📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 নবুওয়্যাতী জীবন ও দাওয়াত

📄 নবুওয়্যাতী জীবন ও দাওয়াত


গ. নবুওয়াতী জীবন: রাসূল (ﷺ) এর নবুওয়াতী জীবন সম্পর্কে জানা: মুহাম্মাদ (ﷺ) এর নবুওয়াতী জীবন ছিল মোট ২৩ বছর। তাঁর বয়স যখন ৪০ বছর, তখন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে তাঁর উপর ওয়াহয়ী নাযিল হয় এবং তিনি নবুওয়াত প্রাপ্ত হন।
তাঁর কোন এক কবি বলেছেন:
*شَمْسُ النُّبُوَّةِ مِنْهُ فِي رَمَضَانَ وَأَتَتْ عَلَيْهِ أَرْبَعُونَ فَأَشْرَقَتْ*
'বয়স তার চল্লিশের কোঠায় এলো, রমাদ্বানে তাঁর থেকে নবুওয়াতের সূর্য উদ্ভাসিত হলো'।

ঘ. নাবী ও রাসূল হওয়ার পটভূমি: তিনি কিসের মাধ্যমে নাবী ও রাসূল হলেন তা জানা: মুহাম্মাদ (ﷺ) তখনই নবুওয়াত প্রাপ্ত হয়েছিলেন যখন তাঁর উপর আল্লাহ্র এই বাণী নাযিল হয়েছিল:
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنَ عَلَقٍ إِقْرَاْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمُ
“পাঠ কর তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিন্ড হতে। পাঠ কর, আর তোমার এব বড়ই অনুগ্রহশীল। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলম দিয়ে, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না

অতঃপর তাঁর উপর যখন নিম্নোক্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়, তখন তিনি রিসালাত প্রাপ্ত হন:
يَأَيُّهَا الْمُدَّيْرُهُ قُمْ فَاذِرَةً وَرَبَّكَ فَكَبِّرُهُ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرُهُ وَالرَّجُزَ فَاهْجُرُهُ وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُهُ وَلِرَبِّكَ فَأَصْبِرُهُ
“ওহে বস্ত্র আবৃত (ব্যক্তি)! ওঠ, সতর্ক কর। আর তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। তোমার পোশাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ। (যাবতীয়) অপবিত্রতা থেকে দূরে থাক। (কারো প্রতি) অনুগ্রহ করো না অধিক পাওয়ার উদ্দেশে। তোমার প্রতিপালকের (সন্তুষ্টির) জন্য ধৈর্য ধর। "

তখন তিনি মানবজাতিকে সতর্ক করতে শুরু করেন এবং আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধসমূহ যথাযথভাবে পালন করতে থাকেন।
রাসূল এবং নাবীর মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে উলামায়ে কিরাম বলেছেন: যার প্রতি আল্লাহ্ শারীআত নাযিল করেছেন কিন্তু তাঁকে সেই শারীআত প্রচারের নির্দেশ দেননি, তিনি হলেন নাবী। আর যার প্রতি আল্লাহ্ শারীআত নাযিল করেছেন এবং যাকে শারীআতের প্রচার এবং এর উপর আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি হলেন রাসূল। সুতরাং এই অর্থে প্রত্যেক রাসূলই নাবী, কিন্তু প্রত্যেক নাবী রাসূল নন।

ঙ. নাবী প্রেরণের উদ্দেশ্য: তাঁকে কী দিয়ে এবং কেন পাঠানো হয়েছে তা জানা। মহান আল্লাহ্ নাবী (ﷺ) কে পাঠিয়েছেন আল্লাহ্ তাওহীদ বা তাঁর একত্ববাদের বার্তা দিয়ে এবং তাঁর প্রবর্তিত শারীআত দিয়ে। এই শারীআতের মাঝে রয়েছে আল্লাহ্র আদেশকৃত কাজসমূহ পালন করা এবং তাঁর নিষেধকৃত কাজসমূহ বর্জন করা। আল্লাহ্ তাঁকে প্রেরণ করেছেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত স্বরূপ, যাতে করে তিনি জগতবাসীকে শির্ক, কুফর এবং অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের করে জ্ঞান, ঈমান ও তাওহীদের আলোর দিকে নিয়ে আল্লাহ্‌ যাতে করে মানবজাতি আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে এবং তাঁর শাস্তি ও ক্রোধ থেকে মুক্তিলাভ করতে পারে।

আল্লাহ্ তাকে শির্ক থেকে সতর্ক এবং তাওহীদের দিকে আহ্বানের জন্য প্রেরণ করেছেন।
এর প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণী: “ওহে বস্ত্রাবৃত (ব্যক্তি)! উঠ, সতর্ক কর। আর তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। তোমার পোশাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ। (যাবতীয়) অপবিত্রতা থেকে দূরে থাক। (কারো প্রতি) অনুগ্রহ করো না অধিক পাওয়ার উদ্দেশ্যে। তোমার প্রতিপালকের (সন্তুষ্টির) জন্য ধৈর্য ধর।”

এখানে قُمْ فَأَنْذِرُ এর মর্মার্থ: তিনি শির্ক থেকে সতর্ক এবং তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন।
وَرَبَّكَ فَكَبِّرُ এর মর্মার্থ: তাওহীদ দ্বারা আপনার রব্বকে সম্মানিত করুন।
وَثِيَابَكَ فَطَهِّرُ এর মর্মার্থ: আপনার আমলসমূহকে শির্ক থেকে পবিত্র করুন।

وَالرُّجْزَ فَاهْجُرُ এর মর্মার্থ: وَالرُّجُزُ এর অর্থ মূর্তি-প্রতিমা, هَجْر এর অর্থ বর্জন ও পরিত্যাগ অর্থাৎ মূর্তি ও মূর্তিপূজারীর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ।

টিকাঃ
426 আস-সারীতুল হালাবিয়া ১/৩৪০।
427 সূরা আল-আলাক ৯৬: ১-৫
428 সূরা আল-মুদ্দাস্ত্রির ৭৪: ১-৭
429 সূরা আল-মুদ্দাসির ৭৪: ১-৭

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 মি‘রাজ ও হিজরাত

📄 মি‘রাজ ও হিজরাত


রাসূল () আল্লাহ্র নির্দেশ পালনার্থে দশ বছর ধরে মানবজাতিকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে থাকেন'। দশ বছর পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঊর্ধ্বাকাশে'।

১. নবুওতের প্রথম দশকের একমাত্র দাওয়াত: অর্থাৎ রাসূল () একাধারে ১০ বছর মানবজাতিকে আল্লাহ্ তাওহীদ এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

২. মি'রাজ: 'উরুজ' অর্থ হলো 'ঊর্ধ্বে গমন'। যেমন মহান আল্লাহ্ কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন:
تَعْرُجُ الْمَلَئِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ
“ফেরেশতা এবং রুহ (জিবরাঈল) আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয়। "

ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া রাসূল (স) এর এক মহান বৈশিষ্ট্য। ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতের পূর্বে।
মালিক ইবনু সা'সা'আ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী (ﷺ) বলেছেন, আমি কা'বা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ, এই দুই অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর তিনি নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট সোনার একটি পেয়ালা নিয়ে আসা হলো, যা হিকমাহ্ ও ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। অতঃপর আমার বুক হতে পেটের নীচ পর্যন্ত চিরে ফেলা হলো। অতঃপর আমার পেট যমযমের পানি দিয়ে ধোয়া হলো। অতঃপর তা হিকমাহ্ ও ঈমানে পূর্ণ করা হলো এবং আমার নিকট সাদা রঙের চতুষ্পদ জন্তু আনা হলো, যা খচ্চর হতে ছোট আর গাধা হতে বড় অর্থাৎ বুরাক। অতঃপর তাতে চড়ে আমি জিব্রাঈল (আঃ) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমা'নে গিয়ে পৌঁছলাম।
জিজ্ঞেস করা হলো, ইনি কে? উত্তরে বলা হলো, জিব্রাঈল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেয়া হলো, মুহাম্মদ (ﷺ)। প্রশ্ন করা হলো, তাঁকে আনার জন্যই কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হলো, তাঁকে মারহাবা, তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমি আদম (আঃ) এর নিকট গেলাম। তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নাবী! তোমার প্রতি মারহাবা।
অতঃপর আমরা দ্বিতীয় আসমা'নে গেলাম। জিজ্ঞেস করা হলো, ইনি কে? তিনি বললেন, আমি জিব্রাঈল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সঙ্গে আর কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)। প্রশ্ন করা হলো, তাঁকে আনার জন্যই কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হলো, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম!
অতঃপর আমি ঈসা ও ইয়াহইয়া (আঃ) এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নাবী! আপনার প্রতি মারহাবা।
অতঃপর আমরা তৃতীয় আসমা'নে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হলো, ইনি কে? উত্তরে বলা হলো, আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন করা হলো, আপনার সঙ্গে কে? বলা হলো, মুহাম্মাদ (ﷺ)। জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁকে আনার জন্যই কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হলো, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমি ইউসুফ (আঃ) এর নিকট গেলাম। তাঁকে আমি সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা।
অতঃপর আমরা চতুর্থ আসমা'নে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হলো, ইনি কে? উত্তরে বলা হলো, আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন করা হলো, আপনার সঙ্গে কে? বলা হলো, মুহাম্মাদ ()। জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁকে আনার জন্যই কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হলো, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমি ইদ্রীস এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবا।
এরপর আমরা পঞ্চম আসমা'নে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হলো, ইনি কে? উত্তরে বলা হলো, আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন করা হলো, আপনার সঙ্গে কে? বলা হলো, মুহাম্মাদ ()। জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁকে আনার জন্যই কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হলো, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমরা হারুন এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা।
অতঃপর আমরা ষষ্ঠ আসমা'নে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হলো, ইনি কে? উত্তরে বলা হলো, আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন করা হলো, আপনার সঙ্গে কে? বলা হলো, মুহাম্মাদ ()। জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁকে আনার জন্যই কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হলো, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমি মূসা এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা। অতঃপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে গেলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হলো, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, হে রব! এই ব্যক্তি যে আমার পরে প্রেরিত, তাঁর উম্মত আমার উম্মতের চেয়ে অধিক পরিমাণে জান্নাতে যাবে।
অতঃপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হলো, ইনি কে? উত্তরে বলা হলো, আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন করা হলো, আপনার সঙ্গে কে? বলা হলো, মুহাম্মাদ ()। জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁকে আনার জন্যই কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হলো, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম! অতঃপর আমি ইবরাহীম এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নাবী! আপনাকে মারহাবা।
অতঃপর বায়তুল মা'মূরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হলো। আমি জিব্রাঈল কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মা'মূর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা সলাত আদায় করেন। তারা এখান থেকে একবার বাহির হলে দ্বিতীয় বার আর ফিরে আসেন না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ।
অতঃপর আমাকে 'সিদ্রাতুল মুনতাহা' দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন হাজারা নামক জায়গার মটকার মত। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার উৎসমূলে চারটি ঝরণা প্রবাহিত। দু'টি ভিতরে আর দু'টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিব্রাঈলকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ভিতরের দু'টি জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের দু'টির একটি হল ফুরাত নদী আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ।
অতঃপর আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সলাত ফরয করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কী করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সলাত ফরয করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বনী ইসরাঈলের রোগ সারানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। আপনার উম্মত এতো সলাত আদায়ে সমর্থ হবে না। অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর আবেদন করুন।
আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সলাত চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার তেমন ঘটল। সলাত ত্রিশ ওয়াক্ত করে দেয়া হলো। আবার তেমন ঘটলে তিনি সলাত বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার তেমন ঘটল। তিনি সলাতকে দশ ওয়াক্ত করে দিলেন। অতঃপর আমি মূসা এর নিকট আসলাম। তিনি আগের মত বললেন। এবার আল্লাহ্ সলাতকে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কী করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ্ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিয়েছেন। এবারও তিনি আগের মত বললেন। আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছি। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফরয জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের হতে হালকা করেও দিয়েছি। আমি প্রতিটি নেকির বদলে দশগুণ সওয়াব দিব।
রাসূল (ﷺ) এই রাতে জান্নাতে প্রবেশ করেন এবং দেখেন এর মুক্তা শোভিত তাঁবু এবং সুগন্ধযুক্ত কস্তুরীর মাটি। অতঃপর রাসূল (ﷺ) পৃথিবীতে অবতরণ করেন। সুবহে সাদিকের সময় তিনি মক্কা এসে পৌঁছান এবং মক্কাতেই ফজরের সলাত আদায় করেন।
আর তার উপর পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরয করা হয়। আর মাক্কায় তিনি তিন বছর সলাত আদায় করেন'। এরপর তাকে মদীনায় হিজরাতের নির্দেশ দেওয়া হয়।

১. ফরয সলাতের রাকআত পরিবর্তন: মাক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে রাসূল ফরয সলাত ৪ রাকাআতের পরিবর্তে ২ রাকআত আদায় করতেন। মদীনায় হিজরাতের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এভাবেই সলাত আদায় করেছেন। হিজরাতের পর সফরের অবস্থায় ফরয সলাত ২ রাকআত বহাল থাকে, অপরদিকে মুকীম (নিজ আবাসে থাকা) অবস্থায় ফরয সলাত ৪ রাকআত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

২. মাদীনায় হিজরাত: মহান আল্লাহ্ তাঁর নাবী মুহাম্মাদ () কে নির্দেশ দেন যাতে তিনি মক্কা ছেড়ে মাদীনায় চলে যান। কারণ মক্কাবাসীরা তাঁকে তাঁর দাওয়াত চালিয়ে যেতে দিচ্ছিল না। তাই নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছরে রবিউল আউয়াল মাসে রাসূল () ওয়াহয়ীর প্রথম অবতরণস্থল, আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রিয়তম শহর মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরাত করেন। মক্কায় তিনি একাধারে ১৩টি বছর দূরদৃষ্টির সাথে মহান আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেন এবং আল্লাহ্ দিকে মানুষকে আহ্বান জানাতে থাকেন। এরপর আল্লাহ্র নির্দেশে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন। কিন্তু এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি তাঁর দাওয়াতের ক্ষেত্রে কুরাইশ গোত্রের অধিকাংশ লোক এবং বিশেষ করে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে অবজ্ঞা, উপেক্ষা এবং প্রত্যাখ্যান ব্যতীত কিছুই পান নি। তারা মুহাম্মাদ () এবং তাঁর উপর যারা ঈমান এনেছে, সেসব মু'মিন ব্যক্তিকে চরম কষ্ট দিতে থাকে। এমনকি তারা রাসূল () কে হত্যার জন্য প্রতারণামূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।
কুরাইশ নেতৃবৃন্দ 'দারুন নাদওয়া' তে সমবেত হয়ে রাসূল () এর ব্যাপারে কি করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পরামর্শ করতে লাগলো। কেননা তারা দেখছিল যে, যেহেতু রাসূল (স) এর সাহাবীরা সবাই হিজরাত করে মদীনা চলে যাচ্ছেন, আর অবশ্যই মুহাম্মাদ () ও এক পর্যায়ে সেখানে গিয়ে তাদের সাথে মিলিত হবেন। সেখানে তিনি আনসার সাহাবায়ি কিরাম যারা তাঁকে এই মর্মে অঙ্গীকার করেছিল যে, তাঁরা নিজেদের স্ত্রী-সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের ন্যায় তাঁকেও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, তাঁদের থেকে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা পাবেন এবং এতে করে তিনি কুরাইশ গোত্রের উপর প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হবেন।
আল্লাহর দুশমন আবু জাহাল পরামর্শ সভায় বলল, রায় এটাই যে, আমরা প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে তেজোদীপ্ত ও শক্তিমান যুবক নির্ধারণ করবো, অতঃপর তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে ধারালো তরবারী তুলে দিব। তারা সবাই মিলে মহাম্মাদ (ﷺ) এর কাছে যাবে এবং এমনভাবে একত্রে একসাথে আঘাত করবে, যেন মনে হয় একজনই আঘাত করছে। এভাবে তারা তাঁকে হত্যা করবে এবং আর আমরা তাঁর থেকে নিষ্কৃতি পাব। এভাবে তাঁকে হত্যা করলে তাঁর খুনের দায়-দায়িত্ব এককভাবে কারো উপর বর্তাবে না, বরং সকল গোত্রের উপর বর্তাবে। যার ফলে ‘আব্দ মানাফ’ গোষ্ঠী (নবীর আত্মীয়-স্বজন) সমগ্র কুরাইশ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হবে না। তাই তারা রক্তপণ (দিয়াত) নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, যা আমরা সকল গোষ্ঠী মিলে দিব।
মহান আল্লাহ্ তাঁর নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) কে মুশরিকদের এসব চক্রান্তের কথা জানিয়ে দিয়ে তাঁকে হিজরাতের অনুমতি দিয়ে দিলেন। আর এই ঘটনার আগেই আবূ বকর সিদ্দীক (رضি) মদীনায় হিজরাতের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু রাসূল (ﷺ) তাকে বলেছিলেন: “আমি আশা করছি যে, আমাকেও হিজরাতের অনুমতি দেওয়া হবে।” তাই রাসূল (ﷺ) কে সঙ্গী হওয়ার জন্য আবূ বকর সিদ্দীক (رضি) তখন হিজরাতকে একটু বিলম্বিত করেন।
আয়িশা (رضي) বলেন: দিনের মধ্যভাগে, ভরদুপুরে আমরা আবূ বকরের ঘরে ছিলাম, এমন সময় হঠাৎ রাসূল (ﷺ) দরজায় এসে হাযির হলেন। আবূ বকর (رضي) তাঁকে বললেন, আমার পিতা-মাতা তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক! আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই বিশেষ কোন কারণ রয়েছে, নইলে এই সময় রাসূল (ﷺ) এখানে আসতেন না। ইতোমধ্যে রাসূল (ﷺ) ঘরে প্রবেশ করলেন এবং আবূ বকরকে বললেন, এখানে আপনার কাছে যারা আছে তাদেরকে একটু সরিয়ে দিন। আবূ বকর (رضي) বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, হে আল্লাহর রাসূল! এরা তো আপনারই পরিবার। রাসূল (ﷺ) বললেন, আমাকে মক্কা ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একথা শুনে আবূ বকর (رضي) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সঙ্গে যেতে চাই। রাসূল (ﷺ) বললেন, হ্যাঁ আপনি আমার সাথেই যাবেন। আবু বকর বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! তাহলে আমার এই ২টি বাহন (উট) থেকে যে কোন একটি আপনি বেছে নিন। রাসূল () বললেন, হ্যাঁ নিব, তবে তা মূল্যের বিনিময়ে।
অতঃপর রাসূল () এবং আবু বকর () উভয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। পথিমধ্যে তাঁরা সাউর পর্বতের গুহায় তিন রাত অবস্থান করেন। এসময় আবূ বকরের ছেলে আব্দুল্লাহ্, যিনি একজন প্রখর মেধাবী যুবক ছিলেন, তিনি তাঁদের নিকট রাত কাটাতেন, আবার রাতের শেষ প্রহরে সেখান থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যেতেন যাতে তিনি ভোরে এসে কুরাইশদের সাথে মিশে যেতে পারতেন। নবী () ও আবু বকর () এর ব্যাপারে কুরাইশরা যে সব কুট-কৌশল বিষয়ে পরামর্শ করতো তা তিনি শুনতেন এবং ভালো করে মনে রাখতেন। অতঃপর সন্ধ্যা নেমে এলে তিনি এসব খবর-বার্তা নিয়ে তাঁদের কাছে চলে আসতেন।
এদিকে কুরাইশরা চতুর্দিকে রাসূল () কে খুঁজতে লাগলো এবং যে কোন উপায়ে তাঁকে ধরার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগলো। এমনকি তারা ঘোষণা দিল যে, মুহাম্মাদ () এবং আবূ বাকর () এই দু'জনকে কিংবা দু'জনের যেকোন একজনকে যে ব্যক্তি ধরিয়ে দিতে পারবে, তাকে ১০০ টি উট পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁদের সাথে ছিলেন। তিনি তাঁর সাহায্য দিয়ে তাঁদেরকে হেফাযত করছিলেন এবং তাঁদেরকে রক্ষণাবেক্ষণ করছিলেন। যার ফলে মুশরিকরা সেই গুহার মুখে দাঁড়িয়েও তাঁদেরকে দেখতে পায় নি। আবূ বকর) বলেন:
قُلْتُ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَأَنَا فِي الْغَارِ لَوْ أَنَّ أَحَدَهُمْ نَظَرَ تَحْتَ قَدَمَيْهِ لَا بَصَرَنَا فَقَالَ مَا ظَنُّكَ يَا أَبَا بَكْرٍ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِعُهُمَا
'আমরা যখন গুহায় আত্মগোপন করেছিলাম তখন আমি নাবী () কে বললাম, যদি কাফিররা তাদের পায়ের নীচের দিকে দৃষ্টিপাত করে তবে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবূ বাকর, ঐ দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, আল্লাহ্ যাদের তৃতীয় জন!'

এভাবে ৩ রাত অতিবাহিত হওয়ার পর যখন তাঁদেরকে খোঁজাখুঁজি কিছুটা থামল, তখন তাঁরা উভয়ে গুহা থেকে বের হয়ে মক্কার নিম্নভূমি দিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা শুরু করলেন।
মদীনাবাসী মুহাজির এবং আনসারগণ যখন শুনেছিলেন যে, রাসূল (ﷺ) তাদের কাছে আসার জন্য মক্কা থেকে মদীনার দিকে রওনা হয়ে গেছেন, সেই থেকে তারা প্রতিদিন প্রস্তরময় ভূমি (হারা) তে এসে রাসূল (ﷺ) ও তাঁর সাহাবী আবূ বকর (رضي) এর আগমনের প্রতীক্ষায় থাকতেন, যে পর্যন্ত না সূর্যের প্রবল তাপ তাদেরকে সরিয়ে দিত। আর যেদিন রাসূল (ﷺ) মদীনায় এসে পৌঁছালেন, প্রতিদিনের মত সেদিনও তারা সূর্যের তাপ প্রবল হওয়া পর্যন্ত রাসূল (ﷺ) এর আগমনের প্রতীক্ষায় ছিলেন। সূর্যের উত্তাপ অসহনীয় হয়ে পড়ায় তারা নিজ নিজ গৃহে ফিরে গিয়েছিলেন।
এমন সময় একজন ইয়াহুদী তার কী এক প্রয়োজনে শহরের দূর্গসমূহের কোন এক উঁচু দূর্গে উঠে কী যেন দেখছিল, হঠাৎ সে দেখলো, রাসূল (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীরা মরুভূমির মরীচিকা ভেদ করে আসছেন। সে তখন আর নিজের আবেগকে চেপে রাখতে না পেরে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বলল, হে আরব জনগোষ্ঠী! তোমাদের গর্ব ও সৌভাগ্যের সম্পদ, যার জন্য তোমরা প্রতীক্ষা করছো, এই যে তিনি এসে গেছেন। এই আওয়াজ শোনা মাত্রই মুসলিমরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাসূল (ﷺ) এর সাক্ষাত লাভের জন্য দ্রুত বেরিয়ে পড়েন। এটা ছিল রাসূল (ﷺ) এর প্রতি তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও সাদর সম্ভাষণ এবং বাস্তবিকপক্ষে এ কথা জানান দেয়ার জন্য যে, তারা জিহাদ এবং রাসূলের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন। হারা প্রান্তরে রাসূল (ﷺ) এর সাথে মিলিত হওয়ার পর রাসূল (ﷺ) তাদেরকে সাথে করে ডান দিকে মোড় নিয়ে 'কুবা' অঞ্চলে আমর বিন আওফ এর মহল্লায় চলে আসেন। সেখানে রাসূল (ﷺ) তাদের মাঝে কয়েক রাত অবস্থান করেন। এ সময় তিনি সেখানে একটি মাসজিদ (মসজিদে কুবা) প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর কুবা থেকে তিনি মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং লোকজন তাঁর সহযাত্রী হন। আর অনেকে রাস্তায় তাঁর সাথে সাক্ষাত করেন। আবু বকর (رضي) বলেন, আমরা যখন মদীনায় আগমন করি তখন লোকজন রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল। অনেকে বাড়ি-ঘরের ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে ও ভৃত্যরা বলছিল:
আল্লাহু আকবার! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এসে গেছেন,
আল্লাহু আকবার! মুহাম্মাদ (ﷺ) এসে গেছেন।
আর হিজরাত: শির্কের দেশ থেকে ইসলামী দেশে দেশান্তর'। এ উম্মাতের উপর ফরয হচ্ছে শির্কের দেশ ছেড়ে ইসলামী দেশে হিজরাত করা'। আর হিজরাতের এ হুকুম শেষ প্রহর স্থাপিত হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে।
এর প্রমাণ আল্লাহ্র বাণী: “যারা নিজেদের আত্মার উপর যুল্ম করেছিল এমন লোকেদের প্রাণ হরণের সময় ফেরেশতারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করে- 'তোমরা কোন কাজে নিমজ্জিত ছিলে'? তারা বলে, 'দুনিয়ায় আমরা দুর্বল ক্ষমতাহীন ছিলাম', ফেরেশতারা বলে, 'আল্লাহর যমীন কি প্রশস্ত ছিল না যাতে তোমরা হিজরাত করতে'? সুতরাং তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম এবং তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থান! কিন্তু যে সকল সহায়হীন পুরুষ, নারী ও বালক যারা উপায় বের করতে পারে না আর তারা পথও পায় না, আশা আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ গুনাহ্ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল।”
আর আল্লাহ্ তাআলার বাণী: “হে আমার বান্দারা। যারা ঈমান এনেছ, আমার যমীন প্রশস্ত, কাজেই তোমরা একমাত্র আমারই ইবাদাত কর।”
ইমাম বাগাভী বলেন: আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ মাক্কায় অবস্থানরত হিজরাত না করা মুসলিমগণ। আল্লাহ্ তাদেরকে ঈমানের নামকরণেই সম্বোধন করেছেন'।
আর হিজরাতের ব্যাপারে সুন্নাহ হতে দালীল তাঁর বাণী: 'হিজরাত বন্ধ হবে না তাওবাহ্ বন্ধ না হওয়া অবধি। আর তাওবাহ্ বন্ধ হবে না সূর্যের তার পশ্চিম হতে উদয় অবধি।'

হিজরাত
১. আভিধানিক অর্থ: কোন কিছু ছাড়া বা পরিত্যাগ করা।
পারিভাষিক অর্থ: শারীআতের পরিভাষায় হিজরাত বলতে বোঝায়, যেমনটি বলেছেন শায়খ ( ), তা হলো শির্কের দেশ ত্যাগ করে ইসলামী দেশে চলে যাওয়া। এখানে ‘শির্কের দেশ’ বলতে ঐ দেশকে বুঝানো হয়েছে, যে দেশে কুফরী আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয় এবং যেখানে ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান যেমন: আযান, জামা’আতবদ্ধ সালাত, দুই ঈদ, জুমুআহ ইত্যাদি ধর্মীয় কোন আচার-অনুষ্ঠান সাধারণ ও ব্যাপকভাবে অনুষ্ঠিত হয় না। ‘সাধারণ ও ব্যাপকভাবে পালিত হয় না’ কথাটি দ্বারা আমরা বুঝিয়েছি, এসব কাফির রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু মুসলিম রয়েছে এবং এখানে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। তাই কেউ যেন এসব দেশকে ইসলামী রাষ্ট্র মনে না করে। ইসলামী রাষ্ট্র হচ্ছে এমন রাষ্ট্র যেখানে সাধারণ ও ব্যাপকভাবে ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে।
২. হিজরাতের বিধান: যদি কোন ঈমানদার ব্যক্তি এমন কোন কাফির রাষ্ট্রে বসবাস করেন যেখানে তিনি তার ধর্মীয় কাজগুলো প্রকাশ্যে করতে পারেন না, তাহলে তার জন্য সেখান থেকে হিজরাত করা ওয়াজিব। কাজেই হিজরাত করা ব্যতীত কেউ যদি প্রকাশ্যে দ্বীন অনুশীলন করতে না পারে, তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত সে হিজরাত না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার ইসলাম পরিপূর্ণ হবে না। কারণ যে কাজ ব্যতীত কোন ওয়াজিব কাজ সম্পন্ন করা যায় না, সেই কাজটিও করা ওয়াজিব।
৩. হিজরাত না করার পরিণতি: এই আয়াত দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, ঐসব লোক যারা হিজরাত করতে সক্ষম ও সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও হিজরাত করে নি, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করবেন এবং তাদেরকে তিরস্কার করবেন এই বলে যে, আল্লাহ্র পৃথিবী কি তোমাদের জন্য সুপ্রশস্থ ছিল না, যে তোমরা হিজরাত করে অন্যত্র চলে যেতে? পক্ষান্তরে দুর্বল ও অসহায়, যারা হিজরাত করতে অপারগ ও অসামর্থ্য ছিল, তাদেরকে তাদের অক্ষমতার দরুন আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন। কারণ আল্লাহ্ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোন কাজের ভার অর্পণ করেন না।
১. শায়খ ইমাম বাগাভীর উদ্ধৃতি দিয়ে এখানে যে কথাটি উল্লেখ করেছেন, এটা যদি তিনি তার তাফসীর গ্রন্থ থেকে উল্লেখ করে থাকেন তাহলে বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, তিনি এখানে বাগাভীর হুবহু ভাষ্য উল্লেখ করেন নি, বরং তার কথার মর্মার্থটুকু উল্লেখ করেছেন। কারণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় যা বলা হয়েছে, তাফসীরে বাগাভীতে হুবহু এমন শব্দে তা বর্ণিত হয়নি।
২. কিয়ামাত অবধি হিজরাত চলমান: আর তা হচ্ছে তখন যখন (আল্লাহ্ কাছে) নেক আমল কবুল হওয়ার সময় শেষ হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ أَيْتِ رَبِّكَ لَا يَنْفَعُ نَفْسًا إِيْمَانُهَا لَمْ تَكُنُ أَمَنَتْ مِن قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيْمَانِهَا خَيْرًا
“যে দিন তোমার রবের কতক নিদর্শন এসে যাবে সে দিন ঐ ব্যক্তির ঈমান কোন সুফল দিবে না যে পূর্বে ঈমান আনেনি বা ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করেনি।”

এখানে ‘কিছু নিদর্শন’ বলতে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয়ের কথা বলা হয়েছে।

কাফির রাষ্ট্রে সফরের শর্তাবলী: এখানে আমরা কাফির দেশে সফর করার উল্লেখ করবো। নিম্নলিখিত ৩টি শর্ত পূরণ করা ব্যতীত কোন মুসলিমের জন্য কোন কাফির রাষ্ট্রে সফর করা বৈধ নয়:

প্রথম শর্ত: সফরকারীর নিকট এই পরিমাণ জ্ঞান থাকতে হবে যা দ্বারা সে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে যে কোন ধরনের সন্দেহ ও সংশয় নিরসন করতে পারে।
দ্বিতীয় শর্ত: তার মাঝে এই পরিমাণ ধার্মিকতা থাকতে হবে যা তাকে জাগতিক লোভ-লালসা থেকে বিরত রাখতে পারে।
তৃতীয় শর্ত: কাফির রাষ্ট্রে সফর করার বিশেষ প্রয়োজন থাকতে হবে।

যদি উল্লিখিত এই ৩টি শর্ত না পাওয়া যায়, তাহলে কোন কাফির দেশে সফর করা বৈধ হবে না। কারণ তাতে ফিতনা বা ফিতনার আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি তাতে রয়েছে অর্থের অপচয়। কারণ মানুষ সাধারণত এ ধরনের সফরে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে থাকে।
পক্ষান্তরে চিকিৎসা কিংবা এমন কোন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা যা সফরকারীর রাষ্ট্রে নেই, এ ধরনের কোন প্রয়োজনীয়তা যদি দেখা দেয় এবং সফরকারীর মাঝে যদি পর্যাপ্ত ইল্ম ও ধার্মিকতা থেকে থাকে যেমনটি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি, তাহলে এতে কোন অসুবিধা নেই।
তবে কাফির দেশে কেবল পর্যটনের জন্য সফর করা, এটা আসলে কোন প্রয়োজন হিসেবে গণ্য হবে না। কেউ পর্যটনের জন্য কোথাও যেতে চাইলে সে এমন কোন ইসলামী রাষ্ট্রে যেতে পারে, যেখানকার অধিবাসীরা ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান যথাযথভাবে হিফাযত করে থাকেন। আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের দেশের (সুউদী আরবের) বিভিন্ন অঞ্চল এখন পর্যটন নগরীতে পরিণত হয়েছে। সুতরাং সম্ভব হলে কেউ এখানে আসতে পারেন এবং অবকাশ যাপন করতে পারেন।
কাফির দেশে বসবাস করাটা একজন মুসলিমের দ্বীন, চরিত্র, চাল-চলন ও শিষ্টাচারের জন্য খুবই বিপজ্জনক। যেসব মুসলিম কাফির দেশে বসবাস করছে, তাদের মাঝে আমরা এবং আরো অনেকেই বিপথগামিতা ও বিচ্যুতি লক্ষ করেছি। আমরা দেখেছি, তারা এখান থেকে যা কিছু নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে থেকে অন্যকিছু নিয়ে ফিরে এসেছে। তাদের অনেকে ফাসিক (অবাধ্য গুনাহগার) হয়ে, কেউ মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে, আবার কেউবা নিজের দ্বীন এমনকি অপর সব ধর্মকে অস্বীকারকারী কাফির হয়ে ফিরে এসেছে। আউযুবিল্লাহ!
আবার কেউবা পুরোপুরি ধর্ম অস্বিকারকারী হয়ে ফিরে এসে দ্বীন ইসলাম নিয়ে এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কালের ব্যক্তিদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে শুরু করেছে। তাই এরূপ ধ্বংসে নিপতিত হওয়া থেকে মুসলিমদের হিফাযতে থাকার জন্য কাফির রাষ্ট্রে বসবাস করার কিছু শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
কাফির রাষ্ট্রে অবস্থানের শর্তদ্বয়: প্রথম শর্ত: কাফিরের দেশে অবস্থানকারীর দ্বীন নিরাপদ থাকতে হবে যেক্ষেত্রে তার সাথে এই পরিমাণ ইলম, ঈমান এবং দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে যা তাকে দ্বীনের উপর অটল ও অবিচল রাখবে এবং কোন প্রকার পথভ্রষ্টতা ও বিচ্যুতি থেকে সতর্ক ও সাবধান রাখবে। একই সাথে তার কাফিরদের প্রতি শত্রুতা ও ঘৃণা লালন করতে হবে এবং তাদের প্রতি বন্ধুত্ব ও ভালবাসা পোষণ করা থেকে নিরাপদ দূরে থাকতে হবে, কেননা ঈমান বিরোধী বিষয়সমূহের মধ্য হতে রয়েছে কাফিরদের প্রতি বন্ধুত্ব পোষণ ও ভালবাসা।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنَ حَادَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عشيرتهم .
“আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় তুমি পাবে না যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতাকারীদেরকে ভালবাসে- হোক না এই বিরোধীরা তাদের পিতা অথবা পুত্র অথবা তাদের ভাই অথবা তাদের জ্ঞাতি গোষ্ঠী。

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصْرَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَا يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأَنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَابِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِي بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنَ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَدِمِينَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহূদ ও নাসারাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ যালিমদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তুমি তাদেরকে দেখবে তারা তাদের (অর্থাৎ ইয়াহদী, নাসারা মুশরিকদের) দৌড়ে গিয়ে বলবে, আমাদের ভয় হয় আমরা বিপদের চক্করে পড়ে না যাই। হয়তো আল্লাহ বিজয় দান করবেন কিংবা নিজের পক্ষ হতে এমন কিছু দিবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছিল তার কারণে লজ্জিত হবে।”

এছাড়াও নাবী (ﷺ) থেকে সাহীহভাবে প্রমাণিত একটি হাদীসে রয়েছে:
قَالَ عَبْدُ اللهِ بْنُ مَسْعُودٍ - رضى الله عنه جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ كَيْفَ تَقُولُ فِي رَجُلٍ أَحَبَّ قَوْمًا وَلَمْ يَلْحَقُ بِهِمْ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
আব্দুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ (==) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (>=)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল: হে আল্লাহর রসূল। এমন ব্যক্তির ব্যাপারে আপনি কী বলেন, যে ব্যক্তি কোন দলকে ভালবাসে, কিন্তু (আমলের ক্ষেত্রে) তাদের সমান হতে পারেনি? তিনি বললেন: মানুষ যাকে ভালবাসে সে তারই সাথী হবে।

আল্লাহর শত্রুদেরকে ভালবাসা যে কোন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক একটি বিষয়সমূহের মধ্যে একটি, কেননা তাদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করা তাদের প্রতি মিল-বন্ধন রাখা এবং তাদেরকে অনুকরণ করাকে আবশ্যক করে। অথবা নিদেনপক্ষে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান না করাকে আবশ্যক করে। আর এ কারণেই রাসূল () বলেছেন:
لَا يُحِبُّ رَجُلٌ قَوْمًا إِلَّا حُشِرَ مَعَهُمْ
'যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়কে ভালবাসবে, তাদের সাথেই তার হাশর হবে'।

দ্বিতীয় শর্ত: অবস্থানকারী মুসলিমকে কোন প্রকার বাধা-বিপত্তি ছাড়া ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে তার দ্বীনকে প্রকাশ করার সক্ষমতা থাকতে হবে সলাত কায়েম করা, জামাআতে সলাত আদায় ও জুমুআর সলাত আদায় করতে কোনরকম বাঁধা-নিষেধ থাকতে পারবে না, যদি সেখানে জামাআতে সলাত এবং জুমুআর সলাত আদায়ের জন্য লোকজন পাওয়া যায়। এমনিভাবে যাকাত আদায় করা, সিয়াম পালন করা, হজ্জ করা এবং ইসলামের অন্যান্য কাজগুলো পালনে কোন রকম বাঁধা-নিষেধ থাকতে পারবে না। যদি সে এগুলো কায়েম করতে না পারে, তাহলে এ ধরনের কাফির রাষ্ট্রে বসবাস করা তার জন্য জায়েয নয়। বরং এমতাবস্থায় তার জন্য ওয়াজিব হল সেখান থেকে ইসলামী রাষ্ট্রে হিজরাত করা।
'আল-মুগনী' কিতাবের লেখক (ইবনু কুদামাহ আল মাকদিসী) উক্ত কিতাবে (৪৫৭/৮) হিজরাত সম্পর্কে মানুষের যে সব প্রকারভেদ রয়েছে সে বিষয়ে উল্লেখ করেন:
এক প্রকার হলো এমন, যাদের উপর হিজরাত করা ওয়াজিব ও তাতে সে সক্ষম। সে কাফিরদের মাঝে থাকাকালে তার দ্বীন প্রকাশ করতে সক্ষম নয়। সে দ্বীন ইসলামের ওয়াজিব কাজগুলো প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম নয়। তার উপর হিজরাত করা ওয়াজিব, কেননা মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّهُمُ الْمَلَئِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي لَارُ قَالُوا أَلَمْ تَكُنُ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَبِكَ مَانَهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًان
“প্রাণ হরণের সময় ফেরেশতারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করে- ‘তোমরা কোন কাজে নিমজ্জিত ছিলে’? তারা বলে, ‘দুনিয়ায় আমরা দুর্বল ক্ষমতাহীন ছিলাম’, ফেরেশতারা বলে, ‘আল্লাহর যমীন কি প্রশস্ত ছিল না যাতে তোমরা হিজরাত করতে’? সুতরাং তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম এবং তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থান!”

এ ধরনের কঠোর হুশিয়ারি হিজরাত করা ওয়াজিব হওয়ার দিকেই নির্দেশ করে। তাছাড়া প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তির জন্য ইসলামের ওয়াজিব কাজসমূহ পালন করা ওয়াজিব। আর (তার ক্ষেত্রে) হিজরাত করা ওয়াজিব কাজসমূহ পালন করা ও সম্পূর্ণ করার জন্য অপরিহার্য।
(এ বিষয়ে ফিকহের কায়েদাটি হলো):
ما لا يَتِمُّ الوَاجِبَ إِلَّا بِهِ فَهُو وَاجِبٌ
“আর যা ছাড়া ওয়াজিব সম্পূর্ণ হয়না, তাও ওয়াজিব।”

কাফির রাষ্ট্রে অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিত: উল্লিখিত দুইটি মৌলিক শর্ত পূরণ হলে কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করার বিষয়টি বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করা যেতে পারে:

প্রথম প্রকার: ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য এবং ইসলামের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করা। এটা এক ধরনের জিহাদ। যে ব্যক্তি এ ধরনের জিহাদের শক্তি-সামর্থ্য রাখে, তার জন্য তা করা ফরযে কিফায়া। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, সেখানে দাওয়াতের কাজটি প্রতিষ্ঠিত করার সক্ষমতা থাকতে হবে এবং এই কাজে বাধা প্রদানকারী বা তার দাওয়াতে সাড়া দিতে কোন প্রকার বাঁধা প্রদানকারী কিছু যাতে সেখানে না থাকে। ইসলামের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে দ্বীনের একটি অন্যতম ওয়াজিব কাজ। এটি রাসূলদের পথ। সর্বদা সব জায়গায় দ্বীন ইসলাম প্রচারের জন্য রাসূল (ﷺ) আদেশ দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন:
بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
'তোমরা আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, যদি তা একটি আয়াতও হয়'।

দ্বিতীয় প্রকার: কাফিরদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য এবং তাদের ভ্রান্ত আকীদাহ্, বাতিল ও ভিত্তিহীন ইবাদাত-বন্দেগী, নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন, উচ্ছৃঙ্খল চাল-চলন ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য কোন কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করা জায়েয। কেননা এক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান দ্বারা মানুষকে কাফির-মুশরিক কর্তৃক প্রতারিত হওয়া থেকে সতর্ক করা যার এবং তাদের বাহ্যিক চাল-চলন দেখে যারা মুগ্ধ ও চমৎকৃত হন, তাদের কাছে কাফিরদের আসল অবস্থা তুলে ধরা যায়। এই উদ্দেশ্যে কোন কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করা এক প্রকার জিহাদও বটে। কেননা কুফর ও কাফিরদের ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করা প্রকারান্তরে ইসলাম এবং হিদায়াতের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট ও উৎসাহিত করারই নামান্তর। আর কুফরের অসারতা ও বিচ্যুতিই হলো ইসলামের সত্যতা ও যথার্থতার প্রমাণ। যেমন কথায় আছে, বিপরীত জিনিস দ্বারা কোন কিছুর পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, কাঙ্ক্ষিত কল্যাণের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড় কোন ফাসাদ সৃষ্টি ব্যতীত সেই অবস্থানকারীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হতে হবে। যদি এভাবে তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত না হয়, যেমন: সেখানে যদি তাকে কাফিরদের ধর্মের অসারতা প্রকাশিত করতে এবং এ ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করতে নিষেধ করে দেওয়া হয়, তাহলে তার জন্য আর সে দেশে অবস্থান করার মাঝে কোন ফায়দা নেই। আর যদি উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হতে গিয়ে বড় ধরনের কোন ফিতনা-ফাসাদ দেখা দেয়, যেমন: অবস্থানকারীর দাওয়াতী কাজের মোকাবেলায় যদি সেখানকার কাফিররা ইসলাম, ইসলামের নাবী-রাসূল (ﷺ) এবং এর সম্মানিত ইমামদের নিন্দা করা শুরু করে, তাহলে সেখানে এ ধরনের কাজ থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। কেননা মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُوا اللَّهَ عَدُوا بِغَيْرِ عِلْمٍ كَذَلِكَ زَيَّنَا لِكُলِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِمْ مَرْجِعُهُمْ فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“(ওহে মুমিনগণ!) আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তারা ডাকে তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, কেননা তারা তাদের অজ্ঞতাপ্রসূত শত্রুতার বশবর্তী হয়ে আল্লাহকে গালি দেবে। আর এভাবেই আমি প্রত্যেক জাতির জন্য তাদের কার্যকলাপকে তাদের দৃষ্টিতে চাকচিক্যময় করে দিয়েছি, অতঃপর তাদের প্রত্যাবর্তন (ঘটবে) তাদের প্রতিপালকের নিকট, তখন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন যা কিছু তারা করতো। ”

এ বিষয়টি মুসলিমদের পক্ষে গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করার জন্য অমুসলিম দেশে অবস্থানের মত; যাতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া যায় ও মুসলিমদের এ ব্যাপারে সতর্ক করা যায়। যেমন: খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূল (ﷺ) মুশরিকদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত জন্য তিনি হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (رضي) কে মুশরিকদের মাঝে প্রেরণ করেছিলেন।

তৃতীয় প্রকার: কোন মুসলিম রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কাফির রাষ্ট্রের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করা জায়েয। যেমন: কোন দূতাবাসে কর্মকর্তা বা কর্মচারী হিসেবে অবস্থান করা। এক্ষেত্রে যে কাজের জন্য অবস্থান করা হবে, সেই কাজের উপর নির্ভর করবে এই অবস্থানের শারঈ বিধান। যেমন: দূতাবাসের সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মকর্তা (এটাচি), তিনি সেখানে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় তত্ত্বাবধান, সেগুলো দেখাশোনা করা, তাদেরকে ইসলামী বিধান পালন এবং ইসলামী আখলাক, আদব-কায়দা, নৈতিকতা ইত্যাদি যথাযথভাবে অনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য অবস্থান করে থাকেন। সুতরাং তার এই অবস্থানের দ্বারা ইসলামের বিরাট উপকার ও কল্যাণ সাধিত হয় এবং অনেক বড় ক্ষতি ও অনিষ্ট দূর হয়।

চতুর্থ প্রকার: ব্যক্তিগত এবং বিশেষ কোন বৈধ প্রয়োজনে সেখানে অবস্থান করা জায়েয, যেমন: ব্যবসা বা চিকিৎসা। তবে তা হতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সেখানে অবস্থান করা যাবে না। উলামায়ে কিরাম ব্যবসার জন্য কাফির রাষ্ট্রে অনুপ্রবেশকে জায়েয বলেছেন এবং এ বিষয়ে দালীল হিসেবে তাঁরা কিছু সংখ্যক সাহাবীর (r.a.) উদ্ধৃতি পেশ করেছেন।

পঞ্চম প্রকার: পড়াশোনার জন্য কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করা। এ ধরনের অবস্থান যদিও পূর্বোল্লিখিত প্রয়োজনে কাফির রাষ্ট্রে অবস্থানের অন্তর্ভুক্ত, তথাপি অন্যান্য প্রয়োজনে সেখানে অবস্থানের তুলনায় পড়াশোনার জন্য অবস্থানের বিষয়টি তার দ্বীন ও চরিত্রের জন্য অধিকতর ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কেননা যে কোন শিক্ষার্থী মর্যাদার দিক দিয়ে নিজেকে ছোট মনে করে এবং তার শিক্ষককে বড় মনে করে থাকে। এক্ষেত্রে তাই এমন হবে যে, সে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তাদের চিন্তা-চেতনা, মতাদর্শ এবং চাল-চলনকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিবে এবং এভাবে এক সময় সে তাদেরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে শুরু করবে। তবে খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থী যাদেরকে আল্লাহ্ হিফাযত করে থাকেন, কেবল তারাই এরূপ পরিস্থিতি থেকে বেঁচে থাকতে পারে।
তাছাড়া একজন শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রয়োজনে তার শিক্ষকের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। এতে করে শিক্ষার্থী তার শিক্ষককে ভালবাসতে শুরু করে এবং শিক্ষকের গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতাকে সে তোষামোদ করতে থাকে। তাছাড়া ঐসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীর অনেক কাফির সহপাঠী থাকে এবং তাদের মধ্য থেকে সে অনেককে বন্ধু হিসেবে বেছে নেয়। সে তাদেরকে ভালবাসে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এ প্রকারের বিপদের কারণে পূর্বোল্লিখিত প্রকারের চেয়ে নিজেকে অধিক হেফাযত প্রয়োজন। আর তাই মৌলিক ২টি শর্তের পাশাপাশি আরো কয়েকটি শর্তারোপ করা হয়েছে। সেগুলো হলো:
১. শিক্ষার্থীকে বিবেক-বুদ্ধির দিক দিয়ে যথেষ্ট পরিপক্ক হতে হবে, যা দ্বারা সে কল্যাণকর এবং ক্ষতিকর বিষয় সমূহের মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারবে এবং সুদূর ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে তা দেখতে পাবে। আর কম বয়সী এবং অপরিপক্ক বুদ্ধি-জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য কাফিরদের দেশে পাঠানোর কাজটি হবে তাদের দ্বীন, চরিত্র এবং চাল-চলনের জন্য খুবই বিপজ্জনক। তাছাড়া এটি তাদের জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্যও মারাত্মক বিপজ্জনক। তার এ বিষপান তার ফিরে যাওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সংক্রমিত হবে। বাস্তবতা ও পর্যবেক্ষণও তাই সাক্ষ্য দেয়। কেননা পড়াশোনার জন্য পাঠানো বহু শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের পরিবর্তে অন্য কিছু নিয়েই ফিরে এসেছে। তারা দ্বীন, চরিত্র এবং চাল-চলনে বিপথগামী হয়ে ফিরেছে। আর এসব বিষয়ে তাদের নিজেদের এবং সমাজের যে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা তো জানা কথা এবং সাক্ষ্যও তাই বলে। কাজেই অপরিপক্ক জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন এসব কম বয়সী শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার জন্য কাফির রাষ্ট্রে পাঠানো যেন কোন ভেড়ীকে হিংস্র কুকুরের মুখে তুলে দেওয়ার মতই কাজ।

২. শিক্ষার্থীর নিকট ইসলামী শারীআতের এই পরিমাণ জ্ঞান থাকতে হবে যা দ্বারা সে হক ও বাতিলের মাঝে সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে এবং সত্য দিয়ে মিথ্যাকে প্রতিহত করতে পারে। যাতে করে কাফিরদের বাতিল বিষয়াদি দ্বারা সে প্রতারিত না হয় এবং বাতিলকে যেন সত্য বলে মনে না করে বা বিভ্রান্তিতে যেন না পড়ে কিংবা বাতিলকে প্রতিহত করতে অক্ষম হয়ে দিশেহারা অথবা বাতিলের অনুসারী না হয়ে যায়। হাদীসে বর্ণিত দু’য়া রয়েছে:
اللَّهُمَّ أَرِنِي الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقني اتباعه وأرني الباطل باطلا وارزقني اجتنابه ولا تجعله ملتبسا علي فأضل
হে আল্লাহ্! সত্যকে সত্য হিসেবে আমাকে দেখাও এবং তা অনুসরণ করার তাউফিক আমাকে দান করো। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে আমাকে দেখাও এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক আমাকে দান করো এবং সত্য-মিথ্যার বিষয়টি আমার কাছে অস্পষ্ট রেখো না, তাহলে আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো。

৩. শিক্ষার্থীর মাঝে এ পরিমাণ ধার্মিকতা থাকতে হবে যা তাকে কুফর এবং পাপাচার থেকে রক্ষা করবে। ধার্মিকতার দিক দিয়ে দুর্বল কোন ব্যক্তি কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করে নিরাপদে থাকতে পারে না। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে যদি কাউকে নিরাপদে রাখেন তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। কেননা সেখানে তাকে আক্রমণকারী বিষয়সমূহ বেশ শক্তিশালী এবং তার প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশ দুর্বল। সেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কুফর ও পাপাচারের অসংখ্য শক্তিশালী উপকরণ। এগুলো যদি এমন কোন স্থানে সংঘটিত হয় যেখানে প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেশ দুর্বল, তাহলে যা হবার তাই হবে।

৪. মুসলিম জাতির জন্য কল্যাণকর যে জ্ঞানার্জন প্রয়োজনীয়তার দাবী, তা অর্জনের মত প্রতিষ্ঠান তার নিজ দেশে নেই। কিন্তু সে বিষয়ে যদি মুসলিম জাতির কোন ফায়দা না থাকে অথবা সে বিষয়ে জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা যদি কোন ইসলামী দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকে, তাহলে সে জ্ঞানার্জনের জন্য অমুসলিম রাষ্ট্রে অবস্থান করা জায়েয নয়। কারণ অমুসলিম দেশে অবস্থান একদিকে যেমন দ্বীন ও আখলাকের জন্য বিপজ্জনক, অন্যদিকে তা প্রচুর অর্থ-সম্পদ অনর্থক অপচয় করার কারণও বটে।

ষষ্ঠ প্রকার: (স্থায়ীভাবে) বসবাসের জন্য কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করা। এ ধরনের অবস্থান পূর্বোল্লিখিত বিভিন্ন কারণে সেখানে অবস্থানের চেয়ে আরো বেশি বিপজ্জনক। কেননা, এভাবে অবস্থান করতে গেলে কাফিরদের সাথে পূর্ণ মেলামেশা ও সংশ্রবের ফলে অনেক ধরনের ফিতনা-ফাসাদ দেখা দিবে।
কেননা অবস্থানকারী যখন নিজেকে সেই দেশের স্থায়ী বাসিন্দা বলে মনে করবে, তখন একটি দেশে বসবাস করতে গেলে যে সব বিষয় সাধারণত মানার প্রয়োজন হয়, সেগুলো তাকে মেনে চলতে হবে যেমন: কাফিরদের প্রতি আন্তরিকতা, হৃদ্যতা, মৈত্রী, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ইত্যাদি। এতে কাফিরদের দল ভারী হবে। তাছাড়া সেখানে বসবাস করলে নিজের পরিবার-পরিজন কাফির সমাজে বেড়ে উঠবে। তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা কাফিরদের স্বভাব-চরিত্র এবং কৃষ্টি-কালচার গ্রহণ করে নিবে। শুধু তাই নয়, তারা আকীদাহ্ ও ইবাদাতের ক্ষেত্রেও কাফিরদেরকে অনুসরণ করতে পারে। এ কারণে নাবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে:
مَنْ جَامَعَ الْمُشْرِكَ وَسَكَنَ مَعَهُ فَإِنَّهُ مِثْلُهُ
‘কেউ কোন মুশরিকের সাহচর্যে থাকলে এবং তাদের সাথে বসবাস করলে সে তাদেরই মত একজন’

হাদীসটির সনদ যদিও দুর্বল, তথাপি এতে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা বাস্তবিকভাবে সঠিক বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ কারো সাথে কেউ বসবাস করলে সে তাদের মত হয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ হয়। এছাড়া কাইস ইবনু আবী হাযিম কর্তৃক জারীর বিন আব্দুল্লাহ্ ( ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে:
عَنْ جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَعَثَ سَرِيَّةٌ إِلَى خَنْعَمْ فَاعْتَصَمَ نَاسٌ بِالسُّجُودِ فَأَسْرَعَ فِيهِمُ الْقَتْلُ فَبَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَأَمَرَ لَهُمْ بِنِصْفِ الْعَقْلِ وَقَالَ أَنَا بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ يُقِيمُ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ " . قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَلِمَ قَالَ " لَا تَرَايَا نَارَاهُمَا "
জারীর বিন আব্দুল্লাহ্ ( ) থেকে বর্ণিত: খাস্বআমদের অঞ্চলে রাসূলুল্লাহ্ ( ) একটি ছোট বাহিনী প্রেরণ করেন। সিজদার মাধ্যমে সেখানকার জনগণ আত্মরক্ষা করতে চাইল। কিন্তু দ্রুততার সাথে তাদেরকে মেরে ফেলা হয়। এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ্ ( ) এর নিকট আসলে তিনি তাদের অর্ধেক দিয়াত (রক্তপণ) দেওয়ার জন্য হুকুম দেন। তিনি আরো বলেন, মুশরিকদের সাথে যে সকল মুসলিম বসবাস করে আমি তাদের দায়িত্ব হতে মুক্ত। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তা কেন? তিনি বললেন: তাদের থেকে এইটুকু দূরে থাকবে যেন উভয়ের আগুন না দেখা যায়।

আবূ দাউদ, তিরমিযী ও অধিকাংশ বর্ণনাকারী এ হাদীসটিকে কাইস ইবনু আবী হাযিম হতে মুরসাল রূপে বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী বলেন, আমি শুনেছি মুহাম্মাদ- অর্থাৎ ইমাম বুখারী বলেন, সঠিক হচ্ছে কাইস থেকে বর্ণিত নবী ( ) এর হাদীস মুরসাল।

কোন কাফির রাষ্ট্র যেখানে প্রকাশ্যে কুফরী আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে এবং যেখানে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল ( ) এর বিধান ব্যতীত অন্য কোন বিধান পালন করা হয়ে থাকে, সেখানে বসবাস করে একজন মু’মিন ব্যক্তি কিভাবে নিজ চোখে এসব দেখে, নিজ কানে এসব শুনে এতে সন্তুষ্ট থাকতে পারে? একজন মু’মিন ব্যক্তি কি করে কোন কাফির রাষ্ট্রে নিজের সন্তান-সন্তুতি ও পরিবার-পরিজন নিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসের ন্যায় শান্তিতে থাকতে পারে?
অথচ সেখানে তার নিজের, তার সন্তান-সন্তুতি ও পরিবার-পরিজনের দ্বীন ও চরিত্রের জন্য রয়েছে নানাবিধ বড় ধরনের বিপদ?
কাফির রাষ্ট্রে বসবাসের দ্বীনী বিধান সম্পর্কে আমরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, এখানে তা তুলে ধরা হলো। আমরা মহান আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করছি, যেন আমাদের এই বক্তব্যে আমরা সত্য ও সঠিক হই।

টিকাঃ
430 সূরা আল-মাআরিজ ৭০:৪
431 সাহীহ বুখারী: হা/৩২০৭
432 সহীহ বুখারী: হা/৩৬৫৩, মুসলিম ২৩৮১, আবু দাউদ হা/২৪৭৯; আহমাদ হা/১৬৯০৬; দারেমী হা/২৫৫৫; তাবারানী কাবীর হা/৯০৭; মিশকাত হা/২৩৪৬।
433 'সূরা আন-নিসা' ৪: ৯৭-৯৯
434 সূরা আল-আনকাবূত ২৯ : ৫৬
435 সুনান আবু দাউদঃ হা/২৪৭৯, আলবানী হাদীসটিকে সাহীহ বলেছেন
৪৩৬ 'সূরা আল-আনআম ৬: ১৫৮
৪৩৭ সূরা আল-মুজাদালাহ ৫৮: ২২
৪৩৮ সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৫১-৫২
439 সহীহ বুখারী: হা/৬১৬৯, ৬১৬৮; মুসলিম ৪৫/৫০/, হাঃ ২৬৪০, আহমাদ ১৮১১৩。
440 মূল: মু'জামুল আওসাত ৬/২৯৩, আল-মু'জামুস সগীর ২/১১৪, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব: ৩০৩৭, গ্রন্থে এ হাদীসটিকে মুহাদ্দিস আল-আলবানী সহীহ লিগাইরিহী বলেছেন। হাদীষটির বিস্তারিত তাহকীক "তাহকীক ২” দ্রষ্টব্য。
441 সূরা আন-নিসা' ৪: ৯৭
442 সাহীহ বুখারী: হাদীস নং ৩৪৬১, তিরমিযী হা/২৬৬৯; আহমাদ হা/৬৪৮৬; দারেমী হা/৫৫৯; মিশকাত হা/১৯৮।
443 সূরা আল-আনআম ৬ : ১০৮
৪৪৪ বিস্তারিত তাহকীক "তাহকীক ৩" দ্রষ্টব্য।
445 আবু দাউদ হা/২৭৮৭; তাবারানী কাবীর হা/৭০২৩; আলবানী হাসান বলেন, সহীহুল জামে হা/৬১৮৬; সহীহা হা/২৩৩০।
446 তিরমিযীঃ ১৬০৪ - মুহাক্কিক মুহাদ্দিস আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন- যুবাইর আলী যাঈ দাঈফ খলেছেন। বিস্তারিত তাহকীক "তাহকীক 4" দ্রষ্টব্য。

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 রাসূল (ﷺ) এর ওফাত ও দ্বীনের পূর্ণতা

📄 রাসূল (ﷺ) এর ওফাত ও দ্বীনের পূর্ণতা


আর মদীনাতে যখন রাসূল (সা.) স্থায়ী অবস্থান গ্রহণ করেন, তখন তাঁকে ইসলামী শরীআহ্হ্র অবশিষ্ট বিধান যেমন: যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, জিহাদ, আযান, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ এবং ইসলামী শরীআহ্ অন্যান্য বিধান পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়'।

১. অবশিষ্ট আহকামের অবতরণ: এখানে গ্রন্থকার বলেছেন যে, নাবী (সা.) যখন মদীনাতে স্থায়ী অবস্থান গ্রহণ করেন, তখন তাঁকে ইসলামের অন্যান্য বিধি-বিধান পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতঃপূর্বে মক্কায় তিনি ১০ বছর যাবত মানুষকে কেবল তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছিলেন। অতঃপর মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে তাঁর উপর ৫ ওয়াক্ত সলাত ফরয করা হয়। এরপর মাক্কা ছেড়ে মাদীনায় হিজরাত করা পর্যন্ত তাঁর উপর যাকাত, সিয়াম, হাজ্জ এবং অন্য কোন ইসলামের নিদর্শনসমূহ ফরয করা হয়নি। শায়খ এর কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, মৌলিক ও বিস্তারিত বিধি-বিধান সহ যাকাত মদীনাতেই ফরয করা হয়েছিল।
তবে কিছু সংখ্যক উলামায়ে কিরাম এ অভিমত পোষণ করেন যে, যাকাতের মূল নির্দেশনা মক্কায় অবস্থানকালীন সময়েই এসেছিল, কিন্তু সেখানে যাকাতের নিসাব এবং এর কী কী ওয়াজিব রয়েছে তা নির্ধারণ করা হয় নি। বরং মাদীনাতে এর নিসাব ও এর মধ্যে ওয়াজিব বিষয়সমূহকে নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা তাদের এই বক্তব্যের স্বপক্ষে দালীল হিসেবে বলেছেন, যে সব আয়াতের মাধ্যমে যাকাতের বিধান ফরয করা হয়েছে, সেই আয়াতগুলো মাক্কী সূরার মাঝে এসেছে। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরা আনআমে বলেছেন:
وَاتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ
"আর ফসল তোলার দিন নির্ধারিত ও অনির্ধারিত দানের মাধ্যমে) হক আদায় কর।"

তিনি আরো বলেছেন:
وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ لِلسَّابِلِ وَالْمَحْرُومِ
“যাদের ধন-সম্পদে একটা সুবিদিত অধিকার আছে, প্রার্থী এবং বঞ্চিতদের।”

যাই হোক, যাকাত ও তার নিসাব, এর ওয়াজিবসমূহ ও এর হকদার সম্পর্কিত নির্দেশনা মদীনাতেই এসেছিল। এমনিভাবে আযান ও জুমুআর সালাতের বিধানও মদীনাতে দেয়া হয়েছিল। বাহ্যত যা বুঝা যায়, জামাআতে সালাত আদায়ের নির্দেশও মদীনাতে এসেছিল। কেননা আযানের মাধ্যমে যে জামাআতে সালাত আদায়ের প্রতি আহ্বান করা হয়, তা ২য় হিজরীতে মদীনাতেই ফরয করা হয়েছিল। যাকাত এবং সিয়ামও ২য় হিজরীতে ফরয করা হয়েছিল। উলামাদের বক্তব্য অনুসারে সঠিক মত হচ্ছে হাজ্জকে ৯ম হিজরীর আগে ফরয করা হয়নি। আর হাজ্জকে ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর ইসলামের ভূমি হিসেবে পরিগণিত হওয়ার পরেই ফরয করা হয়। এমনিভাবে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধসহ অন্য সকল পরিষ্কার নিদর্শনাবলী ফরয করা হয়েছে মদীনাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে রাসূল (ﷺ) এর অবস্থান স্থায়ী হওয়ার।

তথায় তিনি দশ বছর যাবত ইসলামের এসব বিধান প্রতিষ্ঠিত করেন এবং অতঃপর মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহর রহমত ও শান্তি তাঁর উপর।
১. রাসূল (ﷺ) এর ওফাত: রাসূল (ﷺ) হিজরাতের পর দশ বছর যাবত মদীনাতে ইসলামের এসব বিধি-বিধান বাস্তবায়িত করেছেন। অতঃপর আল্লাহ্ যখন তাঁর মাধ্যমে দ্বীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিলেন এবং মু'মিনদের উপর স্বীয় নিয়ামত সম্পন্ন করে দিলেন, তখন আল্লাহ্ তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে এবং সর্ব্বোচ্চ সাহচর্যে নাবী, সত্যবাদী, শহীদ এবং সৎকর্মশীলদের সাথে তাঁকে মিলিয়ে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। তাই সফর মাস শেষে রবীউল আউয়াল মাসের প্রথম থেকেই রাসূল (ﷺ) এর অসুখ দেখা দিল। সেদিন তিনি মাথায় পট্টি বেঁধে লোকজনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এলেন এবং মসজিদের মিম্বারে উঠে প্রথমেই ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের জন্য আল্লাহ্র দরবারে মাগফিরাত কামনা করেন। অতঃপর তিনি বলেন:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ خَطَبَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ " إِنَّ اللهَ خَيْرَ عَبْدًا بَيْنَ الدُّنْيَا وَبَيْنَ مَا عِنْدَهُ ، فَاخْتَارَ مَا عِنْدَ اللَّهِ ". فَبَكَى أَبُو بَكْرٍ - رضى الله عنه - فَقُلْتُ فِي نَفْسِي مَا يُبْكِي هَذَا الشَّيْخَ إِنْ يَكُنِ اللَّهُ خَيْرَ عَبْدًا بَيْنَ الدُّنْيَا وَبَيْنَ مَا عِنْدَهُ فَاخْتَارَ مَا عِنْدَ اللهِ، فَكَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم هُوَ الْعَبْدَ، وَكَانَ أَبُو بَكْرٍ أَعْلَمَنَا. قَالَ " يَا أَبَا بَكْرٍ لَا تَبْكِ، إِنَّ أَمَنَّ النَّاسِ عَلَى فِي صُحْبَتِهِ وَمَالِهِ أَبُو بَكْرٍ، وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيلاً مِنْ أُمَّتِي لَاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ، وَلَكِنْ أُخُوَّةُ الإِسْلَامِ وَمَوَدَّتُهُ، لَا يَبْقَيَنَّ فِي الْمَسْجِدِ باب إِلَّا سُدَّ إِلَّا بَاب أَبِي بَكْرٍ
আল্লাহ্ তাআলা তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া ও আল্লাহ্র নিকট যা আছে এই দু'য়ের মধ্যে একটি গ্রহণের ইখতিয়ার দিলেন। তিনি আল্লাহ্র নিকট যা আছে তা গ্রহণ করলেন। তখন আবূ বকর (রাঃ) কাঁদতে লাগলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, এই বৃদ্ধকে কোন বিষয়টি কাঁদাচ্ছে? আল্লাহ্ তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া ও আল্লাহর নিকট যা রয়েছে-এই দু'য়ের একটা গ্রহণ করার ইখতিয়ার দিলে তিনি আল্লাহ্র নিকট যা রয়েছে তা গ্রহণ করেছেন (এতে কাঁদার কি আছে?)।
মূলত: আল্লাহ্র রাসূলই (ﷺ) ছিলেন সেই বান্দা। আর আবূ বকর (রাঃ) ছিলেন আমাদের মাঝে সর্বাধিক জ্ঞানী। নাবী (ﷺ) বললেন: হে আবূ বক্র, তুমি কাঁদবে না। নিজের সাহচর্য ও সম্পদ দিয়ে আমাকে যিনি সবচেয়ে অধিক ইহসান করেছেন তিনি আবূ বক্র। আমার কোন উম্মাতকে যদি আমি খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) রূপে গ্রহণ করতাম, তবে তিনি হতেন আবু বক্কর। কিন্তু তাঁর সাথে রয়েছে ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য। আবূ বক্রের দরজা ব্যতীত মসজিদের কোন দরজাই রাখা হবে না, সবই বন্ধ করা হবে।

অতঃপর রাসূল (ﷺ) আবূ বকর (رضي) কে নির্দেশ দিলেন (ইমাম হয়ে) উপস্থিত লোকজনকে নিয়ে সলাত আদায় করতে।
عنْ ابْنِ شِهَابٍ قَالَ حَدَّثَنِي أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ الْمُسْلِمِينَ بَيْنَا هُمْ فِي صَلَاةِ الْفَجْرِ مِنْ يَوْمِ الاثْنَيْنِ وَأَبُو بَكْرٍ يُصَلِّي لَهُمْ لَمْ يَفْجَأَهُمْ إِلَّا رَسُوْلُ الله ﷺ قَدْ كَشَفَ سِتْرَ حُجْرَةِ عَائِشَةَ فَنَظَرَ إِلَيْهِمْ وَهُمْ فِي صُفُوفِ الصَّلَاةِ ثُمَّ تَبَسَّمَ يَضْحَكُ فَنَكَصَ أَبُو بَكْرٍ عَلَى عَقِبَيْهِ لِيَصِلَ الصَّفَّ وَظَنَّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُرِيدُ أَنْ يَخْرُجَ إِلَى الصَّلَاةِ فَقَالَ أَنَسٌ وَهَمَّ الْمُسْلِمُونَ أَنْ يَفْتَتِنُوا فِي صَلَاتِهِمْ فَرَحًا بِرَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَأَشَارَ إِلَيْهِمْ بِيَدِهِ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم أَنْ أَتِمُوْا صَلَاتَكُمْ ثُمَّ دَখَلَ الْحُجْرَةَ وَأَرْخَى السِّتْرَ
আনাস ইবনু মালিক (رضي) থেকে বর্ণিত: সোমবারে সাহাবীগণ ফজরের সলাতে ছিলেন। আর আবূ বকর (رضي) তাদের সলাতের ইমামতি করছিলেন। হঠাৎ রসূলুল্লাহ (ﷺ) আয়িশাহ (رضي) এর ঘরের পর্দা উঠিয়ে তাদের দিকে দেখলেন। সাহাবীগণ কাতারবন্দী অবস্থায় সলাতে ছিলেন। তখন নাবী (ﷺ) মুচকি হাসি দিলেন। আবূ বাকর (رضي) মুক্তাদীর সারিতে পিছিয়ে আসতে মনস্থ করলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে সলাত আদায়ের জন্য বের হওয়ার ইচ্ছা করছেন। আনাস (رضي) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর (আগমনের) আনন্দে সাহাবীগণের সলাত ভঙ্গের উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু তিনি (ﷺ) হাতের ইশারায় তাদের সলাত পূর্ণ করতে বললেন। তারপর তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন ও পর্দা টেনে দিলেন।

এরপর মহান আল্লাহ্ তাকে নিজ সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য ১১ হিজরী সালের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ মতান্তরে ১৩ তারিখ সোমবারকে বেছে নিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তাঁর পাশে রাখা একটি পানির পাত্রে হাত ভিজিয়ে বার বার নিজের চেহারা মুছে মুছে বলতে লাগলেন:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ
'আল্লাহ্ ভিন্ন সত্য কোন মা'বুদ নেই, মৃত্যু-যন্ত্রণা সত্যিই কঠিন'।

তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন:
اللَّهُمَّ فِي الرَّفِيقِ الْأَعْلَى
'হে আল্লাহ্! সর্বোচ্চ সাহচর্যে (মিলিত হতে চাই)'।

সেদিনই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সাহাবায়ি কিরাম অস্থির হয়ে পড়েন ও সত্যিই এমনিভাবে অস্থির হওয়া তাদের অধিকার ছিলো। এমতাবস্থায় আবূ বকর এসে মিম্বারে উঠে আল্লাহ্ হাম্দ ও স্নানা' বর্ণনা করলেন। এরপর তিনি বললেন:
فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ وَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ حَيٌّ لَا يَمُوْتُ
'অতঃপর আপনাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদ (স) এর ইবাদাত করতেন, জেনে রাখুন! তিনি তো ইনতিকাল করেছেন। আর যারা আপনাদের মধ্যে আল্লাহ্ ইবাদাত করতেন, (জেনে রাখুন) আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না'।

অতঃপর তিনি কুরআন মাজীদের এ আয়াত তিলাওয়াত করেন:
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنَ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَابِنُ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ
“মুহাম্মাদ হচ্ছে একজন রসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে আরও অনেক রসূল গত হয়েছে; কাজেই যদি সে মারা যায় কিংবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়াবে?"

তিনি আরো তিলাওয়াত করেন:
إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ
‘তুমিও মরবে আর তারাও মরবে।’

অতঃপর আবূ বকর (رضিঃ) এর কথা শুনে লোকেরা প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। এতক্ষণে তারা বুঝতে পারলেন যে, সত্যিকার অর্থেই নবী (ﷺ) ইন্তেকাল করেছেন। কাজেই রাসূল (ﷺ) কে তাঁর সম্মানার্থে তাঁর পরনের জামার উপরেই গোসল দেওয়া হলো। তারপর তিনটি সুতি সাদা চাদরে কাফন পরানো হলো, তাতে জামা বা পাগড়ী কিছু ছিল না। অতঃপর কোন ইমাম ছাড়াই সবাই একা একা রাসূল (ﷺ) এর জানাযার সালাত আদায় করলেন। আর খলীফা মনোনীত করে বাইয়াত সম্পন্ন করার পর বুধবার রাতে রাসূল (ﷺ) এর দাফন কার্য সম্পন্ন হয়। তাঁর প্রতি তাঁর মহান প্রতিপালকের সর্বোৎকৃষ্ট রহমত এবং পরিপূর্ণ শান্তি বর্ষিত হোক।

আর তাঁর দ্বীন রয়ে গেল। এটি তাঁর সেই দ্বীন, এমন কোন কল্যাণকর বিষয় নেই যার নির্দেশনা তিনি তাঁর উম্মাতকে দেননি। আর কোন ক্ষতিকর বিষয়ও নেই যে সম্পর্কে তিনি তাঁর উম্মতকে সতর্ক ও সাবধান করেন নি। আর তাঁর নির্দেশিত কল্যাণকর বিষয়সমূহ হচ্ছে: তাওহীদ ও আল্লাহ্‌র যাবতীয় পছন্দনীয় বিষয় ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট। আর ক্ষতিকর যা থেকে তিনি (ﷺ) সতর্ক ও সাবধান করেছেন: সেগুলো হলো শিরক এবং আল্লাহ্‌র যাবতীয় ঘৃণা ও অপছন্দনীয় বিষয়।

আর আল্লাহ্ তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছেন' আর আল্লাহ্ তাঁর আনুগত্যকে ফরয করে দিয়েছেন স্নাকালাইন তথা মানুষ ও জ্বিন দু'টি জাতির সকলের উপর। আর প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণী: “বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রসূল'। "

জিন ও মানুষের রাসূল: ১. 'সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছেন' অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতির প্রতি রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন।
২. এই আয়াতটি এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) হলেন সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল্লাহ্র রাসূল। আর যিনি তাকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন, সেই মহান সত্ত্বা আল্লাহ্ হলেন সমগ্র আসমান ও যমীনের মালিক, যার হাতে রয়েছে জীবন ও মৃত্যু দানের একক ও পরিপূর্ণ ক্ষমতা। মহান আল্লাহ্ যেমন উলুহিয়্যাতে এক ও অদ্বিতীয়, তেমনি রুবুবিয়্যাতেও এক ও অদ্বিতীয়। অতঃপর উল্লিখিত আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহ্ নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন তার এই উম্মী নাবী ও রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণ করি এবং তাঁর যথাযথ অনুসরণ করি। আর তা-ই হচ্ছে জ্ঞান, আমল, সঠিক পথ ও তাওফীক্বের হিদায়াত তথা প্রদর্শিত পথ। তাই তিনি হলেন সাকালাইন তথা সমগ্র মানব ও জ্বিন জাতির প্রতি প্রেরিত রাসূল। মানব ও জ্বিন জাতিকে আরবীতে স্নাকালাইন (স্নাকীল শব্দের দ্বিবচন হলো স্নাকালাইন, যার অর্থ 'ভারী') বলার কারণ হলো, পৃথিবীতে এই দুই জাতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

তাঁর মাধ্যমেই আল্লাহ্ দ্বীনকে পূর্ণ করেন। আর প্রমাণ মহান আল্লাহ্র বাণী:
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামাত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে নিলাম।"

১. দ্বীনের পূর্ণতা লাভ: রাসূল (ﷺ) এর দ্বীন কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। তিনি তাঁর মৃত্যুর পূর্বে উম্মতের জীবনের সর্বক্ষেত্রে যা কিছুর প্রয়োজন রয়েছে, সবকিছু তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে গিয়েছেন। যেমন আবু যার বলেছেন:
ما ترك النبي ﷺ طائرا يقلب جناحيه في السماء إلا ذكر لنا منه علما
'আকাশে একটি পাখির ডানা নাড়ানোর মাঝেও কী নিদর্শন রয়েছে, সেটুকুও রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে বলে গেছেন।'

عَنْ سَلْمَانَ، قَالَ قَالَ لَنَا الْمُشْرِكُونَ إِنِّي أَرَى صَاحِبَكُمْ يُعَلِّمُكُمْ حَتَّى يُعَلِّمَكُمُ الْخِرَاءَةَ . فَقَالَ أَجَلُ إِنَّهُ نَهَانَا أَنْ يَسْتَنْجِيَ أَحَدُنَا بِيَمِينِهِ أَوْ يَسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةَ وَنَهَى عَنِ الرَّوْثِ وَالْعِظَامِ وَقَালَ " لَا يَسْتَنْجِي أَحَدُكُمْ بِدُونِ ثَلَاثَةِ أَحْجَارٍ
সালমান (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, মুশরিকরা একবার আমাকে বলল, আমরা দেখছি তোমাদের সঙ্গী [রাসূল (ﷺ)] তোমাদেরকে সব কাজই শিক্ষা দেয়; এমনকি প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ম-নীতিও তোমাদেরকে শিক্ষা দেয়! (জবাবে) তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি আমাদেরকে নিষেধ করেছেন ডান হাতে শৌচ কাজ করতে, (ইস্তিঞ্জা সময়) কিবলামুখী হয়ে বসতে এবং তিনি আমাদেরকে আরো নিষেধ করেছেন গোবর অথবা হাড় দিয়ে ইস্তিনজা' করতে। তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন তিনটি ঢিলার কম দিয়ে ইস্তিন্‌ন্জা না করে。

কাজেই নাবী (ﷺ) স্বীয় কথা দ্বারা, কাজ দ্বারা দ্বীন ইসলামের প্রতিটি বিষয়বস্তু সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিবরণ দিয়ে গেছেন, হোক তা নিজে থেকেই ব্যক্ত করার মাধ্যমে কিংবা কোন প্রশ্নের উত্তর প্রদানের মাধ্যমে। আর তিনি যে সব বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করে গেছেন সেগুলোর মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হলো তাওহীদ।

তিনি যে সব কাজের আদেশ দিয়েছেন সে সবের প্রত্যেকটিতে উম্মতের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর যে সব কাজ থেকে তিনি নিষেধ করেছেন, সে সবের প্রত্যেকটিতে উম্মতের ইহকালীন ও পরকালীন অনিষ্ট ও অকল্যাণ নিহিত রয়েছে। কিছু মানুষের অজ্ঞতাপূর্ণ দাবি হলো, ইসলামের আদেশ-নিষেধের মাঝে সংকীর্ণতা ও কাঠিন্য রয়েছে। এ ধরনের দাবির আসল কারণ হলো তাদের বুদ্ধিমত্তার ত্রুটি, ধৈর্যশক্তির স্বল্পতা এবং দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা। বরং এটা তো ইসলামের সাধারণ নীতি যে, মহান আল্লাহ্ আমাদের জন্য দ্বীনের মাঝে এমন কোন বিধান রাখেননি যা পালন করা আমাদের জন্য কঠিন। বরং দ্বীন ইসলামের প্রতিটি বিষয় সকলের জন্য অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাবলীল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
“আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান, যা কষ্টদায়ক তা চান না।”

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنَ حَرَجٍ
“দ্বীনের ভিতর তিনি তোমাদের উপর কোন কঠোরতা চাপিয়ে দেননি।”

তিনি আরো বলেন:
مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنَ حَرَجٍ
“আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না'।

যাবতীয় প্রশংসা কেবল আল্লাহ্রই জন্য, যিনি তাঁর নিয়ামতসমূহকে আমাদের জন্য সুসম্পন্ন করেছেন এবং তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
447 সূরা আল-আনআম ৬: ১৪১
448 সূরা আল-মাআরিজ ৭০: ২৪-২৫
৪৪৯ সাহীহ বুখারী: হা/৪৬৬, মুসলিম হা/২৩৮২; তিরমিযী হা/৩৬৫৯; মিশকাত হা/৫৯৫৭।
৪৫০ সাহীহ বুখারী: হা/৪৪৪৮, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ হা/১৬৫০।
451 সাহীহ বুখারী: হা/৪৪৪৯, আজুরী, আশ-শারীআহ হা/১৮৪৩; তাবারানী কাবীর হা/৭৮; মিশকাত হা/৫৯৫৯।
452 সাহীহ বুখারী: হা/৪৪৩৭, মুসলিম হা/২১৯১; আহমাদ হা/২৪৪৫৪; মিশকাত হা/৫৯৬৪।
453 সাহীহ বুখারী: হা/৪৪৫৪, ইবনু মাজাহ হা/১৬২৭; আহমাদ হা/২৫৮৪১; সহীহ ইবনু হিব্বان হা/৬৬২০।
454 সূরা আলু ইমরান ৩: ১৪৪
৪৫৫ সূরা আয-যুমার ৩৯: ৩০
456 'সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৫৮
457 সূরা আল-মায়েদাহ ৫: ৩
458 মুসনাদ আহমাদ: ২১৩৬১, মুহাক্কিক শুআইব আরনাউত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। বিস্তারিত তাহকীক "তাহকীক ৫" দ্রষ্টব্য।
459 সহীহ মুসলিমঃ হা/৪৯৫ (২৬২), আবূ দাউদ হা/৭; তিরমিযী হা/১৬; নাসাঈ হা/৪১; ইবনু মাজাহ হা/৩১৬; মিশকাত হা/৩৭০।
460 সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৮৫
461 সূরা আল-হাজ্জ ২২: ৭৮
462 সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৬

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 পুনরুত্থান ও হিসাব-নিকাশ

📄 পুনরুত্থান ও হিসাব-নিকাশ


আর তার মৃত্যুর প্রমাণে মহান আল্লাহর বাণী: “তুমিও মরবে আর তারাও মরবে। অতঃপর কিয়ামাত দিবসে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সম্মুখে বাদানুবাদ করবে।”
মানুষের মৃত্যু হলে পুনরুত্থিত হবেই। আর দালীল মহান আল্লাহর বাণী: ‘মাটি থেকে আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব আর তাথেকে তোমাদেরকে আবার বের করব।’
আর আল্লাহ তাআলার বাণী: “আল্লাহ তোমাদেরকে মাটি থেকে উদগত করেন (এবং ক্রমশঃ বাড়িয়ে তোলেন যেমন বাড়িয়ে তোলেন বৃক্ষ) অতঃপর এই মাটিতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনবেন এবং তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন।”
আর পুনরুত্থানের পর হিসাব গ্রহণ এবং তাদের আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া হবে।
আর দালিল মহান আল্লাহর বাণী: "যাতে তিনি যারা মন্দ কাজ করে তাদেরকে তাদের কাজের প্রতিফল দেন আর যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে দেন শুভ প্রতিফল।"

১. রাসূল (ﷺ) অবশ্যই মরণশীল: এই আয়াত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাসূল (ﷺ) এবং যাদের প্রতি তাঁকে পাঠানো হয়েছে তারা সকলেই মরণশীল। অতঃপর কিয়ামাতের দিন তারা আল্লাহর নিকট বিবাদে লিপ্ত হবে। তখন আল্লাহ তাদের মাঝে সত্য ও সঠিক ফায়সালা করে দিবেন। আর সেদিন তিনি কাফিরদেরকে মু’মিনদের উপর বিজয়ী হওয়ার কোন পথ খোলা রাখবেন না।
২. পুনরুত্থানের স্বরূপ: উপরের বাক্যটিতে শায়েখ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেছেন যে, প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হবে। মৃত্যুর পর মহান আল্লাহ্ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান দেওয়ার জন্য পুনরায় জীবিত করবেন। আর এটাই হলো নাবী-রাসূলদেরকে পাঠানোর ফলাফল, যাতে করে মানুষ এই পুনরুত্থান দিবসের জন্য আমল করে। এটি হলো এমন একটি দিন যে দিনের অবস্থা ও ভয়াবহতার যে বিবরণ আল্লাহ্ দিয়েছেন, তা শুনলে অন্তর আল্লাহ্ দিকে ফিরে যায় এবং এই দিনকে প্রচন্ড ভয় পায়। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
فَكَيْفَ تَتَّقُونَ إِنْ كَفَرْتُمْ يَوْمًا يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شِيْبَا السَّمَاءُ مُنْفَطِرٌ بِهِ كَانَنَ وَعُدُهُ مَفْعُولًا
"অতএব (তোমরা যদি (এই রসূলকে) অস্বীকার কর, তাহলে তোমরা কীভাবে সেদিন আত্মরক্ষা করবে যেদিনটি (তার ভীষণতা ও ভয়াবহতায়) বালককে ক'রে দেবে বুড়ো। যার কারণে আকাশ ফেটে যাবে, আল্লাহর ওয়া'দা পূর্ণ হয়ে যাবে।"

বাক্যটিতে মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি ঈমান পোষণের দিকে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। আর এ বিষয়ে শায়েখ দু'টি আয়াতকে দালীল হিসেবে পেশ করেছেন।
৩. মাটি থেকে মানব সৃষ্টি: অর্থাৎ মাটি থেকে আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি যেমনভাবে আদমকে আমি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি।
৪. মাটিতেই প্রত্যাবর্তন: অর্থাৎ মৃত্যুর পর মাটিতে দাফন করার মাধ্যমে।
৫. মাটি থেকেই পুনরুত্থান: অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন পুনরুত্থানের মাধ্যমে।
৬. এই আয়াতটি নিম্নের আয়াতের সাথে সম্পূর্ণ সমার্থক:
مِنْهَا خَلَقْنَكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أخرى

"মাটি থেকে আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব, আর তোমাদেরকে আবার বের করব।"

এই অর্থে কুরআন মাজীদে আরও অনেক আয়াত রয়েছে।
মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করে আবার তাতেই তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মূলতঃ আল্লাহ কিয়ামাতের দিন মানুষের পুনরুত্থানের বিষয়টি প্রমাণ করেছেন, যাতে করে মানবজাতি পুনরুত্থানের প্রতি ঈমান পোষণ করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি তাদের ঈমান যাতে বৃদ্ধি পায়। আর তারা যেন সেই মহান কিয়ামত দিবসের জন্য কাজ করে। আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে সেই মহান দিবসের জন্য কাজ করার তৌফিক দান করেন এবং সেই দিনে আমাদেরকে সৌভাগ্যের অধিকারী করেন।

১. হিসাব গ্রহণ এবং প্রতিফল প্রদান: অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ দুনিয়াতে যে সব কাজ করেছে, পুনরুত্থানের পর তার প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে এবং সে অনুযায়ী তাকে প্রতিদান দেওয়া হবে। কেউ সৎকর্ম করে থাকলে সে ভাল প্রতিদান লাভ করবে, আর মন্দ কাজ করে থাকলে মন্দ প্রতিদান পাবে。
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَا يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًا يره
“অতএব কেউ অণু পরিমাণও সৎ কাজ করলে সে তা দেখবে, ৮. আর কেউ অণু পরিমাণও অসৎ কাজ করলে সেও তা দেখবে। "

তিনি আরো ইরশাদ করেন:
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيمَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٍ شَيْئًا وَإِنْ كَانَنَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنَ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حسِينَ
“আর কিয়ামাত দিবসে আমি সুবিচারের মানদন্ড স্থাপন করব, অতঃপর কারো প্রতি এতটুকুও অন্যায় করা হবে না। (কর্ম) সরিষার দানা পরিমাণ হলেও তা আমি হাযির করব, হিসাব গ্রহণে আমিই যথেষ্ট।”

অন্য আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
مَنَ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا وَمَا جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
“যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে তার জন্য আছে দশ গুণ পুরস্কার, আর যে ব্যক্তি অসৎকাজ করবে তাকে শুধু কৃতকর্মের তুল্য প্রতিফল দেয়া হবে, তাদের উপর অত্যাচার করা হবে না।”

প্রতিটি নেক কাজের প্রতিদান দশ গুণ থেকে সাতশ গুণ এবং সাতশ গুণ থেকে বাড়িয়ে অনেক গুণ করে দেওয়াটা বান্দার প্রতি আল্লাহ্র বিশেষ করুণা, অনুগ্রহ ও দয়া। মানুষকে নেক কাজ করার তাউফিক দান করা যেমন আল্লাহ্ দয়া ও অনুগ্রহ, তেমনি নেক কাজের জন্য সেই কাজের চেয়ে অনেক গুণ বেশি প্রতিদান দেওয়াও বান্দার প্রতি আল্লাহ্র এক বিশেষ অনুগ্রহ। পক্ষান্তরে বান্দাকে তার মন্দ কাজের প্রতিফল দেওয়া হবে সেই খারাপ কাজের সমপরিমাণ, বেশি দেওয়া হবে না।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَمَا جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
“আর যে ব্যক্তি অসৎকাজ করবে তাকে শুধু কৃতকর্মের তুল্য প্রতিফল দেয়া হবে, তাদের উপর অত্যাচার করা হবে না।”

এটি হলো বান্দার প্রতি আল্লাহর পরিপূর্ণ দয়া, অনুগ্রহ এবং সদাচরণ। এরপর এ কথার প্রমাণ হিসেবে শায়খ যে আয়াতটি পেশ করেছেন তা হলো:
لِيَجْزِيَ الَّذِينَ أَسَاءُوا بِمَا عَمِلُوا
“যাতে তিনি যারা মন্দ কাজ করে তাদেরকে তাদের কাজের প্রতিফল দেন।”

এখানে একথা বলা হয়নি যে, মন্দ আমলকারীদেরকে সবচেয়ে খারাপ প্রতিফল দেওয়া হবে, যেমনটি বলা হয়েছে সৎ আমলকারীদের সম্পর্কে যে,
وَيَجْرِيَ الَّذِينَ أَحْسَنُوا بِالْحُسْنَى
'আর যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে দেন শুভ প্রতিফল।"

পুনরুত্থানকে যে অস্বীকার করলো, সে কুফর করলো。
আর দালীল আল্লাহ্র বাণী: “কাফিররা ধারণা করে যে, তাদেরকে কক্ষনো আমার জীবিত করে উঠানো হবে না। বল, নিশ্চয়ই (উঠানো) হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই আবার জীবিত করে উঠানো হবে, অতঃপর তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই জানিয়ে দেয়া হবে তোমরা (দুনিয়ায়) কী কাজ করেছ। এ কাজ (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।”

১. পুনরুত্থান অস্বীকারকারীর বিধান: যে ব্যক্তি মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের বিষয়টি অস্বীকার করবে সে কাফির। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَقَالُوا إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ قَالُوا بَلَى وَرَبُّنَا قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ
“তারা বলে, আমাদের দুনিয়ার জীবন ছাড়া আর কোন জীবন নেই, আমাদেরকে আবার (জীবিত করে) উঠানো হবে না। তুমি যদি দেখতে যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তিনি বলবেন, (তোমরা এখন যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ) তা কি সত্য নয়? তারা বলবে, আমাদের রব্বের কসম তা সত্য। তিনি বলবেন, তোমরা কুফরী করেছিলে তার জন্য এখন শাস্তি ভোগ কর।”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
وَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِلْمُكَذِّبِينَ الَّذِينَ يُكَذِّبُونَ بِيَوْمِ الدِّينِ وَمَا يُكَذِّبُ بِهِ إِلَّا كُلُّ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ أَيْتُنَا قَالَ أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ ثُمَّ إِنَّهُمُ لَصَالُوا الْجَحِيمِ ثُمَّ يُقَالُ هَذَا الَّذِي كُنتُم بِهِ تُكَذِّبُونَ
"সেদিন দুর্ভোগ হবে অস্বীকারকারীদের, যারা কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে। কেবল সীমালঙ্ঘনকারী, পাপাচারী ছাড়া কেউই তা অস্বীকার করে না। তার সামনে যখন আমার আয়াত পড়ে শোনানো হয়, তখন সে বলে, 'এ তো প্রাচীন কালের লোকেদের কাহিনী'। কক্ষনো না, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে জং ধরিয়ে দিয়েছে। কক্ষনো না, তারা সেদিন তাদের প্রতিপালক থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে। অতঃপর তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর বলা হবে 'এটাই তা যা তোমরা অস্বীকার করতে।"

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
بَلْ كَذَّبُوا بِالسَّاعَةِ وَاعْتَدْنَا لِمَن كَذَّبَ بِالسَّاعَةِ سَعِيرًا
"আসলে তারা কিয়ামাতকে অস্বীকার করে, আর যারা কিয়ামাতকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য আমি প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুন।"

মহান আল্লাহ্ আরো বলেন:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِأَيْتِ اللَّهِ وَلِقَابِهِ أُولَئِكَ يَبِسُوا مِن رَّحْمَتِي وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে আর তাঁর সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে, তারা আমার রহমাত থেকে নিরাশ হবে আর তাদের জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি।"

শায়খ এ বিষয়ে দালীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন:
زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلِ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ تُجْزَوْنَ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
"কাফিররা ধারণা করে যে, তাদেরকে কক্ষনো আবার জীবিত করে উঠানো হবে না। বল, নিশ্চয়ই (উঠানো) হবে, আমার প্রতিপালকের শপথা তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই আবার জীবিত করে উঠানো হবে, অতঃপর তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই জানিয়ে দেয়া হবে তোমরা (দুনিয়ায়) কী কাজ করেছ। এ কাজ (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।"

পুনরুত্থান অস্বীকারকারীর রদ: পুনরুত্থানকে যারা অস্বীকার করে, তাদের টনক নড়ার জন্য উপযুক্ত জবাব নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

প্রথমত: পুনরুত্থান এমন একটি বিষয় যা সকল আসমা'নী কিতাব ও শারীআতে উল্লিখিত হয়েছে, নাবী-রাসূলগণ থেকে ধারাবাহিক ও ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং তাদের জাতি ও সম্প্রদায় বিষয়টিকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে। তাহলে তোমরা কি করে এটাকে অস্বীকার করতে পারো? অথচ তোমরা কোন প্রাচীন দার্শনিক, আবিষ্কারক কিংবা চিন্তাবিদ থেকে বর্ণিত এমন সব বর্ণনাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকো যেগুলোর বর্ণনাসূত্র সত্যতা ও বাস্তবতার মাপকাঠিতে এতই নিম্নমানের যে, পুনরুত্থানের বর্ণনার ধারের কাছেও সেগুলো পৌঁছাতে পারবে না।

দ্বিতীয়ত: মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের বিষয়টি যে সম্ভব, মানবীয় বিবেক-বুদ্ধিও নানাভাবে এ কথার সাক্ষ্য দেয়। যেমন:

ক. কোন বিবেকবান মানুষ অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে সৃষ্টির বিষয়টি অস্বীকার করবে না। আর এটাও অস্বীকার করবে না যে, জগতের প্রতিটি বস্তুই অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব লাভ করেছে। অতএব যে মহান সত্ত্বা আমাদেরকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করলেন এবং শূন্য থেকে সৃষ্টি করলেন, নিঃসন্দেহে তিনি আমাদেরকে পুনরায় সেই প্রথম অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম। যেমন আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَهُوَ الَّذِي يَبْدَوُا الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ
"তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন, অতঃপর তার পুনরাবৃত্তি করবেন আর তা তার জন্য খুবই সহজ।'

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
كَمَا بَدَانَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَعِلِينَ
“যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে আবার সৃষ্টি করব। ওয়া‘দা আমি করেছি, তা আমি পূর্ণ করবই।”

খ. আসমানসমূহ ও যমীনের বিশালতা এবং এগুলোর অপূর্ব নির্মাণশৈলী দেখে কোন বিবেকবান মানুষ সৃষ্টিকর্মের এই মহত্ত্বকে অস্বীকার করতে পারবে না। কাজেই যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, নিশ্চয়ই তিনি মানুষ সৃষ্টি করতে এবং তাদেরকে পুনরায় প্রথম অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পুরোপুরি সক্ষম।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
لَخَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَكْبَرُ مِنْ خَلْقِ النَّاسِ
“অবশ্যই আসমান ও যমীনের সৃষ্টি মানুষ সৃষ্টির চেয়ে বড় (ব্যাপার)।”

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন:
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَمْ يَعْيَا بِخَلْقِهِنَّ بِقَدِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتَىٰ بَلَىٰ إِنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“তারা কি দেখে না যে, আল্লাহ্, যিনি আকাশ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন আর ওগুলোর সৃষ্টিতে তিনি ক্লান্ত হননি, তিনি মৃতদেরকে জীবন দিতে সক্ষম? নিঃসন্দেহে তিনি সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।”

তিনি আরো বলেন:
أَوَ لَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوتِ وَا لَارُ بِقَدِرٍ عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمُ ، بَلَى وَهُوَ الْخَلْقُ الْعَلِيمُ إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
"যিনি আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন তিনি কি সেই লোকদের অনুরূপ (আবার) সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হাঁ, অবশ্যই। তিনি মহা স্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। তাঁর কাজকর্ম কেবল এ রকম যে, যখন তিনি কোন কিছুর ইচ্ছে করেন তখন তাকে হুকুম করেন যে হয়ে যাও, আর অমনি তা হয়ে যায়।"

গ. প্রত্যেক চক্ষুষ্মান ব্যক্তিই দেখতে পাবে যে, যমীন কখনো অনুর্বর হয়ে যায় এবং গাছপালা ও তরুলতা মরে যায়। অতঃপর যখন এগুলোর উপর বৃষ্টি হয়, তখন যমীন আবার উর্বর হয়ে উঠে এবং মৃত সেসব গাছপালা ও তরুলতা নতুন জীবন ফিরে পায়। কাজেই যিনি মৃত ভূমিকে জীবন্ত করে তুলতে পারেন, নিশ্চয়ই তিনি মৃত মানুষদেরকে জীবিত করতে এবং তাদেরকে পুনরুত্থিত করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَمَا أَيْتِهِ أَنَّكَ تَرَى ا لارُ خَاشِعَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتُ وَرَبَتْ إِنَّ الَّذِي أَحْيَاهَا لَهُحْيِ الْمَوْتَى إِنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে হল এই যে, তুমি যমীনকে দেখ শুষ্ক অনুর্বর পড়ে আছে। অতঃপর আমি যখন তার উপর বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন তা সতেজ হয় ও বেড়ে যায়। যিনি এ মৃত যমীনকে জীবিত করেন, তিনি অবশ্যই মৃতদেরকে জীবিত করবেন। তিনি সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।"

তৃতীয়ত: মৃতকে জীবিত করার যেসব ঘটনা মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে জানিয়েছেন, সেসব ঘটনার বাস্তবতা এবং বাহ্যিক অবস্থা এ কথা প্রমাণ করে যে, পুনরুত্থানের বিষয়টি আল্লাহর পক্ষে খুবই সম্ভব। এ সম্পর্কিত ঘটনাবলির মাঝে ৫টি ঘটনা মহান আল্লাহ্ সূরা বাকারাতে উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে একটি ঘটনা হলো:
أَوْ كَانَ نَذِيْرٌ مَّرَّ عَلَىٰ قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَىٰ عُرُوشِهَا ۖ قَالَ أَنَّىٰ يُحْيِ هَٰذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا ۖ فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ ۚ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ ۖ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ ۖ قَالَ بَلْ لَّبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ ۖ فَانْظُرْ إِلَىٰ طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَتَّهْ ۖ وَانْظُرْ إِلَىٰ حِمَارِكَ ۖ وَلِنَجْعَلَنَّكَ آيَةً لِّلنَّاسِ ۖ وَانْظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا ۖ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ
"কিংবা এমন ব্যক্তির ঘটনা সম্পর্কে (তুমি কি চিন্তা করনি) যে এক নগর দিয়ে এমন অবস্থায় যাচ্ছিল যে তা উজাড় অবস্থায় ছিল। সে বলল, 'আল্লাহ এ নগরীকে এর মৃত্যুর পরে কীভাবে জীবিত করবেন?' তখন আল্লাহ তাকে একশ' বছর মৃত রাখলেন। তারপর তাকে জীবিত করে তুললেন ও জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি এ অবস্থায় কতকাল ছিলে?' সে বলল, 'একদিন ছিলাম কিংবা একদিন হতেও কম'। আল্লাহ বললেন, 'বরং তুমি একশ' বছর ছিলে, এক্ষণে তুমি তোমার খাদ্যের ও পানীয়ের দিকে লক্ষ্য কর, এটা পচে যায়নি। আর গাধাটার দিকে তাকিয়ে দেখ, আর এতে উদ্দেশ্য এই যে, আমি তোমাকে মানুষের জন্য উদাহরণ করব। আবার তুমি হাড়গুলোর দিকে লক্ষ্য কর, আমি কীভাবে ওগুলো জোড়া লাগিয়ে দেই, তারপর গোশত দ্বারা ঢেকে দেই। এরপর যখন তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল, তখন সে বলল, 'এখন আমি পূর্ণ বিশ্বাস করছি যে, আল্লাহই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।"

চতুর্থত: হিকমাহর দাবি হচ্ছে, মৃত্যুর পর প্রতিটি মানুষের পুনরুত্থান হোক যাতে করে তাদের প্রত্যেকে দুনিয়ায় যে যা করেছে তার প্রতিফল লাভ করতে পারে। যদি তা না হয় তাহলে তো মানুষ সৃষ্টির বিষয়টি হবে অনর্থক, মূল্যহীন এবং হিকমাহ্ বিহীন। তা না হলে এই জীবনে মানুষ ও পশুর মধ্যে আর কোন পার্থক্য থাকবে না। তাই মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمُ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ فَتَعَلَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
“তোমরা কি ভেবেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে তামাশার বস্তু হিসেবে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না? সুউচ্চ মহান আল্লাহ যিনি প্রকৃত মালিক, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, সম্মানিত আরশের অধিপতি।”

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
إِنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ أَكَادُ أَخْفِيهَا لِتُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَىٰ
“কিয়ামাহ তো অবশ্যম্ভাবী, আমি এটা গোপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেককে নিজ কাজ অনুযায়ী প্রতিদান দেয়া যায়।”

তিনি আরো বলেন:
وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَا يَبْعَثُ اللَّهُ مَن يَمُوتُ بَلَىٰ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ لِيُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي يَخْتَلِفُونَ فِيهِ وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّهُمْ كَانُوا كَاذِبِينَ إِنَّمَا قَوْلُنَا لِشَيْءٍ إِذَا أَرَدْنَاهُ أَنْ نَقُولَ لَهُ كُنُ فَيَكُونُ
“তারা আল্লাহর নামে শক্ত কসম খেয়ে বলে, ‘যার মৃত্যু ঘটে আল্লাহ তাকে পুনরায় জীবিত করবেন না।’ অবশ্যই করবেন, এটা তো একটা প্রতিশ্রুতি যা পূরণ করা তাঁর দায়িত্ব, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না (তাদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে) যারা এ ব্যাপারে মতভেদ করেছিল তাদের কাছে স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য, আর কাফিরগণ যাতে জানতে পারে যে, তারা ছিল মিথ্যেবাদী। কোন বিষয়ে আমি ইচ্ছে করলে বলি, ‘হয়ে যাও’, ফলে তা হয়ে যায়।”

অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেছেন:
زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلِ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثْنَ ثُمَّ لَتُنَبَّونَ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
“কাফিররা ধারণা করে যে, তাদেরকে কখনো আবার জীবিত করে উঠানো হবে না। বল, নিশ্চয়ই (উঠানো) হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমাদেরকে অবশ্যই অবশ্যই আবার জীবিত করে উঠানো হবে, অতঃপর তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই জানিয়ে দেয়া হবে তোমরা (দুনিয়ায়) কী কাজ করেছ। এ কাজ (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।”

এত সব সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ সত্ত্বেও যারা পুনরুত্থানের বিষয়টিকে অস্বীকার করে এর উপর অটল থাকে, নিঃসন্দেহে তারা অহংকারী ও জেদী। আর যালিমরা শীঘ্রই জানবে কোন ধরনের গন্তব্যস্থলে তারা ফিরে যাবে।

আর সকল রাসূলকে আল্লাহ্ সুসংবাদ দাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন।
আর দালীল আল্লাহ্ বাণী: 'রসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী যাতে রসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অযুহাতের সুযোগ না থাকে'। "

১. রাসূলগণ সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী: গ্রন্থকার [রহিমাহুল্লাহ] বলেছেন যে, সকল রাসূলকে আল্লাহ্ সুসংবাদ দাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ
"রসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী।”

যারা নাবী-রাসূলের আনুগত্য করে, তাঁরা তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। আর যারা তাঁদের বিরোধিতা করে, তাদেরকে তাঁরা জাহান্নামের ভয় দেখান।
মানবজাতির প্রতি নাবী-রাসূল প্রেরণ করার মাঝে মহান প্রজ্ঞা (হিকমাহ) নিহিত রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ হিকমাহ্ হলো মানবজাতির উপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করা। যাতে করে নাবী-রাসূল পাঠানোর পর আল্লাহ্র উপর মানুষের এ বিষয়ে আর কোন প্রমাণ না থাকে।
যেমন মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ
"যাতে রসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অযুহাতের সুযোগ না থাকে।”

এর মধ্যে আরো একটি মহান হিকমাহ হলো এই, এটা হচ্ছে বান্দার প্রতি আল্লাহ্ নিয়ামতের পূর্ণতা। কেননা সৃষ্টির বিবেক-বুদ্ধি যত বেশিই হোক না কেন, কেবল তা দ্বারা আল্লাহ্র একান্ত নিজের জন্য ওয়াজিবকৃত হক সম্পর্কে বিশদভাবে জানা মোটেও সম্ভবপর নয়। এমনিভাবে আল্লাহ্ যে সকল পরিপূর্ণ সিফাত বা গুণ রয়েছে এবং তাঁর যে সব সুমহান সুন্দর নাম রয়েছে, কেবল মানবীয় বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে সেগুলো সম্পর্কে ভালভাবে জানা আদৌ সম্ভবপর নয়। এ কারণেই আল্লাহ্ নাবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে। আর তিনি তাঁদের প্রতি পরম সত্য ও সঠিক বার্তা দিয়ে কিতাব নাযিল করেছেন, যাতে করে নাবী-রাসূলগণ মানুষের মধ্যে সঠিক ফায়সালা করে দিতে পারেন সে সব বিষয়ে, যাতে তারা মতবিরোধে লিপ্ত।

সর্বপ্রথম রাসূল নূহ থেকে শুরু করে সর্বশেষ নাবী ও রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত প্রত্যেক নাবী-রাসূল মানবজাতিকে যে সব বিষয়ের দাওয়াত দিয়েছেন তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হচ্ছে তাওহীদ। যেমন আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلُّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
"প্রত্যেক জাতির কাছে আমি রসূল পাঠিয়েছি (এ সংবাদ দিয়ে) যে, আল্লাহর ইবাদাত কর আর তাগুতকে বর্জন কর।"

অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنَ قَبْلِكِ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيَ إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
"আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রসূলই পাঠাইনি যার প্রতি আমি ওয়াহয়ী করিনি যে, আমি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই। কাজেই তোমরা আমারই ইবাদাত কর।"

টিকাঃ
463 সূরা আয-যুমার ৩৯: ৩০-৩১
464 সূরা তা-হা ২০: ৫৫
465 সূরা নূহ ৭১: ১৭-১৮
466 সূরা আল-মুয্যাম্মিল ৭৩: ১৭-১৮
467 সূরা তাহা ২০ : ৫৫
468 সূরা আন-নাজম ৫৩ : ৩১
469 সূরা আয-যিলযাল ৯৯ : ৭-৮
470 'সূরা আল-আমবিয়া' ২১ : ৪৭
471 সূরা আল-আনআম ৬ : ১৬০
472 সূরা আল-আনআম ৬: ১৬০
473 সূরা আন-নাজম ৫৩: ৩১
474 সূরা আন-নাজম ৫৩: ৩১
475 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৭
476 সূরা আল-আনআম ৬: ২৯-৩০
477 সূরা আল-মুতফিফীন ৮৩: ১০-১৭
478 সূরা আল-ফুরকান ২৫: ১১
479 সূরা আল-আনকাবূত ২৯ : ২৩
480 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪: ৭
481 সূরা আর-রুম ৩০: ২৭
482 সূরা আল-আম্বিয়া ২১ : ১০৪
483 সূরা গাফির (মুমিন) ৪০ : ৫৭
484 সূরা আল-আহকাফ ৪৬ : ৩৩
485 সূরা ইয়াসীন ৩৬: ৮১-৮২
486 সূরা ফুসিলাত ৪১ : ৩৯
487 সূরা আল-বাকারাহ ২ : ২৫৯
488 সূরা মুমিনূন ২৩: ১১৫-১১৬
489 সূরা তাহা ২০: ১৫
490 সূরা আন-নাহল ১৬: ৩৮-৪০
491 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪: ৭
492 সূরা আন-নিসা' ৪: ১৬৫
493 সূরা আন-নিসা' ৪: ১৬৫
494 সূরা আন-নাহল ১৬: ৩৬
495 সূরা আল-আমবিয়া ২১: ২৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00