📄 ইসতি‘আযাহ্ (আশ্রয় প্রার্থনা)
আর ইসতিআযাহ বা আশ্রয় প্রার্থনা' এর প্রমাণ মহান আল্লাহর বাণী: "বল, 'আমি আশ্রয় চাচ্ছি সকাল বেলার রব-এর।” এবং : “আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানুষের প্রতিপালকের
ইসতিআযাহ (আশ্রয় প্রার্থনা)
১. ইসতিআযাহ অর্থ হলো আশ্রয় প্রার্থনা করা। অর্থাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত বা খারাপ কোন বিষয় থেকে নিরাপত্তা চাওয়া। আর যিনি আশ্রয় দান করেন, তিনি আশ্রয় প্রার্থীকে নিরাপদে রাখেন, তাকে নিরাপত্তা দেন। ইসতিযাহ কয়েক ধরনের হয়ে থাকে:
ক. আল্লাহ্র নিকট: আর তা হলো আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ পরিপূর্ণ মুখাপেক্ষিতা, সুদৃঢ় আনুগত্য, আল্লাহই সকল বিষয়ে যথেষ্ট এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের ছোট, বড়, মানবীয়, মানুষ ব্যতিত অন্য প্রাণী কিংবা অন্য যে কোন ধরনের খারাপ বিষয়বস্তু থেকে আল্লাহ্র সাহায্য এবং আশ্রয়ই হলো একমাত্র পরিপূর্ণ আশ্রয়, এই সুদৃঢ় বিশ্বাস পোষণ। এর প্রমাণ হচ্ছে কুরআন মাজীদে বর্ণিত সূরা ফালাক ও সূরা নাস এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আয়াতসমূহ:
قُلِ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ مِن شَرِّ مَا خَلَقَهُ وَمَا شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ وَمَا شَرِّ النَّفْتِ فِي الْعُقَدِ وَمَا شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
"বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি প্রভাতের প্রতিপালকের। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে। আর রাতের অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে, যখন তা গভীর হয়। আর সকল নারীদের অনিষ্ট থেকে, যারা (যাদু করার উদ্দেশ্যে) গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দেয়। আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে। "
আর আল্লাহ্ তাআলার বাণী:
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ مَلِكِ النَّاسِ إِلَهِ النَّاسِ مِن شَرِ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ
“বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির, মানুষের ইলাহ এর নিকট, আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে জ্বিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে।”
খ. আল্লাহ্র কোন গুণের ওয়াসীলায়: আল্লাহ্র সুমহান গুণাবলির মধ্য থেকে কোন গুণের ওয়াসীলা দ্বারা তাঁর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা। যেমন: মহান আল্লাহ্র কালাম (বাণী), তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ত্ব, শক্তি, মান-মর্যাদা ইত্যাদির ওয়াসীলায় তাঁর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা।
এর প্রমাণ হচ্ছে নাবী (ﷺ) এর নিম্নোক্ত বাণী:
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
'আমি আল্লাহ্র পরিপূর্ণ বাণীর ওয়াসীলায় তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই'।
তিনি (ﷺ) আরো বলতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِعَظَمَتِكَ أَنْ أُغْتَالَ مِنْ تَحْتِي
'হে আল্লাহ্! আমি আমার নিচের দিকে ধসে যাওয়া থেকে আপনার মর্যাদার আশ্রয় গ্রহণ করছি'।
ব্যথা-বেদনা নিরসনের জন্য রাসূল (ﷺ) আল্লাহ্র নিকট এই বলে দুআ' করেছেন:
أَعُوذُ بِعِزَّةِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ
'আমি মহান আল্লাহ্র অসীম মান-মর্যাদা ও তাঁর সুবিশাল ক্ষমতার ওয়াসীলায় আমার অনুভূত এই ব্যথার ক্ষতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি'।
তিনি (স) বলতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ
'হে আল্লাহ্! আমি আপনার সন্তুষ্টির ওয়াসীলায় আপনার অসন্তোষ থেকে আশ্রয় চাই'।
যখন এই আয়াত নাযিল হয়:
قُلْ هُوَ الْقَادِرُ عَلَى أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عَذَابًا مِّنْ فَوْقِكُمْ أَوْ مِن تَحْتِ أَرْجُلِكُمْ أَوْ يَلْبِسَكُمْ شِيَعًا وَيُذِيقَ بَعْضَكُمْ بَأْسَ بَعْضٍ
"বলুন, তোমাদের ঊর্ধ্বদেশ অথবা পদতল হতে শাস্তি প্রেরণ করতে, তোমাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করতে এবং এক দলকে অপর দলের নিপীড়নের আস্বাদ গ্রহণ করাতে তিনিই সক্ষম।"
তখন রাসূল (স) বলেছিলেন:
أَعُوذُ بِوَجْهِكَ
'হে আল্লাহ্! আমি আপনার চেহারার সাহায্যে আশ্রয় প্রার্থনা করছি'।
গ. মৃত, অনুপস্থিত বা জীবিত কোন অক্ষম ব্যক্তির নিকট: কোন মৃতের নিকট অথবা জীবিত কিন্তু বর্তমানে অনুপস্থিত এবং আশ্রয় দানে অক্ষম এমন কারো নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা। এ ধরনের ইসতিযাহ হচ্ছে শির্ক।
এর প্রমাণ হলো মহান আল্লাহ্র এই বাণীঃ
وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِنَ الْإِنْسِ يَعُودُونَ بِرِجَالٍ مِنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا
“আর কতিপয় মানুষ কতক জ্বিনদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতো, ফলে তারা জ্বিনদের অহংকার বাড়িয়ে দিত।”
ঘ. সক্ষম কোন ব্যক্তি বা কোন কিছুর নিকটঃ সৃষ্ট বস্তুসমূহের মধ্য থেকে এমন কোন মানুষ, স্থান অথবা অন্য কোন কিছুর আশ্রয় চাওয়া যার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করা সম্ভব। এ ধরনের জায়েয বা শারীয়াত সম্মত। এর প্রমাণ হচ্ছে নবী(সা) এর হাদীস যাতে তিনি বিভিন্ন ধরনের ফিতনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেনঃ
سَتَكُونُ فِتَنٌ الْقَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنْ الْقَائِمِ وَالْقَائِمُ خَيْرٌ مِنَ الْمَاشِي وَالْمَاشِي فِيهَا خَيْرٌ مِنَ السَّاعِي مَنْ تَشَرَّفَ لَهَا تَسْتَشْرِفُهُ فَمَنْ وَجَدَ مَلْجَأً أَوْ مَعَادًا فَلْيَعُدُّ بِهِ
“শীঘ্রই বিভিন্ন ফিতনা দেখা দিবে। তখন বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়ানো ব্যক্তির চেয়ে ভাল (ফিতনামুক্ত) থাকবে, দাঁড়ানো ব্যক্তি চলমান ব্যক্তির চেয়ে ভাল থাকবে এবং চলমান ব্যক্তি ধাবমান ব্যক্তির চেয়ে ভাল থাকবে। যে ব্যক্তি সেই ফিতনাকে অনুসরণ করবে, ফিতনা তাকে ঘিরে ধরবে। কাজেই তখন কেউ যদি কোথাও কোন নিরাপদ আশ্রয়স্থল কিংবা আত্মরক্ষার ঠিকানা পায়, তাহলে সে যেন সেখানে আশ্রয় নেয়।”
এ ধরনের নিরাপদ স্থান ও আশ্রয় সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেনঃ
مَنْ كَانَتْ لَهُ إِبِلٌ فَلْيَلْحَقْ بِإِبِلِهِ وَمَنْ كَانَتْ لَهُ غَنَمٌ فَلْيَلْحَقْ بِغَنَمِهِ وَمَنْ كَانَتْ لَهُ أَرْضٌ فَلْيَلْحَقْ بِأَرْضِهِ
“যার উট আছে, সে যেন তার উটের সঙ্গে, যার বকরী আছে, সে তার বকরীর সঙ্গে এবং যার জমি আছে সে তার জমি নিয়ে ব্যস্ত থাকে।”
সাহীহ মুসলিমে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, একদা মাখযুম গোত্রের এক মহিলাকে চুরির অপরাধে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট হাযির করা হলে সেই মহিলা তখন উম্মু সালামাহ (রাঃ) এর আশ্রয় চান। সাহীহ মুসলিমে উম্মু সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রয়েছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
يَعُوذُ عَائِدٌ بِالْبَيْتِ فَيُبْعَثُ إِلَيْهِ بَعْثُ
'জনৈক আশ্রয় গ্রহণকারী বাইতুল্লাহ শরীফে আশ্রয় গ্রহণ করবে। তখন তার বিরুদ্ধে একটি বাহিনী প্রেরণ করা হবে'।
এমনিভাবে কেউ যদি কোন অত্যাচারীর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চায়, তাহলে সাধ্যানুযায়ী তাকে আশ্রয় বা নিরাপত্তা প্রদান করা আবশ্যক। কিন্তু কেউ যদি কোন নিষিদ্ধ কাজ করার জন্য কিংবা ইসলামী শারীআতের কোন ওয়াজিব কাজ থেকে পলায়ন করার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাহলে তাকে কোন প্রকার আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেওয়া হারাম।
টিকাঃ
221 সূরা আল-ফালাক ১১৩: ১
222 সূরা আন-নাস ১১৪:১
223 সূরা আল-ফালাক ১১৩: ১-৫
২২৪ সূরা আন-নাস ১১৪ : ১-৬
২২৫ মুসলিম হা/২৭০৮; আবূ দাউদ হা/৩৮৯৮; তিরমিযী হা/৩৪৩৭; ইবনু মাজাহ হা/৩৫১৮; মিশকাত হা/২৪২২।
২২৬ আবু দাউদ হা/৫০৭৪; নাসাঈ হা/৫৫২৯; ইবনু মাজাহ হা/৩৮৭১; মিশকাত হা/২৩৯৭; সহীহুত তারগীব ওয়াত-তারহীব হা/৬৫৯। মুহাদ্দিস আলবানী হাদীসটিকে সাহীহ বলেছেন
227 সাহীহ মুসলিম: হা/২২০২, ইবনু মাজাহ হা/৩৫২২; মিশকাত হা/১৫৩৩।
228 সাহীহ মুসলিম: হা/৪৮৬, আবূ দাউদ হা/৮৭৯; তিরমিযী হা/৩৪৯৩; নাসাঈ হা/১৬৯; ইবনু মাজাহ হা/৩৮৪১; মিশকাত হা/৮৯৩।
229 সূরা আল-আনআম ৬: ৬৫
230 সাহীহ বুখারী: হা/৭৪০৬, তিরমিযী হা/৩০৬৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ হা/৪০১৬。
২৩১ সূরা আল-জিন্ন ৭২: ৬
২৩২ সহীহ বুখারী: হা/৭০৮২, মুসলিম হা/২৮৮৬; আহমাদ হা/৭৭৯৬; মিশকাত হা/৫৩৮৪।
২৩৩ মুসলিম হা/২৮৮৭; আবু দাউদ হা/৪২৫৬; আহমাদ হা/২০৪১২; মিশকাত হা/৫৩৮৫।
📄 ইসতিগাসাহ (বিপদ মুক্তির জন্য সাহায্য প্রার্থনা)
আর ইসতিগাস্নাহ (বিপদ থেকে উদ্ধার বা মুক্তির জন্য সাহায্য প্রার্থনা)' এর প্রমাণ মহান আল্লাহ্র বাণী: “স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছিলে তখন তিনি তোমাদেরকে জবাব দিলেন। "
ইসতিগাস্নাহ (বিপদমুক্তির জন্য সাহায্য প্রার্থনা)
১. ইসতিগাস্নাহ হচ্ছে কোন ধরনের বিপদ বা ধ্বংস থেকে উদ্ধার বা মুক্তির জন্য সাহায্য প্রার্থনা। এটি কয়েক ধরনের হতে পারে:
ক. আল্লাহ্র নিকট: মহান আল্লাহ্র নিকট কোন বিপদ থেকে উদ্ধার বা মুক্তির জন্য ফরিয়াদ করা হলো সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠতম কাজের মধ্যে অন্যতম একটি কাজ। এটা ছিল রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর অনুসারীদের অভ্যাস এবং রীতি।
এ কথার প্রমাণ স্বরূপ শায়খ [ ] এই আয়াতটি পেশ করেছেনঃ
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَکُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلَكَةِ مُرْدِفِينَ
“স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকট উদ্ধার প্রার্থনা করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন এভাবে যে, অবশ্যই আমি তোমাদেরকে সাহায্য করবো এক হাজার ফিরিশতা দিয়ে, যারা একের পর এক আসবে।”
ঘটনাটি ঘটেছিল বদরের যুদ্ধের সময়। যখন রাসূল ( ) দেখলেন মুশরিক যোদ্ধাদের সংখ্যা ১০০০ জন আর নিজ সঙ্গী-সাথীদের সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ৩১০ জনের কিছুটা বেশি (৩১৩ জন), তখন তিনি তাঁর তাবুতে প্রবেশ করে কিবলামুখী হয়ে দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর নিকট আন্তরিকভাবে এই বলে দু’আ করতে লাগলেনঃ
اللَّهُمَّ أَنْجِزْ لِي مَا وَعَدْتَنِي اللَّهُمَّ آتِنِي مَا وَعَدْتَنِي اللَّهُمَّ إِنْ تُهْلِكْ هَذِهِ الْعِصَابَةَ مِنْ أَهْلِ الْإِسْلَامِ لَا تُعْبَدُ فِي الْأَرْضِ
‘হে আল্লাহ্! তুমি আমার সাথে যে ওয়াদা করেছিলে তা পূর্ণ কর। হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে তা দান কর যার ওয়াদা তুমি করেছ। হে আল্লাহ্! যদি কতিপয় মুসলিমের এই ক্ষুদ্র দলটিকে তুমি ধ্বংস করে দাও, তাহলে যমীনে তোমার ইবাদাত অনুষ্ঠিত হবে না’
এভাবে রাসূল ( ) দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে সাহায্যের জন্য কায়মনে কাকুতি-মিনতি করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে তার কাঁধ থেকে চাদর পড়ে গেলে আবু বকর ( ) সেই চাদর রাসূল ( ) এর কাঁধে উঠিয়ে দেন এবং পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে বলেনঃ হে আল্লাহর নবী! আপনার পালনকর্তার প্রতি আপনার কাকুতি-মিনতি যথেষ্ট হয়েছে। নিশ্চয়ই তিনি আপনাকে তাঁর দেওয়া ওয়াদা বাস্তবায়ন করবেন。
আর তখনই আল্লাহ্ এই আয়াত নাযিল করেন:
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ
"স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকট উদ্ধার প্রার্থনা করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।"
খ. মৃত, অনুপস্থিত বা জীবিত অক্ষম ব্যক্তির নিকট: কোন মৃতের নিকট অথবা জীবিত কিন্তু বর্তমানে অনুপস্থিত এমন কারো নিকট বিপদমুক্তির জন্য সাহায্য প্রার্থনা করা, যা তার করার কোন ক্ষমতা বা সাধ্য নেই। এ ধরনের ইসতিগাসাহ করা হল শির্ক। কেননা এ ধরনের সাহায্য প্রার্থনা কেবল সেই ব্যক্তি করে থাকে, যে বিশ্বাস পোষণ করে যে, এক্ষেত্রে সে যাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছে, সৃষ্টিজগত পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের অদৃশ্য কোন হাত বা ক্ষমতা রয়েছে। আর এভাবে তারা তাদেরকে আল্লাহ্ রুবুবিয়্যাতে (প্রতিপালকত্বে) অংশীদার বানিয়ে দেয়। আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
ا مَا يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمُ خُلَفَاءَ الْأَرْضُ وَلَهُ مَعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
“নাকি তিনি, যিনি আর্তের ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাকে ডাকে এবং বিপদ দূরীভূত করেন, আর তোমাদেরকে যমীনের খলীফা বানান। আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহ আছে কি? তোমরা খুব অল্পই শিক্ষা গ্রহণ করে থাক।"
গ. জীবিত, উপস্থিত সক্ষম ব্যক্তির নিকট: উপস্থিত বা জীবিত এমন কারো নিকট বিপদ-আপদে উদ্ধার বা সাহায্য প্রার্থনা করা, যে তাকে সাহায্য করার শক্তি-সামর্থ্য রাখে। এ ধরনের সাহায্য প্রার্থনা করা বৈধ ও শারীআহ্ সম্মত। কুরআন মাজীদে আল্লাহ্ মূসা এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেন:
فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنَ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنَ عَدُوِّهِ فَوَكَزَهُ مُوسى فَقَضَى عَلَيْهِ
“অতঃপর মূসার দলের লোকটি শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মূসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং এভাবে তিনি তাকে হত্যা করে বসলেন।”
ঘ. শারীরিকভাবে অক্ষম কোন জীবিত ব্যক্তির নিকট: কোন বিপদ-আপদে জীবিত কোন ব্যক্তির নিকট উদ্ধার বা সাহায্য প্রার্থনা করা, যে তাকে সাহায্য করতে অক্ষম এবং সাহায্যপ্রার্থীও এই বিশ্বাস রাখে যে, তার অদৃশ্য কোন ক্ষমতা বা হাত নেই। যেমন: পানিতে ডুবন্ত কোন ব্যক্তি যদি পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) কোন লোকের নিকট উদ্ধার কামনা করে, তাহলে তার এই সাহায্য চাওয়াটা হবে প্যারালাইজড লোকটির সাথে নিছক তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। এজন্য এ ধরনের ইসতিগাসাহ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আরো একটি কারণ হলো, কারো এ ধরনের লোকের কাছে ইসতিগাসাহ করতে দেখে অন্যেরা এই ভেবে প্রতারিত ও বিভ্রান্ত হতে পারে যে, হয়তো এই প্যারালাইজড লোকটির এমন কোন অদৃশ্য ক্ষমতা রয়েছে যা দ্বারা সে মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে।
টিকাঃ
235 সূরা আল-আনফাল ৮:৯
236 সূরা আল-আনফাল ৮:৯
237 তিরমিযীঃ হা/৩০৮১, আলবানী হাদীষটিকে হাসান বলেছেন, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/২৯৫৮৩; সহীহ ইবনু হিব্বান হা/৪৭৯৩।
238 সূরা আল-আনফাল ৮:৯
239 সূরা আন-নাম্ন ২৭ : ৬২
240 সূরা আল-কাসাস ২৮: ১৫
📄 যবই (জবাই করা)
আর যবেহ (জবাই করা)’ এর প্রমাণ মহান আল্লাহ্র বাণী: “বল, আমার সালাত, আমার যাবতীয় ইবাদাত, আমার জীবন, আমার মরণ বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই (নিবেদিত)। তাঁর কোন শরীক নেই।”
আর সুন্নাহ হতে: ‘আল্লাহ্ অভিশাপ তার উপর, যে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে কোন কিছু যবেহ করে।’
যব্হ (জবাই করা)
১. যব্হ (জবাই) করা হচ্ছে বিশেষ পদ্ধতিতে রক্তপাত ঘটানোর মাধ্যমে প্রাণ সংহার করা। কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা করা হয়ে থাকে। যেমন:
ক. ইবাদাত হিসেবে: জবাই করা ইবাদাত তখনই হবে যখন এর উদ্দেশ্য হবে যার জন্য তা করা হচ্ছে তার প্রতি সম্মান ও আনুগত্যপূর্ণ বিনয় প্রদর্শন এবং তার নৈকট্য লাভ করা। এটি আল্লাহ্র উদ্দেশ্য ব্যতিত অন্য কারো উদ্দেশ্যে করা হয় না। আর তা করতে হবে কেবল তাঁর নির্দেশিত পন্থা ও পদ্ধতি অনুযায়ী করতে হবে। একমাত্র 'আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে এ ধরনের জবাই করা হচ্ছে শির্কে আকবার (বড় শির্ক)। এর প্রমাণ হিসেবে পুস্তকের সংকলক কুরআন মাজীদের এই আয়াত পেশ করেছেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبُّ الْعَلَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ
“বলুন, আমার সলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ (সবই) সৃষ্টিকুলের রব্ব আল্লাহর জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই।”
খ. আপ্যায়ন, ওয়ালীমা বা অন্যান্য কারণে: কোন মেহমানের সম্মানার্থে অথবা বিয়ের ওয়ালিমা উপলক্ষে কিংবা এ ধরনের শারীআত সম্মত বিশেষ কোন উপলক্ষে যবেহ করা। এ ধরনের যবেহ করার জন্য ইসলামী শারীআত নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশ ক্ষেত্র বিশেষে কখনো ওয়াজিব হয়ে থাকে, কখনো বা মুস্তাহাব। যেমন রাসূল () বলেছেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمُ ضَيْفَهُ
'যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে'।
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
أَوْلِمُ وَلَوْ بِشَاةٍ
'একটি বকরি দিয়ে হলেও তোমরা ওয়ালীমাহ করে নাও'।
গ. ভোজন, ব্যবসা বা অন্যান্য কারণে: ভোগ-উপভোগ, ব্যবসা এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যে জবাই করা। এ ধরনের জবাই করা মূলত মুবাহ (বৈধ)। আর এই বৈধতা প্রমাণিত হয় মহান আল্লাহ্র এই বাণী দ্বারাঃ
أَوَ لَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُمْ مِّمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَنْعَامًا فَهُمْ لَهَا مَلِكُونَ وَذَلَّلْنَهَا لَهُمْ فَمِنْهَا رَكُوبُهُمْ وَمِنْهَا يَأْكُلُونَ
"আর তারা কি লক্ষ করে না যে, আমার হাতে তৈরি জিনিস থেকে তাদের জন্য আমি সৃষ্টি করেছি গবাদিপশুসমূহ, আর এরপর তারাই এগুলোর মালিক? আর আমি এগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি। ফলে এগুলোর কিছু সংখ্যক হয়েছে তাদের বাহন। আর কিছু সংখ্যক থেকে তারা খেয়ে থাকে।"
এ ধরনের যবেহ করা জায়েয বা হারাম উভয়ই হতে পারে, তা নির্ভর করবে কোন উপলক্ষে তা করা হচ্ছে।
টিকাঃ
241 সূরা আল-আনআম ৬: ১৬২-১৬৩
242 সহীহ মুসলিম: হা/৫০১৮
243 সূরা আল-আনআম ৬: ১৬২-১৬৩
244 বুখারী হা/৬০১৮; সাহীহ মুসলিম হা/৭৮ (৪৭), আবূ দাউদ হা/৩৭৪৮; তিরমিযী হা/১৯৬৭; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৭২; মিশকাত হা/৪২৪৩।
245 সাহীহ বুখারী: হা/৩৯৩৭, মুসলিম হা/১৪২৭; আবু দাউদ হা/২১০৯; তিরমিযী হা/১০৯৪; নাসাঈ হা/৩৩৫১; ইবনু মাজাহ হা/১৯০৭; মিশকাত হা/৩২১০।
246 সূরা ইয়াসীন ৩৬: ৭১-৭২
📄 নযর, মানত বা প্রতিজ্ঞা
আর নযর, মানত বা প্রতিজ্ঞা' এর প্রমাণ মহান আল্লাহ্র বাণী:
'যারা মানত পূরণ করে আর সেই দিনকে ভয় করে যার অনিষ্ট হবে সুদূর প্রসারী।'
নযর, মানত বা প্রতিজ্ঞা
১. নযর ও মানতও যে এক প্রকার ইবাদাত, এর প্রমাণ কুরআনের এ আয়াত:
يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَنَ شَرُّهُ مُسْتَطِيران
“তারা (মু’মিনরা) মানতসমূহ পূর্ণ করে এবং সেই দিনের ভয় করে, যে দিনের অকল্যাণ হবে ব্যাপক।”
২. যেসব ক্ষেত্রে ইবাদাত: এই আয়াতে যেহেতু মহান আল্লাহ্ নযর বা মানত পরিপূর্ণরূপে যারা আদায় করে তাদের প্রশংসা করেছেন, অতএব এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্ নযর বা মানতকে পছন্দ করেন। আর যেহেতু আল্লাহ্র নিকট পছন্দনীয় এমন প্রতিটি কাজই হচ্ছে ইবাদাত। আয়াতের পরবর্তী অংশ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا (আর তারা সেই দিনের ভয় করে, যে দিনের অকল্যাণ হবে ব্যাপক) দ্বারা নযর বা মানতের ইবাদাত হওয়ার বিষয়টি আরো প্রমাণিত হয়。
অতঃপর জেনে রাখুন! মহান আল্লাহ্ যে সব মানত পূর্ণ করার প্রশংসা করেছেন, সেগুলো তাঁর সকল ধরনের ইবাদাতকে অন্তর্ভুক্ত করে। কেননা ফরয বা ওয়াজিব কোন ইবাদাত কেউ যখন করতে শুরু করে, তখন সে তা পালন করা এবং পরিপূর্ণ করা তার জন্য আবশ্যকীয়।
এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ্র এই বাণী:
ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَتَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ وَلْيَطَّوْفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ
“তারপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে এবং তাদের মানত পূর্ণ করে। আর তাওয়াফ করে প্রাচীন ঘরের।”
যেসব ক্ষেত্রে অপছন্দনীয়: পক্ষান্তরে কোন ব্যক্তি যদি অন্য কোন কাজকে নিজের জন্য আবশ্যিক করে নেয় কিংবা ফরয-ওয়াজিব ব্যতীত আল্লাহ্র আনুগত্য মূলক কোন আমল করাকে নিজের জন্য আবশ্যিক করে নেয়, তাহলে তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়)। কোন কোন উলামায়ে কিরাম এটাকে হারাম বলেছেন। কেননা রাসূল (ﷺ) নযর বা মানত করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন:
إِنَّهُ لَا يَأْتِي بِخَيْرٍ، وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ
‘মানত কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। এর দ্বারা কেবল কৃপণের কিছু অর্থ-সম্পদ বের হয়ে যায়’
কিন্তু তা সত্ত্বেও কেউ যদি মহান আল্লাহর আনুগত্য মূলক কোন কাজ করার নযর বা মানত করে নেয়, তাহলে তা পালন করা তার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়। কেননা নাবী (ﷺ) বলেছেন:
مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِيعْهُ وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَ اللَّهَ فَلَا يَعْصِهِ
'আল্লাহর আনুগত্যের উদ্দেশ্যে কোন ব্যক্তি মানত করলে সে যেন তা পূর্ণ করে। আর কোন ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করার উদ্দেশ্যে মানত করলে সে যেন তা পূর্ণ না করে'।
নযর বা মানত সম্পর্কে সার-সংক্ষেপ কথা হলো, সাধারণ অর্থে সকল ধরনের ফরয ইবাদাতের ক্ষেত্রে নযর বা মানত প্রযোজ্য হবে। কিন্তু বিশেষ অর্থে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোন কাজ করাকে নিজের জন্য আবশ্যকীয় করে নেওয়াকে নযর বলা হয়। উলামায়ে কিরাম এই বিশেষ ধরনের নযর বা মানতকে আরো কয়েক প্রকারে বিভক্ত করেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে ফিকহের কিতাবাদি দেখা যেতে পারে।
টিকাঃ
247 সূরা আল-ইনসান (দাহ্র) ৭৬ : ৭
248 সূরা আল-ইনসান (দাহর) ৭৬: ৭
249 সূরা আল-হাজ্জ ২২: ২৯
250 সাহীহ মুসলিম: হা/১৬৩৯, নাসাঈ হা/৩৮০১।
251 বুখারী হা/৬৬৯৮; আবু দাউদ হা/৩২৮৯; তিরমিযী হা/১৫২৬; নাসাঈ হা/৩৮০৬; ইবনু মাজাহ হা/২১২৬; মিশকাত হা/৩৪২৭।