📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 বর্তমান যামানায় সালাত ও সালাত আদায়কারী

📄 বর্তমান যামানায় সালাত ও সালাত আদায়কারী


সাবু উমামা বাহেলি রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لتنقضن عرى الإسلام عروة عروة، فكلما انتقضت عروة تشبث الناس بالتي تليها، وأولهن نقضا الحكم وآخرهن الصلاة.

“অবশ্যই ইসলামের স্তম্ভগুলো একে একে ভেঙ্গে পরবে। একটি ভেঙ্গে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষ অপর স্তম্ভকে ধরবে। সর্বপ্রথম ভাঙবে কুর'আনের শাসন, সর্বশেষে সালাত।”

সালাত, যাকাত, সিয়াম, কুর'আনের শাসন তথা খিলাফত, জিহাদ, হজ্জ ইত্যাদি হল দ্বীনের এক একটি স্তম্ভ। হাদিসে বলা হয়েছে ইসলামের স্তম্ভগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম ভাঙ্গবে খিলাফত ব্যবস্থা আর সর্বশেষে সালাত। বহু পূর্বেই খিলাফত ব্যবস্থা ভেঙ্গেছে, শেষ উসমানি খিলাফতের ধ্বংসেরও প্রায় শত বছর হচ্ছে। আল্লাহর জমিনের আজ এমন কোনো অঞ্চল নেই যেখানে কুর'আনের শাসন চলছে। আর সালাত তো প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক। মুসলিম ইতিহাসে কোনো কালে, কোনো বিপদে, কোনো পতন বা মানবিক বিপর্যয়ের সময়েও এমন খুঁজে পাওয়া যাবে না, যখন মানুষ ফরজ সালাত আদায় হতে বিরত থাকতো। পূর্বে সালাত তরক করার কারণে কোনো ব্যক্তি ফাসিক হত না বরং ফাসিক হত অন্য কোনো হারামে জড়ানোর মাধ্যমে, কেননা কোনো মুসলিম বেনামাজী হবে এমনটা তাদের ধারণায় ছিল না। মদখোর, যালিম, যিনাহে লিপ্ত, চোর-ডাকাত, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারী ইত্যাদি ধরনের পাপী বান্দারাও সালাত পড়ত।

কিন্তু বর্তমানের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন, মুসলিম জনসংখ্যার শতকরা ২০ ভাগ লোকও সালাত সঠিকভাবে আদায় করে না। ইসলামের সকল স্তম্ভ ভেঙ্গে গেছে, তাই মুসলিমদের বৃহৎ জামায়াত শুধু সালাতের দিকেই আহবান করছে। আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ এর মধ্যে এখন সালাতই সবচেয়ে বড় ইস্যু বলে গণ্য হচ্ছে।

টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ: ২২১৬০। তাবরানি: ৭৪৮৬।

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সালাতে একাগ্রতা

📄 সালাতে একাগ্রতা


অন্যদিকে যারা সালাত আদায়কারী তাদের অবস্থাও ভালো নয়। সালাতে একাগ্রতা নেই, খুশু-খুজু নেই। আজকের সালাত যেন শুধু কিছু শারিরিক কসরতে পরিণত হয়েছে। অবহেলা, অলসতায় স্বাদহীনভাবে সালাত আদায়কারীরা কোনোরকম সালাত আদায় করছে। এই প্রসঙ্গে হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি ভবিষ্যতবাণী রয়েছে, তিনি বলেন- “তোমরা তোমাদের দ্বীনের বিষয়সমূহ থেকে সর্বপ্রথম খুশুকে হারাবে, আর সর্বশেষ হারাবে সালাত। অনেক সালাত আদায়কারী আছে, যাদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। অচিরেই তোমরা মসজিদে প্রবেশ করবে, কিন্তু কোনো বিনয়াবনত সালাত আদায়কারী দেখতে পাবে না।”২

আমরা এখন শেষ যামানায় বসবাস করছি, আমাদের সালাতে খুশু খুজু নেই। আর তাই আমাদের নামায আমাদেরকে হারাম, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি থেকে বাঁচাতে পারছে না। নামায পড়লেও মন প্রফুল্ল হচ্ছে না, আত্মা পরিতৃপ্ত হচ্ছে না, পাচ্ছি না মানসিক প্রশান্তি। চারদিকের ফিতনা আমাদের গ্রাস করছে, পরাস্ত করছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُم فِي صَلَاتِهِم خَاشِعُونَ.
"ঐ সকল মুমিনরা সফল যারা তাদের নামাযে বিনয়-নম্র।”৩

আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন-
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلُوةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةُ إِلَّا عَلَى الْخُشِعِينَ.
"আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। আর নিশ্চয় তা বিনয়ীরা ছাড়া অন্যদের উপর কঠিন।”৪

টিকাঃ
২ মাদারিজুস সালেকিন: ১/৫২১।
৩ সুরা মুমিনুন: ১-২।
৪ সুরা বাকারা: ৪৫।

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 দুনিয়াবী আলোচনায় মগ্ন সালাত আদায়কারী

📄 দুনিয়াবী আলোচনায় মগ্ন সালাত আদায়কারী


আজকাল দেখা যায় মসজিদে সালাত আদায় করতে এসে পরস্পর নানান কথাবার্তায় আমরা লিপ্ত হই। অথচ মসজিদে দুনিয়াবী কথা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ। মসজিদ তৈরির উদ্দেশ্য হলো সালাত আদায় করা, আল্লাহ তায়ালার যিকির, দ্বীনের বিষয়ে আলোচনা ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إِنَّمَا هِيَ لِذِكْرِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَالصَّلَاةُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ.
“নিশ্চয় তা (তথা মসজিদ) আল্লাহর যিকির, সালাত এবং কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য।”

তবে পারস্পরিক তথ্য আদান প্রদান, একে অপরের খোঁজ খবর নেয়া, অতীত জীবনের কথা বলা, উম্মাহ্র ভালো মন্দ আলাপ করা ইত্যাদি বিষয় মসজিদে আলাপ করা যায়। হাদিসে এসেছে- “সাহাবাগণ মসজিদে নববিতে বসে পূর্বের জাহিলিয়াতের দিনের বিষয়ে আলোচনা করতেন। তখন মসজিদ হতে দেশ শাসন, বিচার ব্যবস্থা, সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নিষেধসহ যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দেয়া হত। এই সব কর্ম দুনিয়াবী কাজের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু মসজিদে বেচা-কেনা বা লেনদেন করা যাবে না, গিবত পরনিন্দা, হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি করা যাবে না।”

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, আজ আমাদের সমাজে মুসল্লিগণ অপ্রাসঙ্গিক গল্প করেন, গীবত পরনিন্দা করেন, হিংসা বিদ্বেষ প্রচার করেন। মসজিদে পণ্য নিয়ে আসা যায় না, কিন্তু মোবাইল ফোন ব্যবহার করে মসজিদে বসেই অনেককে ক্রয়-বিক্রয় করতে দেখা যায়। মসজিদে ফোনের হারাম মিউজিক সালাত চলাকালীন সময়ে বেজে উঠছে। মসজিদে মিথ্যুক নেতাগণ সমাজের হর্তাকর্তাগণ এসে তাদের মিথ্যা প্রচার করছেন।

টিকাঃ
* সহিহ মুসলিম: ১০০১।
* সহিহ মুসলিম: ৬৭০১।
* সহিহ বুখারি: ১/১৭৯১।

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 আখেরি যামানায় অধিকাংশ ইবাদতকারী হবে মূর্খ

📄 আখেরি যামানায় অধিকাংশ ইবাদতকারী হবে মূর্খ


হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

يَكُونُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ عُبَادٌ جُهَّالٌ وَقُرَّاءٌ فُسَقَةٌ. “আখেরি যামানায় অনেক ইবাদতকারী হবে মূর্খ। আর অনেক ক্বারিরা হবে ফাসিক (অর্থাৎ কবীরা গোনাহে লিপ্ত)।”১০

আজ অধিকাংশ ইবাদতকারী, সালাত আদায়কারী, সিয়াম পালনকারী দ্বীনের প্রাথমিক বিষয়ে অজ্ঞ। তারা সালাতের ফরজ ওয়াজিব সুন্নাত সম্পর্কে জানে না, অধিকাংশরা সহিহভাবে তিলাওয়াত করতে পারে না, সালাতের নিয়ম নীতিও জানে না। সিয়াম ভঙ্গের কারণ সম্পর্কে বেখবর। অধিকাংশ সালাত আদায়কারী সঠিকভাবে সুরা ফাতিহা পাঠ করতে পারে না। হাদিসের সাথে আমাদের যামানার অবস্থা পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।

মুসলিমের সন্তান হয়েও দ্বীনের বিষয়ে কোনো জ্ঞান থাকবে না এটা পূর্বে চিন্তাও করা যেত না। ইসলাম ধর্মের একটি সুন্দর বৈশিষ্ট্য হল-বান্দা সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারে, ইবাদত করতে পারে, সালাত পড়তে ও পড়াতে পারে। তার কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নেই। যেকোনো মুসলিম ইমাম হতে পারে, জানাজার নামায পড়াতে পারে। যা অন্য ধর্মে নেই। অন্যদিকে পোপ ব্যতীত খ্রিষ্টান ধর্মে বান্দা আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করতে পারে না, দু'আ করতে পারে না। ইসলামের এই সুন্দর বৈশিষ্ট্য আজ বিলুপ্ত। আজকের মুসলিমরা বাবা মা মারা গেলেও দু'আ করতে জানে না, কুর'আন খতম দিতে পারে না। তারা সালাতে প্যান্ট টাখনুর উপরে তুলে রাখে, জানে না যে-সর্বাবস্থায় প্যান্ট টাখনুর নিচে পড়া হারাম। তারা টুপি শুধু সালাতে পড়তে জানে। নারিরা আযানের সময় মাথা ঢাকতে জানে, তারা জানে না গায়রে মাহরামদের সমানে সর্বাবস্থায় চুল-মাথা ঢেকে রাখতে হবে। দুনিয়াবী জ্ঞান থাকলেও আজকের মুসলিমরা দ্বীনের প্রাথমিক বিষয়ে মূর্খ, জাহিল। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُم عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ.
“দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক বিষয়ের ইলম তাদের রয়েছে। অথচ আখেরাত সম্পর্কে তারা উদাসীন।”১১

টিকাঃ
১০ কানযুল উম্মাল: ১৪/২২২। মুসতাদরাকে হাকিম: ৪/৩৫১।
১১ সুরা রুম : ৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00