📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 প্রথম বিষয়: আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা এবং রাসূল প্রেরণ করেছেন

📄 প্রথম বিষয়: আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা এবং রাসূল প্রেরণ করেছেন


আল্লাহ্ আমাদের সৃষ্টিকর্তা: মহান আল্লাহ্ যে আমাদের সৃষ্টি করেছেন, এর ওয়াহয়ী ভিত্তিক এবং যুক্তিভিত্তিক উভয় প্রকার প্রমাণই রয়েছে。
ওয়াহয়ী ভিত্তিক দালীল: কুরআনে এ বিষয়ে অনেক দালীল রয়েছে। যেমন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنَ طِينٍ ثُمَّ قَضَى أَجَلًا وَأَجَلٌ مُسَمًّى عنده ثم انتم تمترون
"তিনিই তোমাদেরকে কাদামাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর একটা মেয়াদকাল নির্দিষ্ট করেছেন এবং আর একটি নির্ধারিত মেয়াদকাল আছে যা তিনিই জানেন। এরপরও তোমরা সন্দেহ কর।"[৮৭]
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেনঃ
وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرَنَاكُمُ
"আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের আকৃতি প্রদান করেছি।"[৮৮]
তিনি আরো বলেনঃ
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنَ صَلْصَالٍ مِّنَ حَمَإٍ مَسْنُونٍ
"আর অবশ্যই আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি গন্ধযুক্ত কাদার শুষ্ক ঠনঠনে কালচে মাটি হতে।"[৮৯]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছেঃ
وَمَنْ أَيْتِهِ أَنْ خَلَقَكُمْ مِنَ تُرَابٍ ثُمَّ إِذَا أَنْتُمْ بَشَرٌ تَنْتَشِرُونَ
“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর এখন তোমরা মানুষ, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছ।"[৯০]
মহান আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেনঃ
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنَ صَلْصَالٍ كَالْفَغَارِ
"মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন শুষ্ক ঠনঠনে মাটি থেকে যা পোড়া মাটির মত।"[৯১]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
اللهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ
"আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা।"[৯২]
আরো ইরশাদ করা হয়েছে:
وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ
“আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরি কর তাও।"[৯৩]
মহান আল্লাহ্ আরো বলেন:
وَمَنْ خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আর আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন এবং মানুষকে এজন্যই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।”[৯৪]
এছাড়াও কুরআন মাজীদে এ বিষয়ে আরো অনেক দালীল রয়েছে。
যুক্তি ভিত্তিক দালীল: মহান আল্লাহ্ যে আমাদের সৃষ্টি করেছেন, এ সম্পর্কে কুরআন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াতে যুক্তিভিত্তিক প্রমাণের ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি ইরশাদ করেছেন:
أَمْ خُلِقُوا مِنَ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَلِقُونَ
“তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা?”[৯৫]
কোন মানুষ নিজেকে নিজে সৃষ্টি করেনি। কারণ সৃষ্টি লাভের পূর্বে তার অস্তিত্বই ছিল না। আর যার কোন অস্তিত্ব নেই, সে কোন কিছু হতে পারে না এবং যে নিজেই কোন কিছু ছিল না, সে অন্য কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। কোন মানুষকে তার বাবা-মা সৃষ্টি করেন নি, এমনকি তাকে পৃথিবীর অন্য কেউই সৃষ্টি করেনি। আবার কোন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া হঠাৎ করে এমনিতে সৃষ্টিলাভ করাও একেবারে অসম্ভব ব্যাপার। কারণ যেকোন কিছুকে অস্তিত্ব দান করতে হলে একজন অস্তিত্ব দানকারী যেমন অবশ্যই প্রয়োজন, তেমনি যে কোন ঘটনা ঘটার জন্যও একজন ঘটকের প্রয়োজন। তাছাড়া অপরূপ নিয়ম-শৃঙ্খলার ভিত্তিতে পরিচালিত এই বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে পারস্পরিক মিলন ও সমন্বয় এ কথাকে দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দেয় যে, এ বিশ্বজগত তথা সমগ্র সৃষ্টি হঠাৎ করে আপনা আপনিই সৃষ্টি হয়েছে। কেননা হঠাৎ করে যদি কোন বস্তু অস্তিত্ব লাভ করে থাকে তাহলে তার মূল অস্তিত্বই হবে এলোমেলো এবং বিশৃঙ্খল। কাজেই এটা দ্বারা প্রমাণিত হয়, একমাত্র আল্লাহই হলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের একক সৃষ্টিকর্তা। তিনি ব্যতীত আর কোন সৃষ্টিকর্তা এবং আদেশ প্রদানকারী নেই। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ
“জেনে রাখ, সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান তাঁরই কাজ।”[৯৬]
কেউ তাঁকে রব্ব হিসেবে অস্বীকার করেছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে হ্যাঁ, কেউ কেউ নিতান্তই অহংকারের ছলে তা করেছে, যেমনটি করেছিল ফির'আউন। যখন যুবাইর বিন মুতয়িম মুশরিক ছিলেন, তখন একদিন তিনি নাবী (ﷺ) কে কুরআন মাজীদের ‘সূরা তুর’ তিলাওয়াত করতে শুনলেন। তিলাওয়াতের এক পর্যায়ে যখন তিনি এই আয়াতে পৌছালেনঃ
أَمْ خُلِقُوا مِنَ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَلِقُونَ أَمْ خَلَقُوا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَلْ لَّا يُوقِنُونَ أَمْ عِنْدَهُمْ خَزَائِنُ رَبِّكَ أَمْ هُمُ الْمُصَيْطِرُونَ
“তারা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? নাকি তারা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে না। আপনার রবের গুপ্তভাণ্ডার কি তাদের কাছে রয়েছে, নাকি তারাই এ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী?”[৯৭]
তা শুনে যুবাইর বিন মুতয়িম বলেন, “মনে হলো আমার অন্তর উড়ে যাচ্ছে। আর আল্লাহ্র এই আয়াত শোনার মাধ্যমেই আমার অন্তরে ঈমানের বীজ অঙ্কুরিত হয়।”
আল্লাহ্ আমাদের রিযকদাতা: মহান আল্লাহই যে আমাদেরকে রিযক দান করেন, এ বিষয়ে কুরআন, সুন্নাহ এবং যুক্তিভিত্তিক অনেক আয়াত রয়েছে। যেমন কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ, তিনিই তো রিযকদাতা, প্রবল শক্তিধর, পরাক্রমশালী।”[৯৮]
আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেন:
قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَواتِ وَالْأَرْضِ قُلِ اللَّهُ
“বলুন, আসমানসমূহ ও যমীন থেকে কে তোমাদেরকে রিযক প্রদান করেন? বলুন, আল্লাহ।"[৯৯]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
قُلْ مَن يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللهُ :
"বলুন, কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিযক প্রদান করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন? কে জীবিতকে মৃত থেকে বের করেন এবং মৃতকে জীবিত থেকে বের করেন এবং সব বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করেন? তখন তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।"[১০০]
এ বিষয়ে কুরআন মাজীদে আরো অনেক আয়াত বর্ণিত হয়েছে।
সুন্নাহ্ তে এ বিষয়ে যে সব দালীল রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, গর্ভস্থ বাচ্চা সম্পর্কে নাবী (স) বলেছেন, তার প্রতি একজন ফেরেশতাকে ৪টি নির্দেশ দিয়ে পাঠানো হয়:
ক. তার রিজ্ক লিখে দিতে
খ. তার জীবনের সময়সীমা লিখে দিতে
গ. তার আমল লিখে দিতে (তা কেমন হবে)
ঘ. সে দুর্ভাগা নাকি সৌভাগ্যবান, তা লিখে দিতে[১০১]
মহান আল্লাহই যে আমাদেরকে রিজ্ক প্রদান করেন এ বিষয়ে যুক্তিভিত্তিক প্রমাণ হচ্ছে, আমরা যে খাদ্য ও পানীয় ছাড়া বাঁচতে পারি না, সেই খাদ্য ও পানীয় মহান আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন:
أَفَرَعَيْتُمْ مَا تَحْرُثُونَ أَنْتُمْ تَزْرَعُونَهُ أَمْ نَحْنُ الزَّرِعُونَ لَوْ نَشَاءُ لَجَعَلْتُهُ حُطَامًا فَظَلْتُمْ تَفَكَّهُونَ إِنَّا لَمُغْرَمُونَ بَلْ نَحْنُ مَحْرُومُونَ أَفَرَعَيْتُمُ الْمَاءَ الَّذِي تَشْرَبُونَ وَأَنْتُمْ أَنْزَلْتُمُوهُ مِنَ الْمُزْنِ أَمْ نَحْনُ الْمُنْزِلُونَ لَوْ نَشَاءُ جَعَلْتُهُ أَجَاجًا فَلَوْلَا تَشْكُرُونَ
“তোমরা যে বীজ বপন কর সে সম্পর্কে চিন্তা করেছ কি? তোমরা কি সেটাকে অংকুরিত কর, না আমি অংকুরিত করি? আমি ইচ্ছে করলে এটাকে খড় কুটোয় পরিণত করতে পারি, তখন হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে (তোমরা (এই বলে যে), নিশ্চয়ই আমরা দায়গ্রস্ত হয়ে পড়েছি, বরং আমরা হৃত-সর্বস্ব হয়ে পড়েছি। তোমরা যে পানি পান কর, সে সম্পর্কে তোমরা চিন্তা করেছ কি? তোমরাই কি তা মেঘ হতে বর্ষণ কর, না আমি বর্ষণ করি? আমি ইচ্ছে করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না?”[১০২]
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, আমাদের রিষ্ক তথা খাদ্য, পানীয় সবই আল্লাহ্র পক্ষ থেকে আসে।
আল্লাহ আমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেন নি: বাস্তবতা এটাই যে, মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে কোন উদ্দেশ্য ব্যতীত অহেতুক ছেড়ে দেননি। ওয়াহয়ী ভিত্তিক এবং যুক্তিভিত্তিক দালীলসমূহ এ সত্যকেই প্রমাণিত করে।
ওয়াহয়ী ভিত্তিক দালীলের মধ্যে রয়েছে, মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ فَتَعَلَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ
“তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না? মহিমান্বিত আল্লাহ, যিনি প্রকৃত মালিক। তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই।”[১০৩]
তিনি আরো বলেন:
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِّنَ مَّنِي يمنى ثُمَّ كَانَ عَلَقَةً فَخَلَقَ فَسَوَّى فَجَعَلَ مِنْهُ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالْأُنْثَى أَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَدِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِ الْمَوْلَى
“মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনি ছেড়ে দেয়া হবে? সে কি স্খলিত শুক্রবিন্দু ছিল না? অতঃপর সে রক্তপিন্ডে পরিণত হয়। তারপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেন এবং সুঠাম বানান। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন জোড়া জোড়া নর ও নারী। তবুও কি সেই দ্রষ্টা মৃতকে পুনর্জীবিত করতে সক্ষম নন?”[১০৪]
আর যুক্তিভিত্তিক দালীল হলো, ‘মানবজাতির অস্তিত্ব হবে দুনিয়াতে কেবল বেঁচে থাকার জন্য এবং জীবজন্তুর মত কেবল ভোগ-উপভোগের জন্য; এরপর সে মারা যাবে, মৃত্যুর পর সে আর পুনরুত্থিত হবে না এবং তার কোন হিসাব-নিকাশও হবে না’ এমন ধারণা সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহ্ হিকমাহ্ বা প্রজ্ঞার পরিপন্থী বিষয়। বরং এ ধরনের ধারণা হলো উদ্দেশ্যহীন, অহেতুক ও অমূলক। আল্লাহ্ মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন, তাদের প্রতি নাবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, যারা নাবী-রাসূলদের হত্যা ও বিরোধিতা করে তাদেরকে হত্যা করা আমাদের জন্য বৈধ করে দিয়েছেন; অথচ এতকিছুর পরও এর চূড়ান্ত ফলাফল কিছুই হবে না! এটা মহান আল্লাহ্ হিকমতের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অসম্ভব একটি বিষয়।
আল্লাহ্ আমাদের প্রতি রাসূল প্রেরণ করেছেন: আল্লাহ্ আমাদের প্রতি তথা এই উম্মতের প্রতি রাসূল (ﷺ) কে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি আমাদের কাছে আমাদের পালনকর্তার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, আমাদেরকে পবিত্র করেন এবং আমাদেরকে কিতাব (আল কুরআন) এবং হিকমাহ (সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। মহান আল্লাহ্ যেভাবে আমাদের নিকট রাসূল পাঠিয়েছেন, তেমনি পূর্ববর্তী উম্মতদের প্রতিও নাবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
وَإِنْ مِّنَ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ
‘এমন কোন সম্প্রদায় নেই যার নিকট কোন সতর্ককারী প্রেরিত হয়নি।’[১০৫]
নবী-রাসূলদেরকে আল্লাহ্ এ কারণেই জগৎবাসীর প্রতি প্রেরণ করেছেন যাতে করে তাদের উপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যাতে তারা ঠিক সেভাবে আল্লাহ্ ইবাদাত করতে পারে যেভাবে ইবাদাত করলে আল্লাহ্র ভালবাসা এবং সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْتَعِيلَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَعِيسَى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهُرُونَ وَسُلَيْمَنَ وَآتَيْنَا دَاوُدَ رَبُورًا وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْتُهُمْ عَلَيْكَ مِن قَبْلُ وَرُسُلًا لَّمْ نَقْصُصُهُمُ عَلَيْكَ وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمَانَ رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ bَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
“নিশ্চয়ই আমি আপনার নিকট ওয়াহয়ী প্রেরণ করেছিলাম, যেমন প্রেরণ করেছিলাম নূহ ও তাঁর পরবর্তী নাবীগণের প্রতি। আর ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরগণ, ঈসা, আইয়্যুব, ইউনুস, হারুন ও সুলাইমানের নিকট ওয়াহয়ী প্রেরণ করেছিলাম এবং দাউদকে প্রদান করেছিলাম যাবুর। আর অনেক রাসূল, যাদের বর্ণনা আমি আপনাকে পূর্বে দিয়েছি এবং অনেক রাসূল, যাদের বর্ণনা আমি আপনাকে দেইনি। আর অবশ্যই আল্লাহ মূসার সাথে কথা বলেছেন। সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারীরূপে আমি রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আর আল্লাহ হলেন পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”[১০৬]
কিভাবে ইবাদাত করলে আল্লাহ্র ভালবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, নাবী-রাসূলগণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ব্যতীত আমাদের জন্য তা জানা সম্পূর্ণভাবে অসম্ভব। কারণ নাবী-রাসূলগণই আমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন কিভাবে আল্লাহ্র ভালবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় এবং কিভাবে তাঁর নৈকট্য হাসিল করা যায়। তাই সৃষ্টিকুলের প্রতি নাবী-রাসুলগণকে সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করার মাঝে মহান আল্লাহ্র এক মহান হিকমাহ (প্রজ্ঞা) নিহিত রয়েছে। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ্র এই বাণী:
إِنَّا أَرْسَلْنَا إِلَيْكُمْ رَسُولًا شَاهِدًا عَلَيْكُمْ كَمَا أَرْسَلْنَا إِلَى فِرْعَوْنَ رَسُولًا فَعَصَى فِرْعَوْنُ الرَّسُولَ فَأَخَذُتْهُ أَخْذَا وَبِيُلا
"নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্য সাক্ষী স্বরূপ একজন রাসূল প্রেরণ করেছি, যেমনভাবে রাসূল প্রেরণ করেছিলাম ফিরআউনের নিকট। কিন্তু ফিরআউন সেই রাসূলকে অমান্য করেছিল, ফলে আমি তাকে কঠিনভাবে পাকড়াও করেছিলাম।"[১০৭]
অতএব কেউ তাঁর আনুগত্য করলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তাঁর অবাধ্য হলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর দলীল আল্লাহ্‌র বাণী:
"আমি তোমাদের কাছে তেমনিভাবে একজন রাসূলকে তোমাদের প্রতি সাক্ষ্যদাতা হিসেবে পাঠিয়েছি যিনি কিয়ামতে সাক্ষ্য দিবেন যে, দ্বীনের দাওয়াত তিনি যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। যেমনভাবে আমি ফেরাউনের কাছে পাঠিয়েছিলাম একজন রাসূলকে। তখন ফেরাউন সেই রাসূলকে অমান্য করল। ফলে আমি তাকে শক্ত ধরায় ধরলাম।"[১০৮]
রাসূল (ﷺ) এর আনুগত্য করলে জান্নাত: 'যে কেউ এই রাসূল (ﷺ) এর আনুগত্য করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে' কুরআন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ থেকে এ সত্যই উদ্ভাসিত হয়。
মহান আল্লাহ্‌ ইরশাদ করেন:
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
“আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা রহমত লাভ করতে পার। তোমরা ধাবিত হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা হচ্ছে আকাশ ও যমীন, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য।”[১০৯]
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلُهُ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
“আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত হয়ে চলবে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় নদীসমূহ। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর এটাই হলো মহা সাফল্য।”[১১০]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَابِرُونَ
“আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা পরিহার করে চলে, তারাই হলো কৃতকার্য।”[১১১]
মহান আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেছেন:
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّنَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّلِحِينَ وَحَسُنَ أولَئِكَ رَفِيقًا
“আর কেউ আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করলে সে নাবী, সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ), শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের সঙ্গী হবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। তাঁরা কতই না উত্তম সঙ্গী।”[১১২]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছেঃ
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
"আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।"[১১৩]
এ বিষয়ে আরও অনেক আয়াত রয়েছে। অনুরূপ রাসূল (ﷺ) এর নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারাও উল্লিখিত সত্য বিষয়টি প্রমাণিত হয়। রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ " كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ، إِلَّا مَنْ أَبَى . قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى
"আমার উম্মতের সকলেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যে অস্বীকার করবে সে ব্যতীত। সাহাবীরা বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! কে তা অস্বীকার করবে! তিনি বললেনঃ যে আমার আনুগত্য করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে।"[১১৪]
রাসূল (ﷺ) এর অবাধ্য হলে জাহান্নামঃ 'যে রাসূল (ﷺ) এর অবাধ্য হবে, সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে' এই কথার সত্যতা আল্লাহ্ নিম্নোক্ত বাণীসমূহের দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেনঃ
وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَةً يُدْخِلُهُ نَارًا خُلِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُّهِينٌ
"আর কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হলে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করলে তিনি তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।"[১১৬]
মহান আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেন:
وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُّبِينًا
“আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে, সে সুস্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে।”[১১৭]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا
“আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করবে, অবশ্যই তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে সে চিরকাল অবস্থান করবে।”[১১৮]
পূর্বোল্লেখিত হাদীসেও দেখা যায়, রাসূল (ﷺ) বলেছেন:
وَمَنْ عَصَانِي دَخَلَ النَّارَ
‘আর যে আমার অবাধ্য হবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[১১৯]

টিকাঃ
[৮৭] সূরা আল-আনআম ৬: ২
[৮৮] সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১১
[৮৯] সূরা আল-হিজর ১৫: ২৬
[৯০] সূরা আর-রুম ৩০: ২০
[৯১] সূরা আর-রহমান ৫৫: ১৪
[৯২] সূরা আয-যুমার ৩৯: ৬২
[৯৩] সূরা আস্-সফ্ফাত ৩৭: ৯৬
[৯৪] সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬
[৯৫] সূরা আত্-তূর ৫২: ৩৫
[৯৬] সূরা আল-আ'রাফ ৭: ৫৪
[৯৭] সূরা আত্-তূর ৫২: ৩৫-৩৭
[৯৮] সূরা আয-যারিয়াত ৫১ : ৫৮
[৯৯] সূরা সাবা ৩৪ : ২৪
[১০০] সূরা ইউনুস ১০: ৩১
[১০১] বুখারী হা/৩২০৮; মুসলিম হা/৬৬১৬ (২৬৪৩); আবু দাউদ হা/৪৭০৮; তিরমিযী হা/২১৩৭; মিশকাত হা/৮২।
[১০২] সূরা আল-ওয়াকিআহ ৫৬ : ৬৩-৭০
[১০৩] সূরা মু'মিনূন ২৩ : ১১৫-১১৬
[১০৪] সূরা আল-ক্বিয়ামাহ ৭৫ : ৩৬-৪০
[১০৫] সূরা আল-ফাতির ৩৫ : ২৪
[১০৬] সূরা আন্-নিসা' ৪: ১৬৩-১৬৫
[১০৭] সূরা আল-মুজ্জাম্মিল ৭৩: ১৫-১৬
[১০৮] সূরা আল-মুজ্জাম্মিল ৭৩: ১৫-১৬
[১০৯] সূরা আলু ইমরান ৩: ১৩২-১৩৩
[১১০] সূরা আন্-নিসা' ৪: ১৩
[১১১] সূরা আন্-নূর ২৪ : ৫২
[১১২] সূরা আন্-নিসা ৪: ৬৯
[১১৩] সূরা আল-আহযাব ৩৩: ৭১
[১১৪] সহীহ বুখারী: ৭২৮০, আহমাদ হা/৮৭২৮; সহীহ ইবনু হিব্বান হা/১৭; মিশকাত হা/১৪৩。
[১১৫] আল-মু’জামুল আউসাত ৮০৮, বিস্তারিত তাহকীক "তাহকীক ১" দ্রষ্টব্য。
[১১৬] সূরা আন্-নিসা ৪: ১৪
[১১৭] সূরা আল-আহযাব ৩৩: ৩৬
[১১৮] সূরা আল-জিন্ন ৭২: ২৩
[১১৯] মাজমাউয যাওয়াইদ হা/১৬৭২৭, ত্ববারানী আল-মু'জামুল আউসাত্বঃ হা/৮০৮। বিস্তারিত তাহকীক "তাহকীক ১” দ্রষ্টব্য।

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 দ্বিতীয় বিষয়: মহান আল্লাহ্ তাঁর ইবাদাতে কাউকে শরীক করা পছন্দ করেন না

📄 দ্বিতীয় বিষয়: মহান আল্লাহ্ তাঁর ইবাদাতে কাউকে শরীক করা পছন্দ করেন না


দ্বিতীয়টি: আল্লাহ তাঁর ইবাদাতে কাউকে তাঁর সাথে শরীক করা আদৌ পছন্দ করেন না। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ কোন ফেরেশতা কিংবা তাঁর প্রেরিত কোন নাবীকেও না। আর দলীল আল্লাহর বাণী:
"মাসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।"[১২০]
আমাদের জন্য যেসব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য, তন্মধ্যে দ্বিতীয়টি হলো মহান আল্লাহ তাঁর ইবাদাতে অন্য কাউকে শরীক করা বা অংশীদার সাব্যস্ত করা মোটেও পছন্দ করেন না। কেননা তিনিই হলেন ইবাদাতের একমাত্র যোগ্য ও একক হকদার। গ্রন্থকার (রাহিমাহুল্লাহ) এক্ষেত্রে দালীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন আল্লাহর এই বাণী:
وَأَنَّ الْمَسْجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدَاهُ
"মাসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।"[১২১]
এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর সাথে অন্য কাউকে ডাকতে আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ যেসব বিষয় অপছন্দ করেন কেবল সেগুলো থেকেই আমাদেরকে তিনি নিষেধ করেন। যেমন মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
إِنْ تَكْفُرُوا فَأَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنْكُمْ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَإِنْ تَشْكُرُوا يَرْضَهُ لَكُمْ
"যদি তোমরা কুফরী কর, তবে (জেনে রাখ) আল্লাহ্ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না। আর যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে তিনি তোমাদের জন্য তা পছন্দ করেন।"[১২২]
অন্য আয়াতে তিনি বলেন:
فَأَنْ تَرْضَوْا عَنْهُمْ فَأَنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَسِقِينَ
"আর যদি তোমরা তাদের (মুনাফিকদের) প্রতি রাযী হয়ে যাও, তবে আল্লাহ তো এমন ফাসিক (দুষ্কর্মকারী) লোকদের প্রতি রাযী হবেন না।"[১২৩]
অতএব বুঝা গেল, কুফর এবং শির্ক মহান আল্লাহ্ আদৌ পছন্দ করেন না। বরং তিনি কুফর এবং শির্কের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এবং এগুলোকে খতম করার জন্য নাবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন।
আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ :
"আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকবে যতক্ষণ না ফিতনা (শির্ক) দূর হয় এবং দ্বীন পরিপূর্ণরুপে আল্লাহর হয়ে যায়।"[১২৪]
যেহেতু আল্লাহ্ কুফর এবং শির্ক অপছন্দ করেন, তাই প্রত্যেক মু'মিন ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হচ্ছে এগুলোকে অপছন্দ ও ঘৃণা করা। কেননা মু'মিন ব্যক্তির সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি এবং পছন্দ-অপছন্দ হবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি এবং পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী। যাতে করে যে কাজে আল্লাহ্ রাগান্বিত হন, ঈমানদার ব্যক্তিও তাতে রাগান্বিত হয় এবং যে কাজে আল্লাহ্ সন্তুষ্ট থাকেন, ঈমানদার ব্যক্তিও তাতে সন্তুষ্ট থাকে। আর যেহেতু আল্লাহ্ কুফর এবং শির্কের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং এগুলোকে তিনি প্রচন্ড ঘৃণা করেন, তাই কোন মু'মিন-মুমিনাহ্র জন্য এগুলোর প্রতি ন্যূনতম সন্তুষ্টি জ্ঞাপন কিংবা এগুলোকে বিন্দুমাত্র পছন্দ করা আদৌ উচিত নয়। শির্ক হচ্ছে অত্যন্ত ভয়াবহ ও মারাত্মক একটি বিষয়।
মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্য যে কোন অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।”[১২৫]
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন:
إِنَّهُ مَن يشر يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَلَهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنَ أَنْصَارِ
“কেউ আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দেন এবং তার আবাসস্থল হলো জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।”[১২৬]
এ বিষয়ে রাসূল (ﷺ) বলেছেন:
مَنْ لَقِيَ اللَّهَ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ دَخَلَ النَّار
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকেও শরীক না করা অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে এমন অবস্থায় যে, সে তাঁর সাথে শরীক স্থির করেছে, তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[১২৭]

টিকাঃ
[১২০] সূরা আল-জিন্ন ৭২: ১৮
[১২১] সূরা আল-জিন্ন ৭২: ১৮
[১২২] সূরা আয-যুমার ৩৯: ৭
[১২৩] সূরা আত-তাওবাহ ৯: ৯৬
[১২৪] সূরা আল-আনফাল ৮: ৩৯
[১২৫] সূরা আন্-নিসা' ৪ : ৪৮
[১২৬] সূরা আল-মায়িদাহ ৫ : ৭২
[১২৭] সহীহ মুসলিম: হা/১৭১

📘 সালাসাতুল উসুল > 📄 তৃতীয় বিষয়: তাওহীদ ও রাসূলের অনুসারীদের জন্য মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব বৈধ নয়

📄 তৃতীয় বিষয়: তাওহীদ ও রাসূলের অনুসারীদের জন্য মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব বৈধ নয়


তৃতীয়টি:', যে রাসূল () এর আনুগত্য করে এবং আল্লাহকে একক ও অদ্বিতীয় বলে স্বীকার করে, তার জন্য জায়েয নয় আল্লাহ্ ও রাসূল () এর বিরোধিতাকারীদের কারো সাথে বন্ধুত্ব পোষণ করা। যদিও সে তার নিকটাত্মীয় হয়।
আর দলীল আল্লাহ্র বাণী: “আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় তুমি পাবে না যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতাকারীদেরকে ভালবাসে- হোক না এই বিরোধীরা তাদের পিতা অথবা পুত্র অথবা তাদের ভাই অথবা তাদের জ্ঞাতি গোষ্ঠী। আল্লাহ এদের অন্তরে ঈমান বদ্ধমূল করে দিয়েছেন, আর নিজের পক্ষ থেকে রুহ দিয়ে তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন। তাদেরকে তিনি দাখিল করবেন জান্নাতে যার তলদেশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী-নালা, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এরাই আল্লাহর দল; জেনে রেখ, আল্লাহর দলই সাফল্যমন্ডিত।”[১২৮]
তৃতীয় যে বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা এবং তদানুযায়ী আমল করা ওয়াজিব: তৃতীয় যে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা আমাদের প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য আবশ্যক তা হচ্ছে ‘আল-ওয়ালা ওয়াল বারা’ তথা ‘মিত্রতা ও শত্রুতার মূলনীতি’। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌলিক বিষয়। এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে অনেক দালীল রয়েছে।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِّن دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের অনিষ্ট করতে ত্রুটি করবে না।”[১২৯]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصْرَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَا يَتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদী ও নাসারাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে নিশ্চয়ই সে তাদেরই একজন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দান করেন না।”[১৩০]
মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبَا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنَ قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ أَوْلِيَاء وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ
"হে ঈমানদারগণা তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা তোমাদের দ্বীনকে হাসি-তামাশা ও খেলার বস্তুরুপে গ্রহণ করে, তাদেরকে এবং কাফিরদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মু'মিন হয়ে থাক।"[১৩১]
অন্য আয়াতে তিনি বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا أَبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمُ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَا يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ قُلْ إِنْ كَانَ أَبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ بِاقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشُونَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادِ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পিতৃবর্গ ও ভাতৃবৃন্দ যদি ঈমান অপেক্ষা কুফরীকে পছন্দ করে, তবে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই যালিম। হে নাবী! আপনি বলুন, তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করার চেয়ে যদি বেশী প্রিয় হয় তোমাদের পিতৃবর্গ, তোমাদের সন্তানেরা, তোমাদের ভ্রাতাগণ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের আপনগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ ও তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা তোমরা কর এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা কর যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর নির্দেশ তোমাদের কাছে নিয়ে আসেন। আর আল্লাহ্‌র ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।[১৩২]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
قَدْ كَানَتْ لَكُمْ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ ، إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءُوا مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَةً
“অবশ্যই তোমাদের জন্য ইব্রাহীম ও তার সাথে যারা ছিল তাদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদাত কর তা হতে আমরা সম্পর্কমুক্ত। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হলো শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহতে ঈমান আন।”[১৩৩]
কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহর বিরোধিতা করে তার সাথে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা এটাই প্রমাণ করে যে, তার অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি যে ঈমান রয়েছে তা অত্যন্ত দুর্বল প্রকৃতির। তা না হলে এটা কোন যুক্তিসঙ্গত কথা হতে পারে না যে, কোন ব্যক্তি এমন কাউকে বা কোন কিছুকে ভালবাসবে যা তার প্রিয়তমের ঘোরতর শত্রু। কাফিরদের সাথে মিত্রতার অর্থ হচ্ছে, কুফর ও গোমরাহী নিয়ে তারা যা অবস্থায় আছে সে অবস্থায় তাদেরকে সাহায্য- সহযোগিতা করা। আর তাদেরকে ভালবাসার অর্থ হচ্ছে, যেসব কাজ করলে তাদের ভালবাসা লাভ করা যায়, সে সব কাজের মাধ্যমে তাদের ভালবাসা অর্জন করা, হোক তা যে কোন উপায়ে। নিঃসন্দেহে এটি ঈমানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলে নতুবা কমপক্ষে একে অসম্পূর্ণ করে ফেলে। অতএব প্রত্যেক মু’মিন-মুমিনার জন্য অবশ্য কর্তব্য হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল(ﷺ) এর বিরোধিতা যারা করে, তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা, যদিও তারা তার কোন নিকটতম আত্মীয় হোক না কেন। তবে এ কথার অর্থ এটা নয় যে, তাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া এবং সত্যের পথে আহ্বান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

টিকাঃ
[১২৮] সূরা আল-মুজাদালাহ ৫৮ : ২২
[১২৯] সূরা আল ইমরান ৩: ১১৮
[১৩০] সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৫১
[১৩১] সূরা আল-মায়িদাহ ৫: ৫৭
[১৩২] সূরা আত-তাওবাহ ৯: ২৩-২৪
[১৩৩] সূরা আল-মুমতাহিনা ৬০: ৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00