📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সালাত : শয়তানের বিরুদ্ধে একটি ঢালস্বরূপ

📄 সালাত : শয়তানের বিরুদ্ধে একটি ঢালস্বরূপ


মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুর'আনুল কারিমে ইরশাদ করেন-

إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ.

"নিশ্চয় সালাত আল ফাহশা (অর্থাৎ প্রত্যেক কবিরা গুনাহ, যিনা, অশ্লীলতা ইত্যাদি) এবং আল মুনকার (অর্থাৎ কুফর, শিরক এবং প্রত্যেক শয়তানী কর্ম ইত্যাদি) থেকে বিরত রাখে”।”২১
নিম্নোক্ত ঘটনায় বিষয়টি আরো সহজে বুঝা যাবে-

একদা মদ্যপান, জুয়া ও চুরি-ডাকাতিতে অভ্যস্ত একজন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন। তাঁর নিকট কিছু উপদেশ চাইলেন, যাতে নিজ চরিত্রে পরিবর্তন আনতে পারেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে খুব সাধারণ এক উপদেশ দেন; “কখনো মিথ্যা বলবে না"। তারপর তাকে পরের দিন এসে অবস্থা জানাতে বলা হল। লোকটি চলে গেলেন। তিনি খুব আনন্দ অনুভব করছিলেন। তার নিকট এই সাধারণ নির্দেশ পালন করা খুব সহজ মনে হচ্ছিল। বাসায় এসে ব্যক্তিটি গ্লাসে মদ ঢাললেন এবং গ্লাসটি ঠোঁটে লাগালেন, হঠাৎ তার স্মরণ হল আগামীকালকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পুরো রিপোর্ট দিতে হবে। তাকে আজকের দিনের সব কাজের কথা জিজ্ঞেস করা হবে। যদি তিনি সকল সাহাবাদের সামনে মদ পানের কথা স্বীকার করেন তাহলে তা তার জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর হবে।
আর তিনি যদি মদ পান করার কথা অস্বীকার করেন, তাহলে তা হবে মিথ্যা কথা। তাই তিনি মদের গ্লাস রেখে দেন। একই ঘটনা ঘটে অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও। যখন তিনি জুয়ার আসরে বসেন এবং ডাকাতি করতে যান একই চিন্তা তার মাথায় আসে, এবং তিনি তা থেকে বিরত থাকেন। এটা ছিল ওই ব্যক্তির নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রথম পদক্ষেপ। এভাবে তিনি দ্রুত নিজের চরিত্রে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন।

সালাতেরও রয়েছে একই রকম প্রভাব। যদি একজন ব্যক্তির স্মরণে থাকে যে তাকে দিনে ৫ বার 'মুসল্লায়' দাঁড়াতে হবে এবং প্রার্থনা করতে হবে, তাহলে তা তাকে শয়তান প্ররোচনা দেয় এমন সকল পাপকর্ম থেকে হিফাজত করবে।

অবশ্যই সালাতের মান ভালো হতে হবে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবহেলায় নামায পড়লে তা থেকে কোনো উপকার পাওয়া যায় না। একটি দালানের কথা ভাবুন—যার স্থাপনা খুব শক্ত, তৈরি হয়েছে উন্নত কাঁচামাল দিয়ে, রয়েছে চারটি শক্ত দেয়াল ও মজবুত ছাঁদ। এমন দালান যেকোনো বৈরী আবহাওয়ায়, ঝড়-তুফানে টিকে থাকতে সক্ষম। সর্বোপরি ইমারত বানানোর উদ্দেশ্যেই তো হল নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা পাওয়া। অন্যদিকে যদি ইমারতের ভিত্তি দুর্বল হয়, তাহলে তা এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারবে না।

এখন সালাতের কথা ভাবুন। যদি সালাত নিয়মিত, যথাযথ সময়ে, কিরাত বুঝে বুঝে, সম্পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতার সাথে পড়া হয় তাহলে তা মানুষের ঈমানকে মজবুত ও দৃঢ় করবে, বিপদের সময়ে তা শক্তি যোগাবে, চক্ষু শীতল করবে, অন্তর শান্তি ও স্বস্তিতে ভরে উঠবে।
অন্যদিকে অনিয়মিত, অবহেলায় পড়া সালাত বিপদের সময়ে মানুষের তেমন কাজে আসবে না। এমন সালাত তার মনে প্রশান্তি বয়ে আনতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যবান দেহ দুর্বল দেহের তুলনায় খুব সহজে ভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারে।

টিকাঃ
২১ সূরা আনকাবুত : ৪৫।

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সালাত : ইসলামি শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ

📄 সালাত : ইসলামি শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ


পবিত্র কুরআনুল কারিমে শুআইব আলাহিস সালাম ও তাঁর কাওমের কথোপকথন বর্ণিত হয়েছে-

وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَّهِ غَيْرُهُ وَلَا تَنقُصُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ إِنِّي أَرَاكُم بِخَيْرٍ وَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ مُّحِيط. وَيَا قَوْمِ أَوْفُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ. بَقِيَّتُ اللَّهِ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ وَمَا أَنَا عَلَيْكُم بِحَفِيظٌ.
“আর মাদয়ানে তাদের ভাই শুআইবকে নবি করে পাঠাই। সে (তাদেরকে) বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া আমাদের কোন মাবুদ নেই। ওজনে কম দিও না। আজ আমি তোমাদেরকে ভাল অবস্থায়ই দেখছি, কিন্তু আমি তোমাদের উপর এমন একদিনের আযাবের আশঙ্কা করছি, যা তোমাদেরকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে ফেলবে। হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ওজনে ন্যায়সঙ্গতভাবে পূর্ণ করবে। মানুষকে তাদের দ্রব্যাদি কম দেবে না এবং পৃথিবিতে ফাসাদ বিস্তার করে বেড়াবে না। আল্লাহ প্রদত্ত উদ্ধৃত্ত তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা ঈমানদার হও, আর আমি তোমাদের উপর সদা পর্যবেক্ষণকারী নই।”২২

শুআইব আলাহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়কে তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং আল্লাহর বিধান মত ব্যবসা বাণিজ্য করার জন্য আহ্বান করেছিলেন। আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তাঁর সম্প্রদায় খুব তিক্ত মন্তব্য করে-
قَالُوا يَا شُعَيْبُ أَصَلَاتُكَ تَأْمُرُكَ أَن نَّتْرُكَ مَا يَعْبُدُ آبَاؤُنَا أَوْ أَن نَّفْعَلَ فِي أَمْوَالِنَا مَا نَشَاءُ إِنَّكَ لَأَنتَ الْحَلِيمُ الرَّشِيدُ.
“তারা বলল, হে শুআইব! তোমার নামায কি তোমাকে এই আদেশ করেছে যে, আমাদের বাপ-দাদাগণ যাদের উপাসনা করত, আমরা তাদেরকে পরিত্যাগ করব এবং নিজেদের অর্থ-সম্পদে যা ইচ্ছা হয় তা করব না? তুমি তো বড় বুদ্ধিমান ও সদাচারী লোক।”২৩

শুআইব আলাহিস সালামের সম্প্রদায় ভালো করে বুঝতে পেরেছিল যে, তিনি শুধু তাদের নিয়মিত নামাযের দিকে আহ্বান করছেন না, পাশাপাশি তিনি একটি নতুন অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন। শিক্ষণীয় হল, খ্রিষ্টানদের একটি প্রসিদ্ধ প্রবাদ আছে— “যা আল্লাহর মালিকানাধীন তা আল্লাহর; এবং যা সিজারের মালিকানাধীন তা সিজারের"। অর্থাৎ আল্লাহর প্রাপ্য আল্লাহকে দাও এবং সিজারের প্রাপ্য সিজারকে দাও। মূলত তারা এর মাধ্যমে দ্বীন ও রাজনীতিকে পৃথক করেছে। ইসলাম এই ধারণা চরমভাবে উৎখাত করে। বরং ইসলাম বলে সবকিছু আল্লাহর। সবকিছুই তাঁর মালিকানাধীন, তাঁর অধিকারভুক্ত। প্রতিদিন ৫বার সালাতে আল্লাহর ইবাদতকারী মুসলিম থেকে কী করে আশা করা যায় যে, সে জীবনের অন্যান্য বিষয়ে আল্লাহকে বাদ দিয়ে গায়রুল্লাহর অনুসরণ করবে, দৈনন্দিনের অন্যান্য কর্মে সে আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে গারুল্লাহর বিধান গ্রহণ করবে। ইসলাম এমন দ্বিমুখী আচরণ অনুমোদন করে না। মহান আল্লাহ হলেন সৃষ্টিকর্তা। একমাত্র তিনিই বিধান প্রণয়নের এবং অনুগত্য পাওয়ার অধিকার রাখেন। মানুষ হল আল্লাহর গোলাম। মানুষকে শুধুমাত্র আল্লাহর-ই অনুসরণ করতে হবে।

যেসকল মুসলিমরা অমুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করেন, হয়তো তারা ভাবতে পারেন যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে তারা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে অক্ষম, কিন্তু যেসকল মুসলিমগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করেন তাদের কাছে দ্বীনকে শুধু ব্যক্তি জীবনে আবদ্ধ করে রাখার অনুমতি ইসলাম কখনো দেয় না।

আল্লাহর দ্বীন শুধু সালাত, রোযা, যাকাত এবং হজ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা প্রত্যেক মুসলিমকে খুব ভালো করে বুঝে নিতে হবে। প্রত্যেক মুসলিমদের দায়িত্ব হল ইসলামের প্রতিটি শিক্ষা ও বিধান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বাস্তবায়ন করা।

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ. “নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম”। ২৪

وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ. “যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত”। ২৫

বর্তমান যামানায় পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, সাম্যবাদ, গণতন্ত্রের মত বহু বাতিল মতবাদ পৃথিবিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে, কর্তৃত্ব কায়েম করে রেখেছে। অন্যদিকে ইসলাম শরঈ নিজামে পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং যাকাত ভিত্তিক ও সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থার দিকে আহ্বান করে। যদি এই তিন ব্যবস্থার একটিও অকার্যকর থাকে তাহলে ইসলামি শরিয়াহ যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা হতে পারবে না, কার্যকর হতে পারবে না।

কুর'আন স্পষ্টভাবে মুসলিম শাসকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্বের কথা বর্ণনা করছে-
الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ.
“(মুসলিম শাসকরা) এমন লোক যে, আমি যদি দুনিয়ায় তাদেরকে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, মানুষকে সৎকাজের (অর্থাৎ আল্লাহর একত্ববাদ ও ইসলামে যা যা অনুমোদিত সেগুলো) আদেশ করবে ও অন্যায় (অর্থাৎ কুফর, শিরকসহ ইসলাম যা যা বর্জনীয় করেছ এমন) কাজে বাঁধা দেবে (অর্থাৎ সর্বোপরি তারা কুর'আনকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করবে)। সব কাজের পরিণতি আল্লাহরই হাতে।”২৬

“মানুষ তার শাসকের ধর্মের অনুসরণ করে” এটা হল জনপ্রিয় এক আরবি প্রবাদ বাক্য। অবশ্যই সাধারণ জনগণ শাসকদের অনুসরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, এবং যদি শাসক কর্তৃপক্ষ তাদের মাঝে যথাযথভাবে নামায ও রোযার উদাহরণ তৈরি করতে পারে, তবে জনগণ উৎসাহের সাথে এই আমলগুলো করবে। যারা ক্ষমতায় থাকে তারা আমলের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন জিনিসের সরবরাহকারীও বটে। পাবলিক প্লেসে নামাযের ব্যবস্থা করা, মসজিদ নির্মাণ করা ইত্যাদি হল তাদের এখতিয়ারভূক্ত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হক শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, যতক্ষণ না তারা নামায কায়েম করে এবং কোনো কুফরিকর্মে লিপ্ত না হয়। এই আদেশের ফলে মুসলিম রাষ্ট্র বহু গৃহযুদ্ধ এবং স্বৈরশাসকের হাত থেকে রক্ষা পায়।

টিকাঃ
২২ সূরা হুদ: ৮৪-৮৬।
২৩ সুরা হুদ: ৮৭।
২৪ সূরা ইমরান: ১৯।
২৫ সূরা ইমরান: ৮৫।
২৬ সূরা হাজ্জ: ৪১।

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সালাত : পাপ মোচনকারী এবং ছোট ছোট গুনাহের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ

📄 সালাত : পাপ মোচনকারী এবং ছোট ছোট গুনাহের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ


সালাত শুধু ব্যক্তিকে সৎকর্মের প্রতি উৎসাহিত করে না, পাশাপাশি সগিরা গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ.
“নিশ্চয়ই পুণ্যরাজি পাপরাশিকে (সগিরা গুনাহকে) মিটিয়ে দেয়”। ২৭

যেহেতু প্রত্যেক ভালো কাজের মধ্যে নামায হল সর্বাপেক্ষা উত্তম। তাই নামায মানুষের ছোট-খাট গুনাহের প্রায়শ্চিত্ত করে।

আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি হাদিস শুনে আমার নিকট বর্ণনা করেন-
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: " ما من عبد يذنب ذنبا، فيحسن الطهور، ثم يقوم فيصلي ركعتين، ثم يستغفر الله، إلا غفر الله له.
“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যখন কোনো বান্দা কোনরূপ গুনাহ করার পর উত্তমরূপে অজু করে দাঁড়িয়ে দু'রাক'আত সালাত আদায় করে এবং আল্লাহর নিকট গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন।”২৮

এর অর্থ এ নয় যে, ব্যক্তি নিজ ইচ্ছামাফিক গুনাহ করতে থাকবে এবং সালাত পড়ে গুনাহের ক্ষমা লাভ করবে। এখানে মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বুঝিয়েছেন যে, তোমরা গুনাহের পর নিরাশ হইও না, প্রায়শ্চিত্তের দরজার তোমাদের জন্য উন্মুক্ত আছে। একজন ব্যক্তি সুন্দরভাবে, একাগ্রচিত্তে, যথাযথ নিয়মে সালাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং চারিত্রিক উৎকর্ষতা অর্জন করবে। ক্ষমা প্রার্থনার পর তাওবাকারী ব্যক্তির ঈমান দৃঢ় হবে, সে তাঁর ঈমানে নতুন উদ্যম ও প্রাণশক্তি ফিরে পাবে, এবং শয়তানের কুকর্মের প্ররোচনার বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি পাবে।

সূরা ফুরকানে আল্লাহ তা'আলা কবিরা গুনাহগার ব্যক্তির তাওবা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন-
وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بالحقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا. يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا. إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا. وَمَن تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّهُ يَتُوبُ إِلَى اللَّهِ مَتَابًا.
“এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যের ইবাদত করে না, আল্লাহ যার হত্যা অবৈধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতিত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যে ব্যক্তি এরূপ করবে তাকে তার গুনাহের (শাস্তির) সম্মুখীন হতে হবে। কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি বৃদ্ধি করে দ্বিগুণ করা হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে। তবে কেউ তাওবা করলে, ঈমান আনলে এবং সৎকর্ম করলে, আল্লাহ এরূপ লোকদের পাপরাশিকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যে ব্যক্তি তাওবা করে ও সৎকর্ম করে, সে মূলত আল্লাহর দিকে যথাযথভাবে ফিরে আসে।”২৯

টিকাঃ
২৭ সূরা হুদ: ১১৪।
২৮ সহিহ মুসলিম: ৫৬৪; সুনানু আবু দাউদ : ১৫২১; সুনানু ইবনু মাজাহ : ৭৭৭ [সনদ সহিহ]।
২৯ সূরা ফুরকান: ৬৮-৭১।

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সালাত : বিচার দিনে মানুষ প্রথম যে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে

📄 সালাত : বিচার দিনে মানুষ প্রথম যে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে


আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র একটি উদ্দেশ্য মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, এবং এই দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ.
“আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি”।৩০

মানুষকে এই দুনিয়াই শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদতকারী হয়ে বসবাস করতে হবে, এবং আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ইবাদত হল সালাত। হাশরের ময়দানে বিচারের সময় মানুষকে দুনিয়ায় করা প্রতিটি কাজের জবাবদিহি দিতে হবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, দুনিয়ায় তাকে দেয়া অজস্র নিয়ামতের কথা, সে কিভাবে এই নিয়ামত ব্যবহার করেছে, কোন পথে আয় করেছে কোন পথে ব্যয় করেছে।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ. “এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে"।

তবে হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। মানুষ দুইবার তাঁর সৃষ্টিকর্তার সম্মুখে দাঁড়াতে পারে, একবার দুনিয়াতে অন্যবার আখিরাতে। প্রথমবার হল—যখন সে আল্লাহর সম্মুখে প্রতিদিন ‘ফরজ সালাত’ পড়তে জায়নামাজে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়বার হল—যখন সে হাশরের ময়দানে বিচার দিনের মালিকের সামনে দাঁড়াবে। যদি তার প্রথমবার দাঁড়ানো (অর্থাৎ সালাতে দাঁড়ানো) সঠিক হয় তাহলে আল্লাহর সম্মুখে দ্বিতীয়বার দাঁড়ানো তার পক্ষে সহজ হবে। যদি আল্লাহর সম্মুখে প্রথমবার (সালাতে) দাঁড়ানো ভুল হয় তাহলে দ্বিতীয়বার আল্লাহর সামনে হাশরের ময়দানে দাঁড়ানো তার জন্য অত্যাধিক কঠিন হবে।

জেনে-বুঝে এক ওয়াক্ত সালাত ছেড়ে দেয়াও ভয়াবহ গুনাহ। এই গুনাহের কোনো কাফফারা নেই। একজন মুসলিম যতই বিপদে থাকুক এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও এক ওয়াক্ত সালাত সে ছেড়ে দিতে পারবে না। তাহলে স্বাভাবিক জীবনে নামায ছেড়ে দেওয়ার আর কী বা কারণ থাকতে পারে। যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে, ইমাম মুসলিমদের দুই অংশে ভাগ করবেন, এক অংশ ইমামের সাথে সালাতে শরিক হবে আরেক অংশ শত্রুর মুখোমুখি অবস্থান করবে। ইমাম প্রথম অংশকে নিয়ে প্রথম রাকাত শেষ করলে প্রথম অংশ উঠে শত্রুর মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াবে আর দ্বিতীয় অংশ ইমামের সাথে দ্বিতীয় রাকাতে শরিক হবে। এভাবে প্রত্যেকে সালাত আদায় করবে। এই সালাতকে বলা হয় ‘সালাতুল খাওফ’। অর্থাৎ ভয়-ভীতির সালাত।

আরেক প্রকারের সালাত রয়েছে ‘সংক্ষিপ্ত সালাত’। যুদ্ধ এবং সফরকালিন সময়ে এই সালাত পড়া হয়। এখানে ৪ রাকাতের ফরজ সালাত সংক্ষিপ্ত করে ২ রাকাতে আদায় করা হয়, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সালাত ছাড়া যাবে না। শুধুমাত্র হায়েযের সময়ে নারিরা সালাত ছাড়তে পারে। তাছাড়া নারীদেরকেও পুরুষের মত ফরজ সালাত আদায় করতে হয়। ফরয সালাতের বিধান এতটাই কঠোর যে অসুস্থতার সময় ব্যক্তির অসুস্থতা যতই হোক না কেন, যতক্ষণ ব্যক্তি সচেতন অবস্থায় থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে সালাত পড়তে হবে। যদি কোনো ব্যক্তি দাঁড়াতে অক্ষম হয় তাহলে তাকে বসে সালাত পড়তে হবে; যদি সে অসুস্থতার জন্য বসতেও অক্ষম হয় তাহলে তাকে শুয়ে চোখ, হাত ও পা ব্যবহার করে ইশারায় সালাত পড়তে হবে। সালাতের কোনো মাফ নেই।

টিকাঃ
৩০ সূরা যারিআত: ৫৬।
৩১ সূরা তাকাছুর : ৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00