📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সালাত আদায় করা আমাদের একান্ত প্রয়োজন কেন?

📄 সালাত আদায় করা আমাদের একান্ত প্রয়োজন কেন?


একটি দীর্ঘ ও কর্মব্যস্ত সময় কাটানো ক্লান্ত ব্যক্তির জন্য জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া কতই না কঠিন। নরম ও আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে থেকে মুয়াজ্জিনের 'সালাতের দিকে এসো, কল্যাণের দিকে এসো' ডাকে সাড়া দেয়া কতইনা কঠিন।

বিখ্যাত দার্শনিক ইবনে সিনা একবার তাঁর স্মৃতিচারণ করলেন এভাবে- একদা ভীষণ ঠান্ডা রাতে তিনি ও তাঁর গোলাম খোরাসানের একটি সরাইখানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। রাতে তিনি খুব পিপাসা অনুভব করলেন। গোলামকে ডাক দিয়ে পানি আনতে বলেন। এই আরামদায়ক বিছানা থেকে উঠে পানি আনতে গোলামের ইচ্ছে হল না, তাই সে ইবনে সিনার ডাক না শোনার ভান করল। বেশ কয়েকবার ডাকাডাকি করলে সে বিছানা থেকে উঠে অবশেষে মুনিবের জন্য পানি নিয়ে আসে।

কিছুক্ষণ পর আযানের মনোরম সুরেলা ধ্বনি বাতাসে গুঞ্জরিত হল। মোয়াজ্জিন আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান জানাচ্ছেন। ইবনে সিনা মোয়াজ্জিনের কথা ভাবলেন। তিনি ভাবলেন, আমার গোলাম আবদুল্লাহ, সে সব সময় আমাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। আমাকে খুশি করার জন্য সুযোগ তালাশ করে, কিন্তু আজ রাতে সে আমার প্রয়োজনের চাইতে নিজ আরামের দিকে বেশি মনোযোগী হয়েছে。

অন্যদিকে এই পারস্য গোলাম। সে আরামদায়ক উষ্ণ বিছানা ছেড়ে বের হয়েছে। ঠান্ডা পানি দিয়ে অজু করেছে। মসজিদের মিনারে দাঁড়িয়ে তাঁর মালিক আল্লাহর গুণকীর্তন করছে। তাঁর ইবাদতের দিকে ডাকছে。

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতিত কোন মাবুদ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল।”

রাতের ঘটনা ইবনে সিনা লিপিবদ্ধ করেন, “আজ রাতে আমি সত্য ভালোবাসা চিনতে পেরেছি, ওই ভালোবাসা যা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য থেকে তৈরি হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি হল সম্পূর্ণ ও নিঃশর্ত আনুগত্য।”

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সালাত : অন্তর-আত্মার কান্না

📄 সালাত : অন্তর-আত্মার কান্না


ব্যক্তির অহংকার ও গর্ব তাকে যুলুম ও অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে। কখনো কখনো অহংকার ব্যক্তিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়-ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ (নাউজুবিল্লাহ) মনে করে বসে। একসময় ফিরাউন ছিল মিশরের শাসক। সে ছিল এমন একজন ব্যক্তি, যে ঘোষণা করেছিল-
فَقَالَ أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى.
“এবং বলল, আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক।”২
সে তার দৃষ্টিতে তার তথাকথিত মহত্ত্ব ও গর্বে অভিভূত হয়ে পড়ে। ফিরাউন বনি ইসরাইল জাতিকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করে এবং তাদের সুন্দর ও স্বাধীন জীবন দুর্দশাগ্রস্ত ও দুর্বিষহ করে তোলে।

কিন্তু একজন ব্যক্তির অহংবোধ তাকে যতটা শক্তিশালী এবং মহান বলে তার নিকট উপস্থাপন করে সত্যিই কি সে ততটা মহৎ ও শক্তিশালী? পবিত্র কুর'আনুল কারিম আমাদেরকে মানুষের প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে জানাচ্ছে-
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِن بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِن بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةٌ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْقَدِيرُ.
“আল্লাহ সেই সত্তা, যিনি তোমাদের সৃষ্টি (শুরু) করেছেন দুর্বল অবস্থা থেকে, দুর্বলতার পর তিনি দান করেন শক্তি, আবার শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।"৩

সূচনায় মানুষ দুর্বল ও অক্ষম। সমাপ্তিতেও মানুষ দুর্বল ও অক্ষম। এটাই হল মানুষের পরিচয়। সে জন্মের সময় এত দুর্বল ও অসহায় থাকে যে, তার পুরো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নির্ভর করে তার বাবা-মা ও পরিবারের উপর। যদি জন্মের প্রথম বছরগুলোতে সে পরিত্যাজ্য হয় তাহলে সে নিজ থেকে বেঁচে থাকতে পারবে না। শুধু বাল্যকালে নয়, শৈশব-কৈশোরও তার একটি যত্নশীল, অমায়িক এবং ভালোবাসার হাতের প্রয়োজন।

একসময় শিশু যৌবনে উপনিত হয়। আত্মনির্ভরশীল হয়। নিজ জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিতে শিখে। তার শক্ত শরিরের দিকে তাকায়। সে গর্বভরে তাকায় তার সুন্দর দেহ কাঠামো এবং প্রতিভার দিকে। সে দুর্বল অক্ষম মানুষদের তুচ্ছজ্ঞান করে। এমনকি পিতা-মাতা ও অভিভাবক— যারা সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে তাকে লালন-পালন করেছে তাদেরকেও অবজ্ঞা করতে শুরু করে। তার বিবেচনা শক্তি লোপ পায়। তার মধ্যে নিষ্ঠুরতা চলে আসে। অন্যের উপর সে আধিপত্য কায়েম করে। সে মনে করে, সে এখন মনিব (নাউযুবিল্লাহ) তাই যা ইচ্ছে তা করতে পারবে। কিন্তু এই যৌবন, এই সুন্দর দেহকাঠামো ও প্রাণশক্তি কি চিরদিন থাকবে? মাত্র কয়েক দশকেই সে তার কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলবে। তার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি হবে, ধীরে ধীরে তার মাথায় সাদা চুল স্থান করে নিবে, তার যৌবন বার্ধক্যে রূপ নিবে। যৌবনকাল থেকে বার্ধক্যে উপনিত হওয়ার প্রক্রিয়া যদিও খুব ধীরে ধীরে হয় এবং সময় লাগে তবুও বেঁচে থাকলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে বৃদ্ধ হতে হবে।

সময়ের কাঁটা টিক টিক করে নির্দয়ভাবে অবিরত চলতে থাকে, একসময় প্রত্যেক যুবককে বার্ধক্যে নিয়ে যায়। শক্তিশালী যুবক একসময় দুর্বল ও অক্ষম হয়ে যায়। জন্মকালীন সময়ে সে যেমন ছিল তেমনই হয়ে পড়ে। এখন তার কাছে কোনো অভিভাবক বা পিতা মাতা নেই, যারা তাকে সাহায্য করবে। মাঝে মাঝে এমনও হতে পারে—তাঁর পরিবার তাঁকে পরিত্যাগ করবে। এক ঘরের কোণে তাঁর জীবন ও ভবিষ্যৎ আটকে থাকবে।

“প্রারম্ভেও মানুষ দুর্বল ও অক্ষম। সমাপ্তিতেও মানুষ দুর্বল ও অক্ষম।” কথা খুব স্পষ্ট; সত্যিকারের প্রভু হলেন আল্লাহ। তিনিই একমাত্র পরাক্রমশালী, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ মহান।
একমাত্র তিনিই ক্লান্ত হন না, তাঁর কোনো আরামের প্রয়োজন হয় না, তিনি কারোর উপর নির্ভরশীল নন।

“আল্লাহু আকবার” আল্লাহ সবচেয়ে মহান।

যখন এই বার্তা মানুষের মনে স্পষ্টভাবে বুঝে আসে তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, যিনি তাঁকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর নিকট বিনম্রতা প্রদর্শন করতে হবে। নম্রতা ও সম্মান দেখানোর এরচে' ভালো কী পদ্ধতি থাকতে পারে যে—সে তার প্রভুর সামনে গোলামের মত দাঁড়াবে, তাঁর নিকট মাথা নত করবে এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে; হাত উঠিয়ে তাঁর প্রশংসা করবে।

সালাত বান্দার উপর চাপিয়ে দেয়া কোনো বোঝা নয় বরং এটা হল প্রত্যেক অন্তর-আত্মার ক্রন্দন। যে হৃদয় আল্লাহকে চিনেছে সে হৃদয়ের কান্না। এটা হল আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের জন্য তাঁর নিকট বান্দার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কেউ আমাদের সাহায্য করলে আমরা হাসি মুখে সাহায্যকারীকে ধন্যবাদ জানাই। তাহলে মহান আল্লাহ, যিনি আমাদের প্রতিটি চাহিদা, আশা-আকাঙ্খা পূরণ করেন, তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব না? তোমাদের চারপাশে আল্লাহর নিখুঁত ও নির্ভুল সৃষ্টি, সৃষ্টির সৌন্দর্য ও নেয়ামতের দিকে তাকাও। সিজদায় লুটিয়ে পড়ে মহান প্রতিপালকের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।

টিকাঃ
২. সূরা নাযিয়াত: ২৪।
৩. সূরা রূম: ৫৪।

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সালাত : আল্লাহর সাথে বান্দার যোগাযোগের মাধ্যম

📄 সালাত : আল্লাহর সাথে বান্দার যোগাযোগের মাধ্যম


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভের পর আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক প্রেরিত তাঁর নিকট প্রথম আদেশসমূহের অন্যতম ছিল সালাত। ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর কাছে এলেন এবং তাদের সামনে থাকা একটি পাথরে আঘাত করলেন, তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে একটি ঝর্ণা বের হল। তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁকে কিভাবে অজু করতে হয় তা করে দেখান। পরে তাঁকে সালাত আদায় করে দেখান। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন দুইবার দু-রাকাআত করে সালাত পড়া আরম্ভ করেন। একবার দিনে আরেকবার সন্ধ্যায়। তিনি খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে সালাত পড়তে শেখান। সে সময় থেকে ইসরা ও মিরাজের ঘটনা পর্যন্ত প্রতিদিন তিনি এভাবে সালাত আদায় করতেন। হিজরতের খানিক পূর্বে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জেরুজালেমে নিয়ে যাওয়া হয় (ইসরা) এবং অত:পর জেরুজালেম থেকে আকাশে এবং জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হয় (মিরাজ)। এই সফরে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল্লা তাঁকে ৫ ওয়াক্ত সালাত পড়ার আদেশ দান করেন। এটা ছিল বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহর একটি তোহফা। এই গিফটের সাহায্যে একজন বান্দা প্রতিদিন রুহানিয়াত জগতে আল্লাহর মিরাজ লাভ করে অর্থাৎ আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করতে পারে। নামায হল মুমিনদের জন্য মিরাজস্বরূপ। সালাত বান্দাকে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে।

প্রতিবার সালাত পড়ার সময় বান্দাকে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে হয়। বার বার একই সূরা পাঠ করা সত্ত্বেও তাতে বান্দা কোনো প্রকার বিরক্তবোধ বা একঘেয়ামিপনা অনুভব করে না। কেননা এটা হল বান্দা ও তাঁর প্রভু আল্লাহর কথোপকথন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমনটাই বর্ণিত হয়েছে।

আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত এই বাক্যটি হাদিস নয়। এটা কোনো হাদিসের কিতাবেও পাওয়া যায় না। তবে ইসলামের অন্যান্য গ্রহণযোগ্য সুত্র মোতাবেক বাক্যটি সঠিক প্রমাণিত হয়। তাই এ বাক্য নামাযের জন্য উৎসাহ যোগাতে বলা যেতে পারে। কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস বলে প্রচার করা যাবে না। (মালফুজাতে ফকিহুল উম্মাহ, পৃষ্ঠা: ১৭)- অনুবাদক。

আবি হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু, আন রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ক্বালা: ইয়াকুলুল্লাহু তায়ালা: "কাসামতুস সালাতা বাইনি ওয়াবাইনা আবদি, ওলি আবদি মা সাআল, নিসফুহু লি ওয়া নিসফুহু লী, ফাইজা ক্বালা আল আবদু: {আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন} [আল ফাতিহা: ২], ক্বালা আর রাব্বু: হামেদিনী আবদি, ফাইজা ক্বালা: {আর রাহমানির রাহীম} [আল ফাতিহা: ১], ক্বালা আর রাব্বু: আছনা আলাইয়া আবদি, ফাইজা ক্বালা: {মালিকি ইয়াওমিদ্দীন}, ক্বালা: মাজ্জাদানি আবদি, ফাইজা ক্বালা: {ইয়্যাকানা'বুদু ওয়াইয়্যাকা নাসতায়ীন} [আল ফাতিহা: ৫], ক্বালা: হাজা লি আবদি, ওলি আবদি মা সাআল, ফাইজা ক্বালা: {ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম} [আল ফাতিহা: ৬], ক্বালা: হাজা লি আবদি ওলি আবদি মা সাআল।

আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- “আমি সালাতকে আমার মাঝে ও আমার বান্দার মাঝে ভাগ করে দিয়েছি। অর্ধেক আমার আর অর্ধেক আমার বান্দার। আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে, যা সে চায়।”

বান্দা যখন বলে-
اَلْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. (অর্থাৎ যাবতীয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য), তখন আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।” বান্দা যখন বলে-
الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ. (অর্থাৎ যিনি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু), তখন আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করেছে।” বান্দা যখন বলে-
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ. (অর্থাৎ বিচার দিনের মালিক), তখন আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমার আজমতের (বড়ত্বের) প্রশংসা করেছে।” বান্দা যখন বলে-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ.
(অর্থাৎ আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি), তখন আল্লাহ বলেন, “এ হচ্ছে আমার ও আমার বান্দার মাঝের কথা। আর আমার বান্দা তাই পায়, যা সে প্রার্থনা করে।” অতঃপর বান্দা যখন বলে-
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ، صِرَاطَ الَّذِينَ أَنعَمتَ عَلَيْهِمْ غَيرِ المَغضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ.
(অর্থাৎ আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন। আর তাদের পথে নয়, যাদের প্রতি আপনার গযব বর্ষিত হয়েছে, তাদের পথও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে), তখন আল্লাহ বলেন, “এসব কিছু আমার বান্দার জন্য। আর আমার বান্দা যা চায়, তাই পাবে।"৫

প্রতিদিন ৫ ওয়াক্তের সালাত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই বিষয়ে আল্লাহ বান্দাকে কোনো মন্তব্য বা অবহেলা করার অধিকার দেননি। এটা প্রত্যেক বান্দার উপর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বান্দা যদি ওয়াক্তের সংখ্যা কমিয়ে ফেলে অর্থাৎ ৫ ওয়াক্তের কম সালাত আদায় করে তাহলে এটা চরম অবাধ্যতা হবে। এছাড়াও এতে সালাতের সুফল কম পাওয়া যাবে।

উদাহরণস্বরূপ, একটি রুমকে তখনই বাসযোগ্য রুম বলা যাবে যখন এতে ৪টি দেয়াল ও একটি ছাঁদ থাকবে, যদি এটা থেকে একটি দেয়াল বা ছাঁদ সরিয়ে নেওয়া হয় তাহলে এটাকে রুম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে প্রতিদিনের ৫ ওয়াক্তের সালাত আদায় করলে ওই পুরো দিনে সালাতের উপকার লাভ করা যাবে, অন্যথায় যাবে না।

টিকাঃ
১. সুরা আলে ইমরান: ৩১।
৫. সহিহ মুসলিম: ৩৯৫; সুনানু তিরমিযি: ২৯৫৩; সুনানু আবু দাউদ: ৮২১; মুয়াত্তায়ে মালেক: ২৭৮; মুসনাদু আহমাদ: ৭৮৩৭।

📘 সালাত মুমিনের প্রাণ > 📄 সালাত : ইসলামের একটি স্তম্ভ

📄 সালাত : ইসলামের একটি স্তম্ভ


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
أَخْبَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ الصَّلَاةَ عَمُودُ الدِّينِ.
"সালাত হল দ্বীনের স্তম্ভ"।
আরো বর্ণিত আছে-
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: بني الإسلام على خمس: شهادة أن لا إله إلا الله، وإقام الصلاة، وإيتاء الزكاة، والحج، وصيام رمضان.
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
'ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। ১. আল্লাহ্ ব্যতিত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। ২. সালাত কায়েম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. হজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫. রামাদানের সিয়াম পালন করা।'৭
হাদিসে সালাতের বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলাম হল একটি দালানের মত, যে দালানের রয়েছে পাঁচটি স্তম্ভ। এখানের মাত্র একটি স্তম্ভ সরিয়ে ফেললে পুরো দালানের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। যদি প্রচণ্ড ঝড় বাতাস প্রবাহ হয় তাহলে এমন দালান ভেঙ্গে পড়বে। একইভাবে যখন একজন ব্যক্তি সালাত পড়ে না বা সালাত পড়া বন্ধ করে দেয়; তাহলে তার ঈমান দুর্বল হয়ে যাবে এবং মৃদু বাতাসেও তার ইমানের ভিত ভেঙ্গে টুকরো-টুকরো হয়ে যেতে পারে।
সালাত ইসলামের এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য স্তম্ভ যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
جابر بن عبد الله، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: بين العبد وبين الكفر ترك الصلاة.
“মুসলিম বান্দা এবং কাফের ও মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হল 'সালাত' পরিত্যাগ করা।"৮
অর্থাৎ মুমিনরা সালাত আদায় করেন, আর কাফির-মুশরিকরা সালাত আদায় করে না।
বাক্যটি কতই না বাস্তব! যদি আপনি পথে চলাচলকারী অসংখ্য মানুষদের মধ্যে কারা মুসলিম আর কারা কাফির তা সনাক্ত করতে চেষ্টা করেন, তাহলে তা আপনার জন্য অনেক কঠিন হবে। মুসলিমদের কপালে ইসলামের কোনো চিহ্ন নেই। কাফিরদের কপালেও কাফির লেখা কোনো সিল মারা নেই। কিন্তু সালাতের সময়ে আপনি সহজেই মুসলিম ও অমুসলিম গ্রুপকে চিনতে পারবেন। সালাতের সময় হলে আপনি দেখবেন, মুসলিম ব্যক্তি তার কাজ, ব্যবসা তথা তার কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে সালাতে শামিল হচ্ছে। অন্যদিকে দেখবেন কাফির ব্যক্তি তার দুনিয়াবি কর্মে ব্যস্ত রয়েছে।
সূরা আল মুদ্দাছছিরে 'বিচার দিনে'র একটি সুন্দর ঘটনার আলোচনা করা হয়েছে, সেদিন মুমিনরা জাহান্নামবাসীকে জিজ্ঞেস করবে-
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ. وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ. وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ. وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّينِ. حَتَّى أَتَانَا الْيَقِينُ.
“কোন জিনিস তোমাদেরকে জাহান্নামে দাখিল করেছে'? তারা বলবে, 'আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা মিসকীনদেরকে খাবার দিতাম না। আর যারা অহেতুক আলাপ-আলোচনায় মগ্ন হত, আমরাও তাদের সঙ্গে মগ্ন হতাম। এবং আমরা কর্মফল দিবসকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতাম। পরিশেষে সেই নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) আমাদের সামনে এসে গেল।”৯

যদিও সত্য পরিত্যাগকারীরা আজ দুনিয়ায় চুপ করে রয়েছে, কিন্তু পরকালে তারা নিজেরাই সত্য বলবে।

টিকাঃ
৬. জা'মে সাগির: ৫১৮৬।
৭. সহিহ বুখারি: ১৯০৯; সুনানু নাসাঈ ৫০০১।
৮. সুনানু তিরমিযি: ২৬১৯; সুনানু আবু দাউদ: ৪৬৭৮; সুনানু ইবনু মাজাহ: ১০৭৮ [সনদ সহিহ]।
৯. সূরা মুদ্দাছছির: ৪২-৪৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00