📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 হাদিসের দর্পণে একালের মসজিদ

📄 হাদিসের দর্পণে একালের মসজিদ


হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

لا تقوم الساعة حتى يتباهى الناس في المساجد.
“কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত কায়েম হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ মসজিদ (সুসজ্জিতকরণ) নিয়ে গর্বে না লিপ্ত হয়।”১৩

অন্যত্র হাদিসে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
لتزخرفنها كما زخرفت اليهود والنصارى.
“অচিরেই তোমরা মসজিদগুলোকে ইহুদি, নাসারাদের মত কারুকার্য করে গড়ে তুলবে।”১৪

মসজিদ আল্লাহর ঘর, এখানে ইবাদত করা হয়। অবশ্যই মানুষ তার সামর্থমাফিক মসজিদ নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করবে। নেক নিয়তে মসজিদের কাজে সময়, শ্রম ও অর্থ দান করবে। কিন্তু মসজিদে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ সম্পদ ব্যয় করা, গর্ব করার উদ্দেশ্যে কারুকার্যমণ্ডিত করা, জাঁকজমকপূর্ণ করা ইত্যাদি সবকিছু হলো কিয়ামতের নিদর্শন।

বর্তমানে আমাদের সমাজে ব্যাপক আকারে মসজিদ নিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এক এলাকার মসজিদকে আকর্ষণীয় করা হলে, অন্য এলাকার মানুষ নিজ এলাকার মসজিদেও অপ্রয়োজনীয় সংস্কার করেন। ব্যাপকমাত্রায় অপচয় করেন। হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলি থানভী রহিমাহুল্লাহ বলেন- “আজকের শহরের মসজিদের মিম্বার ও মেহরাবে যত খরচ করা হচ্ছে, তা দিয়ে একই খরচে গ্রামে ৮-১০ টি মসজিদ বানানো যাবে।"
এক এলাকায় যদি মসজিদের উন্নয়নে ৫০ লক্ষ টাকা বাজেট করা হয়, তাহলে অন্য এলাকায় ১ কোটি টাকা বাজেট করা হয়। মসজিদ যত আকর্ষণীয় হচ্ছে, মুসল্লির সংখ্যা ততই কমছে। এক অনৈতিক প্রতিযোগিতার মহাউৎসব চলছে। মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে মসজিদ কমিটি। আফসোসের বিষয় অধিকাংশ মসজিদের কমিটি উক্ত এলাকার সবচে' নিকৃষ্ট মানুষদের দখলে থাকে। মসজিদের জন্য টাকা সংগ্রহ করার সময় হারাম-হালাল বিবেচনা করা হয় না। যে সূত্র থেকে যত অর্থ আসছে তা যাচাই করা ব্যতীত নেয়া হচ্ছে।

আখিরুজ্জামানের মসজিদ তাই বাহ্যিক সুরতে সুন্দর দেখালেও বাস্তবিকতার আলোকে তাতে জান্নাতি সুভাষ পরিলক্ষিত হয় না। তাই কৃত্তিমভাবে জান্নাতের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এমনও দেখেছি বড় বড় সুদি ব্যবসায়ীর নিকট থেকে এসি সংগ্রহ করা হয়েছে। দামী মারবেল, বিভিন্ন আলোকসজ্জা, সুন্দর ঝাড়বাতি সবকিছুই নেয়া হয়েছে বিভিন্ন হারামে লিপ্ত ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে। কিছু টাকা সংগ্রহ হয় জনগণের অর্থ সম্পদ লুটকারী নেতাদের পকেট থেকে। এমন মসজিদে আলোকসজ্জা, নরম কারপেট, এসির ঠান্ডা বাতাস ইত্যাদি সব সুযোগকে কৃত্তিমভাবে বানানো জান্নাতি পরিবেশ বলা যায়। হ্যাঁ, অবশ্যই একে দাজ্জালের জান্নাত বলতে হবে। কিছু কিছু মসজিদে গরিব, মিসকিন মানুষ ভেবে-চিন্তে প্রবেশ করে থাকে। কারণ তারা ভাবে—তাদের পোশাক মসজিদের কারুকার্যের সাথে মিলে না, তাই তারা সুসজ্জিত মসজিদ এড়িয়ে চলে। হাদিস থেকে জানা যায়—পূর্বে আহলে কিতাবিরা এমন করত। আহলে কিতাবিদের উপাসনালয় কারুকার্যকরণে আত্মনিয়োগ করা প্রসঙ্গে খাত্তাবি রহিমাহুল্লাহ বলেন-
“ইহুদি খ্রিষ্টানরা যখন আসমানি কিতাব বিকৃত করে ফেলে, তখনই তারা গির্জা সুসজ্জিতকরণে আত্মনিয়োগ করে।”১৫

টিকাঃ
১৩ সুনানু ইবনু মাজাহ: ৭৩৯। সুনানু আবু দাউদ: ৪৪৯। সনদ সহিহ।
১৪ সুনানু আবু দাউদ: ৪৪৮।
১৫ উমদাতুল কারি: ৪/২২৭।

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সুসজ্জিত মসজিদে সালাতে একাগ্রতা সাধারণ মসজিদের তুলনায় বেশি হয় নাকি কম হয়?

📄 সুসজ্জিত মসজিদে সালাতে একাগ্রতা সাধারণ মসজিদের তুলনায় বেশি হয় নাকি কম হয়?


অনেকে মনে করেন মসজিদ কারুকার্যমণ্ডিত হলে মুসল্লিগণ আরামে সালাত পড়তে পারবেন, এতে একাগ্রতা বেশি হবে। মনোযোগ বেশি থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। মানুষ সবসময় সৌন্দর্য দেখতে চায়, উপভোগ করতে চায়। সাধারণ সজ্জার চাইতে জাঁকজমক সজ্জা আমাদের চোখে বেশি পড়ে। চোখের পুরো নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই। হাদিসে এসেছে-
كان قرام لعائشة سترت به جانب بيتها، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: أميطي عنا قرامك هذا، فإنه لا تزال تصاويره تعرض في صلاتي.
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র একটি পর্দা [যাতে নকশা ছিল বা তা রঙিন] ছিল, যার দ্বারা তিনি ঘরের একপাশকে ঢেকে রাখতেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, 'কাপড়টি সরিয়ে নাও। কারণ, এ কাপড়ের ছবিগুলো সবসময় আমার সালাতে ভেসে উঠে। ১৬

চিন্তা করুন-একটি কারুকার্যপূর্ণ কাপড়ের কারণে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একাগ্রতা নষ্ট হচ্ছিল। এবং মসজিদের সৌন্দর্য বিষয়ে তিনি বললেন, 'এটা মুসল্লিদের অন্যমনস্ক করে দিবে'।

উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু'র খিলাফতের সময়ে মসজিদে নববির সম্প্রসারণ করার সময় তিনি মসজিদের সৌন্দর্যবর্ধন ও সাজসজ্জা করতে নিষেধ করেন-যাতে করে মানুষের সালাতে মনোযোগের বিঘ্ন না ঘটে। ১৭

আর আমরা হলাম আখিরুজ্জামানের ফিতনাময় পরিবেশে বাস করা মানুষ, এমনিতেও সালাতে খুশু খুজু ধরে রাখা আমাদের জন্য সহজ নয়- এমতাবস্থায় মসজিদ সুসজ্জিতকরণ, একাগ্রতা ধরে রাখা আরো কঠিন করে ফেলেছে। এই রকম সুসজ্জিত মসজিদে অধিকাংশ মুসল্লি একাগ্রতা ধরে রাখতে পারে না। বর্তমানে একদিকে মসজিদ সুসজ্জিত হচ্ছে অপরদিকে ক্যালিগ্রাফি ও রঙ ব্যবহার করে কুর'আনের আয়াতগুলোকে কারুকার্যমণ্ডিত করা হচ্ছে। হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

يكون في آخر الزمان قوم ينقص أعمارهم، ويزينون مساجدهم.
“শেষ যমানায় এমন কিছু লোক হবে, যারা মসজিদ কম নির্মাণ করবে কিন্তু মসজিদগুলোকে জাকজমকপূর্ণ করবে।”১৮

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
من أشراط الساعة أن تتخذ المساجد طرقا.
“কিয়ামতের একটি আলামত হলো-মানুষ মসজিদকে রাস্তা হিসেবে বানিয়ে ফেলবে।"১৯

অর্থ্যাৎ মসজিদকে সুন্দর জাঁকজমক করবে ঠিকই, কিন্তু মসজিদের পাশ দিয়ে যাবে সালাত আদায় করবে না।

একইভাবে হাদিসে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
ما أمرت بتشييد المساجد.
“আমি মসজিদগুলোকে জাঁকজমকপূর্ণ করতে আদিষ্ট হইনি।”২০

মসজিদের কারুকার্য থেকে মানুষের ইমান-আমল পরিমাপ করা যায়। সমাজের পাপ এবং মসজিদ কারুকার্যকরণের মধ্যে একটি নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে, একটি বাড়লে অপরটি কমে। হাদিসে এসেছে, হযরত ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَا كَثُرَتْ ذُنُوبُ قَوْمٍ إِلَّا زَخْرَفَتْ مَسَاجِدَهَا, وَمَا زَخْرَفَتْ مَسَاجِدَهَا إِلَّا عِنْدَ خُرُوجِ الدَّجَّالِ.
“যখন কোনো সম্প্রদায়ের পাপ বেড়ে যায়, তখনই সমাজের মসজিদগুলো সুসজ্জিত হয়। আর দাজ্জালের আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে না আসা পর্যন্ত মসজিদ গুলো সুসজ্জিত হবে না”। ২১

সুবহানাল্লাহ। সমাজের পাপের প্রতিক্রিয়া মসজিদের উপর কেমনভাবে পড়ে তা এই হাদিসে স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে। যে সমাজ যত বেশি পাপী, উক্ত সমাজের মসজিদ তত বেশি সুসজ্জিত। সমাজের পাপ যত বাড়ে মসজিদ তত বেশি সুসজ্জিত করা হয়। এটা হাদিস থেকে স্পষ্ট অনুমেয়—আমাদের ধ্বংস ক্রমান্বয়ে কাছে আসছে, দাজ্জালের আগমনের সময় ধেয়ে আসছে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করে সালাত আদায় করার তাওফিক দান করুক। আমিন।
সমাপ্ত

টিকাঃ
১৬ সহিহ বুখারি: ৩৭৪।
১৭ ফাতহুল বারি: ৪/৯৮।
১৮ মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক: ২/৪১২।
১৯ মুসান্নাফে ইবনু আবি শাইবা: ১/২৯৯।
২০ সুনানু আবু দাউদ: ৪৪৮। সনদ সহিহ।
২১ আস সুনানুল ওয়ারিদাহ ফিল ফিতান: ৪/৪১৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00