📄 সালাত : আল্লাহর সাথে বান্দার যোগাযোগের মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভের পর আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক প্রেরিত তাঁর নিকট প্রথম আদেশসমূহের অন্যতম ছিল সালাত। ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর কাছে এলেন এবং তাদের সামনে থাকা একটি পাথরে আঘাত করলেন, তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে একটি ঝর্ণা বের হল। তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁকে কিভাবে অজু করতে হয় তা করে দেখান। পরে তাঁকে সালাত আদায় করে দেখান। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন দুইবার দু-রাকাআত করে সালাত পড়া আরম্ভ করেন। একবার দিনে আরেকবার সন্ধ্যায়। তিনি খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে সালাত পড়তে শেখান। সে সময় থেকে ইসরা ও মিরাজের ঘটনা পর্যন্ত প্রতিদিন তিনি এভাবে সালাত আদায় করতেন। হিজরতের খানিক পূর্বে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জেরুজালেমে নিয়ে যাওয়া হয় (ইসরা) এবং অত:পর জেরুজালেম থেকে আকাশে এবং জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হয় (মিরাজ)। এই সফরে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল্লা তাঁকে ৫ ওয়াক্ত সালাত পড়ার আদেশ দান করেন। এটা ছিল বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহর একটি তোহফা। এই গিফটের সাহায্যে একজন বান্দা প্রতিদিন রুহানিয়াত জগতে আল্লাহর মিরাজ লাভ করে অর্থাৎ আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করতে পারে। নামায হল মুমিনদের জন্য মিরাজস্বরূপ। সালাত বান্দাকে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে।
প্রতিবার সালাত পড়ার সময় বান্দাকে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে হয়। বার বার একই সূরা পাঠ করা সত্ত্বেও তাতে বান্দা কোনো প্রকার বিরক্তবোধ বা একঘেয়ামিপনা অনুভব করে না। কেননা এটা হল বান্দা ও তাঁর প্রভু আল্লাহর কথোপকথন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমনটাই বর্ণিত হয়েছে।
আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত এই বাক্যটি হাদিস নয়। এটা কোনো হাদিসের কিতাবেও পাওয়া যায় না। তবে ইসলামের অন্যান্য গ্রহণযোগ্য সুত্র মোতাবেক বাক্যটি সঠিক প্রমাণিত হয়। তাই এ বাক্য নামাযের জন্য উৎসাহ যোগাতে বলা যেতে পারে। কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস বলে প্রচার করা যাবে না। (মালফুজাতে ফকিহুল উম্মাহ, পৃষ্ঠা: ১৭)- অনুবাদক。
আবি হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু, আন রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ক্বালা: ইয়াকুলুল্লাহু তায়ালা: "কাসামতুস সালাতা বাইনি ওয়াবাইনা আবদি, ওলি আবদি মা সাআল, নিসফুহু লি ওয়া নিসফুহু লী, ফাইজা ক্বালা আল আবদু: {আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন} [আল ফাতিহা: ২], ক্বালা আর রাব্বু: হামেদিনী আবদি, ফাইজা ক্বালা: {আর রাহমানির রাহীম} [আল ফাতিহা: ১], ক্বালা আর রাব্বু: আছনা আলাইয়া আবদি, ফাইজা ক্বালা: {মালিকি ইয়াওমিদ্দীন}, ক্বালা: মাজ্জাদানি আবদি, ফাইজা ক্বালা: {ইয়্যাকানা'বুদু ওয়াইয়্যাকা নাসতায়ীন} [আল ফাতিহা: ৫], ক্বালা: হাজা লি আবদি, ওলি আবদি মা সাআল, ফাইজা ক্বালা: {ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম} [আল ফাতিহা: ৬], ক্বালা: হাজা লি আবদি ওলি আবদি মা সাআল।
আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- “আমি সালাতকে আমার মাঝে ও আমার বান্দার মাঝে ভাগ করে দিয়েছি। অর্ধেক আমার আর অর্ধেক আমার বান্দার। আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে, যা সে চায়।”
বান্দা যখন বলে-
اَلْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. (অর্থাৎ যাবতীয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য), তখন আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।” বান্দা যখন বলে-
الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ. (অর্থাৎ যিনি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু), তখন আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করেছে।” বান্দা যখন বলে-
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ. (অর্থাৎ বিচার দিনের মালিক), তখন আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমার আজমতের (বড়ত্বের) প্রশংসা করেছে।” বান্দা যখন বলে-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ.
(অর্থাৎ আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি), তখন আল্লাহ বলেন, “এ হচ্ছে আমার ও আমার বান্দার মাঝের কথা। আর আমার বান্দা তাই পায়, যা সে প্রার্থনা করে।” অতঃপর বান্দা যখন বলে-
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ، صِرَاطَ الَّذِينَ أَنعَمتَ عَلَيْهِمْ غَيرِ المَغضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ.
(অর্থাৎ আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন। আর তাদের পথে নয়, যাদের প্রতি আপনার গযব বর্ষিত হয়েছে, তাদের পথও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে), তখন আল্লাহ বলেন, “এসব কিছু আমার বান্দার জন্য। আর আমার বান্দা যা চায়, তাই পাবে।"৫
প্রতিদিন ৫ ওয়াক্তের সালাত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই বিষয়ে আল্লাহ বান্দাকে কোনো মন্তব্য বা অবহেলা করার অধিকার দেননি। এটা প্রত্যেক বান্দার উপর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বান্দা যদি ওয়াক্তের সংখ্যা কমিয়ে ফেলে অর্থাৎ ৫ ওয়াক্তের কম সালাত আদায় করে তাহলে এটা চরম অবাধ্যতা হবে। এছাড়াও এতে সালাতের সুফল কম পাওয়া যাবে।
উদাহরণস্বরূপ, একটি রুমকে তখনই বাসযোগ্য রুম বলা যাবে যখন এতে ৪টি দেয়াল ও একটি ছাঁদ থাকবে, যদি এটা থেকে একটি দেয়াল বা ছাঁদ সরিয়ে নেওয়া হয় তাহলে এটাকে রুম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে প্রতিদিনের ৫ ওয়াক্তের সালাত আদায় করলে ওই পুরো দিনে সালাতের উপকার লাভ করা যাবে, অন্যথায় যাবে না।
টিকাঃ
১. সুরা আলে ইমরান: ৩১।
৫. সহিহ মুসলিম: ৩৯৫; সুনানু তিরমিযি: ২৯৫৩; সুনানু আবু দাউদ: ৮২১; মুয়াত্তায়ে মালেক: ২৭৮; মুসনাদু আহমাদ: ৭৮৩৭।
📄 সালাত : ইসলামের একটি স্তম্ভ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
أَخْبَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ الصَّلَاةَ عَمُودُ الدِّينِ.
"সালাত হল দ্বীনের স্তম্ভ"।
আরো বর্ণিত আছে-
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: بني الإسلام على خمس: شهادة أن لا إله إلا الله، وإقام الصلاة، وإيتاء الزكاة، والحج، وصيام رمضان.
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
'ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। ১. আল্লাহ্ ব্যতিত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। ২. সালাত কায়েম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. হজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫. রামাদানের সিয়াম পালন করা।'৭
হাদিসে সালাতের বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলাম হল একটি দালানের মত, যে দালানের রয়েছে পাঁচটি স্তম্ভ। এখানের মাত্র একটি স্তম্ভ সরিয়ে ফেললে পুরো দালানের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। যদি প্রচণ্ড ঝড় বাতাস প্রবাহ হয় তাহলে এমন দালান ভেঙ্গে পড়বে। একইভাবে যখন একজন ব্যক্তি সালাত পড়ে না বা সালাত পড়া বন্ধ করে দেয়; তাহলে তার ঈমান দুর্বল হয়ে যাবে এবং মৃদু বাতাসেও তার ইমানের ভিত ভেঙ্গে টুকরো-টুকরো হয়ে যেতে পারে।
সালাত ইসলামের এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য স্তম্ভ যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
جابر بن عبد الله، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: بين العبد وبين الكفر ترك الصلاة.
“মুসলিম বান্দা এবং কাফের ও মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হল 'সালাত' পরিত্যাগ করা।"৮
অর্থাৎ মুমিনরা সালাত আদায় করেন, আর কাফির-মুশরিকরা সালাত আদায় করে না।
বাক্যটি কতই না বাস্তব! যদি আপনি পথে চলাচলকারী অসংখ্য মানুষদের মধ্যে কারা মুসলিম আর কারা কাফির তা সনাক্ত করতে চেষ্টা করেন, তাহলে তা আপনার জন্য অনেক কঠিন হবে। মুসলিমদের কপালে ইসলামের কোনো চিহ্ন নেই। কাফিরদের কপালেও কাফির লেখা কোনো সিল মারা নেই। কিন্তু সালাতের সময়ে আপনি সহজেই মুসলিম ও অমুসলিম গ্রুপকে চিনতে পারবেন। সালাতের সময় হলে আপনি দেখবেন, মুসলিম ব্যক্তি তার কাজ, ব্যবসা তথা তার কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে সালাতে শামিল হচ্ছে। অন্যদিকে দেখবেন কাফির ব্যক্তি তার দুনিয়াবি কর্মে ব্যস্ত রয়েছে।
সূরা আল মুদ্দাছছিরে 'বিচার দিনে'র একটি সুন্দর ঘটনার আলোচনা করা হয়েছে, সেদিন মুমিনরা জাহান্নামবাসীকে জিজ্ঞেস করবে-
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ. وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ. وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ. وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّينِ. حَتَّى أَتَانَا الْيَقِينُ.
“কোন জিনিস তোমাদেরকে জাহান্নামে দাখিল করেছে'? তারা বলবে, 'আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা মিসকীনদেরকে খাবার দিতাম না। আর যারা অহেতুক আলাপ-আলোচনায় মগ্ন হত, আমরাও তাদের সঙ্গে মগ্ন হতাম। এবং আমরা কর্মফল দিবসকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতাম। পরিশেষে সেই নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) আমাদের সামনে এসে গেল।”৯
যদিও সত্য পরিত্যাগকারীরা আজ দুনিয়ায় চুপ করে রয়েছে, কিন্তু পরকালে তারা নিজেরাই সত্য বলবে।
টিকাঃ
৬. জা'মে সাগির: ৫১৮৬।
৭. সহিহ বুখারি: ১৯০৯; সুনানু নাসাঈ ৫০০১।
৮. সুনানু তিরমিযি: ২৬১৯; সুনানু আবু দাউদ: ৪৬৭৮; সুনানু ইবনু মাজাহ: ১০৭৮ [সনদ সহিহ]।
৯. সূরা মুদ্দাছছির: ৪২-৪৭।
📄 সালাত হল একটি দুর্গের মত
সালাত হল প্রত্যেক ভালো কাজের সমষ্টি। নিম্নে কুর'আনের দুটি বর্ণনা তুলে ধরা হল, উভয় বর্ণনায় বেশ কিছু উত্তম কর্মের কথা বর্ণিত হয়েছে। এখানে প্রত্যেক উত্তম আমলের পূর্বে এবং পরে সালাতের বর্ণনা এসেছে।
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ. الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ. إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّ هُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ. فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ. أُولَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ.
“নিশ্চয় সফলতা অর্জন করেছে মুমিনগণ। যারা তাদের সালাতে আন্তরিকভাবে বিনীত। যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। যারা যাকাত সম্পাদনকারী। যারা নিজ লজ্জাস্থানের সংরক্ষণ করে নিজেদের স্ত্রী ও তাদের মালিকানাধীন দাসীদের ছাড়া অন্য সকলের থেকে। কেননা এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। তবে কেউ এ ছাড়া অন্য কিছু কামনা করলে তারাই হবে সীমালঙ্ঘনকারী। এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এবং যারা নিজেদের সালাতের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। এরাই হল সেই ওয়ারিশ, যারা জান্নাতুল ফিরদাউসের মীরাস লাভ করবে। তারা তাতে সর্বদা থাকবে।”১০
إِنَّ الْإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا. إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا. وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا. إِلَّا الْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ. وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَّعْلُومٌ. لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ. وَالَّذِينَ يُصَدِّقُونَ بِيَوْمِ الدِّينِ. وَالَّذِينَ هُم مِّنْ عَذَابِ رَبِّهِم مُشْفِقُونَ. إِنَّ عَذَابَ رَبِّهِمْ غَيْرُ مَأْمُونِ. وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ. فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ. وَالَّذِينَ هُم بِشَهَادَاتِهِمْ قَائِمُونَ. وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ. أُولَئِكَ فِي جَنَّاتٍ مُّكْرَمُونَ.
"মানুষ তো সৃজিত হয়েছে ভীরুরূপে। যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশকরে। আর যখন কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তখন কৃপণ হয়ে যায়। তবে তারা স্বতন্ত্র, যারা সালাত আদায়কারী। যারা তাদের সালাতে সার্বক্ষণিক কায়েম থাকে। এবং যাদের ধন-সম্পদে নির্ধারিত হক আছে যাঞ্ছাকারী ও বঞ্চিতের। এবং যারা প্রতিফল দিবসকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। এবং যারা তাদের পালনকর্তার শাস্তির সম্পর্কে ভীত-কম্পিত। নিশ্চয় তাদের পালনকর্তার শাস্তি থেকে নিঃশঙ্কা থাকা যায় না। এবং যারা তাদের যৌন- অঙ্গকে সংযত রাখে, কিন্তু তাদের স্ত্রী অথবা মালিকানাভূক্ত দাসিদের বেলায় তিরস্কৃত হবে না। অতএব, যারা এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করে, তারাই সীমালংঘনকারী। এবং যারা তাদের আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে। এবং যারা তাদের সাক্ষ্যদানে সরল-নিষ্ঠাবান। এবং যারা তাদের সালাতে যত্নবান। তারাই জান্নাতে থাকবে সম্মানজনকভাবে।”১১
এই আয়াতসমূহে মুমিনদের কয়েকটি চারিত্রিক ও আমলগত বৈশিষ্ট্যের আলোচনা করা হয়েছে। যার মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্য হল নামাযে আন্তরিকভাবে বিনীত হওয়া। মুমিনদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য হল-
০ তারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। ০ তারা যাকাত আদায় করে। ০ তারা নিজেদের স্ত্রী ও তাদের মালিকানাধীন দাসিদের ছাড়া অন্য সকলের থেকে নিজ লজ্জাস্থানের হিফাজত করে এবং অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকে। ০ তারা আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে। • তারা তাদের সাক্ষ্যদানে সরল-নিষ্ঠাবান থাকে।
এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা আবারো সালাতের কথা উল্লেখ করেন।
সূরা আল-মাআরিজ ও সূরা আল-মু'মিনুন উভয় বর্ণনায় আল্লাহ উত্তম আমল বা বৈশিষ্ট্যের শুরুতে এবং শেষে সালাতের আদেশ করেছেন। এতে বুঝা যায় যে, সালাত হলো একটি দুর্গ। এমন দুর্গ যা প্রত্যেক উত্তম আমলের রক্ষণাবেক্ষণ করে। একজন ব্যক্তির সালাত ঠিক থাকলে তার বাকি সৎকর্মও ঠিক থাকবে। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
أَخْبَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ الصَّلَاةَ عَمُودُ الدِّينِ.
“সালাত হল দ্বীনের স্তম্ভ”। ১২
টিকাঃ
১০ সূরা আল মু'মিনুন: ১-১১।
১১ সূরা আল মাআরিজ: ১৯-৩৫।
১২ জা'মে সাগির: ৫১৮৬।
📄 কোন সালাত গ্রহণযোগ্য
الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ.
"যারা তাদের সালাতে আন্তরিকভাবে বিনীত ও বিনম্র"।১৪
এই আয়াতে সালাতে একাগ্রতার (খুশুর) কথা বলা হয়েছে। নিঃসন্দেহে শয়তান হল মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। সে সর্বক্ষণ সালাতে মুমিনদের মনোযোগ ও একাগ্রতা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। যখন মুমিন সালাতে দাঁড়ায় সাথে সাথে সে দেখতে পায় তার মনে বিভিন্ন চিন্তা, বিপদ, আশঙ্কা, কাজ, পরিবার প্রভৃতি বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে। এতে মাঝে মাঝে সালাতরত ব্যক্তি এমন চিন্তায় ডুবে যায় যে, সে এখন কোথায় আছে কি করছে কিছুই তার মনে থাকে না। সে অবচেতন মনে কিরাত পাঠ করে, রুকু সিজদাসহ সালাতের বিভিন্ন আহকাম পালন করতে থাকে। হঠাৎ তার মন আবারো সচল হলে সে বিস্মিত হয়ে ভাবে-সে কি তিন রাকাত পড়েছে না চার রাকাত। এভাবেই শয়তান সালাতকে নষ্ট করে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা বলেছিলেন-যে সালাতের খুব অল্প অংশ, সম্ভবত এক-দশমাংশ অথবা এক-অষ্টমাংশ আল্লাহ গ্রহণ করেন, বাকি অংশ শয়তানের প্ররোচনায় নষ্ট হয়ে যায়।
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ দেখেন এক ব্যক্তি সালাতরত অবস্থায় তার দাঁড়ি নিয়ে খেলছে। এতে তিনি মন্তব্য করেন, “যদি তার মনে খুশু (একাগ্রতা) থাকত, তাহলে তার দেহের অন্যান্য অঙ্গও সালাতের প্রতি মনোযোগী হত।"
সূরা মাউনে প্রাণহীন সালাত সম্পর্কে বলা হয়েছে-
فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ.
“সুতরাং বড় দুর্ভোগ আছে সেই নামাযীদের, যারা তাদের নামাযে গাফলতি করে”। ১৫
একজন ইবাদতকারী সালাত সম্পর্কে গাফেল হয় যখন সে সালাত পড়তে বিলম্ব করে একদম শেষ ওয়াক্তে সালাত আদায় করে এবং যখন সে সালাতে মনোযোগ এবং একাগ্রতা ধরে রাখতে পারে না।
عن أبي هريرة، قال: دخل رجل المسجد فصلى، والنبي صلى الله عليه وسلم في المسجد، ثم جاء إلى النبي صلى الله عليه وسلم فسلم، فرد عليه السلام، وقال: " ارجع فصل فإنك لم تصل "، فرجع ففعل ذلك ثلاث مرات، قال: فقال: والذي بعثك بالحق، ما أحسن غير هذا، فعلمني، قال: " إذا قمت إلى الصلاة فكبر، ثم اقرأ ما تيسر معك من القرآن، ثم اركع حتى تطمئن راكعا، ثم ارفع حتى تعتدل قائما، ثم اسجد حتى تطمئن ساجدا، ثم ارفع حتى تطمئن جالسا، ثم افعل ذلك في صلاتك كلها ".
“আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করার পর এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে সালাত আদায় করল। অত:পর এসে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দিল। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের জওয়াব দিয়ে বললেন, ফিরে যাও। আবার সালাত পড়। কেননা তুমি তো সালাত আদায় করোনি। সে পুনরায় সালাত পড়ার পর এসে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দিল। তিনি বললেন, ফিরে যাও, আবার সালাত আদায় কর কেননা তুমি তো সালাত পড়নি। (তিনবার এরূপ হল)। সে বলল, যে সত্তা আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ, আমি এরচে' উত্তম তরিকায় সালাত আদায় করতে জানি না। প্রিয় রাসুল, আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন, যখন তুমি সালাতে দাঁড়াবে তখন তাকবীর বলবে, অত:পর কুরআনের যতটুকু তিলাওয়াত করা তোমার জন্য সম্ভব ততটুকু তিলাওয়াত কর। তারপর ধীরস্থিরভাবে রুকু কর। অত:পর সোজা স্থির হয়ে দাঁড়াও। অত:পর ধীরস্থিরভাবে সিজদা কর, এরপর ধীরস্থির হয়ে বস, তারপর ধীরস্থিরভাবে সিজদা কর, তোমার পুরো সালাত এভাবেই আদায় কর। "১৬
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ সময় নিয়ে সালাত পড়তেন। সালাতে প্রতিটি পরিবর্তন খুব ধীরস্থির এবং যথাযথভাবে করতেন, সালাতে কোনো তাড়াহুড়ো করতেন না।
رسول الله صلى الله عليه وسلم: أفضل الصلاة طول القنوت.
“উত্তম সালাত হলো, সালাতে কেরাত লম্বা করে পড়া।”১৭
টিকাঃ
১৩ সুনানু তিরমিযি: ৪১৩; সুনানু ইবনু মাজাহ: ৮৬৪ [সনদ সহিহ]।
১৪ সুরা মুমিনুন: ২-৩।
১৫ সূরা মাউন: ৪-৫।
১৬ সহিহ বুখারি: ৭৫৭; সহিহ মুসলিম: ৩৯৭; মুসনাদু আহমাদ: ৯৬৩৫।
১৭ সহিহ মুসলিম: ৭৫৬; মুসনাদু আহমাদ ইবনু হাম্বল: ১৪৩৬৮।