📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 তাক্বদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল

📄 তাক্বদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল


আর তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান'।

আর এ ছয়টি রুকনের দালীল মহান আল্লাহর বাণীঃ “তোমরা নিজেদের মুখ পূর্ব দিকে কর কিংবা পশ্চিম দিকে এতে কোন কল্যাণ নেই বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোন ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নাবীগণের প্রতি।”

আর তাকদীরের দালীল হলো আল্লাহর বাণীঃ “আমি সব কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।”

তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান
১। তাকদীরের মর্মার্থঃ মহান আল্লাহ্ তাঁর সুমহান জ্ঞান এবং পরম প্রজ্ঞানুযায়ী সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য যা কিছু পূর্ব নির্ধারণ করে রেখেছেন, সেটাই হলো জগতের প্রতিটি জিনিসের কদ্র বা তাকদীর।

কদ্রের প্রতি ঈমানের মাঝে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্তঃ
ক। এই ঈমান পোষণ করা যে, মহান আল্লাহ্ চিরকাল ধরে প্রতিটি বিষয়ের আদি-অন্ত সামষ্টিকভাবে এবং বিশদভাবে অবগত, হোক সেটা আল্লাহর কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় কিংবা বান্দার কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়।

খ। এই ঈমান পোষণ করা যে, প্রতিটি জিনিসের জন্য আল্লাহ্ তাঁর অসীম জ্ঞান ও হিকমাহ্ অনুযায়ী যা কিছু নির্ধারণ করেছেন, তা তিনি লাওহে মাহফুযে (সংরক্ষিত ফলকে) লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এই দু'টি বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ
أَلَمْ تَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضُ إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
“তুমি কি জান না যে, আল্লাহ জানেন যা আছে আকাশে আর পৃথিবীতে, এ সবই লিপিতে (রেকর্ডে) আছে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”

সাহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ্ বিন আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, তিনি রাসূল (ﷺ) কে বলতে শুনেছেনঃ
كَتَبَ اللهُ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ
'মহান আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তাকদীর লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন'।

গ. এই ঈমান পোষণ করা যে, সমগ্র সৃষ্টিজগতের কোন কিছুই আল্লাহ্র ইচ্ছা বা অনুমতি ব্যতীত হয় না। হোক তা আল্লাহ্র কর্ম সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় কিংবা বান্দার কর্ম সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়। আল্লাহ্র কর্ম সংশ্লিষ্ট কোন কিছু যে তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত হয় না, এ কথার প্রমাণ স্বরূপ আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَيَخْتَارُ
“আর আপনার রব্ব যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন।”

তিনি আরো ইরশাদ করেন:
وَيَفْعَلُ اللهُ مَا يَشَاءُ
"আর আল্লাহ্ যা ইচ্ছা তাই করেন।”

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন:
هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ
“তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন।”

বান্দার কর্ম সংশ্লিষ্ট কোন কিছুও যে আল্লাহ্র ইচ্ছা ব্যতীত হয় না, এর প্রমাণ স্বরূপ আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَسَلَّطَهُمْ عَلَيْكُمْ فَلَقْتَلُوكُمُ
“আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন তবে তাদেরকে তোমাদের উপর ক্ষমতা দিতেন, ফলে তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করত।”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেনঃ
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ
“আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন তবে তারা তা করতে পারত না, কাজেই তাদেরকে ছেড়ে দাও, তারা তাদের মিথ্যে নিয়ে মগ্ন থাকুক।”

ঘ. এই ঈমান পোষণ করা যে, সমগ্র সৃষ্টিজগতের সকল কিছু তাদের স্বীয় সত্ত্বা, বৈশিষ্ট্য ও আমলসহ মহান আল্লাহ্রই সৃষ্টি।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ
اللهُ خَالِقٍ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ
“আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।”

তিনি আরো ইরশাদ করেনঃ
وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا
“তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ পরিমাণে।”

আল্লাহ্ নাবী ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে তিনি ইরশাদ করেছেন যে, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেনঃ
وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ
"অথচ আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরি কর তাও।"

তাকদীরের প্রতি ঈমানের যে বিবরণ আমরা পেশ করলাম, তা মানুষের ঐচ্ছিক কাজের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব ইচ্ছা ও কর্মশক্তির স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে না। বরং ইসলামী শারীআত এবং বাস্তবতা দ্বারা একথা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত যে, কর্মক্ষেত্রে মানুষের ইচ্ছা ও সামর্থ্যের স্বাধীনতা রয়েছে।

শারঈ দালীল: মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
ذلِكَ الْيَوْمُ الْحَقِّ ، فَمَن شَاءَ اتَّخَذَ إِلَى رَبِّهِ مَابَا
“এই দিনটি (কিয়ামাতের দিন) সত্য। অতএব যার ইচ্ছা সে তার রব্বে নিকট আশ্রয় গ্রহণ করুক'।

তিনি আরো বলেন:
نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ
“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যে প্রকারে ইচ্ছে গমন কর।"

আর কর্মশক্তির স্বাধীনতা সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا
"কাজেই তোমরা আল্লাহকে তোমাদের সাধ্যমত ভয় কর, তোমরা (তাঁর বাণী) শুন, তোমরা (তাঁর) আনুগত্য কর।"

তিনি আরো বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكتسبت
“আল্লাহ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু আরোপ করেন না, সে ভাল যা করেছে সে তার সওয়াব পাবে এবং স্বীয় মন্দ কৃতকর্মের জন্য সে নিজেই নিগ্রহ ভোগ করবে।”

বাস্তবভিত্তিক দালীল: প্রত্যেক মানুষই এ কথা জানে যে, তার নিজস্ব ইচ্ছা ও কর্মশক্তি রয়েছে, যা দ্বারা সে কোন কাজ সম্পাদন করতে কিংবা কোন কাজ বর্জন করতে পারে। প্রতিটি মানুষ তার ইচ্ছায় কী সংঘটিত হচ্ছে (যেমন: একা হাঁটা) এবং তার ইচ্ছা ব্যতীত কী সংঘটিত হচ্ছে (যেমন: ভয়ে কম্পিত হওয়া) এই দু'য়ের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। তবে বান্দার ইচ্ছা ও কর্মশক্তি আল্লাহ্র ইচ্ছা বা অনুমতির মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
لِمَن شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللهُ رَبُّ الْعَلَمِينَ
“যে তোমাদের মধ্যে সরল সঠিক পথে চলতে চায়। তোমরা ইচ্ছে কর না যদি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছে না করেন।”

তাছাড়া যেহেতু সমগ্র সৃষ্টিজগতের মালিকানা আল্লাহ্রই হাতে, সুতরাং তাঁর রাজত্বে তাঁর জ্ঞান ও ইচ্ছা বহির্ভূত কোন কিছু সংঘটিত হতে পারে না।

তাকদীরের প্রতি ঈমানের যে বিবরণ আমরা পেশ করলাম, এর মাধ্যমে কোন ওয়াজিব কাজ পরিত্যাগ করা কিংবা কোন পাপ কাজ করার জন্য কেউ তাকদীরকে দালীল হিসেবে নিতে পারে না এবং একে দায়ী করতে পারে না। এ ধরনের কাজের জন্য তাকদীরকে দায়ী করা যে সম্পূর্ণরূপে বাতিল একটি বিষয়, তার অনেক প্রমাণ রয়েছে। যেমন:

প্রথম দালীল: মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَيْءٍ كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِنَ قَبْلِهِمْ حَتَّى دَاقُوا بَأْسَنَاء قُلْ هَلْ عِنْدَكُمْ مِّنَ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ
“যারা শিরক করেছে তারা বলবে, আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে আমরা শিরক্ করতাম না, আর আমাদের পিতৃপুরুষরাও করত না, আর কোন কিছুই (আমাদের উপর) হারাম করে নিতাম না, এভাবে তাদের আগের লোকেরাও সত্যকে মিথ্যে গণ্য করেছিল, অবশেষে তারা আমার শাস্তি আস্বাদন করেছিল। বল, তোমাদের কাছে কি প্রকৃত জ্ঞান আছে, থাকলে তা আমাদের কাছে পেশ কর, তোমরা তো কেবল ধারণা-অনুমানের অনুসরণ করে চলেছ, তোমরা তো মিথ্যাচারই করে যাচ্ছ।”

কাজেই তাদের কৃতকর্মের জন্য যদি তাকদীর-ই দায়ী হতো, তাহলে তাদের এই অপকর্মের জন্য আল্লাহ্ তাদেরকে শাস্তি আস্বাদন করাতেন না।

দ্বিতীয় দালীল: মহান আল্লাহ্ বলেন:
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
“রসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী যাতে রসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অযুহাতের সুযোগ না থাকে। আল্লাহ হলেন মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।”

আর তাকদীর যদি বিরোধিতাকারীদের জন্য দালীল হতো (মানুষের কৃতকর্মের জন্য যদি তাকদীর-ই দায়ী হতো), তাহলে তাঁদেরকে পাঠানো সত্ত্বেও তাদের বিরোধিতাকারীদের মন্দকর্ম দূর করা যেতো না। কারণ নাবী-রাসূল পাঠানোর পরেও বিরোধিতাকারীদের মন্দকর্ম তো আল্লাহ্ তাকদীর অনুযায়ীই হতো।

তৃতীয় দালীল: সাহীহ বুখারী ও মুসলিমে যে হাদীস্বটি আলী ইবনু আবী তালিব () থেকে বর্ণিত, যার মধ্যে বুখারী বর্ণিত হাদীস্বটি নিম্নরূপঃ
عَنْ عَلى قَالَ كُنَّا جُلُوسًا مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَمَعَهُ عُودُ يَنكُتُ في الأَرْضِ وَقَالَ مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا قَدْ كُتِبَ مَقْعَدُهُ مِنَ النَّارِ أَوْ مِنَ الْجَنَّةِ فَقَالَ رَجُলٌ مِنْ الْقَوْمِ أَلَا تَتَّكِلُ يَا رَسُولَ الله صلى الله عليه وسلم قَালَ لَا اعْمَلُوا فَكُلُّ مُيَسَّرُ ثُمَّ قَرَأَ فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى الْآيَةَ
আলী ( ) বলেন, একবার আমরা নাবী (র) এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তাঁর সঙ্গে ছিল একটুকরা খড়ি, যা দিয়ে তিনি মাটির উপর দাগ টানছিলেন। তিনি তখন বললেন: তোমাদের মাঝে এমন কোন লোক নেই যার ঠিকানা জাহান্নামে বা জান্নাতে লেখা হয়নি। লোকদের ভিতর থেকে এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা কি তাহলে (এর উপর) নির্ভর করব না? তিনি বললেন: না, তোমরা আমল কর। কেননা, প্রত্যেকের জন্য আমল সহজ করে দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন: ... فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَأَتَّقَى অতএব যে দান করে এবং আল্লাহ্‌ ভীরু হয় এবং যা উত্তম তা সত্য বলে গ্রহণ করে, অচিরেই আমি তার জন্য সুগম করে দেব (জান্নাতের) সহজ পথ।
আর সাহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসের ভাষ্য হচ্ছে:
كُلِّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ
'প্রত্যেক ব্যক্তিকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেই কাজকে সহজ করে দেওয়া হবে'।

কাজেই এসব হাদীস থেকে দেখা যায় যে, রাসূল ( ) মানুষকে আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকদীরের উপর নির্ভর করে থাকতে নিষেধ করেছেন।

চতুর্থ দালীল: মহান আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদেরকে বিভিন্ন কাজের আদেশ ও নিষেধ করেছেন। তিনি তাদেরকে কেবল সেসব কাজেরই নির্দেশ দিয়েছেন যেসব কাজের সামর্থ্য বান্দা রাখে (তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কোন কিছু করার নির্দেশ তিনি দেন নি)।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمُ
"কাজেই তোমরা আল্লাহকে তোমাদের সাধ্যমত ভয় কর।"

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু আরোপ করেন না।"

কোন বান্দা যদি এমন সব কাজ করতে বাধ্য হতো যা তার সাধ্যের বাইরে, সে ক্ষেত্রে তার উপর এমন এক কাজের বাধ্যবাধকতা চেপে বসত যার থেকে তার মুক্তিলাভের কোন উপায় নেই (অসাধ্য সম্পাদন তার জন্য বাধ্যতামূলক হতো), আর এ ব্যাপারটি একেবারেই বাতিল! এ কারণে কেউ যদি অজ্ঞতা, ভুলে যাওয়া কিংবা জোর-জবরদস্তির কারণে বাধ্য হয়ে কোন পাপ কাজ করে ফেলে, তাহলে এতে তার গুনাহ হয় না। কেননা এসব ক্ষেত্রে তার ওযর ছিল।

পঞ্চম দালীল: মহান আল্লাহ্র পূর্বনির্ধারণ বা তাকদীর হচ্ছে অত্যন্ত গোপনীয় একটি বিষয়। কোন ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর কেবল জানা যায় তাকদীরে এটা এভাবেই ছিল। কোন বান্দা কোন কাজ করার পূর্বে সেই কাজের ইচ্ছা পোষণ করে থাকে। কাজেই আল্লাহ্ তাকদীরে কী আছে, তা না জেনেই সে কাজ করার ইচ্ছা করে থাকে। সুতরাং তাকদীর সম্পর্কে না জেনে যে কাজ করা হয়, সেই কাজের জন্য তাকদীরকে কোন ভাবেই দায়ী করা যায় না। কেননা মানুষ যে বিষয় জানে না, সে বিষয়টি তার জন্য দালীল হতে পারে না।

ষষ্ঠ দালীল: সাধারণত আমরা দেখি, মানুষ তার নিজের জন্য উপযুক্ত কোন দুনিয়াবী বস্তু লাভের জন্য খুব আগ্রহী হয়ে থাকে এবং সে কখনো নিজের জন্য অনুপযুক্ত কোন বস্তু লাভের প্রতি আগ্রহ পোষণ করে না এবং এই কাজের জন্য তার তাকদীরকেও দায়ী করে না। তাহলে ধর্মীয় ক্ষেত্রে নিজের জন্য লাভজনক বিষয়কে উপেক্ষা করে কেন সে ক্ষতিকর কোন বিষয়কে গ্রহণ করবে এবং এরপর তার তাকদীরকে এজন্য দায়ী করবে এবং দালীল হিসেবে উপস্থাপন করবে? এই দু'টি বিষয় কি একই নয়? (অর্থাৎ দুনিয়াবী ক্ষেত্রে মানুষ চায় নিজের জন্য প্রিয় ও পছন্দনীয় কোন জিনিস, এজন্য সে তাকদীরকে দায়ী করে না। অথচ ধর্মীয় ক্ষেত্রে হারাম কাজের মাধ্যমে নিজের পরিণতি খারাপ করে কিভাবে সে তাকদীরকে দায়ী হতে পারে?)

বিষয়টিকে আরেকটু স্পষ্ট করার জন্য আমরা একটি উদাহরণ পেশ করছি: ধরুন, একজন লোকের সামনে দু'টি রাস্তা আছে। একটি রাস্তা তাকে নিয়ে যাবে এমন এক শহরে, যেখানে পুরোদমে চলছে দাঙ্গা-বিশৃঙ্খলা, হত্যা, অপহরণ, লুটতরাজ, জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, ভীতি, শঙ্কা আর দুর্ভিক্ষ। পক্ষান্তরে অপর রাস্তাটি তাকে নিয়ে যাবে এমন এক শহরে, যেখানে রয়েছে পরিপূর্ণ सुশৃঙ্খল পরিবেশ, স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা, সুখ-সমৃদ্ধি, জীবন ও সম্পদের মূল্যায়ন ইত্যাদি। এমতাবস্থায় লোকটি কোন পথে যাবে? নিশ্চয়ই সে দ্বিতীয় ঐ পথটি বেছে নিবে যে পথটি তাকে সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ শহরে নিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে কোন সাধারণ বিবেকবান মানুষ দ্বারা এটা কখনো সম্ভব হবে না যে, সে ঐ প্রথম রাস্তাটি অবলম্বন করবে যেটি তাকে নিয়ে যাবে এক বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ও আতঙ্কের শহরে, আর এজন্য সে তাকদীরকে দায়ী করবে। তাহলে কেন পরকালের ক্ষেত্রে সে জান্নাতের পথ ছেড়ে জাহান্নামের পথ বেছে নিবে এবং এজন্য সে তাকদীরকে দায়ী করবে?

আরো একটি উদাহরণ: আমরা সাধারণত দেখি, কোন রোগীকে যখন ঔষধ সেবন করতে বলা হয়, তখন তার মন না চাইলেও সে ঔষধ সেবন করে থাকে। এমনিভাবে যখন কোন রোগীকে বিভিন্ন খাদ্য খেতে নিষেধ করা হয় যেগুলো তার জন্য ক্ষতিকর, তখন তার মন না চাইলেও সেসব খাদ্যবস্তু সে পরিহার করে চলে। রোগী তার রোগ থেকে মুক্তি পেতে এবং সুস্থ অবস্থায় ফিরে যেতে এসব করে থাকে। সাধারণভাবে এটা অসম্ভব যে, রোগী তার ঔষধ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে এবং তার জন্য ক্ষতিকর যে সব খাদ্যবস্তু রয়েছে সেগুলো খাবে আর এজন্য সে নিজের তাকদীরকে দায়ী করবে। তাহলে মানুষ কেন আল্লাহ্ এবং রাসূল (স) যা আদেশ করেছেন তা বর্জন করবে এবং তাঁরা যা করতে নিষেধ করেছেন তা সম্পাদন করবে, আর এজন্য সে তাকদীরকে দায়ী করবে?!

সপ্তম দালীল: তাকদীরের উপর দায় চাপানো ব্যক্তিটি দ্বীনের ওয়াজিব কাজগুলো বর্জন করে কিংবা পাপের কাজগুলো সম্পাদন করে থাকে। এখন যদি তার উপর অন্য কোন লোক অত্যাচার করে তার অর্থ-সম্পদ কেড়ে নেয় অথবা তার হক নষ্ট করে এবং এরপর সেই লোকটি যদি তাকদীরের দোহাই দিয়ে তাকে বলে, 'আপনি আমাকে দোষারোপ করবেন না, কারণ আমার দ্বারা কৃত এই অত্যাচার ছিল মহান আল্লাহ্ কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত', সেক্ষেত্রে তার এ দলিল অবশ্যই গৃহীত হবে না।
সুতরাং যেখানে কোন মানুষের উপর কেউ যুলম-অত্যাচার করলে কিংবা তার হক নষ্ট করলে সে এক্ষেত্রে তাকদীরকে দায়ী করে না, সেখানে সে নিজে যখন আল্লাহ্র হক নষ্ট করে তখন কি করে সে তাকদীরকে দায়ী করতে পারে?! বর্ণিত আছে যে, একবার আমীরুল মুমিনীন উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর কাছে চুরির দায়ে হাত কাটার শাস্তিযোগ্য একজন আসামীকে হাযির করা হলে তিনি তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। তখন লোকটি বলল, একটু অপেক্ষা করুন হে আমীরুল মুমিনীন! আমি যে চুরি করেছি সেটা তো আল্লাহ্ নির্ধারিত তাকদীর অনুযায়ীই করেছি। উমার (রাঃ) বললেন, আমরা যে তোমার হাত কাটতে যাচ্ছি সেটাও আল্লাহ্ নির্ধারিত তাকদীর।

তাকদীরের প্রতি ঈমানের ফলাফল: তাকদীরের প্রতি ঈমান অতীব সুন্দর ফলপ্রসু। আর তা হল:

১. কোন কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপকরণ বা মাধ্যম অবলম্বন করে মহান আল্লাহর উপর ভরসা ও নির্ভরতা রাখা। কাজেই কোন ব্যক্তি কেবল উপকরণ বা মাধ্যমের উপরই নির্ভর করবে না, আল্লাহ্র উপরও ভরসা রাখবে। কারণ আল্লাহ্ যার জন্য যতটুকু নির্ধারণ করে রেখেছেন সে ততটুকুই অর্জন করতে পারবে।

২. কোন ব্যক্তি যখন তার কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হাসিল করবে, তখন সে নিজের সক্ষমতার ব্যাপারে বিস্মিত হবে না, বরং সে এটাকে তার প্রতি আল্লাহ্র নিয়ামত হিসেবে মনে করবে। এটা হচ্ছে তার জন্য মহান আল্লাহ্ নির্ধারিত কল্যাণ ও সফলতা লাভের উপকরণ বা মাধ্যম। পক্ষান্তরে সে যদি নিজের ব্যাপারে বিস্ময় বোধ করে, তাহলে সে আল্লাহ্র এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে ভুলে যাবে।

৩. মহান আল্লাহ্ যা কিছুই নির্ধারণ করেন না কেন, তাকদীরে ঈমান পোষণকারী ব্যক্তি অন্তরে প্রশান্তি ও স্বস্তি অনুভব করে। যদি তার কোন প্রিয় বস্তু তার থেকে হারিয়ে যায় অথবা তার সাথে খারাপ কিছু ঘটে তবুও তাতে সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় না এবং অস্থিরতা বোধ করে না। কারণ (সে বিশ্বাস করে) এসব কিছুই আসমান ও যমীনের মালিক আল্লাহ্ কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত ফায়সালা। আর বিষয়টি এমন যে, যা হবার তা অবশ্যই সংঘটিত হবে, কোনভাবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَاهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ لِكَيْلَا تَأْسَوا عَلَىٰ مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
“যমীনে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয়ই আসে, তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আমি তা একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রেখেছি নিশ্চয়ই আল্লাহর পক্ষে এটা খুব সহজ। এটা এ জন্যে যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা দুঃখিত ও বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য তোমরা আনন্দিত না হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”

এ বিষয়ে রাসূল (ﷺ) বলেছেন:
عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَٰلِكَ لأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
'মু'মিনের ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি কাজে তার জন্য মঙ্গল রয়েছে। এটা মু'মিন ব্যতীত অন্য কারো জন্য নয়। সুতরাং তার সুখ এলে সে আল্লাহ্ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ফলে এটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ পৌঁছলে সে ধৈর্য ধারণ করে। ফলে এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়'।

তাকদীর অস্বীকারকারী সম্প্রদায়: তাকদীর বিষয়ে ২টি পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় রয়েছেঃ
ক. জাবিয়্যাহ: তাদের কথা হলো, কোন বান্দা তার কাজের ব্যাপারে বাধ্য। কর্মক্ষেত্রে তার নিজস্ব কোন ইচ্ছা কিংবা শক্তি-সামর্থ্য নেই।
খ. কাদারিয়‍্যাহ: তাদের কথা হলো, কোন বান্দা তার কাজের ক্ষেত্রে ইচ্ছা ও শক্তি-সামর্থ্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বনির্ভর। তার কাজে আল্লাহ্র ইচ্ছা ও শক্তি-সামর্থ্যের কোন প্রভাব নেই।

জারিয়্যাহ সম্প্রদায়ের রদ: শারঈ ও ওয়াকেয়ী (বাস্তব ভিত্তিক) দালীলের মাধ্যমে প্রথম (জারিয়‍্যাহ) সম্প্রদায়ের দাবীর রদ নিম্নরূপ:
শারঈ দালীল: এটা নিশ্চিত যে, মহান আল্লাহ্ বান্দার জন্য ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং আমলকে তিনি বান্দার দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:
مِنْكُمْ مَّا يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنْكُمْ مَّا يُرِيدُ الْآخِرَةَ
“তোমাদের কিছু সংখ্যক দুনিয়া চাচ্ছিলো এবং কিছু সংখ্যক চাচ্ছিলো আখিরাত।"

অন্য আয়াতে তিনি বলেন:
وَقُلِ الْحَقُّ مِن رَّبِّكُمْ فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِنَ وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرُ إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّلِمِينَ نَارًا أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا
“আরে বলে দাও, 'সত্য এসেছে তোমাদের রবেবর নিকট হতে, কাজেই যার ইচ্ছে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছে সত্যকে অস্বীকার করুক।' আমি (অস্বীকারকারী) যালিমদের জন্য আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি যার লেলিহান শিখা তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে।"

তিনি আরো বলেন:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَا أَسَاءَ فَعَلَيْهَا وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ
'যে সৎকাজ করবে নিজের কল্যাণেই করবে। যে অসৎ কাজ করবে তার পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হবে। তোমার প্রতিপালক বান্দাদের প্রতি যালিম নন।"

ওয়াকেয়ী দালীল: নিশ্চয়ই প্রতিটি মানুষ তার ইচ্ছা নির্ভর কাজ (যেমন: খাওয়া, পান করা, বেচা-কেনা ইত্যাদি) এবং ইচ্ছা বহির্ভূত কাজ (যেমন: জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থরথর করে কাঁপা, ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাওয়া ইত্যাদি) এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে জানে। প্রথমোক্ত কাজগুলো সে তার নিজের ইচ্ছা ও পছন্দ অনুযায়ী করেছে, সে বাধ্য হয়ে এই কাজগুলো করছে না। আর দ্বিতীয় প্রকারের কাজগুলো যা তার সাথে ঘটেছে, সেগুলো না সে নিজে পছন্দ করেছে, না সে সেগুলো চেয়েছে।

কাদারিয়‍্যাহ সম্প্রদায়ের রদ: শারঈ ও আকলী (বুদ্ধিবৃত্তিক) দালীলের মাধ্যমে দ্বিতীয় (কাদারিয়্যাহ) সম্প্রদায়ের দাবীর রদ নিম্নরূপ:
শারঈ দালীল: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি জিনিস আল্লাহ্র ইচ্ছাতেই অস্তিত্ব লাভ করে থাকে। আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে একথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বান্দার কর্ম আল্লাহ্র ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়ে থাকে।
আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ شَاءَ اللهُ مَا اقْتَتَلَ الَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَتُ وَلَكِنِ اخْتَلَفُوا فَمِنْهُم مَّا أَمَنَ وَمِنْهُمْ مَّا كَفَرَ وَلَوْ شَاءَ اللهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ
"এবং আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন, তাহলে তাদের পরবর্তীরা তাদের নিকট সুস্পষ্ট দলীল পৌঁছার পর পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহ করত না, কিন্তু তারা পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করল, তাদের কেউ কেউ ঈমান আনল এবং কেউ কেউ কুফরী করল, আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন, তাহলে তারা যুদ্ধবিগ্রহ করত না, কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন, তা-ই করে থাকেন।"

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ شِئْنَا لَأَتَيْنَا كُلَّ نَفْسٍ هُدَهَا وَلَكِنْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي لَا مُلَئَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
"আমি যদি ইচ্ছে করতাম তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎ পথে পরিচালিত করতাম। কিন্তু আমার (এ) কথা অবশ্যই সত্য প্রতিপন্ন হবেঃ আমি নিশ্চয়ই জাহান্নামকে জিন্ন ও মানুষ মিলিয়ে পূর্ণ করব।। "

আকলী দালীল: সমগ্র সৃষ্টিজগতের সব কিছুই মহান আল্লাহ্র মালিকানাধীন। এই জগতে বসবাসকারী মানুষও তাই আল্লাহ্ মালিকানাভুক্ত। আর মালিকানাধীন কারো পক্ষে তার মালিকের রাজত্বে তাঁর অনুমতি ও ইচ্ছা ব্যতীত কিছু করা আদৌ সম্ভবপর নয়।

টিকাঃ
391 সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৭৭
392 সূরা আল-কামার ৫৪: ৪৯
393 সূরা আল-হাজ্জ ২২ : ৭০
394 সাহীহ মুসলিম/হাঃ ২৬৫৩, মুসলিম হা/২৬৫৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ হা/৬৭; মিশকাত হা/৭৯।
395 সূরা আল-কাসাস ২৮ : ৬৮
396 সূরা ইবরাহীম ১৪ : ২৭
397 সূরা আলু ইমরান ৩ : ৬
398 সূরা আন্-নিসা' ৪ : ৯০
399 সূরা আনআম ৬ : ১৩৭
400 সূরা আয-যুমার ৩৯ : ৬২
401 সূরা আল-ফুরকান ২৫ : ২
402 সূরা আস-সাফফাত ৩৭: ৯৬
403 সূরা আন-নাবা' ৭৮: ৩৯
404 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২২৩
405 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪ : ১৬
406 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২৮৬
407 সূরা আত-তাকভীর ৮১: ২৮-২৯
408 সূরা আল-আনআম ৬: ১৪৮
409 সূরা আন-নিসা' ৪: ১৬৫
৪১০ সূরা আল-লাইল ৯২: ৫; সাহীহ বুখারী: হা/৬৬০৫
411 সাহীহ মুসলিম: হা/৬৬৩০, মুসলিম হা/২৬৪৭; আবু দাউদ হা/৪৬৪৯; তিরমিযী হা/২১৩৬; ইবনু মাজাহ হা/৭৮।
412 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪: ১৬
413 সূরা আল-بাকারাহ ২: ২৮৬
414 সূরা আল-হাদীদ ৫৭: ২২-২৩
415 সাহীহ মুসলিম: হা/৭৩৯০ (২৯৯৯); মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/৪৭৯; আহমাদ হা/১৮৯৩৪; সহীহ ইবনু হিব্বান হা/২৮৯৬; মিশকাত হা/৫২৯৭।
416 সূরা আলু ইমরান ৩: ১৫২
417 সূরা আল-কাহফ ১৮: ২৯
418 সূরা ফুসিলাত ৪১ : ৪৬
419 সূরা আল-বাকারাহ ২ : ২৫৩
420 সূরা আস-সাজদাহ ৩২: ১৩

আর তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান'।

আর এ ছয়টি রুকনের দালীল মহান আল্লাহর বাণীঃ “তোমরা নিজেদের মুখ পূর্ব দিকে কর কিংবা পশ্চিম দিকে এতে কোন কল্যাণ নেই বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোন ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নাবীগণের প্রতি।”

আর তাকদীরের দালীল হলো আল্লাহর বাণীঃ “আমি সব কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।”

তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান
১। তাকদীরের মর্মার্থঃ মহান আল্লাহ্ তাঁর সুমহান জ্ঞান এবং পরম প্রজ্ঞানুযায়ী সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য যা কিছু পূর্ব নির্ধারণ করে রেখেছেন, সেটাই হলো জগতের প্রতিটি জিনিসের কদ্র বা তাকদীর।

কদ্রের প্রতি ঈমানের মাঝে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্তঃ
ক। এই ঈমান পোষণ করা যে, মহান আল্লাহ্ চিরকাল ধরে প্রতিটি বিষয়ের আদি-অন্ত সামষ্টিকভাবে এবং বিশদভাবে অবগত, হোক সেটা আল্লাহর কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় কিংবা বান্দার কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়।

খ। এই ঈমান পোষণ করা যে, প্রতিটি জিনিসের জন্য আল্লাহ্ তাঁর অসীম জ্ঞান ও হিকমাহ্ অনুযায়ী যা কিছু নির্ধারণ করেছেন, তা তিনি লাওহে মাহফুযে (সংরক্ষিত ফলকে) লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এই দু'টি বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ
أَلَمْ تَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضُ إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
“তুমি কি জান না যে, আল্লাহ জানেন যা আছে আকাশে আর পৃথিবীতে, এ সবই লিপিতে (রেকর্ডে) আছে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”

সাহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ্ বিন আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, তিনি রাসূল (ﷺ) কে বলতে শুনেছেনঃ
كَتَبَ اللهُ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ
'মহান আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তাকদীর লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন'।

গ. এই ঈমান পোষণ করা যে, সমগ্র সৃষ্টিজগতের কোন কিছুই আল্লাহ্র ইচ্ছা বা অনুমতি ব্যতীত হয় না। হোক তা আল্লাহ্র কর্ম সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় কিংবা বান্দার কর্ম সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়। আল্লাহ্র কর্ম সংশ্লিষ্ট কোন কিছু যে তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত হয় না, এ কথার প্রমাণ স্বরূপ আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَيَخْتَارُ
“আর আপনার রব্ব যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন।”

তিনি আরো ইরশাদ করেন:
وَيَفْعَلُ اللهُ مَا يَشَاءُ
"আর আল্লাহ্ যা ইচ্ছা তাই করেন।”

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন:
هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ
“তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন।”

বান্দার কর্ম সংশ্লিষ্ট কোন কিছুও যে আল্লাহ্র ইচ্ছা ব্যতীত হয় না, এর প্রমাণ স্বরূপ আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَسَلَّطَهُمْ عَلَيْكُمْ فَلَقْتَلُوكُمُ
“আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন তবে তাদেরকে তোমাদের উপর ক্ষমতা দিতেন, ফলে তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করত।”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেনঃ
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ
“আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন তবে তারা তা করতে পারত না, কাজেই তাদেরকে ছেড়ে দাও, তারা তাদের মিথ্যে নিয়ে মগ্ন থাকুক।”

ঘ. এই ঈমান পোষণ করা যে, সমগ্র সৃষ্টিজগতের সকল কিছু তাদের স্বীয় সত্ত্বা, বৈশিষ্ট্য ও আমলসহ মহান আল্লাহ্রই সৃষ্টি।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ
اللهُ خَالِقٍ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ
“আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।”

তিনি আরো ইরশাদ করেনঃ
وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا
“তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ পরিমাণে।”

আল্লাহ্ নাবী ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে তিনি ইরশাদ করেছেন যে, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেনঃ
وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ
"অথচ আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরি কর তাও।"

তাকদীরের প্রতি ঈমানের যে বিবরণ আমরা পেশ করলাম, তা মানুষের ঐচ্ছিক কাজের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব ইচ্ছা ও কর্মশক্তির স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে না। বরং ইসলামী শারীআত এবং বাস্তবতা দ্বারা একথা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত যে, কর্মক্ষেত্রে মানুষের ইচ্ছা ও সামর্থ্যের স্বাধীনতা রয়েছে।

শারঈ দালীল: মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
ذلِكَ الْيَوْمُ الْحَقِّ ، فَمَن شَاءَ اتَّخَذَ إِلَى رَبِّهِ مَابَا
“এই দিনটি (কিয়ামাতের দিন) সত্য। অতএব যার ইচ্ছা সে তার রব্বে নিকট আশ্রয় গ্রহণ করুক'।

তিনি আরো বলেন:
نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ
“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যে প্রকারে ইচ্ছে গমন কর।"

আর কর্মশক্তির স্বাধীনতা সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا
"কাজেই তোমরা আল্লাহকে তোমাদের সাধ্যমত ভয় কর, তোমরা (তাঁর বাণী) শুন, তোমরা (তাঁর) আনুগত্য কর।"

তিনি আরো বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكتسبت
“আল্লাহ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু আরোপ করেন না, সে ভাল যা করেছে সে তার সওয়াব পাবে এবং স্বীয় মন্দ কৃতকর্মের জন্য সে নিজেই নিগ্রহ ভোগ করবে।”

বাস্তবভিত্তিক দালীল: প্রত্যেক মানুষই এ কথা জানে যে, তার নিজস্ব ইচ্ছা ও কর্মশক্তি রয়েছে, যা দ্বারা সে কোন কাজ সম্পাদন করতে কিংবা কোন কাজ বর্জন করতে পারে। প্রতিটি মানুষ তার ইচ্ছায় কী সংঘটিত হচ্ছে (যেমন: একা হাঁটা) এবং তার ইচ্ছা ব্যতীত কী সংঘটিত হচ্ছে (যেমন: ভয়ে কম্পিত হওয়া) এই দু'য়ের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। তবে বান্দার ইচ্ছা ও কর্মশক্তি আল্লাহ্র ইচ্ছা বা অনুমতির মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
لِمَن شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللهُ رَبُّ الْعَلَمِينَ
“যে তোমাদের মধ্যে সরল সঠিক পথে চলতে চায়। তোমরা ইচ্ছে কর না যদি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছে না করেন।”

তাছাড়া যেহেতু সমগ্র সৃষ্টিজগতের মালিকানা আল্লাহ্রই হাতে, সুতরাং তাঁর রাজত্বে তাঁর জ্ঞান ও ইচ্ছা বহির্ভূত কোন কিছু সংঘটিত হতে পারে না।

তাকদীরের প্রতি ঈমানের যে বিবরণ আমরা পেশ করলাম, এর মাধ্যমে কোন ওয়াজিব কাজ পরিত্যাগ করা কিংবা কোন পাপ কাজ করার জন্য কেউ তাকদীরকে দালীল হিসেবে নিতে পারে না এবং একে দায়ী করতে পারে না। এ ধরনের কাজের জন্য তাকদীরকে দায়ী করা যে সম্পূর্ণরূপে বাতিল একটি বিষয়, তার অনেক প্রমাণ রয়েছে। যেমন:

প্রথম দালীল: মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَيْءٍ كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِنَ قَبْلِهِمْ حَتَّى دَاقُوا بَأْسَنَاء قُلْ هَلْ عِنْدَكُمْ مِّنَ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ
“যারা শিরক করেছে তারা বলবে, আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে আমরা শিরক্ করতাম না, আর আমাদের পিতৃপুরুষরাও করত না, আর কোন কিছুই (আমাদের উপর) হারাম করে নিতাম না, এভাবে তাদের আগের লোকেরাও সত্যকে মিথ্যে গণ্য করেছিল, অবশেষে তারা আমার শাস্তি আস্বাদন করেছিল। বল, তোমাদের কাছে কি প্রকৃত জ্ঞান আছে, থাকলে তা আমাদের কাছে পেশ কর, তোমরা তো কেবল ধারণা-অনুমানের অনুসরণ করে চলেছ, তোমরা তো মিথ্যাচারই করে যাচ্ছ।”

কাজেই তাদের কৃতকর্মের জন্য যদি তাকদীর-ই দায়ী হতো, তাহলে তাদের এই অপকর্মের জন্য আল্লাহ্ তাদেরকে শাস্তি আস্বাদন করাতেন না।

দ্বিতীয় দালীল: মহান আল্লাহ্ বলেন:
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
“রসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী যাতে রসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অযুহাতের সুযোগ না থাকে। আল্লাহ হলেন মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।”

আর তাকদীর যদি বিরোধিতাকারীদের জন্য দালীল হতো (মানুষের কৃতকর্মের জন্য যদি তাকদীর-ই দায়ী হতো), তাহলে তাঁদেরকে পাঠানো সত্ত্বেও তাদের বিরোধিতাকারীদের মন্দকর্ম দূর করা যেতো না। কারণ নাবী-রাসূল পাঠানোর পরেও বিরোধিতাকারীদের মন্দকর্ম তো আল্লাহ্ তাকদীর অনুযায়ীই হতো।

তৃতীয় দালীল: সাহীহ বুখারী ও মুসলিমে যে হাদীস্বটি আলী ইবনু আবী তালিব () থেকে বর্ণিত, যার মধ্যে বুখারী বর্ণিত হাদীস্বটি নিম্নরূপঃ
عَنْ عَلى قَالَ كُنَّا جُلُوسًا مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَمَعَهُ عُودُ يَنكُتُ في الأَرْضِ وَقَالَ مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا قَدْ كُتِبَ مَقْعَدُهُ مِنَ النَّارِ أَوْ مِنَ الْجَنَّةِ فَقَالَ رَجُলٌ مِنْ الْقَوْمِ أَلَا تَتَّكِلُ يَا رَسُولَ الله صلى الله عليه وسلم قَালَ لَا اعْمَلُوا فَكُلُّ مُيَسَّرُ ثُمَّ قَرَأَ فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى الْآيَةَ
আলী ( ) বলেন, একবার আমরা নাবী (র) এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তাঁর সঙ্গে ছিল একটুকরা খড়ি, যা দিয়ে তিনি মাটির উপর দাগ টানছিলেন। তিনি তখন বললেন: তোমাদের মাঝে এমন কোন লোক নেই যার ঠিকানা জাহান্নামে বা জান্নাতে লেখা হয়নি। লোকদের ভিতর থেকে এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা কি তাহলে (এর উপর) নির্ভর করব না? তিনি বললেন: না, তোমরা আমল কর। কেননা, প্রত্যেকের জন্য আমল সহজ করে দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন: ... فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَأَتَّقَى অতএব যে দান করে এবং আল্লাহ্‌ ভীরু হয় এবং যা উত্তম তা সত্য বলে গ্রহণ করে, অচিরেই আমি তার জন্য সুগম করে দেব (জান্নাতের) সহজ পথ।
আর সাহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসের ভাষ্য হচ্ছে:
كُلِّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ
'প্রত্যেক ব্যক্তিকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেই কাজকে সহজ করে দেওয়া হবে'।

কাজেই এসব হাদীস থেকে দেখা যায় যে, রাসূল ( ) মানুষকে আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকদীরের উপর নির্ভর করে থাকতে নিষেধ করেছেন।

চতুর্থ দালীল: মহান আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদেরকে বিভিন্ন কাজের আদেশ ও নিষেধ করেছেন। তিনি তাদেরকে কেবল সেসব কাজেরই নির্দেশ দিয়েছেন যেসব কাজের সামর্থ্য বান্দা রাখে (তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কোন কিছু করার নির্দেশ তিনি দেন নি)।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمُ
"কাজেই তোমরা আল্লাহকে তোমাদের সাধ্যমত ভয় কর।"

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু আরোপ করেন না।"

কোন বান্দা যদি এমন সব কাজ করতে বাধ্য হতো যা তার সাধ্যের বাইরে, সে ক্ষেত্রে তার উপর এমন এক কাজের বাধ্যবাধকতা চেপে বসত যার থেকে তার মুক্তিলাভের কোন উপায় নেই (অসাধ্য সম্পাদন তার জন্য বাধ্যতামূলক হতো), আর এ ব্যাপারটি একেবারেই বাতিল! এ কারণে কেউ যদি অজ্ঞতা, ভুলে যাওয়া কিংবা জোর-জবরদস্তির কারণে বাধ্য হয়ে কোন পাপ কাজ করে ফেলে, তাহলে এতে তার গুনাহ হয় না। কেননা এসব ক্ষেত্রে তার ওযর ছিল।

পঞ্চম দালীল: মহান আল্লাহ্র পূর্বনির্ধারণ বা তাকদীর হচ্ছে অত্যন্ত গোপনীয় একটি বিষয়। কোন ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর কেবল জানা যায় তাকদীরে এটা এভাবেই ছিল। কোন বান্দা কোন কাজ করার পূর্বে সেই কাজের ইচ্ছা পোষণ করে থাকে। কাজেই আল্লাহ্ তাকদীরে কী আছে, তা না জেনেই সে কাজ করার ইচ্ছা করে থাকে। সুতরাং তাকদীর সম্পর্কে না জেনে যে কাজ করা হয়, সেই কাজের জন্য তাকদীরকে কোন ভাবেই দায়ী করা যায় না। কেননা মানুষ যে বিষয় জানে না, সে বিষয়টি তার জন্য দালীল হতে পারে না।

ষষ্ঠ দালীল: সাধারণত আমরা দেখি, মানুষ তার নিজের জন্য উপযুক্ত কোন দুনিয়াবী বস্তু লাভের জন্য খুব আগ্রহী হয়ে থাকে এবং সে কখনো নিজের জন্য অনুপযুক্ত কোন বস্তু লাভের প্রতি আগ্রহ পোষণ করে না এবং এই কাজের জন্য তার তাকদীরকেও দায়ী করে না। তাহলে ধর্মীয় ক্ষেত্রে নিজের জন্য লাভজনক বিষয়কে উপেক্ষা করে কেন সে ক্ষতিকর কোন বিষয়কে গ্রহণ করবে এবং এরপর তার তাকদীরকে এজন্য দায়ী করবে এবং দালীল হিসেবে উপস্থাপন করবে? এই দু'টি বিষয় কি একই নয়? (অর্থাৎ দুনিয়াবী ক্ষেত্রে মানুষ চায় নিজের জন্য প্রিয় ও পছন্দনীয় কোন জিনিস, এজন্য সে তাকদীরকে দায়ী করে না। অথচ ধর্মীয় ক্ষেত্রে হারাম কাজের মাধ্যমে নিজের পরিণতি খারাপ করে কিভাবে সে তাকদীরকে দায়ী হতে পারে?)

বিষয়টিকে আরেকটু স্পষ্ট করার জন্য আমরা একটি উদাহরণ পেশ করছি: ধরুন, একজন লোকের সামনে দু'টি রাস্তা আছে। একটি রাস্তা তাকে নিয়ে যাবে এমন এক শহরে, যেখানে পুরোদমে চলছে দাঙ্গা-বিশৃঙ্খলা, হত্যা, অপহরণ, লুটতরাজ, জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, ভীতি, শঙ্কা আর দুর্ভিক্ষ। পক্ষান্তরে অপর রাস্তাটি তাকে নিয়ে যাবে এমন এক শহরে, যেখানে রয়েছে পরিপূর্ণ সুশৃঙ্খল পরিবেশ, স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা, সুখ-সমৃদ্ধি, জীবন ও সম্পদের মূল্যায়ন ইত্যাদি। এমতাবস্থায় লোকটি কোন পথে যাবে? নিশ্চয়ই সে দ্বিতীয় ঐ পথটি বেছে নিবে যে পথটি তাকে সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ শহরে নিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে কোন সাধারণ বিবেকবান মানুষ দ্বারা এটা কখনো সম্ভব হবে না যে, সে ঐ প্রথম রাস্তাটি অবলম্বন করবে যেটি তাকে নিয়ে যাবে এক বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ও আতঙ্কের শহরে, আর এজন্য সে তাকদীরকে দায়ী করবে। তাহলে কেন পরকালের ক্ষেত্রে সে জান্নাতের পথ ছেড়ে জাহান্নামের পথ বেছে নিবে এবং এজন্য সে তাকদীরকে দায়ী করবে?

আরো একটি উদাহরণ: আমরা সাধারণত দেখি, কোন রোগীকে যখন ঔষধ সেবন করতে বলা হয়, তখন তার মন না চাইলেও সে ঔষধ সেবন করে থাকে। এমনিভাবে যখন কোন রোগীকে বিভিন্ন খাদ্য খেতে নিষেধ করা হয় যেগুলো তার জন্য ক্ষতিকর, তখন তার মন না চাইলেও সেসব খাদ্যবস্তু সে পরিহার করে চলে। রোগী তার রোগ থেকে মুক্তি পেতে এবং সুস্থ অবস্থায় ফিরে যেতে এসব করে থাকে। সাধারণভাবে এটা অসম্ভব যে, রোগী তার ঔষধ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে এবং তার জন্য ক্ষতিকর যে সব খাদ্যবস্তু রয়েছে সেগুলো খাবে আর এজন্য সে নিজের তাকদীরকে দায়ী করবে। তাহলে মানুষ কেন আল্লাহ্ এবং রাসূল (স) যা আদেশ করেছেন তা বর্জন করবে এবং তাঁরা যা করতে নিষেধ করেছেন তা সম্পাদন করবে, আর এজন্য সে তাকদীরকে দায়ী করবে?!

সপ্তম দালীল: তাকদীরের উপর দায় চাপানো ব্যক্তিটি দ্বীনের ওয়াজিব কাজগুলো বর্জন করে কিংবা পাপের কাজগুলো সম্পাদন করে থাকে। এখন যদি তার উপর অন্য কোন লোক অত্যাচার করে তার অর্থ-সম্পদ কেড়ে নেয় অথবা তার হক নষ্ট করে এবং এরপর সেই লোকটি যদি তাকদীরের দোহাই দিয়ে তাকে বলে, 'আপনি আমাকে দোষারোপ করবেন না, কারণ আমার দ্বারা কৃত এই অত্যাচার ছিল মহান আল্লাহ্ কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত', সেক্ষেত্রে তার এ দলিল অবশ্যই গৃহীত হবে না।
সুতরাং যেখানে কোন মানুষের উপর কেউ যুলম-অত্যাচার করলে কিংবা তার হক নষ্ট করলে সে এক্ষেত্রে তাকদীরকে দায়ী করে না, সেখানে সে নিজে যখন আল্লাহ্র হক নষ্ট করে তখন কি করে সে তাকদীরকে দায়ী করতে পারে?! বর্ণিত আছে যে, একবার আমীরুল মুমিনীন উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর কাছে চুরির দায়ে হাত কাটার শাস্তিযোগ্য একজন আসামীকে হাযির করা হলে তিনি তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। তখন লোকটি বলল, একটু অপেক্ষা করুন হে আমীরুল মুমিনীন! আমি যে চুরি করেছি সেটা তো আল্লাহ্ নির্ধারিত তাকদীর অনুযায়ীই করেছি। উমার (রাঃ) বললেন, আমরা যে তোমার হাত কাটতে যাচ্ছি সেটাও আল্লাহ্ নির্ধারিত তাকদীর।

তাকদীরের প্রতি ঈমানের ফলাফল: তাকদীরের প্রতি ঈমান অতীব সুন্দর ফলপ্রসু। আর তা হল:

১. কোন কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপকরণ বা মাধ্যম অবলম্বন করে মহান আল্লাহর উপর ভরসা ও নির্ভরতা রাখা। কাজেই কোন ব্যক্তি কেবল উপকরণ বা মাধ্যমের উপরই নির্ভর করবে না, আল্লাহ্র উপরও ভরসা রাখবে। কারণ আল্লাহ্ যার জন্য যতটুকু নির্ধারণ করে রেখেছেন সে ততটুকুই অর্জন করতে পারবে।

২. কোন ব্যক্তি যখন তার কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হাসিল করবে, তখন সে নিজের সক্ষমতার ব্যাপারে বিস্মিত হবে না, বরং সে এটাকে তার প্রতি আল্লাহ্র নিয়ামত হিসেবে মনে করবে। এটা হচ্ছে তার জন্য মহান আল্লাহ্ নির্ধারিত কল্যাণ ও সফলতা লাভের উপকরণ বা মাধ্যম। পক্ষান্তরে সে যদি নিজের ব্যাপারে বিস্ময় বোধ করে, তাহলে সে আল্লাহ্র এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে ভুলে যাবে।

৩. মহান আল্লাহ্ যা কিছুই নির্ধারণ করেন না কেন, তাকদীরে ঈমান পোষণকারী ব্যক্তি অন্তরে প্রশান্তি ও স্বস্তি অনুভব করে। যদি তার কোন প্রিয় বস্তু তার থেকে হারিয়ে যায় অথবা তার সাথে খারাপ কিছু ঘটে তবুও তাতে সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় না এবং অস্থিরতা বোধ করে না। কারণ (সে বিশ্বাস করে) এসব কিছুই আসমান ও যমীনের মালিক আল্লাহ্ কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত ফায়সালা। আর বিষয়টি এমন যে, যা হবার তা অবশ্যই সংঘটিত হবে, কোনভাবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَاهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ لِكَيْلَا تَأْسَوا عَلَىٰ مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
“যমীনে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয়ই আসে, তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আমি তা একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রেখেছি নিশ্চয়ই আল্লাহর পক্ষে এটা খুব সহজ। এটা এ জন্যে যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা দুঃখিত ও বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য তোমরা আনন্দিত না হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”

এ বিষয়ে রাসূল (ﷺ) বলেছেন:
عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَٰلِكَ لأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
'মু'মিনের ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি কাজে তার জন্য মঙ্গল রয়েছে। এটা মু'মিন ব্যতীত অন্য কারো জন্য নয়। সুতরাং তার সুখ এলে সে আল্লাহ্ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ফলে এটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ পৌঁছলে সে ধৈর্য ধারণ করে। ফলে এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়'।

তাকদীর অস্বীকারকারী সম্প্রদায়: তাকদীর বিষয়ে ২টি পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় রয়েছেঃ
ক. জাবিয়্যাহ: তাদের কথা হলো, কোন বান্দা তার কাজের ব্যাপারে বাধ্য। কর্মক্ষেত্রে তার নিজস্ব কোন ইচ্ছা কিংবা শক্তি-সামর্থ্য নেই।
খ. কাদারিয়‍্যাহ: তাদের কথা হলো, কোন বান্দা তার কাজের ক্ষেত্রে ইচ্ছা ও শক্তি-সামর্থ্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বনির্ভর। তার কাজে আল্লাহ্র ইচ্ছা ও শক্তি-সামর্থ্যের কোন প্রভাব নেই।

জারিয়্যাহ সম্প্রদায়ের রদ: শারঈ ও ওয়াকেয়ী (বাস্তব ভিত্তিক) দালীলের মাধ্যমে প্রথম (জারিয়‍্যাহ) সম্প্রদায়ের দাবীর রদ নিম্নরূপ:
শারঈ দালীল: এটা নিশ্চিত যে, মহান আল্লাহ্ বান্দার জন্য ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং আমলকে তিনি বান্দার দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:
مِنْكُمْ مَّا يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنْكُمْ مَّا يُرِيدُ الْآخِرَةَ
“তোমাদের কিছু সংখ্যক দুনিয়া চাচ্ছিলো এবং কিছু সংখ্যক চাচ্ছিলো আখিরাত।"

অন্য আয়াতে তিনি বলেন:
وَقُلِ الْحَقُّ مِن رَّبِّكُمْ فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِنَ وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرُ إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّلِمِينَ نَارًا أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا
“আরে বলে দাও, 'সত্য এসেছে তোমাদের রবেবর নিকট হতে, কাজেই যার ইচ্ছে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছে সত্যকে অস্বীকার করুক।' আমি (অস্বীকারকারী) যালিমদের জন্য আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি যার লেলিহান শিখা তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে।"

তিনি আরো বলেন:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَا أَسَاءَ فَعَلَيْهَا وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ
'যে সৎকাজ করবে নিজের কল্যাণেই করবে। যে অসৎ কাজ করবে তার পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হবে। তোমার প্রতিপালক বান্দাদের প্রতি যালিম নন।"

ওয়াকেয়ী দালীল: নিশ্চয়ই প্রতিটি মানুষ তার ইচ্ছা নির্ভর কাজ (যেমন: খাওয়া, পান করা, বেচা-কেনা ইত্যাদি) এবং ইচ্ছা বহির্ভূত কাজ (যেমন: জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থরথর করে কাঁপা, ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাওয়া ইত্যাদি) এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে জানে। প্রথমোক্ত কাজগুলো সে তার নিজের ইচ্ছা ও পছন্দ অনুযায়ী করেছে, সে বাধ্য হয়ে এই কাজগুলো করছে না। আর দ্বিতীয় প্রকারের কাজগুলো যা তার সাথে ঘটেছে, সেগুলো না সে নিজে পছন্দ করেছে, না সে সেগুলো চেয়েছে।

কাদারিয়‍্যাহ সম্প্রদায়ের রদ: শারঈ ও আকলী (বুদ্ধিবৃত্তিক) দালীলের মাধ্যমে দ্বিতীয় (কাদারিয়‍্যাহ) সম্প্রদায়ের দাবীর রদ নিম্নরূপ:
শারঈ দালীল: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি জিনিস আল্লাহ্র ইচ্ছাতেই অস্তিত্ব লাভ করে থাকে। আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে একথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বান্দার কর্ম আল্লাহ্র ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়ে থাকে।
আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ شَاءَ اللهُ مَا اقْتَتَلَ الَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَتُ وَلَكِنِ اخْتَلَفُوا فَمِنْهُم مَّا أَمَنَ وَمِنْهُمْ مَّا كَفَرَ وَلَوْ شَاءَ اللهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ
"এবং আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন, তাহলে তাদের পরবর্তীরা তাদের নিকট সুস্পষ্ট দলীল পৌঁছার পর পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহ করত না, কিন্তু তারা পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করল, তাদের কেউ কেউ ঈমান আনল এবং কেউ কেউ কুফরী করল, আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন, তাহলে তারা যুদ্ধবিগ্রহ করত না, কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন, তা-ই করে থাকেন।"

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ شِئْنَا لَأَتَيْنَا كُلَّ نَفْسٍ هُدَهَا وَلَكِنْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي لَا مُلَئَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
"আমি যদি ইচ্ছে করতাম তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎ পথে পরিচালিত করতাম। কিন্তু আমার (এ) কথা অবশ্যই সত্য প্রতিপন্ন হবেঃ আমি নিশ্চয়ই জাহান্নামকে জিন্ন ও মানুষ মিলিয়ে পূর্ণ করব।। "

আকলী দালীল: সমগ্র সৃষ্টিজগতের সব কিছুই মহান আল্লাহ্র মালিকানাধীন। এই জগতে বসবাসকারী মানুষও তাই আল্লাহ্ মালিকানাভুক্ত। আর মালিকানাধীন কারো পক্ষে তার মালিকের রাজত্বে তাঁর অনুমতি ও ইচ্ছা ব্যতীত কিছু করা আদৌ সম্ভবপর নয়।

টিকাঃ
391 সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৭৭
392 সূরা আল-কামার ৫৪: ৪৯
393 সূরা আল-হাজ্জ ২২ : ৭০
394 সাহীহ মুসলিম/হাঃ ২৬৫৩, মুসলিম হা/২৬৫৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ হা/৬৭; মিশকাত হা/৭৯।
395 সূরা আল-কাসাস ২৮ : ৬৮
396 সূরা ইবরাহীম ১৪ : ২৭
397 সূরা আলু ইমরান ৩ : ৬
398 সূরা আন্-নিসা' ৪ : ৯০
399 সূরা আনআম ৬ : ১৩৭
400 সূরা আয-যুমার ৩৯ : ৬২
401 সূরা আল-ফুরকান ২৫ : ২
402 সূরা আস-সাফফাত ৩৭: ৯৬
403 সূরা আন-নাবা' ৭৮: ৩৯
404 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২২৩
405 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪ : ১৬
406 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২৮৬
407 সূরা আত-তাকভীর ৮১: ২৮-২৯
408 সূরা আল-আনআম ৬: ১৪৮
409 সূরা আন-নিসা' ৪: ১৬৫
৪১০ সূরা আল-লাইল ৯২: ৫; সাহীহ বুখারী: হা/৬৬০৫
411 সাহীহ মুসলিম: হা/৬৬৩০, মুসলিম হা/২৬৪৭; আবু দাউদ হা/৪৬৪৯; তিরমিযী হা/২১৩৬; ইবনু মাজাহ হা/৭৮।
412 সূরা আত-তাগাবুন ৬৪: ১৬
413 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২৮৬
414 সূরা আল-হাদীদ ৫৭: ২২-২৩
415 সাহীহ মুসলিম: হা/৭৩৯০ (২৯৯৯); মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/৪৭৯; আহমাদ হা/১৮৯৩৪; সহীহ ইবনু হিব্বান হা/২৮৯৬; মিশকাত হা/৫২৯৭।
416 সূরা আলু ইমরান ৩: ১৫২
417 সূরা আল-কাহফ ১৮: ২৯
418 সূরা ফুসিলাত ৪১ : ৪৬
419 সূরা আল-বাকারাহ ২ : ২৫৩
420 সূরা আস-সাজদাহ ৩২: ১৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00