📄 ইলমের কারণে আপতিত দুঃখ-কষ্টে সবর করা
ইলমের কারণে আপতিত দুঃখ-কষ্টে ধৈর্যধারণ: ধৈর্য হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্যের উপর নাক্সকে অটল ও অবিচল রাখা, আত্মাকে আল্লাহর নাফরমানী থেকে বিরত রাখা এবং একে আল্লাহর ফায়সালা সমূহের ব্যাপারে ক্রোধান্বিত, অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখা। দ্বীনের দাওয়াতের কাজে যতই কষ্ট-যন্ত্রণা আপতিত হোক না কেন, আল্লাহ্ দিকে আহ্বানকারীকে সর্বাবস্থায় আগ্রহী ও প্রাণবন্ত হয়ে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। কেননা কল্যাণ ও মঙ্গলের দিকে যারা আহ্বান করে তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে মানুষের স্বভাব, তবে যাদেরকে আল্লাহ্ হিদায়াত দান করেছেন, তারা অবশ্যই তা করে না। আল্লাহ্ তাঁর নাবী (ﷺ) কে সম্বোধন করে বলেছেনঃ
وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَى مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا حَتَّى أَتَاهُمْ نَصْرُنَا
“তোমার পূর্বেও রসূলগণকে মিথ্যে মনে করা হয়েছে কিন্তু তাদেরকে মিথ্যে মনে করা এবং কষ্ট দেয়া সত্ত্বেও তারা ধৈর্যধারণ করেছে, যতক্ষণ না তাদের কাছে আমার সাহায্য এসেছে। আল্লাহর ওয়াদার পরিবর্তন হয় না, নাবীগণের কিছু সংবাদ তো তোমার নিকট পৌঁছেছেই।”[৭৭]
দ্বীনের দাওয়াতের কাজে কষ্ট-যন্ত্রণা যত বেশি মারাত্মক হবে আল্লাহর সাহায্য ততই নিকটবর্তী হবে। আল্লাহর সাহায্য কেবল এভাবে নির্দিষ্ট নয় যে, তিনি কোন মানুষকে তার জীবদ্দশাতেই সাহায্য করবেন এবং সে তার দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া ও বাস্তব প্রতিফলন নিজের জীবদ্দশাতেই দেখে যেতে পারবে। বরং তা এভাবে যে, দাঈ যে বিষয়ের প্রতি মানুষকে আহ্বান করে গেছেন তার মৃত্যুর পর আল্লাহ্ মানুষের অন্তরে সে বিষয়টি গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে দিবেন, ফলে মানুষ সেটাকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা অনুসরণ করবে। এটাও এই দাঈর প্রতি মহান আল্লাহ্র একপ্রকার সুস্পষ্ট অনুগ্রহ ও সাহায্য হিসেবে গণ্য হবে, যদিও ইতোমধ্যে দাঈ মৃত্যুবরণ করে থাকেন। তাই দাঈর জন্য কর্তব্য ও করণীয় হলো ধৈর্য সহকারে দ্বীনের দাওয়াতের কাজ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া, আল্লাহর দ্বীনের দিকে মানুষকে আহ্বানের পথে ধৈর্য ধারণ করা এবং সকল প্রকার বাধা-বিপত্তি, প্রতিবন্ধকতা ও দুঃখ-কষ্টকে ধৈর্য সহকারে মোকাবেলা করে দাওয়াতের কাজে অটল ও অবিচল থাকা। নাবী-রাসূলগণ দ্বীনের দাওয়াতের কাজে প্রতিপক্ষের কথা ও কাজের দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে কত দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণাই না ভোগ করেছেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
كَذَلِكَ مَا أَتَى الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ مِّن رَّسُولٍ إِلَّا قَالُوا سَاحِرٌ أَوْ مجنون
“এভাবে তাদের পূর্ববর্তীদের কাছে যখনই কোন রাসূল এসেছেন তখনই তারা তাঁকে বলেছে, এ তো এক জাদুকর, না হয় এক উন্মাদ!”[৭৮]
তিনি আরো বলেন:
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوًّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ
"আর এভাবেই আমরা প্রত্যেক নাবীর জন্য অপরাধীদের মধ্য থেকে শত্রু বানিয়ে থাকি"।[৭৯]
কাজেই দাঈর কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহ্র দ্বীনের কাজে সকল বাধা-বিপত্তি, দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতন ধৈর্যের সাথে মুকাবিলা করা। দেখুন! মহান আল্লাহ্ তাঁর নাবী মুহাম্মাদ () কে সম্বোধন করে বলেছেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ تَنْزِيلًا
"নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি ধাপে ধাপে।”[৮০]
মানবীয় বিবেচনায় এই আয়াতের পর ‘অতএব আপনি আপনার মহান প্রতিপালকের নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন’ এমন কোন অর্থবোধক আয়াত নাযিল হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু দেখা যায়, পরবর্তী আয়াতে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন:
فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبُّكَكَ
"কাজেই আপনি ধৈর্যের সাথে আপনার রবের নির্দেশের প্রতীক্ষা করুন।"[৮১]
এই আয়াতে থেকে একটি কথার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তা হলো, যে ব্যক্তি কুরআন মাজীদের দাওয়াত ও খিদমতে নিয়োজিত হবে, তাকে এমন অনেক কিছুর মুকাবিলা করতে হবে যাতে প্রচুর ধৈর্যশক্তির প্রয়োজন।
রাসূল (ﷺ) এর অবস্থার প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করুন! তাঁকে যখন তাঁর গোত্রের লোকেরা মেরে রক্তাক্ত করলো, তখন তিনি তাঁর চেহারা থেকে রক্ত মুছতে মুছতে আল্লাহ্র সমীপে দু'আ করলেন,
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
‘হে আল্লাহ্! আপনি আমার জাতিকে ক্ষমা করে দিন। কেননা তারা এমন এক জাতি যারা জানে না (অজ্ঞ)’।[৮২]
সুতরাং দাঈকে অবশ্যই ধৈর্যশীল এবং আল্লাহ্র নিকট থেকে সর্বোত্তম প্রতিদান লাভের আশাবাদী হতে হবে।
টিকাঃ
[৭৭] সূরা আল-আনআম ঃ ৩৪
[৭৮] সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫২
[৭৯] সূরা আল-ফুরকান ২৫: ৩১
[৮০] সূরা আল-ইনসান (দাহর) ৭৬: ২৩
[৮১] সূরা আল-ইনসান (দাহর) ৭৬: ২৪
[৮২] সহীহ বুখারী: হা/৩৪৭৭, মুসলিম হা/১৭৯২; ইবনু মাজাহ হা/৪০২৫; মিশকাত হা/৫৩১৩