📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 বিশিষ্ট আলেমদের অভিমত

📄 বিশিষ্ট আলেমদের অভিমত


ইমাম বাগাবী তাঁর শারহুস সুন্নাহ গ্রন্থে বলেন : ইচ্ছাকৃতভাবে ফরয সলাত ত্যাগকারী কাফের হবে কিনা- এ ব্যাপারে বিদ্বানগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। অতঃপর এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত পেশ করেছেন এমন কতিপয় মনীষীদের নাম উল্লেখ করেছেন। (২য়খণ্ড ১৭৮-১৭৯ পৃ.)
আল্লামা শাওকানী 'নাইলুল আওতার' গ্রন্থে পূর্ব উল্লিখিত জাবির কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটির টীকায় বলেন, হাদীসটি দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, সলাত ত্যাগ করা কুফরকে আবশ্যক করে। আর যে ব্যক্তি সলাত ফরয হওয়াকে অস্বীকার করত তা ত্যাগ করে তাহলে সকল মুসলিমের ঐক্যমতে সে কাফের। হ্যাঁ, যদি নতুন ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী হয়, কিংবা মুসলিমদের সাথে এ পরিমাণ সময় চলাফেরা করার সুযোগ না পেয়ে থাকে যে, সলাতের আবশ্যকীয়তা তার নিকট পৌঁছেনি; তাহলে উক্ত ব্যক্তির কথা ভিন্ন।
আর যদি কোনো ব্যক্তি সলাতের আবশ্যকীয়তা সম্পর্কে অবগত থাকে এবং তা বিশ্বাস রাখে; কিন্তু অলসতাবশত ছেড়ে দেয়- যেমন আমাদের সমাজে এরকম অনেক মানুষ রয়েছে- এরূপ ব্যক্তিদের ব্যাপারে উলামাদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে।
জমহুর (অধিকাংশ) সালাফ (পূর্ববর্তী) এবং খাল্‌ল্ফ (পরবর্তী) আলেমগণ এ ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন। তন্মধ্যে ইমাম শাফেঈ ও ইমাম মালেক এর মতে সে কাফের হবে না; বরং সে ফাসেক। অতএব যদি সে তওবা করে ফিরে আসে তাহলে মুক্তি পাবে। নতুবা আমরা তাকে বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তির ন্যায় হদ মেরে হত্যা করব।
ইমাম ইবনু হিব্বান তাঁর সহীহ গ্রন্থে (৪/৩২৪) পৃষ্ঠায় বলেন, রাসূলুল্লাহ সলাত ত্যাগকারীর উপর 'কুফর' শব্দটি এ জন্য প্রয়োগ করেছেন যেহেতু সলাত পরিত্যাগ করা 'কুফর' শুরু হওয়ার প্রাথমিক ধাপ। কেননা, মানুষ যখন সলাত ছেড়ে দেয় তখন সে অন্যান্য ফরযসমূহকে ত্যাগ করা আরম্ভ করে দেয়। আর যখন সে যাবতীয় ফরয আমল ত্যাগ করা শুরু করে দেবে তখন এক পর্যায়ে সেটাকে (ফরযসমূকে) অস্বীকার করার দিকে ধাবিত হবে- এ জন্য রাসূলুল্লাহ শেষ ধাপের কথাটিকে প্রথমেই প্রয়োগ করেছেন।
অতঃপর ইবনু হিব্বান অধ্যায় রচনা করে তাতে এমন হাদীস উল্লেখ করেছেন আমরা যা উল্লেখ করেছি তা সঠিক হিসেবে প্রমাণ করে। সে অধ্যায়টি হল “ যা শেষে সংঘটিত হবে এমন বস্তুকে শুরুতে আরবরা উল্লেখ করে থাকে।”
এ প্রসঙ্গে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর اَلْمَرَاءُ فِي الْقُرْآنِ كُفْرٌ 'আল-কুরআনের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা কুফর কথাটি উল্লেখ করে বলেন : কোনো সন্দেহপোষণকারী মুতাশাবেহ আয়াত সমূহের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে পারে যা এক প্রকার অস্বীকার করা- এমন ভেবে রাসূলুল্লাহ প্রথমেই مراء তথা 'সন্দেহ' শব্দটি উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং সলাত পরিত্যাগ করা ভয়াবহ এবং মারাত্মক একটি বিষয় যা দ্বীন ইসলাম থেকে মানুষকে বের করে দেয় এবং কাফের ও মুশরিকদের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়। (এ জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)
আর যখন এ গুরুত্বপূর্ণ মাস'আলার বিষয়ে উলামায়ে কিরাম এবং ইমামদের মাঝে মতভেদ রয়েছে সে জন্যই জ্ঞান অন্বেষণকারীদের উপর আবশ্যক হল, এ বিষয়ে গভীরভাবে জ্ঞান অর্জন করা। ঢালাওভাবে প্রত্যেক সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের বা মুরতাদ শব্দ ইত্যাদি না বলা।
কারণ, সূর্যের ন্যায় স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া একজন মুসলিম ব্যক্তিকে ফতোয়া দিয়ে ইসলাম থেকে বের করে কাফেরদের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া ঐ মুসলিম ব্যক্তি জন্য উচিত নয় যে আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে। কেননা, সহীহ হাদীসে অনেক সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেন-'
مَنْ قَالِ لِأَخِيهِ : يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا
অর্থাৎ “যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে বলে 'হে কাফের' তাহলে দু'জনের মধ্যে যে কোনো এক ব্যক্তির প্রতি উক্ত শব্দটি প্রযোজ্য হয়।”
আর বুখারীর বর্ণনায় এসেছে- فَقَدَ كَفَرَ أَحَدُهُمَا অর্থাৎ “দু'জনের মধ্যে যে কোনো একজন কাফের হয়ে যাবে।”
সুতরাং এ সমস্ত হাদীস এবং এ বিষয়ে আরো যে সব হাদীস রয়েছে সেগুলো কাউকে দ্রুত কাফের না বলার জন্য সতর্ককারী এবং বিরাট উপদেশ প্রদান করছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا ....
অর্থাৎ “কিন্তু যে ব্যক্তি কুফরীর জন্য তার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দেয়।”
সুতরাং জরুরী বিষয় হচ্ছে, যে ব্যক্তি কুফরি কাজের প্রতি তার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দেয় এবং অন্তর তাতে প্রশান্তি পায় তখন অন্তর কুফরির দিকেই ধাবিত হয়।
তবে হ্যাঁ, কতক বিদ্বান অথবা বিদ্যা অর্জনকারীদের আবেগ ও ঈর্ষা তাদেরকে এ ফাতওয়ার দিকে ধাবিত করেছে যে, “প্রত্যেক সলাত পরিত্যাগকারী কাফের, সে অস্বীকার করে সলাত বর্জন করুক বা অলসতা করে বর্জন করুক। তারা এ ফাতওয়া দিয়েছেন সলাত পরিত্যাগকারীদেরকে ভীতি প্রদর্শন করার জন্য এবং সলাতের প্রতি উৎসাহ প্রদানের জন্য। কেননা তাদের ধারণা অনুযায়ী সলাতের প্রতি অলসতা প্রদর্শন এক পর্যায় ইসলামের এ মহান রুকন ত্যাগ করার দিকে ধাবিত করবে।"
এ সকল বিদ্বান অথবা বিদ্যা অর্জনকারীরা তাদের উক্ত মতের স্বপক্ষে কুরআন ও হাদীস থেকে দলীল পেশ করেছেন, কিন্তু এ সংক্রান্ত যত হাদীস রয়েছে সবগুলো উপস্থাপন করেননি। কারণ যদি সমস্ত হাদীস উপস্থাপন করা হয় তাহলে বিষয়টি হালকা হবে এবং এক পর্যায়ে দলীলগুলো বিপরীত পক্ষকে সমর্থন করবে। আমিও এ মহৎ মাসআলায় মতানৈক্যকারীদের প্রমাণাদি ও মতানৈক্যের কেন্দ্র এবং তার প্রতি গভীর মনোনিবেশন করব না। কারণ এর জন্য আলাদা স্থান উপযুক্ত মনে করি।
তবে আমি এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি যা সচরাচর অনেক জ্ঞান অন্বেষণকারীরা অবগত নয়।
প্রথমত : ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল তার ছাত্র ইমাম হাফেজ মুসাদ্দাদ ইবনু মুসারহাদকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন : “আল্লাহর সাথে শরীক করা ছাড়া কোনো বিষয় ইসলাম থেকে বান্দাকে বের করে দেয় না।” অথবা আল্লাহর ফরয বিধানগুলোর মধ্যে কোনো একটি ফরয বিধানকে অস্বীকারবশত প্রত্যাখ্যান করলে (ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়)। যদি কেউ কোন বিধান অলসতা কিংবা অবজ্ঞাবশত ছেড়ে দেয় তাহলে তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তাকে শাস্তি দিতে পারেন। কিংবা ক্ষমা করতে পারেন।
আমার মতে, কুরআন ও হাদীসে সলাত পরিত্যাগের বিষয়টি (আম) সাধারণভাবে এবং (খাস) বিশেষভাবে এসেছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذُلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার গুনাহ ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন”
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
خَمْسُ صَلَوَاتٍ كَتَبَهُنَّ اللهُ عَلَى الْعِبَادِ فَمَنْ جَاءَ بِهِنَّ وَلَمْ يُضَيِّعُ مِنْهُمْ شَيْئًا اسْتِخْفَافًا بِحَقِّهِنَّ كَانَ لَهُ عِنْدَ اللَّهِ عَهْدٌ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَمْ يَأْتِ بِهِنَّ فَلَيْسَ لَهُ عِنْدَ اللهِ عَهْدٌ إِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ وَإِنْ شَاءَ أَدْخَلَهُ الْجَنَّةَ»
“আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দার উপর পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরয করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি তা আদায় করে এবং তা হতে কোনো কিছু হালকা মনে করে কমতি করে না, তাহলে তার জন্য আল্লাহর নিকট এ প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে ব্যক্তি তা পালন করল না, তার জন্য আল্লাহর নিকট কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। ইচ্ছা করলে তিনি শাস্তি দিতে পারেন। আর চাইলে তাকে জান্নাতেও প্রবেশ করাতে পারেন।
দ্বিতীয়ত : ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব 'আদ্-দুরারুস সুন্নিয়াহ' নামক গ্রন্থে (১/৭০) সে সব ব্যক্তিদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন যারা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, কোন্ আমলের কারণে মানুষ কাফের হয়ে যায় এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ওয়াজিব হয়?
উত্তরে তিনি বলেন, ইসলামের রুকন হচ্ছে পাঁচটি। তন্মধ্যে প্রথমটি হল কালিমায়ে শাহাদাহ। অতঃপর অবশিষ্ট চারটি। যখন কোন মুসলিম উপর্যুক্ত রুকনগুলোর স্বীকৃতি দেয় এবং অলসতাবশত তা পালন না করে, তবে আমরা তার বিরুদ্ধে লড়াই করলেও তাকে সরাসরি কাফের বলবো না। আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করে নয় বরং অলসতা করে তা পরিত্যাগ করে- সেই ব্যক্তিকে কাফের বলা যাবে কিনা তা নিয়ে উলামায়ে কেরামগণ ইখতেলাফ (মতবিরোধ) করেছেন।
হ্যাঁ, তবে 'কালিমায়ে শাহাদাহ'কে যদি কেউ অবজ্ঞা বা তুচ্ছ করে; তাহলে সমস্ত আলেমের ঐক্যমতে সে ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে।
তৃতীয়ত : কতিপয় বিদ্বান কুরআনের আয়াতকে দলীল হিসেবে ভিত্তি করে সলাত বা নামায ত্যাগকারীকে কাফের সাব্যস্ত করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-
فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَاتَوُا الزَّكُوةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ)
“এখন যদি তারা তাওবাহ করে, সলাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে তাহলে তার। তোমাদের দ্বীনী ভাই।”
তারা বলেন, আলোচ্য আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহ তা'আলা শর্ত আরোপ করেছেন, আমাদের মাঝে এবং মুশরিকদের মাঝে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক তখনই প্রতিষ্ঠা হবে যখন তারা সলাত আদায় করবে। সুতরাং যদি সলাত আদায় না করে তাহলে তারা আমাদের দ্বীনী ভাই হিসেবে গণ্য হবে না।
উল্লেখিত দলীলের দু'টি জবাব রয়েছে :
১ম জবাব : ইমাম ইবনু আতিয়‍্যাহ 'আল-মুহাররারুল ওয়াজীয' (খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৩৯) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :
تَابُوا : رَجَعُوْا عَنْ حَالِهِمْ وَالتَّوْبَةُ مِنْهُمْ تَتَضَمَّنُ الْإِيْمَانَ»
অর্থাৎ “তওবা করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তারা পূর্বের অবস্থা থেকে ফিরে আসবে। আর তাদের তওবা হল, ঈমান আনয়ন করা।"
সুতরাং সলাত কায়েমের শর্ত হল তাকে প্রথমে তাওবা করতে হবে, আর সে তাওবার অন্তর্ভুক্ত হল ঈমান আনয়ন করা। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা সলাত কায়েম অথবা যাকাত প্রদানের কথা উল্লেখ করার পূর্বে তওবার কথা উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং বুঝা গেল, দ্বীনী ভাই হওয়ার ক্ষেত্রে মূলনীতি হল তওবা করে ঈমান আনয়ান করা। এ জন্য ইমাম ত্ববারী তার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ জামেউল বায়ানে (খণ্ড ১৮ পৃষ্ঠা ৮৬) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন : হে মু'মিনগণ! যদি এই সমস্ত মুশরিকগণ যাদেরকে আমি হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছি তারা যদি কুফরি করা এবং শিরক করা থেকে ফিরে আসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং আনুগত্য করে, ফরয সলাত কায়েম করে এবং তা সঠিকভাবে আদায় করে, যাকাত সঠিকভাবে দেয়- তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। অর্থাৎ তারা তোমার মুসলিম ভাই। এ কথাটি পূর্বের কথাকে সমর্থন করে।
২য় জবাব : উল্লেখিত আয়াতে সলাত শব্দের সঙ্গে যাকাত শব্দটি এসেছে। সুতরাং যে ব্যক্তি সলাত কায়েম করে কিন্তু যাকাত দেয় না, তাহলে তো সে দ্বীনী ভাই হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা নয়। কারণ সলাতের ক্ষেত্রে যে বিধানটি মুসলিমদের উপর বর্তাবে ঠিক একই বিধান যাকাতের ক্ষেত্রেও বর্তাবে; তাই কিনা? এখন উত্তরে কেউ যদি বলেন, যাকাত না দিলেও সে দ্বীনী ভাই হিসেবে গণ্য হবে তাহলে আমরা বলব, আয়াতে কারীমায় সলাত এবং যাকাতের মাঝে পার্থক্যের দলীল কোথায়? অথচ কুরআনে তওবা শব্দের পর সলাত ও যাকাতের দু'টি শব্দ পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর যদি বলা হয় যে, দীনী ভাই হিসেবে সে গণ্য হবেনা। তাহলে আমরা বলব, এ কথাটি নিঃসন্দেহে বাতিল। কারণ, এর ব্যাপারে কোনো দলীল-প্রমাণ নেই।
চতুর্থত : হুযায়ফা ইবনু আল-ইয়ামান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন : ইসলাম পুরাতন হয়ে যাবে, যেমন কাপড়ের উপরের কারুকার্য পুরাতন হয়ে যায়। শেষে এমন অবস্থা হবে যে কেউ জানবেনা- সিয়াম (রোজা) কী, সলাত (নামায) কী, কুরবানী কী, যাকাত কী? একরাতে পৃথিবী থেকে মহান আল্লাহর কিতাব বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং একটি আয়াতও অবশিষ্ট থাকবে না। মানুষের (মুসলমানদের) কতক দল অবশিষ্ট থাকবে। তাদের বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা বলবে, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমার উপর পেয়েছি। সুতরাং আমরাও সেই বাক্য বলতে থাকবো।
তবে কেউ কেউ এ হাদীসকে ত্রুটিযুক্ত বলেছেন এবং রাবী আবূ মুয়াবিয়ার ব্যাপারে সমালোচনা থাকায় হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন। অথচ তাতে সমস্যা নেই। এতদসত্ত্বেও যারা হাদীসটির ব্যাপারে সমালোচনা করেছেন তাদের নিকট একটি বিষয় গোপন রয়েছে, সেটা হল- হাদীসটির মুতাবা‘আহ রয়েছে।
হাদীসটি আবূ মালেক হতে বর্ণিত। আবূ আওয়ানা তার সনদ এবং মতন দ্বারা বর্ণনা করেছেন, যেমনটি বুসীরী তার 'আল-মিসবাহ' গ্রন্থে বলেছেন। আর আবূ আওয়ানা একজন নির্ভরযোগ্য রাবী। আল্লামা আলবানী তাঁর সিলসিলাহ সহীহাহ (১/১৩০-১৩২) গ্রন্থে তালীক সূত্রে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
আলোচ্য হাদীসে গুরুত্বপূর্ণ 'ফিকহী' ফায়দা রয়েছে। তা হচ্ছে- কেউ যদি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর সাক্ষ্য দেয় তাহলে সে কিয়ামত দিবসে জাহান্নামের আগুনে চিরস্থায়ী থাকবে না। যদিও সে ইসলামের অন্যান্য রুকনগুলো যেমন : সলাত, যাকাত ইত্যাদি আদায় না করে থাকে।
আর এটা সবাই অবগত আছে যে, সলাত ইসলামের অন্যতম একটি ফরয বিধান; এ বিশ্বাস থাকা অবস্থায় কোন ব্যক্তি সলাত পরিত্যাগ করলে তার বিধান সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে ইখতেলাফ (মতবিরোধ) রয়েছে। অধিকাংশ বিদ্বানের মতে সলাত পরিত্যাগ করার কারণে সে কাফের হবে না, বরং সে ফাসেক পাপিষ্ট বলে গণ্য হবে। তবে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের মতে সে কাফের হয়ে যাবে। তাকে মুরতাদের শাস্তিস্বরূপ হত্যা করতে হবে: হদস্বরূপ নয়।
অবশ্য সাহাবীদের থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত: কোন মুসলিম ব্যক্তি ইসলামের কোন আমল ছেড়ে দিলে কাফের হয়ে যাবে; এটা তারা মনে করতেন না, তবে সলাত ত্যাগ করলে কাফের মনে করতেন।
আর আমার মতে, জমহুর বিদ্বানদের অভিমতটিই সঠিক। কেননা, সাহাবীদের থেকে যা বর্ণিত সে ব্যাপারে এমন কোনো 'নস' (দলীল) নেই যে, তাঁরা সলাত পরিত্যাগ করার কুফর দ্বারা এমন কুফর উদ্দেশ্য নিতেন যে কুফরী কাজ করার কারণে বান্দা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে; আর এ উদ্দেশ্য গ্রহণ করাও সম্ভব নয় যে, তাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এটা কী করে সম্ভব? অথচ হুযায়ফা ইবনু আল-ইয়ামান ঐ সমস্ত সাহাবীদের মধ্যে একজন বড় এবং প্রবীণ সাহাবী। তিনি সিলাহ ইবনু যুফারের কথাকে প্রত্যাখ্যান করেন। কেননা, সিলাহ ইবনু যুফার তিনি বিষয়টি আহমাদ ইবনু হাম্বালের ন্যায় বুঝেছিলেন। এজন্য সিলাহ ইবনু যুফার বলেন (সলাত পরিত্যাগকারীর জন্য) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমাটি কোনো কাজে আসবেনা। তারা জানে না সলাত কী জিনিস?
হুযায়ফা প্রত্যুত্তরে বলেন, হে সিলাহ! তবে কি তুমি তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবে! তিনবার উক্ত বাক্যটি বলেছেন।
হুযায়ফা হতে বর্ণিত এ কথাটি প্রমাণ করে যে, সলাত এবং ইসলামের অন্যান্য রুকন পরিত্যাগকারীগণ কাফের নয়। বরং সে মুসলিম এবং কিয়ামত দিবসে জাহান্নামের আগুনে চিরস্থায়ী থাকবেনা। (অতএব এ বিষয়টি ভালভাবে স্মরণ রাখতে হবে। কারণ এ স্থান ছাড়া অন্য কোথাও আপনি উক্ত বিষয়টি পাবেন না।)
হাফেয সাখাবীর ফাতাওয়া হাদীসিয়্যাহ (২/৮৪) কিতাব পাঠ করে দেখেছি, তিনি সলাত ত্যাগকারীকে কাফের হওয়ার ব্যাপারে কতিপয় হাদীস উল্লেখপূর্বক বলেন, হাদীসগুলো মাশহুর এবং পরিচিত। কিন্তু বাহ্যিকভাবে এর প্রত্যেকটি হাদীস সলাত অস্বীকারকারীকেই কেবল কাফের হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। কেননা, যখন কোনো ব্যক্তি কাফের হয়ে যায় তখন সমস্ত মুসলিমের ঐক্যমতে সে মুরতাদ।
সুতরাং যদি সে এর আগেই ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে মুক্তি পাবে। নতুবা তাকে মুরতাদের শাস্তিস্বরূপ হত্যা করতে হবে। আর যে ব্যক্তি বিনা ওযরে অলসতা করে ছেড়ে দেয় এবং বিশ্বাস রাখে যে, এটা পালন করা ফরয, তাহলে নির্ভরযোগ্য কথা হলো, জমহুরের মতে সে কাফের হবেনা। এবং তার ব্যাপারে এটাও বিশুদ্ধ কথা হল, এক ওয়াক্ত সলাতের যে সময়সীমা শরীয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই সময় যদি অতিবাহিত হয়ে যায় (যেমন যুহরের সলাত ছেড়ে দিল এমন কি সূর্য ডুবে গেল কিংবা মাগরিবের সলাত ছেড়ে দিল ফজর উদিত হয়ে গেল) তাহলে সে তওবা করবে যেমনটি মুরতাদ তওবা করে। যদি তওবা না করে তাহলে হত্যা করবে, গোসল দেবে, জানাযা পড়াবে এবং মুসলমানদের পার্শ্বে দাফন করাবে; পাশাপাশি মুসলিমদের অন্যান্য যাবতীয় নিয়মাবলী তার উপর প্রযোজ্য হবে। তার উপর কুফর শব্দটি বর্তাবে। কেননা, সে কতক বিধানে কাফেরদের দলে শরীক হয়েছে। (কাফেররা যেমন ইসলামের বিধান মানে না তেমনি সে কাফেরদের মত একটি বিধানকে মানেনি)। কিন্তু সে শরীয়ত থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে যায়নি। আর হাদীসগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে আমল করা অতীব জরুরি। যেমন রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ বান্দার উপর পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরজ করে দিয়েছেন..... হাদীসটির শেষাংশে এসেছে- আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন আবার ক্ষমাও করে দিতে পারেন এবং রাসূলুল্লাহ আরো বলেছেন-
مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ»
“যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালিমার উপর বিশ্বাস রেখে মারা গেল, সে জান্নাতে প্রবেশ করল।” এ সকল বর্ণনা সমন্বয় করে আমল করা ওয়াজিব। তাই মুসলিমগণ এখনো সলাত বর্জনকারীদের মেরাস তথা উত্তরাধিকার হয়। আর তারাও উত্তরাধিকার বানায়। আর যদি সলাত তাগ্যকারী কাফেরই হতো তাহলে তাকে ক্ষমা করা হতো না, এমতাবস্থায় তাকে মেরাস (উত্তরাধিকার সম্পত্তি) দেয়া হতো না এবং তার থেকে মিরাস বা উত্তরাধিকার সম্পত্তি গ্রহণ করাও হতো না।
পঞ্চমত: কতিপয় আলেম এ মাসআলায় বর্ণিত হাদীসের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে জবাব দিয়েছেন। তারা বলেছেন, উক্ত হাদীসগুলো থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, সলাত পরিত্যাগকারীদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোককে আল্লাহ ক্ষমা ও রহম করবেন, যারা শিরক করেনি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন :
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذُلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন”
অনুরূপভাবে আমলনামা এবং শাফা'আতের হাদীস, এ ছাড়াও আরো কিছু হাদীস রয়েছে যা প্রমাণ করে কতক সলাত ত্যাগকারীকে আল্লাহ ক্ষমার আচলে ঢেকে নিবেন। এ সকল হাদীসের আলোকে তারা বলেন : উক্ত হাদীসগুলোকে 'আম (সাধারণ), আর সলাত বর্জনকারীকে কাফের বলা হয়েছে এমন হাদীসগুলো খাস (নির্দিষ্ট)।
আমার মতে, এই আলেমগণ যদিও বিপরীতমুখী কথা বলেছেন (আল্লাহ তাদের বুঝার তাওফীক দান করুন!) তবে তারা সঠিক বিষয় অনুধাবণ করার নিকটবর্তী হয়েছেন যেমন আহলুস সুন্নাহদের নিকট “প্রতিশ্রুতি এবং শাস্তির” নিয়মনীতিটি পরিচিত। এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমু ফাতাওয়া (৪/৪৮৪), (৮/২৭০) (১১/৬৪৮), (২৩/৩০৫) কিতাবে কয়েক স্থানে ব্যক্ত করেছেন। এ নিয়মনীতির সারকথা হলো, আল্লাহ তা'আলা শাস্তি দিবেন বলে যে ধমক দিয়েছেন তা তাঁর ইচ্ছাধীন। তিনি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন অথবা শাস্তিও দিতে পারেন।
আর নিয়ামত দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আল্লাহ তা'আলা ততটুকু বাস্তবায়ন করবেন যতটুকু তিনি নিজের উপর আবশ্যক করে নিয়েছেন।
বেনামাযীর উপর কুফরের বিশেষণ এজন্যই আরোপিত হয়, সে সলাত না পড়ে কাফেরের অনুসরণ করে এবং শরীয়তের এমন একটি কাজ বর্জন করে যা অবশ্য পালনীয়। কেননা, হাদীস শরীফের উদ্ধৃতি এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট। এখানে উল্লেখ হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছে করলে শাস্তিও দিতে পারেন, আবার ক্ষমাও করতে পারেন।
রাসূলুল্লাহ আরো বলেছেন: যে ব্যক্তি لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ “আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোনো মা'বুদ নেই” স্বীকার করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে সে জান্নাতে যাবে।
এ কারণেই আজ পর্যন্ত বেনামাযী মুসলিমরা অন্যের ওয়ারিস হয় এবং অন্যরাও তাদের ওয়ারিস হয়। সে কাফের হলে এরূপ হতো না।
পূর্বোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ও স্পষ্টভাবে বলতে পারি যে, সলাত বর্জনকারী পাপী ও ফাসিক্ব। সে যদি দ্রুত তওবা করে ফিরে না আসে এবং হিদায়াত লাভ না করে কিংবা আল্লাহ যদি তাকে সাহায্য ও ক্ষমার দ্বারা আচ্ছাদিত না করেন তবে তার মুরতাদ হয়ে যাওয়া, কুফরী ও শির্কে লিপ্ত হওয়া এমনকি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলার কাছে মুরতাদ, কুফর এবং ইসলাম থেকে বহিস্কার হওয়া থেকে পানাহ চাই।
পরিশেষে যে বিষয়টি বলবো তা হলো : এ মাসআলাটি গভীর জ্ঞানের মাসআলাহ। সালাফ (পূর্ববর্তী) এবং খালাফ (পরবর্তী) আলেমগণ এ নিয়ে ইখতেলাফ করেছেন। সুতরাং এ বিষয়ের আলোচনা করার জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টি, বিবেকপূর্ণ জ্ঞান এবং তাক্বলীদ ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। কেননা, এটা সত্যকে চিনতে সাহায্য করবে, সত্যের দিকে আহ্বান করবে এবং সত্যের উপর অটল রাখবে।
আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী এ কিতাবটি সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন। আমরা তাঁর কিতাবটি পাঠক ভাইদের নিকট উপস্থাপন করছি যাতে করে আরো বেশি জ্ঞান অর্জন করার জন্য উৎসাহী হন এবং সওয়াব অর্জনের আশা রাখেন আর যখন কোনো মতবিরোধ দেখা দেয় তখন আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের কথানুযায়ী উত্তর প্রদান করেন। আল্লাহ বলেন :
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُوْلِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا)
“যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তাহলে সেই বিষয়কে আল্লাহ এবং রসূলের (নির্দেশের) দিকে ফিরিয়ে দাও যদি তোমরা আল্লাহ এবং আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাক; এটাই উত্তম এবং সুন্দরতম মর্মকথা।”
সুতরাং এ পুস্তকের পাঠককে মতভেদপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মুহাব্বত, তার অভ্যাস বা যে বিশ্বাসের উপর সে বড় হয়েছে বা তার পূর্বের শিক্ষা যেন তাকে সত্য গ্রহণে ও সত্যকে মান্য করতে বাধা প্রদান না করে। সে যেন অন্যদিকে প্রচেষ্টা না করে যেহেতু সত্যই সর্বোচ্চ কাঙ্ক্ষিত ও মূল্যবান বিষয়, তাই মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি- তিনি যেন হিদায়াত, সরল ও সঠিক পথ গ্রহণের তাওফীক দেন। আর সঠিক পথের প্রার্থনা করছি তার জন্য, যে পথ হারিয়েছে এবং সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের বলার ক্ষেত্রে যার মতামত গোলমাল হয়ে গেছে।
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

টিকাঃ
৩. মুসনাদ আহমাদ ৫ম খণ্ড, হা. ৩৪৬; তিরমিযী হা. ২৬২৩; ইবনু মাজাহ হা. ১০৭৯
৪. ইবনু মাজাহ হা. ৪০৩৪; ইমাম বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ১৮ পৃ.। এর সনদটি দুর্বল, তবে শাওয়াহেদ থাকার কারণে হাদীসটি শক্তিশালী হয়েছে। দেখুন- ইবনু হাজার আসকালানীর আত্-তালখীসুল হাবীর ২য় খণ্ড ১৪৮ পৃ.; আল্লামা আলবানীর ইরওয়াউল গালীল ৭ম খণ্ড ৮৯-৯১ পৃ.।
৫. এটি রাসূল এর যুগের কথা। রাসূল এর যুগেই যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে অবস্থা কেমন হতে পারে!
৬. আবূ দাউদ হা. ৪৬০৩, আহমাদ (২/৫২৮), ইবনু আবূ শায়বাহ (১০/৫২), হাকিম (২/২২৩) ইত্যাদি। হাদীসটির সনদ হাসান। দেখুন মিশকাতুল মাসাবীহ ৩৩৬, সহীহ তারগীব ১৩৯।
৭. উক্ত বাক্যটি ইমাম শাওকানী-এর আস-সায়লুল যারার (৪/৫৭৮) নামক গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।
৮. বুখারী ১০/৪২৭, মুসলিম হা. ৬০; রাবী 'উমার হতে বর্ণিত। আর বুখারীতে (১০/৩৮৮) উক্ত অধ্যায়ে আবূ যার হতে বর্ণিত।
৯. সূরা নাহল ১৬ : ১০৬
১০. উক্তিটি ইমাম শাওকানী রে হতে নেয়া হয়েছে।
১১. যেমন : তাবাকাতু হানাবিলা (১/৩৪৩) নামক গ্রন্থে রয়েছে।
১২. ইবনু তাইমিয়া প্রণীত 'আল-ঈমান' নামক গ্রন্থের ২৪৫ পৃষ্ঠা।
১৩. সূরাহ আন্-নিসা ৪:৪৮
১৪. আবু দাউদ হাঃ ৪২৫; নাসাঈ ১ম খণ্ড হাঃ ২৩০; দেখুন সহীহ আত-তারগীব (৩৬৬) আলবানী। (আত্-তামহীদ খণ্ড ২৩, পৃ. ২৮৯-৩০১) ইবনু আবদিল বার্র। উক্ত কিতাবে এ ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে।
১৫. সূরাহ আত্-তাওবাহ ৯ : ১১
১৬. ইবনু মাজাহ হাঃ ৪০৪৯; হাকিম (৪/৪৭৩); আবূ মুয়াবিয়া আবূ মালেক আল-আশজায়ী হতে তিনি ইবনু হিরাশ হতে তিনি হুযায়ফা ইবনুল-ইয়ামানী থেকে মারফু' সূত্রে বর্ণনা করেন। ইমাম হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন, ইমাম যাহাবী অনুরূপ বলেছেন। আল-বুসিরী মিসবাহুয যুজাযা গ্রন্থে অনুরূপ সহীহ বলেছেন। ইবনু হাজার ফাতহুল বারীতে (১৩/১৬) শক্তিশালী বলেছেন।
১৭. মুতাবা'আহ হচ্ছে- কোন রাবীর বর্ণিত একাধিক হাদীসের শব্দে হুবহু মিল থাকা অথবা এক রাবীর বর্ণিত হাদীসের শব্দের সাথে অন্য রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের শব্দের হুবহু মিল থাকাকে বলা হয়। -অনুবাদক
১৮. তিরমিযী, হাকেম
১৯. সূরাহ আন্-নিসা ৪:৪৮
২০. অর্থাৎ যারা অলসতা করেসলাত ছেড়ে দেয় শাফাআতের আম হাদীস দ্বারা আল্লাহ তাদের ক্ষমা করতে পারেন।
২১. সূরাহ আন-নিসা ৪:৫৯

📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 লেখকের ভূমিকা

📄 লেখকের ভূমিকা


إِنَّ الْحَمْدَ لِلهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أَمَّا بَعْدُ :
আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তনের পর যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাই সেটি সূক্ষ্ম জ্ঞানের আলোচনা, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাদীসের তাখরীজ ও ব্যাখ্যা। তা মূলত আমার কিতাব সিলসিলাহ সহীহার সপ্তম খণ্ডে আলোচিত হয়েছে। এর একটি অংশ এখানে প্রকাশের জন্য মনস্থ করলাম, যেহেতু এর উপকারিতা ও গুরুত্ব অপরিসীম।
আমার কতিপয় দীনী ভাই এ অংশটুকু দেখার পর তা প্রকাশের জন্য উৎসাহ দিতে লাগলেন যাতে এর দ্বারা দ্রুত কল্যাণ লাভ করা যায়। আমিও এমনটি অনুভব করছিলাম। সুতরাং আমার সাথী এবং আমার যুবক ছাত্র আলী ইবনু হাসান আল-হালাবী'কে তা দিয়ে দিলাম যাতে করে সে নিজে এর উপর একটা জ্ঞানগর্ভ ভূমিকা লিখে বইটি প্রকাশ করে। যার মাধ্যমে পাঠকবৃন্দ উপকৃত হয়। সে তা-ই করল। (আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।) এরপর সে বইটির প্রুফ দেখে সংশোধন করে ছাপানোর উপযোগী করল। উক্ত সংক্ষিপ্ত ভূমিকার শেষে আল্লাহর নিকট এ প্রার্থনা করি, এ দ্বীনী ইলমের আলোচনার দ্বারা পাঠকবৃন্দ এবং এর প্রতি দৃষ্টিপাতকারীদের যেন উপকার সাধিত হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী এবং উত্তর দাতা। আর আমি আল্লাহর তাওফীক কামনা করি।

📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 শাফা'আতের হাদীস

📄 শাফা'আতের হাদীস


নিম্নে বর্ণিত হাদীসটি ইমাম মা'মার ইবনু রাশেদ আল-জামে' (১১/৪০৯-৪১১) কিতাবে বর্ণনা করে মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাকের সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন। যা যায়েদ বিন আসলাম থেকে, তিনি আত্মত্বা বিন ইয়াসার থেকে, তিনি আবূ সাঈদ আল-খুদরী হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ إِذَا خَلَصَ الْمُؤْمِنُونَ مِنْ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَمِنُوا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ) فَمَا مُجَادَلَهُ أَحَدِكُمْ لِصَاحِبِهِ فِي الْحَقِّ يَكُونُ لَهُ فِي الدُّنْيَا بِأَشَدِ مُجَادَلَةٌ لَهُ مِنْ الْمُؤْمِنِينَ لِرَبِّهِمْ فِي إِخْوَانِهِمْ الَّذِينَ أُدْخِلُوا النَّارَ قَالَ يَقُولُونَ رَبَّنَا إِخْوَانُنَا كَانُوا يُصَلُّونَ مَعَنَا وَيَصُومُونَ مَعَنَا وَيَحُجُونَ مَعَنَا وَيُجَاهِدُوْنَ مَعَنَا) فَأَدْخَلْتَهُمْ النَّارَ قَالَ فَيَقُولُ اذْهَبُوا فَأَخْرِجُوا مَنْ عَرَفْتُمْ فَيَأْتُونَهُمْ فَيَعْرِفُونَهُمْ بِصُوَرِهِمْ لَا تَأْكُلُ النَّارُ صُوَرَهُمْ (لَمْ تَغْشَ الْوَجْهُ فَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ النَّارُ إِلَى أَنْصَافِ سَاقَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ إِلَى كَعْبَيْهِ (فَيُخْرِجُونَ مِنْهَا بَشَرًا كَثِيرًا) فَيَقُولُونَ رَبَّnَا أَخْرَجْنَا مَنْ أَمَرْتَنَا. قال ثُمَّ (يَعُودُوْنَ يَتَكَلَّمُونَ) يَقُولُ أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ دِينَارٍ مِنْ الْإِيمَانِ (فَيُخْرِجُوْنَ خَلْقاً كَثِيرًا) ثُمَّ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا لَمْ نَذَرْ فِيْهَا أَحَدًا مَنْ أَمَرْتَنَا. ثُمَّ يَقُوْلُ : ارْجِعُواْ فَمَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ نِصْفِ دِينَارٍ فَأَخْرَجُواهُ فَيُخْرِجُوْنَ خَلْقًا كَثِيْرًا ثُمَّ يَقُوْلُوْنَ : رَبَّنَا لَمْ نَذَرْ فِيْهَا مِمَّنْ أَمَرْتَنَا ( حَتَّى يَقُولَ اخرجوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فَيُخْرَجُوْنَ خَلْقًا كَثِيرًا) قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَمَنْ لَمْ يُصَدِّقْ بِهَذَا فَلْيَقْرَأُ هَذِهِ الْآيَةَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا} قَالَ فَيَقُولُونَ رَبَّنَا قَدْ أَخْرَجْنَا مَنْ أَمَرْتَنَا فَلَمْ يَبْقَ فِي النَّارِ أَحَدٌ فِيهِ خَيْرٌ قَالَ ثُمَّ يَقُولُ اللهُ شَفَعَتْ الْمَلَائِكَةُ وَشَفَعَ الْأَنْبِيَاءُ وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُونَ وَبَقِيَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ قَالَ فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنْ النَّارِ أَوْ قَالَ قَبْضَتَيْنِ نَاسٌ لَمْ يَعْمَلُوا لِلَّهِ خَيْرًا قَط قَدْ احْتَرَقُوا حَتَّى صَارُوا حُمَمًا قَالَ فَيُؤْتَى بِهِمْ إِلَى مَاءٍ يُقَالُ لَهُ مَاءُ الْحَيَاةِ فَيُصَبُّ عَلَيْهِمْ فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحَبَّةُ فِي حَمِيلِ السَّيْلِ فَيَخْرُجُونَ مِنْ أَجْسَادِهِمْ مِثْلَ اللُّؤْلُوْ فِي أَعْنَاقِهِمْ الْخَاتَمُ عُتَقَاءُ اللهِ قَالَ فَيُقَالُ لَهُمْ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ فَمَا تَمَنَّيْتُمْ أَوْ رَأَيْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ لَكُمْ عِنْدِي أَفْضَلُ مِنْ هَذَا قَالَ فَيَقُولُونَ رَبَّنَا وَمَا أَفْضَلُ مِنْ ذَلِكَ قَالَ فَيَقُولُ رِضَائِي عَلَيْكُمْ فَلَا أَسْخَطُ عَلَيْكُمْ أَبَدًا
রাসূলুল্লাহ বলেছেন: মু'মিনগণ যখন জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে এবং নিরাপত্তা লাভ করবে (সেই সত্ত্বার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ) তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি দুনিয়াতে তার অধিকার আদায়ের ব্যাপারে তার ভাইয়ের সাথে যেমন ঝগড়া বা বাক-বিতণ্ডা করে থাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে জাহান্নামে প্রবেশকারী তার মু'মিন ভাইয়ের জন্য তার চেয়ে অধিক তর্ক বিতর্ক করবে। রাসূলুল্লাহ বলছেন, মু'মিনগণ সেদিন বলবে : হে আমাদের রব! আমাদের ভাইয়েরা আমাদের সাথে সলাত আদায় করেছে, সিয়াম পালন করেছে, হাজ্জ করেছে (এবং আমাদের সাথে জিহাদ করেছে) তারপরও কি তাদেরকে জাহান্নামে দিয়েছেন! রাসূলুল্লাহ বলেন, অতঃপর আল্লাহ বলবেন, যাও তোমরা যাদেরকে চেন জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। এরপর তারা তাদের নিকট আসবে এবং তাদের চেহারা দেখে চিনতে পারবে। জাহান্নামের আগুন তাদের চেহারা ভক্ষণ করবেনা (মুখমণ্ডল বিকৃত হবে না)। তাদের মধ্যে কতিপয়ের পায়ের নলা পর্যন্ত আগুন গ্রাস করবে। আবার কাহারো উভয় পায়ের গিরা পর্যন্ত। (সুতরাং বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।)
অতঃপর তারা বলবে : হে আমাদের রব! যাদেরকে বের করে আনার আদেশ দিয়েছিলেন তাদেরকে আমরা বের করে এনেছি। রাসূলুল্লাহ বলেন, অতঃপর (তারা প্রত্যাবর্তন করবে এবং কথাবার্তা বলবে) আল্লাহ বলবেন, যাদের অন্তরে দিনার পরিমাণ ঈমান রয়েছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। এরপর তারা বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে। অতঃপর তারা (মু'মিনগণ) বলবে : হে আমাদের রব! আপনি যাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার আদেশ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে কাউকে জাহান্নামে রেখে আসিনি। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, তোমরা আবার ফিরে যাও। দেখ, যার অন্তরে অর্ধেক দিনার পরিমাণ ঈমান রয়েছে- তোমরা তাকে বের করে আনো। অতএব তারা বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে।
অতঃপর তারা বলবে, হে আমাদের রব! আপনি যাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার আদেশ দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কাউকে জাহান্নামে রেখে আসিনি। এমনকি শেষ পর্যায়ে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, যাও যার অন্তরে যাররা (অণু) পরিমাণ ঈমান রয়েছে তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। অতএব তারা আবারো বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে। বর্ণনাকারী আবূ সাঈদ খুদরী বলেছেন, এ হাদীসের প্রতি যে বিশ্বাস করে না, সে যেন নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে। আয়াতটি হল :
إِنَّ اللهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةٌ تُضْعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا
“আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করেন না আর কোনো পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ করেন এবং নিজের নিকট হতেও বিরাট পুরস্কার দান করেন।”²²
অতঃপর মু'মিনগণ বলবেন, হে আমাদের রব্ব! আপনি যাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার আদেশ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে কল্যাণের অধিকারী (ঈমানদার) ব্যক্তি কেউ অবশিষ্ট নেই। রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর আল্লাহ বলবেন, ফেরেশ্রামণ্ডলী সুপারিশ করেছে, নাবীগণ সুপারিশ করেছে, মু'মিনগণ সুপারিশ করেছে: এখন সবচেয়ে দয়াবান মহান আল্লাহ বাকি আছেন।
রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর আল্লাহ এক অঞ্জলী অথবা দু' অঞ্জলী পরিমাণ মানুষকে জাহান্নাম থেকে উঠাবেন, যারা আল্লাহর জন্য (ঈমান ব্যতীত) কখনই কল্যাণমূলক কাজ করেনি। তাদেরকে আগুনে পোড়ানো হয়েছে; এমনকি তারা কয়লায় পরিণত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর তাদেরকে পানির কাছে আনা হবে, যেটাকে বলা হয় 'হায়াত'। আর তাদের উপর সেই হায়াত নামক পানি ঢেলে দেয়া হবে, ফলে তারা গজিয়ে উঠবে যেভাবে প্রবহমান ঝর্ণার পাশে শস্য গজিয়ে উঠে। (তোমরা প্রস্তর খণ্ডের পার্শ্বে দিয়ে এবং বৃক্ষের পার্শ্বে দিয়ে যেতে অবশ্য দেখেছ, যে পার্শ্বটি সূর্যের দিকে থাকে সেটি সবুজ রঙের হয় আর যে পার্শ্বটি ছায়ার দিকে থাকে সেটি সাদা হয়ে থাকে)।
রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর সেই পানির স্পর্শে তাদের শরীর মণি-মুক্তার ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তাদের ঘাড়ে একটি সিল থাকবে। আল্লাহ তাদেরকে মুক্ত করবেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর যেমনটি আকাঙ্ক্ষা করতে। আর তোমরা সেখানে যে বস্তুসমূহ দেখতে পাবে সব কিছু তোমাদের জন্য (এবং এর সাথে অনুরূপ পরিমাণ পাবে)। এরপর জান্নাতবাসীগণ বলবে : এরা তো ঐসব লোক যাদেরকে পরম করুণাময় আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেছেন এবং কোনো প্রকার আমল ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন এবং তাদের এমন কোনো ভাল আমল ছিলনা যা তাদেরকে জান্নাতের পথে অগ্রগামী করে দেয়।
রাসূলুল্লাহ বলেন : অতঃপর তারা বলবে : হে আমাদের রব! আমাদেরকে এমন বস্তু দান করেছেন যা দুনিয়াতে কাউকে দান করেন নি। রাসূলুল্লাহ বলেন, এরপর আল্লাহ বলবেন : আমার নিকট তোমাদের জন্য এমন বস্তু রয়েছে যা সবচেয়ে উত্তম। এরপর তারা বলবে : হে আমাদের রব! এর চেয়ে অধিক উত্তম? সেটি কী? রাসূলুল্লাহ বলেন, অতঃপর আল্লাহ বলবেন, তোমাদের উপর আমার সন্তুষ্টি এবং খুশি। অতএব তোমাদের উপর আমি আর কখনই অসন্তুষ্ট হবো না।
ইমাম বুখারী এবং মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদীসটি সহীহ। যা আব্দুর রাজ্জাকের রেওয়ায়েত থেকে বর্ণিত, তিনি মা'মার থেকে বর্ণনা করেছেন। আর আব্দুর রাজ্জাকের সূত্র থেকে ইমাম আহমাদ (৩/৯৪) সংকলন করেছেন; নাসাঈ (২/২৭১); ইবনু মাজাহ হা. ৬০, ইবনু খুজায়মা আত্-তাওহীদ কিতাবে পৃ. (১৮৪, ২০১, এবং ২১২) ইবনু নাসার আল-মারুজী "তা'যীমু ক্বদরীস সলাত” নামক কিতাবে হা. ২৭৬। আব্দুর রাজ্জাক হাদীসটিকে অনুসরণ করেছেন; মুহাম্মাদ ইবনু সাওর তিনি মা'মার থেকে রেওয়ায়েত করেছেন; তবে হুবহু শব্দগুলো আনেন নি, তিনি কেবল সদৃশ বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ হিশাম ইবনু সা'দের হাদীসকে সংকলন করেছেন। আর একটি জামা'আত মা'মারকে অনুসরণ করেছেন।
তন্মধ্যে :
১ম : সাঈদ ইবনু আবূ হেলাল যিনি যায়েদ বিন আসলাম থেকে বর্ণনা করেছেন এবং হাদীসটিকে পূর্ণ করেছেন। হাদীসের প্রথম অংশ হচ্ছে অর্থাৎ চন্দ্র-সূর্য দেখতে কি তোমাদের কোনো সমস্যা হয়? ....
هَلْ تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ الشَّمْسِ وَالْقَمَرِ ....
এটা একটা দীর্ঘ হাদীস। ইমাম বুখারী হাদীসটি সংকলন করেছেন। হা. ৭৪৩৯, মুসলিম ১/১১৪-১১৭, ইবনু খুযায়মা পৃ. ২০১, ইবনু হিব্বান হা. ৭৩৩৩ আল-ইহসান।
২য় : হাফস্ ইবনু মাইসারাহ, তিনি যায়েদ থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি ইমাম মুসলিম সংকলন করেছেন (১/১১৪-১১৭) অনুরূপ বুখারী হা. ৪৫৮১। তবে ইমাম বুখারী হাদীসটি সম্পূর্ণ বর্ণনা করেননি। অনুরূপভাবে আবূ আওয়ানা (১/১৬৮-১৬৯)।
৩য় : হিশাম ইবনু সা'দ, তিনি যায়েদ থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি আবূ আওয়ানাহ সংকলন করেছেন (১/১৮১-১৮৩) এবং সম্পূর্ণ বর্ণনা করেছেন। ইবনু খুযায়মাহ পৃ. (২০০), হাকেম (৪/৫৮২-৫৮৪) সহীহ বলেছেন। অনুরূপ মুসলিম (১/১৭), তবে হুবহু শব্দগুলো আনেননি। তিনি কেবল হাফস্ ইবনু মাইসারার হাদীসের শব্দের বরাত দিয়েছেন। আর যায়েদকে অনুসরণ করেছেন সোলায়মান ইবনু আমর ইবনু উবায়দ আল আতওয়ারী। তিনি হচ্ছেন বনী লাইস গোত্রের এবং তিনি আবূ সাঈদ এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি আবূ সাঈদ খুদরী এর নিকট শুনেছি। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ এর নিকট বলতে শুনেছি-
অতঃপর তিনি অনুরূপ সংক্ষিপ্তাকারে হাদীসটি উল্লেখ করেন এবং তাতে ৩য় নাম্বারের রাবীকে অতিরিক্ত উল্লেখ করেছেন। ইমাম আহমাদ হাদীসটি সংকলন করেছেন (৩/১১-১২), ইবনু খুযায়মাহ পৃ. ২১১; ইবনু আবী শায়বাহ আল-মুসান্নিফ গ্রন্থে (১৩/ ১৭৬/১৬০৩৯) এবং তার নিকট থেকে ইবনু মাজাহ (৪২৮০), ইবনু জারির তার তাফসীর গ্রন্থে (১৬/৮৫), ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ যাওওয়াদুয যাহেদ গ্রন্থে পৃ. (৪৪৮/ ১২৬৮), হাকেম (৪/৫৮৫) এবং তিনি বলেছেন, মুসলিমের শর্তের ভিত্তিতে সনদটি সহীহ। ইমাম যাহাবী পরিস্কার বলে দিয়েছেন, হাদীসটি হাসান। কেননা, এর মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক তিনি বর্ণনা করে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। হাদীসটি এমনভাবে সংকলন করা হয়েছে যে, আর কোথাও তা পাওয়া যাবেনা। আর হাদীসটি মুত্তাফাকুন 'আলাইহ এবং অন্যান্য সহীহ, সুনান এবং মাসানিদ কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটির এসব তাখরীজ উল্লেখ করার পর আমি বলছি,
উক্ত হাদীসটিতে অনেক উপকারিতা রয়েছে:
যেমন নেক্কার মু'মিনগণ তাদের সাথে সলাত আদায়কারী ভাইদের ব্যাপারে সুপারিশ করা, যাদেরকে পাপের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হয়েছিল। অতঃপর ঈমানের তারতম্য অনুপাতে নিম্নতম জাহান্নামী মুমিনদের জন্যও সুপারিশ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক অবশিষ্ট মু'মিনকে বের করা যারা জাহান্নামে বাকি ছিল তাদেরকে মর্যাদা দান করা, তাদেরকে কোনো রকম সৎ আমল ছাড়াই জাহান্নাম থেকে বের করা এবং এমনকি তাদের এমন কোনো সৎ আমল ছিলনা যা রবের নিকট উপস্থিত করবে।
### কতক আলিমের সন্দেহ
কতিপয় আলেম সন্দেহ পোষণ করেছেন »لا خير« (সৎ আমল ব্যতীত) শব্দটি নিয়ে। তাদের মতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক কতিপয় আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইবনু হাজার ফাতহুল বারী গ্রন্থে (১৩/৪৩৯) বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এমন কতিপয় লোক যারা কালিমা শাহাদাতাইন এর বেশি কিছু স্বীকৃতি প্রদান করেনি। যা হাদীসটির বাকি অংশ থেকে বুঝা যায়।
আমি (আলবানী) বলছি: আনাস হতে শাফা'আতের ব্যাপারেও দীর্ঘ হাদীস রয়েছে। সেখানে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহকে বলা হবে- হে মুহাম্মাদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে। তুমি চাও, তোমাকে দেয়া হবে এবং সুপারিশ কর তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।
তখন রাসূলুল্লাহ বলবেন, হে আমার রব! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দিন ঐ সমস্ত লোকদের ব্যাপারে যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমা বলেছে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন: আমার ইজ্জতের কসম, আমার মহত্ব, আমার বড়ত্ব এবং আমার সম্মানের কসম, অবশ্যই আমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করব যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" কালিমা বলেছে।²³
আনাস হতে অন্য সূত্রে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলা মানুষের হিসাব নিকাশ শেষ করবেন এবং আমার উম্মতের অবশিষ্ট লোকদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাবেন। এরপর জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে যাওয়া তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে বলবে, তোমাদের আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার সাথে শরীক না করা কোন্ কাজে আসল? এরপর মহান আল্লাহ বলবেন, আমার ইজ্জতের কসম, অবশ্যই আমি তোমাদেরকে (তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে) জাহান্নাম থেকে মুক্ত করব। এরপর তাদের নিকট (দূত) পাঠানো হবে এবং তারা পুড়ে যাওয়া অবস্থায় জাহান্নাম থেকে বের হবে। অতঃপর তাদেরকে হায়াতের নহরে প্রবেশ করানো হবে এবং সেখান থেকে নতুন করে গজিয়ে উঠবে... ইমাম আহমাদ এবং অন্যান্যগণ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। আলবানী 'যিলাল' গ্রন্থে (৮৪৩-৮৪৫ নং) হাদীসের অধীনে উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে সমর্থক হাদীস রয়েছে। অনুরূপ ফাতহুল বারীতে (১১/৪৫৫) আলাদাভাবে সমর্থক হাদীস রয়েছে। আর হাদীসটির মধ্যে ইবনু আবী হামজার ইজতেহাদ এই মাস'আলার উপর যেটি বের হয়েছিল তা রাসূলুল্লাহর কথা দ্বারা প্রতিহত হয়েছে। সেখানে রয়েছে “মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত হবেনা”। অনুরূপ হাদীস পরবর্তীতে এসেছে যে- কেবল চেহারা ব্যতীত। তারা সবাই মুসলিম, তবে সলাত আদায় করেনি। কিন্তু তারা সেখান (জাহান্নাম) হতে বের হবে না, যেহেতু তাদের সাথে সৎ আমলের কোনো আলামতই নেই।
এজন্য হাফেজ ইবনু হাজার (১১/৪৫৭) তার কথার অনুসরণ করেছেন। তবে তিনি আম (সাধারণভাবে) এ কথা প্রয়োগ করেছেন। আর সেটি হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঞ্জলী দিয়ে জাহান্নামীদের বের করবেন। কেননা, হাদীসে এসেছে- তারা কখনই সৎ আমল করেনি। আর এটি আবূ সাঈদ এর হাদীসে উল্লেখ রয়েছে যা 'তাওহীদে”র আলোচনায় আসছে। অর্থাৎ তিনি এই হাদীসকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আর হাফেজ ইবনু হাজার হয়তোবা ভুলে গেছেন কেননা, হাদীসটিতে তিনি নিজেই অন্য দিক দিয়ে ইবনু আবী হামজাকে অনুসরণ করেছেন। সেটি হল- যখন আল্লাহ তা'আলা প্রথম বার মু'মিনদের সুপারিশ কবুল করবেন তাদের সাথে সলাত, সওম ইত্যাদি আদায়কারী ব্যক্তিদের ব্যাপারে এবং তারা জাহান্নাম থেকে তাদের মুসলিম ভাইদের বের করে আনবেন চিহ্ন দেখে। সুতরাং যখন তারা পরবর্তীতে কয়েকবার সুপারিশ করবে এবং বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে, তখন তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে সলাت আদায় করেছিল এমন ব্যক্তি থাকবেনা। কেবল তাদের মধ্যে কল্যাণ বিদ্যমান থাকবে তাদের ঈমান অনুপাতে এবং এটিই হচ্ছে সুস্পষ্ট বিষয় যা কারো অজানা নয়। ইনশাআল্লাহ।
### গবেষণা ও পর্যালোচনা
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রতীয়মান হয় প্রাগুক্ত হাদীসটি এ ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ করে যে, যখন সলাত বর্জনকারী ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমার উপর সাক্ষ্য অবস্থায় মুসলিম হিসেবে ইন্তেকাল করলে মুশরিকদের ন্যায় চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে না। সুতরাং এতে অত্যন্ত মজবুত দলীল রয়েছে যে, সলাত বর্জনকারী আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। কেননা, আল্লাহ বলেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন।”²⁴ ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে (৬/২৪০) আয়েশা হতে মারফু' সূত্রে স্পষ্টভাবে হাদীস বর্ণনা করেছেন- শব্দগুলো হচ্ছে-
الدواوين عند الله عز وجل ثلاثة ... ) الحديث
অর্থাৎ আল্লাহর নিকট তিনটি দফতর রয়েছে- তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, যা আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করবেন না, আর তাহল তাঁর সাথে শিরক করা। মহান আল্লাহ বলেন,
مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করল তার উপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন।²⁵
আরেকটি দিওয়ান (আমলনামা) যেটাকে আল্লাহ পরওয়া (ভ্রুক্ষেপ) করবেন না- তা হচ্ছে, বান্দার নিজের উপর যুলুম। যা বান্দা এবং তার রবের মাঝে চুক্তি ছিল। যেমন সে একদিনের সওম ছেড়ে দিয়েছে, কিংবা সলাত বর্জন করেছে; অতএব মহান আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেবেন এবং ইচ্ছা করলে কিছু মনে করবেন না...।²⁶ ইমাম হাকেম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে সহীহ বলেছেন। আমি 'তাখরিজুত ত্বাহাবী' গ্রন্থে (পৃ. ৩৬৭, চতুর্থ সংস্করণ) এ সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণনা করেছি যা এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা পূর্বের আলোচনা অবগত হলেন। আমি সীমাহীন অবাক হই সে সব সংখ্যাগরিষ্ঠ লেখকগণ সম্পর্কে যারা “অলসতাবশত সলাত বর্জনকারী কাফের হবে বা নাকি হবে না?” এর মত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাহ নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখা-লেখি করেছেন, কিন্তু অসচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। আমার জানা মতে, যে হাদীসটি আমি উল্লেখ করেছি তা বর্ণনা করতে প্রায় সবাই বে-খবর, অথচ তা বিশুদ্ধতার বিষয়ে ইমাম বুখারী এবং মুসলিম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য কিতাবে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। আর তারা এটাও উল্লেখ করেননি, হাদীসটি কোন্ দলের স্বপক্ষের দলীল এবং কোন্ দলের বিপক্ষের দলীল। বিশেষ করে ইবনুল কায়্যিম বিভিন্ন দলীল প্রমাণ দিয়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তার 'সলাত' নামক গ্রন্থে বিভিন্ন দলীল দিয়ে তাদের প্রত্যেকটির উত্তর প্রদান করেছেন। তবে যাদের মতে “সলাত বর্জনকারী কাফের হবে না” তাদের মতের স্বপক্ষের উক্ত হাদীসটি তিনি অতি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছেন। যার ফলে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি যে, সলাত বর্জনকারীরাও শাফা'আতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, শাফা'আতের হাদীসটিতে রয়েছে-
يَقُوْلُ اللهُ عَزَّ وَ جَلَّ : وَعِزَّتِي وَ جَلَالِي لَأَخْرُجَنَّ مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
অর্থাৎ মহান আল্লাহ বলবেন: আমার ইজ্জত এবং আমার মাহাত্ম্যের কসম! যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে অবশ্যই আমি তাকে জাহান্নাম থেকে বের করবো।
হাদীসটিতে আরো রয়েছে :
فَيَخْرُجُ مِنْ النَّارِ مَنْ لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ)
অর্থাৎ, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম থেকে এমন সব লোকদের বের করবেন, যারা কখনই কোনো সৎ আমল করেনি।
... فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنْ النَّارِ نَاسًا لَمْ يَعْمَلُوْا اللَّهَ خَيْرًا قَطَّ ....
অর্থাৎ অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঞ্জলী দিয়ে এক অঞ্জলী লোককে জাহান্নাম থেকে উঠাবেন, যারা আল্লাহর জন্য কখনই সৎ আমল করেনি।
পাঠকবৃন্দ! এখানে যে কারণে বিরুদ্ধবাদীরা হাদীসটি সংক্ষেপ করেছেন তা খুবই ক্ষতিকারক, যা স্পষ্ট। কেননা, বিষয়টি আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি। আর হাফেয ইবনু হাজার স্বীয় মুস্তাদরাকে ইবনে আবী জাময়ার হাদীসের পূর্ণরূপ উল্লেখ করেছেন। যার দ্বারা বোঝা যায় যে, মু'মিন ব্যক্তিরা দ্বিতীয় বার বেনামাযী ও তাদের পরে যারা আছে তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে। অতএব মাসআলাটির ক্ষেত্রে এটি একটি অকাট্য দলীল। যে সকল বিদ্বান অভিন্ন আকীদায় বিশ্বাসী অত্র দলীল দ্বারা এ মাসআলাহর ব্যাপারে তাদের মতবিরোধ দূর হয়ে যাবে। যে আকীদার অন্যতম একটি হল উম্মাতের মুহাম্মাদীর কোন ব্যক্তি কবীরা গুনাহর কারণে কাফির হবে না। বিশেষ করে বর্তমান যামানায় যখন এমন ব্যক্তিদের প্রসার হয়েছে যারা নিজেদেরকে আলিম বলে দাবী করে আর বিশ্বাস রাখে; আকীদাহ শুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও যদি কোন মুসলিম ওয়াজিব আমল পালনে অবহেলা করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। তবে কাফেরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, তারা ইসলামকে স্বীকৃতিও দেয় না এবং দীন পালনার্থে সলাতও আদায় করে না।
মহান আল্লাহ বলেন,
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُوْنَ)
“আমি কি মুসলিমদেরকে অপরাধীদের মত গণ্য করব? তোমাদের কী হয়েছে, তোমরা কেমনভাবে বিচার করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছ?”²⁷
আমি ইমাম ইবনুল কায়্যিম কে ভালবাসি এজন্য যে, তিনি এ সহীহ হাদীসটি উল্লেখ করতে অসতর্ক ছিলেন না, যা সলাত বর্জনকারী কাফির না হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণ। আর তার কাছে এর কোন উত্তর থাকলে প্রদান করতেন। ফলে বিনা পক্ষপাতিত্বে উভয় দলের একটি ইনসাফপূর্ণ সমাধান হতো।

টিকাঃ
২২. সূরাহ আন্-নিসা ৪ : ৪০
২৩. মুত্তাফাকুন আলাইহ, আলবানী "যিলালুল জান্নাহ" কিতাবে (২/২৯৬) উল্লেখ করেছেন
২৪. সূরাহ আন্-নিসা : ৪৪
২৫. সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫ : ৭
২৬. হাকেম (৪/৫৭৬)
২৭. সূরাহ আল-ক্বালাম ৬৮: ৩৫-৩৬

📘 সালাত পরিত্যাগকারির হুকুম > 📄 কতক আলিমের সন্দেহ

📄 কতক আলিমের সন্দেহ


কতিপয় আলেম সন্দেহ পোষণ করেছেন »لا خير« (সৎ আমল ব্যতীত) শব্দটি নিয়ে। তাদের মতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক কতিপয় আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইবনু হাজার ফাতহুল বারী গ্রন্থে (১৩/৪৩৯) বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এমন কতিপয় লোক যারা কালিমা শাহাদাতাইন এর বেশি কিছু স্বীকৃতি প্রদান করেনি। যা হাদীসটির বাকি অংশ থেকে বুঝা যায়।
আমি (আলবানী) বলছি: আনাস হতে শাফা'আতের ব্যাপারেও দীর্ঘ হাদীস রয়েছে। সেখানে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহকে বলা হবে- হে মুহাম্মাদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে। তুমি চাও, তোমাকে দেয়া হবে এবং সুপারিশ কর তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।
তখন রাসূলুল্লাহ বলবেন, হে আমার রব! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দিন ঐ সমস্ত লোকদের ব্যাপারে যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমা বলেছে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন: আমার ইজ্জতের কসম, আমার মহত্ব, আমার বড়ত্ব এবং আমার সম্মানের কসম, অবশ্যই আমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করব যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" কালিমা বলেছে।²³
আনাস হতে অন্য সূত্রে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলা মানুষের হিসাব নিকাশ শেষ করবেন এবং আমার উম্মতের অবশিষ্ট লোকদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাবেন। এরপর জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে যাওয়া তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে বলবে, তোমাদের আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার সাথে শরীক না করা কোন্ কাজে আসল? এরপর মহান আল্লাহ বলবেন, আমার ইজ্জতের কসম, অবশ্যই আমি তোমাদেরকে (তাওহীদে বিশ্বাসীদেরকে) জাহান্নাম থেকে মুক্ত করব। এরপর তাদের নিকট (দূত) পাঠানো হবে এবং তারা পুড়ে যাওয়া অবস্থায় জাহান্নাম থেকে বের হবে। অতঃপর তাদেরকে হায়াতের নহরে প্রবেশ করানো হবে এবং সেখান থেকে নতুন করে গজিয়ে উঠবে... ইমাম আহমাদ এবং অন্যান্যগণ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। আলবানী 'যিলাল' গ্রন্থে (৮৪৩-৮৪৫ নং) হাদীসের অধীনে উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে সমর্থক হাদীস রয়েছে। অনুরূপ ফাতহুল বারীতে (১১/৪৫৫) আলাদাভাবে সমর্থক হাদীস রয়েছে। আর হাদীসটির মধ্যে ইবনু আবী হামজার ইজতেহাদ এই মাস'আলার উপর যেটি বের হয়েছিল তা রাসূলুল্লাহর কথা দ্বারা প্রতিহত হয়েছে। সেখানে রয়েছে “মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত হবেনা”। অনুরূপ হাদীস পরবর্তীতে এসেছে যে- কেবল চেহারা ব্যতীত। তারা সবাই মুসলিম, তবে সলাত আদায় করেনি। কিন্তু তারা সেখান (জাহান্নাম) হতে বের হবে না, যেহেতু তাদের সাথে সৎ আমলের কোনো আলামতই নেই।
এজন্য হাফেজ ইবনু হাজার (১১/৪৫৭) তার কথার অনুসরণ করেছেন। তবে তিনি আম (সাধারণভাবে) এ কথা প্রয়োগ করেছেন। আর সেটি হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঞ্জলী দিয়ে জাহান্নামীদের বের করবেন। কেননা, হাদীসে এসেছে- তারা কখনই সৎ আমল করেনি। আর এটি আবূ সাঈদ এর হাদীসে উল্লেখ রয়েছে যা 'তাওহীদে”র আলোচনায় আসছে। অর্থাৎ তিনি এই হাদীসকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আর হাফেজ ইবনু হাজার হয়তোবা ভুলে গেছেন কেননা, হাদীসটিতে তিনি নিজেই অন্য দিক দিয়ে ইবনু আবী হামজাকে অনুসরণ করেছেন। সেটি হল- যখন আল্লাহ তা'আলা প্রথম বার মু'মিনদের সুপারিশ কবুল করবেন তাদের সাথে সলাত, সওম ইত্যাদি আদায়কারী ব্যক্তিদের ব্যাপারে এবং তারা জাহান্নাম থেকে তাদের মুসলিম ভাইদের বের করে আনবেন চিহ্ন দেখে। সুতরাং যখন তারা পরবর্তীতে কয়েকবার সুপারিশ করবে এবং বহু সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে, তখন তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে সলাত আদায় করেছিল এমন ব্যক্তি থাকবেনা। কেবল তাদের মধ্যে কল্যাণ বিদ্যমান থাকবে তাদের ঈমান অনুপাতে এবং এটিই হচ্ছে সুস্পষ্ট বিষয় যা কারো অজানা নয়। ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
২৩. মুত্তাফাকুন আলাইহ, আলবানী "যিলালুল জান্নাহ" কিতাবে (২/২৯৬) উল্লেখ করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00