📄 বান্দার জন্য তার রবকে জানার আবশ্যকতা
বান্দার জন্য তার রব্বকে জানার আবশ্যকতা:
ক. মহান আল্লাহ্র সৃষ্টিজগতকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে দেখা এবং এ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা। কেননা এর দ্বারা মহান আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করা, তাঁর মহান রাজত্ব, পরিপূর্ণ ক্ষমতা, অনুপম হিকমাহ্ এবং তাঁর অপার রহমত বা দয়ার পরিচয় লাভ করা যায়।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
أَوَلَمْ يَنظُرُوا فِي مَلَكُوتِ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ مِنْ شَيْءٍ
"তারা কি গভীরভাবে লক্ষ করে না আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌম কর্তৃত্ব সম্পর্কে এবং আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সে বিষয়ে? "[১৬০]
তিনি আরো বলেন:
قُلْ إِنَّمَا أَعِظُكُمْ بِوَاحِدَةٍ أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا
“বলুন, আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি। তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু'জন দু'জন করে অথবা একা একা দাঁড়াও এবং অতঃপর চিন্তা করে দেখ।”[১৬১]
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ الَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَأَيْت لأولي الألباب
“নিশ্চয়ই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানী লোকেদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। "[১৬২]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
إِنَّ فِي اخْتِلَافِ الَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضُ لايت لِقَوْمٍ يَتَّقُونَ
“নিশ্চয়ই দিন ও রাতের পরিবর্তনে এবং আসমানসমূহ ও যমীনে আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তাতে নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে। "[১৬৩]
মহান আল্লাহ্ আরো বলেন:
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضُ وَاخْتِلَافِ الَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِي تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنْفَعُ النَّاسَ وَمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِنَ مَاءٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضُ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فِيهَا مِن كُلِّ دَابَّةٍ وَتَصْرِيفِ الرِّيحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخَّرِ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
“নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে, মানুষের জন্য উপকারী দ্রব্যবাহী চলমান সামুদ্রিক জাহাজে এবং আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে মৃত ভূ-পৃষ্টকে সজীব করে দিয়েছেন এবং তার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন সকল প্রকার বিচরণশীল প্রাণীকে এবং বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে বিবেকবান সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”[১৬৪]
খ. বান্দার জন্য তার মহান প্রতিপালককে চেনা ও জানার আরেকটি উপায় হলো ইসলামী শারীআতের ওয়াহয়ী ভিত্তিক নিদর্শনসমূহ, যা নিয়ে নাবী-রাসূলগণ আগমন করেছেন সেগুলোকে গভীরভাবে অবলোকন করা, মানবজীবনের জন্য এগুলোর যথার্থতা এবং এগুলোর মাঝে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন যে কল্যাণ নিহিত যা ব্যতীত সৃষ্টিকুলের দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন কায়েম হয়না সে সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা। যখন কোন ব্যক্তি মানুষের প্রতি আল্লাহর এসব মহান নিয়ামতসমূহকে এবং এসবের মধ্যে নিহিত আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা, সুষ্ঠু-সুন্দর ব্যবস্থাপনা এবং মানবজাতির কল্যাণে এ সকল ঐশী বিধি-বিধানের উপযোগিতা ও যথার্থতা দেখতে পাবে, তখন এর দ্বারা সে তার মহান প্রতিপালকের পরিচয় লাভ করতে পারবে।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ، وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
"তবে কি তারা কুরআনকে গভীরভাবে অনুধাবন করে না? যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত, তবে তারা এতে অনেক অসঙ্গতি পেত।"[১৬৫]
গ. মু'মিনের অন্তরে মহান আল্লাহ্ কর্তৃক তাঁর স্বীয় সত্ত্বার পরিচয় প্রদান। এতে করে মু'মিনের নিকট আল্লাহ্র পরিচয় এতটাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, যেন তার প্রতিপালককে সে প্রত্যক্ষ করতে পাচ্ছে। জিবরীল (আ) যখন তাঁকে ইহসান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন তখন রাসুলুল্লাহ () বলেন,
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
'আপনি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবেন যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে দেখতে না পান তাহলে (মনে করবেন) তিনি আপনাকে দেখছেন'।[১৬৬]
টিকাঃ
[১৬০] সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৮৫
[১৬১] সূরা সাবা ৩৪: ৪৬
[১৬২] সূরা আলু ইমরান ৩: ১৯০
[১৬৩] সূরা ইউনুস ১০: ৬
[১৬৪] সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৬৪
[১৬৫] সূরা আন্-নিসা'৪: ৮২
[১৬৬] সাহীহ বুখারী: হা/৫০, মুসলিম হা/৮; আবু দাউদ হা/৪৬৯৫; তিরমিযী হা/২৬১০; নাসাঈ হা/৪৯৯০; ইবনু মাজাহ হা/৬৩; মিশকাত হা/২।
📄 রব বা প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহ্র মা‘রিফাত
রব্ব বা প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহ্র মা'রিফাত: 'তারবিয়্যাহ' হলো যথাযথ যত্ন-পরিচর্যা করা যার উপর ভিত্তি করে লালনপালন করা স্থাপিত হয়। লেখক এর কথা থেকে বুঝা যায়, 'রব' শব্দটি 'তারবিয়াহ' শব্দ থেকে উদ্ভূত। কেননা তিনি বলেছেন, 'যিনি আমাকে এবং সমগ্র বিশ্বজগতকে তাঁর অফুরন্ত নিয়ামত দিয়ে লালন-পালন করেন। কেননা সমগ্র সৃষ্টিজগতকে মহান আল্লাহ্ তাঁর অফুরন্ত নিয়ামত দিয়ে লালন-পালন ও তত্ত্বাবধান করছেন এবং তাদেরকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তাদেরকে উপযুক্ত করে তৈরি করেছেন এবং জীবিকা প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। যেমন মূসা (আঃ) এবং ফিরআউনের মধ্যকার সংলাপের বিবরণ দিতে দিয়ে মহান আল্লাহ্ বলেনঃ
قَالَ فَمَنْ رَبُّكُمَا يُمُوسى قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلِّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى
“ফিরআউন বলল, হে মূসা। তাহলে কে তোমাদের রব? মূসা বললেন, আমাদের রব তিনি, যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে তার সৃষ্টি আকৃতি দান করেছেন এবং তারপর পথনির্দেশনা দান করেছেন।”¹⁶⁸
বান্দার প্রতি আল্লাহর নিয়ামত এতই বেশি যে, তা গণনা করা সম্ভব নয়।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেনঃ
وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
“তোমরা যদি আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা কর, তাহলে কখনো এর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না।”¹⁶⁹
অতএব যে আল্লাহ্ তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, জীবন দিয়েছেন, উপযুক্ত করে তৈরি করেছেন এবং জীবিকা দান করেছেন, তিনিই ইবাদাত পাওয়ার একমাত্র যোগ্য এবং একক হকদার।
টিকাঃ
¹⁶⁸ সূরা তাহা ২০ : ৪৯-৫০
¹⁶⁹ সূরা ইবরাহীম ১৪ : ৩৪