব্যতীত কোনো প্রকার সৎ আমল কবুল হবে না। তবে ঈমান সহীহ হওয়ার জন্য সলাত শর্ত কিনা, এ প্রশ্নের জওয়াব কোথায়?
অর্থাৎ শুধু সলাত ঈমানের পরিপূর্ণতার শর্ত নয়। বরং আহলুস সুন্নাতের মতে সকল সৎ আমল ঈমানের জন্য শর্ত। খাওয়ারিজ ও মু'তাযিলীগণ এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করে থাকে। তাদের মতে কাবীরা গুনাহকারী ব্যক্তি কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
কেউ যদি বলেন যে, ঈমান সহীহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য সলাত আদায় করা শর্ত এবং সলাত পরিত্যাগকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে, তবে তিনি খাওয়ারিজদের কতক কথার সাথে একাত্বতা প্রকাশ করলেন। তাছাড়া এর চেয়েও ক্ষতিকর দিক হচ্ছে, এতে তারা পূর্বোক্ত শাফা'আতের হাদীসের বিরোধীতা করলেন।
হতে পারে ইবনুল কায়্যিম নিরপেক্ষতা অবলম্বনের দ্বারা একদিকে পাঠকদেরকে ইসলামে সলাতের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বোঝাতে চেয়েছেন। অন্যদিকে ঈমান বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য সলাত শর্ত হওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই বোঝাতে চেয়েছেন। কেননা, তার মতে অলসতাবশত সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হবে না। তবে হ্যাঁ, সলাত পরিত্যাগ করার পাশাপাশি এ সম্পর্কে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সে কাফের হয়ে যাবে এবং দীন ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। এ সম্পর্কে আমি ইতোপূর্বে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছি। ইবনুল কায়্যিম এর গ্রন্থের শেষ অনুচ্ছেদের আলোচনায় এ সম্পর্কিত বিষয়ে অবগত হওয়া যায়। তিনি সেখানে বলেছেন-
কেউ কেউ সলাত ত্যাগে অটল থাকার পরও তার কাফের হওয়া সম্পর্কে সন্দেহ রাখা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়। অথচ তাকে রাজন্যবর্গের সামনে সলাতের দিকে আহ্বান জানানো হয় এবং সে লক্ষ্য করে যে, তার মাথার উপর তরবারি ঝুলছে ও তার চক্ষু অশ্রুসজল হয়। আর তাকে বলা হয়, তুমি সলাত আদায় করবে? অন্যথায় তোমাকে হত্যা করা হবে। তখন সে বলে, তোমরা আমাকে হত্যা করে ফেল; আমি কখনও সলাত আদায় করবো না।
আমি (আলবানী) বলছি, সলাত বর্জনে এমন দৃঢ়সংকল্প ব্যক্তি এবং বিচারকের হত্যার হুমকি সত্ত্বেও সলাত আদায়ে অস্বীকারকারীর ক্ষেত্রে সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের সাব্যস্তকারী দলের সকল দলীল-প্রমাণ প্রয়োগ করা প্রযোজ্য। আর বিরোধী পক্ষের দলীল-প্রমাণের সাথে তাদের দলীল-প্রমাণসমূহ একত্রিত করে এ সিদ্ধান্তে আসা উচিত যে, (অস্বীকার ব্যতীত) সলাত পরিত্যাগকারী কাফের নয়। কেননা, এ ধরণের কুফরী হচ্ছে আমলগত। আক্বীদা বা বিশ্বাসগত নয়। এ বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিম থেকে আলোচনা গত হয়েছে। আর শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এমনটিই বলেছেন। অর্থাৎ তিনি কাফের হওয়ার দলীল-প্রমাণসমূহকে এ অর্থেই ব্যবহার করেছেন।
কোনো ওযর ছাড়াই সলাত ত্যাগকারী মুসলিম কিনা এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে মাযমূ' ফাতাওয়ায় (২২/৪৮) জ্ঞানগর্ভ ও লম্বা আলোচনা করেন। তা থেকে আমাদের আলোচিত হাদীসের সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদসহ অধিকাংশ আলেমের মতে, সলাত পরিত্যাগকারী হত্যার যোগ্য- এ অভিমত আলোচনার পর তিনি বলেন "আর যখন সে সলাত বর্জনে অটল থাকে এমন কি তাকে হত্যা করা হলো। তাহলে তাকে কি কাফের মুরতাদ হিসেবে হত্যা করা হলো, নাকি ফাসিক মুসলিম হিসেবে হত্যা করা হলো?
ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণিত দু' অভিমতের একটি হচ্ছে- সে “সলাত আদায় করা ফরয” এটা যদি অন্তরে বিশ্বাস করে এবং জেদ করে সলাত ত্যাগ করে না আবার তা যথাযথ আদায়ও করে না; আদম সন্তানের মধ্যে এমন মানুষের পরিচয় মেলে না এবং এটা তাদের অভ্যাসও নয়। সুতরাং ইসলামে এমন ঘটনা ঘটতে পারে না। আর এরকম কাউকে পাওয়া যাবে না, যে সলাত ফরয হওয়াতে বিশ্বাস করে আর তাকে বলা হয়, যদি সলাত আদায় না করো তাহলে তোমাকে হত্যা করা হবে। অথচ এমতাবস্থায় সলাত ফরযের প্রতি বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তা বর্জনের উপর অটল থাকে- ইসলামে এমন হওয়া অসম্ভব।
যখন কোনো ব্যক্তি সলাত আদায় কথা থেকে বিরত থাকে এমনকি তাকে হত্যা করা হয়- তাহলে বোঝা যাবে যে, সে অন্তরে এর ফরয হওয়ার প্রতি বিশ্বাসী নয় এবং সে তা আদায় করাটাও অবশ্য কর্তব্য বলে মানে না। এমন ব্যক্তি সকল মুসলিমের ঐক্যমতে কাফের। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরামের আসার এবং সহীহ হাদীস রয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ এর বাণী-
لَيْسَ بَيْنَ الْعَبْدِ وَبَيْنَ الْكُفْرِ إِلَّا تَرْكُ الصَّلَاةِ»
“(মুসলিম) বান্দা এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সলাত ত্যাগ করা।”³³
সুতরাং যে ব্যক্তি সলাত বর্জনে অটল থাকে, এমনকি এ অবস্থাতেই মারা যায়; আল্লাহ তা'আলার জন্য একবারও সিজদাহ করে না- সে সলাতকে ফরয বললেও সে কক্ষনো মুসলিম নয়। কেননা, সে ব্যক্তি যদি 'সলাত ফরয' এ কথা বিশ্বাস করত এবং আদায় না করা হলে হত্যা করা হবে এ বিশ্বাসও রাখত তাহলে সলাত আদায়ের জন্য এ বিশ্বাসই যথেষ্ট ছিল। কারণ কোন জিনিসের দিকে আহবান করা হলে আর তা পালন করার সামর্থ থাকলে তা পালন করা আবশ্যক হয়ে যায়।
সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যদি কখনোও তা আদায় না করে তবে বোঝা যাবে তার দাবী অনুযায়ী কাজের মিল নেই। (আর সত্য কথা হলো, শাস্তির পরিপূর্ণ ভয় সলাত পরিত্যাগকারীকে আমলে উৎসাহ দানকারী।)
কিন্তু কখনো এর সাথে এমন কতক বিষয় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় যা তাকে আবশ্যিকভাবে বিলম্বিত করে দেয় এবং সে ঐ বিষয়ের কতক ওয়াজিব আমল ছেড়ে দেয় ও কখনো তা ছুটে যায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সলাত বর্জনে অটল থাকে, একেবারেই সলাত আদায় করে না এবং এ অবস্থায় মারা যায় তাহলে সে মুসলিম থাকে না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের অবস্থা এই যে, তারা কখনো সলাত আদায় করে আবার কখনো ছেড়ে দেয়। তারা সলাতকে ভালভাবে সংরক্ষণ করে না। এসব লোক শাস্তি পাবার যোগ্য। এসব লোকদের সম্পর্কে 'উবাদাহ সূত্রে সুনান গ্রন্থে নাবী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
خَمْسُ صَلَوَاتٍ كَتَبَهُنَّ اللهُ عَلَى الْعِبَادِ فِي الْيَوْمِ وَاللَّيْلَةِ مَنْ حَافَظَ عَلَيْهِنَّ كَانَ لَهُ عَهْدٌ عِنْدَ اللهِ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَمْ يُحَافِظُ عَلَيْهِنَّ لَمْ يَكُنْ لَهُ عَهْدٌ عِنْدَ اللَّهِ إِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ وَإِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ»
"আল্লাহ তা'আলা বান্দার উপর রাত-দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরয করেছেন, যে ব্যক্তি সেগুলোকে সংরক্ষণ করবে তথা যথারীতি আদায় করবে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে এ প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে ব্যক্তি সেগুলো হিফাযত করবেনা; তার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে শাস্তিও দিতে পারেন। আর ইচ্ছা করলে ক্ষমাও করতে পারেন। "³⁴
সলাতের সংরক্ষণকারী বলা হয় তাকে যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্দেশিত সময় মোতাবিক সেগুলোকে আদায় করে। আর যে ব্যক্তি কখনও সেগুলোকে নির্দিষ্ট সময় হতে দেরি করে আদায় করে অথবা কখনও তার ওয়াজিবসমূহকে ছেড়ে দেয় সে ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে এবং তার নফল সলাতসমূহ তার ফরযের ঘাটতি পূরণকারী হবে যা বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ এর উক্তি প্রমাণ করে যা তার পরবর্তী কতক অনুসারীগণের মধ্যে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে, তা হলো কোনো প্রকার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই সলাত পরিত্যাগকারী কাফের।
অন্যদিকে তাঁর উক্তি এ কথার বিপরীত অভিমতকেও প্রমাণ করে যা এই হাদীসের সাথে কোনো বিরোধ করে না। এটা কী করে সম্ভব? অথচ তিনি তাঁর মুসনাদে আয়িশাহ হতে এ মর্মের হাদীস বর্ণনা করেছেন যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে।
তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ তার মাসায়েল গ্রন্থে (৫৫পৃষ্ঠায়) বলেছেন, :
سَأَلْتُ أَبِي - رَحِمَهُ اللهُ - عَنْ تَرْكِ الصَّلَاةِ مُتَعَمِّدًا؟ قَالَ : ... وَالَّذِي يَتْرُكُهَا لَا يُصَلِّيْهَا وَالَّذِي يُصَلِّيْهَا فِي غَيْرِ وَقْتِهَا أَدْعُوهُ ثَلَاثًا فَإِنْ صَلَّى وَإِلَّا ضَرَبْتُ عُنُقَهُ هُوَ عِنْدِي بِمَنْزِلَةِ الْمُرْتَدِ...»
“আমি আমার পিতাকে ইচ্ছাকৃত সলাত পরিত্যাগকারীর বিধান সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ... যে ব্যক্তি তা ছেড়ে দিল আর যে ব্যক্তি তা সঠিক সময়ে আদায় করলো না- তাকে তিনবার দাওয়াত দিব। যদি সে দাওয়াতে সাড়া দেয়, ভাল। নচেৎ আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব। সে আমার কাছে মুরতাদের সমপর্যায়ভুক্ত...।"
আমি (আলবানী) বলছি, 'ইমাম আহমাদ-এর এ উক্তির উদ্দেশ্য এই যে, শুধু শুধু সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হয়ে যাবে না। হ্যাঁ, ব্যাপার এমন হতে পারে যে, সলাত আদায় না করলে তাকে হত্যা করা হবে জেনেও সলাত আদায় করতে অস্বীকার করে। তাহলে সে সলাত আদায় করার চেয়ে নিহত হওয়াকেই প্রাধান্য দেয়। সুতরাং তার এ আচরণ প্রমাণ করে যে, তার সলাত অস্বীকার বিশ্বাসগত কুফরী। ফলে সে হত্যাযোগ্য।
তার বক্তব্যের অনুরূপ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এর ছাত্র কাজী ইবনু মুফলিহ - "المحرر في الفقه الحنبلي" গ্রন্থে ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-
وَمَنْ أَخَرَ صَلَاةٌ تَكَاسُلًا لَا جُحُودًا أُمِرَ بِهَا فَإِنْ أَصَرَّ حَتَّى ضَاقَ وَقْتُ الْأُخْرَى وَجَبَ قَتْلُهُ )
“কাউকে সলাতের আদেশ দেওয়ার পর অস্বীকার করে নয়, বরং অলসতা করে সলাতকে দেরি করে ফেলল, এমতাবস্থায় অন্য সলাতের সময় এসে পড়ল তখন তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
আমি (আলবানী) বলছি, সলাত আদায় করতে দেরি করার কারণে কাফের হবে না; বরং অস্বীকার করে তার উপর অটল থাকলে কাফের হবে।
এ কারণেই ইমাম আবূ জা'ফার ত্বাহাবী তাঁর »مشكل الآثار« গ্রন্থে এ মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি উভয় পক্ষের কিছু দলীল-প্রমাণ উল্লেখ করে কাফের না হওয়ার অভিমতকে প্রাধাণ্য দিয়েছেন (৪/২২৮)। তিনি এ বিষয়ে বলেন, “এ সম্পর্কে কথা এই যে, আমরা তো তাকে সলাত আদায় করার নির্দেশ প্রদান করছি, কোনো কাফেরকে সলাত আদায়ের নির্দেশ দিচ্ছি না। তার মধ্যে কাফের হওয়ার মত কিছু থাকলে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিব। অতঃপর যদি সে মুসলিম হয়ে যায় তখন তাকে সলাত আদায়ের নির্দেশ প্রদান করবো। আর আমাদের কেউ সলাত ছেড়ে দিলে তাকেও সলাত আদায়ের নির্দেশ করবো। কেননা, সে তো সলাত আদায়কারী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। এজন্যই নাবী রামাযান মাসে ইচ্ছাকৃত সিয়াম ভঙ্গকারীকে কাফফারা প্রদানের নির্দেশ করেছেন। আর তাকে সিয়াম তথা রোযা পালনের দ্বারাই কাফ্ফ্ফারা আদায়ের আদেশ করেছেন; (আর বাস্তব সত্য) এই যে, মুসলিম ব্যতীত কারো জন্য সিয়াম নেই।
রামাযানের সিয়াম এবং পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায়ের পূর্বে কোনো ব্যক্তি ইসলাম ধর্মের সাক্ষ্য প্রদান করলে সে মুসলিম হয়; এটাই স্বাভাবিক। আর সেগুলোর অস্বীকার করার দ্বারা সে কাফের হয়ে যায়। এসব ইবাদতের কোনটি অস্বীকার না করে কেবল বর্জন করলেই কাফের হয় না। সে কাফের হবে না এজন্য যে, সে মুসলিম ছিল; আর তার ইসলাম প্রমাণিত হয়েছে ইসলামের স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে আর ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে ইসলামকে অস্বীকার করার মাধ্যমে।
আমি (আলবানী) বলছি, এটি একটি উত্তম ফিকহী মন্তব্য ও শক্তিশালী উক্তি যা খণ্ডন করার নয়। এটা পরিপূর্ণভাবে ঐ কথারই সমর্থক যে, এমনিতেই সলাত বর্জন করার কারণে কাফের হবে না; বরং সলাতের দিকে দাওয়াত দেয়ার পরও যদি অস্বীকার করে তবে কাফের হবে; যা পূর্বে উল্লেখ হয়েছে।
অধিকন্তু, ইমাম আহমাদ এর উক্তি থেকে যা বোঝা যায় সে কথাকে আরো শক্তিশালী করে শাইখ আলাউদ্দীন আল-মারওয়ারদী প্রণীত - "الإنصاف في معرفة الراجح من الخلاف على مذهب الإمام المبجل أحمد بن حنبل" আল-ইনসাফ ফী মা'রিফাতির রাজেহ মিনাল খিলাফ 'আলা মাযহাবিল ইমাম মুবায্যাল আহমাদ বিন হাম্বাল) গ্রন্থে যা বর্ণিত হয়েছে। তিনি তাঁর গ্রন্থে ১ম খণ্ড ৪০২ পৃষ্ঠায় কিছু পূর্বে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল এর উক্তির ব্যাখ্যাকারের অনুরূপ মন্তব্য করেছেন -
«أَدْعُوهُ ثَلَاثًا » : «الدَّاعِيْ لَهُ هُوَ الْإِمَامُ أَوْ نَائِبُهُ فَلَوْ تَرَكَ صَلَوَاتٍ كَثِيرَةً قَبْلَ الدُّعَاءِ لَمْ يَجِبْ قَتْلَهُ وَلَا يَكْفُرُ عَلَى الصَّحِيحِ مِنَ الْمَذْهَبِ وَعَلَيْهِ جَمَاهِيرُ الْأَصْحَابِ وَ قَطَعَ بِهِ كَثِيرٌ مِنْهُمْ»
(আমি তাকে তিনবার সলাত আদায়ের দাওয়াত দিব) : (এখানে দাওয়াত দানকারী হবেন মুসলিম নেতা অথবা তার নায়েব তথা তাঁর প্রতিনিধি। যদি দাওয়াত দেওয়ার পূর্বে অনেক সলাত আদায় না করে থাকে তবুও তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হবে না এবং বিশুদ্ধ মতানুযায়ী সে কাফেরও হবে না। অধিকাংশ সাহাবা আজমাঈন এ মতের পক্ষে এবং তাদের অনেকে এ অভিমতকে অকাট্যভাবে গ্রহণ করেছেন।
আর এ মত গ্রহণ করেছেন আবূ আব্দুল্লাহ বিন বাত্তাহ। শাইখ আবুল ফারয আব্দুর রহমান বিন কুদামাহ আল-মাক্বদেসী তাঁর আশ্-শারহুল কাবীর 'আলাল মুক্বনি'তে (ইমাম মুওয়াফফিক উদ্দীন মাকদেসী প্রণীত মুক্বনি' এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ) [১/৩৮৫] বর্ণনা করেছেন। সেখানে তিনি বৃদ্ধি করে বলেছেন যে, যারা সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের বলেন তাদের কথাকে তিনি অস্বীকার করেছেন।
আবুল ফারয বলেন : (এটা অধিকাংশ ফকীহর অভিমত- যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী' প্রমুখ।)
অতঃপর এর সমর্থনে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন- যার অধিকাংশই ইবনুল কায়্যিম যাওযী থেকে বর্ণিত। এর মধ্যে ইবনু তাইমিয়্যাহ এর বক্তব্য পূর্বে বর্ণিত 'উবাদাহ-এর হাদীস রয়েছে। তিনি বলেন-
«وَلَوْ كَانَ كَافِرًا لَمْ يُدْخِلْهُ فِي الْمَشِيئَةِ
“সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হলে তাকে আল্লাহর ইচ্ছার অন্তর্ভুক্ত করতেন না।"
আমি (আলবানী) বলছি, এ কথাটি আ'য়িশাহ বর্ণিত হাদীসকে এমনভাবে শক্তিশালী করছে যাতে কোনো সন্দেহ থাকে না। অতএব এটা ভুলে যেয়ো না।
অতঃপর আবুল ফারম্ বলেন : “যেহেতু এ বিষয়ে মুসলিমদের ইজমা' রয়েছে, তাই কোনো যুগের বা সময়ের কারো সম্পর্কে জানা নেই যে, সলাত ফরয হওয়া ব্যক্তিকে সলাত ত্যাগ করার কারণে মারা যাবার পর তাকে গোসল দেয়া বা তার জানাযা না পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে এবং তার উত্তরাধিকার সম্পত্তি প্রদানে বাধা দেওয়া হয়েছে, বরং অধিকাংশ সলাত পরিত্যাগ করা সত্ত্বেও এ দু'টি বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। সলাত পরিত্যাগ করার কারণে যদি কাফের হতো তবে তাদের ক্ষেত্রে এ বিধানসমূহ জারি হয়ে যেত।
আমরা মুসলিমদের মাঝে এ বিষয়ে কোনো মতপার্থক্য জানি না যে, সলাত পরিত্যাগকারীর উপর হত্যার ফায়সালা সাব্যস্ত হবে; যদিও মুরতাদের সম্পর্কে মতবিরোধ রয়েছে।
অন্যদিকে পূর্বোক্ত হাদীসসমূহ অর্থাৎ যেসব হাদীস দ্বারা কাফের আখ্যাদানকারীরা দলীল গ্রহণ করেছেন। যেমন-
بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ
“কোন মুসিলম ব্যক্তি ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হলো সলাত পরিত্যাগ করা।” অর্থাৎ সলাত পরিত্যাগ করলে সে কাফের হয়ে যায়।
এ হাদীসে কুফর বলা হয়েছে ধমক স্বরূপ এবং কাফেরদের সাথে (আমলের দিক থেকে) মিল থাকার কারণে; (যেহেতু তারাও সলাত আদায় করে না।) প্রকৃত অর্থে কুফর বলা হয়নি।
যেমন- রাসূলুল্লাহ এর বাণী-
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ»
"মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী কাজ এবং তাকে হত্যা করা কুফরী কর্ম।"
তাছাড়া অনুরূপ যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলোতে ভীতি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কঠোরতা করা হয়েছে।
আমাদের শায়খ (অর্থাৎ মুওয়াফফিক মাকদেসী) বলেন:
«هَذَا أَصْوَبُ الْقَوْلَيْنِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ
“দুটি” অভিমতের মধ্যে এটাই সবচেয়ে সঠিক। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।"
আমি (আলবানী) বলছি, শায়খ সুলায়মান বিন শায়খ আব্দুল্লাহ বিন শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব তাঁর 'মুক্বনি' (১/৯৫-৯৬) গ্রন্থের টীকাতে ইবনু কুদামার মতকে স্বীকৃতি দান করেছেন।
ইমাম শাওকানী তাঁর 'সাইলুল জারার' নামক গ্রন্থের ১ম খণ্ড ২৯২ পৃষ্ঠায় ব্যাখ্যা করেছেন যে, ইচ্ছাকৃত সলাত পরিত্যাগকারী কাফের এবং সে হত্যাযোগ্য। মুসলিমগণের ইমামের কর্তব্য তাকে হত্যা করা। তিনি তাঁর "নাইলুল আওতার” গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, এমন কুফরী উদ্দেশ্য যা ক্ষমাযোগ্য নয়। উলামায়ে কিরামের উদ্ধৃতি ও মতভেদ আলোচনা পেশ করার পর বলেছেন-
“সত্য কথা এই যে, সে কাফের হয়ে গেছে; তাকে হত্যা করতে হবে। কেননা, হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, শরীয়ত প্রণেতা সলাত পরিত্যাগকারীর উপর 'কুফর' শব্দ প্রয়োগ করেছেন। আর কোনো মুসলিম এবং কুফরির বিধান জায়েয সাব্যস্ত করার মাঝে পার্থক্যকারী হিসেবে সলাতকে দাঁড় করেছেন। যখন সলাত পরিত্যাগ করলো তখন তার উপর কুফরীর বিধান আরোপ করা বৈধ হয়ে গেল।
পূর্বযুগের মনীষীদের হতে যে সব মতপার্থক্য বর্ণিত হয়েছে সে দিকে দৃষ্টি দেয়া আমাদের জন্য আবশ্যক নয়। কেননা, আমাদের বক্তব্য হলো : কতক কুফরী কাজ রয়েছে যা মাগফিরাত ও শাফা'আত লাভ হতে বঞ্চিত করতে পারে না। যেমন আহলে কিবলাদের কতক পাপকে কুফর বলেছেন। সুতরাং এ সম্পর্কে আলেম সমাজ যে সব ভুল তা'বীল বা ব্যাখ্যা করেছেন সে সবের প্রতি দৃষ্টিপাতের কোনো প্রয়োজন নেই।”
ইমাম (শাওকানী) ঠিকই বলেছেন, কিন্তু তিনি যে সলাত বর্জনকারীর উপর 'কাফের' শব্দ প্রয়োগ করেছেন তা ব্যাপক এবং আমার নিকট প্রশংসনীয় নয়। কেননা, যে সব হাদীসে কুফরীর ইঙ্গিত করা হয়েছে, সেসব হাদীসে কাফের সাব্যস্ত করা হয়নি। বরং সেখানে শুধু এতটুকু আছে যে, فَقَدْ كَفَرَ 'সে কুফরী করলো।' আমি এ ধরনের ফে'ল বা ক্রিয়া হতে اسم فاعل বা কর্তার তথা কার্য সম্পাদনকারী' শব্দ کافر গ্রহণ করা কারো পক্ষে বৈধ মনে করি না। কেননা, এরূপ করা হলে কুফর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এমন প্রত্যেক প্রকারের ব্যক্তির উপর কাফের শব্দ প্রয়োগ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। যেমন গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে শপথকারী, অন্যায়ভাবে মুসলিমকে হত্যাকারী অথবা রক্তসম্পর্ক অস্বীকারকারী এবং এ ধরনের আরো যে সব অপরাধীর কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
হ্যাঁ, আবূ ইয়া'লা তাঁর গ্রন্থে ২৩৪৯ নং হাদীসে বর্ণনা করেছেন এবং অন্যান্যরা আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস হতে মারফু' সনদে বর্ণনা করেছেন যে,
عَرَى الْإِسْلَام وَقَوَاعِدُ الدِّينِ ثَلَاثَةٌ عَلَيْهِنَّ أُسِّسَ الْإِسْلَامُ مَنْ تَرَكَ مِنْهُنَّ وَاحِدَةٌ فَهُوَ بِهَا كَافِرٌ حَلَالُ الدَّمِ : شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَالصَّلَاةُ الْمَكْتُوْبَةُ وَصَوْمُ رَمَضَانَ
অর্থাৎ “ইসলামের মূল স্তম্ভ ও দীনের মৌলিক নীতি হলো তিনটি- তার উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি এগুলোর কোন একটি পরিত্যাগ করবে সে কাফের, তার রক্তপাত বৈধ :
১) شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ- আল্লাহ ব্যতীত (সত্য) কোন মা'বুদ নেই” এ কথার সাক্ষ্য দেয়া।
২) الصَّلَاةُ الْمَكْتُوْبَةُ - ফরয সলাত আদায় করা।
৩) صَوْمُ رَمَضَانَ - রামাযান মাসের সিয়াম পালন।
আমি (আলবানী) বলছি যে, যদি এ হাদীসটি সহীহ হতো তাহলে তা সলাত ত্যাগকারী কাফের হওয়ার পক্ষে স্পষ্ট দলীল সাব্যস্ত হতো। কিন্তু তাদের বর্ণিত হাদীসটি সহীহ নয়। এ সম্পর্কে আমি “সিলসিলাহ যঈ'ফার ৯৪ নং এ বর্ণনা দিয়েছি।
সারকথা : শুধু সলাত পরিত্যাগ করা কোনো মুসলিম ব্যক্তি কাফের হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। তবে অবশ্যই সে ফাসিক এবং তার বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে; তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন, ইচ্ছা করলে ক্ষমাও করতে পারেন। অত্র বইয়ের মূলভিত্তি যে হাদীসটি সেই হাদীসটি এ বিষয়ের একটি স্পষ্ট প্রমাণ যা অস্বীকার করার কারো জন্য সুযোগ নেই।
অপরপক্ষে যে ব্যক্তিকে সলাতের দিকে আহ্বান করা হল ও তা আদায় না করলে হত্যা করার ভয় দেখানোও হল, তারপরেও সে ব্যক্তি যদি আহবানে সাড়া না দিয়ে সলাত আদায় না করে; ফলে তাকে হত্যা করা হয় তবে দৃঢ়তার সাথে বলা যায় সে ব্যক্তি কাফের, তার রক্তপাত হালাল ও বৈধ; তার জানাযা পড়া হবে না এবং তাকে মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা হবে না।
সুতরাং যে ব্যক্তি বিস্তারিত না জেনে সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের হওয়ার ফায়সালা দিবে সে ভুল করবে; যে ব্যক্তি কাফের না হওয়ার ফায়সালা দিবে সেও ভুল করবে। সঠিক কথা এই যে, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ রয়েছে। আর এটা এমন সত্য বিষয় যে সম্পর্কে কোনো গোপনিয়তা নেই। সুতরাং এ বিষয়কে নিয়তের উপর ছেড়ে দিতে হবে।
টিকাঃ
৩৩. সুনান ইবনু মাজাহ হা. ১০৮০, সুনান নাসায়ী হা. ৪৬৪
৩৪. সুনান ইবনু মাজাহ, নাসায়ী, হাদীস সহীহ
📄 একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা
অতঃপর আমার বক্তব্য এই যে, আমার আশংকা হয়, কতক অজ্ঞ কট্টরপন্থী ব্যক্তিরা উক্ত সহীহ হাদীস (তথা শাফায়াতের বড় হাদীসটি) যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ- সলাত আদায় করা ফরয এ বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও অলসতাবশত সলাত ত্যাগকারী আল্লাহর তা'আলার বাণী- )وَيَغْفِرُ دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ﴿ আর এ (শিরক) ব্যতীত যে কোনো গুনাহ আল্লাহ ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন) এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করবে। যেমন ১৪০৭ হিজরীর শেষাংশে কতক ব্যক্তি তা করেছিল।
(এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই) তা হলো- দু'জন ছাত্র একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা করত- তাদের একজন হল সৌদিয়ান অন্যজন মিসরী। তারা উভয়ে (সিলসিলাহ আহাদিস আস সহীহার) শুরু অংশের একশটি হাদীসের ব্যাপারে আমার পেছনে লেগে গেল। তার মধ্যে একটি হলো- হুযাইফাহ বিন ইয়ামান এর হাদীস (সিলসিলাহ : ৮৭ নং) যার শব্দ নিম্নরূপ-
يَدْرُسُ الْإِسْلَامُ كَمَا يَدْرُسُ وَشِيَ القَوْبِ حَتَّى لَا يَدْرِي مَا صِيَامٌ وَلَا صَلَاةٌ وَلَا نُسُكْ وَلَا صَدَقَةٌ وَلَيُسْرَى عَلَى كِتَابِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فِي لَيْلَةٍ فَلَا يَبْقِي فِي الْأَرْضِ مِنْهُ آيَةٌ وَ تَبْقِي طَوَائِفٌ مِنْ النَّاسِ : الشَّيْخُ الْكَبِيرُ وَ الْعَجُوْزُ ، يَقُوْلُوْنَ : أَدْرَكْنَا آبَاءَنَا عَلَى هَذِهِ الْكَلِمَةِ : " لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ فَنَحْنُ نَقُوْلُهَا".
ইসলাম পুরাতন হয়ে যাবে, যেমন কাপড়ের উপরের কারুকার্য পুরাতন হয়ে যায়। শেষে এমন অবস্থা হবে যে কেউ জানবেনা-সিয়াম (রোজা) কী, সলাত (নামায) কী, কুরবানী কী, যাকাত কী? একরাতে পৃথিবী থেকে মহান আল্লাহর কিতাব বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং একটি আয়াতও অবশিষ্ট থাকবে না। মানুষের (মুসলমানদের) কতক দল অবশিষ্ট থাকবে। তাদের বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা বলবে, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমার উপর পেয়েছি। সুতরাং আমরাও সেই বাক্য বলতে থাকবো।
সিলাহ বিন যুফার হুযায়ফা কে বললেন, "لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ« কালিমা তাদের কি কাজে আসবে? যেহেতু তারা জানবে না- সলাত, সিয়াম, কুরবানী এবং সাদাকা কী জিনিস?
এ কথা শুনে হুযায়ফা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সিলাহ বিন যুফার এ কথাটি তার সামনে তিনবার উপস্থাপন করলেন, আর তিনি প্রত্যেকবারই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তৃতীয়বারের পর হুযায়ফাহ তার দিক অগ্রসর হয়ে বললেন : হে সিলাহ! যাও তুমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর। (তিনবার)
আমি (আলবানী ঐ দু'জন ছাত্রকে) বললাম, আমি যে এ হাদীসটি সহীহ বলে অভিহিত করেছি তার প্রতিবাদে তোমরা দু'জনে মিলে এ হাদীস দুর্বল হওয়ার পক্ষে তিন পৃষ্ঠার একটি খসড়া প্রস্তুত করে নিয়ে আস। কিন্তু তারা দু'জনে এ হাদীস দুর্বল প্রমাণ করার মতো কিছুই পেল না। তবে, তারা যা পেল তা এই যে, উক্ত হাদীসটি আবূ মু'আবিয়াহ মুহাম্মাদ বিন হাযিম যারীর থেকে বর্ণিত। তিনি একজন মুরজিয়া মতবাদে বিশ্বাসী, অর্থাৎ আমল না করে জান্নাত পাওয়ার আশায় বিশ্বাসী। আর এ হাদীসটি মুরজিয়াদের বিদ'আতীমূলক কাজের পক্ষাবলম্বন করছে।
তাদের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ মূর্খতার পরিচয়। এখানে বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন নেই। শুধু এতটুকু বলতে চাই, আবূ মু'আবিয়াহ তথা নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী রাবী এবং ইমাম বুখারী ও মুসলিমের মতে তার বর্ণিত হাদীস দিয়ে দলীল গ্রহণ করা যাবে। কেননা, তিনি তাঁর মতো শক্তিশালী রাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি মুরজিয়া মতবাদের সাথে কোনোভাবেই সম্পর্ক রাখে না।
তারা দু'জনে এ দাবি করেছে তাদের অজ্ঞতার কারণে। তাদের এ দাবি কী করে সঠিক হতে পারে? অথচ ইমাম হাকিম ও ইমাম যাহাবী এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। অনুরূপ ইমাম ইবনু তাইমিয়া, ইবনু হাজার আসকালানী এবং বুসীরীও সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন।
তাদের দু'জনের জ্ঞানে যদি এটা ধরে যে, ঐ সকল আলেম এ হাদীসকে সহীহ বলার ক্ষেত্রে ভুল করেছেন, তাহলে তাদের দু'জনের নিকট এমন জ্ঞানের সমাবেশ ঘটেনি যাতে তারা উভয়ে বিশ্বাস করবে যে তাঁরা সকলে এমন হাদীসকে সহীহ বলে অভিহিত করেছেন যা মুরজিয়া মতবাদকে শক্তিশালী করছে?
আল্লাহর শপথ! তারা এমন বড় মাপের আলেমের জ্ঞানের সাথে পাল্লা দিচ্ছে এবং তাদের কর্তৃক সহীহ হাদীসকে যঈফ বলছে এমন ব্যক্তি যার নিকট ঐসব লোকদের মতো ভাল বিদ্যা নেই।
উক্ত সহীহ হাদীস থেকে এ উপকার পাওয়া যায় যে, কতক মানুষ অজ্ঞতার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। তাদের অবস্থা এই হবে যে, তারা কালিমার সাক্ষ্যদান ব্যতীত ইসলামের কোনো জ্ঞান রাখবে না। বিষয়টি এমন নয় যে, তারা সলাতের ওয়াজিবসমূহ এবং অন্যান্য আরকান সম্পর্কে জ্ঞান রাখবে অথচ সে অনুযায়ী আমল করবে না। কক্ষনো নয়; উক্ত হাদীসে এ জাতীয় কোনো বিষয়ই নেই। বরং তাদের অবস্থা হলো মরুবাসী বেদুঈন এবং কুফর রাষ্ট্রে নওমুসলিমের মতো যারা শাহাদাতাইন তথা দু' কালেমা ছাড়া আর কিছুই জানে না।
এরকম ঘটনা কোনো এক শহরে ঘটেছিল। ফলে একজন আমাকে এক মহিলা সম্পর্কে ফোন করে জানতে চাইলো যে, জনৈক মহিলা বিবাহ করেছে অথচ সহবাসের পর ফরয গোসল করা ছাড়াই সে সলাত আদায় করতো। এর কিছুদিন পর এক মসজিদের ইমাম জিজ্ঞাসা করলেন যে, সে মনে করে যে, তার নিকট এমন কতক বিষয় জানা আছে যা আলেমদের সাথে সাংঘর্ষিক। সে তার পুত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করলো, সে জুনুবী তথা স্বপ্নদোষ হওয়ার পর নাপাক অবস্থায় সলাত আদায় করে। কেননা, সে নাপাকীর গোসলের ওয়াজিবসমূহ সম্পর্কে অজ্ঞ।
📄 ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ-এর অভিমত
ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ তাঁর মাজমূ' ফাতাওয়ার ২২ খণ্ড ৪১ পৃষ্ঠায় বলেছেন : “যে ব্যক্তি জানতে পারল যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ; অতঃপর তাঁর প্রতি ঈমান আনল অথচ মুহামম্মাদ- যে শারী‘আত নিয়ে এসেছেন তার অধিকাংশ বিধানই সে অবগত নয়। তাহলে তার কাছে যে বিধানের জ্ঞান পৌঁছেনি সে বিধান না পালন করার জন্য তাকে আল্লাহ তা'আলা শাস্তি দিবেন না। আল্লাহ তা'আলা কারো প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর ঈমান পরিত্যাগ করার কারণেই যদি শাস্তি না দেন তবে এ কতক পালন না করার কারণে শাস্তি দিবেন না। এটা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত এবং উত্তম কথা। আর রাসূলুল্লাহ এর সুন্নাতে এরূপ অনেক দৃষ্টান্ত বিদ্যমান.....।
অতঃপর ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ একটি অত্যন্ত সুন্দর উদাহরণ পেশ করেছেন। তা এই যে, একজন মুসতাহাযাহ (যে মহিলার হায়েয শুরু হয়ে আর বন্ধ হয় না, বরং তা চলতেই থাকে) মহিলা রাসূলুল্লাহ-কে বললেন, আমার খুব কঠিন ও প্রচুর হায়েয হয়ে থাকে যা আমাকে সলাত ও সিয়াম হতে বিরত রাখে। [রাসূলুল্লাহ তার এ কথা শ্রবণ করে] উক্ত মহিলাকে ইস্তিহাযার রক্ত চলাকালে সলাত আদায় করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু যে সব সলাত আদায় করা হয়নি তা আর কাযা করার নির্দেশ দিলেন না।
আমি (আলবানী) বলছি : উক্ত মহিলা হলেন ফাতিমা বিনতে আবী হুবাইশ। বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য কিতাবে তার হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। আর সহীহ আবু দাউদের ২৮১ নং এ উল্লিখিত হয়েছে।
অনুরূপ আরেকজন মহিলা ছিলেন। তিনি হলেন উম্মু হাবীবাহ বিনতে জাহশ। তিনি আব্দুর রহমান বিন আওফ এর স্ত্রী। তার হায়েয একটানা সাত বছর পর্যন্ত চালু ছিল। এ হাদীসটিও ইমাম বুখারী, মুসলিম বর্ণনা করেছেন। আর সহীহ আবু দাউদের ২৮৩ নং এ আলোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয় মহিলা হলেন হামনা বিনতে জাহশ । ইবনু তাইমিয়া এঁর প্রতিই ইশারা করেছেন। কেননা, তাঁর হাদীসে রয়েছে,
إِنِّي أَسْتَحَاضُ حَيْضَةً شَدِيدَةً تَمْنَعُنِي الصَّلَاةَ وَالصَّوْمَ؟ فَأَمَرَهَا بِالصَّلَاةِ زَمَنَ دَمِ الْإِسْتِحَاضَةِ وَلَمْ يَأْمُرْهَا بِالْقَضَاءِ»
“আমার কঠিন ও অত্যন্ত বেশি হায়েয হয়। তা আমাকে সলাত ও সওম হতে বিরত রাখে। ফলে [রাসূলুল্লাহ তাকে সলাত আদায় করে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন। (রাসূলুল্লাহ উক্ত রক্তকে ইস্তিহাযা (যা এক প্রকার রোগ বিশেষ) মনে করলেন।) তাই তাকে ইস্তিহাযা চলাকালীন সময়ে ছুটে যাওয়া সলাতকে কাযা করে আদায় আদেশ করলেন না।
📄 আহমাদ বিন হাম্বালের অভিমত
আহমাদ বিন হাম্বালের হতেও একটি উক্তি রয়েছে যা পূর্বে বর্ণিত বিষয়সমূহের সাথে খুব ভাল সম্পর্ক রয়েছে এবং পূর্বের ঐ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, সাধারণভাবে সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হয় না।
আব্দুল্লাহ বিন ইমাম আহমাদ তাঁর মাসায়েল গ্রন্থের ৫৬ ও ১৯৫ পৃষ্ঠায় বলেছেন : “আমি আমার পিতাকে দু'মাস যাবৎ সলাত ত্যাগকারী এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, সে বর্তমানে উক্ত দু'মাসের সলাতসমূহ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে আদায় করে নিবে। ঐ ওয়াক্তের শেষ পর্যন্ত সেই ওয়াক্তের নির্ধারিত সলাত আদায় করবে যেগুলো সে ছেড়ে দিয়েছে। জীবনে ২য় বার আর এমন করবে না। অতঃপর পরের ওয়াক্তের ছুটে যাওয়া সলাত আদায় করবে।
তবে যদি ছুটে যাওয়া সলাতের পরিমাণ বেশি হয় এবং সে জীবিকা অন্বেষণে ব্যস্ত থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করতে না পারে। তাহলে সেই সলাত পুনরায় আদায় করবে যেমন সলাতরত অবস্থায় কোনো কিছু ছুটে যাওয়ার কথা স্মরণ হলে তা পরে আদায় করা হয়।
প্রিয় পাঠক! আপনি ইমাম আহমাদ এর বক্তব্য শ্রবণ করলেন যা পূর্বের কথা প্রমাণ করে যে, সাধারণভাবে সলাত বর্জন করলে একজন মুসলিম ইসলাম থেকে খারিজ বা বের হয়ে যায় না বরং একাধারে দু'মাস সলাত আদায় না করলেও নয়। বরং যে ব্যক্তি জীবিকা অন্বেষণে ব্যস্ত থাকে তার জন্য পূর্বের কাযা সলাতসমূহকে পরে আদায় করে নেয়ার অনুমতি দিলেন। তার এ উক্তি থেকে আমার কাছে দু'টি বিষয় প্রমাণিত হয় :
প্রথমত : পূর্বে যা বলেছেন সে কথাই অর্থাৎ সে ইসলামের উপরই থাকবে। যদিও সে ছুটে যাওয়া সকল সলাত আদায় করে দায়িত্বমুক্ত না হয়।
দ্বিতীয়ত : কাযা সলাতের হুকুমটি নির্ধারিত ওয়াক্ত বা সময়মত সলাত আদায়ের হুকুমের মত নয়। কেননা, আমি বিশ্বাস করি না যে, জীবিকা উপার্জনের তাকিদে কেবল ইমাম আহমাদ কেন বরং তার চেয়ে আরো নিম্নস্তরের বিদ্বানও নির্দিষ্ট সময় আদায় না করে পরে কাযা করে নেয়ার অনুমতি দিবেন। কেননা, নির্ধারিত ওয়াক্তে সলাত আদায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া আ'আলা অধিক জ্ঞাত।
মুসলিম ভ্রাতৃমণ্ডলী! জেনে রাখুন, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল এর উক্ত বর্ণনা এবং এ সম্পর্কে আরো যে সব রেওয়ায়েত পাওয়া যায় সেগুলোর উপর প্রত্যেক মুসলিমকে প্রথমত : নিজের এবং দ্বিতীয়ত : ইমাম আহমাদের বিশেষত্বের কারণে নির্ভর করা উচিত। কেননা তাঁর প্রসিদ্ধ উক্তি হলো »إِذَا صَحَ الْحَدِيثُ فَهُوَ مَذْهَيْ« “যখন কোনো হাদীস সহীহ বলে প্রমাণিত হবে তখন সেটাই আমার মাযহাব।” আর তাঁর থেকে অন্যান্য যে সব উক্তি বর্ণিত আছে সেগুলো পূর্বে বর্ণিত বিষয়ের সাথে যথেষ্ট সাংঘর্ষিক ও গোলমালে। আর এ বিষয়ে দেখতে পাওয়া যাবে ইনসাফ গ্রন্থের ১ম খণ্ড ৩২৭-৩২৮ পৃ. এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে।
তাতে গোলমাল দেখা গেলেও তার মধ্যে এমন কোনো স্পষ্ট কথা নেই যে, সাধারণভাবে সলাত পরিত্যাগ করলেই কেউ কাফের হয়ে যাবে।
এমতাবস্থায় তাঁর উদ্দেশ্যর দিকে লক্ষ্য করে তাঁর ও স্পষ্টতর বর্ণনার উপর প্রাধান্য দেয়া জরুরী। উক্ত সাধারণ বর্ণনা তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে।
যদিও আমরা মেনে নেই যে, সাধারণভাবে সলাত ত্যাগ করার কারণে কাফের হওয়ার পক্ষে তাঁর থেকে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে তবুও তাঁর অন্যান্য রেওয়ায়েতে সলাত পরিত্যাগকারীকে তার ঈমানের জন্য এমনকি সরিষা দানা পরিমাণ ঈমানের কারণে জাহান্নাম হতে বের করে আনার সহীহ শুদ্ধ স্পষ্ট হাদীসের সাথে মিল থাকার কারণে সেগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক হয়ে গেছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাম্বালী মাযহাবের অনেক মুহাক্কিক উলামা এ বিষয়টিকে স্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ইবনু কুদামা আল-মাকদেসীও রয়েছেন। যার আলোচনা ইবনু আবিল ফারয এর বর্ণনায় গত হয়েছে।
ইবনু কুদামা এর উক্তি হলো :
وَإِنْ تَرَكَ شَيْئًا مِنْ الْعِبَادَاتِ الْخَمْسَةِ تَهَاوُنًا لَمْ يَكْفُرُ»
"যদি কোন ব্যক্তি পাঁচটি ইবাদতের মধ্যে কোনটি অবহেলাবশত ছেড়ে দেয় সে কাফের বলে গণ্য হবে না। তাঁর লেখা আল-মুকুনি' গ্রন্থে এবং আল-মুগনির ২য় খণ্ড ২৯৮-৩০২ পৃষ্ঠায় লম্বা আলোচনা করেছেন। তাতে মতভেদ ও সকল পক্ষের দলীলও উল্লেখ করেছেন। অতঃপর তাঁর আল-মুক্বনি'তে নিম্নে উল্লেখিত উক্তির মাধ্যমে আলোচনা শেষ করেছেন।
وَهُوَ الْحَقُ الَّذِي لَا رَيْبَ فِيْهِ وَعَلَيْهِ مُتَلِفًا الشَّرْحُ الْكَبِيرَ وَ الْإِنْصَافِ" كَمَا تَقَدَّمَ)
সন্দেহাতীতভাবে এটাই সত্য কথা, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আর এ মতের উপর রয়েছেন শারহুল কাবীর ও ইনসাফ গ্রন্থ প্রণেতা, যার বর্ণনা পূর্বে গত হয়েছে।
(প্রিয় পাঠক!) যখন আপনি আহমাদ বিন হাম্বলের কথাকে সঠিক বলে জানবেন, তখন সুবকী ইমাম শাফেয়ীর এর আলোচনায় যা বর্ণনা করেছেন সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করবেন না।
সুবকী তাঁর তাবাকাতুশ শাফিয়ী আল-কুবরার ১ম খণ্ড ২২০ পৃষ্ঠায় বলেছেন : “কথিত আছে, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ইমাম শাফেয়ী এর সাথে সলাত পরিত্যাগকারী সম্পর্কে পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হলেন। ইমাম আহমাদকে ইমাম শাফেয়ী বললেন, হে আহমাদ! আপনি কি বলছেন যে, সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হয়ে যাবে? আহমাদ বললেন, হ্যাঁ। শাফেয়ী বললেন, যদি সে কাফের হয়ে যায় তবে মুসলিম হবে কিভাবে?
আহমাদ বললেন, সে »لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ« বলবে। শাফেয়ী বললেন, সে তো এ কালিমার উপর অটল রয়েছে; সে তো তা ছেড়ে দেয়নি। আহমাদ বললেন, সে মুসলিম হবে যদি সলাত আদায় করে। শাফেয়ী বললেন, কাফিরের সলাত বৈধ নয় এবং এর দ্বারা তাকে মুসলিমও বলা যায় না। ইমাম শাফেয়ীর এমন জবাবে আহমাদ তর্ক বন্ধ করে চুপ হয়ে গেলেন।”
আমি (আলবানী) বলতে চাই, এ ঘটনাকে ইমাম আহমাদের সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে না। এর দু'টি কারণ রয়েছে।
প্রথমত : ঘটনাটি প্রমাণিত নয়। ইমাম সুবকী স্বয়ং তার কথাতেই এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। কেননা, তিনি বলেছেন, (حُ) 'কথিত আছে'। এটা মুনকাতে' বা বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত।
দ্বিতীয়ত : তিনি (সুবকী) এ কথাকে এর উপর ভিত্তি করে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আহমাদ একজন মুসলিমকে শুধু সলাত ত্যাগ করার কারণে কাফের বলেছেন, অথচ এমন কথা তাঁর থেকে প্রমাণিত নয়। যার বর্ণনা পূর্বে গত হয়েছে।
বরং এ বর্ণনাকে কতক ঐসব শায়খের সাথে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে যারা সব সময় বলে থাকেন যে, সলাত পরিত্যাগকারী কাফের। আমি আশা রাখি তারা সেই সহীহ হাদীস অবগত হওয়ার পর এ অভিমত থেকে ফিরে আসবে, যে হাদীসের উপর ভিত্তি করে আমার এই পুস্তিকা লেখা। এবং তারা প্রত্যাবর্তন করবে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল-এর এবং হাম্বালী মাযহাবের বড় বড় ই+মামের অভিমতের দিকে যাঁরা ইমাম সাহেবের অনুরূপ অভিমত পোষণ করে থাকেন।
কেননা, এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী মুসলিমকে তার কোনো আমলের কারণে কাফের বলে ফতোয়া কেবল সে দিতে পারে, যে মনে করে সলাতের দিকে আহ্বান করার পর তা না মানলে হত্যা করা হবে। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত তার পক্ষ হতে আল্লাহ নির্ধারিত শরীয়তের কোনো বিষয় অস্বীকার করা প্রমাণিত না হয়; ততক্ষণ পর্যন্ত তার উপরে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না। যদিও তা কিছু অংশ হোক না কেন।
উপর্যুক্ত আলোচনার পর আমাকে আশ্চর্য করে যা হাফেয ইবনু হাজার আসকালানী তাঁর ফাতহুল বারী'র ১২তম খণ্ডের ৩০০ পৃষ্ঠায় গাযালী হতে বর্ণনা করেছেন। গাযালী বলেন, আমাদের উচিত, যে কোন মূল্যে কাফের সাব্যস্ত করা থেকে বেঁচে থাকা। কেননা, তাওহীদে বিশ্বাসী মুসলিমের রক্তপাত' গর্হিত কাজ। একজন মুসলিমের রক্তপাত করার পাপ থেকে এক হাজার কাফেরকে বেঁচে রাখার পাপ তুচ্ছ।
যেখানে বিষয়টি এরকম সেখানে আমার নিকটে এ খবর এসেছে যে, তাদের কেউ কেউ এ হাদীস অনুযায়ী এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যা কাফেরদের সাথে চিরস্থায়ী জাহান্নামে অবস্থান করা হতে সলাত পরিত্যাগকারী মুসলিমকে রক্ষা পাওয়ার দলীল গ্রহণের ব্যাপারে আপনাকে সন্দেহে নিপতিত করে দেবে। তারা মনে করেন সলাত পরিত্যাগকারীর এমন কোনো হিতাকাঙ্ক্ষী থাকবে না যা তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আনবে।
এ যেন এক আশ্চর্যজনক প্রতিযোগিতা যা আমাদেরকে কট্টর মাযহাবপন্থীদের প্রতিযোগিতাকে স্মরণ করে দেয়। তারা তাদের মাযহাবের সমর্থনে প্রমাণিত সত্যকেও প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। কেননা, হাদীসের বক্তব্য সুস্পষ্ট যে, প্রাথমিক স্তরেই ঐসকল লোকেরা জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবে যাদের চেহারায় (সলাত আদায়ের) এমন চিহ্ন থাকবে যা জাহান্নামের আগুন তা খেয়ে ফেলতে পারবে না। সুতরাং পরবর্তী ধাপগুলোতে যাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কোনো সলাত আদায়কারী থাকবে না।
এমন স্পষ্ট কথাও যদি কতক কঠিন তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণকারীর জন্য কাজে না আসে তাহলে আমাদের পক্ষে এতটুকু ব্যতীত আর কিছুই বলার থাকে না-
سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ»
“তোমাদের প্রতি সালাম, মূর্খদের সাথে আমাদের (বিতর্কের) কোনো প্রয়োজন নেই।”³⁵