📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 কতক আলিমের সন্দেহ

📄 কতক আলিমের সন্দেহ


কতিপয় আলেম সন্দেহ পোষণ করেছেন »لا خير« (সৎ আমল ব্যতীত) শব্দটি নিয়ে। তাদের মতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক কতিপয় আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইবনু হাজার ফাতহুল বারী গ্রন্থে (১৩/৪৩৯) বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এমন কতিপয় লোক যারা কালিমা শাহাদাতাইন এর বেশি কিছু স্বীকৃতি প্রদান করেনি। যা হাদীসটির বাকি অংশ থেকে বুঝা যায়।
আমি (আলবানী) বলছি: আনাস হতে শাফা'আতের ব্যাপারেও দীর্ঘ হাদীস রয়েছে। সেখানে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহকে বলা হবে- হে মুহাম্মাদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে। তুমি চাও, তোমাকে দেয়া হবে এবং সুপারিশ কর তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।
তখন রাসূলুল্লাহ বলবেন, হে আমার রব! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দিন ঐ সমস্ত লোকদের ব্যাপারে যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমা বলেছে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন: আমার ইজ্জতের কসম, আমার মহত্ব, আমার বড়ত্ব এবং আমার সম্মানের কসম, অবশ্যই আমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করব যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" কালিমা বলেছে।²³
আনাস হতে অন্য সূত্রে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলা মানুষের হিসাব নিকাশ শেষ করবেন এবং আমার উম্মতের অবশিষ্ট লোকদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাবেন। এরপর জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে যাওয়া তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে বলবে, তোমাদের আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার সাথে শরীক না করা কোন্ কাজে আসল? এরপর মহান আল্লাহ বলবেন, আমার ইজ্জতের কসম, অবশ্যই আমি তোমাদেরকে (তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে) জাহান্নাম থেকে মুক্ত করব। এরপর তাদের নিকট (দূত) পাঠানো হবে এবং তারা পুড়ে যাওয়া অবস্থায় জাহান্নাম থেকে বের হবে। অতঃপর তাদেরকে হায়াতের নহরে প্রবেশ করানো হবে এবং সেখান থেকে নতুন করে গজিয়ে উঠবে... ইমাম আহমাদ এবং অন্যান্যগণ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। আলবানী 'যিলাল' গ্রন্থে (৮৪৩-৮৪৫ নং) হাদীসের অধীনে উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে সমর্থক হাদীস রয়েছে। অনুরূপ ফাতহুল বারীতে (১১/৪৫৫) আলাদাভাবে সমর্থক হাদীস রয়েছে। আর হাদীসটির মধ্যে ইবনু আবী হামজার ইজতেহাদ এই মাস'আলার উপর যেটি বের হয়েছিল তা রাসূলুল্লাহর কথা দ্বারা প্রতিহত হয়েছে। সেখানে রয়েছে “মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত হবেনা”। অনুরূপ হাদীস পরবর্তীতে এসেছে যে- কেবল চেহারা ব্যতীত। তারা সবাই মুসলিম, তবে সলাত আদায় করেনি। কিন্তু তারা সেখান (জাহান্নাম) হতে বের হবে না, যেহেতু তাদের সাথে সৎ আমলের কোনো আলামতই নেই।
এজন্য হাফেজ ইবনু হাজার (১১/৪৫৭) তার কথার অনুসরণ করেছেন। তবে তিনি আম (সাধারণভাবে) এ কথা প্রয়োগ করেছেন। আর সেটি হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঞ্জলী দিয়ে জাহান্নামীদের বের করবেন। কেননা, হাদীসে এসেছে- তারা কখনই সৎ আমল করেনি। আর এটি আবূ সাঈদ এর হাদীসে উল্লেখ রয়েছে যা 'তাওহীদে”র আলোচনায় আসছে। অর্থাৎ তিনি এই হাদীসকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আর হাফেজ ইবনু হাজার হয়তোবা ভুলে গেছেন কেননা, হাদীসটিতে তিনি নিজেই অন্য দিক দিয়ে ইবনু আবী হামজাকে অনুসরণ করেছেন। সেটি হল- যখন আল্লাহ তা'আলা প্রথম বার মু'মিনদের সুপারিশ কবুল করবেন তাদের সাথে সলাত, সওম ইত্যাদি আদায়কারী ব্যক্তিদের ব্যাপারে এবং তারা জাহান্নাম থেকে তাদের মুসলিম ভাইদের বের করে আনবেন চিহ্ন দেখে। সুতরাং যখন তারা পরবর্তীতে কয়েকবার সুপারিশ করবে এবং বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে, তখন তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে সলাত আদায় করেছিল এমন ব্যক্তি থাকবেনা। কেবল তাদের মধ্যে কল্যাণ বিদ্যমান থাকবে তাদের ঈমান অনুপাতে এবং এটিই হচ্ছে সুস্পষ্ট বিষয় যা কারো অজানা নয়। ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
২৩. মুত্তাফাকুন আলাইহ, আলবানী "যিলালুল জান্নাহ" কিতাবে (২/২৯৬) উল্লেখ করেছেন।

📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 গবেষণা ও পর্যালোচনা

📄 গবেষণা ও পর্যালোচনা


উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রতীয়মান হয় প্রাগুক্ত হাদীসটি এ ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ করে যে, যখন সলাত বর্জনকারী ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমার উপর সাক্ষ্য অবস্থায় মুসলিম হিসেবে ইন্তেকাল করলে মুশরিকদের ন্যায় চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে না। সুতরাং এতে অত্যন্ত মজবুত দলীল রয়েছে যে, সলাত বর্জনকারী আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। কেননা, আল্লাহ বলেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন।”²⁴ ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে (৬/২৪০) আয়েশা হতে মারফু' সূত্রে স্পষ্টভাবে হাদীস বর্ণনা করেছেন- শব্দগুলো হচ্ছে-
الدواوين عند الله عز وجل ثلاثة ... ) الحديث
অর্থাৎ আল্লাহর নিকট তিনটি দফতর রয়েছে- তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, যা আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করবেন না, আর তাহল তাঁর সাথে শিরক করা। মহান আল্লাহ বলেন,
مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করল তার উপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন।²⁵
আরেকটি দিওয়ান (আমলনামা) যেটাকে আল্লাহ পরওয়া (ভ্রুক্ষেপ) করবেন না- তা হচ্ছে, বান্দার নিজের উপর যুলুম। যা বান্দা এবং তার রবের মাঝে চুক্তি ছিল। যেমন সে একদিনের সওম ছেড়ে দিয়েছে, কিংবা সলাত বর্জন করেছে; অতএব মহান আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেবেন এবং ইচ্ছা করলে কিছু মনে করবেন না...।²⁶ ইমাম হাকেম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে সহীহ বলেছেন। আমি 'তাখরিজুত ত্বাহাবী' গ্রন্থে (পৃ. ৩৬৭, চতুর্থ সংস্করণ) এ সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণনা করেছি যা এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা পূর্বের আলোচনা অবগত হলেন। আমি সীমাহীন অবাক হই সে সব সংখ্যাগরিষ্ঠ লেখকগণ সম্পর্কে যারা “অলসতাবশত সলাত বর্জনকারী কাফের হবে বা নাকি হবে না?” এর মত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাহ নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখা-লেখি করেছেন, কিন্তু অসচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। আমার জানা মতে, যে হাদীসটি আমি উল্লেখ করেছি তা বর্ণনা করতে প্রায় সবাই বে-খবর, অথচ তা বিশুদ্ধতার বিষয়ে ইমাম বুখারী এবং মুসলিম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য কিতাবে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। আর তারা এটাও উল্লেখ করেননি, হাদীসটি কোন্ দলের স্বপক্ষের দলীল এবং কোন্ দলের বিপক্ষের দলীল। বিশেষ করে ইবনুল কায়্যিম বিভিন্ন দলীল প্রমাণ দিয়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তার 'সলাত' নামক গ্রন্থে বিভিন্ন দলীল দিয়ে তাদের প্রত্যেকটির উত্তর প্রদান করেছেন। তবে যাদের মতে “সলাত বর্জনকারী কাফের হবে না” তাদের মতের স্বপক্ষের উক্ত হাদীসটি তিনি অতি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছেন। যার ফলে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি যে, সলাত বর্জনকারীরাও শাফা'আতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, শাফা'আতের হাদীসটিতে রয়েছে-
يَقُوْلُ اللهُ عَزَّ وَ جَلَّ : وَعِزَّتِي وَ جَلَالِي لَأَخْرُجَنَّ مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
অর্থাৎ মহান আল্লাহ বলবেন: আমার ইজ্জত এবং আমার মাহাত্ম্যের কসম! যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে অবশ্যই আমি তাকে জাহান্নাম থেকে বের করবো।
হাদীসটিতে আরো রয়েছে :
فَيَخْرُجُ مِنْ النَّارِ مَنْ لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ)
অর্থাৎ, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম থেকে এমন সব লোকদের বের করবেন, যারা কখনই কোনো সৎ আমল করেনি।
... فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنْ النَّارِ نَاسًا لَمْ يَعْمَلُوْا اللَّهَ خَيْرًا قَطَّ ....
অর্থাৎ অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঞ্জলী দিয়ে এক অঞ্জলী লোককে জাহান্নাম থেকে উঠাবেন, যারা আল্লাহর জন্য কখনই সৎ আমল করেনি।
পাঠকবৃন্দ! এখানে যে কারণে বিরুদ্ধবাদীরা হাদীসটি সংক্ষেপ করেছেন তা খুবই ক্ষতিকারক, যা স্পষ্ট। কেননা, বিষয়টি আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি। আর হাফেয ইবনু হাজার স্বীয় মুস্তাদরাকে ইবনে আবী জাময়ার হাদীসের পূর্ণরূপ উল্লেখ করেছেন। যার দ্বারা বোঝা যায় যে, মু'মিন ব্যক্তিরা দ্বিতীয় বার বেনামাযী ও তাদের পরে যারা আছে তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে। অতএব মাসআলাটির ক্ষেত্রে এটি একটি অকাট্য দলীল। যে সকল বিদ্বান অভিন্ন আকীদায় বিশ্বাসী অত্র দলীল দ্বারা এ মাসআলাহর ব্যাপারে তাদের মতবিরোধ দূর হয়ে যাবে। যে আকীদার অন্যতম একটি হল উম্মাতের মুহাম্মাদীর কোন ব্যক্তি কবীরা গুনাহর কারণে কাফির হবে না। বিশেষ করে বর্তমান যামানায় যখন এমন ব্যক্তিদের প্রসার হয়েছে যারা নিজেদেরকে আলিম বলে দাবী করে আর বিশ্বাস রাখে; আকীদাহ শুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও যদি কোন মুসলিম ওয়াজিব আমল পালনে অবহেলা করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। তবে কাফেরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, তারা ইসলামকে স্বীকৃতিও দেয় না এবং দীন পালনার্থে সলাতও আদায় করে না।
মহান আল্লাহ বলেন,
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُوْنَ)
“আমি কি মুসলিমদেরকে অপরাধীদের মত গণ্য করব? তোমাদের কী হয়েছে, তোমরা কেমনভাবে বিচার করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছ?”²⁷
আমি ইমাম ইবনুল কায়্যিম কে ভালবাসি এজন্য যে, তিনি এ সহীহ হাদীসটি উল্লেখ করতে অসতর্ক ছিলেন না, যা সলাত বর্জনকারী কাফির না হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণ। আর তার কাছে এর কোন উত্তর থাকলে প্রদান করতেন। ফলে বিনা পক্ষপাতিত্বে উভয় দলের একটি ইনসাফপূর্ণ সমাধান হতো।

টিকাঃ
২৪. সূরাহ আন্-নিসা : ৪৪
২৫. সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫ : ৭
২৬. হাকেম (৪/৫৭৬)
২৭. সূরাহ আল-ক্বালাম ৬৮: ৩৫-৩৬

📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 কুফর দু' প্রকার

📄 কুফর দু' প্রকার


ইবনুল কায়্যিম কে আমি ভালবাসি এবং পছন্দ করি। তিনি (সলাত পরিত্যাগকারীকে) কাফের না বলার এ সহীহ হাদীসটি উল্লেখ করা হতে বেখেয়াল হন নি। আর তিনি যথাসাধ্য উত্তর প্রদান করেছেন এবং এজন্য তিনি উভয় দলকে নিয়ে পরস্পর আলোচনা করেছেন। আর কোনো দলের পক্ষাবলম্বন না করে নিরপেক্ষ আলোচনা করেছেন।
হ্যাঁ, তবে তিনি এ ব্যাপারে বিশেষভাবে আলোচনা করা আমার উপর শিরোধার্য করে দিয়েছেন। ইবনুল কায়্যিম বিশেষভাবে একটি অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন (উভয় দলের মধ্যে ফায়সালার ব্যাপারে এবং উভয় দলের কাছে প্রস্তাব রাখার জন্য) যা উভয় দলের দলীলগুলো সঠিকভাবে বোধগম্য হতে গবেষককে সহায়তা করবে। কেননা, তিনি এ ব্যাপারে সুন্দর এবং চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন- “উলামাদের নিকট গ্রহণযোগ্য অভিমত হলো প্রত্যেক কুফরী কর্মের কারণে মুসলিম ইসলাম ধর্ম থেকে বের হয়ে যায় না।”
সুতরাং পাঠকদের নিকট আমি (আলবানী) তাঁর (ইবনুল কায়্যিম) আলোচনার মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করব এবং এর পাশাপাশি সহীহ হাদীসকে লক্ষ্য রেখে আমি তাঁকে অনুসরণ করব। তিনি বর্ণনা করেছেন :
أَنَّ الْكُفْرَ نَوْعَانِ : كُفْرٌ عَمَلٌ وَكُفْرٌ جُحُوْدٌ وَإِعْتِقَادٌ.
অর্থাৎ কুফরী দুই প্রকার :
১. আমলগত দিক থেকে কুফর।
২. আক্বীদাগত এবং অস্বীকারবশত কুফর।
আমলগত কুফর দু' ভাগে বিভক্ত :
১ম প্রকার : এমন কুফর যা ঈমানের বিপরীত।
২য় প্রকার : এমন কুফর যা ঈমানের বিপরীত নয়।
সুতরাং মূর্তিকে সিজদা করা, কুরআন মাজীদকে অপমান এবং তুচ্ছ মনে করা, রাসূলুল্লাহকে হত্যা করা বা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, তাকে গালি দেয়া ইত্যাদি কর্ম যা ঈমানের বিপরীত। আর আল্লাহ তা'আলা যা নাযিল করেছেন তা ব্যতীত অন্যান্য বিধান দ্বারা ফায়সালা করা এবং সলাত বর্জন করা এগুলো অকাট্যভাবে আমলগত কুফরের অন্তর্ভুক্ত।
আমি (আলবানী) বলছি, যে কথাগুলো তিনি প্রয়োগ করেছেন সে ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে। কেননা, উল্লেখিত বিষয়টি কখনো কখনো كُفُرْ إِعْتِقَادٌ (আক্বীদাগত কুফরের) অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আর এটা ঐ সময় হয়, যখন আক্বীদা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো নিদর্শনগুলো তার সাথে সংযুক্ত হয়। যেমন- সলাত এবং সলাত আদায়কারী ব্যক্তিদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা। অনুরূপ বিচারক যখন তাকে সলাত আদায়ের দিকে আহ্বান করে এমতাবস্থায় তার মধ্যে এমন কিছু বিষয় বিদ্যমান থাকে যা তাকে হত্যা করার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। এর আলোচনা অচিরেই আসবে, কেননা এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অতঃপর তিনি (ইবনুল কায়্যিম) বলেছেন : “কুফর” শব্দটির প্রয়োগ সলাত ত্যাগকারী থেকে বাদ দেয়া সম্ভব নয়। কেননা, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল এই শব্দটি প্রয়োগ করেছেন। তবে সেটি হবে »كُفْرٌ عَمَلُ« আলমগত কুফর; »لَا كُفْرْ إِعْتِقَارُ« আক্বীদাগত কুফর নয়। যিনাকারী, চোর, মদ্য পানকারী এবং যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে নয় এমন ব্যক্তিদের ঈমান নেই বলে রাসূলুল্লাহ উল্লেখ করেছেন। এ শ্রেণীর লোকেরা উক্ত কর্মাবস্থায় ঈমান থেকে দূরে থাকে। আর যখন “ঈমান” বিষয়টি তার থেকে দূর হয়ে যায়, তখন সে আমলগত দিক থেকে কাফের হয়। এমতাবস্থায় সে অস্বীকার এবং আক্বীদাগত দিক থেকে কাফের সাব্যস্ত হয় না।
আমি (আলবানী) বলছি : তবে আমি মনে করি এরূপ অপরাধীদের ক্ষেত্রে “কুফর শব্দ” প্রয়োগ করা সঠিক নয়। যেমন এরূপ বলা উচিত হবে না : যে ব্যক্তি ব্যভিচার করল সে কুফরী করল। 'সে ব্যক্তি কাফের হয়ে গেল' এ কথা বলা জায়েয হওয়া তো অনেক দূরের কথা। এমনকি সলাত বর্জনকারী ও অন্যান্য অপরাধী যাদের ব্যাপারে কুফর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও (বলা যাবে না সে কাফের হয়ে গেল)। কারণ অন্যান্য দলীলের প্রতি দৃষ্টি দেয়া উচিত। সুতরাং কাফের ও রক্ত হালাল এমন কথা বলা তো বহু দূরের কথা।
এ ব্যাপারে সর্বোত্তম কথা হলো- এমন কথা বলা উচিত হবে না যে, ঐ ব্যক্তি কাফের হয়ে গেছে এবং তার রক্তপাত হালাল অর্থাৎ তাকে হত্যা করা বৈধ।
এরপর তিনি (ইবনুল কায়্যিম) নিম্নে বর্ণিত সহীহ হাদীসটি উল্লেখ করেন-
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقُ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ»
অর্থাৎ মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী কর্ম; আর তাকে হত্যা করা কুফরী।²⁸
তিনি আরো বলেন : সবাই অবগত যে, রাসূলুল্লাহ কুফরী দ্বারা কেবল আমলগত কুফরী উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আক্বীদাগত কুফরী নয়। আর এ কুফরী মুসলমানিত্ব এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয় না। যেমন- চোর এবং যিনাকারী ইসলাম এবং মুসলিম জাতি থেকে বের হয় না। যদিও তাকে মু'মিন বলা হয়নি। এ ব্যাখ্যাই হল সাহাবাদের উক্তি, যারা আল্লাহর কিতাব, ইসলাম এবং কুফর ও তার আবশ্যিক বিষয় সম্পর্কে উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে অধিক জ্ঞান রাখেন। অতঃপর তিনি ইবনু আব্বাস হতে নিম্নে বর্ণিত আয়াতের ব্যাপারে সুপরিচিত আছার (উক্তি) উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলার বাণী :
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْنَ )
আল্লাহর নাযিল কৃত বিধান দ্বারা যারা বিচার বা ফায়সালা করে না তারা কাফের।²⁹
ইবনু আব্বাস, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ইহা সেই কাফের নয় যে কাফেরের কথা মানুষ বুঝে থাকে। অর্থাৎ মানুষ যেমন বুঝে থাকে কাফের মানেই ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে।
আমি (আলবানী) বলছি, ইমাম হাকেম এখানে একটু বৃদ্ধি করে বলেছেন,
إِنَّهُ لَيْسَ كُفْرًا يَنْقُلُ عَنْ الْمِلَّةِ كُفْرٌ دُوْنَ كُفْرٍ)
অর্থাৎ সে এমন কাফের হয় না যা মিল্লাত (দীন) থেকে বের করে দেয়, বরং তা প্রকৃত কুফর থেকে নিম্নস্তর কুফর।³⁰
অতএব যারা সলাত বর্জনকারীকে কাফের সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন তাদের উক্তির মধ্যে ভঙ্গুরতা প্রকাশ পায়।
অতঃপর ইবনুল কায়্যিম বলেন, এখানে মূল উদ্দেশ্য হলো- সলাত পরিত্যাগকারীর ঈমান নেতিবাচক হওয়া অধিক উপযোগী অন্য কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত অপরাধীর চেয়ে। সলাত পরিত্যাগকারীর উপর থেকে ইসলাম দূর হয়ে যাওয়া অধিক উপযুক্ত তার চেয়ে যার হাত ও মুখের দ্বারা মুসলিম ব্যক্তি নিরাপদ নয়। তাই সলাত ত্যাগকারীকে মু'মিন মুসলিম কিছুই বলা হবে না; যদিও ঈমান ইসলামের অন্যান্য শাখা-প্রশাখা পালন করে থাকে।
আমি (আলবানী) বলছি- সলাত বর্জনকারী থেকে মু'মিন মুসলিম নামকরণকে দূর করা বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা একটি প্রসিদ্ধ আয়াতে সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়কে মু'মিন হিসেবে অভিহিত করেছেন। আয়াতটি নিম্নরূপ :
وَإِنْ طَائِفَتْنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِي عَإِلَى أَمْرِ اللَّهِ ۚ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ)
মু'মিনদের দু'দল লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর একটি দল অপরটির উপর বাড়াবাড়ি করলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করে, তার বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই কর যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহ্র নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে ফায়সালা কর আর সুবিচার কর; আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন।³¹
অথচ আল্লাহ রাসূল ﷺ বলেছেন, سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ
অর্থাৎ মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকী কর্ম; আর তাকে (মু'মিনকে) হত্যা করা কুফরী আচরণ।³²
অতএব সীমালঙ্ঘনকারী মুসলিমকে কুফর গুণে গুনান্বিত করা হলেও সে মু'মিন নয় এটা আবশ্যক করে না। 'মুসলিম নয়' এ কথা বলা তো অনেক দূরের কথা। অনুরূপভাবে সলাত বর্জনকারীকে কুফর গুণে গুণান্বিত করা হলেও সে মু'মিন নয় বা মুসলিম নয় একথা বলা আবশ্যক করে না। তবে হ্যাঁ, এ থেকে যদি এই উদ্দেশ্য নেয়া হয় যে, সে পরিপূর্ণ মুসলিম নয় তাহলে ভিন্ন কথা।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন: তার ব্যাপারে এ কথাটি অবশিষ্ট থাকে যে, তার ঈমান তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়া থেকে রক্ষা করবে কিনা? এ ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে, তার ঈমান কাজে আসবে যদি পরিত্যাগকৃত আমল অন্যান্য আমল সহীহ হওয়ার শর্ত না হয়ে থাকে। আর যদি শর্ত হয়ে থাকে তবে তার ঈমান কোনো কাজে আসবে না।

টিকাঃ
২৮. বুখারী হা. ৪৮, মুসলিম হা. ৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ হা. ৬৯, ৩৯৩৯, সুনান নাসায়ী হা. ৪১০৫,
২৯. সূরাহ আল মায়িদাহ ৫ : ৪৪
৩০. ইমাম হাকেম (২/৩১৩) ও যাহাবী একে সহীহ বলেছেন।
৩১. সূরাহ হুজুরাত ৪৯ : ৯
৩২. বুখারী হা. ৪৮, মুসলিম হা. ৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ হা. ৬৯, ৩৯৩৯, সুনান নাসায়ী হা. ৪১০৫,

📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 আমলগত কুফরের কারণে কোনো মুসলিম ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না

📄 আমলগত কুফরের কারণে কোনো মুসলিম ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না


এখন কথা হচ্ছে, সলাত আদায় করা ঈমান সহীহ হওয়ার শর্ত কিনা? আর এটাই হচ্ছে এ মাস'আলার মূল প্রতিপাদ্য ও বিবেচ্য বিষয়।
আমি বলছি, এর পর ইবনুল কায়্যিম সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের সাব্যস্তকারী দলের মতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন: এটা প্রমাণ করে যে, সলাত ব্যতীত বান্দার কোনো প্রকার আমলই কবুল করা হবে না।
অতএব আমি বলতে চাই : আমলগত কুফর ও আকীদাগত কুফর সম্পর্কে ইবনুল কায়্যিম এর বিস্তৃত আলোচনার পর আমার নিকট একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়েছে- তা হচ্ছে, আমলগত কুফরের কারণে কোনো মুসলিম ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না। সুতরাং কুফর সাব্যস্তকারী দলের হাতে প্রচুর দলীল থাকা সত্ত্বেও সলাত পরিত্যাগকারী ব্যক্তি ইসলাম হতে বের হয়ে যাওয়ার হুকুম লাগানো সম্ভব নয়। কেননা, এ সম্পর্কিত যত দলীল রয়েছে তার সবই আমলগত কুফর সম্পর্কিত, আক্বীদা বা বিশ্বাসগত নয়।
এ কারণেই তিনি শেষ পর্যায়ে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, এ ব্যক্তির ঈমান কি কোনো কাজে আসবে? আর ঈমান সহীহ হওয়ার জন্য কি সলাত আদায় শর্ত?
আমি বলতে চাই : যারাই তাঁর জওয়াবের প্রতি লক্ষ্য করবেন বুঝতে পারবেন যে, তিনি এ দিকে ফিরে এসেছেন যে, সলাত ব্যতীত কোনো প্রকার সৎ আমল কবুল হবে না। তবে ঈমান সহীহ হওয়ার জন্য সলাত শর্ত কিনা, এ প্রশ্নের জওয়াব কোথায়?
অর্থাৎ শুধু সলাত ঈমানের পরিপূর্ণতার শর্ত নয়। বরং আহলুস সুন্নাতের মতে সকল সৎ আমল ঈমানের জন্য শর্ত। খাওয়ারিজ ও মু'তাযিলীগণ এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করে থাকে। তাদের মতে কাবীরা গুনাহকারী ব্যক্তি কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
কেউ যদি বলেন যে, ঈমান সহীহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য সলাত আদায় করা শর্ত এবং সলাত পরিত্যাগকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে, তবে তিনি খাওয়ারিজদের কতক কথার সাথে একাত্বতা প্রকাশ করলেন। তাছাড়া এর চেয়েও ক্ষতিকর দিক হচ্ছে, এতে তারা পূর্বোক্ত শাফা'আতের হাদীসের বিরোধীতা করলেন।
হতে পারে ইবনুল কায়্যিম নিরপেক্ষতা অবলম্বনের দ্বারা একদিকে পাঠকদেরকে ইসলামে সলাতের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বোঝাতে চেয়েছেন। অন্যদিকে ঈমান বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য সলাত শর্ত হওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই বোঝাতে চেয়েছেন। কেননা, তার মতে অলসতাবশত সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হবে না। তবে হ্যাঁ, সলাত পরিত্যাগ করার পাশাপাশি এ সম্পর্কে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সে কাফের হয়ে যাবে এবং দীন ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। এ সম্পর্কে আমি ইতোপূর্বে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছি। ইবনুল কায়্যিম এর গ্রন্থের শেষ অনুচ্ছেদের আলোচনায় এ সম্পর্কিত বিষয়ে অবগত হওয়া যায়। তিনি সেখানে বলেছেন-
কেউ কেউ সলাত ত্যাগে অটল থাকার পরও তার কাফের হওয়া সম্পর্কে সন্দেহ রাখা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়। অথচ তাকে রাজন্যবর্গের সামনে সলাতের দিকে আহ্বান জানানো হয় এবং সে লক্ষ্য করে যে, তার মাথার উপর তরবারি ঝুলছে ও তার চক্ষু অশ্রুসজল হয়। আর তাকে বলা হয়, তুমি সলাত আদায় করবে? অন্যথায় তোমাকে হত্যা করা হবে। তখন সে বলে, তোমরা আমাকে হত্যা করে ফেল; আমি কখনও সলাত আদায় করবো না।
আমি (আলবানী) বলছি, সলাত বর্জনে এমন দৃঢ়সংকল্প ব্যক্তি এবং বিচারকের হত্যার হুমকি সত্ত্বেও সলাত আদায়ে অস্বীকারকারীর ক্ষেত্রে সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের সাব্যস্তকারী দলের সকল দলীল-প্রমাণ প্রয়োগ করা প্রযোজ্য। আর বিরোধী পক্ষের দলীল-প্রমাণের সাথে তাদের দলীল-প্রমাণসমূহ একত্রিত করে এ সিদ্ধান্তে আসা উচিত যে, (অস্বীকার ব্যতীত) সলাত পরিত্যাগকারী কাফের নয়। কেননা, এ ধরণের কুফরী হচ্ছে আমলগত। আক্বীদা বা বিশ্বাসগত নয়। এ বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিম থেকে আলোচনা গত হয়েছে। আর শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়‍্যাহ এমনটিই বলেছেন। অর্থাৎ তিনি কাফের হওয়ার দলীল-প্রমাণসমূহকে এ অর্থেই ব্যবহার করেছেন।
কোনো ওযর ছাড়াই সলাত ত্যাগকারী মুসলিম কিনা এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে মাযমূ' ফাতাওয়ায় (২২/৪৮) জ্ঞানগর্ভ ও লম্বা আলোচনা করেন। তা থেকে আমাদের আলোচিত হাদীসের সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদসহ অধিকাংশ আলেমের মতে, সলাত পরিত্যাগকারী হত্যার যোগ্য- এ অভিমত আলোচনার পর তিনি বলেন "আর যখন সে সলাত বর্জনে অটল থাকে এমন কি তাকে হত্যা করা হলো। তাহলে তাকে কি কাফের মুরতাদ হিসেবে হত্যা করা হলো, নাকি ফাসিক মুসলিম হিসেবে হত্যা করা হলো?
ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণিত দু' অভিমতের একটি হচ্ছে- সে “সলাত আদায় করা ফরয” এটা যদি অন্তরে বিশ্বাস করে এবং জেদ করে সলাত ত্যাগ করে না আবার তা যথাযথ আদায়ও করে না; আদম সন্তানের মধ্যে এমন মানুষের পরিচয় মেলে না এবং এটা তাদের অভ্যাসও নয়। সুতরাং ইসলামে এমন ঘটনা ঘটতে পারে না। আর এরকম কাউকে পাওয়া যাবে না, যে সলাত ফরয হওয়াতে বিশ্বাস করে আর তাকে বলা হয়, যদি সলাত আদায় না করো তাহলে তোমাকে হত্যা করা হবে। অথচ এমতাবস্থায় সলাত ফরযের প্রতি বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তা বর্জনের উপর অটল থাকে- ইসলামে এমন হওয়া অসম্ভব।
যখন কোনো ব্যক্তি সলাত আদায় কথা থেকে বিরত থাকে এমনকি তাকে হত্যা করা হয়- তাহলে বোঝা যাবে যে, সে অন্তরে এর ফরয হওয়ার প্রতি বিশ্বাসী নয় এবং সে তা আদায় করাটাও অবশ্য কর্তব্য বলে মানে না। এমন ব্যক্তি সকল মুসলিমের ঐক্যমতে কাফের। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরামের আসার এবং সহীহ হাদীস রয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ এর বাণী-
لَيْسَ بَيْنَ الْعَبْدِ وَبَيْنَ الْكُفْرِ إِلَّا تَرْكُ الصَّلَاةِ»
“(মুসলিম) বান্দা এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সলাত ত্যাগ করা।”³³
সুতরাং যে ব্যক্তি সলাত বর্জনে অটল থাকে, এমনকি এ অবস্থাতেই মারা যায়; আল্লাহ তা'আলার জন্য একবারও সিজদাহ করে না- সে সলাতকে ফরয বললেও সে কক্ষনো মুসলিম নয়। কেননা, সে ব্যক্তি যদি 'সলাত ফরয' এ কথা বিশ্বাস করত এবং আদায় না করা হলে হত্যা করা হবে এ বিশ্বাসও রাখত তাহলে সলাত আদায়ের জন্য এ বিশ্বাসই যথেষ্ট ছিল। কারণ কোন জিনিসের দিকে আহবান করা হলে আর তা পালন করার সামর্থ থাকলে তা পালন করা আবশ্যক হয়ে যায়।
সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যদি কখনোও তা আদায় না করে তবে বোঝা যাবে তার দাবী অনুযায়ী কাজের মিল নেই। (আর সত্য কথা হলো, শাস্তির পরিপূর্ণ ভয় সলাত পরিত্যাগকারীকে আমলে উৎসাহ দানকারী।)
কিন্তু কখনো এর সাথে এমন কতক বিষয় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় যা তাকে আবশ্যিকভাবে বিলম্বিত করে দেয় এবং সে ঐ বিষয়ের কতক ওয়াজিব আমল ছেড়ে দেয় ও কখনো তা ছুটে যায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সলাত বর্জনে অটল থাকে, একেবারেই সলাত আদায় করে না এবং এ অবস্থায় মারা যায় তাহলে সে মুসলিম থাকে না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের অবস্থা এই যে, তারা কখনো সলাত আদায় করে আবার কখনো ছেড়ে দেয়। তারা সলাতকে ভালভাবে সংরক্ষণ করে না। এসব লোক শাস্তি পাবার যোগ্য। এসব লোকদের সম্পর্কে 'উবাদাহ সূত্রে সুনান গ্রন্থে নাবী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
خَمْسُ صَلَوَاتٍ كَتَبَهُنَّ اللهُ عَلَى الْعِبَادِ فِي الْيَوْمِ وَاللَّيْلَةِ مَنْ حَافَظَ عَلَيْهِنَّ كَانَ لَهُ عَهْدٌ عِنْدَ اللهِ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَمْ يُحَافِظُ عَلَيْهِنَّ لَمْ يَكُنْ لَهُ عَهْدٌ عِنْدَ اللَّهِ إِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ وَإِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ»
"আল্লাহ তা'আলা বান্দার উপর রাত-দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরয করেছেন, যে ব্যক্তি সেগুলোকে সংরক্ষণ করবে তথা যথারীতি আদায় করবে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে এ প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে ব্যক্তি সেগুলো হিফাযত করবেনা; তার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে শাস্তিও দিতে পারেন। আর ইচ্ছা করলে ক্ষমাও করতে পারেন। "³⁴
সলাতের সংরক্ষণকারী বলা হয় তাকে যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্দেশিত সময় মোতাবিক সেগুলোকে আদায় করে। আর যে ব্যক্তি কখনও সেগুলোকে নির্দিষ্ট সময় হতে দেরি করে আদায় করে অথবা কখনও তার ওয়াজিবসমূহকে ছেড়ে দেয় সে ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে এবং তার নফল সলাতসমূহ তার ফরযের ঘাটতি পূরণকারী হবে যা বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ এর উক্তি প্রমাণ করে যা তার পরবর্তী কতক অনুসারীগণের মধ্যে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে, তা হলো কোনো প্রকার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই সলাত পরিত্যাগকারী কাফের।
অন্যদিকে তাঁর উক্তি এ কথার বিপরীত অভিমতকেও প্রমাণ করে যা এই হাদীসের সাথে কোনো বিরোধ করে না। এটা কী করে সম্ভব? অথচ তিনি তাঁর মুসনাদে আয়িশাহ হতে এ মর্মের হাদীস বর্ণনা করেছেন যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে।
তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ তার মাসায়েল গ্রন্থে (৫৫পৃষ্ঠায়) বলেছেন, :
سَأَلْتُ أَبِي - رَحِمَهُ اللهُ - عَنْ تَرْكِ الصَّلَاةِ مُتَعَمِّدًا؟ قَالَ : ... وَالَّذِي يَتْرُكُهَا لَا يُصَلِّيْهَا وَالَّذِي يُصَلِّيْهَا فِي غَيْرِ وَقْتِهَا أَدْعُوهُ ثَلَاثًا فَإِنْ صَلَّى وَإِلَّا ضَرَبْتُ عُنُقَهُ هُوَ عِنْدِي بِمَنْزِلَةِ الْمُرْتَدِ...»
“আমি আমার পিতাকে ইচ্ছাকৃত সলাত পরিত্যাগকারীর বিধান সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ... যে ব্যক্তি তা ছেড়ে দিল আর যে ব্যক্তি তা সঠিক সময়ে আদায় করলো না- তাকে তিনবার দাওয়াত দিব। যদি সে দাওয়াতে সাড়া দেয়, ভাল। নচেৎ আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব। সে আমার কাছে মুরতাদের সমপর্যায়ভুক্ত...।"
আমি (আলবানী) বলছি, 'ইমাম আহমাদ-এর এ উক্তির উদ্দেশ্য এই যে, শুধু শুধু সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হয়ে যাবে না। হ্যাঁ, ব্যাপার এমন হতে পারে যে, সলাত আদায় না করলে তাকে হত্যা করা হবে জেনেও সলাত আদায় করতে অস্বীকার করে। তাহলে সে সলাত আদায় করার চেয়ে নিহত হওয়াকেই প্রাধান্য দেয়। সুতরাং তার এ আচরণ প্রমাণ করে যে, তার সলাত অস্বীকার বিশ্বাসগত কুফরী। ফলে সে হত্যাযোগ্য।
তার বক্তব্যের অনুরূপ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এর ছাত্র কাজী ইবনু মুফলিহ - "المحرر في الفقه الحنبلي" গ্রন্থে ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-
وَمَنْ أَخَرَ صَلَاةٌ تَكَاسُلًا لَا جُحُودًا أُمِرَ بِهَا فَإِنْ أَصَرَّ حَتَّى ضَاقَ وَقْتُ الْأُخْرَى وَجَبَ قَتْلُهُ )
“কাউকে সলাতের আদেশ দেওয়ার পর অস্বীকার করে নয়, বরং অলসতা করে সলাতকে দেরি করে ফেলল, এমতাবস্থায় অন্য সলাতের সময় এসে পড়ল তখন তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
আমি (আলবানী) বলছি, সলাত আদায় করতে দেরি করার কারণে কাফের হবে না; বরং অস্বীকার করে তার উপর অটল থাকলে কাফের হবে।
এ কারণেই ইমাম আবূ জা'ফার ত্বাহাবী তাঁর »مشكل الآثار« গ্রন্থে এ মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি উভয় পক্ষের কিছু দলীল-প্রমাণ উল্লেখ করে কাফের না হওয়ার অভিমতকে প্রাধাণ্য দিয়েছেন (৪/২২৮)। তিনি এ বিষয়ে বলেন, “এ সম্পর্কে কথা এই যে, আমরা তো তাকে সলাত আদায় করার নির্দেশ প্রদান করছি, কোনো কাফেরকে সলাত আদায়ের নির্দেশ দিচ্ছি না। তার মধ্যে কাফের হওয়ার মত কিছু থাকলে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিব। অতঃপর যদি সে মুসলিম হয়ে যায় তখন তাকে সলাত আদায়ের নির্দেশ প্রদান করবো। আর আমাদের কেউ সলাত ছেড়ে দিলে তাকেও সলাত আদায়ের নির্দেশ করবো। কেননা, সে তো সলাত আদায়কারী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। এজন্যই নাবী রামাযান মাসে ইচ্ছাকৃত সিয়াম ভঙ্গকারীকে কাফফারা প্রদানের নির্দেশ করেছেন। আর তাকে সিয়াম তথা রোযা পালনের দ্বারাই কাফ্ফ্ফারা আদায়ের আদেশ করেছেন; (আর বাস্তব সত্য) এই যে, মুসলিম ব্যতীত কারো জন্য সিয়াম নেই।
রামাযানের সিয়াম এবং পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায়ের পূর্বে কোনো ব্যক্তি ইসলাম ধর্মের সাক্ষ্য প্রদান করলে সে মুসলিম হয়; এটাই স্বাভাবিক। আর সেগুলোর অস্বীকার করার দ্বারা সে কাফের হয়ে যায়। এসব ইবাদতের কোনটি অস্বীকার না করে কেবল বর্জন করলেই কাফের হয় না। সে কাফের হবে না এজন্য যে, সে মুসলিম ছিল; আর তার ইসলাম প্রমাণিত হয়েছে ইসলামের স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে আর ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে ইসলামকে অস্বীকার করার মাধ্যমে।
আমি (আলবানী) বলছি, এটি একটি উত্তম ফিকহী মন্তব্য ও শক্তিশালী উক্তি যা খণ্ডন করার নয়। এটা পরিপূর্ণভাবে ঐ কথারই সমর্থক যে, এমনিতেই সলাত বর্জন করার কারণে কাফের হবে না; বরং সলাতের দিকে দাওয়াত দেয়ার পরও যদি অস্বীকার করে তবে কাফের হবে; যা পূর্বে উল্লেখ হয়েছে।
অধিকন্তু, ইমাম আহমাদ এর উক্তি থেকে যা বোঝা যায় সে কথাকে আরো শক্তিশালী করে শাইখ আলাউদ্দীন আল-মারওয়ারদী প্রণীত - "الإنصاف في معرفة الراجح من الخلاف على مذهب الإمام المبجل أحمد بن حنبل" আল-ইনসাফ ফী মা'রিফাতির রাজেহ মিনাল খিলাফ 'আলা মাযহাবিল ইমাম মুবায্যাল আহমাদ বিন হাম্বাল) গ্রন্থে যা বর্ণিত হয়েছে। তিনি তাঁর গ্রন্থে ১ম খণ্ড ৪০২ পৃষ্ঠায় কিছু পূর্বে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল এর উক্তির ব্যাখ্যাকারের অনুরূপ মন্তব্য করেছেন -
«أَدْعُوهُ ثَلَاثًا » : «الدَّاعِيْ لَهُ هُوَ الْإِمَامُ أَوْ نَائِبُهُ فَلَوْ تَرَكَ صَلَوَاتٍ كَثِيرَةً قَبْلَ الدُّعَاءِ لَمْ يَجِبْ قَتْلَهُ وَلَا يَكْفُرُ عَلَى الصَّحِيحِ مِنَ الْمَذْهَبِ وَعَلَيْهِ جَمَاهِيرُ الْأَصْحَابِ وَ قَطَعَ بِهِ كَثِيرٌ مِنْهُمْ»
(আমি তাকে তিনবার সলাত আদায়ের দাওয়াত দিব) : (এখানে দাওয়াত দানকারী হবেন মুসলিম নেতা অথবা তার নায়েব তথা তাঁর প্রতিনিধি। যদি দাওয়াত দেওয়ার পূর্বে অনেক সলাত আদায় না করে থাকে তবুও তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হবে না এবং বিশুদ্ধ মতানুযায়ী সে কাফেরও হবে না। অধিকাংশ সাহাবা আজমাঈন এ মতের পক্ষে এবং তাদের অনেকে এ অভিমতকে অকাট্যভাবে গ্রহণ করেছেন।
আর এ মত গ্রহণ করেছেন আবূ আব্দুল্লাহ বিন বাত্তাহ। শাইখ আবুল ফারয আব্দুর রহমান বিন কুদামাহ আল-মাক্বদেসী তাঁর আশ্-শারহুল কাবীর 'আলাল মুক্বনি'তে (ইমাম মুওয়াফফিক উদ্দীন মাকদেসী প্রণীত মুক্বনি' এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ) [১/৩৮৫] বর্ণনা করেছেন। সেখানে তিনি বৃদ্ধি করে বলেছেন যে, যারা সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের বলেন তাদের কথাকে তিনি অস্বীকার করেছেন।
আবুল ফারয বলেন : (এটা অধিকাংশ ফকীহর অভিমত- যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী' প্রমুখ।)
অতঃপর এর সমর্থনে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন- যার অধিকাংশই ইবনুল কায়্যিম যাওযী থেকে বর্ণিত। এর মধ্যে ইবনু তাইমিয়্যাহ এর বক্তব্য পূর্বে বর্ণিত 'উবাদাহ-এর হাদীস রয়েছে। তিনি বলেন-
«وَلَوْ كَانَ كَافِرًا لَمْ يُدْخِلْهُ فِي الْمَشِيئَةِ
“সলাত পরিত্যাগকারী কাফের হলে তাকে আল্লাহর ইচ্ছার অন্তর্ভুক্ত করতেন না।"
আমি (আলবানী) বলছি, এ কথাটি আ'য়িশাহ বর্ণিত হাদীসকে এমনভাবে শক্তিশালী করছে যাতে কোনো সন্দেহ থাকে না। অতএব এটা ভুলে যেয়ো না।
অতঃপর আবুল ফারম্ বলেন : “যেহেতু এ বিষয়ে মুসলিমদের ইজমা' রয়েছে, তাই কোনো যুগের বা সময়ের কারো সম্পর্কে জানা নেই যে, সলাত ফরয হওয়া ব্যক্তিকে সলাত ত্যাগ করার কারণে মারা যাবার পর তাকে গোসল দেয়া বা তার জানাযা না পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে এবং তার উত্তরাধিকার সম্পত্তি প্রদানে বাধা দেওয়া হয়েছে, বরং অধিকাংশ সলাত পরিত্যাগ করা সত্ত্বেও এ দু'টি বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। সলাত পরিত্যাগ করার কারণে যদি কাফের হতো তবে তাদের ক্ষেত্রে এ বিধানসমূহ জারি হয়ে যেত।
আমরা মুসলিমদের মাঝে এ বিষয়ে কোনো মতপার্থক্য জানি না যে, সলাত পরিত্যাগকারীর উপর হত্যার ফায়সালা সাব্যস্ত হবে; যদিও মুরতাদের সম্পর্কে মতবিরোধ রয়েছে।
অন্যদিকে পূর্বোক্ত হাদীসসমূহ অর্থাৎ যেসব হাদীস দ্বারা কাফের আখ্যাদানকারীরা দলীল গ্রহণ করেছেন। যেমন-
بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ
“কোন মুসিলম ব্যক্তি ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হলো সলাত পরিত্যাগ করা।” অর্থাৎ সলাত পরিত্যাগ করলে সে কাফের হয়ে যায়।
এ হাদীসে কুফর বলা হয়েছে ধমক স্বরূপ এবং কাফেরদের সাথে (আমলের দিক থেকে) মিল থাকার কারণে; (যেহেতু তারাও সলাত আদায় করে না।) প্রকৃত অর্থে কুফর বলা হয়নি।
যেমন- রাসূলুল্লাহ এর বাণী-
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ»
"মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী কাজ এবং তাকে হত্যা করা কুফরী কর্ম।"
তাছাড়া অনুরূপ যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলোতে ভীতি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কঠোরতা করা হয়েছে।
আমাদের শায়খ (অর্থাৎ মুওয়াফফিক মাকদেসী) বলেন:
«هَذَا أَصْوَبُ الْقَوْلَيْنِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ
“দুটি” অভিমতের মধ্যে এটাই সবচেয়ে সঠিক। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।"
আমি (আলবানী) বলছি, শায়খ সুলায়মান বিন শায়খ আব্দুল্লাহ বিন শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব তাঁর 'মুক্বনি' (১/৯৫-৯৬) গ্রন্থের টীকাতে ইবনু কুদামার মতকে স্বীকৃতি দান করেছেন।
ইমাম শাওকানী তাঁর 'সাইলুল জারার' নামক গ্রন্থের ১ম খণ্ড ২৯২ পৃষ্ঠায় ব্যাখ্যা করেছেন যে, ইচ্ছাকৃত সলাত পরিত্যাগকারী কাফের এবং সে হত্যাযোগ্য। মুসলিমগণের ইমামের কর্তব্য তাকে হত্যা করা। তিনি তাঁর "নাইলুল আওতার” গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, এমন কুফরী উদ্দেশ্য যা ক্ষমাযোগ্য নয়। উলামায়ে কিরামের উদ্ধৃতি ও মতভেদ আলোচনা পেশ করার পর বলেছেন-
“সত্য কথা এই যে, সে কাফের হয়ে গেছে; তাকে হত্যা করতে হবে। কেননা, হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, শরীয়ত প্রণেতা সলাত পরিত্যাগকারীর উপর 'কুফর' শব্দ প্রয়োগ করেছেন। আর কোনো মুসলিম এবং কুফরির বিধান জায়েয সাব্যস্ত করার মাঝে পার্থক্যকারী হিসেবে সলাতকে দাঁড় করেছেন। যখন সলাত পরিত্যাগ করলো তখন তার উপর কুফরীর বিধান আরোপ করা বৈধ হয়ে গেল।
পূর্বযুগের মনীষীদের হতে যে সব মতপার্থক্য বর্ণিত হয়েছে সে দিকে দৃষ্টি দেয়া আমাদের জন্য আবশ্যক নয়। কেননা, আমাদের বক্তব্য হলো : কতক কুফরী কাজ রয়েছে যা মাগফিরাত ও শাফা'আত লাভ হতে বঞ্চিত করতে পারে না। যেমন আহলে কিবলাদের কতক পাপকে কুফর বলেছেন। সুতরাং এ সম্পর্কে আলেম সমাজ যে সব ভুল তা'বীল বা ব্যাখ্যা করেছেন সে সবের প্রতি দৃষ্টিপাতের কোনো প্রয়োজন নেই।”
ইমাম (শাওকানী) ঠিকই বলেছেন, কিন্তু তিনি যে সলাত বর্জনকারীর উপর 'কাফের' শব্দ প্রয়োগ করেছেন তা ব্যাপক এবং আমার নিকট প্রশংসনীয় নয়। কেননা, যে সব হাদীসে কুফরীর ইঙ্গিত করা হয়েছে, সেসব হাদীসে কাফের সাব্যস্ত করা হয়নি। বরং সেখানে শুধু এতটুকু আছে যে, فَقَدْ كَفَرَ 'সে কুফরী করলো।' আমি এ ধরনের ফে'ল বা ক্রিয়া হতে اسم فاعل বা কর্তার তথা কার্য সম্পাদনকারী' শব্দ کافر গ্রহণ করা কারো পক্ষে বৈধ মনে করি না। কেননা, এরূপ করা হলে কুফর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এমন প্রত্যেক প্রকারের ব্যক্তির উপর কাফের শব্দ প্রয়োগ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। যেমন গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে শপথকারী, অন্যায়ভাবে মুসলিমকে হত্যাকারী অথবা রক্তসম্পর্ক অস্বীকারকারী এবং এ ধরনের আরো যে সব অপরাধীর কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
হ্যাঁ, আবূ ইয়া'লা তাঁর গ্রন্থে ২৩৪৯ নং হাদীসে বর্ণনা করেছেন এবং অন্যান্যরা আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস হতে মারফু' সনদে বর্ণনা করেছেন যে,
عَرَى الْإِسْلَام وَقَوَاعِدُ الدِّينِ ثَلَاثَةٌ عَلَيْهِنَّ أُسِّسَ الْإِسْلَامُ مَنْ تَرَكَ مِنْهُنَّ وَاحِدَةٌ فَهُوَ بِهَا كَافِرٌ حَلَالُ الدَّمِ : شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَالصَّلَاةُ الْمَكْتُوْبَةُ وَصَوْمُ رَمَضَانَ
অর্থাৎ “ইসলামের মূল স্তম্ভ ও দীনের মৌলিক নীতি হলো তিনটি- তার উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি এগুলোর কোন একটি পরিত্যাগ করবে সে কাফের, তার রক্তপাত বৈধ :
১) شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ- আল্লাহ ব্যতীত (সত্য) কোন মা'বুদ নেই” এ কথার সাক্ষ্য দেয়া।
২) الصَّلَاةُ الْمَكْتُوْبَةُ - ফরয সলাত আদায় করা।
৩) صَوْمُ رَمَضَانَ - রামাযান মাসের সিয়াম পালন।
আমি (আলবানী) বলছি যে, যদি এ হাদীসটি সহীহ হতো তাহলে তা সলাত ত্যাগকারী কাফের হওয়ার পক্ষে স্পষ্ট দলীল সাব্যস্ত হতো। কিন্তু তাদের বর্ণিত হাদীসটি সহীহ নয়। এ সম্পর্কে আমি “সিলসিলাহ যঈ'ফার ৯৪ নং এ বর্ণনা দিয়েছি।
সারকথা : শুধু সলাত পরিত্যাগ করা কোনো মুসলিম ব্যক্তি কাফের হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। তবে অবশ্যই সে ফাসিক এবং তার বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে; তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন, ইচ্ছা করলে ক্ষমাও করতে পারেন। অত্র বইয়ের মূলভিত্তি যে হাদীসটি সেই হাদীসটি এ বিষয়ের একটি স্পষ্ট প্রমাণ যা অস্বীকার করার কারো জন্য সুযোগ নেই।
অপরপক্ষে যে ব্যক্তিকে সলাতের দিকে আহ্বান করা হল ও তা আদায় না করলে হত্যা করার ভয় দেখানোও হল, তারপরেও সে ব্যক্তি যদি আহবানে সাড়া না দিয়ে সলাত আদায় না করে; ফলে তাকে হত্যা করা হয় তবে দৃঢ়তার সাথে বলা যায় সে ব্যক্তি কাফের, তার রক্তপাত হালাল ও বৈধ; তার জানাযা পড়া হবে না এবং তাকে মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা হবে না।
সুতরাং যে ব্যক্তি বিস্তারিত না জেনে সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের হওয়ার ফায়সালা দিবে সে ভুল করবে; যে ব্যক্তি কাফের না হওয়ার ফায়সালা দিবে সেও ভুল করবে। সঠিক কথা এই যে, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ রয়েছে। আর এটা এমন সত্য বিষয় যে সম্পর্কে কোনো গোপনিয়তা নেই। সুতরাং এ বিষয়কে নিয়তের উপর ছেড়ে দিতে হবে।

টিকাঃ
৩৩. সুনান ইবনু মাজাহ হা. ১০৮০, সুনান নাসায়ী হা. ৪৬৪
৩৪. সুনান ইবনু মাজাহ, নাসায়ী, হাদীস সহীহ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00