📄 যবই (জবাই করা)
আর যবেহ (জবাই করা)’ এর প্রমাণ মহান আল্লাহ্র বাণী: “বল, আমার সালাত, আমার যাবতীয় ইবাদাত, আমার জীবন, আমার মরণ বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই (নিবেদিত)। তাঁর কোন শরীক নেই।”
আর সুন্নাহ হতে: ‘আল্লাহ্ অভিশাপ তার উপর, যে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে কোন কিছু যবেহ করে।’
যব্হ (জবাই করা)
১. যব্হ (জবাই) করা হচ্ছে বিশেষ পদ্ধতিতে রক্তপাত ঘটানোর মাধ্যমে প্রাণ সংহার করা। কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা করা হয়ে থাকে। যেমন:
ক. ইবাদাত হিসেবে: জবাই করা ইবাদাত তখনই হবে যখন এর উদ্দেশ্য হবে যার জন্য তা করা হচ্ছে তার প্রতি সম্মান ও আনুগত্যপূর্ণ বিনয় প্রদর্শন এবং তার নৈকট্য লাভ করা। এটি আল্লাহ্র উদ্দেশ্য ব্যতিত অন্য কারো উদ্দেশ্যে করা হয় না। আর তা করতে হবে কেবল তাঁর নির্দেশিত পন্থা ও পদ্ধতি অনুযায়ী করতে হবে। একমাত্র 'আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে এ ধরনের জবাই করা হচ্ছে শির্কে আকবার (বড় শির্ক)। এর প্রমাণ হিসেবে পুস্তকের সংকলক কুরআন মাজীদের এই আয়াত পেশ করেছেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبُّ الْعَلَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ
“বলুন, আমার সলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ (সবই) সৃষ্টিকুলের রব্ব আল্লাহর জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই।”
খ. আপ্যায়ন, ওয়ালীমা বা অন্যান্য কারণে: কোন মেহমানের সম্মানার্থে অথবা বিয়ের ওয়ালিমা উপলক্ষে কিংবা এ ধরনের শারীআত সম্মত বিশেষ কোন উপলক্ষে যবেহ করা। এ ধরনের যবেহ করার জন্য ইসলামী শারীআত নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশ ক্ষেত্র বিশেষে কখনো ওয়াজিব হয়ে থাকে, কখনো বা মুস্তাহাব। যেমন রাসূল () বলেছেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمُ ضَيْفَهُ
'যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে'।
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
أَوْلِمُ وَلَوْ بِشَاةٍ
'একটি বকরি দিয়ে হলেও তোমরা ওয়ালীমাহ করে নাও'।
গ. ভোজন, ব্যবসা বা অন্যান্য কারণে: ভোগ-উপভোগ, ব্যবসা এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যে জবাই করা। এ ধরনের জবাই করা মূলত মুবাহ (বৈধ)। আর এই বৈধতা প্রমাণিত হয় মহান আল্লাহ্র এই বাণী দ্বারাঃ
أَوَ لَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُمْ مِّمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَنْعَامًا فَهُمْ لَهَا مَلِكُونَ وَذَلَّلْنَهَا لَهُمْ فَمِنْهَا رَكُوبُهُمْ وَمِنْهَا يَأْكُلُونَ
"আর তারা কি লক্ষ করে না যে, আমার হাতে তৈরি জিনিস থেকে তাদের জন্য আমি সৃষ্টি করেছি গবাদিপশুসমূহ, আর এরপর তারাই এগুলোর মালিক? আর আমি এগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি। ফলে এগুলোর কিছু সংখ্যক হয়েছে তাদের বাহন। আর কিছু সংখ্যক থেকে তারা খেয়ে থাকে।"
এ ধরনের যবেহ করা জায়েয বা হারাম উভয়ই হতে পারে, তা নির্ভর করবে কোন উপলক্ষে তা করা হচ্ছে।
টিকাঃ
241 সূরা আল-আনআম ৬: ১৬২-১৬৩
242 সহীহ মুসলিম: হা/৫০১৮
243 সূরা আল-আনআম ৬: ১৬২-১৬৩
244 বুখারী হা/৬০১৮; সাহীহ মুসলিম হা/৭৮ (৪৭), আবূ দাউদ হা/৩৭৪৮; তিরমিযী হা/১৯৬৭; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৭২; মিশকাত হা/৪২৪৩।
245 সাহীহ বুখারী: হা/৩৯৩৭, মুসলিম হা/১৪২৭; আবু দাউদ হা/২১০৯; তিরমিযী হা/১০৯৪; নাসাঈ হা/৩৩৫১; ইবনু মাজাহ হা/১৯০৭; মিশকাত হা/৩২১০।
246 সূরা ইয়াসীন ৩৬: ৭১-৭২
📄 নযর, মানত বা প্রতিজ্ঞা
আর নযর, মানত বা প্রতিজ্ঞা' এর প্রমাণ মহান আল্লাহ্র বাণী:
'যারা মানত পূরণ করে আর সেই দিনকে ভয় করে যার অনিষ্ট হবে সুদূর প্রসারী।'
নযর, মানত বা প্রতিজ্ঞা
১. নযর ও মানতও যে এক প্রকার ইবাদাত, এর প্রমাণ কুরআনের এ আয়াত:
يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَنَ شَرُّهُ مُسْتَطِيران
“তারা (মু’মিনরা) মানতসমূহ পূর্ণ করে এবং সেই দিনের ভয় করে, যে দিনের অকল্যাণ হবে ব্যাপক।”
২. যেসব ক্ষেত্রে ইবাদাত: এই আয়াতে যেহেতু মহান আল্লাহ্ নযর বা মানত পরিপূর্ণরূপে যারা আদায় করে তাদের প্রশংসা করেছেন, অতএব এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্ নযর বা মানতকে পছন্দ করেন। আর যেহেতু আল্লাহ্র নিকট পছন্দনীয় এমন প্রতিটি কাজই হচ্ছে ইবাদাত। আয়াতের পরবর্তী অংশ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا (আর তারা সেই দিনের ভয় করে, যে দিনের অকল্যাণ হবে ব্যাপক) দ্বারা নযর বা মানতের ইবাদাত হওয়ার বিষয়টি আরো প্রমাণিত হয়。
অতঃপর জেনে রাখুন! মহান আল্লাহ্ যে সব মানত পূর্ণ করার প্রশংসা করেছেন, সেগুলো তাঁর সকল ধরনের ইবাদাতকে অন্তর্ভুক্ত করে। কেননা ফরয বা ওয়াজিব কোন ইবাদাত কেউ যখন করতে শুরু করে, তখন সে তা পালন করা এবং পরিপূর্ণ করা তার জন্য আবশ্যকীয়।
এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ্র এই বাণী:
ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَتَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ وَلْيَطَّوْفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ
“তারপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে এবং তাদের মানত পূর্ণ করে। আর তাওয়াফ করে প্রাচীন ঘরের।”
যেসব ক্ষেত্রে অপছন্দনীয়: পক্ষান্তরে কোন ব্যক্তি যদি অন্য কোন কাজকে নিজের জন্য আবশ্যিক করে নেয় কিংবা ফরয-ওয়াজিব ব্যতীত আল্লাহ্র আনুগত্য মূলক কোন আমল করাকে নিজের জন্য আবশ্যিক করে নেয়, তাহলে তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়)। কোন কোন উলামায়ে কিরাম এটাকে হারাম বলেছেন। কেননা রাসূল (ﷺ) নযর বা মানত করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন:
إِنَّهُ لَا يَأْتِي بِخَيْرٍ، وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ
‘মানত কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। এর দ্বারা কেবল কৃপণের কিছু অর্থ-সম্পদ বের হয়ে যায়’
কিন্তু তা সত্ত্বেও কেউ যদি মহান আল্লাহর আনুগত্য মূলক কোন কাজ করার নযর বা মানত করে নেয়, তাহলে তা পালন করা তার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়। কেননা নাবী (ﷺ) বলেছেন:
مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِيعْهُ وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَ اللَّهَ فَلَا يَعْصِهِ
'আল্লাহর আনুগত্যের উদ্দেশ্যে কোন ব্যক্তি মানত করলে সে যেন তা পূর্ণ করে। আর কোন ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করার উদ্দেশ্যে মানত করলে সে যেন তা পূর্ণ না করে'।
নযর বা মানত সম্পর্কে সার-সংক্ষেপ কথা হলো, সাধারণ অর্থে সকল ধরনের ফরয ইবাদাতের ক্ষেত্রে নযর বা মানত প্রযোজ্য হবে। কিন্তু বিশেষ অর্থে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোন কাজ করাকে নিজের জন্য আবশ্যকীয় করে নেওয়াকে নযর বলা হয়। উলামায়ে কিরাম এই বিশেষ ধরনের নযর বা মানতকে আরো কয়েক প্রকারে বিভক্ত করেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ফিকহের কিতাবাদি দেখা যেতে পারে।
টিকাঃ
247 সূরা আল-ইনসান (দাহ্র) ৭৬ : ৭
248 সূরা আল-ইনসান (দাহর) ৭৬: ৭
249 সূরা আল-হাজ্জ ২২: ২৯
250 সাহীহ মুসলিম: হা/১৬৩৯, নাসাঈ হা/৩৮০১।
251 বুখারী হা/৬৬৯৮; আবু দাউদ হা/৩২৮৯; তিরমিযী হা/১৫২৬; নাসাঈ হা/৩৮০৬; ইবনু মাজাহ হা/২১২৬; মিশকাত হা/৩৪২৭।