📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল

📄 আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল


ঈমানের রুকন বা স্তম্ভসমূহ
আল্লাহ্র প্রতি ঈমান
১. আল্লাহ্র প্রতি ঈমানের মাঝে ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
ক. তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ: মানুষের ফিতরাত (আল্লাহ্ প্রদত্ত সহজাত স্বভাব), তার বিবেক-বুদ্ধি, ইসলামী শারীআত এবং মানুষের ইন্দ্রিয় অনুভূতি আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ ও সাক্ষ্য প্রদান করে।

ফিতরাত ভিত্তিক প্রমাণ: মানুষের ফিতরাত আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ ও সাক্ষ্য দেয়। এ কথার প্রমাণ হলো, প্রতিটি সৃষ্টিকে কোন প্রকার পূর্ব চিন্তা বা শিক্ষা ছাড়াই আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসী করেই সৃষ্টি করা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত কোন জাগতিক চিন্তা-ভাবনা বা শিক্ষা-দীক্ষা তাকে এই বিশ্বাস থেকে বিমুখ না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে এই জন্মগত স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের উপরই অটল থাকে。
যেমন এ সম্পর্কে রাসূল (ই) বলেছেন:
مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ وَيُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ
'প্রত্যেক আদম সন্তান ইসলামী ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার বাবা-মা তাকে ইয়াহূদী, নাসারা অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে ফেলে'।

বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ: মহান আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে 'আকূল বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ হচ্ছে এই যে, সমগ্র জগতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে সৃষ্টি লাভকারী সবকিছুকে সৃষ্টি করার জন্য একজন স্রষ্টার অবশ্যই প্রয়োজন ছিল, আছে এবং থাকবে। কেননা কোন বস্তু এমনিতেই নিজে নিজে যেমন সৃষ্টি হতে পারে না, তেমনি তা হঠাৎ করে কোন কারণ ছাড়াই অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না।
কোন বস্তুর পক্ষে নিজেকে অস্তিত্ব দান করা আদৌ সম্ভবপর নয়, যেহেতু কোন কিছু নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে না। এটা এ কারণে যে, প্রতিটি বস্তু তার অস্তিত্ব লাভের পূর্বে অস্তিত্বহীন ছিল। সুতরাং বস্তু যখন নিজেই অস্তিত্বহীন, তখন সে আবার কি করে নিজেকে বা অপরকে সৃষ্টি করতে পারে কিংবা স্রষ্টা হতে পারে?

এমনিভাবে কোন বস্তু হঠাৎ করে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না। বরং প্রতিটি নব আবিষ্কৃত বস্তুর জন্য একজন আবিষ্কারক বা উদ্ভাবক অবশ্যই থাকতে হবে। তাছাড়া এই অপূর্ব সুন্দর ব্যবস্থাপনা, প্রতিটি বস্তুর পারস্পরিক সামঞ্জস্য ও ভারসাম্যপূর্ণ চমৎকার বিন্যাস, কার্যের সাথে কারণের এবং একটি সৃষ্টির সাথে আরেকটির দৃঢ় সমন্বয় নিয়ে যে জগতের অস্তিত্ব, তা হঠাৎ করে কোন কারণ ছাড়াই নিজে নিজে অস্তিত্ব লাভ করবে, এটা অসম্ভব। যখন কোন বস্তুর মূল অস্তিত্বই হয়ে থাকে আকস্মিকভাবে বিশৃঙ্খলার সাথে, তখন কিভাবে তা সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত হয়ে থাকতে পারে এবং এই অবস্থায় তার ক্রমবর্ধমান বিকাশ লাভ হতে পারে?!
যেহেতু এটা সম্ভব নয় যে, কোন সৃষ্টি নিজেকে নিজে অস্তিত্ব দিতে পারে এবং তা কোন কারণ ছাড়াই আকস্মিকভাবে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে, কাজেই অবশ্যই তার একজন অস্তিত্ব দানকারী রয়েছেন। তিনিই হলেন সব কিছুর স্রষ্টা, মালিক ও প্রতিপালক মহান আল্লাহ্। কুরআন মাজীদের 'সূরা ত্বর' এ মহান আল্লাহ্ এই বুদ্ধিবৃত্তিক দালীল এবং সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীত যুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন。
তিনি ইরশাদ করেন:
أَمْ خَلَقْتُمُ مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ أَنْتُمُ الْخَالِقُونَ
'তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না অরা নিজেরাই স্রষ্টা”?

অর্থাৎ তারা কোন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া সৃষ্টি লাভ করেনি এবং তারা নিজেরাও নিজেদের স্রষ্টা নয়। কাজেই নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায় যে, সমগ্র সৃষ্টি জগতের সব কিছুর স্রষ্টা হলেন একমাত্র আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন। এ কারণে জুবায়ের বিন মুতইম যখন রাসূল () কে সূরা আত-ত্বর তিলাওয়াতের এক পর্যায়ে এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতে শুনলেন:
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخُلِقُونَ أَمْ خَلَقُوا السَّمَوتِ وَالْأَرْضُ بَل لَّا يُوقِنُونَ أَمْ عِندَهُمْ خَزَائِنُ رَبُّكَ أَمْ هُمُ الْمُصَيْطِرُونَ
“তারা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? নাকি তারা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে না। আপনার রবের গুপ্তভাণ্ডার কি তাদের কাছে আছে, নাকি তারাই এ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী?”

জুবায়ের বিন মুতইম তখন মুশরিক ছিলেন। তিনি বলেন, এই আয়াত শুনে আমার প্রাণ উড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো এবং এই আয়াতগুলোই আমার অন্তরে সর্বপ্রথম ঈমানের বীজ বপন করেছিল।

এখানে আমরা আরো একটি উদাহরণ পেশ করছি যা উপরোল্লিখিত সত্যকে (অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত কোন কিছু সৃষ্টি হতে পারে না) আরো সুস্পষ্ট করবে। মনে করুন, আপনাকে যদি চারিদিকে বাগান ঘেরা, বাগানের মধ্য দিয়ে নদী-নালা প্রবাহিত, নরম তুলতুলে বিছানা সমৃদ্ধ এবং সকল প্রকার সাজ-সজ্জায় সজ্জিত ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একটি মজবুত অট্টালিকার কথা কেউ বলে এবং সেই সাথে বলে যে, এই অট্টালিকা এবং এতে যা কিছু আছে সবকিছুই নিজে নিজে নির্মিত হয়েছে কিংবা তা কোন নির্মাতা ছাড়া এমনিতেই হঠাৎ করে হয়ে গেছে, তাহলে অবশ্যই আপনি সাথে সাথে ঘটনাটি অস্বীকার করবেন এবং এরূপ সংবাদদাতাকে নির্দ্বিধায় মিথ্যুক বলবেন। তার গল্পকে আপনি উদ্ভট, কান্ডজ্ঞানহীন এবং মূর্খতাপূর্ণ কথাবার্তা বলেই সাব্যস্ত করবেন। সুতরাং একটি অট্টালিকার ক্ষেত্রে যদি তা আদৌ সম্ভব না হয়, তাহলে সুবিস্তৃত আকাশ, যমীন, গ্রহ-নক্ষত্র, তারকারাজি এবং অপূর্ব সুন্দর বিন্যাস ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনা সমৃদ্ধ এই সুবিশাল জগত, এসব কিছু কি এমনিতে নিজে নিজে অস্তিত্ব লাভ করেছে নাকি কোন সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত তা হঠাৎ করেই হয়ে গেছে?!

শারঈ প্রমাণ: আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে ইসলামী শারীআতের দালীল হলো, সকল আসমা'নী কিতাবেই এ বিষয়ের উচ্চারণ রয়েছে। তাছাড়া এসব আসমা'নী কিতাবে মানুষের জন্য উপকারী ও কল্যাণকর যে সব বিধিবিধান রয়েছে, এসবই এক দিকে যেমন মহান আল্লাহ প্রতিপালকত্বের প্রমাণ বহন করে, অন্য দিকে তা আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা এবং সৃষ্টিজগতের সার্বিক কল্যাণ সম্পর্কে তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞানের সাক্ষ্য দেয়। এছাড়া সকল আসমা'নী কিতাবে জাগতিক বিষয়ে যে সব সংবাদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবে প্রতিফলিত হয়ে একদিকে যেমন তা আল্লাহ প্রদত্ত ঐশী সংবাদসমূহের চির সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে, অন্যদিকে তা প্রমাণ বহন করছে যে, এ সবকিছুই আমাদের রব্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে সংঘটিত এবং তিনি যে সব বিষয়বস্তুর সংবাদ দিয়েছেন, সেসব কিছুকে তিনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করার তথা সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন।

মানবেন্দ্রিয় ভিত্তিক প্রমাণ: মানুষের ইন্দ্রিয় অনুভূতি দু'ভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করে:

প্রথমত আমরা শুনে থাকি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করি যে, মহান আল্লাহ্ দু'কারীর দু'আ কবুল করেন এবং বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। এ বিষয়গুলো অকাট্যভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَنُوحًا إِذْ نَادَى مِن قَبْلُ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ
"আর স্মরণ করুন নূহকে, পূর্বে তিনি যখন ডেকেছিলেন তখন তার ডাকে আমি সাড়া দিয়েছিলাম।”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ

"স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকট উদ্ধার প্রার্থনা করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।"

সাহীহ বুখারীতে আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: এক জুমুআহর দিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমুআহর খুতবা দিচ্ছিলেন এমতাবস্থায় আরবী এক গ্রাম্য লোক মসজিদে প্রবেশ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সমস্ত সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পরিবার-পরিজন অনাহারে নিপতিত হচ্ছে। অতএব আমাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট দু'আ করুন।

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর দু'হাত উঠালেন এবং আল্লাহ্র দরবারর দু'আ করলেন। সাথে সাথে আকাশে পাহাড়ের মত মেঘমালা বিস্তৃত হলো এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বার থেকে নামার পূর্বেই আমি (আনাস) দেখতে পেলাম, তার দাড়ি মুবারাক থেকে বৃষ্টির পানি টপকে পড়ছে। পরবর্তী জুমুআর দিন সেই একই লোক অথবা তাদের অন্য একজন দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! ঘর-বাড়ি ধসে পড়ছে, সম্পদ পানিতে ডুবে যাচ্ছে, কাজেই আমাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট দু'আ করুন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর হাত দুটো উঠালেন এবং বললেন, হে আল্লাহ্! আমাদের আশেপাশে বৃষ্টি দাও, আমাদের উপর না। একথা বলে মেঘে ঢাকা আকাশের যে দিকেই তিনি ইশারা করছিলেন সে দিকটি সাথে সাথে পরিষ্কার ও মেঘমুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

যারা দু'আ কবুল হওয়ার শর্ত পূরণ করে সত্যিকার অর্থে আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, আল্লাহ্ তাদের ডাকে সাড়া দেন এবং তাদের দু'আ কবুল করেন। বিষয়টি আজ অবধি প্রতিনিয়তই আমরা প্রত্যক্ষ করছি।

দ্বিতীয়ত নাবীগণের আলৌকিক নিদর্শনাবলি (মু'জিযা) যেগুলো মানবজাতি প্রত্যক্ষ করে অথবা যেগুলো সম্পর্কে তারা শুনে থাকে, সেগুলো তাঁদের প্রেরণকর্তা আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের অস্তিত্বের অকাট্য দালীল। কেননা এ সকল মু'জিযা হলো এমন সব বিষয়, যা মানুষের সাধ্য ও ক্ষমতা বহির্ভূত। এগুলো আল্লাহ্ নাবী-রাসূলদের সমর্থনে এবং সাহায্য করার উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকেন। এর কিছু দৃষ্টান্ত হলো:

প্রথম দৃষ্টান্ত: মূসা (আঃ) এর মু'জিযা, যখন আল্লাহ্ তাঁকে লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করতে নির্দেশ দিলেন এবং তিনি আল্লাহ্র নির্দেশানুযায়ী আঘাত করলেন, তখন সাথে সাথে সাগর বক্ষে পাহাড়ের মত পানির প্রাচীর ঘেরা বারটি শুকনো রাস্তা খুলে গেল। এ ঘটনা সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
فَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنِ اضْرِبُ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ فَانْفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَانَ طُودًا عَظِيمًا
“অতঃপর আমরা মূসার প্রতি ওয়াহী করলাম যে, আপনার লাঠি দ্বারা সাগরে আঘাত করুন। ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতের মত হয়ে গেল।”

দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: ঈসা( এর মু’জিযা, তিনি আল্লাহ্র নির্দেশে মৃতকে জীবিত করতেন এবং তাদেরকে কবর থেকে উঠিয়ে আনতেন।
এ বিষয়ে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَأَحْيِ الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللهِ
“আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে আমি মৃতকে জীবন্ত করি।”

ঈসা( এর মু’জিযা সম্পর্কে আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
وَإِذْ تُخْرِجُ الْمَوْتَى بِإِذْنِي
“আমার অনুমতিক্রমে আপনি মৃতকে জীবিত করতেন।”

তৃতীয় দৃষ্টান্ত: মুহাম্মাদ( এর মু’জিযা, যখন কুরাইশ গোত্রের লোকেরা তাঁর নিকট কোন আলৌকিক নিদর্শন প্রত্যক্ষ করতে চাইল, তখন তিনি তাঁর হাতের আঙ্গুল দিয়ে চাঁদের দিকে ইশারা করলেন, সাথে সাথে চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল এবং উপস্থিত সকল লোকই তা স্বচক্ষে দেখতে পেল।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ وَإِن يَرَوْا أَيَةً يَعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُسْتَمِرُّ

“কিয়ামত কাছাকাছি হয়েছে, আর চাঁদ খন্ডিত হয়েছে। আর তারা কোন নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা তো চিরাচরিত জাদু।”

এ সকল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অলৌকিক নিদর্শন বা মু'জিযা যেগুলো মহান আল্লাহ্ তাঁর নাবী-রাসূলদের সমর্থনে এবং সাহায্য করার উদ্দেশ্যে দিয়েছেন, সেগুলো অকাট্যভাবে আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ ও সাক্ষ্য বহন করে।

খ. তাঁর রুবুবিয়্যাহ বা প্রতিপালকত্বে ঈমান: আল্লাহ্র প্রতি ঈমান পোষণের মধ্যে যে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত, তন্মধ্যে দ্বিতীয় বিষয় হলো আল্লাহ্ রুবুবিয়্যাহ তথা তাঁর প্রতিপালক হওয়ার প্রতি এই মর্মে ঈমান পোষণ করা যে, মহান আল্লাহই হলেন একমাত্র রব, তাঁর কোন অংশীদার বা সহযোগী নেই।
রব্ব হলেন তিনি যিনি সৃষ্টি (خلق), রাজত্ব (ملك) ও হুকুম (أمر) প্রদানের একক অধিপতি। সুতরাং তিনি ব্যতীত কোন সৃষ্টিকর্তা নেই, তিনি ছাড়া আর কোন মালিক নেই এবং হুকুম বা বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র তাঁরই, অন্য কারো নয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ
“জেনে রাখ, সৃষ্টি করা ও আদেশ দান তাঁরই কাজ।”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِنَ قِطْمِيرٍ
"তিনিই আল্লাহ তোমাদের রব, সকল আধিপত্য তাঁরই। আর তোমরা যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ডাক, তারা তো খেজুরের আঁটির আবরণেরও অধিকারী নয়।"

সৃষ্টি জগতের কেউ (যে কোন ধর্ম পালনকারী ব্যক্তি) মহান আল্লাহ্র রুবুবিয়্যাতকে (পালনকর্তা হওয়াকে) অস্বীকার করেছে বলে জানা যায় না। তবে এমন কোন দাম্ভিক ও অহংকারী কেউ যদি থাকে, যার কথার সাথে তার বিশ্বাসের মিল নেই, তাহলে সেই কেবল আল্লাহ্ রুবুবিয়্যাতকে অস্বীকার করতে পারে, যেমনটি করেছিল ফিরআউন। সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল:
“আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ রব।”

আরো বলেছিল:
“হে পরিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলে জানি না!”

কিন্তু এ সবই ছিল ফিরআউনের মুখের কথা মাত্র। কথাগুলো সে অন্তর থেকে বলেনি। প্রকৃতপক্ষে তার আকীদাহ্ বা বিশ্বাস এরূপ ছিল না। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتُهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا
“আর তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে আল্লাহর নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে নিশ্চিত সত্য বলে গ্রহণ করেছিল।”

ফির'আউনকে (তার এসব মৌখিক দাবীর প্রেক্ষিতে) মূসা তাকে আল্লাহ্র ভাষায় বলেছিলেন:
قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَوتِ وَالْأَرْضُ
“মূসা বললেন, তুমি অবশ্যই জান যে, এসব স্পষ্ট নিদর্শন আসমানসমূহ ও যমীনের রব্ব আল্লাহই নাযিল করেছেন প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরুপ। আর হে ফির'আউনা আমি তো মনে করছি তুমি হবে ধ্বংসপ্রাপ্ত।”

কাজেই মুশরিকরা মহান আল্লাহ্ রুবুবিয়্যাতকে তথা আল্লাহকে পালনকর্তা বলে স্বীকার করতো, কিন্তু তারা আল্লাহ্ উলুহিয়্যাহ তথা ইবাদাতে তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত করতো। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
قُل لِّمَنِ الْأَرْضُ وَمَا فِيهَا إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ قُلْ مَن رَّبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ قُلْ مَن بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ
“বলুন, যমীন এবং এতে যা কিছু আছে এগুলোর মালিকানা কার? যদি (তোমরা জান (তবে বল)। অবশ্যই তারা বলবে, এগুলোর মালিকানা আল্লাহর। বলুন, তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না? বলুন, সাত আসমান ও মহান আরশের রব কে? অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ। বলুন, তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? বলুন, কার হাতে সমস্ত বস্তুর কর্তৃত্ব? যিনি আশ্রয় প্রদান করেন অথচ তাঁর বিপক্ষে কেউ কাউকে আশ্রয় দিতে পারে না, যদি তোমরা জান (তবে বল)। অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ। বলুন, তাহলে কোথা থেকে তোমরা জাদুগ্রস্থ হচ্ছ?”

আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ الْعَزِيزُ الْعَلِيمُ
“আর আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো তো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ।

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ مَّا خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ
“আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?”

আল্লাহর নির্দেশ বলতে জাগতিক এবং শারীআতগত উভয় প্রকার নির্দেশকেই বুঝায়। তিনি যেমন তাঁর হিকমাহ অনুযায়ী যা ইচ্ছা তাই বিশ্বজগতে সংঘটিত করে থাকেন, তেমনি ইবাদাত ও মুয়ামালাতের (পারস্পরিক লেনদেন, আচার-আচরণ ইত্যাদি) ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর পরম প্রজ্ঞা অনুযায়ী যে বিধান প্রবর্তন করতে চান, তাই করেন।
সুতরাং যে ব্যক্তি ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে বিধান প্রবর্তনকারী সাব্যস্ত করল কিংবা মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ফায়সালা প্রদানকারী সাব্যস্ত করল, সে অবশ্যই আল্লাহর সাথে শির্ক করল এবং ঈমানের দাবি বাস্তবায়ন করল না।

গ. তাঁর উলুহিয়্যাহ বা ইলাহ হওয়ার প্রতি ঈমান: অর্থাৎ এই মর্মে ঈমান পোষণ করা যে, তিনিই একমাত্র ইলাহ হওয়ার যোগ্য, অন্য কেউ নয় এবং তাঁর কোন অংশীদার নেই। এখানে ‘আল-ইলাহ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘আল মা’লুহ’ বা যার ইলাহত্ব আছে বা ‘আল-মা’বুদ’ বা যার ইবাদাত পাওয়ার যোগ্যতা আছে। আর সে ইবাদাত ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান সহকারে।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
وَإِلٰهُكُمْ إِلٰهٌ وَاحِدٌ لَّاۤ إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمٰنُ الرَّحِيْمُ
“আর তোমাদের ইলাহ হলেন এক ইলাহ। তিনি পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু, তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই।”

অন্য আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন:
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

“আল্লাহ সাক্ষ্য দেন এবং ফেরেশতাগণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।”

আল্লাহ্র সাথে অন্য যা কিছুকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে ইবাদাত করা হয়, তার উলুহিয়্যাহ বা ইবাদাতযোগ্য হওয়ার বিষয়টি বাতিল এবং ভিত্তিহীন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
ذلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
“এটা এজন্য যে, আল্লাহ - তিনিই হলেন সত্য এবং তাঁর পরিবর্তে তারা যাকে ডাকে সে তো বাতিল। আর আল্লাহ – তিনিই হলেন সমুচ্চ, সুমহান।”

কোন বাতিল উপাস্যকে ইলাহ বলে নামকরণ করা, এটা তাকে প্রকৃত মা'বুদ হওয়ার অধিকার প্রদান করে না। যেমন মুশরিকদের প্রধান তিন দেবতা লাত, উয্যা এবং মানাত সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءُ سَيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنَ سُلْطَنٍ
“তাঁকে (আল্লাহকে) ছেড়ে তোমরা শুধু কতগুলো নামের ইবাদাত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ। এগুলোর ব্যাপারে কোন প্রমাণ আল্লাহ নাযিল করেননি।”

হুদ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন:

اتُجَادِلُونَنِي فِي أَسْمَاءِ سَيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَّا نَزَلَ اللهُ بِهَا مِنَ سُلْطَنٍ
“তবে কি তোমরা আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও এমন কতগুলো নাম সম্বন্ধে যেগুলোর নাম তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষরা রেখেছ, যে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন প্রমাণ নাযিল করেননি?”

ইউসুফ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন যে, তিনি তার কারাবন্দী সাথীদ্বয়কে বলেছিলেন:
أَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ مَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنَ سُلْطَنٍ
“ভিন্ন ভিন্ন বহু রব্ব উত্তম, নাকি মহাপ্রতাপশালী এক আল্লাহ? তাঁকে ছেড়ে তোমরা শুধু কতগুলো নামের ইবাদাত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ। এগুলোর কোন প্রমাণ আল্লাহ নাযিল করেননি।”

আর এ কারণেই প্রত্যেক নাবী-রাসূল নিজ নিজ সম্প্রদায়কে একথাই বলতেন:
اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنَ الهِ غَيْرُهُ
“তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই।”

কিন্তু মুশরিকরা এই আহ্বানকে উপেক্ষা করেছিল এবং আল্লাহ্ ব্যতীত আরো অসংখ্য ইলাহ সাব্যস্ত করেছিল। তারা আল্লাহ্র সাথে সাথে সেই সব বাতিল মা'বুদের ইবাদাত করতো, তাদের কাছে সাহায্য চাইতো এবং তাদের কাছে বিপদ থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি কামনা করতো।

মুশরিকদের এ ধরনের উপাস্য নির্ধারণ করাকে আল্লাহ্ ২টি বুদ্ধিবৃত্তিক দালীল দিয়ে বাতিল সাব্যস্ত করেছেন:

প্রথমত: আল্লাহ্ ব্যতীত তারা যেসব উপাস্য নির্ধারণ করে থাকে, সেসবের মাঝে উলুহিয়্যাহ তথা ইলাহ বা মা'বুদ হওয়ার বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি নেই। কেননা সে সব উপাস্য নিজেরাই সৃষ্টি, কোন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাদের নেই। তারা তাদের উপাসকদের যেমন কোন উপকার করতে পারে না, তেমনি তাদেরকে কোন অনিষ্ট থেকেও রক্ষা করতে পারে না। এসব বাতিল উপাস্য তাদের উপাসকদের জীবন-মৃত্যুরও মালিক নয়। আসমা'নী কোন বিষয়ে তাদের কোন কর্তৃত্ব এবং অংশীদারিত্ব নেই। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَاتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً لَّا يَخْلُقُونَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَمْلِكُونَ لِأَنْفُسِهِمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيُوةً وَلَا نشورا
“আর তারা আল্লাহর পরিবর্তে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে অন্যদেরকে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। তারা নিজেদের অপকার কিংবা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। আর মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের উপরও তারা কোন ক্ষমতা রাখে না।”

অন্য আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِّن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَواتِ وَلَا فِي الْأَرْضُ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكِ وَمَا لَهُ مِنْهُمْ مِنَ ظَهِيرٍ وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَةً إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ
“বলুন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে করে ডাক, তারা আসমানসমূহ ও যমীনে অণু পরিমাণ জিনিসেরও মালিক নয়। আর এই দু'টিতে তাদের কোন অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ আল্লাহর সাহায্যকারীও নয়। আর আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন, সে ছাড়া আর কারো সুপারিশ তাঁর কাছে কোন কাজে আসবে না।

আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেন:
أَيُشْرِكُونَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَسْتَطِيعُونَ لَهُمْ نَصْرًا وَلَا أَنْفُسَهُمْ يُنْصِرُونَ
“তারা কি এমন কিছুকে শরীক সাব্যস্ত করে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট। ওরা না তাদেরকে সাহায্য করতে পারে, আর না নিজেদেরকে সাহায্য করতে পারে।”

আর যখন তথাকথিত ঐসব উপাস্যদের এই অবস্থা, সুতরাং তাদেরকে উপাস্য বলে গ্রহণ করা হলো চরম মূর্খতা এবং সবচেয়ে বড় অনর্থক ও বাতিল কাজ।

দ্বিতীয়ত: ঐসব মুশরিকরা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতে (প্রতিপালক হওয়াতে) আল্লাহর এককত্বকে স্বীকার করতো। তারা একথা স্বীকার করতো যে, মহান আল্লাহই হলেন একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এবং পালনকর্তা যার হাতে রয়েছে আসমান ও যমীনের সকল কিছুর মালিকানা ও কর্তৃত্ব। তিনিই একমাত্র আশ্রয় প্রদানকারী, তাঁর উপর আর কোন আশ্রয় প্রদানকারী নেই। সুতরাং তারা রুবুবিয়্যাহ তথা রব্ব হিসেবে যেমন আল্লাহর এককত্বকে স্বীকার করে, তেমনি তাদের জন্য আবশ্যক হলো উলুহিয়্যাহ তথা ইবাদাতেও আল্লাহর এককত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা।
যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ

“হে মানব সকলা তোমরা তোমাদের সেই রবের ইবাদাত কর যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারে। যিনি যমীনকে তোমাদের জন্য করেছেন বিছানা স্বরূপ ও আসমানকে করেছেন ছাদ স্বরুপ এবং আকাশ হতে পানি অবতীর্ণ করে তা দ্বারা তিনি তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। কাজেই তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিও না।”

অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّا خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ
“আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?”

মহান আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
قُلْ مَن يَرْزُقُكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضُ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَا يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَا يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ ، فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ فَذَلِكُمُ اللهُ رَبُّمُ الْحَقِّ ۚ فَمَا ذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَلُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ
“বলুন, কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে জীবন উপকরণ সরবরাহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, কে জীবিতকে মৃত থেকে বের করেন এবং কে মৃতকে জীবিত হতে বের করেন এবং সব বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন? তখন তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। সুতরাং বলুন, তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? অতএব তিনিই আল্লাহ, তোমাদের সত্য রব। সত্য চলে যাওয়ার পর বিভ্রান্তি ছাড়া আর কী থাকে? কাজেই তোমাদেরকে কোথায় ফেরানো হচ্ছে?”

ঘ. তাঁর আসমা ওয়াস সিফাত বা নাম ও গুণাবলির প্রতি ঈমান: অর্থাৎ কুরআন মাজীদ এবং নাবী (স) এর সুন্নাতে মহান আল্লাহ্ নিজের যে সকল নাম ও গুণাবলী বর্ণনা করেছেন সেগুলোকে কোনরূপ (পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন), (অস্বীকার ও বাতিলকরণ), (কৈফিয়ত দেওয়া), (সাদৃশ্য স্থাপন) না করে কুরআন-সুন্নাহ্ তে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবে এ সকল নাম ও গুণাবলির প্রতি ঈমান পোষণ করা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَابِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
"আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাক। আর যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন কর। তাদের কৃতকর্মের ফল অচিরেই তাদেরকে দেওয়া হবে। ”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى فِي السَّمَواتِ وَالْأَرْضُ، وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
“আসমানসমূহ ও যমীনে সর্বোচ্চ গুণাগুন তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, হিকমাহওয়ালা। ”

অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
"কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনিই সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।”

আসমা' ওয়াস সিফাতের ব্যাপারে পথভ্রষ্ট দলসমূহ: আল্লাহ্র আসমা' (নাম) ও সিফাতের (গুণাবলীর) প্রতি ঈমান আনয়নের ক্ষেত্রে দু'টি পথভ্রষ্ট দল:
ক. মুআত্তিলা সম্প্রদায়: যারা আল্লাহর সুমহান নাম ও গুণাবলিকে কিংবা এসবের মধ্য থেকে কোন কোনটিকে এই ধারণা বশত তারা অস্বীকার করে যে, যদি এগুলোকে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি বলে স্বীকার করা হয়, তাহলে আল্লাহর কোন সৃষ্টি বা মাখলুকের সাথে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাদৃশ্য স্থাপন করা হয়। মুয়াত্বিলা সম্প্রদায়ের এই ধারণা বেশ কয়েকটি কারণে সম্পূর্ণরূপে অমূলক ও বাতিল। যেমন:
১. তাদের এরূপ ধারণা একটি বাতিল বিষয়কে আবশ্যক করে দেয়। তা হচ্ছে, আল্লাহর বাণী বা কালামের এক আয়াত অন্য আয়াতের বিরোধী ও বিপরীত। এই ধারণা নিতান্তই বাতিল, কারণ মহান আল্লাহ্ স্বীয় সত্ত্বার জন্য বিভিন্ন নাম ও গুণাবলি প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর মত আর কোন কিছু নেই। আল্লাহ্ নাম ও গুণাবলিকে প্রতিষ্ঠিত করার কারণে যদি আসলেই সেগুলো সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়, তাহলে তো আল্লাহর কালামকে পরষ্পর বিরোধী বলতে হবে! আর বলতে হবে, আল্লাহ্র কালামের এক আয়াত অন্য আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে!
২. দুইটি জিনিসের একই নাম এবং একই গুণ হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো পরষ্পরের অনুরূপ বা একই রকম হবে, এটা আবশ্যক নয়। যেমন আপনি দুইজন ব্যক্তিকে দেখেন, তারা কিন্তু উভয়েই মানুষ এবং তারা উভয়েই শোনে, দেখে এবং কথা বলে। অর্থাৎ তাদের দু'জনের প্রত্যেকেই একই নাম ও গুণে গুণান্বিত। কিন্তু তাই বলে তাদের দু'জনের দেখা, শোনা, কথাবার্তা ও মানবীয় গুণাবলী অবশ্যই একই রকম নয়। এমনিভাবে জীবজন্তুর মাঝেও আপনি দেখবেন যে, তাদেরও হাত, পা এবং চোখ রয়েছে। তাই বলে প্রতিটি জীবজন্তুর হাত, পা এবং চোখ অবশ্যই একই রকম নয়।
কাজেই একই নাম ও গুণে গুণান্বিত হওয়া সত্ত্বেও সৃষ্টিকুলের পরস্পরের মাঝে যেখানে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান, তাহলে একই নাম বা গুণে গুণান্বিত হওয়া সত্ত্বেও মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ এবং তাঁর সৃষ্টির মাঝে পার্থক্য আরো ব্যাপক ও বিশাল।
খ. মুশাব্বিহা সম্প্রদায়: তারা আল্লাহ্র সুমহান নাম ও গুণাবলিকে স্বীকার করে বটে, তবে তারা আল্লাহ্র কোন সৃষ্টির সাথে এগুলোর সাদৃশ্য বা উপমা স্থাপন করে এবং সে অনুযায়ী তারা এগুলোর উপর বিশ্বাস পোষণ করে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা এই যে, কুরআন-সুন্নাহ তে আল্লাহ্ নাম ও গুণাবলির সাদৃশ্য বা উপমা স্থাপনের পক্ষে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা রয়েছে। আর তা হলো, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদরকে তাই বলে থাকেন যা তারা বুঝতে পারে। মুশাব্বিহা সম্প্রদায়ের এই ধারণা যে সব কারণে মিথ্যা ও বাতিল বলে গণ্য, তন্মধ্যে নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:

১. সৃষ্টির সাথে আল্লাহর সাদৃশ্যের বিষয়টি বিবেক-বুদ্ধি এবং ইসলামী শারীআত দ্বারা প্রত্যাখ্যাত এবং বাতিল বলে গণ্য। আর কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্য কোন বাতিল বিষয়ের দিকে আহ্বান জানাবে, এটা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব।
২. মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উদ্দেশ্যে নিজের নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে যা বলেছেন, মৌলিক বা বাহ্যিক অর্থের দিক দিয়ে তা বান্দাদের বোধগম্য ভাষাতেই বলেছেন। এসবের মূল বা বাহ্যিক অর্থ বান্দার বোধগম্য বটে, কিন্তু এই অর্থের প্রকৃত অবস্থা ও বৈশিষ্ট্য মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞানে রয়েছে, যা তাঁর জাত (সত্ত্বা) এবং গুণাবলির জন্য মানানসই।
যেমন মহান আল্লাহ নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন যে, তিনি হলেন সামী’ (সর্বশ্রোতা)। এখানে আমরা ‘সামউন’ (শ্রবণ) শব্দটির মৌলিক বা বাহ্যিক অর্থ সম্পর্কে অবগত। আর তা হলো, কোন শব্দ বা আওয়াজ শুনতে পাওয়া। কিন্তু এই শ্রবণের বিষয়টি যখন আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত হবে, তখন এর প্রকৃত অবস্থা আমাদের অজানা। তাছাড়া আল্লাহর বিভিন্ন মাখলুকের ক্ষেত্রে যেহেতু ‘শ্রবণের’ প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, অতএব মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এবং বিভিন্ন মাখলুকের শ্রবণের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের মাঝে পার্থক্য আরো ব্যাপক ও বিশাল।
এমনিভাবে মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর নিজের সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, তিনি আরশের উপর উঠেছেন। এখানে استوی ইসতিওয়া উপরে উঠা( শব্দের মূল অর্থ জ্ঞাত। কিন্তু এই ইসতিওয়া যখন মহান আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত হবে, তখন আরশের উপর তাঁর উঠার প্রকৃতি কী, তা কেবল আল্লাহই জানেন, অন্য কেউ নয়। আল্লাহর ক্ষেত্রে ইস্তাওয়ার প্রকৃত অবস্থা এবং কোন মাখলুকের ক্ষেত্রে এর অবস্থা কখনোই এক নয়। একটি স্থির চেয়ারের উপর উঠা আর দ্রুতবেগে চলা উটের পিঠে কষ্টকরভাবে উঠা এই দুইটি সমান নয়। সুতরাং যেখানে সৃষ্টির কোন কিছুর উপরে উঠার ক্ষেত্রেই এতো ভিন্নতা, সেখানে প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে মহান আল্লাহর ইস্তিওয়া আর সৃষ্ট বস্তুর উপরে উঠার মাঝে পার্থক্য আরো ব্যাপক ও বিশাল।

আল্লাহর প্রতি ঈমান এর ফলাফল
উপরোল্লিখিত আলোচনায় আল্লাহর প্রতি ঈমানের যে বিবরণ পেশ করা হলো, তা থেকে ঈমানদারদের জন্য যেসব মহা গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল বেরিয়ে আসে সেগুলো হলো:

১. মহান আল্লাহ্ তাওহীদ বা এককত্বকে এমনভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে কেবল আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো প্রতি আশা ও ভয় না থাকে এবং কেবল আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত না করা হয়।
২. আল্লাহ্র সুন্দর সুন্দর নামসমূহ এবং তাঁর সুমহান গুণাবলির দাবি অনুযায়ী আল্লাহ্র প্রতি পূর্ণ ভালবাসা ও মুহাব্বত পোষণ করা।
৩. আল্লাহ্ যা কিছু আদেশ দিয়েছেন সেগুলো যথাযথভাবে পালন করা এবং যা কিছু থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকা।

টিকাঃ
২৮৫ সহীহ বুখারী হা/১৩৫৮, মুসলিম হা/২৬৫৮; আহমাদ হা/৮১৭৯; মিশকাত হা/৯০।
286 সূরা আত্-তূর ৫২: ৩৫
287 সূরা আত্-তূর ৫২: ৩৫-৩৭
288 সাহীহ বুখারী: হা/৪৮৫৪, মুসনাদুল হুমায়দী হা/৫৬৬; বায়হাকী, আসমা ওয়াস-সিফাত হা/৮৩৪।
২৮৯ 'সূরা আল-আম্বিয়া' ২১: ৭৬
290 সূরা আল-আনফাল ৮:৯
291 সাহীহ বুখারী: হা/৯৩৩, মুসলিম হা/৮৯৭; নাসাঈ হা/১৫২৮; মিশকাত হা/৫৯০২।
২৯২ সূরা আশ-শুআরা ২৬ : ৬৩
২৯৩ সূরা আল ইমরান ৩ : ৪৯
২৯৪ সূরা আল-মায়িদাহ ৫ : ১১০
295 সূরা আল-কামার ৫৪: ১-২
296 সূরা আল-আ'রাফ ৭:৫৪
297 সূরা আল-ফাতির ৩৫: ১৩
298 সূরা আন্-নাযিআত ৭৯: ২৪
299 সূরা আল-কাসাস ২৮: ৩৮
300 সূরা আন্-নামল ২৭: ১৪
301 সূরা আল-ইসরা' (বানী ইসরাঈল) ১৭: ১০২
302 সূরা আল-মুমিনূন ২৩ : ৮৪-৮৯
303 সূরা আয-যুখরুফ ৪৩: ৯
304 সূরা আয-যুখরুফ ৪৩: ৮৭
305 সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৬৩
306 সূরা আলু ইমরান: ১৮
307 সূরা আল-হাজ্জ ২২: ৬২
308 সূরা আন-নাজম ৫৩: ২৩
309 সূরা আল-আ'রাফ ৭:৭১
310 সূরা ইউসুফ ১২: ৩৯-৪০
311 সূরা আল-আ'রাফ ৭:৫৯
312 সূরা আল-ফুরকান ২৫: ৩
৩১৩ সূরা সাবা ৩৪: ২২-২৩
৩১৪ সূরা আল-আ’রাফ ৭: ১৯১-১৯২
315 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২১-২২
316 সূরা আয-যুখরুফ ৪৩: ৮৭
317 সূরা ইউনুস ১০: ৩১-৩২
318 সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৮০
319 সূরা আর-রুম ৩০: ২৭
320 সূরা আশ-শুরা ৪২: ১১

ঈমানের রুকন বা স্তম্ভসমূহ
আল্লাহ্র প্রতি ঈমান
১. আল্লাহ্র প্রতি ঈমানের মাঝে ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
ক. তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ: মানুষের ফিতরাত (আল্লাহ্ প্রদত্ত সহজাত স্বভাব), তার বিবেক-বুদ্ধি, ইসলামী শারীআত এবং মানুষের ইন্দ্রিয় অনুভূতি আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ ও সাক্ষ্য প্রদান করে।

ফিতরাত ভিত্তিক প্রমাণ: মানুষের ফিতরাত আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ ও সাক্ষ্য দেয়। এ কথার প্রমাণ হলো, প্রতিটি সৃষ্টিকে কোন প্রকার পূর্ব চিন্তা বা শিক্ষা ছাড়াই আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসী করেই সৃষ্টি করা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত কোন জাগতিক চিন্তা-ভাবনা বা শিক্ষা-দীক্ষা তাকে এই বিশ্বাস থেকে বিমুখ না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে এই জন্মগত স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের উপরই অটল থাকে。
যেমন এ সম্পর্কে রাসূল (ই) বলেছেন:
مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ وَيُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ
'প্রত্যেক আদম সন্তান ইসলামী ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার বাবা-মা তাকে ইয়াহূদী, নাসারা অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে ফেলে'।

বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ: মহান আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে 'আকূল বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ হচ্ছে এই যে, সমগ্র জগতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে সৃষ্টি লাভকারী সবকিছুকে সৃষ্টি করার জন্য একজন স্রষ্টার অবশ্যই প্রয়োজন ছিল, আছে এবং থাকবে। কেননা কোন বস্তু এমনিতেই নিজে নিজে যেমন সৃষ্টি হতে পারে না, তেমনি তা হঠাৎ করে কোন কারণ ছাড়াই অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না।
কোন বস্তুর পক্ষে নিজেকে অস্তিত্ব দান করা আদৌ সম্ভবপর নয়, যেহেতু কোন কিছু নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে না। এটা এ কারণে যে, প্রতিটি বস্তু তার অস্তিত্ব লাভের পূর্বে অস্তিত্বহীন ছিল। সুতরাং বস্তু যখন নিজেই অস্তিত্বহীন, তখন সে আবার কি করে নিজেকে বা অপরকে সৃষ্টি করতে পারে কিংবা স্রষ্টা হতে পারে?

এমনিভাবে কোন বস্তু হঠাৎ করে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না। বরং প্রতিটি নব আবিষ্কৃত বস্তুর জন্য একজন আবিষ্কারক বা উদ্ভাবক অবশ্যই থাকতে হবে। তাছাড়া এই অপূর্ব সুন্দর ব্যবস্থাপনা, প্রতিটি বস্তুর পারস্পরিক সামঞ্জস্য ও ভারসাম্যপূর্ণ চমৎকার বিন্যাস, কার্যের সাথে কারণের এবং একটি সৃষ্টির সাথে আরেকটির দৃঢ় সমন্বয় নিয়ে যে জগতের অস্তিত্ব, তা হঠাৎ করে কোন কারণ ছাড়াই নিজে নিজে অস্তিত্ব লাভ করবে, এটা অসম্ভব। যখন কোন বস্তুর মূল অস্তিত্বই হয়ে থাকে আকস্মিকভাবে বিশৃঙ্খলার সাথে, তখন কিভাবে তা সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত হয়ে থাকতে পারে এবং এই অবস্থায় তার ক্রমবর্ধমান বিকাশ লাভ হতে পারে?!
যেহেতু এটা সম্ভব নয় যে, কোন সৃষ্টি নিজেকে নিজে অস্তিত্ব দিতে পারে এবং তা কোন কারণ ছাড়াই আকস্মিকভাবে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে, কাজেই অবশ্যই তার একজন অস্তিত্ব দানকারী রয়েছেন। তিনিই হলেন সব কিছুর স্রষ্টা, মালিক ও প্রতিপালক মহান আল্লাহ্। কুরআন মাজীদের 'সূরা ত্বর' এ মহান আল্লাহ্ এই বুদ্ধিবৃত্তিক দালীল এবং সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীত যুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন。
তিনি ইরশাদ করেন:
أَمْ خَلَقْتُمُ مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ أَنْتُمُ الْخَالِقُونَ
'তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না অরা নিজেরাই স্রষ্টা”?

অর্থাৎ তারা কোন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া সৃষ্টি লাভ করেনি এবং তারা নিজেরাও নিজেদের স্রষ্টা নয়। কাজেই নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায় যে, সমগ্র সৃষ্টি জগতের সব কিছুর স্রষ্টা হলেন একমাত্র আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন। এ কারণে জুবায়ের বিন মুতইম যখন রাসূল () কে সূরা আত-ত্বর তিলাওয়াতের এক পর্যায়ে এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতে শুনলেন:
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخُلِقُونَ أَمْ خَلَقُوا السَّمَوتِ وَالْأَرْضُ بَل لَّا يُوقِنُونَ أَمْ عِندَهُمْ خَزَائِنُ رَبُّكَ أَمْ هُمُ الْمُصَيْطِرُونَ
“তারা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? নাকি তারা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে না। আপনার রবের গুপ্তভাণ্ডার কি তাদের কাছে আছে, নাকি তারাই এ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী?”

জুবায়ের বিন মুতইম তখন মুশরিক ছিলেন। তিনি বলেন, এই আয়াত শুনে আমার প্রাণ উড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো এবং এই আয়াতগুলোই আমার অন্তরে সর্বপ্রথম ঈমানের বীজ বপন করেছিল।

এখানে আমরা আরো একটি উদাহরণ পেশ করছি যা উপরোল্লিখিত সত্যকে (অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত কোন কিছু সৃষ্টি হতে পারে না) আরো সুস্পষ্ট করবে। মনে করুন, আপনাকে যদি চারিদিকে বাগান ঘেরা, বাগানের মধ্য দিয়ে নদী-নালা প্রবাহিত, নরম তুলতুলে বিছানা সমৃদ্ধ এবং সকল প্রকার সাজ-সজ্জায় সজ্জিত ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একটি মজবুত অট্টালিকার কথা কেউ বলে এবং সেই সাথে বলে যে, এই অট্টালিকা এবং এতে যা কিছু আছে সবকিছুই নিজে নিজে নির্মিত হয়েছে কিংবা তা কোন নির্মাতা ছাড়া এমনিতেই হঠাৎ করে হয়ে গেছে, তাহলে অবশ্যই আপনি সাথে সাথে ঘটনাটি অস্বীকার করবেন এবং এরূপ সংবাদদাতাকে নির্দ্বিধায় মিথ্যুক বলবেন। তার গল্পকে আপনি উদ্ভট, কান্ডজ্ঞানহীন এবং মূর্খতাপূর্ণ কথাবার্তা বলেই সাব্যস্ত করবেন। সুতরাং একটি অট্টালিকার ক্ষেত্রে যদি তা আদৌ সম্ভব না হয়, তাহলে সুবিস্তৃত আকাশ, যমীন, গ্রহ-নক্ষত্র, তারকারাজি এবং অপূর্ব সুন্দর বিন্যাস ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনা সমৃদ্ধ এই সুবিশাল জগত, এসব কিছু কি এমনিতে নিজে নিজে অস্তিত্ব লাভ করেছে নাকি কোন সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত তা হঠাৎ করেই হয়ে গেছে?!

শারঈ প্রমাণ: আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে ইসলামী শারীআতের দালীল হলো, সকল আসমা'নী কিতাবেই এ বিষয়ের উচ্চারণ রয়েছে। তাছাড়া এসব আসমা'নী কিতাবে মানুষের জন্য উপকারী ও কল্যাণকর যে সব বিধিবিধান রয়েছে, এসবই এক দিকে যেমন মহান আল্লাহ প্রতিপালকত্বের প্রমাণ বহন করে, অন্য দিকে তা আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা এবং সৃষ্টিজগতের সার্বিক কল্যাণ সম্পর্কে তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞানের সাক্ষ্য দেয়। এছাড়া সকল আসমা'নী কিতাবে জাগতিক বিষয়ে যে সব সংবাদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবে প্রতিফলিত হয়ে একদিকে যেমন তা আল্লাহ প্রদত্ত ঐশী সংবাদসমূহের চির সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে, অন্যদিকে তা প্রমাণ বহন করছে যে, এ সবকিছুই আমাদের রব্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে সংঘটিত এবং তিনি যে সব বিষয়বস্তুর সংবাদ দিয়েছেন, সেসব কিছুকে তিনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করার তথা সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন।

মানবেন্দ্রিয় ভিত্তিক প্রমাণ: মানুষের ইন্দ্রিয় অনুভূতি দু'ভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করে:

প্রথমত আমরা শুনে থাকি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করি যে, মহান আল্লাহ্ দু'কারীর দু'আ কবুল করেন এবং বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। এ বিষয়গুলো অকাট্যভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَنُوحًا إِذْ نَادَى مِن قَبْلُ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ
"আর স্মরণ করুন নূহকে, পূর্বে তিনি যখন ডেকেছিলেন তখন তার ডাকে আমি সাড়া দিয়েছিলাম।”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ

"স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকট উদ্ধার প্রার্থনা করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।"

সাহীহ বুখারীতে আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: এক জুমুআহর দিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমুআহর খুতবা দিচ্ছিলেন এমতাবস্থায় আরবী এক গ্রাম্য লোক মসজিদে প্রবেশ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সমস্ত সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পরিবার-পরিজন অনাহারে নিপতিত হচ্ছে। অতএব আমাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট দু'আ করুন।

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর দু'হাত উঠালেন এবং আল্লাহ্র দরবারর দু'আ করলেন। সাথে সাথে আকাশে পাহাড়ের মত মেঘমালা বিস্তৃত হলো এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বার থেকে নামার পূর্বেই আমি (আনাস) দেখতে পেলাম, তার দাড়ি মুবারাক থেকে বৃষ্টির পানি টপকে পড়ছে। পরবর্তী জুমুআর দিন সেই একই লোক অথবা তাদের অন্য একজন দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! ঘর-বাড়ি ধসে পড়ছে, সম্পদ পানিতে ডুবে যাচ্ছে, কাজেই আমাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট দু'আ করুন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর হাত দুটো উঠালেন এবং বললেন, হে আল্লাহ্! আমাদের আশেপাশে বৃষ্টি দাও, আমাদের উপর না। একথা বলে মেঘে ঢাকা আকাশের যে দিকেই তিনি ইশারা করছিলেন সে দিকটি সাথে সাথে পরিষ্কার ও মেঘমুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

যারা দু'আ কবুল হওয়ার শর্ত পূরণ করে সত্যিকার অর্থে আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, আল্লাহ্ তাদের ডাকে সাড়া দেন এবং তাদের দু'আ কবুল করেন। বিষয়টি আজ অবধি প্রতিনিয়তই আমরা প্রত্যক্ষ করছি।

দ্বিতীয়ত নাবীগণের আলৌকিক নিদর্শনাবলি (মু'জিযা) যেগুলো মানবজাতি প্রত্যক্ষ করে অথবা যেগুলো সম্পর্কে তারা শুনে থাকে, সেগুলো তাঁদের প্রেরণকর্তা আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের অস্তিত্বের অকাট্য দালীল। কেননা এ সকল মু'জিযা হলো এমন সব বিষয়, যা মানুষের সাধ্য ও ক্ষমতা বহির্ভূত। এগুলো আল্লাহ্ নাবী-রাসূলদের সমর্থনে এবং সাহায্য করার উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকেন। এর কিছু দৃষ্টান্ত হলো:

প্রথম দৃষ্টান্ত: মূসা (আঃ) এর মু'জিযা, যখন আল্লাহ্ তাঁকে লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করতে নির্দেশ দিলেন এবং তিনি আল্লাহ্র নির্দেশানুযায়ী আঘাত করলেন, তখন সাথে সাথে সাগর বক্ষে পাহাড়ের মত পানির প্রাচীর ঘেরা বারটি শুকনো রাস্তা খুলে গেল। এ ঘটনা সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
فَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنِ اضْرِبُ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ فَانْفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَانَ طُودًا عَظِيمًا
“অতঃপর আমরা মূসার প্রতি ওয়াহী করলাম যে, আপনার লাঠি দ্বারা সাগরে আঘাত করুন। ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতের মত হয়ে গেল।”

দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: ঈসা( এর মু’জিযা, তিনি আল্লাহ্র নির্দেশে মৃতকে জীবিত করতেন এবং তাদেরকে কবর থেকে উঠিয়ে আনতেন।
এ বিষয়ে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَأَحْيِ الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللهِ
“আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে আমি মৃতকে জীবন্ত করি।”

ঈসা( এর মু’জিযা সম্পর্কে আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
وَإِذْ تُخْرِجُ الْمَوْتَى بِإِذْنِي
“আমার অনুমতিক্রমে আপনি মৃতকে জীবিত করতেন।”

তৃতীয় দৃষ্টান্ত: মুহাম্মাদ( এর মু’জিযা, যখন কুরাইশ গোত্রের লোকেরা তাঁর নিকট কোন আলৌকিক নিদর্শন প্রত্যক্ষ করতে চাইল, তখন তিনি তাঁর হাতের আঙ্গুল দিয়ে চাঁদের দিকে ইশারা করলেন, সাথে সাথে চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল এবং উপস্থিত সকল লোকই তা স্বচক্ষে দেখতে পেল।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ وَإِن يَرَوْا أَيَةً يَعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُسْتَمِرُّ

“কিয়ামত কাছাকাছি হয়েছে, আর চাঁদ খন্ডিত হয়েছে। আর তারা কোন নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা তো চিরাচরিত জাদু।”

এ সকল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অলৌকিক নিদর্শন বা মু'জিযা যেগুলো মহান আল্লাহ্ তাঁর নাবী-রাসূলদের সমর্থনে এবং সাহায্য করার উদ্দেশ্যে দিয়েছেন, সেগুলো অকাট্যভাবে আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ ও সাক্ষ্য বহন করে।

খ. তাঁর রুবুবিয়্যাহ বা প্রতিপালকত্বে ঈমান: আল্লাহ্র প্রতি ঈমান পোষণের মধ্যে যে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত, তন্মধ্যে দ্বিতীয় বিষয় হলো আল্লাহ্ রুবুবিয়্যাহ তথা তাঁর প্রতিপালক হওয়ার প্রতি এই মর্মে ঈমান পোষণ করা যে, মহান আল্লাহই হলেন একমাত্র রব, তাঁর কোন অংশীদার বা সহযোগী নেই।
রব্ব হলেন তিনি যিনি সৃষ্টি (خلق), রাজত্ব (ملك) ও হুকুম (أمر) প্রদানের একক অধিপতি। সুতরাং তিনি ব্যতীত কোন সৃষ্টিকর্তা নেই, তিনি ছাড়া আর কোন মালিক নেই এবং হুকুম বা বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র তাঁরই, অন্য কারো নয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ
“জেনে রাখ, সৃষ্টি করা ও আদেশ দান তাঁরই কাজ।”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِنَ قِطْمِيرٍ
"তিনিই আল্লাহ তোমাদের রব, সকল আধিপত্য তাঁরই। আর তোমরা যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ডাক, তারা তো খেজুরের আঁটির আবরণেরও অধিকারী নয়।"

সৃষ্টি জগতের কেউ (যে কোন ধর্ম পালনকারী ব্যক্তি) মহান আল্লাহ্র রুবুবিয়্যাতকে (পালনকর্তা হওয়াকে) অস্বীকার করেছে বলে জানা যায় না। তবে এমন কোন দাম্ভিক ও অহংকারী কেউ যদি থাকে, যার কথার সাথে তার বিশ্বাসের মিল নেই, তাহলে সেই কেবল আল্লাহ্ রুবুবিয়্যাতকে অস্বীকার করতে পারে, যেমনটি করেছিল ফিরআউন। সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল:
“আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ রব।”

আরো বলেছিল:
“হে পরিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলে জানি না!”

কিন্তু এ সবই ছিল ফিরআউনের মুখের কথা মাত্র। কথাগুলো সে অন্তর থেকে বলেনি। প্রকৃতপক্ষে তার আকীদাহ্ বা বিশ্বাস এরূপ ছিল না। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتُهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا
“আর তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে আল্লাহর নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে নিশ্চিত সত্য বলে গ্রহণ করেছিল।”

ফির'আউনকে (তার এসব মৌখিক দাবীর প্রেক্ষিতে) মূসা তাকে আল্লাহ্র ভাষায় বলেছিলেন:
قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَوتِ وَالْأَرْضُ
“মূসা বললেন, তুমি অবশ্যই জান যে, এসব স্পষ্ট নিদর্শন আসমানসমূহ ও যমীনের রব্ব আল্লাহই নাযিল করেছেন প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরুপ। আর হে ফির'আউনা আমি তো মনে করছি তুমি হবে ধ্বংসপ্রাপ্ত।”

কাজেই মুশরিকরা মহান আল্লাহ্ রুবুবিয়্যাতকে তথা আল্লাহকে পালনকর্তা বলে স্বীকার করতো, কিন্তু তারা আল্লাহ্ উলুহিয়্যাহ তথা ইবাদাতে তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত করতো। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
قُل لِّمَنِ الْأَرْضُ وَمَا فِيهَا إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ قُلْ مَن رَّبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ قُلْ مَن بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ
“বলুন, যমীন এবং এতে যা কিছু আছে এগুলোর মালিকানা কার? যদি (তোমরা জান (তবে বল)। অবশ্যই তারা বলবে, এগুলোর মালিকানা আল্লাহর। বলুন, তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না? বলুন, সাত আসমান ও মহান আরশের রব কে? অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ। বলুন, তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? বলুন, কার হাতে সমস্ত বস্তুর কর্তৃত্ব? যিনি আশ্রয় প্রদান করেন অথচ তাঁর বিপক্ষে কেউ কাউকে আশ্রয় দিতে পারে না, যদি তোমরা জান (তবে বল)। অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ। বলুন, তাহলে কোথা থেকে তোমরা জাদুগ্রস্থ হচ্ছ?”

আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ الْعَزِيزُ الْعَلِيمُ
“আর আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো তো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ।

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ مَّا خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ
“আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?”

আল্লাহর নির্দেশ বলতে জাগতিক এবং শারীআতগত উভয় প্রকার নির্দেশকেই বুঝায়। তিনি যেমন তাঁর হিকমাহ অনুযায়ী যা ইচ্ছা তাই বিশ্বজগতে সংঘটিত করে থাকেন, তেমনি ইবাদাত ও মুয়ামালাতের (পারস্পরিক লেনদেন, আচার-আচরণ ইত্যাদি) ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর পরম প্রজ্ঞা অনুযায়ী যে বিধান প্রবর্তন করতে চান, তাই করেন।
সুতরাং যে ব্যক্তি ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে বিধান প্রবর্তনকারী সাব্যস্ত করল কিংবা মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ফায়সালা প্রদানকারী সাব্যস্ত করল, সে অবশ্যই আল্লাহর সাথে শির্ক করল এবং ঈমানের দাবি বাস্তবায়ন করল না।

গ. তাঁর উলুহিয়্যাহ বা ইলাহ হওয়ার প্রতি ঈমান: অর্থাৎ এই মর্মে ঈমান পোষণ করা যে, তিনিই একমাত্র ইলাহ হওয়ার যোগ্য, অন্য কেউ নয় এবং তাঁর কোন অংশীদার নেই। এখানে ‘আল-ইলাহ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘আল মা’লুহ’ বা যার ইলাহত্ব আছে বা ‘আল-মা’বুদ’ বা যার ইবাদাত পাওয়ার যোগ্যতা আছে। আর সে ইবাদাত ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান সহকারে।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
وَإِلٰهُكُمْ إِلٰهٌ وَاحِدٌ لَّاۤ إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمٰنُ الرَّحِيْمُ
“আর তোমাদের ইলাহ হলেন এক ইলাহ। তিনি পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু, তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই।”

অন্য আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন:
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

“আল্লাহ সাক্ষ্য দেন এবং ফেরেশতাগণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।”

আল্লাহ্র সাথে অন্য যা কিছুকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে ইবাদাত করা হয়, তার উলুহিয়্যাহ বা ইবাদাতযোগ্য হওয়ার বিষয়টি বাতিল এবং ভিত্তিহীন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
ذلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
“এটা এজন্য যে, আল্লাহ - তিনিই হলেন সত্য এবং তাঁর পরিবর্তে তারা যাকে ডাকে সে তো বাতিল। আর আল্লাহ – তিনিই হলেন সমুচ্চ, সুমহান।”

কোন বাতিল উপাস্যকে ইলাহ বলে নামকরণ করা, এটা তাকে প্রকৃত মা'বুদ হওয়ার অধিকার প্রদান করে না। যেমন মুশরিকদের প্রধান তিন দেবতা লাত, উয্যা এবং মানাত সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءُ سَيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنَ سُلْطَنٍ
“তাঁকে (আল্লাহকে) ছেড়ে তোমরা শুধু কতগুলো নামের ইবাদাত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ। এগুলোর ব্যাপারে কোন প্রমাণ আল্লাহ নাযিল করেননি।”

হুদ সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন:

اتُجَادِلُونَنِي فِي أَسْمَاءِ سَيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَّا نَزَلَ اللهُ بِهَا مِنَ سُلْطَنٍ
“তবে কি তোমরা আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও এমন কতগুলো নাম সম্বন্ধে যেগুলোর নাম তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষরা রেখেছ, যে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন প্রমাণ নাযিল করেননি?”

ইউসুফ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেন যে, তিনি তার কারাবন্দী সাথীদ্বয়কে বলেছিলেন:
أَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ مَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنَ سُلْطَنٍ
“ভিন্ন ভিন্ন বহু রব্ব উত্তম, নাকি মহাপ্রতাপশালী এক আল্লাহ? তাঁকে ছেড়ে তোমরা শুধু কতগুলো নামের ইবাদাত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ। এগুলোর কোন প্রমাণ আল্লাহ নাযিল করেননি।”

আর এ কারণেই প্রত্যেক নাবী-রাসূল নিজ নিজ সম্প্রদায়কে একথাই বলতেন:
اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنَ الهِ غَيْرُهُ
“তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই।”

কিন্তু মুশরিকরা এই আহ্বানকে উপেক্ষা করেছিল এবং আল্লাহ্ ব্যতীত আরো অসংখ্য ইলাহ সাব্যস্ত করেছিল। তারা আল্লাহ্র সাথে সাথে সেই সব বাতিল মা'বুদের ইবাদাত করতো, তাদের কাছে সাহায্য চাইতো এবং তাদের কাছে বিপদ থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি কামনা করতো।

মুশরিকদের এ ধরনের উপাস্য নির্ধারণ করাকে আল্লাহ্ ২টি বুদ্ধিবৃত্তিক দালীল দিয়ে বাতিল সাব্যস্ত করেছেন:

প্রথমত: আল্লাহ্ ব্যতীত তারা যেসব উপাস্য নির্ধারণ করে থাকে, সেসবের মাঝে উলুহিয়্যাহ তথা ইলাহ বা মা'বুদ হওয়ার বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি নেই। কেননা সে সব উপাস্য নিজেরাই সৃষ্টি, কোন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাদের নেই। তারা তাদের উপাসকদের যেমন কোন উপকার করতে পারে না, তেমনি তাদেরকে কোন অনিষ্ট থেকেও রক্ষা করতে পারে না। এসব বাতিল উপাস্য তাদের উপাসকদের জীবন-মৃত্যুরও মালিক নয়। আসমা'নী কোন বিষয়ে তাদের কোন কর্তৃত্ব এবং অংশীদারিত্ব নেই। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَاتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً لَّا يَخْلُقُونَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَمْلِكُونَ لِأَنْفُسِهِمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيُوةً وَلَا نشورا
“আর তারা আল্লাহর পরিবর্তে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে অন্যদেরকে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। তারা নিজেদের অপকার কিংবা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। আর মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের উপরও তারা কোন ক্ষমতা রাখে না।”

অন্য আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِّن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَواتِ وَلَا فِي الْأَرْضُ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكِ وَمَا لَهُ مِنْهُمْ مِنَ ظَهِيرٍ وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَةً إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ
“বলুন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে করে ডাক, তারা আসমানসমূহ ও যমীনে অণু পরিমাণ জিনিসেরও মালিক নয়। আর এই দু'টিতে তাদের কোন অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ আল্লাহর সাহায্যকারীও নয়। আর আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন, সে ছাড়া আর কারো সুপারিশ তাঁর কাছে কোন কাজে আসবে না।

আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেন:
أَيُشْرِكُونَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَسْتَطِيعُونَ لَهُمْ نَصْرًا وَلَا أَنْفُسَهُمْ يُنْصِرُونَ
“তারা কি এমন কিছুকে শরীক সাব্যস্ত করে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট। ওরা না তাদেরকে সাহায্য করতে পারে, আর না নিজেদেরকে সাহায্য করতে পারে।”

আর যখন তথাকথিত ঐসব উপাস্যদের এই অবস্থা, সুতরাং তাদেরকে উপাস্য বলে গ্রহণ করা হলো চরম মূর্খতা এবং সবচেয়ে বড় অনর্থক ও বাতিল কাজ।

দ্বিতীয়ত: ঐসব মুশরিকরা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতে (প্রতিপালক হওয়াতে) আল্লাহর এককত্বকে স্বীকার করতো। তারা একথা স্বীকার করতো যে, মহান আল্লাহই হলেন একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এবং পালনকর্তা যার হাতে রয়েছে আসমান ও যমীনের সকল কিছুর মালিকানা ও কর্তৃত্ব। তিনিই একমাত্র আশ্রয় প্রদানকারী, তাঁর উপর আর কোন আশ্রয় প্রদানকারী নেই। সুতরাং তারা রুবুবিয়্যাহ তথা রব্ব হিসেবে যেমন আল্লাহর এককত্বকে স্বীকার করে, তেমনি তাদের জন্য আবশ্যক হলো উলুহিয়্যাহ তথা ইবাদাতেও আল্লাহর এককত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা।
যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ

“হে মানব সকলা তোমরা তোমাদের সেই রবের ইবাদাত কর যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারে। যিনি যমীনকে তোমাদের জন্য করেছেন বিছানা স্বরূপ ও আসমানকে করেছেন ছাদ স্বরুপ এবং আকাশ হতে পানি অবতীর্ণ করে তা দ্বারা তিনি তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। কাজেই তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিও না।”

অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّا خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ
“আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?”

মহান আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
قُلْ مَن يَرْزُقُكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضُ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَا يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَا يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ ، فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ فَذَلِكُمُ اللهُ رَبُّمُ الْحَقِّ ۚ فَمَا ذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَلُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ
“বলুন, কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে জীবন উপকরণ সরবরাহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, কে জীবিতকে মৃত থেকে বের করেন এবং কে মৃতকে জীবিত হতে বের করেন এবং সব বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন? তখন তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। সুতরাং বলুন, তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? অতএব তিনিই আল্লাহ, তোমাদের সত্য রব। সত্য চলে যাওয়ার পর বিভ্রান্তি ছাড়া আর কী থাকে? কাজেই তোমাদেরকে কোথায় ফেরানো হচ্ছে?”

ঘ. তাঁর আসমা ওয়াস সিফাত বা নাম ও গুণাবলির প্রতি ঈমান: অর্থাৎ কুরআন মাজীদ এবং নাবী (স) এর সুন্নাতে মহান আল্লাহ্ নিজের যে সকল নাম ও গুণাবলী বর্ণনা করেছেন সেগুলোকে কোনরূপ (পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন), (অস্বীকার ও বাতিলকরণ), (কৈফিয়ত দেওয়া), (সাদৃশ্য স্থাপন) না করে কুরআন-সুন্নাহ্ তে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবে এ সকল নাম ও গুণাবলির প্রতি ঈমান পোষণ করা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَابِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
"আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাক। আর যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন কর। তাদের কৃতকর্মের ফল অচিরেই তাদেরকে দেওয়া হবে। ”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى فِي السَّمَواتِ وَالْأَرْضُ، وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
“আসমানসমূহ ও যমীনে সর্বোচ্চ গুণাগুন তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, হিকমাহওয়ালা। ”

অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
"কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনিই সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।”

আসমা' ওয়াস সিফাতের ব্যাপারে পথভ্রষ্ট দলসমূহ: আল্লাহ্র আসমা' (নাম) ও সিফাতের (গুণাবলীর) প্রতি ঈমান আনয়নের ক্ষেত্রে দু'টি পথভ্রষ্ট দল:
ক. মুআত্তিলা সম্প্রদায়: যারা আল্লাহর সুমহান নাম ও গুণাবলিকে কিংবা এসবের মধ্য থেকে কোন কোনটিকে এই ধারণা বশত তারা অস্বীকার করে যে, যদি এগুলোকে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি বলে স্বীকার করা হয়, তাহলে আল্লাহর কোন সৃষ্টি বা মাখলুকের সাথে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাদৃশ্য স্থাপন করা হয়। মুয়াত্বিলা সম্প্রদায়ের এই ধারণা বেশ কয়েকটি কারণে সম্পূর্ণরূপে অমূলক ও বাতিল। যেমন:
১. তাদের এরূপ ধারণা একটি বাতিল বিষয়কে আবশ্যক করে দেয়। তা হচ্ছে, আল্লাহর বাণী বা কালামের এক আয়াত অন্য আয়াতের বিরোধী ও বিপরীত। এই ধারণা নিতান্তই বাতিল, কারণ মহান আল্লাহ্ স্বীয় সত্ত্বার জন্য বিভিন্ন নাম ও গুণাবলি প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর মত আর কোন কিছু নেই। আল্লাহ্ নাম ও গুণাবলিকে প্রতিষ্ঠিত করার কারণে যদি আসলেই সেগুলো সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়, তাহলে তো আল্লাহর কালামকে পরষ্পর বিরোধী বলতে হবে! আর বলতে হবে, আল্লাহ্র কালামের এক আয়াত অন্য আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে!
২. দুইটি জিনিসের একই নাম এবং একই গুণ হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো পরষ্পরের অনুরূপ বা একই রকম হবে, এটা আবশ্যক নয়। যেমন আপনি দুইজন ব্যক্তিকে দেখেন, তারা কিন্তু উভয়েই মানুষ এবং তারা উভয়েই শোনে, দেখে এবং কথা বলে। অর্থাৎ তাদের দু'জনের প্রত্যেকেই একই নাম ও গুণে গুণান্বিত। কিন্তু তাই বলে তাদের দু'জনের দেখা, শোনা, কথাবার্তা ও মানবীয় গুণাবলী অবশ্যই একই রকম নয়। এমনিভাবে জীবজন্তুর মাঝেও আপনি দেখবেন যে, তাদেরও হাত, পা এবং চোখ রয়েছে। তাই বলে প্রতিটি জীবজন্তুর হাত, পা এবং চোখ অবশ্যই একই রকম নয়।
কাজেই একই নাম ও গুণে গুণান্বিত হওয়া সত্ত্বেও সৃষ্টিকুলের পরস্পরের মাঝে যেখানে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান, তাহলে একই নাম বা গুণে গুণান্বিত হওয়া সত্ত্বেও মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ এবং তাঁর সৃষ্টির মাঝে পার্থক্য আরো ব্যাপক ও বিশাল।
খ. মুশাব্বিহা সম্প্রদায়: তারা আল্লাহ্র সুমহান নাম ও গুণাবলিকে স্বীকার করে বটে, তবে তারা আল্লাহ্র কোন সৃষ্টির সাথে এগুলোর সাদৃশ্য বা উপমা স্থাপন করে এবং সে অনুযায়ী তারা এগুলোর উপর বিশ্বাস পোষণ করে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা এই যে, কুরআন-সুন্নাহ তে আল্লাহ্ নাম ও গুণাবলির সাদৃশ্য বা উপমা স্থাপনের পক্ষে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা রয়েছে। আর তা হলো, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদরকে তাই বলে থাকেন যা তারা বুঝতে পারে। মুশাব্বিহা সম্প্রদায়ের এই ধারণা যে সব কারণে মিথ্যা ও বাতিল বলে গণ্য, তন্মধ্যে নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:

১. সৃষ্টির সাথে আল্লাহর সাদৃশ্যের বিষয়টি বিবেক-বুদ্ধি এবং ইসলামী শারীআত দ্বারা প্রত্যাখ্যাত এবং বাতিল বলে গণ্য। আর কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্য কোন বাতিল বিষয়ের দিকে আহ্বান জানাবে, এটা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব।
২. মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উদ্দেশ্যে নিজের নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে যা বলেছেন, মৌলিক বা বাহ্যিক অর্থের দিক দিয়ে তা বান্দাদের বোধগম্য ভাষাতেই বলেছেন। এসবের মূল বা বাহ্যিক অর্থ বান্দার বোধগম্য বটে, কিন্তু এই অর্থের প্রকৃত অবস্থা ও বৈশিষ্ট্য মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞানে রয়েছে, যা তাঁর জাত (সত্ত্বা) এবং গুণাবলির জন্য মানানসই।
যেমন মহান আল্লাহ নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন যে, তিনি হলেন সামী’ (সর্বশ্রোতা)। এখানে আমরা ‘সামউন’ (শ্রবণ) শব্দটির মৌলিক বা বাহ্যিক অর্থ সম্পর্কে অবগত। আর তা হলো, কোন শব্দ বা আওয়াজ শুনতে পাওয়া। কিন্তু এই শ্রবণের বিষয়টি যখন আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত হবে, তখন এর প্রকৃত অবস্থা আমাদের অজানা। তাছাড়া আল্লাহর বিভিন্ন মাখলুকের ক্ষেত্রে যেহেতু ‘শ্রবণের’ প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, অতএব মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এবং বিভিন্ন মাখলুকের শ্রবণের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের মাঝে পার্থক্য আরো ব্যাপক ও বিশাল।
এমনিভাবে মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর নিজের সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, তিনি আরশের উপর উঠেছেন। এখানে استوی ইসতিওয়া উপরে উঠা( শব্দের মূল অর্থ জ্ঞাত। কিন্তু এই ইসতিওয়া যখন মহান আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত হবে, তখন আরশের উপর তাঁর উঠার প্রকৃতি কী, তা কেবল আল্লাহই জানেন, অন্য কেউ নয়। আল্লাহর ক্ষেত্রে ইস্তাওয়ার প্রকৃত অবস্থা এবং কোন মাখলুকের ক্ষেত্রে এর অবস্থা কখনোই এক নয়। একটি স্থির চেয়ারের উপর উঠা আর দ্রুতবেগে চলা উটের পিঠে কষ্টকরভাবে উঠা এই দুইটি সমান নয়। সুতরাং যেখানে সৃষ্টির কোন কিছুর উপরে উঠার ক্ষেত্রেই এতো ভিন্নতা, সেখানে প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে মহান আল্লাহর ইস্তিওয়া আর সৃষ্ট বস্তুর উপরে উঠার মাঝে পার্থক্য আরো ব্যাপক ও বিশাল।

আল্লাহর প্রতি ঈমান এর ফলাফল
উপরোল্লিখিত আলোচনায় আল্লাহর প্রতি ঈমানের যে বিবরণ পেশ করা হলো, তা থেকে ঈমানদারদের জন্য যেসব মহা গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল বেরিয়ে আসে সেগুলো হলো:

১. মহান আল্লাহ্ তাওহীদ বা এককত্বকে এমনভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে কেবল আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো প্রতি আশা ও ভয় না থাকে এবং কেবল আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত না করা হয়।
২. আল্লাহ্র সুন্দর সুন্দর নামসমূহ এবং তাঁর সুমহান গুণাবলির দাবি অনুযায়ী আল্লাহ্র প্রতি পূর্ণ ভালবাসা ও মুহাব্বত পোষণ করা।
৩. আল্লাহ্ যা কিছু আদেশ দিয়েছেন সেগুলো যথাযথভাবে পালন করা এবং যা কিছু থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকা।

টিকাঃ
২৮৫ সহীহ বুখারী হা/১৩৫৮, মুসলিম হা/২৬৫৮; আহমাদ হা/৮১৭৯; মিশকাত হা/৯০।
286 সূরা আত্-তূর ৫২: ৩৫
287 সূরা আত্-তূর ৫২: ৩৫-৩৭
288 সাহীহ বুখারী: হা/৪৮৫৪, মুসনাদুল হুমায়দী হা/৫৬৬; বায়হাকী, আসমা ওয়াস-সিফাত হা/৮৩৪।
২৮৯ 'সূরা আল-আম্বিয়া' ২১: ৭৬
290 সূরা আল-আনফাল ৮:৯
291 সাহীহ বুখারী: হা/৯৩৩, মুসলিম হা/৮৯৭; নাসাঈ হা/১৫২৮; মিশকাত হা/৫৯০২।
২৯২ সূরা আশ-শুআরা ২৬ : ৬৩
২৯৩ সূরা আল ইমরান ৩ : ৪৯
২৯৪ সূরা আল-মায়িদাহ ৫ : ১১০
295 সূরা আল-কামার ৫৪: ১-২
296 সূরা আল-আ'রাফ ৭:৫৪
297 সূরা আল-ফাতির ৩৫: ১৩
298 সূরা আন্-নাযিআত ৭৯: ২৪
299 সূরা আল-কাসাস ২৮: ৩৮
300 সূরা আন্-নামল ২৭: ১৪
301 সূরা আল-ইসরা' (বানী ইসরাঈল) ১৭: ১০২
302 সূরা আল-মুমিনূন ২৩ : ৮৪-৮৯
303 সূরা আয-যুখরুফ ৪৩: ৯
304 সূরা আয-যুখরুফ ৪৩: ৮৭
305 সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৬৩
306 সূরা আলু ইমরান: ১৮
307 সূরা আল-হাজ্জ ২২: ৬২
308 সূরা আন-নাজম ৫৩: ২৩
309 সূরা আল-আ'রাফ ৭:৭১
310 সূরা ইউসুফ ১২: ৩৯-৪০
311 সূরা আল-আ'রাফ ৭:৫৯
312 সূরা আল-ফুরকান ২৫: ৩
৩১৩ সূরা সাবা ৩৪: ২২-২৩
৩১৪ সূরা আল-আ’রাফ ৭: ১৯১-১৯২
315 সূরা আল-বাকারাহ ২: ২১-২২
316 সূরা আয-যুখরুফ ৪৩: ৮৭
317 সূরা ইউনুস ১০: ৩১-৩২
318 সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৮০
319 সূরা আর-রুম ৩০: ২৭
320 সূরা আশ-শুরা ৪২: ১১

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল

📄 ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল


আর তাঁর মালায়িকাহ বা ফেরেশতাগণের প্রতি'।

মালায়িকাহ বা ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান
১. ফেরেশতারা হলেন আল্লাহ্র সৃষ্টি এবং অদৃশ্য জগতের বাসিন্দা। তারা সর্বদা আল্লাহ্ ইবাদাতে মশগুল থাকেন। তাদের মাঝে রুবুবিয়্যাহ বা উলুহিয়্যাহ্র কোন কিছুই নেই। মহান আল্লাহ্ তাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর আদেশের প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্যশীল ও আত্মসমর্পণকারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। একই সাথে তাদেরকে আল্লাহ্ তাঁর হুকুম বাস্তবায়নের শক্তি- সামর্থ্য দান করেছেন। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَمَا عِنْدَةً لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ
"আর তাঁর সান্নিধ্যে যারা আছে তারা অহংকার বশে তাঁর ইবাদাত করা হতে বিমুখ হয় না এবং বিরক্তি বোধ করে না। তারা রাত-দিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং ক্লান্তও হয় না।”

ফেরেশতারা সংখ্যায় অনেক। তাদের সঠিক সংখ্যা কেবল আল্লাহই জানেন। সাহীহ বুখারী ও মুসলিমে আনাস () থেকে বর্ণিত মি'রাজের ঘটনা সম্পর্কিত হাদীসে রয়েছে যে, মি'রাজের রজনীতে ঊর্ধ্বাকাশের 'বাইতুল মা'মূর' রাসূল () এর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা সলাত আদায় করেন। সলাت আদায় করা শেষ হলে তারা সেখান থেকে বের হয়ে যান এবং আর সেখানে তারা ফিরে আসেন না।

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান পোষণ করার মাঝে ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
ক. তাদের অস্তিত্বের প্রতি ঈমান পোষণ করা।
খ. তাদের মধ্য থেকে যাদের নাম আমরা জানি (যেমন জিবরীল), নাম সহকারে তাদের প্রতি ঈমান পোষণ করা এবং যাদের নাম আমাদের জানা নেই তাদের প্রতি সাধারণভাবে ঈমান পোষণ করা।
গ. ফেরেশতাদের মধ্য থেকে যাদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা অবগত, তার প্রতি ঈমান পোষণ। যেমন জিবরীল এর গুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তিনি তাকে তার সৃষ্টিগত আসল রূপে ও আকৃতিতে দেখেছেন। তার ৬০০টি ডানা রয়েছে, যা দিগন্তকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।
কখনো কখনো কোন কোন ফেরেশতা আল্লাহর নির্দেশে মানুষের রূপ ধারণ করে থাকেন। যেমন: জিবরীল কে আল্লাহ যখন মারইয়াম এর ওয়াস নিকট পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর নিকট মানুষরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। অনুরূপভাবে রাসূল (ﷺ) একদিন যখন তাঁর সাহাবায়ি কিরামদের নিয়ে বৈঠকরত অবস্থায় ছিলেন, তখন জিবরাঈল ধবধবে সাদা কাপড় পরিহিত এবং ঘন-কালো কেশে এমন এক মানুষের বেশে রাসূল (ﷺ) এর নিকট হাযির হয়েছিলেন, যার মাঝে সফর করার কোন ছাপ দেখা যাচ্ছিল না। আবার বৈঠকে উপস্থিত কোন সাহাবীর কাছে তাকে পরিচিত বলেও মনে হচ্ছিল না। তিনি এসে রাসূল (ﷺ) এর পাশে গিয়ে তাঁর হাঁটুর সাথে নিজের হাঁটু লাগিয়ে বসলেন এবং তাঁর হাত দু'টি তার উরুতে রাখলেন, অতঃপর রাসূল (ﷺ) কে ইসলাম, ঈমান, ইহসান এবং কিয়ামাহ ও এর আলামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। রাসূল (ﷺ) তাকে এগুলোর উত্তর দিলেন। এরপর জিবরীল (ﷺ) চলে গেলেন। অতঃপর রাসূল (ﷺ) উপস্থিত সাহাবায়ি কিরামকে লক্ষ করে বললেন:
فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمُكُمْ دِينَكُمْ
'ইনি হলেন জিবরীল তিনি এসেছিলেন তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শেখাতে'।

এমনিভাবে মহান আল্লাহ্ যে সকল ফেরেশতাকে ইবরাহীম এবং লুত্ব এর নিকট পাঠিয়েছিলেন তারাও তাদের নিকট মানুষের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন।
ঘ. ফেরেশতাগণ আল্লাহ্র নির্দেশে যেসব কাজ করে থাকেন বলে আমরা অবগত হয়েছি, সেসবের প্রতি ঈমান পোষণ করা। যেমন ফেরেশতারা রাত-দিন আল্লাহ্ তাসবীহ এবং তাঁর ইবাদাত করে থাকেন এবং এতে তারা কোনরূপ ক্লান্তি বা অবসাদ বোধ করেন না।
ফেরেশতাদের মধ্যে কারো কারো বিশেষ কিছু কাজ বা দায়িত্ব রয়েছে। যেমন:
১. জিবরীল, তিনি আল্লাহ্র ওয়াইয়ীর ব্যাপারে বিশ্বস্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত। আল্লাহ্ তাকে নাবী-রাসূলদের নিকট ওয়াইয়ী দিয়ে প্রেরণ করেন。
২. মীকাঈল, তিনি বৃষ্টি বর্ষণ ও তৃণ-উদ্ভিদ উৎপাদনের দায়িত্বে নিয়োজিত।
৩. ইসরাফীল, তিনি কিয়ামাতের ঘণ্টা প্রতিষ্ঠার সময় ও সৃষ্টিজগতের পুনরুত্থানের সময় শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত।
৪. মালাকুল মাউত, তিনি মানুষের মৃত্যুর সময় প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত।
৫. মালিক, তিনি জাহান্নামের অগ্নিকুন্ডের দায়িত্বে নিয়োজিত এবং জাহান্নামের প্রহরী।
(৬) কিছু ফেরেশতা আছেন যারা মাতৃগর্ভস্থ সন্তানের দায়িত্বে নিয়োজিত। মাতৃগর্ভে যখন কোন সন্তানের ৪ মাস পূর্ণ হয়, তখন আল্লাহ্ তার প্রতি একজন ফেরেশতা পাঠান এবং তাকে সেই সন্তানের রিয্ক, হায়াত, আমল এবং সে সৌভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা, এসব লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
(৭) কিছু ফেরেশতা আছেন যারা প্রতিটি আদম সন্তানের কাজকর্ম সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করে রাখেন। এ কাজের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট দু'জন ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের একজন আছেন ডানপাশে এবং অপরজন বামপাশে।
(৮) এমনিভাবে আরো কিছু ফেরেশতা রয়েছেন যারা কোন মৃত ব্যক্তিকে কবরে প্রশ্ন করার দায়িত্বে নিয়োজিত। কোন মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর দু'জন ফেরেশতা তার কবরে আসেন এবং তাকে তার রব, তার দ্বীন এবং তার নাবী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

মালায়িকাহর প্রতি ঈমান এর ফলাফল: ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান পোষণ যেসব গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল প্রদান করে তন্মধ্যে কয়েকটি হলো:
ক. আল্লাহ্র মহত্ত্ব, অপরিসীম শক্তি এবং তাঁর মহান ক্ষমতা ও রাজত্ব সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা। কেননা কোন সৃষ্টির মহত্ত্বের মাঝেই সৃষ্টিকর্তার মহত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।
খ. যেহেতু মহান আল্লাহ্ প্রতিটি আদম সন্তানের দেখাশোনা, তাদের কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করা এবং মানবজাতির আরো অগণিত কল্যাণার্থে বিভিন্ন ফেরেশতা নিয়োজিত করে রেখেছেন, কাজেই ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান পোষণের মাধ্যমে আল্লাহ্র এসব বিশেষ অনুগ্রহের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা হয়।
গ. ফেরেশতাগণ সর্বদা মহান আল্লাহ্র ইবাদাতে মশগুল থাকেন, তাই তাদের প্রতি মুহাব্বত ও ভালবাসা পোষণ করা হয়।

মালায়িকার দেহ অস্বীকারকারীদের রদ: পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী কোন কোন সম্প্রদায় ফেরেশতাদের দেহ ও আকার বিশিষ্ট হওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করে। তারা বলে, সৃষ্টির মাঝে লুকায়িত যে কল্যাণী শক্তি রয়েছে, তাই হলো ফেরেশতা। তাদের এই দাবিটি মূলত কুরআন মাজীদ, সুন্নাতে রাসূল (ﷺ) এবং মুসলিমদের ইজমা'কে মিথ্যা সাব্যস্ত করার নামান্তর।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ فَاطِرِ السَّمَٰوَاتِ وَالْأَرْضِ جَاعِلِ الْمَلَٰۤئِكَةِ رُسُلًا أُولِىۤ أَجْنِحَةٍ مَّثْنٰىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ
"সকল প্রশংসা আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহরই, যিনি ফিরিশতাদেরকে দূত বানিয়েছেন যারা দুই দুই, তিন তিন অথবা চার চার পাখাবিশিষ্ট।"

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ تَرَىٰۤ إِذْ يَّتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلٰۤئِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ

“আর আপনি যদি দেখতে পেতেন যখন ফেরেশতাগণ তাদের প্রাণ হরণ করছিল যারা কুফরী করেছে এবং তাদের মুখমণ্ডলে ও পিঠে আঘাত করছিল।”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّلِمُونَ فِي غَمَرَتِ الْمَوْتِ وَالْمَلَيْكَةُ بَاسِطُوا أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُوا أَنْفُسَكُمْ
“আর যদি আপনি দেখতে পেতেন, যখন যালিমরা মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকবে এবং ফেরেশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, তোমাদের প্রাণ বের করে দাও।”

অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
حَتَّى إِذَا فَرْعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقِّ ۚ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
‘অবশেষে যখন তাদের (আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা কিংবা সুপারিশের অনুমতিপ্রাপ্তদের) অন্তর থেকে ভয় বিদূরিত হবে, তখন তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তোমাদের রব্ব কী বললেন? এর উত্তরে তারা বলবে, যা সত্য তিনি তা-ই বলেছেন। আর তিনি সমুচ্চ, সুমহান।’

আর জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَالْمَلَيْكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِّن كُلِّ بَابٍ سَلَّمٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ
“আর ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে এবং বলবে, তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি সালাম। আর পরকালের এই আবাস প্রতিদান হিসেবে কতই না উত্তম!”

সাহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা ( ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا نَادَى جِبْرِيلَ إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنَادِي جِبْرِيلُ فِي السَّمَاءِ إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ وَيُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي أَهْলِ الْأَرْضِ
'আল্লাহ্ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন, তখন তিনি জিব্রীল ( ) কে ডেকে বলেন, আল্লাহ্ অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, অতএব তুমিও তাকে ভালবাস। ফলে জিব্রীল ( ) তাকে ভালবাসেন। অতঃপর জিব্রীল ( ) আসমানে এ ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ্ অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, তোমরাও তাকে ভালবাস। তখন তাকে আসমানবাসীরা ভালবাসে এবং পৃথিবীবাসীদের মধ্যেও তাকে কবুল করে নেওয়া হয়।

আবু হুরায়রা ( ) থেকে বর্ণিত আরও একটি হাদীসে রাসূল ইরশাদ করেছেন:
إِذَا كَانَ يَوْمُ الْجُمُعَةِ، وَقَفَتِ الْمَلَائِكَةُ عَلَى بَابِ الْمَسْجِدِ يَكْتُبُونَ الأَوَّلَ فَالأَوَّلَ، وَمَثَلُ الْمُهَجِّرِ كَمَثَلِ الَّذِي يُهْدِي بَدَنَةً، ثُمَّ كَالَّذِي يُهْدِي بَقَرَةً، ثُمَّ كَبْشًا، ثُمَّ دَجَاجَةً، ثُمَّ بَيْضَةً، فَإِذَا خَرَجَ الإِمَامُ طَوَوْا صُحُفَهُمْ، وَيَسْتَمِعُونَ الذَّكْرَ
'জুমু'আর দিন মসজিদের দরজায় মালাইকা (ফেরেশতাগণ) অবস্থান করেন এবং ক্রমানুসারে আগে আগে যারা আসেন তাদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার পূর্বে আসে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি মোটাতাজা উট কুরবানী করে। অতঃপর যে আসে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি গাভী কুরবানী করে। অতঃপর আগমনকারী ব্যক্তি মুরগি দানকারীর ন্যায়। অতঃপর আগমনকারী ব্যক্তি একটি ডিম দানকারীর ন্যায়। অতঃপর ইমাম যখন খুতবা দিতে বের হন তখন মালাইকা (ফেরেশতাগণ) তাঁদের খাতা বন্ধ করে দিয়ে মনোযোগ সহকারে খুতবা শ্রবণ করতে থাকেন।

অতএব কুরআন-হাদীসের এসব দালীল দ্বারা একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ফেরেশতাগণ দেহ ও আকৃতি সম্বলিত সৃষ্টি। তারা মানুষের ভাবগত শক্তি নয়, যেমনটি দাবী করে থাকে পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী লোকজন। এ ব্যাপারে উপরোল্লিখিত কুরআন-সুন্নাহর দালীলের ভিত্তিতে মুসলিমদের ইজমা' রয়েছে।

টিকাঃ
321 সূরা আল-আমবিয়া' ২১: ১৯-২০
৩২২ সহীহ মুসলিম: হা/১, আহমাদ হা/৩৬৭; আবু দাউদ হা/৪৬৯৫; মিশকাত হা/২।
৩২৩ সূরা আল-ফাতির ৩৫: ১
324 সূরা আল-আনফাল ৮:৫০
325 সূরা আল-আনআম ৬:৯৩
326 সূরা সাবা ৩৪: ২২-২৩
327 সূরা আর-রা'দ ১৩: ২৩-২৪
৩২৮ সহীহ বুখারী: হা/৭৪৮৫, মুসলিম হা/২৬৩৭; আহমাদ হা/৮৫০০; সহীহ ইবনু হিব্বان হা/৩৬৫; মিশকাত হা/৫০০৫।
৩২৯ সহীহ বুখারী: হা/৯২৯, আহমাদ হা/১০৫৬৮; বায়হাকী কুবরা হা/৫৮৬২; মিশকাত হা/১৩৮৪。

আর তাঁর মালায়িকাহ বা ফেরেশতাগণের প্রতি'।

মালায়িকাহ বা ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান
১. ফেরেশতারা হলেন আল্লাহ্র সৃষ্টি এবং অদৃশ্য জগতের বাসিন্দা। তারা সর্বদা আল্লাহ্ ইবাদাতে মশগুল থাকেন। তাদের মাঝে রুবুবিয়্যাহ বা উলুহিয়্যাহ্র কোন কিছুই নেই। মহান আল্লাহ্ তাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর আদেশের প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্যশীল ও আত্মসমর্পণকারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। একই সাথে তাদেরকে আল্লাহ্ তাঁর হুকুম বাস্তবায়নের শক্তি- সামর্থ্য দান করেছেন। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَمَا عِنْدَةً لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ
"আর তাঁর সান্নিধ্যে যারা আছে তারা অহংকার বশে তাঁর ইবাদাত করা হতে বিমুখ হয় না এবং বিরক্তি বোধ করে না। তারা রাত-দিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং ক্লান্তও হয় না।”

ফেরেশতারা সংখ্যায় অনেক। তাদের সঠিক সংখ্যা কেবল আল্লাহই জানেন। সাহীহ বুখারী ও মুসলিমে আনাস () থেকে বর্ণিত মি'রাজের ঘটনা সম্পর্কিত হাদীসে রয়েছে যে, মি'রাজের রজনীতে ঊর্ধ্বাকাশের 'বাইতুল মা'মূর' রাসূল () এর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা সলাত আদায় করেন। সলাت আদায় করা শেষ হলে তারা সেখান থেকে বের হয়ে যান এবং আর সেখানে তারা ফিরে আসেন না।

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান পোষণ করার মাঝে ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
ক. তাদের অস্তিত্বের প্রতি ঈমান পোষণ করা।
খ. তাদের মধ্য থেকে যাদের নাম আমরা জানি (যেমন জিবরীল), নাম সহকারে তাদের প্রতি ঈমান পোষণ করা এবং যাদের নাম আমাদের জানা নেই তাদের প্রতি সাধারণভাবে ঈমান পোষণ করা।
গ. ফেরেশতাদের মধ্য থেকে যাদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা অবগত, তার প্রতি ঈমান পোষণ। যেমন জিবরীল এর গুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তিনি তাকে তার সৃষ্টিগত আসল রূপে ও আকৃতিতে দেখেছেন। তার ৬০০টি ডানা রয়েছে, যা দিগন্তকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।
কখনো কখনো কোন কোন ফেরেশতা আল্লাহর নির্দেশে মানুষের রূপ ধারণ করে থাকেন। যেমন: জিবরীল কে আল্লাহ যখন মারইয়াম এর ওয়াস নিকট পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর নিকট মানুষরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। অনুরূপভাবে রাসূল (ﷺ) একদিন যখন তাঁর সাহাবায়ি কিরামদের নিয়ে বৈঠকরত অবস্থায় ছিলেন, তখন জিবরাঈল ধবধবে সাদা কাপড় পরিহিত এবং ঘন-কালো কেশে এমন এক মানুষের বেশে রাসূল (ﷺ) এর নিকট হাযির হয়েছিলেন, যার মাঝে সফর করার কোন ছাপ দেখা যাচ্ছিল না। আবার বৈঠকে উপস্থিত কোন সাহাবীর কাছে তাকে পরিচিত বলেও মনে হচ্ছিল না। তিনি এসে রাসূল (ﷺ) এর পাশে গিয়ে তাঁর হাঁটুর সাথে নিজের হাঁটু লাগিয়ে বসলেন এবং তাঁর হাত দু'টি তার উরুতে রাখলেন, অতঃপর রাসূল (ﷺ) কে ইসলাম, ঈমান, ইহসান এবং কিয়ামাহ ও এর আলামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। রাসূল (ﷺ) তাকে এগুলোর উত্তর দিলেন। এরপর জিবরীল (ﷺ) চলে গেলেন। অতঃপর রাসূল (ﷺ) উপস্থিত সাহাবায়ি কিরামকে লক্ষ করে বললেন:
فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمُكُمْ دِينَكُمْ
'ইনি হলেন জিবরীল তিনি এসেছিলেন তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শেখাতে'।

এমনিভাবে মহান আল্লাহ্ যে সকল ফেরেশতাকে ইবরাহীম এবং লুত্ব এর নিকট পাঠিয়েছিলেন তারাও তাদের নিকট মানুষের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন।
ঘ. ফেরেশতাগণ আল্লাহ্র নির্দেশে যেসব কাজ করে থাকেন বলে আমরা অবগত হয়েছি, সেসবের প্রতি ঈমান পোষণ করা। যেমন ফেরেশতারা রাত-দিন আল্লাহ্ তাসবীহ এবং তাঁর ইবাদাত করে থাকেন এবং এতে তারা কোনরূপ ক্লান্তি বা অবসাদ বোধ করেন না।
ফেরেশতাদের মধ্যে কারো কারো বিশেষ কিছু কাজ বা দায়িত্ব রয়েছে। যেমন:
১. জিবরীল, তিনি আল্লাহ্র ওয়াইয়ীর ব্যাপারে বিশ্বস্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত। আল্লাহ্ তাকে নাবী-রাসূলদের নিকট ওয়াইয়ী দিয়ে প্রেরণ করেন。
২. মীকাঈল, তিনি বৃষ্টি বর্ষণ ও তৃণ-উদ্ভিদ উৎপাদনের দায়িত্বে নিয়োজিত।
৩. ইসরাফীল, তিনি কিয়ামাতের ঘণ্টা প্রতিষ্ঠার সময় ও সৃষ্টিজগতের পুনরুত্থানের সময় শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত।
৪. মালাকুল মাউত, তিনি মানুষের মৃত্যুর সময় প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত।
৫. মালিক, তিনি জাহান্নামের অগ্নিকুন্ডের দায়িত্বে নিয়োজিত এবং জাহান্নামের প্রহরী।
(৬) কিছু ফেরেশতা আছেন যারা মাতৃগর্ভস্থ সন্তানের দায়িত্বে নিয়োজিত। মাতৃগর্ভে যখন কোন সন্তানের ৪ মাস পূর্ণ হয়, তখন আল্লাহ্ তার প্রতি একজন ফেরেশতা পাঠান এবং তাকে সেই সন্তানের রিয্ক, হায়াত, আমল এবং সে সৌভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা, এসব লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
(৭) কিছু ফেরেশতা আছেন যারা প্রতিটি আদম সন্তানের কাজকর্ম সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করে রাখেন। এ কাজের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট দু'জন ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের একজন আছেন ডানপাশে এবং অপরজন বামপাশে।
(৮) এমনিভাবে আরো কিছু ফেরেশতা রয়েছেন যারা কোন মৃত ব্যক্তিকে কবরে প্রশ্ন করার দায়িত্বে নিয়োজিত। কোন মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর দু'জন ফেরেশতা তার কবরে আসেন এবং তাকে তার রব, তার দ্বীন এবং তার নাবী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

মালায়িকাহর প্রতি ঈমান এর ফলাফল: ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান পোষণ যেসব গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল প্রদান করে তন্মধ্যে কয়েকটি হলো:
ক. আল্লাহ্র মহত্ত্ব, অপরিসীম শক্তি এবং তাঁর মহান ক্ষমতা ও রাজত্ব সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা। কেননা কোন সৃষ্টির মহত্ত্বের মাঝেই সৃষ্টিকর্তার মহত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।
খ. যেহেতু মহান আল্লাহ্ প্রতিটি আদম সন্তানের দেখাশোনা, তাদের কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করা এবং মানবজাতির আরো অগণিত কল্যাণার্থে বিভিন্ন ফেরেশতা নিয়োজিত করে রেখেছেন, কাজেই ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান পোষণের মাধ্যমে আল্লাহ্র এসব বিশেষ অনুগ্রহের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা হয়।
গ. ফেরেশতাগণ সর্বদা মহান আল্লাহ্র ইবাদাতে মশগুল থাকেন, তাই তাদের প্রতি মুহাব্বত ও ভালবাসা পোষণ করা হয়।

মালায়িকার দেহ অস্বীকারকারীদের রদ: পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী কোন কোন সম্প্রদায় ফেরেশতাদের দেহ ও আকার বিশিষ্ট হওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করে। তারা বলে, সৃষ্টির মাঝে লুকায়িত যে কল্যাণী শক্তি রয়েছে, তাই হলো ফেরেশতা। তাদের এই দাবিটি মূলত কুরআন মাজীদ, সুন্নাতে রাসূল (ﷺ) এবং মুসলিমদের ইজমা'কে মিথ্যা সাব্যস্ত করার নামান্তর।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ فَاطِرِ السَّمَٰوَاتِ وَالْأَرْضِ جَاعِلِ الْمَلَٰۤئِكَةِ رُسُلًا أُولِىۤ أَجْنِحَةٍ مَّثْنٰىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ
"সকল প্রশংসা আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহরই, যিনি ফিরিশতাদেরকে দূত বানিয়েছেন যারা দুই দুই, তিন তিন অথবা চার চার পাখাবিশিষ্ট।"

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ تَرَىٰۤ إِذْ يَّتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلٰۤئِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ

“আর আপনি যদি দেখতে পেতেন যখন ফেরেশতাগণ তাদের প্রাণ হরণ করছিল যারা কুফরী করেছে এবং তাদের মুখমণ্ডলে ও পিঠে আঘাত করছিল।”

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন:
وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّلِمُونَ فِي غَمَرَتِ الْمَوْتِ وَالْمَلَيْكَةُ بَاسِطُوا أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُوا أَنْفُسَكُمْ
“আর যদি আপনি দেখতে পেতেন, যখন যালিমরা মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকবে এবং ফেরেশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, তোমাদের প্রাণ বের করে দাও।”

অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
حَتَّى إِذَا فَرْعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقِّ ۚ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
‘অবশেষে যখন তাদের (আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা কিংবা সুপারিশের অনুমতিপ্রাপ্তদের) অন্তর থেকে ভয় বিদূরিত হবে, তখন তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তোমাদের রব্ব কী বললেন? এর উত্তরে তারা বলবে, যা সত্য তিনি তা-ই বলেছেন। আর তিনি সমুচ্চ, সুমহান।’

আর জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَالْمَلَيْكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِّن كُلِّ بَابٍ سَلَّمٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ
“আর ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে এবং বলবে, তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি সালাম। আর পরকালের এই আবাস প্রতিদান হিসেবে কতই না উত্তম!”

সাহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা ( ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا نَادَى جِبْرِيلَ إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنَادِي جِبْرِيلُ فِي السَّمَاءِ إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ وَيُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي أَهْলِ الْأَرْضِ
'আল্লাহ্ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন, তখন তিনি জিব্রীল ( ) কে ডেকে বলেন, আল্লাহ্ অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, অতএব তুমিও তাকে ভালবাস। ফলে জিব্রীল ( ) তাকে ভালবাসেন। অতঃপর জিব্রীল ( ) আসমানে এ ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ্ অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, তোমরাও তাকে ভালবাস। তখন তাকে আসমানবাসীরা ভালবাসে এবং পৃথিবীবাসীদের মধ্যেও তাকে কবুল করে নেওয়া হয়।

আবু হুরায়রা ( ) থেকে বর্ণিত আরও একটি হাদীসে রাসূল ইরশাদ করেছেন:
إِذَا كَانَ يَوْمُ الْجُمُعَةِ، وَقَفَتِ الْمَلَائِكَةُ عَلَى بَابِ الْمَسْجِدِ يَكْتُبُونَ الأَوَّلَ فَالأَوَّلَ، وَمَثَلُ الْمُهَجِّرِ كَمَثَلِ الَّذِي يُهْدِي بَدَنَةً، ثُمَّ كَالَّذِي يُهْدِي بَقَرَةً، ثُمَّ كَبْشًا، ثُمَّ دَجَاجَةً، ثُمَّ بَيْضَةً، فَإِذَا خَرَجَ الإِمَامُ طَوَوْا صُحُفَهُمْ، وَيَسْتَمِعُونَ الذَّكْرَ
'জুমু'আর দিন মসজিদের দরজায় মালাইকা (ফেরেশতাগণ) অবস্থান করেন এবং ক্রমানুসারে আগে আগে যারা আসেন তাদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার পূর্বে আসে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি মোটাতাজা উট কুরবানী করে। অতঃপর যে আসে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি গাভী কুরবানী করে। অতঃপর আগমনকারী ব্যক্তি মুরগি দানকারীর ন্যায়। অতঃপর আগমনকারী ব্যক্তি একটি ডিম দানকারীর ন্যায়। অতঃপর ইমাম যখন খুতবা দিতে বের হন তখন মালাইকা (ফেরেশতাগণ) তাঁদের খাতা বন্ধ করে দিয়ে মনোযোগ সহকারে খুতবা শ্রবণ করতে থাকেন।

অতএব কুরআন-হাদীসের এসব দালীল দ্বারা একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ফেরেশতাগণ দেহ ও আকৃতি সম্বলিত সৃষ্টি। তারা মানুষের ভাবগত শক্তি নয়, যেমনটি দাবী করে থাকে পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী লোকজন। এ ব্যাপারে উপরোল্লিখিত কুরআন-সুন্নাহর দালীলের ভিত্তিতে মুসলিমদের ইজমা' রয়েছে।

টিকাঃ
321 সূরা আল-আমবিয়া' ২১: ১৯-২০
৩২২ সহীহ মুসলিম: হা/১, আহমাদ হা/৩৬৭; আবু দাউদ হা/৪৬৯৫; মিশকাত হা/২।
৩২৩ সূরা আল-ফাতির ৩৫: ১
324 সূরা আল-আনফাল ৮:৫০
325 সূরা আল-আনআম ৬:৯৩
326 সূরা সাবা ৩৪: ২২-২৩
327 সূরা আর-রা'দ ১৩: ২৩-২৪
৩২৮ সহীহ বুখারী: হা/৭৪৮৫, মুসলিম হা/২৬৩৭; আহমাদ হা/৮৫০০; সহীহ ইবনু হিব্বان হা/৩৬৫; মিশকাত হা/৫০০৫।
৩২৯ সহীহ বুখারী: হা/৯২৯, আহমাদ হা/১০৫৬৮; বায়হাকী কুবরা হা/৫৮৬২; মিশকাত হা/১৩৮৪。

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল

📄 কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল


আর তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি'।

কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান
১. 'কুতুব' হলো 'কিতাব' শব্দের বহুবচন যার অর্থ হলো, যা কিছু লিখিত হয়েছে। এখানে কিতাবসমূহ বলতে সেই সব কিতাবকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূলগণের প্রতি জগতবাসীর জন্য রহমত ও হিদায়াত স্বরূপ নাযিল করেছেন, যাতে করে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে সার্বিক কল্যাণ লাভ করতে পারে।
কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান পোষণের মাঝে ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
ক. এই ঈমান পোষণ করা যে, এসব কিতাব নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে।
ख. এসব আসমা'নী কিতাবের মধ্য থেকে যেগুলোর নাম আমরা জানতে পেরেছি, নামসহ সেগুলোর উপর ঈমান পোষণ করা। যেমন কুরআন মাজীদ নাযিল হয়েছে মুহাম্মাদ (আ.) এর উপর, তাওরাত নাযিল হয়েছে মূসা (আ.) এর উপর, ইনজিল নাযিল হয়েছে ঈসা (আ.) এর উপর এবং যাবুর নাযিল হয়েছে দাউদ (আ.) এর উপর। আর যে সব কিতাবের নাম আমাদের জানা নেই, সে সব কিতাবের প্রতি সামষ্টিকভাবে ঈমান পোষণ করা।
গ. আল্লাহ্র নাযিলকৃত কিতাবসমূহে যা কিছু সত্যরূপে নিরুপিত হয়েছে তার সত্যায়ন করা। যেমন কুরআন মাজীদে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে সত্য ও সঠিক বলে স্বীকৃতি দেওয়া। তেমনি পূর্ববর্তী আসমা'নী কিতাবসমূহের অপরিবর্তিত ও অবিকৃত সংবাদসমূহকে সত্য ও সঠিক বলে স্বীকার করা।
ঘ. কিতাবসমূহে যেসব বিধান মানসূখ বা রহিত করা হয় নি, সেসব বিধান পালন করা এবং এসব বিধানের হিকমাহ্ বা অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আমরা বুঝি আর নাই বুঝি, সর্বাবস্থায় সেগুলোর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও সন্তুষ্টি প্রদর্শন করা। আর কুরআন মাজীদ নাযিলের মধ্য দিয়ে পূর্বেকার সকল আসমা'নী কিতাব রহিত হয়ে গেছে。

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ الْكِتٰبِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ
"আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যা এর পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবের সত্যায়নকারী ও সংরক্ষক।"

এ আয়াতে مُهَيْمِن তথা 'সত্যায়নকারী ও সংরক্ষক' বলতে অন্য বিচারক বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এর ভিত্তিতে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহের কোন হুকুম পালন করা এখন আর জায়েয নেই। তবে সেসব কিতাবের যে হুকুমগুলো কুরআন মাজীদ সমর্থন করে, সেগুলো অবশ্যই পালনীয়।

কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান এর ফলাফল: আল্লাহ্র নাযিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান পোষণের দ্বারা যেসব গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জিত হয় তন্মধ্যে রয়েছে:

ক. এ বিষয়ে জ্ঞানার্জন যে মহান আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে প্রত্যেক জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য কিতাব নাযিল করে তা দ্বারা তাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন।
খ. মহান আল্লাহ্ প্রত্যেক জাতির জন্য তাদের অবস্থা উপযোগী যে শারীয়াত দিয়েছেন, এর মাঝে যে হিকমাহ্ বা পরম প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে, তা জানা যায়। যেমন আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
"তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি করে শরীয়ত ও সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করে দিয়েছি।"

টিকাঃ
330 সূরা আল-মায়েদাহ ৫:৪৮
331 সূরা আল-মায়েদাহ ৫: ৪৮

আর তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি'।

কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান
১. 'কুতুব' হলো 'কিতাব' শব্দের বহুবচন যার অর্থ হলো, যা কিছু লিখিত হয়েছে। এখানে কিতাবসমূহ বলতে সেই সব কিতাবকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূলগণের প্রতি জগতবাসীর জন্য রহমত ও হিদায়াত স্বরূপ নাযিল করেছেন, যাতে করে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে সার্বিক কল্যাণ লাভ করতে পারে।
কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান পোষণের মাঝে ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
ক. এই ঈমান পোষণ করা যে, এসব কিতাব নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে।
ख. এসব আসমা'নী কিতাবের মধ্য থেকে যেগুলোর নাম আমরা জানতে পেরেছি, নামসহ সেগুলোর উপর ঈমান পোষণ করা। যেমন কুরআন মাজীদ নাযিল হয়েছে মুহাম্মাদ (আ.) এর উপর, তাওরাত নাযিল হয়েছে মূসা (আ.) এর উপর, ইনজিল নাযিল হয়েছে ঈসা (আ.) এর উপর এবং যাবুর নাযিল হয়েছে দাউদ (আ.) এর উপর। আর যে সব কিতাবের নাম আমাদের জানা নেই, সে সব কিতাবের প্রতি সামষ্টিকভাবে ঈমান পোষণ করা।
গ. আল্লাহ্র নাযিলকৃত কিতাবসমূহে যা কিছু সত্যরূপে নিরুপিত হয়েছে তার সত্যায়ন করা। যেমন কুরআন মাজীদে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে সত্য ও সঠিক বলে স্বীকৃতি দেওয়া। তেমনি পূর্ববর্তী আসমা'নী কিতাবসমূহের অপরিবর্তিত ও অবিকৃত সংবাদসমূহকে সত্য ও সঠিক বলে স্বীকার করা।
ঘ. কিতাবসমূহে যেসব বিধান মানসূখ বা রহিত করা হয় নি, সেসব বিধান পালন করা এবং এসব বিধানের হিকমাহ্ বা অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আমরা বুঝি আর নাই বুঝি, সর্বাবস্থায় সেগুলোর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও সন্তুষ্টি প্রদর্শন করা। আর কুরআন মাজীদ নাযিলের মধ্য দিয়ে পূর্বেকার সকল আসমা'নী কিতাব রহিত হয়ে গেছে。

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ الْكِتٰبِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ
"আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যা এর পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবের সত্যায়নকারী ও সংরক্ষক।"

এ আয়াতে مُهَيْمِن তথা 'সত্যায়নকারী ও সংরক্ষক' বলতে অন্য বিচারক বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এর ভিত্তিতে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহের কোন হুকুম পালন করা এখন আর জায়েয নেই। তবে সেসব কিতাবের যে হুকুমগুলো কুরআন মাজীদ সমর্থন করে, সেগুলো অবশ্যই পালনীয়।

কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান এর ফলাফল: আল্লাহ্র নাযিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান পোষণের দ্বারা যেসব গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জিত হয় তন্মধ্যে রয়েছে:

ক. এ বিষয়ে জ্ঞানার্জন যে মহান আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে প্রত্যেক জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য কিতাব নাযিল করে তা দ্বারা তাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন।
খ. মহান আল্লাহ্ প্রত্যেক জাতির জন্য তাদের অবস্থা উপযোগী যে শারীয়াত দিয়েছেন, এর মাঝে যে হিকমাহ্ বা পরম প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে, তা জানা যায়। যেমন আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
"তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি করে শরীয়ত ও সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করে দিয়েছি।"

টিকাঃ
330 সূরা আল-মায়েদাহ ৫:৪৮
331 সূরা আল-মায়েদাহ ৫: ৪৮

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল

📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান ও তার ফলাফল


আর তাঁর রাসূলগণের প্রতি।

রাসূলগণের প্রতি ঈমান
১. রাসূল এর মর্মার্থ: 'রাসূল' হলো একবচন, এর বহুবচন হলো 'বুসুল'। কোন কিছু পৌঁছানোর জন্য যাকে পাঠানো হয়, শাব্দিক অর্থে তাকে রাসূল বলে। এখানে রুসুল বলতে তাদেরকে বুঝানো হয়েছে, মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহ্ পক্ষ থেকে শারীআত বিষয়ে ওয়াহয়ী প্রাপ্ত হয়েছেন এবং তা প্রচারের নির্দেশ পেয়েছেন।
আল্লাহ্ পক্ষ থেকে মানবজাতির প্রতি প্রেরিত সর্বপ্রথম রাসূল হলেন নূহ এবং সর্বশেষ রাসূল হলেন মুহাম্মাদ()। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى nُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ
“নিশ্চয়ই আমি আপনার নিকট ওয়াহয়ী প্রেরণ করেছিলাম যেমন প্রেরণ করেছিলাম নূহ ও তাঁর পরবর্তী নাবীগণের প্রতি।”

সাহীহ বুখারীতে আনাস() থেকে শাফাআত (সুপারিশ) সম্পর্কিত হাদীয়ে রয়েছে যে মানুষ আদম এর কাছে শাফায়াতের জন্য আসবে ও তখন তিনি তাদেরকে ওজর দেখাবেন ও বলবেন তোমরা নূহ এর কাছে যাও, যিনি প্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ্ প্রেরণ করেছিলেন।...
মুহাম্মাদ () সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ
“মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নাবী।”

এমন কোন জাতি নেই যাদের প্রতি আল্লাহ্ স্বতন্ত্র শারীআত দিয়ে রাসূল প্রেরণ করেননি কিংবা পূর্ববর্তী কোন রাসূলের শারীআতকে নবায়ন করার ওয়াহয়ী দিয়ে কোন নাবী প্রেরণ করেন নি。

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
"আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং স্বাগুতকে বর্জন কর।"

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
وَإِنْ مِّنَ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ
"আর এমন কোন উম্মত নেই যার কাছে গত হয়নি কোন সতর্ককারী।"

আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَيَةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا
“নিশ্চয়ই আমি তাওরাত নাযিল করেছিলাম। এতে ছিল হিদায়াত ও নূর। নাবীগণ যারা ছিলেন অনুগত, তারা ইয়াহুদীদেরকে তা অনুযায়ী হুকুম দিতেন।"

রাসূলগণ হলেন আল্লাহ্র সৃষ্টি মানুষ। তাঁদের মাঝে রুবুবিয়্যাহ কিংবা উলুহিয়্যাহর কিছু নেই। তাইতো দেখা যায়, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহ্র নিকট সবচেয়ে মর্যাদাবান রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
مَا شَاءَ اللهُ وَلَوْ كُنْتُ قُل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

"বলুন, আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ব্যতীত আমার নিজের ভাল-মন্দের উপরও আমার কোন অধিকার নেই। আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম, তবে তো আমি অনেক কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ছাড়া আমি তো আর কিছুই নই। ”

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنَ اللهِ أَحَدٌهُ وَلَنْ أَجِدَ مِن دُونِهِ مُلْتَحَدًا
"বলুন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কোন ক্ষতি বা কল্যাণের মালিক নই৷ বলুন, আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউই আমাকে রক্ষা করতে পারবে না এবং আল্লাহ ছাড়া আমি কখনও কোন আশ্রয় পাব না। ”

রোগ, মৃত্যু, ক্ষুধা, পিপাসা এবং অন্যান্য মানবীয় বৈশিষ্ট্য সকল নাবী-রাসূলের মাঝে ছিল। যেমন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কর্তৃক তাঁর রব্ব সম্পর্কে দেওয়া বিবরণ উল্লেখ করে মহান আল্লাহ্ বলেন:
وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ
“আর তিনিই আমাকে খাওয়ান ও পান করান। আর রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। আর তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন এবং তারপর আমাকে পুনর্জীবিত করবেন। "

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ، أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ، فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكَّرُونِي

'আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ। তোমরা যেমন ভুল করে থাক, আমিও তোমাদের মত ভুলে যাই। কাজেই আমি কোন সময় ভুলে গেলে তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেবে'।

নবী-রাসূলদের উচ্চ মর্যাদার বিবরণ দিতে গিয়ে এবং তাঁদের প্রশংসা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ্ তাঁদেরকে তাঁর বান্দা বলে অভিহিত করেছেন। যেমন নূহ(আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُورًا
"তিনি তো ছিলেন একজন পরম কৃতজ্ঞ বান্দা।"

এমনিভাবে মুহাম্মাদ(সাঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا
"কত বরকতময় তিনি! যিনি তাঁর বান্দার উপর সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী কিতাব নাযিল করেছেন, যাতে সে সৃষ্টিজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে।"

ইবরাহীম(আঃ), ইসহাক(আঃ) এবং ইয়া'কুব(আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ ওয়াস সালাম ইরশাদ করেছেন:
وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بِخَالِصَةٍ ذِكْرَى الدَّارِ ۖ وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ
“স্মরণ কর আমার বান্দা ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কুব-এর কথা- তারা ছিল শক্তি ও সূক্ষ্মদর্শিতার অধিকারী। বস্তুত আমি তাদেরকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছিলাম এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যে- তা হল পরলোকের স্মরণ। আমার দৃষ্টিতে তারা ছিল আমার বাছাইকৃত উত্তম বান্দাহদের অন্তর্ভুক্ত।”

ঈসা ইবনু মারইয়াম সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنْ هُوَ إِلَّا عَبْدٌ أَنْعَمْنَا عَلَيْهِ وَجَعَلْنَهُ مَثَلًا لِبَنِي إِسْرَاعِيلَ
“তিনি তো শুধু একজন বান্দাহ যার প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম আর বানী ইসরাঈলের জন্য আমি তাকে করেছিলাম (আমার কুদরাতের বিশেষ এক) নমুনা।”

রাসূলগণের প্রতি ঈমানের মাঝে ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
ক. এই ঈমান পোষণ করা যে, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে পাওয়া তাঁদের রিসালাত তথা বার্তা অকাট্য সত্য। যে ব্যক্তি কোন একজন রাসূলের রিসালাতকে অস্বীকার করবে, সে সকল রাসূলকে অস্বীকারকারী বলে গণ্য হবে। যেমন মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
كَذَّبَتْ قَوْمُ نُوحِ الْمُرْسَلِينَ
"নূহের সম্প্রদায় রাসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল।”

এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, আল্লাহ্ নূহ এর সম্প্রদায়কে সকল নাবী-রাসূলকে অস্বীকারকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। অথচ তারা যখন নূহ কে অস্বীকার করেছিল, তখন দুনিয়াতে তিনি ব্যতীত অন্য কোন নাবী বা রাসূল ছিলেন না।

এমনিভাবে খ্রিস্টান সম্প্রদায় (নাসারা) যারা মুহাম্মাদ কে রাসূল বলে স্বীকার করে না এবং তাঁর অনুসরণ করে না, তারাও ঈসা ইবনু মারইয়াম কে অস্বীকারকারী এবং তাঁর বিরোধিতাকারী। কেননা ঈসা তাদেরকে মুহাম্মাদ এর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। আর এই সুসংবাদ দেওয়ার অর্থই হলো, মুহাম্মাদ (ﷺ) তাদের প্রতি আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল হিসেবে আগমন করবেন এবং তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ্ তাদেরকে বিপথগামীতা থেকে রক্ষা করবেন। আর তিনি তাদেরকে সরল-সঠিক পথ দেখাবেন।

খ. যে সকল নাবী-রাসূলের নাম আমরা জানতে পেরেছি, নামসহ তাদের প্রতি ঈমান পোষণ করা। যেমন: মুহাম্মাদ (ﷺ), ইবরাহীম ( عليه السلام ), মূসা ( عليه السلام ), ঈসা ( عليه السلام ) এবং নূহ ( عليه السلام )। এই পাঁচজন হলেন উলূল ‘আযম তথা দৃঢ় সংকল্পের অধীকারী বিশেষ মর্যাদাবান রাসূল। কুরআন মাজীদের দু’টি স্থানে মহান আল্লাহ্ এই পাঁচজন রাসূলের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন সূরা আহযাবে তিনি ইরশাদ করেন:
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّنَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ
“স্মরণ কর, আমি যখন নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম আর তোমার কাছ থেকেও; আর নূহ, ইব্রাহীম, মূসা আর মারইয়াম পুত্র ‘ঈসা থেকেও।”

সূরা শুরা তে তিনি ইরশাদ করেন:
فَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
“তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধি-ব্যবস্থাই দিয়েছেন যার হুকুম তিনি দিয়েছিলেন নূহকে। আর সেই (বিধি ব্যবস্থাই) (তোমাকে ওয়াহয়ীর মাধ্যমে দিলাম যার হুকুম দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ‘ঈসাকে- তা এই যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত কর, আর তাতে বিভক্তি সৃষ্টি করো না।”

আর তাঁদের মধ্যে যাদের নাম আমাদের জানা নেই, আমরা তাদের উপর সামষ্টিকভাবে ঈমান পোষণ করব।

মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّن قَبْلِكَ مِنْهُم مَّا قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُم مَّا لَمْ نَقْصُصُ عَلَيْكَ
“আমি তোমার পূর্বে অনেক রসূল পাঠিয়েছিলাম। তাদের মধ্যে কারো কারো কাহিনী আমি তোমার কাছে বর্ণনা করেছি, তাদের মধ্যে কারো কারো কথা আমি তোমার কাছে বর্ণনা করিনি।”

গ. নাবী-রাসূল থেকে তাঁদের নিজেদের সম্পর্কে যে সকল কথা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে সত্য বলে স্বীকার করা।

ঘ. নাবী-রাসূলদের মধ্যে যাকে গোটা মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে সেই সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ () এর শারীআত পালন করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
“কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মু’মিন হবে না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর তোমার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কিছু মাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, আর তারা তার সামনে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে।”

রাসূল এর প্রতি ঈমান এর ফলাফল: নবী রাসূলগণের প্রতি ঈমান পোষণের দ্বারা যেসব গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জিত হয় তন্মধ্যে রয়েছে:
ক. আল্লাহ্র অশেষ রহমত এবং বান্দাদের প্রতি তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ হয়। কেননা মহান আল্লাহ্ রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন যাতে তাঁরা মানবজাতিকে আল্লাহ্র পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জনিয়ে দেন কিভাবে তারা আল্লাহ্ ইবাদাত করবে। কারণ কেবল মানবীয় বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা আল্লাহ্র পথ চেনা এবং আল্লাহ্ ইবাদাতের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানা মোটেও সম্ভব নয়।

খ। এই মহান নিয়ামতের জন্য আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করা হয়।

গ। নাবী-রাসূলদের প্রতি ঈমান পোষণের মাধ্যমে তাঁদের প্রতি যথাযথ ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা এবং যেভাবে তাঁদের প্রশংসা করা উচিত সেভাবে তাদের প্রশংসা করা হয়। কেননা তাঁরা হলেন আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল যারা আল্লাহ্ ইবাদাত করে থাকেন, তাঁর বার্তা প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত থাকেন এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে উত্তম নসীহত করে থাকেন।

বিরোধিতাকারীরা নাবী-রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছে এই ধারণাবলে যে, আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল কখনো মানুষের মধ্য থেকে হতে পারে না। কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ্ তাদের এই ধারণার কথা উল্লেখ করার সাথে সাথে তা বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ
وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلَّا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَسُولًا قُلِ لَوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِّينَ لَنَزَلْنَا عَلَيْهِمْ مِنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَّسُولًا
“আর যখন মানুষের কাছে হিদায়াত আসে, তখন তাদেরকে ঈমান আনা থেকে বিরত রাখে কেবল তাদের এই কথা যে, আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন? বলুন, ফেরেশতাগণ যদি নিশ্চিন্ত হয়ে যমীনে বিচরণ করত (অর্থাৎ যমীনে বসবাস করতো), তবে আমি আসমান থেকে তাদের কাছে অবশ্যই ফেরেশতাকে রাসূল করে পাঠাতাম।”

এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ্ বিরোধিতাকারীদের ভ্রান্ত ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছেন এই মর্মে যে, রাসূল যেহেতু দুনিয়াবাসীর প্রতি প্রেরিত, আর এই দুনিয়াবাসী হল মানুষ, কাজেই রাসূলকে অবশ্যই মানুষ হতে হবে। যদি দুনিয়াবাসী মানুষ না হয়ে ফেরেশতা হতো, তাহলে তাদের প্রতি রাসূল হিসেবে আল্লাহ্ আসমান থেকে ফেরেশতা পাঠাতেন যাতে করে যাদের প্রতি রাসূল পাঠানো হবে, তারা যেমন, প্রেরিত রাসূলও তেমন হয়।

যারা রাসূলগণকে অস্বীকার করতো, তাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا تُرِيدُونَ أَنْ تَصُدُّونَا عَمَّا كَانَ يَعْبُدُ آبَاؤُنَا فَأْتُونَا بِسُلْطَنٍ مُّبِينٍ قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِنْ نَحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَى مَن يَشَاءُ مِنَ عِبَادِهِ وَمَا كَانَ لَنَا أَنْ نَأْتِيَكُمُ بِسُلْطَنٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
"তাদের রসূলগণ বলেছিল, 'আল্লাহ সম্পর্কে সন্দেহ? যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তোমাদেরকে ডাকছেন তোমাদের অপরাধ সার্জনা করার জন্য আর একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেয়ার জন্য।' তারা বলল, 'তুমি আমাদেরই মত মানুষ বৈ তো নও, আমাদের পূর্বপুরুষরা যার ইবাদাত করত তাত্থেকে আমাদেরকে তুমি বাধা দিতে চাও, তাহলে তুমি (তোমার দাবীর স্বপক্ষে) আমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত কর। তাদের রসূলগণ তাদেরকে বলেছিল, 'যদিও আমরা তোমাদের মতই মানুষ ব্যতীত নই, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের মধ্যে যার উপর ইচ্ছে অনুগ্রহ করেন। আল্লাহর হুকুম ছাড়া তোমাদের কাছে কোন প্রমাণ উপস্থিত করা আমাদের কাজ নয়। মু'মিনদের উচিত আল্লাহরই উপর ভরসা করা।”

টিকাঃ
332 'সূরা আন-নিসা' ৪: ১৬৩
333 সূরা আল-আহযাব ৩৩: ৪০
৩৩৪ সূরা আন-নাহল ১৬: ৩৬
৩৩৫ সূরা আল-ফাতির ৩৫: ২৪
৩৩৬ সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৪৮
337 সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৮৮
338 সূরা আল-জিন্ন ৭২: ২১-২২
339 'সূরা আশ্-শুআরা' ২৬: ৭৯-৮১
৩৪০ সাহীহ বুখারী: হা/৪০১, মুসলিম হা/৫৭২; আবু দাউদ হা/১০২০; নাসাঈ হা/১২৪২; ইবনু মাজাহ হা/১২০৩; মিশকাত হা/১০১৬。
৩৪১ সূরা আল-ইসরা ১৭:৩
৩৪২ সূরা আল-ফুরকান ২৫:১
343 সূরা সাদ ৩৮: ৪৫-৪৭
344 সূরা আয-যুখরুফ ৪৩: ৫৯
345 সূরা আশ্-শুআরা' ২৬: ১০৫
৩৪৬ সূরা আল-আহযাব ৩৩:৭
৩৪৭ সূরা আশ-শুরা ৪২:১৩
348 সূরা গাফির (মুমিন) ৪০ : ৭৮
349 সূরা আন-নিসা' ৪ : ৬৫
৩৫০ সূরা আল-ইসরা' ১৭ : ৯৪-৯৫
351 সূরা ইবরাহীম ১৪: ১০-১১

আর তাঁর রাসূলগণের প্রতি।

রাসূলগণের প্রতি ঈমান
১. রাসূল এর মর্মার্থ: 'রাসূল' হলো একবচন, এর বহুবচন হলো 'বুসুল'। কোন কিছু পৌঁছানোর জন্য যাকে পাঠানো হয়, শাব্দিক অর্থে তাকে রাসূল বলে। এখানে রুসুল বলতে তাদেরকে বুঝানো হয়েছে, মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহ্ পক্ষ থেকে শারীআত বিষয়ে ওয়াহয়ী প্রাপ্ত হয়েছেন এবং তা প্রচারের নির্দেশ পেয়েছেন।
আল্লাহ্ পক্ষ থেকে মানবজাতির প্রতি প্রেরিত সর্বপ্রথম রাসূল হলেন নূহ এবং সর্বশেষ রাসূল হলেন মুহাম্মাদ()। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى nُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ
“নিশ্চয়ই আমি আপনার নিকট ওয়াহয়ী প্রেরণ করেছিলাম যেমন প্রেরণ করেছিলাম নূহ ও তাঁর পরবর্তী নাবীগণের প্রতি।”

সাহীহ বুখারীতে আনাস() থেকে শাফাআত (সুপারিশ) সম্পর্কিত হাদীয়ে রয়েছে যে মানুষ আদম এর কাছে শাফায়াতের জন্য আসবে ও তখন তিনি তাদেরকে ওজর দেখাবেন ও বলবেন তোমরা নূহ এর কাছে যাও, যিনি প্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ্ প্রেরণ করেছিলেন।...
মুহাম্মাদ () সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ
“মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নাবী।”

এমন কোন জাতি নেই যাদের প্রতি আল্লাহ্ স্বতন্ত্র শারীআত দিয়ে রাসূল প্রেরণ করেননি কিংবা পূর্ববর্তী কোন রাসূলের শারীআতকে নবায়ন করার ওয়াহয়ী দিয়ে কোন নাবী প্রেরণ করেন নি。

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
"আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং স্বাগুতকে বর্জন কর।"

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
وَإِنْ مِّنَ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ
"আর এমন কোন উম্মত নেই যার কাছে গত হয়নি কোন সতর্ককারী।"

আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَيَةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا
“নিশ্চয়ই আমি তাওরাত নাযিল করেছিলাম। এতে ছিল হিদায়াত ও নূর। নাবীগণ যারা ছিলেন অনুগত, তারা ইয়াহুদীদেরকে তা অনুযায়ী হুকুম দিতেন।"

রাসূলগণ হলেন আল্লাহ্র সৃষ্টি মানুষ। তাঁদের মাঝে রুবুবিয়্যাহ কিংবা উলুহিয়্যাহর কিছু নেই। তাইতো দেখা যায়, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহ্র নিকট সবচেয়ে মর্যাদাবান রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
مَا شَاءَ اللهُ وَلَوْ كُنْتُ قُل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

"বলুন, আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ব্যতীত আমার নিজের ভাল-মন্দের উপরও আমার কোন অধিকার নেই। আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম, তবে তো আমি অনেক কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ছাড়া আমি তো আর কিছুই নই। ”

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنَ اللهِ أَحَدٌهُ وَلَنْ أَجِدَ مِن دُونِهِ مُلْتَحَدًا
"বলুন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কোন ক্ষতি বা কল্যাণের মালিক নই৷ বলুন, আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউই আমাকে রক্ষা করতে পারবে না এবং আল্লাহ ছাড়া আমি কখনও কোন আশ্রয় পাব না। ”

রোগ, মৃত্যু, ক্ষুধা, পিপাসা এবং অন্যান্য মানবীয় বৈশিষ্ট্য সকল নাবী-রাসূলের মাঝে ছিল। যেমন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কর্তৃক তাঁর রব্ব সম্পর্কে দেওয়া বিবরণ উল্লেখ করে মহান আল্লাহ্ বলেন:
وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ
“আর তিনিই আমাকে খাওয়ান ও পান করান। আর রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। আর তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন এবং তারপর আমাকে পুনর্জীবিত করবেন। "

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ، أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ، فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكَّرُونِي

'আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ। তোমরা যেমন ভুল করে থাক, আমিও তোমাদের মত ভুলে যাই। কাজেই আমি কোন সময় ভুলে গেলে তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেবে'।

নবী-রাসূলদের উচ্চ মর্যাদার বিবরণ দিতে গিয়ে এবং তাঁদের প্রশংসা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ্ তাঁদেরকে তাঁর বান্দা বলে অভিহিত করেছেন। যেমন নূহ(আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُورًا
"তিনি তো ছিলেন একজন পরম কৃতজ্ঞ বান্দা।"

এমনিভাবে মুহাম্মাদ(সাঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا
"কত বরকতময় তিনি! যিনি তাঁর বান্দার উপর সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী কিতাব নাযিল করেছেন, যাতে সে সৃষ্টিজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে।"

ইবরাহীম(আঃ), ইসহাক(আঃ) এবং ইয়া'কুব(আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্ ওয়াস সালাম ইরশাদ করেছেন:
وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بِخَالِصَةٍ ذِكْرَى الدَّارِ ۖ وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ
“স্মরণ কর আমার বান্দা ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কুব-এর কথা- তারা ছিল শক্তি ও সূক্ষ্মদর্শিতার অধিকারী। বস্তুত আমি তাদেরকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছিলাম এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যে- তা হল পরলোকের স্মরণ। আমার দৃষ্টিতে তারা ছিল আমার বাছাইকৃত উত্তম বান্দাহদের অন্তর্ভুক্ত।”

ঈসা ইবনু মারইয়াম সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنْ هُوَ إِلَّا عَبْدٌ أَنْعَمْنَا عَلَيْهِ وَجَعَلْنَهُ مَثَلًا لِبَنِي إِسْرَاعِيلَ
“তিনি তো শুধু একজন বান্দাহ যার প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম আর বানী ইসরাঈলের জন্য আমি তাকে করেছিলাম (আমার কুদরাতের বিশেষ এক) নমুনা।”

রাসূলগণের প্রতি ঈমানের মাঝে ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
ক. এই ঈমান পোষণ করা যে, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে পাওয়া তাঁদের রিসালাত তথা বার্তা অকাট্য সত্য। যে ব্যক্তি কোন একজন রাসূলের রিসালাতকে অস্বীকার করবে, সে সকল রাসূলকে অস্বীকারকারী বলে গণ্য হবে। যেমন মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
كَذَّبَتْ قَوْمُ نُوحِ الْمُرْسَلِينَ
"নূহের সম্প্রদায় রাসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল।”

এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, আল্লাহ্ নূহ এর সম্প্রদায়কে সকল নাবী-রাসূলকে অস্বীকারকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। অথচ তারা যখন নূহ কে অস্বীকার করেছিল, তখন দুনিয়াতে তিনি ব্যতীত অন্য কোন নাবী বা রাসূল ছিলেন না।

এমনিভাবে খ্রিস্টান সম্প্রদায় (নাসারা) যারা মুহাম্মাদ কে রাসূল বলে স্বীকার করে না এবং তাঁর অনুসরণ করে না, তারাও ঈসা ইবনু মারইয়াম কে অস্বীকারকারী এবং তাঁর বিরোধিতাকারী। কেননা ঈসা তাদেরকে মুহাম্মাদ এর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। আর এই সুসংবাদ দেওয়ার অর্থই হলো, মুহাম্মাদ (ﷺ) তাদের প্রতি আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল হিসেবে আগমন করবেন এবং তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ্ তাদেরকে বিপথগামীতা থেকে রক্ষা করবেন। আর তিনি তাদেরকে সরল-সঠিক পথ দেখাবেন।

খ. যে সকল নাবী-রাসূলের নাম আমরা জানতে পেরেছি, নামসহ তাদের প্রতি ঈমান পোষণ করা। যেমন: মুহাম্মাদ (ﷺ), ইবরাহীম ( عليه السلام ), মূসা ( عليه السلام ), ঈসা ( عليه السلام ) এবং নূহ ( عليه السلام )। এই পাঁচজন হলেন উলূল ‘আযম তথা দৃঢ় সংকল্পের অধীকারী বিশেষ মর্যাদাবান রাসূল। কুরআন মাজীদের দু’টি স্থানে মহান আল্লাহ্ এই পাঁচজন রাসূলের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন সূরা আহযাবে তিনি ইরশাদ করেন:
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّنَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ
“স্মরণ কর, আমি যখন নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম আর তোমার কাছ থেকেও; আর নূহ, ইব্রাহীম, মূসা আর মারইয়াম পুত্র ‘ঈসা থেকেও।”

সূরা শুরা তে তিনি ইরশাদ করেন:
فَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
“তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধি-ব্যবস্থাই দিয়েছেন যার হুকুম তিনি দিয়েছিলেন নূহকে। আর সেই (বিধি ব্যবস্থাই) (তোমাকে ওয়াহয়ীর মাধ্যমে দিলাম যার হুকুম দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ‘ঈসাকে- তা এই যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত কর, আর তাতে বিভক্তি সৃষ্টি করো না।”

আর তাঁদের মধ্যে যাদের নাম আমাদের জানা নেই, আমরা তাদের উপর সামষ্টিকভাবে ঈমান পোষণ করব।

মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّن قَبْلِكَ مِنْهُم مَّا قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُم مَّا لَمْ نَقْصُصُ عَلَيْكَ
“আমি তোমার পূর্বে অনেক রসূল পাঠিয়েছিলাম। তাদের মধ্যে কারো কারো কাহিনী আমি তোমার কাছে বর্ণনা করেছি, তাদের মধ্যে কারো কারো কথা আমি তোমার কাছে বর্ণনা করিনি।”

গ. নাবী-রাসূল থেকে তাঁদের নিজেদের সম্পর্কে যে সকল কথা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে সত্য বলে স্বীকার করা।

ঘ. নাবী-রাসূলদের মধ্যে যাকে গোটা মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে সেই সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ () এর শারীআত পালন করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
“কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মু’মিন হবে না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর তোমার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কিছু মাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, আর তারা তার সামনে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে।”

রাসূল এর প্রতি ঈমান এর ফলাফল: নবী রাসূলগণের প্রতি ঈমান পোষণের দ্বারা যেসব গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জিত হয় তন্মধ্যে রয়েছে:
ক. আল্লাহ্র অশেষ রহমত এবং বান্দাদের প্রতি তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ হয়। কেননা মহান আল্লাহ্ রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন যাতে তাঁরা মানবজাতিকে আল্লাহ্র পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জনিয়ে দেন কিভাবে তারা আল্লাহ্ ইবাদাত করবে। কারণ কেবল মানবীয় বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা আল্লাহ্র পথ চেনা এবং আল্লাহ্ ইবাদাতের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানা মোটেও সম্ভব নয়।

খ। এই মহান নিয়ামতের জন্য আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করা হয়।

গ। নাবী-রাসূলদের প্রতি ঈমান পোষণের মাধ্যমে তাঁদের প্রতি যথাযথ ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা এবং যেভাবে তাঁদের প্রশংসা করা উচিত সেভাবে তাদের প্রশংসা করা হয়। কেননা তাঁরা হলেন আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল যারা আল্লাহ্ ইবাদাত করে থাকেন, তাঁর বার্তা প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত থাকেন এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে উত্তম নসীহত করে থাকেন।

বিরোধিতাকারীরা নাবী-রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছে এই ধারণাবলে যে, আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল কখনো মানুষের মধ্য থেকে হতে পারে না। কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ্ তাদের এই ধারণার কথা উল্লেখ করার সাথে সাথে তা বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ
وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلَّا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَسُولًا قُلِ لَوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِّينَ لَنَزَلْنَا عَلَيْهِمْ مِنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَّسُولًا
“আর যখন মানুষের কাছে হিদায়াত আসে, তখন তাদেরকে ঈমান আনা থেকে বিরত রাখে কেবল তাদের এই কথা যে, আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন? বলুন, ফেরেশতাগণ যদি নিশ্চিন্ত হয়ে যমীনে বিচরণ করত (অর্থাৎ যমীনে বসবাস করতো), তবে আমি আসমান থেকে তাদের কাছে অবশ্যই ফেরেশতাকে রাসূল করে পাঠাতাম।”

এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ্ বিরোধিতাকারীদের ভ্রান্ত ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছেন এই মর্মে যে, রাসূল যেহেতু দুনিয়াবাসীর প্রতি প্রেরিত, আর এই দুনিয়াবাসী হল মানুষ, কাজেই রাসূলকে অবশ্যই মানুষ হতে হবে। যদি দুনিয়াবাসী মানুষ না হয়ে ফেরেশতা হতো, তাহলে তাদের প্রতি রাসূল হিসেবে আল্লাহ্ আসমান থেকে ফেরেশতা পাঠাতেন যাতে করে যাদের প্রতি রাসূল পাঠানো হবে, তারা যেমন, প্রেরিত রাসূলও তেমন হয়।

যারা রাসূলগণকে অস্বীকার করতো, তাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا تُرِيدُونَ أَنْ تَصُدُّونَا عَمَّا كَانَ يَعْبُدُ آبَاؤُنَا فَأْتُونَا بِسُلْطَنٍ مُّبِينٍ قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِنْ نَحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَى مَن يَشَاءُ مِنَ عِبَادِهِ وَمَا كَانَ لَنَا أَنْ نَأْتِيَكُمُ بِسُلْطَنٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
"তাদের রসূলগণ বলেছিল, 'আল্লাহ সম্পর্কে সন্দেহ? যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তোমাদেরকে ডাকছেন তোমাদের অপরাধ সার্জনা করার জন্য আর একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেয়ার জন্য।' তারা বলল, 'তুমি আমাদেরই মত মানুষ বৈ তো নও, আমাদের পূর্বপুরুষরা যার ইবাদাত করত তাত্থেকে আমাদেরকে তুমি বাধা দিতে চাও, তাহলে তুমি (তোমার দাবীর স্বপক্ষে) আমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত কর। তাদের রসূলগণ তাদেরকে বলেছিল, 'যদিও আমরা তোমাদের মতই মানুষ ব্যতীত নই, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের মধ্যে যার উপর ইচ্ছে অনুগ্রহ করেন। আল্লাহর হুকুম ছাড়া তোমাদের কাছে কোন প্রমাণ উপস্থিত করা আমাদের কাজ নয়। মু'মিনদের উচিত আল্লাহরই উপর ভরসা করা।”

টিকাঃ
332 'সূরা আন-নিসা' ৪: ১৬৩
333 সূরা আল-আহযাব ৩৩: ৪০
৩৩৪ সূরা আন-নাহল ১৬: ৩৬
৩৩৫ সূরা আল-ফাতির ৩৫: ২৪
৩৩৬ সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৪৮
337 সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৮৮
338 সূরা আল-জিন্ন ৭২: ২১-২২
339 'সূরা আশ্-শুআরা' ২৬: ৭৯-৮১
৩৪০ সাহীহ বুখারী: হা/৪০১, মুসলিম হা/৫৭২; আবু দাউদ হা/১০২০; নাসাঈ হা/১২৪২; ইবনু মাজাহ হা/১২০৩; মিশকাত হা/১০১৬。
৩৪১ সূরা আল-ইসরা ১৭:৩
৩৪২ সূরা আল-ফুরকান ২৫:১
343 সূরা সাদ ৩৮: ৪৫-৪৭
344 সূরা আয-যুখরুফ ৪৩: ৫৯
345 সূরা আশ্-শুআরা' ২৬: ১০৫
৩৪৬ সূরা আল-আহযাব ৩৩:৭
৩৪৭ সূরা আশ-শুরা ৪২:১৩
348 সূরা গাফির (মুমিন) ৪০ : ৭৮
349 সূরা আন-নিসা' ৪ : ৬৫
৩৫০ সূরা আল-ইসরা' ১৭ : ৯৪-৯৫
351 সূরা ইবরাহীম ১৪: ১০-১১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00