📄 রাসূল (ﷺ) এর ওফাত ও দ্বীনের পূর্ণতা
আর মদীনাতে যখন রাসূল (সা.) স্থায়ী অবস্থান গ্রহণ করেন, তখন তাঁকে ইসলামী শরীআহ্হ্র অবশিষ্ট বিধান যেমন: যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, জিহাদ, আযান, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ এবং ইসলামী শরীআহ্ অন্যান্য বিধান পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়'।
১. অবশিষ্ট আহকামের অবতরণ: এখানে গ্রন্থকার বলেছেন যে, নাবী (সা.) যখন মদীনাতে স্থায়ী অবস্থান গ্রহণ করেন, তখন তাঁকে ইসলামের অন্যান্য বিধি-বিধান পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতঃপূর্বে মক্কায় তিনি ১০ বছর যাবত মানুষকে কেবল তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছিলেন। অতঃপর মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে তাঁর উপর ৫ ওয়াক্ত সলাত ফরয করা হয়। এরপর মাক্কা ছেড়ে মাদীনায় হিজরাত করা পর্যন্ত তাঁর উপর যাকাত, সিয়াম, হাজ্জ এবং অন্য কোন ইসলামের নিদর্শনসমূহ ফরয করা হয়নি। শায়খ এর কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, মৌলিক ও বিস্তারিত বিধি-বিধান সহ যাকাত মদীনাতেই ফরয করা হয়েছিল।
তবে কিছু সংখ্যক উলামায়ে কিরাম এ অভিমত পোষণ করেন যে, যাকাতের মূল নির্দেশনা মক্কায় অবস্থানকালীন সময়েই এসেছিল, কিন্তু সেখানে যাকাতের নিসাব এবং এর কী কী ওয়াজিব রয়েছে তা নির্ধারণ করা হয় নি। বরং মাদীনাতে এর নিসাব ও এর মধ্যে ওয়াজিব বিষয়সমূহকে নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা তাদের এই বক্তব্যের স্বপক্ষে দালীল হিসেবে বলেছেন, যে সব আয়াতের মাধ্যমে যাকাতের বিধান ফরয করা হয়েছে, সেই আয়াতগুলো মাক্কী সূরার মাঝে এসেছে। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরা আনআমে বলেছেন:
وَاتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ
"আর ফসল তোলার দিন নির্ধারিত ও অনির্ধারিত দানের মাধ্যমে) হক আদায় কর।"
তিনি আরো বলেছেন:
وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ لِلسَّابِلِ وَالْمَحْرُومِ
“যাদের ধন-সম্পদে একটা সুবিদিত অধিকার আছে, প্রার্থী এবং বঞ্চিতদের।”
যাই হোক, যাকাত ও তার নিসাব, এর ওয়াজিবসমূহ ও এর হকদার সম্পর্কিত নির্দেশনা মদীনাতেই এসেছিল। এমনিভাবে আযান ও জুমুআর সালাতের বিধানও মদীনাতে দেয়া হয়েছিল। বাহ্যত যা বুঝা যায়, জামাআতে সালাত আদায়ের নির্দেশও মদীনাতে এসেছিল। কেননা আযানের মাধ্যমে যে জামাআতে সালাত আদায়ের প্রতি আহ্বান করা হয়, তা ২য় হিজরীতে মদীনাতেই ফরয করা হয়েছিল। যাকাত এবং সিয়ামও ২য় হিজরীতে ফরয করা হয়েছিল। উলামাদের বক্তব্য অনুসারে সঠিক মত হচ্ছে হাজ্জকে ৯ম হিজরীর আগে ফরয করা হয়নি। আর হাজ্জকে ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর ইসলামের ভূমি হিসেবে পরিগণিত হওয়ার পরেই ফরয করা হয়। এমনিভাবে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধসহ অন্য সকল পরিষ্কার নিদর্শনাবলী ফরয করা হয়েছে মদীনাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে রাসূল (ﷺ) এর অবস্থান স্থায়ী হওয়ার।
তথায় তিনি দশ বছর যাবত ইসলামের এসব বিধান প্রতিষ্ঠিত করেন এবং অতঃপর মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহর রহমত ও শান্তি তাঁর উপর।
১. রাসূল (ﷺ) এর ওফাত: রাসূল (ﷺ) হিজরাতের পর দশ বছর যাবত মদীনাতে ইসলামের এসব বিধি-বিধান বাস্তবায়িত করেছেন। অতঃপর আল্লাহ্ যখন তাঁর মাধ্যমে দ্বীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিলেন এবং মু'মিনদের উপর স্বীয় নিয়ামত সম্পন্ন করে দিলেন, তখন আল্লাহ্ তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে এবং সর্ব্বোচ্চ সাহচর্যে নাবী, সত্যবাদী, শহীদ এবং সৎকর্মশীলদের সাথে তাঁকে মিলিয়ে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। তাই সফর মাস শেষে রবীউল আউয়াল মাসের প্রথম থেকেই রাসূল (ﷺ) এর অসুখ দেখা দিল। সেদিন তিনি মাথায় পট্টি বেঁধে লোকজনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এলেন এবং মসজিদের মিম্বারে উঠে প্রথমেই ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের জন্য আল্লাহ্র দরবারে মাগফিরাত কামনা করেন। অতঃপর তিনি বলেন:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ خَطَبَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ " إِنَّ اللهَ خَيْرَ عَبْدًا بَيْنَ الدُّنْيَا وَبَيْنَ مَا عِنْدَهُ ، فَاخْتَارَ مَا عِنْدَ اللَّهِ ". فَبَكَى أَبُو بَكْرٍ - رضى الله عنه - فَقُلْتُ فِي نَفْسِي مَا يُبْكِي هَذَا الشَّيْخَ إِنْ يَكُنِ اللَّهُ خَيْرَ عَبْدًا بَيْنَ الدُّنْيَا وَبَيْنَ مَا عِنْدَهُ فَاخْتَارَ مَا عِنْدَ اللهِ، فَكَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم هُوَ الْعَبْدَ، وَكَانَ أَبُو بَكْرٍ أَعْلَمَنَا. قَالَ " يَا أَبَا بَكْرٍ لَا تَبْكِ، إِنَّ أَمَنَّ النَّاسِ عَلَى فِي صُحْبَتِهِ وَمَالِهِ أَبُو بَكْرٍ، وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيلاً مِنْ أُمَّتِي لَاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ، وَلَكِنْ أُخُوَّةُ الإِسْلَامِ وَمَوَدَّتُهُ، لَا يَبْقَيَنَّ فِي الْمَسْجِدِ باب إِلَّا سُدَّ إِلَّا بَاب أَبِي بَكْرٍ
আল্লাহ্ তাআলা তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া ও আল্লাহ্র নিকট যা আছে এই দু'য়ের মধ্যে একটি গ্রহণের ইখতিয়ার দিলেন। তিনি আল্লাহ্র নিকট যা আছে তা গ্রহণ করলেন। তখন আবূ বকর (রাঃ) কাঁদতে লাগলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, এই বৃদ্ধকে কোন বিষয়টি কাঁদাচ্ছে? আল্লাহ্ তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া ও আল্লাহর নিকট যা রয়েছে-এই দু'য়ের একটা গ্রহণ করার ইখতিয়ার দিলে তিনি আল্লাহ্র নিকট যা রয়েছে তা গ্রহণ করেছেন (এতে কাঁদার কি আছে?)।
মূলত: আল্লাহ্র রাসূলই (ﷺ) ছিলেন সেই বান্দা। আর আবূ বকর (রাঃ) ছিলেন আমাদের মাঝে সর্বাধিক জ্ঞানী। নাবী (ﷺ) বললেন: হে আবূ বক্র, তুমি কাঁদবে না। নিজের সাহচর্য ও সম্পদ দিয়ে আমাকে যিনি সবচেয়ে অধিক ইহসান করেছেন তিনি আবূ বক্র। আমার কোন উম্মাতকে যদি আমি খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) রূপে গ্রহণ করতাম, তবে তিনি হতেন আবু বক্কর। কিন্তু তাঁর সাথে রয়েছে ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য। আবূ বক্রের দরজা ব্যতীত মসজিদের কোন দরজাই রাখা হবে না, সবই বন্ধ করা হবে।
অতঃপর রাসূল (ﷺ) আবূ বকর (رضي) কে নির্দেশ দিলেন (ইমাম হয়ে) উপস্থিত লোকজনকে নিয়ে সলাত আদায় করতে।
عنْ ابْنِ شِهَابٍ قَالَ حَدَّثَنِي أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ الْمُسْلِمِينَ بَيْنَا هُمْ فِي صَلَاةِ الْفَجْرِ مِنْ يَوْمِ الاثْنَيْنِ وَأَبُو بَكْرٍ يُصَلِّي لَهُمْ لَمْ يَفْجَأَهُمْ إِلَّا رَسُوْلُ الله ﷺ قَدْ كَشَفَ سِتْرَ حُجْرَةِ عَائِشَةَ فَنَظَرَ إِلَيْهِمْ وَهُمْ فِي صُفُوفِ الصَّلَاةِ ثُمَّ تَبَسَّمَ يَضْحَكُ فَنَكَصَ أَبُو بَكْرٍ عَلَى عَقِبَيْهِ لِيَصِلَ الصَّفَّ وَظَنَّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُرِيدُ أَنْ يَخْرُجَ إِلَى الصَّلَاةِ فَقَالَ أَنَسٌ وَهَمَّ الْمُسْلِمُونَ أَنْ يَفْتَتِنُوا فِي صَلَاتِهِمْ فَرَحًا بِرَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَأَشَارَ إِلَيْهِمْ بِيَدِهِ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم أَنْ أَتِمُوْا صَلَاتَكُمْ ثُمَّ دَখَلَ الْحُجْرَةَ وَأَرْخَى السِّتْرَ
আনাস ইবনু মালিক (رضي) থেকে বর্ণিত: সোমবারে সাহাবীগণ ফজরের সলাতে ছিলেন। আর আবূ বকর (رضي) তাদের সলাতের ইমামতি করছিলেন। হঠাৎ রসূলুল্লাহ (ﷺ) আয়িশাহ (رضي) এর ঘরের পর্দা উঠিয়ে তাদের দিকে দেখলেন। সাহাবীগণ কাতারবন্দী অবস্থায় সলাতে ছিলেন। তখন নাবী (ﷺ) মুচকি হাসি দিলেন। আবূ বাকর (رضي) মুক্তাদীর সারিতে পিছিয়ে আসতে মনস্থ করলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে সলাত আদায়ের জন্য বের হওয়ার ইচ্ছা করছেন। আনাস (رضي) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর (আগমনের) আনন্দে সাহাবীগণের সলাত ভঙ্গের উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু তিনি (ﷺ) হাতের ইশারায় তাদের সলাত পূর্ণ করতে বললেন। তারপর তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন ও পর্দা টেনে দিলেন।
এরপর মহান আল্লাহ্ তাকে নিজ সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য ১১ হিজরী সালের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ মতান্তরে ১৩ তারিখ সোমবারকে বেছে নিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তাঁর পাশে রাখা একটি পানির পাত্রে হাত ভিজিয়ে বার বার নিজের চেহারা মুছে মুছে বলতে লাগলেন:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ
'আল্লাহ্ ভিন্ন সত্য কোন মা'বুদ নেই, মৃত্যু-যন্ত্রণা সত্যিই কঠিন'।
তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন:
اللَّهُمَّ فِي الرَّفِيقِ الْأَعْلَى
'হে আল্লাহ্! সর্বোচ্চ সাহচর্যে (মিলিত হতে চাই)'।
সেদিনই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সাহাবায়ি কিরাম অস্থির হয়ে পড়েন ও সত্যিই এমনিভাবে অস্থির হওয়া তাদের অধিকার ছিলো। এমতাবস্থায় আবূ বকর এসে মিম্বারে উঠে আল্লাহ্ হাম্দ ও স্নানা' বর্ণনা করলেন। এরপর তিনি বললেন:
فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ وَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ حَيٌّ لَا يَمُوْتُ
'অতঃপর আপনাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদ (স) এর ইবাদাত করতেন, জেনে রাখুন! তিনি তো ইনতিকাল করেছেন। আর যারা আপনাদের মধ্যে আল্লাহ্ ইবাদাত করতেন, (জেনে রাখুন) আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না'।
অতঃপর তিনি কুরআন মাজীদের এ আয়াত তিলাওয়াত করেন:
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنَ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَابِنُ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ
“মুহাম্মাদ হচ্ছে একজন রসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে আরও অনেক রসূল গত হয়েছে; কাজেই যদি সে মারা যায় কিংবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়াবে?"
তিনি আরো তিলাওয়াত করেন:
إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ
‘তুমিও মরবে আর তারাও মরবে।’
অতঃপর আবূ বকর (رضিঃ) এর কথা শুনে লোকেরা প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। এতক্ষণে তারা বুঝতে পারলেন যে, সত্যিকার অর্থেই নবী (ﷺ) ইন্তেকাল করেছেন। কাজেই রাসূল (ﷺ) কে তাঁর সম্মানার্থে তাঁর পরনের জামার উপরেই গোসল দেওয়া হলো। তারপর তিনটি সুতি সাদা চাদরে কাফন পরানো হলো, তাতে জামা বা পাগড়ী কিছু ছিল না। অতঃপর কোন ইমাম ছাড়াই সবাই একা একা রাসূল (ﷺ) এর জানাযার সালাত আদায় করলেন। আর খলীফা মনোনীত করে বাইয়াত সম্পন্ন করার পর বুধবার রাতে রাসূল (ﷺ) এর দাফন কার্য সম্পন্ন হয়। তাঁর প্রতি তাঁর মহান প্রতিপালকের সর্বোৎকৃষ্ট রহমত এবং পরিপূর্ণ শান্তি বর্ষিত হোক।
আর তাঁর দ্বীন রয়ে গেল। এটি তাঁর সেই দ্বীন, এমন কোন কল্যাণকর বিষয় নেই যার নির্দেশনা তিনি তাঁর উম্মাতকে দেননি। আর কোন ক্ষতিকর বিষয়ও নেই যে সম্পর্কে তিনি তাঁর উম্মতকে সতর্ক ও সাবধান করেন নি। আর তাঁর নির্দেশিত কল্যাণকর বিষয়সমূহ হচ্ছে: তাওহীদ ও আল্লাহ্র যাবতীয় পছন্দনীয় বিষয় ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট। আর ক্ষতিকর যা থেকে তিনি (ﷺ) সতর্ক ও সাবধান করেছেন: সেগুলো হলো শিরক এবং আল্লাহ্র যাবতীয় ঘৃণা ও অপছন্দনীয় বিষয়।
আর আল্লাহ্ তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছেন' আর আল্লাহ্ তাঁর আনুগত্যকে ফরয করে দিয়েছেন স্নাকালাইন তথা মানুষ ও জ্বিন দু'টি জাতির সকলের উপর। আর প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণী: “বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রসূল'। "
জিন ও মানুষের রাসূল: ১. 'সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছেন' অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতির প্রতি রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন।
২. এই আয়াতটি এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) হলেন সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল্লাহ্র রাসূল। আর যিনি তাকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন, সেই মহান সত্ত্বা আল্লাহ্ হলেন সমগ্র আসমান ও যমীনের মালিক, যার হাতে রয়েছে জীবন ও মৃত্যু দানের একক ও পরিপূর্ণ ক্ষমতা। মহান আল্লাহ্ যেমন উলুহিয়্যাতে এক ও অদ্বিতীয়, তেমনি রুবুবিয়্যাতেও এক ও অদ্বিতীয়। অতঃপর উল্লিখিত আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহ্ নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন তার এই উম্মী নাবী ও রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণ করি এবং তাঁর যথাযথ অনুসরণ করি। আর তা-ই হচ্ছে জ্ঞান, আমল, সঠিক পথ ও তাওফীক্বের হিদায়াত তথা প্রদর্শিত পথ। তাই তিনি হলেন সাকালাইন তথা সমগ্র মানব ও জ্বিন জাতির প্রতি প্রেরিত রাসূল। মানব ও জ্বিন জাতিকে আরবীতে স্নাকালাইন (স্নাকীল শব্দের দ্বিবচন হলো স্নাকালাইন, যার অর্থ 'ভারী') বলার কারণ হলো, পৃথিবীতে এই দুই জাতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
তাঁর মাধ্যমেই আল্লাহ্ দ্বীনকে পূর্ণ করেন। আর প্রমাণ মহান আল্লাহ্র বাণী:
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামাত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে নিলাম।"
১. দ্বীনের পূর্ণতা লাভ: রাসূল (ﷺ) এর দ্বীন কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। তিনি তাঁর মৃত্যুর পূর্বে উম্মতের জীবনের সর্বক্ষেত্রে যা কিছুর প্রয়োজন রয়েছে, সবকিছু তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে গিয়েছেন। যেমন আবু যার বলেছেন:
ما ترك النبي ﷺ طائرا يقلب جناحيه في السماء إلا ذكر لنا منه علما
'আকাশে একটি পাখির ডানা নাড়ানোর মাঝেও কী নিদর্শন রয়েছে, সেটুকুও রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে বলে গেছেন।'
عَنْ سَلْمَانَ، قَالَ قَالَ لَنَا الْمُشْرِكُونَ إِنِّي أَرَى صَاحِبَكُمْ يُعَلِّمُكُمْ حَتَّى يُعَلِّمَكُمُ الْخِرَاءَةَ . فَقَالَ أَجَلُ إِنَّهُ نَهَانَا أَنْ يَسْتَنْجِيَ أَحَدُنَا بِيَمِينِهِ أَوْ يَسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةَ وَنَهَى عَنِ الرَّوْثِ وَالْعِظَامِ وَقَালَ " لَا يَسْتَنْجِي أَحَدُكُمْ بِدُونِ ثَلَاثَةِ أَحْجَارٍ
সালমান (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, মুশরিকরা একবার আমাকে বলল, আমরা দেখছি তোমাদের সঙ্গী [রাসূল (ﷺ)] তোমাদেরকে সব কাজই শিক্ষা দেয়; এমনকি প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ম-নীতিও তোমাদেরকে শিক্ষা দেয়! (জবাবে) তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি আমাদেরকে নিষেধ করেছেন ডান হাতে শৌচ কাজ করতে, (ইস্তিঞ্জা সময়) কিবলামুখী হয়ে বসতে এবং তিনি আমাদেরকে আরো নিষেধ করেছেন গোবর অথবা হাড় দিয়ে ইস্তিনজা' করতে। তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন তিনটি ঢিলার কম দিয়ে ইস্তিন্ন্জা না করে。
কাজেই নাবী (ﷺ) স্বীয় কথা দ্বারা, কাজ দ্বারা দ্বীন ইসলামের প্রতিটি বিষয়বস্তু সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিবরণ দিয়ে গেছেন, হোক তা নিজে থেকেই ব্যক্ত করার মাধ্যমে কিংবা কোন প্রশ্নের উত্তর প্রদানের মাধ্যমে। আর তিনি যে সব বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করে গেছেন সেগুলোর মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হলো তাওহীদ।
তিনি যে সব কাজের আদেশ দিয়েছেন সে সবের প্রত্যেকটিতে উম্মতের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর যে সব কাজ থেকে তিনি নিষেধ করেছেন, সে সবের প্রত্যেকটিতে উম্মতের ইহকালীন ও পরকালীন অনিষ্ট ও অকল্যাণ নিহিত রয়েছে। কিছু মানুষের অজ্ঞতাপূর্ণ দাবি হলো, ইসলামের আদেশ-নিষেধের মাঝে সংকীর্ণতা ও কাঠিন্য রয়েছে। এ ধরনের দাবির আসল কারণ হলো তাদের বুদ্ধিমত্তার ত্রুটি, ধৈর্যশক্তির স্বল্পতা এবং দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা। বরং এটা তো ইসলামের সাধারণ নীতি যে, মহান আল্লাহ্ আমাদের জন্য দ্বীনের মাঝে এমন কোন বিধান রাখেননি যা পালন করা আমাদের জন্য কঠিন। বরং দ্বীন ইসলামের প্রতিটি বিষয় সকলের জন্য অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাবলীল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
“আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান, যা কষ্টদায়ক তা চান না।”
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنَ حَرَجٍ
“দ্বীনের ভিতর তিনি তোমাদের উপর কোন কঠোরতা চাপিয়ে দেননি।”
তিনি আরো বলেন:
مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنَ حَرَجٍ
“আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না'।
যাবতীয় প্রশংসা কেবল আল্লাহ্রই জন্য, যিনি তাঁর নিয়ামতসমূহকে আমাদের জন্য সুসম্পন্ন করেছেন এবং তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।
টিকাঃ
447 সূরা আল-আনআম ৬: ১৪১
448 সূরা আল-মাআরিজ ৭০: ২৪-২৫
৪৪৯ সাহীহ বুখারী: হা/৪৬৬, মুসলিম হা/২৩৮২; তিরমিযী হা/৩৬৫৯; মিশকাত হা/৫৯৫৭।
৪৫০ সাহীহ বুখারী: হা/৪৪৪৮, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ হা/১৬৫০।
451 সাহীহ বুখারী: হা/৪৪৪৯, আজুরী, আশ-শারীআহ হা/১৮৪৩; তাবারানী কাবীর হা/৭৮; মিশকাত হা/৫৯৫৯।
452 সাহীহ বুখারী: হা/৪৪৩৭, মুসলিম হা/২১৯১; আহমাদ হা/২৪৪৫৪; মিশকাত হা/৫৯৬৪।
453 সাহীহ বুখারী: হা/৪৪৫৪, ইবনু মাজাহ হা/১৬২৭; আহমাদ হা/২৫৮৪১; সহীহ ইবনু হিব্বان হা/৬৬২০।
454 সূরা আলু ইমরান ৩: ১৪৪
৪৫৫ সূরা আয-যুমার ৩৯: ৩০
456 'সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৫৮
457 সূরা আল-মায়েদাহ ৫: ৩
458 মুসনাদ আহমাদ: ২১৩৬১, মুহাক্কিক শুআইব আরনাউত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। বিস্তারিত তাহকীক "তাহকীক ৫" দ্রষ্টব্য।
459 সহীহ মুসলিমঃ হা/৪৯৫ (২৬২), আবূ দাউদ হা/৭; তিরমিযী হা/১৬; নাসাঈ হা/৪১; ইবনু মাজাহ হা/৩১৬; মিশকাত হা/৩৭০।
460 সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৮৫
461 সূরা আল-হাজ্জ ২২: ৭৮
462 সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৬
📄 পুনরুত্থান ও হিসাব-নিকাশ
আর তার মৃত্যুর প্রমাণে মহান আল্লাহর বাণী: “তুমিও মরবে আর তারাও মরবে। অতঃপর কিয়ামাত দিবসে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সম্মুখে বাদানুবাদ করবে।”
মানুষের মৃত্যু হলে পুনরুত্থিত হবেই। আর দালীল মহান আল্লাহর বাণী: ‘মাটি থেকে আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব আর তাথেকে তোমাদেরকে আবার বের করব।’
আর আল্লাহ তাআলার বাণী: “আল্লাহ তোমাদেরকে মাটি থেকে উদগত করেন (এবং ক্রমশঃ বাড়িয়ে তোলেন যেমন বাড়িয়ে তোলেন বৃক্ষ) অতঃপর এই মাটিতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনবেন এবং তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন।”
আর পুনরুত্থানের পর হিসাব গ্রহণ এবং তাদের আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া হবে।
আর দালিল মহান আল্লাহর বাণী: "যাতে তিনি যারা মন্দ কাজ করে তাদেরকে তাদের কাজের প্রতিফল দেন আর যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে দেন শুভ প্রতিফল।"
১. রাসূল (ﷺ) অবশ্যই মরণশীল: এই আয়াত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাসূল (ﷺ) এবং যাদের প্রতি তাঁকে পাঠানো হয়েছে তারা সকলেই মরণশীল। অতঃপর কিয়ামাতের দিন তারা আল্লাহর নিকট বিবাদে লিপ্ত হবে। তখন আল্লাহ তাদের মাঝে সত্য ও সঠিক ফায়সালা করে দিবেন। আর সেদিন তিনি কাফিরদেরকে মু’মিনদের উপর বিজয়ী হওয়ার কোন পথ খোলা রাখবেন না।
২. পুনরুত্থানের স্বরূপ: উপরের বাক্যটিতে শায়েখ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেছেন যে, প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হবে। মৃত্যুর পর মহান আল্লাহ্ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান দেওয়ার জন্য পুনরায় জীবিত করবেন। আর এটাই হলো নাবী-রাসূলদেরকে পাঠানোর ফলাফল, যাতে করে মানুষ এই পুনরুত্থান দিবসের জন্য আমল করে। এটি হলো এমন একটি দিন যে দিনের অবস্থা ও ভয়াবহতার যে বিবরণ আল্লাহ্ দিয়েছেন, তা শুনলে অন্তর আল্লাহ্ দিকে ফিরে যায় এবং এই দিনকে প্রচন্ড ভয় পায়। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
فَكَيْفَ تَتَّقُونَ إِنْ كَفَرْتُمْ يَوْمًا يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شِيْبَا السَّمَاءُ مُنْفَطِرٌ بِهِ كَانَنَ وَعُدُهُ مَفْعُولًا
"অতএব (তোমরা যদি (এই রসূলকে) অস্বীকার কর, তাহলে তোমরা কীভাবে সেদিন আত্মরক্ষা করবে যেদিনটি (তার ভীষণতা ও ভয়াবহতায়) বালককে ক'রে দেবে বুড়ো। যার কারণে আকাশ ফেটে যাবে, আল্লাহর ওয়া'দা পূর্ণ হয়ে যাবে।"
বাক্যটিতে মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি ঈমান পোষণের দিকে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। আর এ বিষয়ে শায়েখ দু'টি আয়াতকে দালীল হিসেবে পেশ করেছেন।
৩. মাটি থেকে মানব সৃষ্টি: অর্থাৎ মাটি থেকে আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি যেমনভাবে আদমকে আমি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি।
৪. মাটিতেই প্রত্যাবর্তন: অর্থাৎ মৃত্যুর পর মাটিতে দাফন করার মাধ্যমে।
৫. মাটি থেকেই পুনরুত্থান: অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন পুনরুত্থানের মাধ্যমে।
৬. এই আয়াতটি নিম্নের আয়াতের সাথে সম্পূর্ণ সমার্থক:
مِنْهَا خَلَقْنَكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أخرى
"মাটি থেকে আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব, আর তোমাদেরকে আবার বের করব।"
এই অর্থে কুরআন মাজীদে আরও অনেক আয়াত রয়েছে।
মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করে আবার তাতেই তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মূলতঃ আল্লাহ কিয়ামাতের দিন মানুষের পুনরুত্থানের বিষয়টি প্রমাণ করেছেন, যাতে করে মানবজাতি পুনরুত্থানের প্রতি ঈমান পোষণ করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি তাদের ঈমান যাতে বৃদ্ধি পায়। আর তারা যেন সেই মহান কিয়ামত দিবসের জন্য কাজ করে। আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে সেই মহান দিবসের জন্য কাজ করার তৌফিক দান করেন এবং সেই দিনে আমাদেরকে সৌভাগ্যের অধিকারী করেন।
১. হিসাব গ্রহণ এবং প্রতিফল প্রদান: অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ দুনিয়াতে যে সব কাজ করেছে, পুনরুত্থানের পর তার প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে এবং সে অনুযায়ী তাকে প্রতিদান দেওয়া হবে। কেউ সৎকর্ম করে থাকলে সে ভাল প্রতিদান লাভ করবে, আর মন্দ কাজ করে থাকলে মন্দ প্রতিদান পাবে。
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَا يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًا يره
“অতএব কেউ অণু পরিমাণও সৎ কাজ করলে সে তা দেখবে, ৮. আর কেউ অণু পরিমাণও অসৎ কাজ করলে সেও তা দেখবে। "
তিনি আরো ইরশাদ করেন:
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيمَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٍ شَيْئًا وَإِنْ كَانَنَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنَ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حسِينَ
“আর কিয়ামাত দিবসে আমি সুবিচারের মানদন্ড স্থাপন করব, অতঃপর কারো প্রতি এতটুকুও অন্যায় করা হবে না। (কর্ম) সরিষার দানা পরিমাণ হলেও তা আমি হাযির করব, হিসাব গ্রহণে আমিই যথেষ্ট।”
অন্য আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
مَنَ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا وَمَا جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
“যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে তার জন্য আছে দশ গুণ পুরস্কার, আর যে ব্যক্তি অসৎকাজ করবে তাকে শুধু কৃতকর্মের তুল্য প্রতিফল দেয়া হবে, তাদের উপর অত্যাচার করা হবে না।”
প্রতিটি নেক কাজের প্রতিদান দশ গুণ থেকে সাতশ গুণ এবং সাতশ গুণ থেকে বাড়িয়ে অনেক গুণ করে দেওয়াটা বান্দার প্রতি আল্লাহ্র বিশেষ করুণা, অনুগ্রহ ও দয়া। মানুষকে নেক কাজ করার তাউফিক দান করা যেমন আল্লাহ্ দয়া ও অনুগ্রহ, তেমনি নেক কাজের জন্য সেই কাজের চেয়ে অনেক গুণ বেশি প্রতিদান দেওয়াও বান্দার প্রতি আল্লাহ্র এক বিশেষ অনুগ্রহ। পক্ষান্তরে বান্দাকে তার মন্দ কাজের প্রতিফল দেওয়া হবে সেই খারাপ কাজের সমপরিমাণ, বেশি দেওয়া হবে না।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَمَا جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
“আর যে ব্যক্তি অসৎকাজ করবে তাকে শুধু কৃতকর্মের তুল্য প্রতিফল দেয়া হবে, তাদের উপর অত্যাচার করা হবে না।”
এটি হলো বান্দার প্রতি আল্লাহর পরিপূর্ণ দয়া, অনুগ্রহ এবং সদাচরণ। এরপর এ কথার প্রমাণ হিসেবে শায়খ যে আয়াতটি পেশ করেছেন তা হলো:
لِيَجْزِيَ الَّذِينَ أَسَاءُوا بِمَا عَمِلُوا
“যাতে তিনি যারা মন্দ কাজ করে তাদেরকে তাদের কাজের প্রতিফল দেন।”
এখানে একথা বলা হয়নি যে, মন্দ আমলকারীদেরকে সবচেয়ে খারাপ প্রতিফল দেওয়া হবে, যেমনটি বলা হয়েছে সৎ আমলকারীদের সম্পর্কে যে,
وَيَجْرِيَ الَّذِينَ أَحْسَنُوا بِالْحُسْنَى
'আর যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে দেন শুভ প্রতিফল।"
পুনরুত্থানকে যে অস্বীকার করলো, সে কুফর করলো。
আর দালীল আল্লাহ্র বাণী: “কাফিররা ধারণা করে যে, তাদেরকে কক্ষনো আমার জীবিত করে উঠানো হবে না। বল, নিশ্চয়ই (উঠানো) হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই আবার জীবিত করে উঠানো হবে, অতঃপর তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই জানিয়ে দেয়া হবে তোমরা (দুনিয়ায়) কী কাজ করেছ। এ কাজ (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।”
১. পুনরুত্থান অস্বীকারকারীর বিধান: যে ব্যক্তি মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের বিষয়টি অস্বীকার করবে সে কাফির। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَقَالُوا إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ قَالُوا بَلَى وَرَبُّنَا قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ
“তারা বলে, আমাদের দুনিয়ার জীবন ছাড়া আর কোন জীবন নেই, আমাদেরকে আবার (জীবিত করে) উঠানো হবে না। তুমি যদি দেখতে যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তিনি বলবেন, (তোমরা এখন যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ) তা কি সত্য নয়? তারা বলবে, আমাদের রব্বের কসম তা সত্য। তিনি বলবেন, তোমরা কুফরী করেছিলে তার জন্য এখন শাস্তি ভোগ কর।”
তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
وَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِلْمُكَذِّبِينَ الَّذِينَ يُكَذِّبُونَ بِيَوْمِ الدِّينِ وَمَا يُكَذِّبُ بِهِ إِلَّا كُلُّ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ أَيْتُنَا قَالَ أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ ثُمَّ إِنَّهُمُ لَصَالُوا الْجَحِيمِ ثُمَّ يُقَالُ هَذَا الَّذِي كُنتُم بِهِ تُكَذِّبُونَ
"সেদিন দুর্ভোগ হবে অস্বীকারকারীদের, যারা কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে। কেবল সীমালঙ্ঘনকারী, পাপাচারী ছাড়া কেউই তা অস্বীকার করে না। তার সামনে যখন আমার আয়াত পড়ে শোনানো হয়, তখন সে বলে, 'এ তো প্রাচীন কালের লোকেদের কাহিনী'। কক্ষনো না, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে জং ধরিয়ে দিয়েছে। কক্ষনো না, তারা সেদিন তাদের প্রতিপালক থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে। অতঃপর তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর বলা হবে 'এটাই তা যা তোমরা অস্বীকার করতে।"
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
بَلْ كَذَّبُوا بِالسَّاعَةِ وَاعْتَدْنَا لِمَن كَذَّبَ بِالسَّاعَةِ سَعِيرًا
"আসলে তারা কিয়ামাতকে অস্বীকার করে, আর যারা কিয়ামাতকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য আমি প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুন।"
মহান আল্লাহ্ আরো বলেন:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِأَيْتِ اللَّهِ وَلِقَابِهِ أُولَئِكَ يَبِسُوا مِن رَّحْمَتِي وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে আর তাঁর সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে, তারা আমার রহমাত থেকে নিরাশ হবে আর তাদের জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি।"
শায়খ এ বিষয়ে দালীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন:
زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلِ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ تُجْزَوْنَ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
"কাফিররা ধারণা করে যে, তাদেরকে কক্ষনো আবার জীবিত করে উঠানো হবে না। বল, নিশ্চয়ই (উঠানো) হবে, আমার প্রতিপালকের শপথা তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই আবার জীবিত করে উঠানো হবে, অতঃপর তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই জানিয়ে দেয়া হবে তোমরা (দুনিয়ায়) কী কাজ করেছ। এ কাজ (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।"
পুনরুত্থান অস্বীকারকারীর রদ: পুনরুত্থানকে যারা অস্বীকার করে, তাদের টনক নড়ার জন্য উপযুক্ত জবাব নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
প্রথমত: পুনরুত্থান এমন একটি বিষয় যা সকল আসমা'নী কিতাব ও শারীআতে উল্লিখিত হয়েছে, নাবী-রাসূলগণ থেকে ধারাবাহিক ও ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং তাদের জাতি ও সম্প্রদায় বিষয়টিকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে। তাহলে তোমরা কি করে এটাকে অস্বীকার করতে পারো? অথচ তোমরা কোন প্রাচীন দার্শনিক, আবিষ্কারক কিংবা চিন্তাবিদ থেকে বর্ণিত এমন সব বর্ণনাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকো যেগুলোর বর্ণনাসূত্র সত্যতা ও বাস্তবতার মাপকাঠিতে এতই নিম্নমানের যে, পুনরুত্থানের বর্ণনার ধারের কাছেও সেগুলো পৌঁছাতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত: মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের বিষয়টি যে সম্ভব, মানবীয় বিবেক-বুদ্ধিও নানাভাবে এ কথার সাক্ষ্য দেয়। যেমন:
ক. কোন বিবেকবান মানুষ অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে সৃষ্টির বিষয়টি অস্বীকার করবে না। আর এটাও অস্বীকার করবে না যে, জগতের প্রতিটি বস্তুই অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব লাভ করেছে। অতএব যে মহান সত্ত্বা আমাদেরকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করলেন এবং শূন্য থেকে সৃষ্টি করলেন, নিঃসন্দেহে তিনি আমাদেরকে পুনরায় সেই প্রথম অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম। যেমন আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَهُوَ الَّذِي يَبْدَوُا الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ
"তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন, অতঃপর তার পুনরাবৃত্তি করবেন আর তা তার জন্য খুবই সহজ।'
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
كَمَا بَدَانَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَعِلِينَ
“যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে আবার সৃষ্টি করব। ওয়া‘দা আমি করেছি, তা আমি পূর্ণ করবই।”
খ. আসমানসমূহ ও যমীনের বিশালতা এবং এগুলোর অপূর্ব নির্মাণশৈলী দেখে কোন বিবেকবান মানুষ সৃষ্টিকর্মের এই মহত্ত্বকে অস্বীকার করতে পারবে না। কাজেই যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, নিশ্চয়ই তিনি মানুষ সৃষ্টি করতে এবং তাদেরকে পুনরায় প্রথম অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পুরোপুরি সক্ষম।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
لَخَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَكْبَرُ مِنْ خَلْقِ النَّاسِ
“অবশ্যই আসমান ও যমীনের সৃষ্টি মানুষ সৃষ্টির চেয়ে বড় (ব্যাপার)।”
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন:
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَمْ يَعْيَا بِخَلْقِهِنَّ بِقَدِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتَىٰ بَلَىٰ إِنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“তারা কি দেখে না যে, আল্লাহ্, যিনি আকাশ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন আর ওগুলোর সৃষ্টিতে তিনি ক্লান্ত হননি, তিনি মৃতদেরকে জীবন দিতে সক্ষম? নিঃসন্দেহে তিনি সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।”
তিনি আরো বলেন:
أَوَ لَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوتِ وَا لَارُ بِقَدِرٍ عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمُ ، بَلَى وَهُوَ الْخَلْقُ الْعَلِيمُ إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
"যিনি আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন তিনি কি সেই লোকদের অনুরূপ (আবার) সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হাঁ, অবশ্যই। তিনি মহা স্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। তাঁর কাজকর্ম কেবল এ রকম যে, যখন তিনি কোন কিছুর ইচ্ছে করেন তখন তাকে হুকুম করেন যে হয়ে যাও, আর অমনি তা হয়ে যায়।"
গ. প্রত্যেক চক্ষুষ্মান ব্যক্তিই দেখতে পাবে যে, যমীন কখনো অনুর্বর হয়ে যায় এবং গাছপালা ও তরুলতা মরে যায়। অতঃপর যখন এগুলোর উপর বৃষ্টি হয়, তখন যমীন আবার উর্বর হয়ে উঠে এবং মৃত সেসব গাছপালা ও তরুলতা নতুন জীবন ফিরে পায়। কাজেই যিনি মৃত ভূমিকে জীবন্ত করে তুলতে পারেন, নিশ্চয়ই তিনি মৃত মানুষদেরকে জীবিত করতে এবং তাদেরকে পুনরুত্থিত করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَمَا أَيْتِهِ أَنَّكَ تَرَى ا لارُ خَاشِعَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتُ وَرَبَتْ إِنَّ الَّذِي أَحْيَاهَا لَهُحْيِ الْمَوْتَى إِنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে হল এই যে, তুমি যমীনকে দেখ শুষ্ক অনুর্বর পড়ে আছে। অতঃপর আমি যখন তার উপর বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন তা সতেজ হয় ও বেড়ে যায়। যিনি এ মৃত যমীনকে জীবিত করেন, তিনি অবশ্যই মৃতদেরকে জীবিত করবেন। তিনি সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।"
তৃতীয়ত: মৃতকে জীবিত করার যেসব ঘটনা মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে জানিয়েছেন, সেসব ঘটনার বাস্তবতা এবং বাহ্যিক অবস্থা এ কথা প্রমাণ করে যে, পুনরুত্থানের বিষয়টি আল্লাহর পক্ষে খুবই সম্ভব। এ সম্পর্কিত ঘটনাবলির মাঝে ৫টি ঘটনা মহান আল্লাহ্ সূরা বাকারাতে উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে একটি ঘটনা হলো:
أَوْ كَانَ نَذِيْرٌ مَّرَّ عَلَىٰ قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَىٰ عُرُوشِهَا ۖ قَالَ أَنَّىٰ يُحْيِ هَٰذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا ۖ فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ ۚ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ ۖ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ ۖ قَالَ بَلْ لَّبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ ۖ فَانْظُرْ إِلَىٰ طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَتَّهْ ۖ وَانْظُرْ إِلَىٰ حِمَارِكَ ۖ وَلِنَجْعَلَنَّكَ آيَةً لِّلنَّاسِ ۖ وَانْظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا ۖ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ
"কিংবা এমন ব্যক্তির ঘটনা সম্পর্কে (তুমি কি চিন্তা করনি) যে এক নগর দিয়ে এমন অবস্থায় যাচ্ছিল যে তা উজাড় অবস্থায় ছিল। সে বলল, 'আল্লাহ এ নগরীকে এর মৃত্যুর পরে কীভাবে জীবিত করবেন?' তখন আল্লাহ তাকে একশ' বছর মৃত রাখলেন। তারপর তাকে জীবিত করে তুললেন ও জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি এ অবস্থায় কতকাল ছিলে?' সে বলল, 'একদিন ছিলাম কিংবা একদিন হতেও কম'। আল্লাহ বললেন, 'বরং তুমি একশ' বছর ছিলে, এক্ষণে তুমি তোমার খাদ্যের ও পানীয়ের দিকে লক্ষ্য কর, এটা পচে যায়নি। আর গাধাটার দিকে তাকিয়ে দেখ, আর এতে উদ্দেশ্য এই যে, আমি তোমাকে মানুষের জন্য উদাহরণ করব। আবার তুমি হাড়গুলোর দিকে লক্ষ্য কর, আমি কীভাবে ওগুলো জোড়া লাগিয়ে দেই, তারপর গোশত দ্বারা ঢেকে দেই। এরপর যখন তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল, তখন সে বলল, 'এখন আমি পূর্ণ বিশ্বাস করছি যে, আল্লাহই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।"
চতুর্থত: হিকমাহর দাবি হচ্ছে, মৃত্যুর পর প্রতিটি মানুষের পুনরুত্থান হোক যাতে করে তাদের প্রত্যেকে দুনিয়ায় যে যা করেছে তার প্রতিফল লাভ করতে পারে। যদি তা না হয় তাহলে তো মানুষ সৃষ্টির বিষয়টি হবে অনর্থক, মূল্যহীন এবং হিকমাহ্ বিহীন। তা না হলে এই জীবনে মানুষ ও পশুর মধ্যে আর কোন পার্থক্য থাকবে না। তাই মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمُ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ فَتَعَلَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
“তোমরা কি ভেবেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে তামাশার বস্তু হিসেবে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না? সুউচ্চ মহান আল্লাহ যিনি প্রকৃত মালিক, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, সম্মানিত আরশের অধিপতি।”
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
إِنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ أَكَادُ أَخْفِيهَا لِتُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَىٰ
“কিয়ামাহ তো অবশ্যম্ভাবী, আমি এটা গোপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেককে নিজ কাজ অনুযায়ী প্রতিদান দেয়া যায়।”
তিনি আরো বলেন:
وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَا يَبْعَثُ اللَّهُ مَن يَمُوتُ بَلَىٰ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ لِيُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي يَخْتَلِفُونَ فِيهِ وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّهُمْ كَانُوا كَاذِبِينَ إِنَّمَا قَوْلُنَا لِشَيْءٍ إِذَا أَرَدْنَاهُ أَنْ نَقُولَ لَهُ كُنُ فَيَكُونُ
“তারা আল্লাহর নামে শক্ত কসম খেয়ে বলে, ‘যার মৃত্যু ঘটে আল্লাহ তাকে পুনরায় জীবিত করবেন না।’ অবশ্যই করবেন, এটা তো একটা প্রতিশ্রুতি যা পূরণ করা তাঁর দায়িত্ব, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না (তাদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে) যারা এ ব্যাপারে মতভেদ করেছিল তাদের কাছে স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য, আর কাফিরগণ যাতে জানতে পারে যে, তারা ছিল মিথ্যেবাদী। কোন বিষয়ে আমি ইচ্ছে করলে বলি, ‘হয়ে যাও’, ফলে তা হয়ে যায়।”
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেছেন:
زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلِ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثْنَ ثُمَّ لَتُنَبَّونَ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
“কাফিররা ধারণা করে যে, তাদেরকে কখনো আবার জীবিত করে উঠানো হবে না। বল, নিশ্চয়ই (উঠানো) হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমাদেরকে অবশ্যই অবশ্যই আবার জীবিত করে উঠানো হবে, অতঃপর তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই জানিয়ে দেয়া হবে তোমরা (দুনিয়ায়) কী কাজ করেছ। এ কাজ (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।”
এত সব সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ সত্ত্বেও যারা পুনরুত্থানের বিষয়টিকে অস্বীকার করে এর উপর অটল থাকে, নিঃসন্দেহে তারা অহংকারী ও জেদী। আর যালিমরা শীঘ্রই জানবে কোন ধরনের গন্তব্যস্থলে তারা ফিরে যাবে।
আর সকল রাসূলকে আল্লাহ্ সুসংবাদ দাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন।
আর দালীল আল্লাহ্ বাণী: 'রসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী যাতে রসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অযুহাতের সুযোগ না থাকে'। "
১. রাসূলগণ সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী: গ্রন্থকার [রহিমাহুল্লাহ] বলেছেন যে, সকল রাসূলকে আল্লাহ্ সুসংবাদ দাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ
"রসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী।”
যারা নাবী-রাসূলের আনুগত্য করে, তাঁরা তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। আর যারা তাঁদের বিরোধিতা করে, তাদেরকে তাঁরা জাহান্নামের ভয় দেখান।
মানবজাতির প্রতি নাবী-রাসূল প্রেরণ করার মাঝে মহান প্রজ্ঞা (হিকমাহ) নিহিত রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ হিকমাহ্ হলো মানবজাতির উপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করা। যাতে করে নাবী-রাসূল পাঠানোর পর আল্লাহ্র উপর মানুষের এ বিষয়ে আর কোন প্রমাণ না থাকে।
যেমন মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ
"যাতে রসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অযুহাতের সুযোগ না থাকে।”
এর মধ্যে আরো একটি মহান হিকমাহ হলো এই, এটা হচ্ছে বান্দার প্রতি আল্লাহ্ নিয়ামতের পূর্ণতা। কেননা সৃষ্টির বিবেক-বুদ্ধি যত বেশিই হোক না কেন, কেবল তা দ্বারা আল্লাহ্র একান্ত নিজের জন্য ওয়াজিবকৃত হক সম্পর্কে বিশদভাবে জানা মোটেও সম্ভবপর নয়। এমনিভাবে আল্লাহ্ যে সকল পরিপূর্ণ সিফাত বা গুণ রয়েছে এবং তাঁর যে সব সুমহান সুন্দর নাম রয়েছে, কেবল মানবীয় বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে সেগুলো সম্পর্কে ভালভাবে জানা আদৌ সম্ভবপর নয়। এ কারণেই আল্লাহ্ নাবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে। আর তিনি তাঁদের প্রতি পরম সত্য ও সঠিক বার্তা দিয়ে কিতাব নাযিল করেছেন, যাতে করে নাবী-রাসূলগণ মানুষের মধ্যে সঠিক ফায়সালা করে দিতে পারেন সে সব বিষয়ে, যাতে তারা মতবিরোধে লিপ্ত।
সর্বপ্রথম রাসূল নূহ থেকে শুরু করে সর্বশেষ নাবী ও রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত প্রত্যেক নাবী-রাসূল মানবজাতিকে যে সব বিষয়ের দাওয়াত দিয়েছেন তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হচ্ছে তাওহীদ। যেমন আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلُّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
"প্রত্যেক জাতির কাছে আমি রসূল পাঠিয়েছি (এ সংবাদ দিয়ে) যে, আল্লাহর ইবাদাত কর আর তাগুতকে বর্জন কর।"
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنَ قَبْلِكِ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيَ إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
"আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রসূলই পাঠাইনি যার প্রতি আমি ওয়াহয়ী করিনি যে, আমি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই। কাজেই তোমরা আমারই ইবাদাত কর।"
টিকাঃ
463 সূরা আয-যুমার ৩৯: ৩০-৩১
464 সূরা তা-হা ২০: ৫৫
465 সূরা নূহ ৭১: ১৭-১৮
466 সূরা আল-মুয্যাম্মিল ৭৩: ১৭-১৮
467 সূরা তাহা ২০ : ৫৫
468 সূরা আন-নাজম ৫৩ : ৩১
469 সূরা আয-যিলযাল ৯৯ : ৭-৮
470 'সূরা আল-আমবিয়া' ২১ : ৪৭
471 সূরা আল-আনআম ৬ : ১৬০
472 সূরা আল-আনআম ৬: ১৬০
473 সূরা আন-নাজম ৫৩: ৩১
474 সূরা আন-নাজম ৫৩: ৩১
475 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৭
476 সূরা আল-আনআম ৬: ২৯-৩০
477 সূরা আল-মুতফিফীন ৮৩: ১০-১৭
478 সূরা আল-ফুরকান ২৫: ১১
479 সূরা আল-আনকাবূত ২৯ : ২৩
480 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪: ৭
481 সূরা আর-রুম ৩০: ২৭
482 সূরা আল-আম্বিয়া ২১ : ১০৪
483 সূরা গাফির (মুমিন) ৪০ : ৫৭
484 সূরা আল-আহকাফ ৪৬ : ৩৩
485 সূরা ইয়াসীন ৩৬: ৮১-৮২
486 সূরা ফুসিলাত ৪১ : ৩৯
487 সূরা আল-বাকারাহ ২ : ২৫৯
488 সূরা মুমিনূন ২৩: ১১৫-১১৬
489 সূরা তাহা ২০: ১৫
490 সূরা আন-নাহল ১৬: ৩৮-৪০
491 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪: ৭
492 সূরা আন-নিসা' ৪: ১৬৫
493 সূরা আন-নিসা' ৪: ১৬৫
494 সূরা আন-নাহল ১৬: ৩৬
495 সূরা আল-আমবিয়া ২১: ২৫
📄 আল্লাহর বিধানবিরোধী বিচারকদের বিধান
দ্বিতীয় প্রকারের উদাহরণ হিসেবে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ
وَمَا لَمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَفِرُونَ
“আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার-ফায়সালা করে না, তারাই কাফির।”
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেনঃ
وَمَا لَمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
“আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার-ফায়সালা করে না তারাই যালিম।”
তিনি আরো ইরশাদ করেছেনঃ
وَمَا لَمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفُسِقُونَ
“আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই ফাসিক।”
আল্লাহর বিধানবিরোধী বিচারক কি একইসাথে কাফির, যালিম ও ফাসিকঃ এখন প্রশ্ন হলো, এই তিনটি বৈশিষ্ট্য কি একই ব্যক্তির ব্যাপারে বলা হয়েছে? অর্থাৎ প্রত্যেক যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ্ নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করে না, সে কি একই সাথে কাফির, যালিম এবং ফাসিক? কেননা কুরআন মাজীদে আল্লাহ্ কাফিরদেরকে যালিম এবং ফাসিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেছেনঃ
وَالْكَافِرُونَ هُمُ الظَّالِمُونَ
“আর বস্তুতঃ কাফিররাই হলো অত্যাচারী।”
অন্য আয়াতে তিনি বলেনঃ
إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَسِقُونَ
"তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সঙ্গে কুফুরী করেছে আর বিদ্রোহী পাপাচারী অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।"
কাজেই প্রত্যেক কাফির হলো যালিম এবং ফাসিক। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করে না, সেই ব্যক্তি কি একই সাথে কাফির, যালিম ও ফাসিক বলে গণ্য হবে, নাকি আল্লাহ্র বিধান অনুযায়ী বিচার- ফায়সালা না করার বিভিন্ন কারণের উপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির উপর উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রযোজ্য হবে? আমার কাছে শেষোক্ত কথাটি অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। মহান আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
এক্ষেত্রে আমরা বলবো, কেউ যদি আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধানকে অবজ্ঞা করে অথবা তুচ্ছজ্ঞান করে কিংবা এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান ব্যতীত অন্য কোন বিধান অধিকতর উপযোগী এবং জগতবাসীর জন্য তা অধিকতর উপযোগী অথবা তা জগতবাসীর জন্য আল্লাহ্ নাযিলকৃত বিধানের সমমান সম্পন্ন ও সমান কল্যাণকর, তাহলে সে ইসলাম বহির্ভূত কাফির বলে গণ্য হবে। আর ঐসকল লোক মানুষের জন্য ইসলামী শারীআত বিরোধী বিধান প্রবর্তন করে এবং এটাকে মানুষের চলার পথ হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়। আর কেউ যখন ইসলামী শারীআত বিরোধী বিধান প্রবর্তন করে থাকে, তখন সে নিশ্চয়ই এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, তার প্রবর্তিত বিধান জগতবাসীর জন্য অধিকতর কল্যাণকর এবং উপকারী। মানুষের স্বভাবজাত বিবেক-বুদ্ধিও একথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে যে, কোন মানুষ কেবল তখনই এক পদ্ধতি ছেড়ে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করে যখন সে এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, যে পদ্ধতি সে বর্জন করেছে সেটা ত্রুটিপূর্ণ এবং বর্তমানে যে পদ্ধতি সে অবলম্বন করছে সেটা অধিকতর উত্তম।
আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করে না, কিন্তু সে যদি আল্লাহ্র বিধানকে অবজ্ঞা না করে অথবা তুচ্ছজ্ঞান না করে কিংবা এই বিশ্বাস পোষণ না করে যে, আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান ব্যতীত অন্য কোন বিধান তার জন্য অধিকতর উপযোগী অথবা অন্য কোন বিধান আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধানের সমান কল্যাণকর, তাহলে সে কাফির নয় বরং যালিম বলে গণ্য হবে। তবে সে কোন পর্যায়ের যালিম তা নির্ধারিত হবে সে কিসের মাধ্যমে কী ধরনের বিচার-ফায়সালা করছে সেটার উপর।
আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করে না, কিন্তু সে যদি আল্লাহ্র বিধানকে অবজ্ঞা না করে অথবা তুচ্ছজ্ঞান না করে কিংবা এই বিশ্বাস পোষণ না করে যে, আল্লাহ প্রদত্ত বিধান ব্যতীত অন্য কোন বিধান অপেক্ষা অধিকতর সঠিক অথবা অন্য কোন বিধান আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের সমান উপযোগী ও কল্যাণকর, বরং যে ব্যক্তির ব্যাপারে সে বিচারকার্য পরিচালনা করছে তার প্রতি ব্যক্তিগত ভালবাসার দরুন অথবা ঘুষ লাভের আশায় কিংবা জাগতিক অন্য কোন কারণে সে যদি আল্লাহ্র বিধান ব্যতীত অন্য কোন বিধান দিয়ে বিচার-ফায়সালা করে থাকে, তাহলে সে কাফির নয় বরং ফাসিক বলে গণ্য হবে। তবে সে কোন পর্যায়ের ফাসিক, তা নির্ধারিত হবে সে কিসের মাধ্যমে কী ধরনের বিচার-ফায়সালা করছে সেটার উপর।
আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে রব্ব হিসেবে গ্রহণকারীদের প্রকারভেদ: শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ বলেছেন: যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পন্ডিতবর্গ ও ধর্মজ্ঞানদেরকে রব্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা দুই প্রকার:
ক. যারা এ কথা জানে যে, তাদের পন্ডিত ও ধর্মজ্ঞানরা আল্লাহ্র দ্বীনকে পরিবর্তন করেছে, তা সত্ত্বেও তারা এই পরিবর্তকে মেনে নিয়ে তাদেরকে অনুসরণ করেছে। তারা তাদের ঐসব পন্ডিত ও ধর্মজ্ঞান কর্তৃক আল্লাহ্র হারামকৃত বিষয়কে হালাল এবং হালালকৃত বিষয়কে হারাম করার বিষয়ে বিশ্বাস পোষণ করে তাদেরকে অনুসরণ করে, যদিও তারা জানে যে, এই কাজের মাধ্যমে তারা সকল নাবী-রাসূলের দ্বীনের বিপরীত পথে চলছে। এ ধরনের কাজ ও বিশ্বাস হলো কুফর। মহান আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এ ধরনের কাজকে শির্ক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
খ. যারা আল্লাহ্র হারামকৃত বস্তুকে হালাল এবং হালালকৃত বস্তুকে হারাম বলে বিশ্বাস করে - এভাবেই তাঁর (ﷺ) থেকে বর্ণিত হয়েছে - এ বিষয়টি তাদের ব্যাপারে নিশ্চিত, কিন্তু তারা পন্ডিত ও ধর্মজ্ঞানদের অনুসরণ করেছে শুধু আল্লাহ্র নির্দেশ অমান্য করতে গিয়ে। যেমন: মুসলিমদের অনেকে পাপ কাজ করে থাকে কিন্তু তারা বিশ্বাস করে যে, তারা যা করেছে তা গুনাহের কাজ। এরূপ পাপী ব্যক্তিদের জন্য শারীআতের যে বিধান প্রযোজ্য (তারা কাফির হবে না), তাদের ক্ষেত্রে একই হুকুম প্রযোজ্য হবে।
এখানে লক্ষণীয় একটি বিষয় হলো, আল্লাহ্র বিধান বাদ দিয়ে সাধারণভাবে কোন বিধান প্রবর্তন করা আর বিশেষ ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে কোন বিচারক কর্তৃক আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান ব্যতীত অন্য বিধান দিয়ে বিচার-ফায়সালা করা, এই দু'টি বিষয়ের মাঝে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কেননা আল্লাহ্র বিধানকে বাদ দিয়ে সাধারণভাবে ইসলাম বিরোধী কোন বিধান প্রবর্তন করা সুস্পষ্ট কুফর ও শির্ক, পূর্বের মত যার আর কোন প্রকারভেদ নেই। কারণ যে ব্যক্তি ইসলাম বিরোধী কোন বিধান প্রবর্তন করে, নিশ্চয়ই সে এই বিশ্বাস পোষণ করে তা করে যে, তার প্রবর্তিত বিধান ইসলামী বিধানের চেয়ে অধিকতর সঠিক এবং মানুষের জন্য তা অধিক উপকারী ও কল্যাণকর।
এই মাসআলাহ অর্থাৎ আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে অন্য কোন বিধান দিয়ে বিচার-ফায়সালা করার বিষয়টি খুব বড় একটি বিষয়, যা বর্তমান যুগের শাসকবর্গের জন্য একটি পরীক্ষা। কোন মানুষের জন্য তাই উচিত হবে না এ বিষয়ে প্রকৃত ঘটনা ও সত্য প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত শাসকবর্গের বিরুদ্ধে তাড়াহুড়া করে ভুল কোন সিদ্ধান্ত দিয়ে দেওয়া, যার যোগ্য তারা নয়। কারণ এটি অত্যন্ত মারাত্মক একটি বিষয়। আমরা মহান আল্লাহ্র কাছে দু'আ করছি, তিনি যেন মুসলিমদের জন্য তাদের শাসনকর্তা এবং তাদের নিকটস্থ ব্যক্তিবর্গ ও উপদেষ্টা মন্ডলীকে সংশোধন করে দেন। আল্লাহ্ যাকে সত্যিকারের জ্ঞান দান করেছেন, তার জন্য করণীয় হলো ঐসব শাসকবর্গের সামনে সত্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা, যাতে করে তাদের উপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সত্য তাদের নিকট পরিষ্কার হয়ে যায়। যে ব্যক্তি ধ্বংস হতে চায়, সে যাতে দালীল-প্রমাণ নিয়েই ধ্বংস হয়। আর যে ব্যক্তি বেঁচে থাকতে চায়, সে যাতে দালীল-প্রমাণ নিয়েই বেঁচে থাকে। আল্লাহ্ যাকে সত্যিকারের জ্ঞান দান করেছেন, সে যেন এ বিষয়ে কথা বলতে নিজেকে নগণ্য মনে না করে এবং সে যাতে কাউকে ভয় না করে। কারণ প্রকৃত ইজ্জত ও সম্মান হচ্ছে আল্লাহ্, তাঁর রাসূল (ﷺ) এবং মু'মিন ব্যক্তিদের জন্য।
আর দালীল' মহান আল্লাহ্র বাণী: "দীনের মধ্যে জবরদস্তির অবকাশ নেই, নিশ্চয় হিদায়াত গোমরাহী হতে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। কাজেই যে ব্যক্তি মিথ্যে মা'বুদদেরকে (তাগুতকে) অমান্য করল এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল, নিশ্চয়ই সে দৃঢ়তর রজ্জু ধারণ করল。
আর এটিই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর মর্মার্থ।
১. এখানে দালীল বলতে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার-ফায়সালা করা এবং তাগূতকে অস্বীকার করা যে ওয়াজিব, এই কথার প্রমাণকে বুঝানো হয়েছে।
২. দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কারো উপর কোন জোর-জবরদস্তি নেই। কেননা দ্বীন ইসলামের যাবতীয় বিষয়ের প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট দালীল-প্রমাণ রয়েছে।
তাইতো মহান আল্লাহ্ এর পর পরই বলেছেন:
قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ
‘সত্য পথ সুস্পষ্ট হয়ে গেছে ভ্রান্ত পথ থেকে।’
আর যেহেতু ভ্রান্ত পথ থেকে সঠিক পথ সুস্পষ্টভাবে পৃথক হয়ে গেছে, তাই প্রত্যেক অনুগত মানুষের উচিত ভ্রান্ত পথের পরিবর্তে হিদায়াত বা সঠিক পথ গ্রহণ করা।
৩. মহান আল্লাহ্ তাঁর উপর ঈমান আনার আগে প্রথমে তাগূতকে অস্বীকার করা দিয়ে শুরু করেছেন। কারণ কোন বিষয়কে পূর্ণতা দিতে হলে একে প্রতিষ্ঠা করার আগে তার অস্তিত্বের পথে যে বিষয়গুলো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, সেগুলো আগে দূর করতে হয়। এজন্য বলা হয়ে থাকে, কোন কিছু সাজানোর পূর্বে কাজ হলো খালি করা।
৪. অর্থাৎ পরিপূর্ণভাবে আঁকড়ে ধরে থাকা। আর মজবুত হাতল বলতে এখানে ইসলামকে বুঝানো হয়েছে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মহান আল্লাহ্ এই আয়াতে (فَقَدِ اسْتَمْسَكَ) ‘সে দৃঢ়ভাবে ধারণ করলো’ বলেছেন, (تَمْسَكَ) ‘সে ধারণ করলো’ বলেন নি। কারণ দৃঢ়ভাবে ধারণ করা অর্থটি ধারণ করা অর্থ থেকে অধিকতর শক্তিশালী। যে স্বাভাবিকভাবে কোন কিছু ধারণ করতে পারে সে সুদৃঢ়ভাবে তা নাও ধরতে করতে পারে।
হাদীসনেও ইরশাদ করা হয়েছে: 'সকল কাজের মূল হলো ইসলাম', স্তম্ভ হলো সলাত' এবং সর্বোচ্চ শিখর হলো আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করা।
মহান আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক মুহাম্মাদ (ﷺ), তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁর সাহাবীগণের উপর'।
১. প্রত্যেক বস্তুরই যে একটি প্রধান অংশ থাকে, এর দালীল হিসেবে গ্রন্থকার (রহঃ) এই হাদীসটি পেশ করতে চেয়েছেন। মুহাম্মাদ (ﷺ) যে সব বিষয় নিয়ে এসেছেন, তন্মধ্যে প্রধান বিষয় হলো ইসলাম।
২. কেননা সলাত ব্যতীত ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এজন্য সলাত পরিত্যাগকারী সম্পর্কে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হচ্ছে, সে কাফির এবং তার আর ইসলাম থাকে না।
৩. অর্থাৎ ইসলামের সর্বোচ্চ ও পূর্ণাঙ্গ স্তর হচ্ছে আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করা। কারণ একজন মানুষ যখন নিজেকে সংশোধন করে নিবে, তখন সে আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করে অন্যকে সংশোধনের প্রয়াস চালাতে পারবে, যাতে করে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহ্র বাণী সমুন্নত হয়। আল্লাহ্র বাণী সমুন্নত হোক এই উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি লড়াই করবে, তার এই লড়াই হবে আল্লাহ্র রাস্তায় লড়াই করা। আর যেহেতু এর মাধ্যমে অন্য সকল কিছুর উপর ইসলাম বিজয়ী হয়, তাই আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ হলো ইসলামের সর্বোচ্চ শিখর।
৪. শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দিল ওয়াহ্হাব (রহঃ) মহান আল্লাহকেই জ্ঞানের প্রকৃত উৎস হিসেবে স্বীকার করে এবং নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ), তাঁর পরিবারবর্গ এবং সাহাবীদের উপর দরুদ ও সালাম পাঠানোর মাধ্যমে তিনটি মূলনীতি ও তার সাথে প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ পরিসমাপ্ত করেছেন।
সমাপ্তি কথা
আমরা মহান আল্লাহর নিকট দুআ করছি, তিনি যেন এ পুস্তিকার লেখককে উত্তম প্রতিদান দেন এবং আমাদেরকেও এর প্রতিদান এবং সওয়াবে অংশীদার করেন। আর তাঁকে এবং আমাদেরকে যেন তিনি তাঁর সম্মানিত গৃহ জান্নাতে একত্রিত করেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু।
যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, সলাত (দরুদ) ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) এর প্রতি।
টিকাঃ
515 সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৪৪
516 সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৪৫
517 সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৪৭
518 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২৫৪
519 সূরা আত-তাওবাহ ৯: ৮৪
520 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২৫৬
521 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২৫৬
522 তিরমিযী হা/২৬১৬; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৭৩; আহমাদ হা/২২০১৬; মিশকাত হা/২৯; আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়াউল গলীল হা/৪১৩。