📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 শাহাদাহ বা সাক্ষ্য প্রদান

📄 শাহাদাহ বা সাক্ষ্য প্রদান


সুতরাং শাহাদাহ (সাক্ষ্য প্রদান)' এর প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণী: “আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নেই এবং ফেরেশতাগণ ও ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানীগণও (সাক্ষ্য দিচ্ছে যে,) তিনি ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নেই, তিনি মহাপরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী।”
এর অর্থ হচ্ছে لَا مَعْبُودَ بِحَقٍّ إِلَّا اللهُ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা'বুদ নেই। (لَا إِلَهَ (নেই কোন ইলাহ) কথাটি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য যা কিছুর ইবাদাত করা হয় সে সব কিছুকে অস্বীকৃতি জানায় এবং إِلَّا اللهُ (আল্লাহ্ ব্যতীত) কথাটি সকল প্রকার ইবাদাতকে একমাত্র আল্লাহ্ জন্য সাব্যস্ত করে দেয়। তাঁর ইবাদাতে কোন অংশীদার নেই, ঠিক যেমনি শরীক নেই তাঁর রাজত্বেও।

আর এর ব্যাখ্যা যাকে পরিষ্কার করেছে মহান আল্লাহ্র বাণী: “স্মরণ কর, ইবরাহীম (আ:) যখন তার পিতাকে ও তার জাতিকে বলেছিল- তোমরা যেগুলোর পূজা কর, সেগুলো থেকে আমি সম্পর্কহীন। ২৭. আমার সম্পর্ক আছে শুধু তাঁর সাথে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে সঠিক পথ দেখাবেন। ২৮. এ কথাটিকে সে স্থায়ী বাণীরূপে তার পরবর্তীদের মধ্যে রেখে গেছে, যাতে তারা (আল্লাহর পথে) ফিরে আসে।”
আর তাঁর বাণী: “আপনি বলুন, হে আহলে কিতাবগণ! এসো সেই কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, যেন আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাত না করি, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ আল্লাহ ছাড়া একে অন্যকে রব্ব হিসেবে গ্রহণ না করি। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তোমরা বল, তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী মুসলিম।”
আর “মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহ্র রাসূল” সাক্ষ্যের প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণীঃ “তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট একজন রসূল এসেছেন, তোমাদেরকে যা কিছু কষ্ট দেয় তা তার নিকট খুবই কষ্টদায়ক। সে তোমাদের কল্যাণকামী, মু’মিনদের প্রতি করুণাসিক্ত, বড়ই দয়ালু।”
আর ‘মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল’ সাক্ষ্যের অর্থঃ তাঁর আদেশকৃত বিষয়ের আনুগত্য, তাঁর প্রদানকৃত সংবাদের সত্যায়ন, তাঁর নিষেধ ও বারণকৃত বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর পেশকৃত শরীয়ত ব্যতীত অন্য কোনভাবে আল্লাহর ইবাদাত না হওয়া।

৪. শাহাদাহ বা সাক্ষ্য প্রদান: ইসলামের একটি স্বতন্ত্র রুকন হলো এই সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল। যদিও এতে ২টি অংশ রয়েছে, তথাপি এই ২টি অংশ মিলে একটি রুকন হয়েছে। কেননা এই দু’টি অংশের একত্রে বাস্তবায়নের উপরই সকল ইবাদাতের বিশুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে। কাজেই 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এই সাক্ষ্য প্রদানের দাবি অনুযায়ী, ইবাদাত যদি একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে নিবেদিত না হয় এবং 'মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ' এই সাক্ষ্য প্রদানের দাবি অনুযায়ী, ইবাদাতের ক্ষেত্রে যদি রাসূল (ﷺ) এর যথাযথ অনুসরণ করা না হয়, তাহলে তা আল্লাহর নিকট আদৌ গৃহীত হবে না।
১. এ আয়াতে রয়েছে আল্লাহ্ নিজের সত্ত্বা সম্পর্কে নিজের সাক্ষ্য, ফেরেশতাগণের সাক্ষ্য এবং জ্ঞানীদের সাক্ষ্য এই মর্মে যে, আল্লাহ্ ব্যতীত সত্যিকারের কোন মা'বুদ নেই এবং আল্লাহ্ সদা-সর্বদা ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী। অতঃপর তিনি নিজেই এই সাক্ষ্যকে সত্যায়ন করেছেন এই বলে যে, لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (তিনি ব্যতীত কোন সত্য মা'বুদ নেই, তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়)।
কুরআন মাজীদের এই আয়াতে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে এক মহৎ গুণ ও কৃতিত্বের বিষয়। কেননা এতে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ্ ও ফেরেশতাদের সাথে সাথে তারাও (আল্লাহ্র একত্ব ও ন্যায়নিষ্ঠার বিষয়ে) সাক্ষ্য প্রদানকারী। এখানে 'উলুল ইলম' (জ্ঞানীগণ) বলতে ইসলামী শারীআত সম্পর্কে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের বুঝানো হয়েছে, যাদের সর্বাগ্রে রয়েছেন নাবী-রাসূলগণ।
এই সাক্ষ্যটি একটি সুমহান সাক্ষ্য। কারণ এখানে সাক্ষ্যদাতাগণ এবং সাক্ষ্যের বিষয়বস্তু উভয়ই অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন। কেননা এখানে সাক্ষ্যদাতা হলেন মহান আল্লাহ্, তাঁর ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানীগণ। আর সাক্ষ্যের বিষয়বস্তু হচ্ছে আল্লাহ্ তাওহীদ প্রতিষ্ঠা তাঁর উলুহিয়্যাতে (ইলাহ হওয়ার বিষয়টিতে)

আর এই সাক্ষ্যের সত্যায়ন হল আল্লাহর এই বাণী:
لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।"

২. 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' সাক্ষ্যবাণীর ব্যাখ্যা: 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কথাটির অর্থ হলো, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্যিকারের উপাস্য নেই। তাই 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এই সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ হচ্ছে মানুষ তার অন্তর এবং মুখ দিয়ে এ কথা স্বীকার করবে যে, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকারের কোন মা'বুদ নেই। 'ইলাহ' শব্দের অর্থ হচ্ছে যার ইবাদাত করা হয় তথা মা'বুদ বা উপাস্য। 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এই পূর্ণ বাক্যটি একটি না বোধক এবং একটি হ্যাঁ বোধক কথার সমন্বয়ে গঠিত। না বোধক কথাটি হলো 'লা ইলাহা' (কোন ইলাহ নেই) এবং হ্যাঁ বোধক কথাটি হলো 'ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া)। এই বাক্যে উল্লিখিত 'আল্লাহ' শব্দটি 'লা' শব্দটির অনুল্লেখিত خبر এর বদল ও এর পূর্ণ বাক্যটি হচ্ছে: لا إله حق إلا الله' অর্থাৎ নেই কোন ইলাহ যে সত্য আল্লাহ ব্যতীত। আর আমাদের এই 'হক' শব্দটিকে 'লা' অনুল্লেখিত রাখার বিষয়টিই একটি সমস্যার জবাবকে ব্যাখ্যা করে, আর তা হচ্ছে- একথা কিভাবে বলা যায় যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই? অথচ আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ ব্যতীত আরো অনেক উপাস্য রয়েছে যেগুলোকে আল্লাহ নিজেও 'আলিহাহ' (উপাস্যসমূহ) বলে নামকরণ করেছেন এবং যারা এগুলোর উপাসনা করে তারাও এগুলোকে উপাস্য বলে অভিহিত করে থাকে? যেমন আমরা দেখি, কুরআন মাজীদে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمُ الْأَصْنَامُ الَّتِي يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ لَمَّا جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ
"অতঃপর যখন আপনার রবের নির্দেশ আসল, তখন আল্লাহ ছাড়া তারা যে ইলাহ সমূহের ইবাদাত করতো তারা তাদের কোন কাজে আসল না।"

আর কিভাবে আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো জন্য 'উলুহিয়্যাহ' (ইলাহ বা মা'বুদ হওয়া) প্রমাণ করতে পারি? অথচ কুরআন মাজীদের অন্য আয়াতে দেখা যায় যে, প্রত্যেক নাবী ও রাসূল (ﷺ) তাঁদের কউমের অধিবাসীদেরকে বলেছেন:
اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِّنَ إِلَهِ غَيْرُهُ
“তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন (সত্য) ইলাহ নেই।"

এই সমস্যাটির জবাব لا إله إلا الله বা 'নেই কোন উপাস্য আল্লাহ্ ব্যতীত' এর ১ এর খাবারটির অনুল্লেখিত হওয়ার মধ্যেই পাওয়া যায়। এজন্য আমরা বলি, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য যা কিছুর উপাসনা করা হয়ে থাকে, যদিও সেগুলো উপাস্য, কিন্তু তা বাতিল। সেগুলো সত্যিকার কোন উপাস্য নয় ও এগুলোর উলুহিয়্যাহ বা ইলাহ বা মা'বুদ হওয়ার ন্যূনতম কোন যোগ্যতা ও অধিকার নেই।
এ কথার দালীল হচ্ছে মহান আল্লাহর এই বাণী:
ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
“এটা এজন্য যে, আল্লাহ- তিনিই হলেন সত্য এবং তাঁর পরিবর্তে তারা যাকে ডাকে তা তো অলীক ও অসত্য। আর আল্লাহ, তিনি তো সমুচ্চ, সুমহান।"

এ সম্পর্কে অন্য আয়াতে আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
أَفَرَعَيْتُمُ اللَّهَ وَالْعُزَّى وَمَنُوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى أَلَكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنْثَى تِلْكَ إِذًا قِسْمَةٌ ضِيزَى إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءُ سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنَ سُلْطَنٍ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنْفُسُ وَلَقَدْ جَاءَهُم مِن رَّبِّهِمُ الْهُدَى

"অতএব, তোমরা আমাকে জানাও ‘লাত’ ও ‘উযযা’ সম্পর্কে এবং তৃতীয় আরেকটি ‘মানাত’ সম্পর্কে? তবে কি তোমাদের জন্য পুত্র সন্তান এবং আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান? এ রকম বন্টন তো অসঙ্গত। এগুলো কতক নাম মাত্র যা তোমাদের পূর্বপুরুষরা ও তোমরা রেখে নিয়েছ, যার সমর্থনে আল্লাহ কোন দালীল প্রেরণ করেননি। তারা তো কেবল অনুমান এবং মনের খেয়াল-খুশীরই অনুসরণ করে। অথচ তাদের নিকট তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবশ্যই পথ-নির্দেশ এসেছে।"

ইউসুফ সম্পর্কে কুরআন মাজীদে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, তিনি তাঁর কওমের লোকজনকে বলেছিলেনঃ
دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءَ سَيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا تُعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ
“তাঁকে ছেড়ে তোমরা শুধু কতগুলো নামের ইবাদাত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ, এগুলোর কোন প্রমাণ আল্লাহ নাবিল করেননি। বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই।”

উল্লিখিত আয়াতসমূহ দ্বারা একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, لا إله إلا الله ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ নেই কোন সত্য উপাস্য আল্লাহ ব্যতিত কথার অর্থ হচ্ছে لا معبود حق إلا الله ‘লা মা’বূদা হাককুন ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা’বুদ নেই। আর আল্লাহ ব্যতীত যতসব উপাস্য রয়েছে, যাদের উলুহিয়্যাহ বা উপাস্য হওয়ার যোগ্যতা আছে বলে তাদের উপাসকরা মনে করেছে তাতে কোন সত্যতা নেই এবং তাদের উলুহিয়্যাহ (সম্পূর্ণ) বাতিল।
১. তিনি হলেন মহান আল্লাহ্র অন্তরঙ্গ বন্ধু, হানীফদের (যারা শিরকমুক্তভাবে সোজা সরল পথ ও সত্য দ্বীনের উপর রয়েছে) ইমাম এবং মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পরেই রয়েছে যার স্থান। তাঁর পিতার নাম ছিল আযর।
২. براء শব্দটি البراءة বা আলবারাআহ শব্দটির ন্যায়, ও তা بريء বা বারী' শব্দের চাইতেও অধিকতর। (এ সকল শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে কোন কিছুর সাথে সম্পর্ক রাখা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকা।) আলোচ্য আয়াতের إِنَّنِي بَرَاءٌ مِمَّا تَعْبُدُونَ (তোমরা যাদের ইবাদাত কর তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই) কথাটি 'লা ইলাহা' কথার সমার্থক।
৩. إِلَّا الَّذِي فَطَرَنِي (তবে তিনি ব্যতীত, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন) অর্থাৎ যিনি আমাকে শুরুতেই ফিতরাত তথা সহজাত প্রবৃত্তিতে সৃষ্টি করেছেন।

আলোচ্য আয়াতের إِلَّا الَّذِي فَطَرَنِي এই অংশটুকু 'ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ব্যতীত) কথাটির সমার্থক।
রাজত্বের ক্ষেত্রে যেমন আল্লাহর কোন অংশীদার নেই, তেমনি ইবাদাতের ক্ষেত্রেও তাঁর কোন শরীক নেই। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহর এই বাণী:
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبْرَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَلَمِينَ
"জেনে রাখ, সৃষ্টি করা এবং নির্দেশ দান তাঁরই কাজ। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ কত বরকতময়!"

এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, সৃষ্টি করা এবং আদেশ প্রদানের অধিকার একমাত্র আল্লাহর জন্যই সুনির্দিষ্ট, যিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক। যাবতীয় সৃষ্টি তাঁরই এবং সৃষ্টিগত ও ধর্মীয় সকল প্রকার বিধিবিধান প্রদানের অধিকারও একমাত্র তাঁরই, অন্য কারো নয়।
৮. سَيَهْدِينِ (তিনি আমাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন) অর্থাৎ তিনিই আমাকে সত্যের সন্ধান দিবেন এবং সেই পথে পরিচালিত হওয়ার তাওফীক দান করবেন।
৫. فِي عَقِبِهِ (তাঁর উত্তরসূরীদের মাঝে) অর্থাৎ তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে।
৬. وَجَعَلَهَا (তিনি একে রেখে গেছেন) এখানে 'একে' বলতে ইব্রাহিম এর কথাকে বুঝানো হয়েছে, যা তিনি স্থায়ীরূপে তাঁর উত্তরসূরীদের মাঝে রেখে গিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, 'কেবল আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্যের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই'।
৭. لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ (যাতে তারা ফিরে আসে) অর্থাৎ যাতে তারা শিরক থেকে আল্লাহ তাওহীদের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে পারে।
৮. قُلْ (আপনি বলুন) অর্থাৎ আহলে কিতাব ইহুদী ও নাসারাদের সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য রাসূল(ﷺ) কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৯. تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ (এসো সেই কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই) এখানে যে কথার দিকে তাদেরকে আহ্বান করা হচ্ছে

সেই কথা হলো, 'আমরা একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদাত করবো না, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবো না এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া একে অন্যকে রব্ব হিসেবে গ্রহণ করবো না'। আর 'আমরা একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদাত করবো না' এটাই হচ্ছে কালিমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর অর্থ। তাছাড়া سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ এর অর্থ হচ্ছে, আলোচ্য বিষয়ে তোমাদের ও আমাদের মাঝে সাদৃশ্য রয়েছে।
وَلا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ ৫০. )আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া একে অন্যকে রব্ব হিসেবে গ্রহণ করবো না) অর্থাৎ আল্লাহকে যেরূপ সম্মান প্রদর্শন করা হয়, আমরা কেউ কাউকে সেরূপ সম্মান প্রদর্শন করবো না, আল্লাহ্ ইবাদাতের ন্যায় আমরা কেউ কারো ইবাদাত করবো না এবং আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে আমরা বিধানদাতা সাব্যস্ত করবো না।
১১. فَإِنْ تَوَلَّوْا )আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়) অর্থাৎ তোমরা যে বিষয়ের প্রতি তাদেরকে আহ্বান করছ, যদি তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বা সেই আহ্বানকে উপেক্ষা করে।
১২. فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ )তবে তোমরা বল, তোমরা সাক্ষী থেকো যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী মুসলিম)
অর্থাৎ যদি তারা তোমাদের আহ্বানে সাড়া না দেয় এবং উপেক্ষা করে, তাহলে তোমরা তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দাও এবং তাদেরকে এই মর্মে সাক্ষী রাখ যে, নিশ্চয়ই তোমরা আল্লাহ্র নিকট আত্মসমর্পণকারী মুসলিম। আর এই সুমহান বাক্য 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। এর ব্যাপারে তাদের জেদ ও অস্বীকার করা থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা।
১. مِنْ أَنْفُسِكُمْ (তোমাদের মধ্য থেকেই) অর্থাৎ তোমাদের স্বজাতি থেকেই। শুধু তাই নয়, বরং তিনি তোমাদেরই একজন। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
“তিনিই নিরক্ষরদের মধ্যে তাদের একজনকে পাঠিয়েছেন রাসূলরূপে, যিনি তাদের নিকট তিলাওয়াত করেন তাঁর (আল্লাহর) আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমাহ (প্রজ্ঞা), যদিও ইতঃপূর্বে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।”

২. عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ (তোমাদেরকে যা কষ্ট দেয় তা তার জন্য বড়ই বেদনাদায়ক) অর্থাৎ যা তোমাদের জন্য কষ্টদায়ক, তা তাঁর জন্যও কষ্টদায়ক।
৩. حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ (তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী) অর্থাৎ তিনি তোমাদের মঙ্গল চান এবং সকল প্রকার অনিষ্ট ও অমঙ্গল থেকে তোমাদের নিষ্কৃতি কামনা করেন।

بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ . ৪. মু'মিনদের প্রতি তিনি স্নেহপরায়ণ এবং দয়ালু। এখানে রাসূলের () মমতা ও দয়া কেবল ঈমানদারগণের জন্য নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তিনি মু'মিনদের প্রতি স্নেহপরায়ণ এবং দয়ালু। কারণ তিনি কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে এবং তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে আদিষ্ট ছিলেন। রাসূল () এর এসব গুণাবলি প্রমাণ করে যে, সত্যিই তিনি আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল।
যেমন মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ
“মুহাম্মাদ হলেন আল্লাহ্র রাসূল।”

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا
"আপনি বলুন, হে মানুষ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর রাসূল।”

এরকম আরো অনেক আয়াত রয়েছে যেগুলো প্রমাণ করে যে, সত্যিকার অর্থেই মুহাম্মাদ () আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল।
৫. 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' সাক্ষ্যবাণীর ব্যাখ্যা: 'মুহাম্মাদ () আল্লাহ্র রাসূল' এই সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ হচ্ছে, অন্তর দিয়ে এই বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে পোষণ করা এবং মুখ দিয়ে স্বীকার করা যে, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ্ আল-কুরাশী আল-হাশিমী হলেন সমগ্র মানব ও জ্বিন জাতির প্রতি আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আর আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন এবং মানব জাতিকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।”

আর কোন ইবাদাতই আল্লাহর উদ্দেশ্যে কৃত ইবাদাত বলে গণ্য হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল (ﷺ) এর প্রতি প্রেরিত ওয়াহয়ী মোতাবেক না হবে।
যেমন মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا
"কত বরকতময় তিনি! যিনি তাঁর বান্দার উপর সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী কিতাব নাযিল করেছেন, যাতে তিনি সৃষ্টিজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন।"

'মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল' এই সাক্ষ্যের দাবি বা চাহিদা হলো, রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে যে সব সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোকে পরিপূর্ণভাবে সত্য বলে স্বীকার করা, তিনি যা কিছু আদেশ করেছেন তা যথাযথভাবে মেনে চলা, যা কিছু থেকে নিষেধ ও বারণ করেছেন তা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা এবং শারীয়াত বহির্ভূত পন্থায় ইবাদাত না করা।
তাছাড়া এই শাহাদাহ বা সাক্ষ্য প্রদানের আরও দাবি হলো, এরূপ কোন ধারণা বা বিশ্বাস আদৌ পোষণ না করা যে, রুবুবিয়্যাহ (প্রতিপালক হওয়ার ক্ষেত্রে), সৃষ্টিজগত পরিচালনায় কিংবা ইবাদাতে রাসূল (ﷺ) এর ন্যূনতম কোন অধিকার রয়েছে। বরং এই সাক্ষ্য প্রদানের দাবি হলো রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, তিনি হলেন আল্লাহর এক বান্দা যার ইবাদাত করা যায় না, তিনি হলেন আল্লাহর প্রেরিত একজন রাসূল যার রিসালাতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার আদৌ কোন সুযোগ নেই এবং তিনি কেবল আল্লাহ যা চান তা ব্যতীত নিজের বা অন্যের বিন্দুমাত্র উপকার বা ক্ষতি করার কোন সামর্থ্য রাখেন না।
যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
قُلْ لَّاۤ أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَۤائِنُ اللهِ وَلَاۤ أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَاۤ أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحٰى إِلَيَّ

"বলুন, আমি তোমাদেরকে বলিনা যে, আমার নিকট আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ আছে, আর আমি গায়েবও জানি না এবং তোমাদেরকে এটাও বলি না যে, আমি ফিরিশতা। আমার প্রতি যা ওয়াহয়ীরূপে প্রেরণ করা হয়, আমি তো শুধু তারই অনুসরণ করি?"

সুতরাং রাসূল (ﷺ) হলেন আল্লাহ্ আদিষ্ট এক বান্দাহ। তিনি কেবল তাই অনুসরণ করেন যা আল্লাহ্ তাঁকে আদেশ করেন। মহান আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا قُلِ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنَ اللهِ أَحَدٌهُ وَلَنْ أَجِدَ مِن دُونِهِ مُلْتَحَدًا
"বলুন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কোন ক্ষতি বা কল্যাণের মালিক নই। বলুন, আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউই আমাকে রক্ষা করতে পারবে না এবং আল্লাহ ছাড়া আমি কখনও কোন আশ্রয় পাব না।"

অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
قُلْ لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
“বলুন, আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ব্যতীত আমার নিজের ভাল- মন্দের উপরও আমার কোন অধিকার নেই। আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম তবে তো আমি অনেক কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ব্যতীত আমি তো আর কিছুই নই।”

কাজেই এর মাধ্যমে জেনে রাখুন, রাসূল (ﷺ) কিংবা অন্য কোন সৃষ্ট বস্তুই ইবাদাত পাওয়ার অধিকারী নয়। ইবাদাত কেবল আল্লাহ্ জন্যই করতে হবে, অন্য কারো জন্য নয়।

টিকাঃ
255 সূরা আলু ইমরান ৩: ১৮
২৫৬ সূরা হুদ ১১: ১০১
257 সূরা আল-মু'মিনূন ২৩: ৩২
258 সূরা আল-হাজ্জ ২২: ৬২
২৫৯ সূরা আন-নাজম ৫৩: ১৯-২৩
২৬০ সূরা ইউসুফ ১২: ৪০
261 সূরা যুখরুফ ৪৩: ২৬-২৮
262 সূরা আলু ইমরান ৩: ৬৪
২৬৩ সূরা আল-আ'রাফ ৭:৫৪
264 সূরা আত তাওবাহ ৯ : ১২৮
265 সূরা আল-জুমুআহ ৬২ : ২
266 সূরা আল-ফাতহ ৪৮ : ২৯
267 সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৫৮
268 সূরা আয-যারিয়াত ৫১: ৫৬
269 সূরা আল-ফুরকান ২৫: ১
270 সূরা আল-আনআম ৬:৫০
271 সূরা আল-জ্বিন ৭২: ২১-২২
272 সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৮৮
২৭৩ সূরা আল-আনআম ৬ : ১৬২-১৬৩

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 সালাত ও যাকাত

📄 সালাত ও যাকাত


আর সালাত ও এবং যাকাত' আর তাওহীদের ব্যাখ্যার প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণীঃ “তাদেরকে এ ছাড়া অন্য কোন হুকুমই দেয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ইবাদাত করবে খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে। আর তারা নামায প্রতিষ্ঠা করবে আর যাকাত দিবে। আর এটাই সঠিক সুদৃঢ় দ্বীন।”

সলাত এবং যাকাত
১। সলাত কায়েম করা এবং যাকাত প্রদান করা হচ্ছে দ্বীন ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এর প্রমাণ হলো মহান আল্লাহ্ এই বাণী:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلوةَ وَيُؤْتُوا الزَّكُوةَ
"আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদাত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ট করে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত প্রদান করে।"

তাছাড়া এই আয়াত আমভাবে সকল প্রকার ইবাদাতকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাই প্রতিটি মানুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে হানীফ হয়ে শারীআত নির্দেশিত পন্থানুযায়ী খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহ্ ইবাদাত করা।
২. এখানে আম (সাধারণ) কোন বিষয়ের পরে খাস (বিশেষ) কোন বিষয় উল্লেখ করার উদাহরণ পেশ করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে সাধারণভাবে ইবাদাতের কথা বলার পর সলাত ও যাকাতের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। কেননা সলাত কায়েম করা এবং যাকাত প্রদান করা হচ্ছে দ্বীন ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুইটি ইবাদাত যা মহান আল্লাহ্ নির্ধারণ করেছেন। সলাত হলো শারীরিক ইবাদাত এবং যাকাত হলো আর্থিক ইবাদাত। কুরআন মাজীদের প্রায় সর্বত্রই সলাত এবং যাকাতের কথা একই সাথে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. অর্থাৎ আল্লাহ্ ইবাদাত করা তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে এবং সালাত কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করা।
৪. একমাত্র ইসলামই হলো সরল-সঠিক সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন যাতে কোন প্রকার বক্রতা নেই। কেননা ইসলাম হলো আল্লাহ্র মনোনীত দ্বীন, আর আল্লাহ্র মনোনীত দ্বীন হলো সরল-সঠিক সুপ্রতিষ্ঠিত। যেমন মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۚ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ط
"আর এই পথই হলো আমার সরল পথ। কাজেই তোমরা এর অনুসরণ কর এবং ভিন্ন ভিন্ন পথের অনুসরণ করো না। যদি কর তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।"

আলোচ্য আয়াতে (সূরা বাইয়্যিনা : ৫) ইবাদাত, সলাত এবং যাকাতের কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি তাতে তাওহীদের হাকীকাত তথা আল্লাহর একত্ববাদের তাৎপর্যের কথাও বলা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, সম্পূর্ণভাবে শির্ক থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণ ইখলাসের সাথে আল্লাহ্ ইবাদাত করা। কাজেই যে ব্যক্তি সকল প্রকার ইবাদাতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খাঁটি করে নি, সে যেমন তাওহীদপন্থী বলে গণ্য নয়, তেমনি যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে ইবাদাত নিবেদন করে, সেও তাওহীদপন্থী বলে গণ্য হবে না।

টিকাঃ
২৭৪ সূরা আল-বাইয়্যিনাহ ৯৮ : ৫
275 সূরা আল-বাইয়্যিনাহ ৯৮: ৫
276 সূরা আল-আনআম ৬: ১৫৩

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 সিয়াম

📄 সিয়াম


আর সিয়ামের প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণী: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।”

সিয়াম
১. রমাদান মাসে সিয়াম পালন করা ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ হলো কুরআন মাজীদের এই আয়াত:
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমনভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।”

) كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ CO (যেমনিভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববতীদের উপর) কথাটি থেকে যে সব ফায়দা পাওয়া যায় সেগুলো নিম্নরূপ:
ক. মহান আল্লাহ্ আমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও সিয়াম পালন ফরয করে দিয়েছিলেন। এতে বুঝা যায় যে, মহান আল্লাহ্ সিয়ামকে খুব বেশি ভালবাসেন এবং সিয়াম পালন প্রত্যেক জাতির জন্য আবশ্যক।
খ. মহান আল্লাহ্ এ উম্মতকে এ কথা বলে হালকা করে দিয়েছেন যে এ সিয়ামের আদেশ শুধু তাদেরকেই দেয়া হয়নি যা দৈহিক ও আত্মিক ভাবে কষ্টকর হতেও পারে (বরং এ আদেশ পূর্ববর্তীদেরকেও দেয়া হয়েছিল)
গ. আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ্ এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন যে, এই উম্মতের জন্য তিনি তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন, অর্থাৎ আগের উম্মতদের প্রতি যেসব ফযীলত তিনি দান করেছিলেন, সেসবকে তিনি পরিপূর্ণরূপ দান করেছেন।

২. এই আয়াতে মহান আল্লাহ্ সিয়াম পালনের হিকমাহ্ (অন্তর্নিহিত তাৎপর্য) বর্ণনা করেছেন। আর তা হলো لَعَلَّكُمُ تَتَّقُونَ )যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার)। অর্থাৎ সিয়াম পালনের মাধ্যমে তাকওয়া এবং এর আরো যে সব গুণ ও বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান তা যাতে তোমরা অর্জন করতে পারো। সিয়ামের এসব ফায়দার প্রতি ইঙ্গিত করেই রাসূল () ইরশাদ করেছেন:

مَنْ لَمْ يَدَعُ قَوْلَ الزُّورِ وَالعَمَلَ بِهِ، وَالجَهْلَ، فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
'যে ব্যক্তি মিথ্যা ও বানোয়াট কথা বলা এবং সে অনুসারে কাজ করা এবং মূর্খতা পরিহার করলো না, আল্লাহর নিকট তার পানাহার বর্জনে কিছু যায় আসে না"।

টিকাঃ
277 সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৮৩
279 সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৮৩
২৮০ সহীহ বুখারী: হা/৬০৫৭, আবূ দাউদ হা/২৩৬২; তিরমিযী হা/৭০৭; ইবনু মাজাহ হা/১৬৮৯; মিশকাত হা/১৯৯৯。

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 হজ্জ

📄 হজ্জ


আর হজ্জের প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণী: “আল্লাহর জন্য উক্ত ঘরের হাজ্জ করা লোকেদের উপর আবশ্যক যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে এবং যে ব্যক্তি অস্বীকার করবে, (সে জেনে রাখুক) নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিশ্ব জাহানের মুখাপেক্ষী নন।”

হাজ্জ
৩. হাজ্জ পালন ফরয। এর প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণী:
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنَ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمَا كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ
"আল্লাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর হজ্জ করা মানুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য, যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে। আর যে কেউ কুফরী করে সে জেনে রাখুক, নিশ্চয়ই আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন।"

এই আয়াতটি নবম হিজরীতে নাযিল হয় এবং এর দ্বারা হজ্জ ফরয করা হয়। যেহেতু এই আয়াতে হজ্জ সম্পর্কে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا (যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে), অর্থাৎ যে ব্যক্তি হজ্জ পালনের সামর্থ্য রাখে, হজ্জ কেবল তার উপরই ফরয। কাজেই এ থেকে প্রমাণিত হয়, যাদের সামর্থ্য নেই তাদের জন্য হজ্জ পালন করা ফরয নয়।

৪. আলোচ্য আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
وَمَا كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ
"(আর যে কেউ কুফরী করে সে জেনে রাখুক, নিশ্চয়ই আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন।"

এ থেকে প্রমাণিত হয়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ পালন না করা হচ্ছে কুফরী কাজ। তবে অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মত হলো, তা এমন পর্যায়ের কুফর নয় যা ইসলাম ধর্ম থেকে কাউকে বের করে দেয় (অর্থাৎ তা হলো ছোট কুফর)।
এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ্ বিন শাকীক বলেন:
كَانَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم لَا يَرَوْنَ شَيْئًا مِنَ الْأَعْمَالِ تَرْكُهُ كُفْرٌ غَيْرَ الصَّلَاةِ
'মুহাম্মাদ () এর কোন সাহাবী কেবল সালাত ব্যতীত অন্য কোন আমল ছেড়ে দেওয়াকে কুফরী কাজ মনে করতেন না'।

টিকাঃ
278 সূরা আল ইমরান ৩: ৯৭
২৮১ সূরা আল ইমরান ৩: ৯৭
282 তিরমিযী হা/২৬২২; মিশকাত হা/৫৭৯; আলবানী সহীহ বলেছেন, হুকমু তারিকিস সালাত পৃ. ১৭; সহীহা হা/৮৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00