📄 সালাত : পাপের প্রায়শ্চিত্ত, পবিত্রতা অর্জন ও জান্নাতে দাখিলের চিরন্তন ব্যবস্থাপত্র
সালাত সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস:
১. আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
عن أبي هريرة، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: أرأيتم لو أن نهرا بباب أحدكم يغتسل منه كل يوم خمس مرات هل يبقى من درنه شيء؟ قالوا: لا يبقى من درنه شيء. قال: فكذلك مثل الصلوات الخمس يمحو الله بهن الخطايا.
“তোমাদের কি মনে হয়, যদি কারো দরজার কাছে নদি থাকে যাতে সে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকবে?” তারা বলল, “তার গায়ে কোনো ময়লা থাকবে না।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- “পাঁচ ওয়াক্ত সালাতও একই রকম। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা পাপসমূহ মুছে দেন। "৪৬
২. আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
عن أبي هريرة، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يقول: الصلوات الخمس والجمعة إلى الجمعة، ورمضان إلى رمضان، مكفرات ما بينهن ما اجتنبت الكبائر.
“পাঁচ ওয়াক্ত নামায, এক জুমআ থেকে আরেক জুমআ এবং এক রমাদান থেকে আরেক রমাদানের মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহকে মুছে দেয়, যদি সে কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।”৪৭
৩. আরো বর্ণিত আছে-
হযরত রাবিয়াহ বিন কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন-
حدثني ربيعة بن كعب الأسلمي، قال: كنت أبيت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم فأتيته بوضوئه وحاجته فقال لي: «سل» فقلت: أسألك مرافقتك في الجنة. قال: «أو غير ذلك» قلت: هو ذاك. قال: فأعني على نفسك بكثرة السجود.
“আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে রাত যাপন করতাম; তার অজুর পানি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস হাজির করে দিতাম। একদিন তিনি আমাকে বললেন, "তুমি আমার কাছে কিছু চাও।” আমি বললাম, 'আমি জান্নাতে আপনার সংস্পর্শে থাকতে চাই।' তিনি বললেন, “এছাড়া আর কিছু?” আমি বললাম- 'ওটাই (আমার বাসনা)।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তাহলে অধিক থেকে অধিক (নফল সালাত আদায়ের মাধ্যমে) সিজদাহ করে এ ব্যাপারে আমার সহায়তা কর। ৪৮
প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন-
৪. আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
عن أبي ذر، أن النبي صلى الله عليه وسلم خرج زمن الشتاء والورق يتهافت، فأخذ بغصنين من شجرة، قال: فجعل ذلك الورق يتهافت، قال: فقال: «يا أبا ذر قلت: لبيك يا رسول الله. قال: إن العبد المسلم ليصلي الصلاة يريد بها وجه الله فتهافت عنه ذنوبه كما يتهافت هذا الورق عن هذه الشجرة.
“একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শীতকালে বের হন, এই সময় গাছ থেকে পাতা ঝরছিল। তিনি একটি গাছের ডাল ধরে হালকা নাড়ান এতে আরো বেশি পাতা ঝরে পড়ে। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হে আবু যার, আমি বললাম, 'উপস্থিত, হে আল্লাহর রাসূল!' তিনি বলেন, 'যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সালাত কায়েম করে, তখন তার পাপরাশী গাছের পাতা ঝরার মত করে ঝরতে থাকে।"৪৯
৫. উকবা ইবনু আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
عن عقبة بن عامر قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: يعجب ربك من راعي غنم في رأس شظية الجبل يؤذن بالصلاة ويصلي، فيقول الله عز وجل: انظروا إلى عبدي هذا يؤذن ويقيم الصلاة يخاف مني، قد غفرت لعبدي وأدخلته الجنة.
“আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তোমার রব সে ব্যক্তির উপর খুশি হন, যে পাহাড়ের উচ্চশৃঙ্গে বকরী চরায় এবং নামাযের জন্য আযান দেয় ও সালাত আদায় করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা আমার এ বান্দাকে দেখো, সে আযান দিচ্ছে এবং সালাত কায়েম করছে ও আমাকে ভয় করছে। আমি আমার এ বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালাম।"৫০
টিকাঃ
৪৬ সহিহ বুখারী: ৫২৮; সহিহ মুসলিম: ৬৬৭; সুনানু তিরমিযি: ২৮৬৮; সুনানু নাসাঈ : ৪৬২; মুসনাদু আহমাদ: ৮৯২৪।
৪৭ সহিহ মুসলিম: ২৩৩; মুসনাদু আহমাদ: ৯১৯৭।
৪৮ সহিহ মুসলিম: ৪৮৯; সুনানু আবু দাউদ: ১৩২০ [সনদ সহিহ]।
৪৯ মুসনাদু আহমাদ: ২১৫৫৬ (সনদ হাসান)।
৫০ সুনানু নাসাঈ: ৬৬৫; সুনানু আবু দাউদ: ১২০৩; মুসনাদু আহমাদ: ১৭৪৪২। (সনদ সহিহ]
📄 সালাত : প্রত্যেক মুসলিমের অপরিহার্য কর্তব্য
মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক শিশুর জীবনের সূচনা হয় ডান কানে আযান এবং বাম কানে ইকামত শুনার মাধ্যমে। প্রত্যেক পিতা- মাতার উচিত শৈশব থেকেই সন্তানদের নামাযের গুরুত্ব জানানো এবং সালাত পড়ার নিয়ম শিখানো।
সালাতের অপরিসীম গুরুত্বের কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শৈশব-কৈশোর থেকেই সন্তানকে সালাতে অভ্যস্ত করাতে বলেছেন。
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: مروا أولادكم بالصلاة وهم أبناء سبع سنين، واضربوهم عليها، وهم أبناء عشر وفرقوا بينهم في المضاجع.
“সাত বছর বয়স হলে তোমরা তোমাদের সন্তানদের সালাতের জন্য নির্দেশ দাও এবং ১০ বছর হলে (সালাত আদায় না করলে) তাদের প্রহার করো। আর তাদের (ছেলে এবং মেয়ের) ঘুমের বিছানা পৃথক করে দাও।”৫১
সালাত পুরুষের মত নারির উপরও ফরজ করা হয়েছে। নারিদের সাধারণত ঘরের অভ্যন্তরে সালাত পড়া উচিত, তবে নারিরা ইচ্ছে করলে মসজিদে গিয়ে ফরজ সালাত কায়েম করতে পারে, এবং তাতে কারোর বাঁধা দেয়া উচিত নয়।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
عن ابن عمر، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: لا تمنعوا النساء أن يخرجن إلى المساجد، وبيوتهن خير لهن.
“তোমরা তোমাদের নারিদের মসজিদে যেতে নিষেধ করো না। তবে তাদের ঘরই তাদের জন্য উত্তম।"৫২
أن عبد الله بن عمر قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: لا تمنعوا نساءكم المساجد إذا استأذنكم إليها.
অন্যত্র এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যদি তোমাদের কারও স্ত্রী মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চায় তবে তাদের নিষেধ করো না।"৫৩
পরিশেষে.....
সালাত প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ।
فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلَاةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِكُمْ فَإِذَا اطْمَأْنَنتُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا.
“অতঃপর যখন তোমরা সালাত সম্পন্ন কর, তখন দণ্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর। অতঃপর যখন বিপদমুক্ত হয়ে যাও, তখন সালাত ঠিক করে আদায় করো। নিশ্চয়ই সালাত মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।”৫৪
হযরত আনাস ইবনু মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
من نام عن صلاة فليصلها إذا استيقظ، ومن نسي صلاة فليصلها إذا ذكرها.
“কোনো ব্যক্তি সালাত আদায় করতে ভুলে গেলে যখনই তার (সালাতের কথা) স্মরণ হবে, আদায় করে নেবে।”৫৫
দুরুদ ও শান্তির অবিরাম ধারা বর্ষিত হোক নবিকুল শিরোমণি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পবিত্র বংশধর ও তাঁর অনুসারীদের উপর।
টিকাঃ
৫১ সুনানু আবু দাউদ: ৪৯৫। [সনদ 'হাসান সহিহ']; করহুস সুন্নাহ: ৫০৫।
৫২ সুনানু আবু দাউদ: ৫৬৭। [সনদ সহিহ]; মুসনাদু আহমাদ: ৫৪৭২।
৫৩ সহিহ মুসলিম: ১০১৬; ইবনু মাজাহ ৬২৪।
৫৪ সূরা নিসা: ১০৩।
৫৫ ত্বহাবি শরিফ: ২৬৭৪। জ্ঞাতব্য বিষয়: যদি কেউ সালাত আদায় করতে ভুলে যায়, কিংবা সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে পড়ে, আর যদি উক্ত ব্যক্তি যখন জাগ্রত হয় বা সালাতের কথা মনে পরে সেই সময়টা যদি ‘মাকরুহ বা হারাম’ ওয়াক্ত না হয়ে থাকে, তাহলে তৎক্ষণাৎ সালাত আদায় করে নিবে। আর যদি মাকরুহ বা হারাম ওয়াক্তে গিয়ে সালাতের কথা মনে পরে তাহলে ‘হারাম বা মাকরুহ’ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সালাত আদায় করে নিবে। ঐ সময় সালাত আদায় করবে না। সুত্রঃ [বাদায়ে সানায়ে: ১/২৪৫; বিনায়া শারহুল হিদায়া: ২/৫৯।]