📄 শাফা'আতের হাদীস
নিম্নে বর্ণিত হাদীসটি ইমাম মা'মার ইবনু রাশেদ আল-জামে' (১১/৪০৯-৪১১) কিতাবে বর্ণনা করে মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাকের সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন। যা যায়েদ বিন আসলাম থেকে, তিনি আত্মত্বা বিন ইয়াসার থেকে, তিনি আবূ সাঈদ আল-খুদরী হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ إِذَا خَلَصَ الْمُؤْمِنُونَ مِنْ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَمِنُوا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ) فَمَا مُجَادَلَهُ أَحَدِكُمْ لِصَاحِبِهِ فِي الْحَقِّ يَكُونُ لَهُ فِي الدُّنْيَا بِأَشَدِ مُجَادَلَةٌ لَهُ مِنْ الْمُؤْمِنِينَ لِرَبِّهِمْ فِي إِخْوَانِهِمْ الَّذِينَ أُدْخِلُوا النَّارَ قَالَ يَقُولُونَ رَبَّنَا إِخْوَانُنَا كَانُوا يُصَلُّونَ مَعَنَا وَيَصُومُونَ مَعَنَا وَيَحُجُونَ مَعَنَا وَيُجَاهِدُوْنَ مَعَنَا) فَأَدْخَلْتَهُمْ النَّارَ قَالَ فَيَقُولُ اذْهَبُوا فَأَخْرِجُوا مَنْ عَرَفْتُمْ فَيَأْتُونَهُمْ فَيَعْرِفُونَهُمْ بِصُوَرِهِمْ لَا تَأْكُلُ النَّارُ صُوَرَهُمْ (لَمْ تَغْشَ الْوَجْهُ فَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ النَّارُ إِلَى أَنْصَافِ سَاقَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ إِلَى كَعْبَيْهِ (فَيُخْرِجُونَ مِنْهَا بَشَرًا كَثِيرًا) فَيَقُولُونَ رَبَّnَا أَخْرَجْنَا مَنْ أَمَرْتَنَا. قال ثُمَّ (يَعُودُوْنَ يَتَكَلَّمُونَ) يَقُولُ أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ دِينَارٍ مِنْ الْإِيمَانِ (فَيُخْرِجُوْنَ خَلْقاً كَثِيرًا) ثُمَّ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا لَمْ نَذَرْ فِيْهَا أَحَدًا مَنْ أَمَرْتَنَا. ثُمَّ يَقُوْلُ : ارْجِعُواْ فَمَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ نِصْفِ دِينَارٍ فَأَخْرَجُواهُ فَيُخْرِجُوْنَ خَلْقًا كَثِيْرًا ثُمَّ يَقُوْلُوْنَ : رَبَّنَا لَمْ نَذَرْ فِيْهَا مِمَّنْ أَمَرْتَنَا ( حَتَّى يَقُولَ اخرجوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فَيُخْرَجُوْنَ خَلْقًا كَثِيرًا) قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَمَنْ لَمْ يُصَدِّقْ بِهَذَا فَلْيَقْرَأُ هَذِهِ الْآيَةَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا} قَالَ فَيَقُولُونَ رَبَّنَا قَدْ أَخْرَجْنَا مَنْ أَمَرْتَنَا فَلَمْ يَبْقَ فِي النَّارِ أَحَدٌ فِيهِ خَيْرٌ قَالَ ثُمَّ يَقُولُ اللهُ شَفَعَتْ الْمَلَائِكَةُ وَشَفَعَ الْأَنْبِيَاءُ وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُونَ وَبَقِيَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ قَالَ فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنْ النَّارِ أَوْ قَالَ قَبْضَتَيْنِ نَاسٌ لَمْ يَعْمَلُوا لِلَّهِ خَيْرًا قَط قَدْ احْتَرَقُوا حَتَّى صَارُوا حُمَمًا قَالَ فَيُؤْتَى بِهِمْ إِلَى مَاءٍ يُقَالُ لَهُ مَاءُ الْحَيَاةِ فَيُصَبُّ عَلَيْهِمْ فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحَبَّةُ فِي حَمِيلِ السَّيْلِ فَيَخْرُجُونَ مِنْ أَجْسَادِهِمْ مِثْلَ اللُّؤْلُوْ فِي أَعْنَاقِهِمْ الْخَاتَمُ عُتَقَاءُ اللهِ قَالَ فَيُقَالُ لَهُمْ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ فَمَا تَمَنَّيْتُمْ أَوْ رَأَيْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ لَكُمْ عِنْدِي أَفْضَلُ مِنْ هَذَا قَالَ فَيَقُولُونَ رَبَّنَا وَمَا أَفْضَلُ مِنْ ذَلِكَ قَالَ فَيَقُولُ رِضَائِي عَلَيْكُمْ فَلَا أَسْخَطُ عَلَيْكُمْ أَبَدًا
রাসূলুল্লাহ বলেছেন: মু'মিনগণ যখন জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে এবং নিরাপত্তা লাভ করবে (সেই সত্ত্বার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ) তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি দুনিয়াতে তার অধিকার আদায়ের ব্যাপারে তার ভাইয়ের সাথে যেমন ঝগড়া বা বাক-বিতণ্ডা করে থাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে জাহান্নামে প্রবেশকারী তার মু'মিন ভাইয়ের জন্য তার চেয়ে অধিক তর্ক বিতর্ক করবে। রাসূলুল্লাহ বলছেন, মু'মিনগণ সেদিন বলবে : হে আমাদের রব! আমাদের ভাইয়েরা আমাদের সাথে সলাত আদায় করেছে, সিয়াম পালন করেছে, হাজ্জ করেছে (এবং আমাদের সাথে জিহাদ করেছে) তারপরও কি তাদেরকে জাহান্নামে দিয়েছেন! রাসূলুল্লাহ বলেন, অতঃপর আল্লাহ বলবেন, যাও তোমরা যাদেরকে চেন জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। এরপর তারা তাদের নিকট আসবে এবং তাদের চেহারা দেখে চিনতে পারবে। জাহান্নামের আগুন তাদের চেহারা ভক্ষণ করবেনা (মুখমণ্ডল বিকৃত হবে না)। তাদের মধ্যে কতিপয়ের পায়ের নলা পর্যন্ত আগুন গ্রাস করবে। আবার কাহারো উভয় পায়ের গিরা পর্যন্ত। (সুতরাং বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।)
অতঃপর তারা বলবে : হে আমাদের রব! যাদেরকে বের করে আনার আদেশ দিয়েছিলেন তাদেরকে আমরা বের করে এনেছি। রাসূলুল্লাহ বলেন, অতঃপর (তারা প্রত্যাবর্তন করবে এবং কথাবার্তা বলবে) আল্লাহ বলবেন, যাদের অন্তরে দিনার পরিমাণ ঈমান রয়েছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। এরপর তারা বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে। অতঃপর তারা (মু'মিনগণ) বলবে : হে আমাদের রব! আপনি যাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার আদেশ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে কাউকে জাহান্নামে রেখে আসিনি। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, তোমরা আবার ফিরে যাও। দেখ, যার অন্তরে অর্ধেক দিনার পরিমাণ ঈমান রয়েছে- তোমরা তাকে বের করে আনো। অতএব তারা বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে।
অতঃপর তারা বলবে, হে আমাদের রব! আপনি যাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার আদেশ দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কাউকে জাহান্নামে রেখে আসিনি। এমনকি শেষ পর্যায়ে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, যাও যার অন্তরে যাররা (অণু) পরিমাণ ঈমান রয়েছে তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। অতএব তারা আবারো বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে। বর্ণনাকারী আবূ সাঈদ খুদরী বলেছেন, এ হাদীসের প্রতি যে বিশ্বাস করে না, সে যেন নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে। আয়াতটি হল :
إِنَّ اللهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةٌ تُضْعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا
“আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করেন না আর কোনো পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ করেন এবং নিজের নিকট হতেও বিরাট পুরস্কার দান করেন।”²²
অতঃপর মু'মিনগণ বলবেন, হে আমাদের রব্ব! আপনি যাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার আদেশ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে কল্যাণের অধিকারী (ঈমানদার) ব্যক্তি কেউ অবশিষ্ট নেই। রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর আল্লাহ বলবেন, ফেরেশ্রামণ্ডলী সুপারিশ করেছে, নাবীগণ সুপারিশ করেছে, মু'মিনগণ সুপারিশ করেছে: এখন সবচেয়ে দয়াবান মহান আল্লাহ বাকি আছেন।
রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর আল্লাহ এক অঞ্জলী অথবা দু' অঞ্জলী পরিমাণ মানুষকে জাহান্নাম থেকে উঠাবেন, যারা আল্লাহর জন্য (ঈমান ব্যতীত) কখনই কল্যাণমূলক কাজ করেনি। তাদেরকে আগুনে পোড়ানো হয়েছে; এমনকি তারা কয়লায় পরিণত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর তাদেরকে পানির কাছে আনা হবে, যেটাকে বলা হয় 'হায়াত'। আর তাদের উপর সেই হায়াত নামক পানি ঢেলে দেয়া হবে, ফলে তারা গজিয়ে উঠবে যেভাবে প্রবহমান ঝর্ণার পাশে শস্য গজিয়ে উঠে। (তোমরা প্রস্তর খণ্ডের পার্শ্বে দিয়ে এবং বৃক্ষের পার্শ্বে দিয়ে যেতে অবশ্য দেখেছ, যে পার্শ্বটি সূর্যের দিকে থাকে সেটি সবুজ রঙের হয় আর যে পার্শ্বটি ছায়ার দিকে থাকে সেটি সাদা হয়ে থাকে)।
রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর সেই পানির স্পর্শে তাদের শরীর মণি-মুক্তার ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তাদের ঘাড়ে একটি সিল থাকবে। আল্লাহ তাদেরকে মুক্ত করবেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর যেমনটি আকাঙ্ক্ষা করতে। আর তোমরা সেখানে যে বস্তুসমূহ দেখতে পাবে সব কিছু তোমাদের জন্য (এবং এর সাথে অনুরূপ পরিমাণ পাবে)। এরপর জান্নাতবাসীগণ বলবে : এরা তো ঐসব লোক যাদেরকে পরম করুণাময় আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেছেন এবং কোনো প্রকার আমল ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন এবং তাদের এমন কোনো ভাল আমল ছিলনা যা তাদেরকে জান্নাতের পথে অগ্রগামী করে দেয়।
রাসূলুল্লাহ বলেন : অতঃপর তারা বলবে : হে আমাদের রব! আমাদেরকে এমন বস্তু দান করেছেন যা দুনিয়াতে কাউকে দান করেন নি। রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর আল্লাহ বলবেন : আমার নিকট তোমাদের জন্য এমন বস্তু রয়েছে যা সবচেয়ে উত্তম। এরপর তারা বলবে : হে আমাদের রব! এর চেয়ে অধিক উত্তম? সেটি কী? রাসূলুল্লাহ বলেন, অতঃপর আল্লাহ বলবেন, তোমাদের উপর আমার সন্তুষ্টি এবং খুশি। অতএব তোমাদের উপর আমি আর কখনই অসন্তুষ্ট হবো না।
ইমাম বুখারী এবং মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদীসটি সহীহ। যা আব্দুর রাজ্জাকের রেওয়ায়েত থেকে বর্ণিত, তিনি মা'মার থেকে বর্ণনা করেছেন। আর আব্দুর রাজ্জাকের সূত্র থেকে ইমাম আহমাদ (৩/৯৪) সংকলন করেছেন; নাসাঈ (২/২৭১); ইবনু মাজাহ হা. ৬০, ইবনু খুজায়মা আত্-তাওহীদ কিতাবে পৃ. (১৮৪, ২০১, এবং ২১২) ইবনু নাসার আল-মারুজী "তা'যীমু ক্বদরীস সলাত” নামক কিতাবে হা. ২৭৬। আব্দুর রাজ্জাক হাদীসটিকে অনুসরণ করেছেন; মুহাম্মাদ ইবনু সাওর তিনি মা'মার থেকে রেওয়ায়েত করেছেন; তবে হুবহু শব্দগুলো আনেন নি, তিনি কেবল সদৃশ বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ হিশাম ইবনু সা'দের হাদীসকে সংকলন করেছেন। আর একটি জামা'আত মা'মারকে অনুসরণ করেছেন।
তন্মধ্যে :
১ম : সাঈদ ইবনু আবূ হেলাল যিনি যায়েদ বিন আসলাম থেকে বর্ণনা করেছেন এবং হাদীসটিকে পূর্ণ করেছেন। হাদীসের প্রথম অংশ হচ্ছে অর্থাৎ চন্দ্র-সূর্য দেখতে কি তোমাদের কোনো সমস্যা হয়? ....
هَلْ تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ الشَّمْسِ وَالْقَمَرِ ....
এটা একটা দীর্ঘ হাদীস। ইমাম বুখারী হাদীসটি সংকলন করেছেন। হা. ৭৪৩৯, মুসলিম ১/১১৪-১১৭, ইবনু খুযায়মা পৃ. ২০১, ইবনু হিব্বান হা. ৭৩৩৩ আল-ইহসান।
২য় : হাফস্ ইবনু মাইসারাহ, তিনি যায়েদ থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি ইমাম মুসলিম সংকলন করেছেন (১/১১৪-১১৭) অনুরূপ বুখারী হা. ৪৫৮১। তবে ইমাম বুখারী হাদীসটি সম্পূর্ণ বর্ণনা করেননি। অনুরূপভাবে আবূ আওয়ানা (১/১৬৮-১৬৯)।
৩য় : হিশাম ইবনু সা'দ, তিনি যায়েদ থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি আবূ আওয়ানাহ সংকলন করেছেন (১/১৮১-১৮৩) এবং সম্পূর্ণ বর্ণনা করেছেন। ইবনু খুযায়মাহ পৃ. (২০০), হাকেম (৪/৫৮২-৫৮৪) সহীহ বলেছেন। অনুরূপ মুসলিম (১/১৭), তবে হুবহু শব্দগুলো আনেননি। তিনি কেবল হাফস্ ইবনু মাইসারার হাদীসের শব্দের বরাত দিয়েছেন। আর যায়েদকে অনুসরণ করেছেন সোলায়মান ইবনু আমর ইবনু উবায়দ আল আতওয়ারী। তিনি হচ্ছেন বনী লাইস গোত্রের এবং তিনি আবূ সাঈদ এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি আবূ সাঈদ খুদরী এর নিকট শুনেছি। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ এর নিকট বলতে শুনেছি-
অতঃপর তিনি অনুরূপ সংক্ষিপ্তাকারে হাদীসটি উল্লেখ করেন এবং তাতে ৩য় নাম্বারের রাবীকে অতিরিক্ত উল্লেখ করেছেন। ইমাম আহমাদ হাদীসটি সংকলন করেছেন (৩/১১-১২), ইবনু খুযায়মাহ পৃ. ২১১; ইবনু আবী শায়বাহ আল-মুসান্নিফ গ্রন্থে (১৩/ ১৭৬/১৬০৩৯) এবং তার নিকট থেকে ইবনু মাজাহ (৪২৮০), ইবনু জারির তার তাফসীর গ্রন্থে (১৬/৮৫), ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ যাওওয়াদুয যাহেদ গ্রন্থে পৃ. (৪৪৮/ ১২৬৮), হাকেম (৪/৫৮৫) এবং তিনি বলেছেন, মুসলিমের শর্তের ভিত্তিতে সনদটি সহীহ। ইমাম যাহাবী পরিস্কার বলে দিয়েছেন, হাদীসটি হাসান। কেননা, এর মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক তিনি বর্ণনা করে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। হাদীসটি এমনভাবে সংকলন করা হয়েছে যে, আর কোথাও তা পাওয়া যাবেনা। আর হাদীসটি মুত্তাফাকুন 'আলাইহ এবং অন্যান্য সহীহ, সুনান এবং মাসানিদ কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটির এসব তাখরীজ উল্লেখ করার পর আমি বলছি,
উক্ত হাদীসটিতে অনেক উপকারিতা রয়েছে:
যেমন নেক্কার মু'মিনগণ তাদের সাথে সলাত আদায়কারী ভাইদের ব্যাপারে সুপারিশ করা, যাদেরকে পাপের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হয়েছিল। অতঃপর ঈমানের তারতম্য অনুপাতে নিম্নতম জাহান্নামী মুমিনদের জন্যও সুপারিশ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক অবশিষ্ট মু'মিনকে বের করা যারা জাহান্নামে বাকি ছিল তাদেরকে মর্যাদা দান করা, তাদেরকে কোনো রকম সৎ আমল ছাড়াই জাহান্নাম থেকে বের করা এবং এমনকি তাদের এমন কোনো সৎ আমল ছিলনা যা রবের নিকট উপস্থিত করবে।
### কতক আলিমের সন্দেহ
কতিপয় আলেম সন্দেহ পোষণ করেছেন »لا خير« (সৎ আমল ব্যতীত) শব্দটি নিয়ে। তাদের মতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক কতিপয় আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইবনু হাজার ফাতহুল বারী গ্রন্থে (১৩/৪৩৯) বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এমন কতিপয় লোক যারা কালিমা শাহাদাতাইন এর বেশি কিছু স্বীকৃতি প্রদান করেনি। যা হাদীসটির বাকি অংশ থেকে বুঝা যায়।
আমি (আলবানী) বলছি: আনাস হতে শাফা'আতের ব্যাপারেও দীর্ঘ হাদীস রয়েছে। সেখানে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহকে বলা হবে- হে মুহাম্মাদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে। তুমি চাও, তোমাকে দেয়া হবে এবং সুপারিশ কর তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।
তখন রাসূলুল্লাহ বলবেন, হে আমার রব! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দিন ঐ সমস্ত লোকদের ব্যাপারে যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমা বলেছে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন: আমার ইজ্জতের কসম, আমার মহত্ব, আমার বড়ত্ব এবং আমার সম্মানের কসম, অবশ্যই আমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করব যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" কালিমা বলেছে।²³
আনাস হতে অন্য সূত্রে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলা মানুষের হিসাব নিকাশ শেষ করবেন এবং আমার উম্মতের অবশিষ্ট লোকদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাবেন। এরপর জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে যাওয়া তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে বলবে, তোমাদের আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার সাথে শরীক না করা কোন্ কাজে আসল? এরপর মহান আল্লাহ বলবেন, আমার ইজ্জতের কসম, অবশ্যই আমি তোমাদেরকে (তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে) জাহান্নাম থেকে মুক্ত করব। এরপর তাদের নিকট (দূত) পাঠানো হবে এবং তারা পুড়ে যাওয়া অবস্থায় জাহান্নাম থেকে বের হবে। অতঃপর তাদেরকে হায়াতের নহরে প্রবেশ করানো হবে এবং সেখান থেকে নতুন করে গজিয়ে উঠবে... ইমাম আহমাদ এবং অন্যান্যগণ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। আলবানী 'যিলাল' গ্রন্থে (৮৪৩-৮৪৫ নং) হাদীসের অধীনে উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে সমর্থক হাদীস রয়েছে। অনুরূপ ফাতহুল বারীতে (১১/৪৫৫) আলাদাভাবে সমর্থক হাদীস রয়েছে। আর হাদীসটির মধ্যে ইবনু আবী হামজার ইজতেহাদ এই মাস'আলার উপর যেটি বের হয়েছিল তা রাসূলুল্লাহর কথা দ্বারা প্রতিহত হয়েছে। সেখানে রয়েছে “মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত হবেনা”। অনুরূপ হাদীস পরবর্তীতে এসেছে যে- কেবল চেহারা ব্যতীত। তারা সবাই মুসলিম, তবে সলাত আদায় করেনি। কিন্তু তারা সেখান (জাহান্নাম) হতে বের হবে না, যেহেতু তাদের সাথে সৎ আমলের কোনো আলামতই নেই।
এজন্য হাফেজ ইবনু হাজার (১১/৪৫৭) তার কথার অনুসরণ করেছেন। তবে তিনি আম (সাধারণভাবে) এ কথা প্রয়োগ করেছেন। আর সেটি হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঞ্জলী দিয়ে জাহান্নামীদের বের করবেন। কেননা, হাদীসে এসেছে- তারা কখনই সৎ আমল করেনি। আর এটি আবূ সাঈদ এর হাদীসে উল্লেখ রয়েছে যা 'তাওহীদে”র আলোচনায় আসছে। অর্থাৎ তিনি এই হাদীসকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আর হাফেজ ইবনু হাজার হয়তোবা ভুলে গেছেন কেননা, হাদীসটিতে তিনি নিজেই অন্য দিক দিয়ে ইবনু আবী হামজাকে অনুসরণ করেছেন। সেটি হল- যখন আল্লাহ তা'আলা প্রথম বার মু'মিনদের সুপারিশ কবুল করবেন তাদের সাথে সলাত, সওম ইত্যাদি আদায়কারী ব্যক্তিদের ব্যাপারে এবং তারা জাহান্নাম থেকে তাদের মুসলিম ভাইদের বের করে আনবেন চিহ্ন দেখে। সুতরাং যখন তারা পরবর্তীতে কয়েকবার সুপারিশ করবে এবং বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে, তখন তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে সলাت আদায় করেছিল এমন ব্যক্তি থাকবেনা। কেবল তাদের মধ্যে কল্যাণ বিদ্যমান থাকবে তাদের ঈমান অনুপাতে এবং এটিই হচ্ছে সুস্পষ্ট বিষয় যা কারো অজানা নয়। ইনশাআল্লাহ।
### গবেষণা ও পর্যালোচনা
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রতীয়মান হয় প্রাগুক্ত হাদীসটি এ ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ করে যে, যখন সলাত বর্জনকারী ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমার উপর সাক্ষ্য অবস্থায় মুসলিম হিসেবে ইন্তেকাল করলে মুশরিকদের ন্যায় চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে না। সুতরাং এতে অত্যন্ত মজবুত দলীল রয়েছে যে, সলাত বর্জনকারী আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। কেননা, আল্লাহ বলেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন।”²⁴ ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে (৬/২৪০) আয়েশা হতে মারফু' সূত্রে স্পষ্টভাবে হাদীস বর্ণনা করেছেন- শব্দগুলো হচ্ছে-
الدواوين عند الله عز وجل ثلاثة ... ) الحديث
অর্থাৎ আল্লাহর নিকট তিনটি দফতর রয়েছে- তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, যা আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করবেন না, আর তাহল তাঁর সাথে শিরক করা। মহান আল্লাহ বলেন,
مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করল তার উপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন।²⁵
আরেকটি দিওয়ান (আমলনামা) যেটাকে আল্লাহ পরওয়া (ভ্রুক্ষেপ) করবেন না- তা হচ্ছে, বান্দার নিজের উপর যুলুম। যা বান্দা এবং তার রবের মাঝে চুক্তি ছিল। যেমন সে একদিনের সওম ছেড়ে দিয়েছে, কিংবা সলাত বর্জন করেছে; অতএব মহান আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেবেন এবং ইচ্ছা করলে কিছু মনে করবেন না...।²⁶ ইমাম হাকেম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে সহীহ বলেছেন। আমি 'তাখরিজুত ত্বাহাবী' গ্রন্থে (পৃ. ৩৬৭, চতুর্থ সংস্করণ) এ সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণনা করেছি যা এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা পূর্বের আলোচনা অবগত হলেন। আমি সীমাহীন অবাক হই সে সব সংখ্যাগরিষ্ঠ লেখকগণ সম্পর্কে যারা “অলসতাবশত সলাত বর্জনকারী কাফের হবে বা নাকি হবে না?” এর মত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাহ নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখা-লেখি করেছেন, কিন্তু অসচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। আমার জানা মতে, যে হাদীসটি আমি উল্লেখ করেছি তা বর্ণনা করতে প্রায় সবাই বে-খবর, অথচ তা বিশুদ্ধতার বিষয়ে ইমাম বুখারী এবং মুসলিম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য কিতাবে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। আর তারা এটাও উল্লেখ করেননি, হাদীসটি কোন্ দলের স্বপক্ষের দলীল এবং কোন্ দলের বিপক্ষের দলীল। বিশেষ করে ইবনুল কায়্যিম বিভিন্ন দলীল প্রমাণ দিয়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তার 'সলাত' নামক গ্রন্থে বিভিন্ন দলীল দিয়ে তাদের প্রত্যেকটির উত্তর প্রদান করেছেন। তবে যাদের মতে “সলাত বর্জনকারী কাফের হবে না” তাদের মতের স্বপক্ষের উক্ত হাদীসটি তিনি অতি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছেন। যার ফলে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি যে, সলাত বর্জনকারীরাও শাফা'আতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, শাফা'আতের হাদীসটিতে রয়েছে-
يَقُوْلُ اللهُ عَزَّ وَ جَلَّ : وَعِزَّتِي وَ جَلَالِي لَأَخْرُجَنَّ مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
অর্থাৎ মহান আল্লাহ বলবেন: আমার ইজ্জত এবং আমার মাহাত্ম্যের কসম! যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে অবশ্যই আমি তাকে জাহান্নাম থেকে বের করবো।
হাদীসটিতে আরো রয়েছে :
فَيَخْرُجُ مِنْ النَّارِ مَنْ لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ)
অর্থাৎ, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম থেকে এমন সব লোকদের বের করবেন, যারা কখনই কোনো সৎ আমল করেনি।
... فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنْ النَّارِ نَاسًا لَمْ يَعْمَلُوْا اللَّهَ خَيْرًا قَطَّ ....
অর্থাৎ অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঞ্জলী দিয়ে এক অঞ্জলী লোককে জাহান্নাম থেকে উঠাবেন, যারা আল্লাহর জন্য কখনই সৎ আমল করেনি।
পাঠকবৃন্দ! এখানে যে কারণে বিরুদ্ধবাদীরা হাদীসটি সংক্ষেপ করেছেন তা খুবই ক্ষতিকারক, যা স্পষ্ট। কেননা, বিষয়টি আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি। আর হাফেয ইবনু হাজার স্বীয় মুস্তাদরাকে ইবনে আবী জাময়ার হাদীসের পূর্ণরূপ উল্লেখ করেছেন। যার দ্বারা বোঝা যায় যে, মু'মিন ব্যক্তিরা দ্বিতীয় বার বেনামাযী ও তাদের পরে যারা আছে তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে। অতএব মাসআলাটির ক্ষেত্রে এটি একটি অকাট্য দলীল। যে সকল বিদ্বান অভিন্ন আকীদায় বিশ্বাসী অত্র দলীল দ্বারা এ মাসআলাহর ব্যাপারে তাদের মতবিরোধ দূর হয়ে যাবে। যে আকীদার অন্যতম একটি হল উম্মাতের মুহাম্মাদীর কোন ব্যক্তি কবীরা গুনাহর কারণে কাফির হবে না। বিশেষ করে বর্তমান যামানায় যখন এমন ব্যক্তিদের প্রসার হয়েছে যারা নিজেদেরকে আলিম বলে দাবী করে আর বিশ্বাস রাখে; আকীদাহ শুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও যদি কোন মুসলিম ওয়াজিব আমল পালনে অবহেলা করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। তবে কাফেরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, তারা ইসলামকে স্বীকৃতিও দেয় না এবং দীন পালনার্থে সলাতও আদায় করে না।
মহান আল্লাহ বলেন,
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُوْنَ)
“আমি কি মুসলিমদেরকে অপরাধীদের মত গণ্য করব? তোমাদের কী হয়েছে, তোমরা কেমনভাবে বিচার করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছ?”²⁷
আমি ইমাম ইবনুল কায়্যিম কে ভালবাসি এজন্য যে, তিনি এ সহীহ হাদীসটি উল্লেখ করতে অসতর্ক ছিলেন না, যা সলাত বর্জনকারী কাফির না হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণ। আর তার কাছে এর কোন উত্তর থাকলে প্রদান করতেন। ফলে বিনা পক্ষপাতিত্বে উভয় দলের একটি ইনসাফপূর্ণ সমাধান হতো।
টিকাঃ
২২. সূরাহ আন্-নিসা ৪ : ৪০
২৩. মুত্তাফাকুন আলাইহ, আলবানী "যিলালুল জান্নাহ" কিতাবে (২/২৯৬) উল্লেখ করেছেন
২৪. সূরাহ আন্-নিসা : ৪৪
২৫. সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫ : ৭
২৬. হাকেম (৪/৫৭৬)
২৭. সূরাহ আল-ক্বালাম ৬৮: ৩৫-৩৬
📄 কতক আলিমের সন্দেহ
কতিপয় আলেম সন্দেহ পোষণ করেছেন »لا خير« (সৎ আমল ব্যতীত) শব্দটি নিয়ে। তাদের মতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক কতিপয় আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইবনু হাজার ফাতহুল বারী গ্রন্থে (১৩/৪৩৯) বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এমন কতিপয় লোক যারা কালিমা শাহাদাতাইন এর বেশি কিছু স্বীকৃতি প্রদান করেনি। যা হাদীসটির বাকি অংশ থেকে বুঝা যায়।
আমি (আলবানী) বলছি: আনাস হতে শাফা'আতের ব্যাপারেও দীর্ঘ হাদীস রয়েছে। সেখানে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহকে বলা হবে- হে মুহাম্মাদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে। তুমি চাও, তোমাকে দেয়া হবে এবং সুপারিশ কর তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।
তখন রাসূলুল্লাহ বলবেন, হে আমার রব! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দিন ঐ সমস্ত লোকদের ব্যাপারে যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমা বলেছে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন: আমার ইজ্জতের কসম, আমার মহত্ব, আমার বড়ত্ব এবং আমার সম্মানের কসম, অবশ্যই আমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করব যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" কালিমা বলেছে।²³
আনাস হতে অন্য সূত্রে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলা মানুষের হিসাব নিকাশ শেষ করবেন এবং আমার উম্মতের অবশিষ্ট লোকদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাবেন। এরপর জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে যাওয়া তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে বলবে, তোমাদের আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার সাথে শরীক না করা কোন্ কাজে আসল? এরপর মহান আল্লাহ বলবেন, আমার ইজ্জতের কসম, অবশ্যই আমি তোমাদেরকে (তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে) জাহান্নাম থেকে মুক্ত করব। এরপর তাদের নিকট (দূত) পাঠানো হবে এবং তারা পুড়ে যাওয়া অবস্থায় জাহান্নাম থেকে বের হবে। অতঃপর তাদেরকে হায়াতের নহরে প্রবেশ করানো হবে এবং সেখান থেকে নতুন করে গজিয়ে উঠবে... ইমাম আহমাদ এবং অন্যান্যগণ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। আলবানী 'যিলাল' গ্রন্থে (৮৪৩-৮৪৫ নং) হাদীসের অধীনে উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে সমর্থক হাদীস রয়েছে। অনুরূপ ফাতহুল বারীতে (১১/৪৫৫) আলাদাভাবে সমর্থক হাদীস রয়েছে। আর হাদীসটির মধ্যে ইবনু আবী হামজার ইজতেহাদ এই মাস'আলার উপর যেটি বের হয়েছিল তা রাসূলুল্লাহর কথা দ্বারা প্রতিহত হয়েছে। সেখানে রয়েছে “মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত হবেনা”। অনুরূপ হাদীস পরবর্তীতে এসেছে যে- কেবল চেহারা ব্যতীত। তারা সবাই মুসলিম, তবে সলাত আদায় করেনি। কিন্তু তারা সেখান (জাহান্নাম) হতে বের হবে না, যেহেতু তাদের সাথে সৎ আমলের কোনো আলামতই নেই।
এজন্য হাফেজ ইবনু হাজার (১১/৪৫৭) তার কথার অনুসরণ করেছেন। তবে তিনি আম (সাধারণভাবে) এ কথা প্রয়োগ করেছেন। আর সেটি হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঞ্জলী দিয়ে জাহান্নামীদের বের করবেন। কেননা, হাদীসে এসেছে- তারা কখনই সৎ আমল করেনি। আর এটি আবূ সাঈদ এর হাদীসে উল্লেখ রয়েছে যা 'তাওহীদে”র আলোচনায় আসছে। অর্থাৎ তিনি এই হাদীসকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আর হাফেজ ইবনু হাজার হয়তোবা ভুলে গেছেন কেননা, হাদীসটিতে তিনি নিজেই অন্য দিক দিয়ে ইবনু আবী হামজাকে অনুসরণ করেছেন। সেটি হল- যখন আল্লাহ তা'আলা প্রথম বার মু'মিনদের সুপারিশ কবুল করবেন তাদের সাথে সলাত, সওম ইত্যাদি আদায়কারী ব্যক্তিদের ব্যাপারে এবং তারা জাহান্নাম থেকে তাদের মুসলিম ভাইদের বের করে আনবেন চিহ্ন দেখে। সুতরাং যখন তারা পরবর্তীতে কয়েকবার সুপারিশ করবে এবং বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে, তখন তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে সলাত আদায় করেছিল এমন ব্যক্তি থাকবেনা। কেবল তাদের মধ্যে কল্যাণ বিদ্যমান থাকবে তাদের ঈমান অনুপাতে এবং এটিই হচ্ছে সুস্পষ্ট বিষয় যা কারো অজানা নয়। ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
২৩. মুত্তাফাকুন আলাইহ, আলবানী "যিলালুল জান্নাহ" কিতাবে (২/২৯৬) উল্লেখ করেছেন।
📄 গবেষণা ও পর্যালোচনা
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রতীয়মান হয় প্রাগুক্ত হাদীসটি এ ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ করে যে, যখন সলাত বর্জনকারী ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমার উপর সাক্ষ্য অবস্থায় মুসলিম হিসেবে ইন্তেকাল করলে মুশরিকদের ন্যায় চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে না। সুতরাং এতে অত্যন্ত মজবুত দলীল রয়েছে যে, সলাত বর্জনকারী আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। কেননা, আল্লাহ বলেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন।”²⁴ ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে (৬/২৪০) আয়েশা হতে মারফু' সূত্রে স্পষ্টভাবে হাদীস বর্ণনা করেছেন- শব্দগুলো হচ্ছে-
الدواوين عند الله عز وجل ثلاثة ... ) الحديث
অর্থাৎ আল্লাহর নিকট তিনটি দফতর রয়েছে- তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, যা আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করবেন না, আর তাহল তাঁর সাথে শিরক করা। মহান আল্লাহ বলেন,
مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করল তার উপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন।²⁵
আরেকটি দিওয়ান (আমলনামা) যেটাকে আল্লাহ পরওয়া (ভ্রুক্ষেপ) করবেন না- তা হচ্ছে, বান্দার নিজের উপর যুলুম। যা বান্দা এবং তার রবের মাঝে চুক্তি ছিল। যেমন সে একদিনের সওম ছেড়ে দিয়েছে, কিংবা সলাত বর্জন করেছে; অতএব মহান আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেবেন এবং ইচ্ছা করলে কিছু মনে করবেন না...।²⁶ ইমাম হাকেম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে সহীহ বলেছেন। আমি 'তাখরিজুত ত্বাহাবী' গ্রন্থে (পৃ. ৩৬৭, চতুর্থ সংস্করণ) এ সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণনা করেছি যা এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা পূর্বের আলোচনা অবগত হলেন। আমি সীমাহীন অবাক হই সে সব সংখ্যাগরিষ্ঠ লেখকগণ সম্পর্কে যারা “অলসতাবশত সলাত বর্জনকারী কাফের হবে বা নাকি হবে না?” এর মত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাহ নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখা-লেখি করেছেন, কিন্তু অসচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। আমার জানা মতে, যে হাদীসটি আমি উল্লেখ করেছি তা বর্ণনা করতে প্রায় সবাই বে-খবর, অথচ তা বিশুদ্ধতার বিষয়ে ইমাম বুখারী এবং মুসলিম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য কিতাবে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। আর তারা এটাও উল্লেখ করেননি, হাদীসটি কোন্ দলের স্বপক্ষের দলীল এবং কোন্ দলের বিপক্ষের দলীল। বিশেষ করে ইবনুল কায়্যিম বিভিন্ন দলীল প্রমাণ দিয়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তার 'সলাত' নামক গ্রন্থে বিভিন্ন দলীল দিয়ে তাদের প্রত্যেকটির উত্তর প্রদান করেছেন। তবে যাদের মতে “সলাত বর্জনকারী কাফের হবে না” তাদের মতের স্বপক্ষের উক্ত হাদীসটি তিনি অতি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছেন। যার ফলে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি যে, সলাত বর্জনকারীরাও শাফা'আতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, শাফা'আতের হাদীসটিতে রয়েছে-
يَقُوْلُ اللهُ عَزَّ وَ جَلَّ : وَعِزَّتِي وَ جَلَالِي لَأَخْرُجَنَّ مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
অর্থাৎ মহান আল্লাহ বলবেন: আমার ইজ্জত এবং আমার মাহাত্ম্যের কসম! যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে অবশ্যই আমি তাকে জাহান্নাম থেকে বের করবো।
হাদীসটিতে আরো রয়েছে :
فَيَخْرُجُ مِنْ النَّارِ مَنْ لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ)
অর্থাৎ, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম থেকে এমন সব লোকদের বের করবেন, যারা কখনই কোনো সৎ আমল করেনি।
... فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنْ النَّارِ نَاسًا لَمْ يَعْمَلُوْا اللَّهَ خَيْرًا قَطَّ ....
অর্থাৎ অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঞ্জলী দিয়ে এক অঞ্জলী লোককে জাহান্নাম থেকে উঠাবেন, যারা আল্লাহর জন্য কখনই সৎ আমল করেনি।
পাঠকবৃন্দ! এখানে যে কারণে বিরুদ্ধবাদীরা হাদীসটি সংক্ষেপ করেছেন তা খুবই ক্ষতিকারক, যা স্পষ্ট। কেননা, বিষয়টি আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি। আর হাফেয ইবনু হাজার স্বীয় মুস্তাদরাকে ইবনে আবী জাময়ার হাদীসের পূর্ণরূপ উল্লেখ করেছেন। যার দ্বারা বোঝা যায় যে, মু'মিন ব্যক্তিরা দ্বিতীয় বার বেনামাযী ও তাদের পরে যারা আছে তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে। অতএব মাসআলাটির ক্ষেত্রে এটি একটি অকাট্য দলীল। যে সকল বিদ্বান অভিন্ন আকীদায় বিশ্বাসী অত্র দলীল দ্বারা এ মাসআলাহর ব্যাপারে তাদের মতবিরোধ দূর হয়ে যাবে। যে আকীদার অন্যতম একটি হল উম্মাতের মুহাম্মাদীর কোন ব্যক্তি কবীরা গুনাহর কারণে কাফির হবে না। বিশেষ করে বর্তমান যামানায় যখন এমন ব্যক্তিদের প্রসার হয়েছে যারা নিজেদেরকে আলিম বলে দাবী করে আর বিশ্বাস রাখে; আকীদাহ শুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও যদি কোন মুসলিম ওয়াজিব আমল পালনে অবহেলা করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। তবে কাফেরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, তারা ইসলামকে স্বীকৃতিও দেয় না এবং দীন পালনার্থে সলাতও আদায় করে না।
মহান আল্লাহ বলেন,
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُوْنَ)
“আমি কি মুসলিমদেরকে অপরাধীদের মত গণ্য করব? তোমাদের কী হয়েছে, তোমরা কেমনভাবে বিচার করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছ?”²⁷
আমি ইমাম ইবনুল কায়্যিম কে ভালবাসি এজন্য যে, তিনি এ সহীহ হাদীসটি উল্লেখ করতে অসতর্ক ছিলেন না, যা সলাত বর্জনকারী কাফির না হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণ। আর তার কাছে এর কোন উত্তর থাকলে প্রদান করতেন। ফলে বিনা পক্ষপাতিত্বে উভয় দলের একটি ইনসাফপূর্ণ সমাধান হতো।
টিকাঃ
২৪. সূরাহ আন্-নিসা : ৪৪
২৫. সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫ : ৭
২৬. হাকেম (৪/৫৭৬)
২৭. সূরাহ আল-ক্বালাম ৬৮: ৩৫-৩৬
📄 কুফর দু' প্রকার
ইবনুল কায়্যিম কে আমি ভালবাসি এবং পছন্দ করি। তিনি (সলাত পরিত্যাগকারীকে) কাফের না বলার এ সহীহ হাদীসটি উল্লেখ করা হতে বেখেয়াল হন নি। আর তিনি যথাসাধ্য উত্তর প্রদান করেছেন এবং এজন্য তিনি উভয় দলকে নিয়ে পরস্পর আলোচনা করেছেন। আর কোনো দলের পক্ষাবলম্বন না করে নিরপেক্ষ আলোচনা করেছেন।
হ্যাঁ, তবে তিনি এ ব্যাপারে বিশেষভাবে আলোচনা করা আমার উপর শিরোধার্য করে দিয়েছেন। ইবনুল কায়্যিম বিশেষভাবে একটি অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন (উভয় দলের মধ্যে ফায়সালার ব্যাপারে এবং উভয় দলের কাছে প্রস্তাব রাখার জন্য) যা উভয় দলের দলীলগুলো সঠিকভাবে বোধগম্য হতে গবেষককে সহায়তা করবে। কেননা, তিনি এ ব্যাপারে সুন্দর এবং চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন- “উলামাদের নিকট গ্রহণযোগ্য অভিমত হলো প্রত্যেক কুফরী কর্মের কারণে মুসলিম ইসলাম ধর্ম থেকে বের হয়ে যায় না।”
সুতরাং পাঠকদের নিকট আমি (আলবানী) তাঁর (ইবনুল কায়্যিম) আলোচনার মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করব এবং এর পাশাপাশি সহীহ হাদীসকে লক্ষ্য রেখে আমি তাঁকে অনুসরণ করব। তিনি বর্ণনা করেছেন :
أَنَّ الْكُفْرَ نَوْعَانِ : كُفْرٌ عَمَلٌ وَكُفْرٌ جُحُوْدٌ وَإِعْتِقَادٌ.
অর্থাৎ কুফরী দুই প্রকার :
১. আমলগত দিক থেকে কুফর।
২. আক্বীদাগত এবং অস্বীকারবশত কুফর।
আমলগত কুফর দু' ভাগে বিভক্ত :
১ম প্রকার : এমন কুফর যা ঈমানের বিপরীত।
২য় প্রকার : এমন কুফর যা ঈমানের বিপরীত নয়।
সুতরাং মূর্তিকে সিজদা করা, কুরআন মাজীদকে অপমান এবং তুচ্ছ মনে করা, রাসূলুল্লাহকে হত্যা করা বা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, তাকে গালি দেয়া ইত্যাদি কর্ম যা ঈমানের বিপরীত। আর আল্লাহ তা'আলা যা নাযিল করেছেন তা ব্যতীত অন্যান্য বিধান দ্বারা ফায়সালা করা এবং সলাত বর্জন করা এগুলো অকাট্যভাবে আমলগত কুফরের অন্তর্ভুক্ত।
আমি (আলবানী) বলছি, যে কথাগুলো তিনি প্রয়োগ করেছেন সে ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে। কেননা, উল্লেখিত বিষয়টি কখনো কখনো كُفُرْ إِعْتِقَادٌ (আক্বীদাগত কুফরের) অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আর এটা ঐ সময় হয়, যখন আক্বীদা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো নিদর্শনগুলো তার সাথে সংযুক্ত হয়। যেমন- সলাত এবং সলাত আদায়কারী ব্যক্তিদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা। অনুরূপ বিচারক যখন তাকে সলাত আদায়ের দিকে আহ্বান করে এমতাবস্থায় তার মধ্যে এমন কিছু বিষয় বিদ্যমান থাকে যা তাকে হত্যা করার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। এর আলোচনা অচিরেই আসবে, কেননা এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অতঃপর তিনি (ইবনুল কায়্যিম) বলেছেন : “কুফর” শব্দটির প্রয়োগ সলাত ত্যাগকারী থেকে বাদ দেয়া সম্ভব নয়। কেননা, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল এই শব্দটি প্রয়োগ করেছেন। তবে সেটি হবে »كُفْرٌ عَمَلُ« আলমগত কুফর; »لَا كُفْرْ إِعْتِقَارُ« আক্বীদাগত কুফর নয়। যিনাকারী, চোর, মদ্য পানকারী এবং যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে নয় এমন ব্যক্তিদের ঈমান নেই বলে রাসূলুল্লাহ উল্লেখ করেছেন। এ শ্রেণীর লোকেরা উক্ত কর্মাবস্থায় ঈমান থেকে দূরে থাকে। আর যখন “ঈমান” বিষয়টি তার থেকে দূর হয়ে যায়, তখন সে আমলগত দিক থেকে কাফের হয়। এমতাবস্থায় সে অস্বীকার এবং আক্বীদাগত দিক থেকে কাফের সাব্যস্ত হয় না।
আমি (আলবানী) বলছি : তবে আমি মনে করি এরূপ অপরাধীদের ক্ষেত্রে “কুফর শব্দ” প্রয়োগ করা সঠিক নয়। যেমন এরূপ বলা উচিত হবে না : যে ব্যক্তি ব্যভিচার করল সে কুফরী করল। 'সে ব্যক্তি কাফের হয়ে গেল' এ কথা বলা জায়েয হওয়া তো অনেক দূরের কথা। এমনকি সলাত বর্জনকারী ও অন্যান্য অপরাধী যাদের ব্যাপারে কুফর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও (বলা যাবে না সে কাফের হয়ে গেল)। কারণ অন্যান্য দলীলের প্রতি দৃষ্টি দেয়া উচিত। সুতরাং কাফের ও রক্ত হালাল এমন কথা বলা তো বহু দূরের কথা।
এ ব্যাপারে সর্বোত্তম কথা হলো- এমন কথা বলা উচিত হবে না যে, ঐ ব্যক্তি কাফের হয়ে গেছে এবং তার রক্তপাত হালাল অর্থাৎ তাকে হত্যা করা বৈধ।
এরপর তিনি (ইবনুল কায়্যিম) নিম্নে বর্ণিত সহীহ হাদীসটি উল্লেখ করেন-
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقُ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ»
অর্থাৎ মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী কর্ম; আর তাকে হত্যা করা কুফরী।²⁸
তিনি আরো বলেন : সবাই অবগত যে, রাসূলুল্লাহ কুফরী দ্বারা কেবল আমলগত কুফরী উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আক্বীদাগত কুফরী নয়। আর এ কুফরী মুসলমানিত্ব এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয় না। যেমন- চোর এবং যিনাকারী ইসলাম এবং মুসলিম জাতি থেকে বের হয় না। যদিও তাকে মু'মিন বলা হয়নি। এ ব্যাখ্যাই হল সাহাবাদের উক্তি, যারা আল্লাহর কিতাব, ইসলাম এবং কুফর ও তার আবশ্যিক বিষয় সম্পর্কে উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে অধিক জ্ঞান রাখেন। অতঃপর তিনি ইবনু আব্বাস হতে নিম্নে বর্ণিত আয়াতের ব্যাপারে সুপরিচিত আছার (উক্তি) উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলার বাণী :
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْنَ )
আল্লাহর নাযিল কৃত বিধান দ্বারা যারা বিচার বা ফায়সালা করে না তারা কাফের।²⁹
ইবনু আব্বাস, উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ইহা সেই কাফের নয় যে কাফেরের কথা মানুষ বুঝে থাকে। অর্থাৎ মানুষ যেমন বুঝে থাকে কাফের মানেই ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে।
আমি (আলবানী) বলছি, ইমাম হাকেম এখানে একটু বৃদ্ধি করে বলেছেন,
إِنَّهُ لَيْسَ كُفْرًا يَنْقُلُ عَنْ الْمِلَّةِ كُفْرٌ دُوْنَ كُفْرٍ)
অর্থাৎ সে এমন কাফের হয় না যা মিল্লাত (দীন) থেকে বের করে দেয়, বরং তা প্রকৃত কুফর থেকে নিম্নস্তর কুফর।³⁰
অতএব যারা সলাত বর্জনকারীকে কাফের সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন তাদের উক্তির মধ্যে ভঙ্গুরতা প্রকাশ পায়।
অতঃপর ইবনুল কায়্যিম বলেন, এখানে মূল উদ্দেশ্য হলো- সলাত পরিত্যাগকারীর ঈমান নেতিবাচক হওয়া অধিক উপযোগী অন্য কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত অপরাধীর চেয়ে। সলাত পরিত্যাগকারীর উপর থেকে ইসলাম দূর হয়ে যাওয়া অধিক উপযুক্ত তার চেয়ে যার হাত ও মুখের দ্বারা মুসলিম ব্যক্তি নিরাপদ নয়। তাই সলাত ত্যাগকারীকে মু'মিন মুসলিম কিছুই বলা হবে না; যদিও ঈমান ইসলামের অন্যান্য শাখা-প্রশাখা পালন করে থাকে।
আমি (আলবানী) বলছি- সলাত বর্জনকারী থেকে মু'মিন মুসলিম নামকরণকে দূর করা বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা একটি প্রসিদ্ধ আয়াতে সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়কে মু'মিন হিসেবে অভিহিত করেছেন। আয়াতটি নিম্নরূপ :
وَإِنْ طَائِفَتْنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِي عَإِلَى أَمْرِ اللَّهِ ۚ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ)
মু'মিনদের দু'দল লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর একটি দল অপরটির উপর বাড়াবাড়ি করলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করে, তার বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই কর যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহ্র নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে ফায়সালা কর আর সুবিচার কর; আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন।³¹
অথচ আল্লাহ রাসূল ﷺ বলেছেন, سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ
অর্থাৎ মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকী কর্ম; আর তাকে (মু'মিনকে) হত্যা করা কুফরী আচরণ।³²
অতএব সীমালঙ্ঘনকারী মুসলিমকে কুফর গুণে গুনান্বিত করা হলেও সে মু'মিন নয় এটা আবশ্যক করে না। 'মুসলিম নয়' এ কথা বলা তো অনেক দূরের কথা। অনুরূপভাবে সলাত বর্জনকারীকে কুফর গুণে গুণান্বিত করা হলেও সে মু'মিন নয় বা মুসলিম নয় একথা বলা আবশ্যক করে না। তবে হ্যাঁ, এ থেকে যদি এই উদ্দেশ্য নেয়া হয় যে, সে পরিপূর্ণ মুসলিম নয় তাহলে ভিন্ন কথা।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন: তার ব্যাপারে এ কথাটি অবশিষ্ট থাকে যে, তার ঈমান তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়া থেকে রক্ষা করবে কিনা? এ ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে, তার ঈমান কাজে আসবে যদি পরিত্যাগকৃত আমল অন্যান্য আমল সহীহ হওয়ার শর্ত না হয়ে থাকে। আর যদি শর্ত হয়ে থাকে তবে তার ঈমান কোনো কাজে আসবে না।
টিকাঃ
২৮. বুখারী হা. ৪৮, মুসলিম হা. ৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ হা. ৬৯, ৩৯৩৯, সুনান নাসায়ী হা. ৪১০৫,
২৯. সূরাহ আল মায়িদাহ ৫ : ৪৪
৩০. ইমাম হাকেম (২/৩১৩) ও যাহাবী একে সহীহ বলেছেন।
৩১. সূরাহ হুজুরাত ৪৯ : ৯
৩২. বুখারী হা. ৪৮, মুসলিম হা. ৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ হা. ৬৯, ৩৯৩৯, সুনান নাসায়ী হা. ৪১০৫,