📄 ধর্মীয় সংস্কার
উপরে বলা হয়েছে সালাহউদ্দীন তাকওয়াসম্পন্ন, ঈমানদার ও আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকারী ইবাদাতগুজার ব্যক্তি ছিলেন। ইবনু শাদ্দাদ বলেন, “তাঁর (রাহিমাহুল্লাহ) ঈমান ছিলো উত্তম এবং তিনি আল্লাহর অনেক যিকির করতেন। বড় বড় আলিম ও কাযিদের সাহচর্যে থেকে তিনি এসব গুণাবলি অর্জন করেন।" এমন ইসলামী শিক্ষা পেয়ে গড়ে ওঠা একজন মানুষের কাছ থেকে এটাই প্রত্যাশিত যে, তিনি দ্বীনি সংস্কার কার্যক্রম চালাবেন, ত্রুটি-বিচ্যুতি শুধরে দিবেন, কুফরের অন্ধকার দূর করে ইসলামের আলোকবর্তিকা হবেন। সালাহউদ্দীনও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।
দৃঢ় ঈমান ও ইয়াকীনে বলীয়ান হয়ে তিনি মুসলিম ভূমিগুলো থেকে নাস্তিকতা ও ধর্মদ্রোহের মূল উপড়ে ফেলেন। আলিম ও কাযিদের সাথে পরামর্শ করে তিনি আল্লাহর আইনের বিরোধিতাকারী লোকদেরকে হত্যা করতেন।
ফাতিমি খলিফার উজির হওয়ার পর মিশরের জনগণের ত্রুটিপূর্ণ আকিদা দেখে তিনি অত্যন্ত দুঃখ করতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবাদের (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম) সুন্নাহর সাথে এসব আকিদা সাংঘর্ষিক ছিলো। যেমন, এসব ফির্কা বিশ্বাস করতো যে নেতৃত্ব (ইমামতি) মানুষের হাতে নেই। এটি যেহেতু দ্বীনি বিষয়, তাই জনগণ নাকি কখনোই তাদের নেতা নির্বাচন করতে পারবে না। একজন নবীর নাকি কোনো অধিকার নেই জনগণকে এই কাজে অংশগ্রহণ করতে দেওয়ার। নবীকে নাকি মৃত্যুর আগে অবশ্যই একজন ইমাম নির্ধারণ করে দিয়ে যেতে হবে আর সেই ইমাম হবেন নবীদের মতোই পাপের ঊর্ধ্বে। তারা বিশ্বাস করতো যে রাসূলুল্লাহ ﷺ 'আলীকে (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) ইমাম নিযুক্ত করে গেছেন, আর আবু বকর (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) ও 'উমার (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) তাঁকে টপকে নেতা হয়ে ভুল করেছেন (না'উযুবিল্লাহ)। এসব যালিম আরো বিশ্বাস করতো যে, নেতা হওয়া মানুষেরা অবশ্যই অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন হবেন আর নয়তো ঐশ্বরিক অবতার হবেন। তাদের কিছু ফির্কা এমনও বলে যে, যিনি মারা যাননি তাঁর মাধ্যমে ইমামতি স্থগিত হয়ে গেছে। তিনি এখন আত্মগোপন করে আছেন, শেষ জামানায় বেরিয়ে এসে ন্যায় প্রতিষ্ঠা শুরু করবেন। ৪০৮ হিজরিতে হামযাহ ইবনু 'আলী ঘোষণা দেয় যে খলিফাই আল্লাহ। ফলে শি'য়াদের একটি দল ও ইসমা'ঈলীরা ফাতিমি খলিফা আল-হাকিম বিআমরিল্লাহকে আল্লাহ বলে মেনে নেয়। না'উযুবিল্লাহ। এছাড়া সে একটি বইও প্রকাশ করে যাতে লেখা ছিলো, "ঐশ্বরিক ক্ষমতা অবতার রূপে আদমের মধ্যে আসে, তারপর সেখান থেকে 'আলী ইবনু আবি তালিবের কাছে, সেখান থেকে আল-'আযীযের কাছে, সেখান থেকে তার ছেলে আল-হাকিম বিআমরিল্লাহর কাছে। আর তাদের অবতারের বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি আল্লাহয় পরিণত হয়েছেন।” বাতিনিদের মধ্যে অবতারের বিশ্বাস হামযাহ বিন 'আলীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে উজির হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই সালাহউদ্দীনকে এসব বাতিল আকিদার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামতে হয় আর ইসলামের বিশুদ্ধ আকিদা সুন্নী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হয়। এর কয়েক মাস পরেই তিনি দেশ জুড়ে শিক্ষালয় স্থাপন শুরু করেন, যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো আন-নাসিরিইয়্যাহ মাদ্রাসা ও কামিলিয়্যাহ মাদ্রাসা। তিনি সর্বস্তরের মানুষকে এসকল বিদ্যাপীঠের সাথে জড়িত হয়ে বিশুদ্ধ ঈমান-আকিদা, রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবাদের পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দেন।
বাতিলের বিরুদ্ধে সালাহউদ্দীনকে সাহায্য করেছিলো তাঁর প্রতি মিশরের জনগণের ভালোবাসা। দামিয়েটা ও গাযায় ফ্র্যাংকদের উপর জয়লাভ এবং মিশরীয়-অমিশরীয়দের হাজ্জযাত্রার পথ লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার আকাবা জয় করায় তিনি সবার ভালোবাসায় সিক্ত হন। এসকল বিজয়ে খুশি হয়ে মিশরীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শি'য়া মতবাদ ছেড়ে সুন্নী মতবাদ গ্রহণ করে এবং সালাহউদ্দীনের সাথে মিলে আল্লাহর শত্রু ও তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আজকের মিশরের সুন্নীরা সালাহউদ্দীনের কাছে চিরঋণী。