📄 নির্মাণ সংস্কার
কায়রোর প্রাচীর পুনর্নির্মাণ ছিলো এই ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দেয়ালটি অনেক জায়গায় ধসে গিয়ে চোরারাস্তায় পরিণত হয়েছিলো। এগুলো দিয়ে আইনের চোখ এড়িয়ে মানুষ অবাধে কায়রোর ভেতরে-বাইরে যাতায়াত করতে শুরু করেছিলো। নির্মাণ কাজের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে সালাহউদ্দীন নিয়োগ করেন আত-তাওয়াশি বাহাউদ্দীন কারাকুসকে। প্রাচীর ২৯.৩০২ কিউবিট দীর্ঘ ছিলো এবং পুরো শহরটিকে বেষ্টন করে রেখেছিলো। 'আমর বিন আল-'আস (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আল-ফুস্তাত, সালিহ ইবনু 'আলী আল-'আব্বাসির প্রতিষ্ঠিত আল-'আসকার এবং জাওহার আস-সাকিল্লির প্রতিষ্ঠিত আল-কাহিরাহ শহর মিলে ছিলো তখনকার কায়রো। আক্রমণকারীদের হাত থেকে কায়রোকে সুরক্ষিত করা হয়েছিলো এই প্রাচীর দিয়ে।
শত্রুদের বিরুদ্ধে শহরের নিরাপত্তা বাড়াতে তিনি কালা'আতুল জাবাল (পাহাড় কেল্লা) নির্মাণ করেন। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় তিনি এর নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। এই কেল্লা মিশরের একটি শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি এবং অনেকবার একে সংস্কার করা হয়েছে।
এছাড়া সুয়েজ শহরের সাতান্ন কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সিনাই উপদ্বীপে তিনি কালা'আত সিনা' (সিনাই কেল্লা) স্থাপন করেন। কেল্লার দক্ষিণাংশে দুটি মাসজিদ ও সুপেয় পানির একটি জলাধার নির্মাণ করা হয়। জলাধারের দরজায় লেখা ছিলো, “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মাদের উপর। ইসলাম ও মুসলিমদের বাদশাহ, মুমিনদের নেতার খলিফা আন-নাসর সালাহউদ্দীনের নামকে আল্লাহ অমর করুন। এই জলাধার নির্মাণ করেন বাদশাহ 'আলী ইবনুন নাসির আল-'আদিল আল-মুযফার। নির্মাণকাল শা'বান, ৫৯০ হিজরি।"
শুধু সামরিক কাঠামোই না, সালাহউদ্দীন গিযা এবং আর-রুদাহ দ্বীপে দালানকোঠাও নির্মাণ করেন। এছাড়া নীলনদের গভীরতা মাপতে মিটার স্থাপন করেন এবং খাল খনন করেন। এছাড়া তিনি কায়রোতে মারস্তান হাসপাতাল নির্মাণ করেন। এটি ছিলো বিশাল এক দাতব্য হাসপাতাল। তিনি একজন সুপ্রশিক্ষিত লোককে হাসপাতাল দেখাশোনা, ঔষধ ভাণ্ডার তত্ত্বাবধান ও রোগীদের যত্ন-আত্তির কাজে নিয়োগ করেন। রোগীদের জন্য এখানে বিছানা প্রস্তুত থাকতো। মহিলাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড ছিলো। মস্তিষ্ক বিকারগ্রস্তদের জন্য লোহার গরাদ দেওয়া আলাদা জায়গা ছিলো এবং তাদের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট লোক নিযুক্ত থাকতো।
সালাহউদ্দীনের সময় গিযা এবং আর-রুদাহ ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শহর।
ইবনু জুবাইর তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছেন:
"গিযাতে প্রতি রবিবারে এক বিরাট বাজার বসতো। গিযা ও কায়রোকে পৃথককারী একটি দ্বীপে আমোদ-প্রমোদের জন্য প্রাসাদ ছিলো। এছাড়া নীলনদে একটি উপসাগর দিয়েও এ দুটি পৃথক ছিলো। সেখানে এক বিশাল জামে মাসজিদ ছিলো। মাসজিদের পাশেই নীলনদের মিটার ছিলো যা দিয়ে পানির উচ্চতা পরিমাপ করা হতো। মিটারটিতে দামী পাথর-মার্বেল ইত্যাদি ছিলো।”
সালাহউদ্দীনের স্থল ও নৌসেনাদের প্রধান উৎস ছিলো মিশর। তিনি জাহাজ ও নৌবহর নির্মাণ করান এবং নৌসেনাদের পরিচালনার জন্য আল- 'আদিলের নেতৃত্বে আলাদা বিভাগ স্থাপন করেন। আলেক্সান্দ্রিয়া আর দামিয়েটা ছিলো মিশরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর। আর আল-ফুস্তাত ও কুস ছিলো গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর। নৌপথে শত্রু আক্রমণ ঠেকাতে এসব জায়গায় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন থাকতো। লক্ষ্য ছিলো একটাই, ইসলামের ঝাণ্ডাকে সুউচ্চে তুলে ধরা।
সালাহউদ্দীন খেয়াল করলেন যে ফ্র্যাংকরা আলেক্সান্দ্রিয়ার দিকে ছোঁকছোঁক করছে। তিনি সাবধানতাবশত এর প্রাচীর ও টাওয়ারগুলো সংস্কার করেন। কায়রোর মতো এখানেও একটি পাগলাগারদ ছিলো। সুবহুল আ'শা গ্রন্থের লেখক বলেন:
“সুলতান মিশর জয় করার পর ৩৮৪ হিজরি সনে আল-'আযীয ইবনুল মু'ইযের নির্মিত একটি প্রাসাদের দখল নেন। হলঘরটিকে তিনি পাগলাগারদে রূপান্তরিত করেন। এছাড়া তিনি বিদেশী অতিথিদের জন্য একটি দালান নির্মাণ করেন। কৃষকদের অবস্থা উন্নয়নের জন্য সেতু নির্মাণ ও খাল খননের সুপারিশ করেন।”
📄 শিক্ষা সংস্কার
সালাহউদ্দীন 'ইলম ও 'আলিম সমাজকে ভালোবাসতেন। দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুনর্জাগরণে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে তিনি কুণ্ঠা করেননি। তিনি বিভিন্ন বিদ্যাপীঠ স্থাপন করে কবি, লেখক, গবেষক এবং শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। সেখানে মক্তব ব্যবস্থা চালু ছিলো। শিশুরা মক্তবে শাইখদের অধীনে থেকে কুর'আন ও হাদীস অধ্যয়ন করতো। তারা আরবি ক্যালিগ্রাফিতেও দক্ষতা অর্জন করতো। এছাড়া গণিত, কাব্য, আরবি প্রবাদ এবং ইমামতি ও দু'আর নিয়মকানুন অধ্যয়ন করতো।
নাবালক থেকে সাবালক হওয়ার পর তারা ইচ্ছা করলে মিশর, সিরিয়া, মসুল, বাগদাদ ও মক্কায় 'ইলমের মারকাযগুলোতে গিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতো। যুক্তিবিদ্যা, কিরাআত, আদব ইত্যাদি শাস্ত্র মাসজিদ-মাদ্রাসাগুলোতে সবিস্তারে শেখানো হতো। বিভিন্ন আলিমের কাছ থেকে এবং বিভিন্ন পদ্ধতিতে কুর'আনের তাফসিরও শিখতো তারা।
সালাহউদ্দীনের যুগে মাসজিদগুলো ছিলো সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কেন্দ্রভূমি। 'ইবাদাত ও 'ইলম অর্জনে ব্যস্ত মানুষে টইটম্বুর ছিলো সেগুলো। তিলাওয়াত, তাফসির, শব্দতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, ছন্দ ও অলংকার শাস্ত্রসহ বিভিন্ন বিদ্যায় পারদর্শী মানুষ বেরিয়ে আসতো সেখান থেকে।
কায়রোর সবচেয়ে বিখ্যাত মাসজিদ ছিলো 'আমর বিন আল-'আস মাসজিদ, আল-আযহার মাসজিদ, আল-আকমার মাসজিদ, আল-হাকিম বিআমরিল্লাহ মাসজিদ ও আল-হুসাইন মাসজিদ। ইসলামী সংস্কৃতি ও জ্ঞানের প্রসারে আলেকজান্দ্রিয়ার আল-'আত্তিন মাসজিদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সারা মিশরজুড়ে মাসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিলো।
শামের মাসজিদগুলোও একই কাজ করতো। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো দামেস্ক মাসজিদ। ইবনু জুবাইর দামেস্ক ভ্রমণকালে এই মাসজিদ দেখে অভিভূত হয়ে যান। দামেস্ক ছিলো জ্ঞানের মারকায। বিভিন্ন এলাকা থেকে আলিমগণ এখানে আসতেন। ত্রিপোলিতেও দারুল হিকমাহ (জ্ঞানকেন্দ্র) ছিলো। এখানেও বিশাল সংখ্যক ছাত্র ছিলো। মিশরের দারুল হিকমাহ'র সাথে সম্মিলিতভাবে এটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ভূমিকা রাখে।
মিশর, শাম এবং ৫৮৩ সালে জেরুজালেমের মুক্তির পর সেখানে স্থাপিত বিদ্যাপীঠগুলোতে বিরাট পরিসরে চার মাযহাবের উপর পড়াশোনা হতো। আস-সিয়ুফিয়াহ মাদ্রাসা হলো হানাফি মাযহাবের অধ্যয়নের জন্য সালাহউদ্দীনের প্রতিষ্ঠিত প্রথম বিদ্যালয়। বত্রিশটি দোকানের আয় দিয়ে এই মাদ্রাসা চালানো হতো এবং এখানকার শিক্ষকদেরকে ভালোরকম পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হতো। ক্রুসেড শেষ হওয়ার সময়কাল পর্যন্ত মাদ্রাসাটি টিকে ছিলো।
তিনি নিজে ছিলেন শাফি'ঈ মাযহাবের অনুসারী। শাফি'ঈ মাযহাব অধ্যয়নের জন্য তিনি আস-সালিহিয়াহ মাদ্রাসা স্থাপন করেন। তিনি এ মাদ্রাসার দেখভাল করতেন এবং এর পরিসর প্রশস্ত করেন। তিনি এর পাশে একটি হাম্মামখানা, সামনে একটি রান্নাঘর ও অসংখ্য দোকান নির্মাণ করেন। আল-খুতাত গ্রন্থে আল-মাকরিযি লিখেছেন যে, সুলতান কায়রোর বাইরে নীলনদে অবস্থিত জাযিরাতুল ফীল (হাতিদ্বীপ) স্থাপন করেন।
৫৮৩ হিজরিতে জেরুজালেম মুক্ত করার পর তিনি সেখানে বিদ্যালয় স্থাপন করে আল-কাযী বাহাউদ্দীন ইবনু শাদ্দাদকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেন। অনেক ছাত্র সেখানে এসে জ্ঞান অর্জন করতো। ইবনু শাদ্দাদের খ্যাতিও এভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
স্থাপিত সব বিদ্যাপীঠেই সালাহউদ্দীন বিভিন্ন জাগতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাশাস্ত্রের প্রসার তত্ত্বাবধান করেন। এসব শিক্ষালয়ে দুই দল শিক্ষক থাকতেন। এক দল শিক্ষক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ। অপরদল সেই দক্ষ দলের থেকে শুনে শুনে সেগুলো পুনরাবৃত্তি করতেন যাতে ঠিকমতো সেগুলো শেখা হয়ে যায়। পুনরাবৃত্তিকারীরা দুর্বল ছাত্রদেরকে দক্ষ করে তুলতে প্রচুর শ্রম দিতেন। আজকের আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রফেসরের থেকে লেকচারারের মাধ্যমে ছাত্রদের কাছে জ্ঞান পৌঁছানোর ধারাটি এই পদ্ধতিরই অনুরূপ।
এটা তো স্পষ্টই যে, এসব বিষয় শিক্ষা দান করা হতো সুন্নী মতাদর্শের প্রসারের জন্য। নূরুদ্দীন এমনটাই চেয়েছিলেন। জ্ঞানের জগতে তিনি ফাতিমিদের বাতিনি ভাবধারা উচ্ছেদ করতে তৎপর ছিলেন। সঠিক জ্ঞানে সজ্জিত এই বাহিনীকে নিয়ে তিনি যুদ্ধের জগতে ফ্র্যাংকদেরকে উচ্ছেদ করেন।
মিশরে সেসময় বইয়ের বিক্রিবাট্টা ছিলো তুঙ্গে। 'আমর ইবনুল 'আস মাসজিদের পাশেই এক বইয়ের বাজারে অমূল্য অনেক বই বিক্রয় হতো। এছাড়া দামেস্কেও এক বৈচিত্র্যময় বই-পুস্তকের বিশাল দোকানপাট ছিলো।
📄 অর্থনৈতিক সংস্কার
সালাহউদ্দীনের শাসনামলে মুসলিম জাতির ধনভাণ্ডার পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে। সেসময় রাষ্ট্রের আয়ের প্রচুর উৎস ছিলো। যেমন:
* ১। মিশরের ফাতিমিদের ধনসম্পদ সালাহউদ্দীনের হাতে আসে।
* ২। অমুসলিম নাগরিকরা জিযইয়া প্রদান করে।
* ৩। বন্দীদের থেকে মুক্তিপণ নেওয়া হয়।
* ৪। প্রচুর গানীমাতের মাল পাওয়া যায়।
* ৫। চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের অর্জিত জমিজমা থেকে প্রাপ্ত খেরাজ।
সালাহউদ্দীন এসব আয় জিহাদ, কেল্লা ও দূর্গ নির্মাণ, কাঠামো ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সহ বিভিন্ন জায়গায় খরচ করতেন।
যুদ্ধের কারণে যাতে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে সালাহউদ্দীন কৃষি ও সেচব্যবস্থার যত্ন নিতেন। মিশর ও শামের মধ্যে কৃষিজ ফসল আমদানি-রপ্তানি হতে থাকতো। এছাড়া অন্যান্য অর্থনৈতিক ও সামরিক লেনদেন তো আছেই। জালিম ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধেও দুটি দেশ একত্রে লড়াই করতো।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে মিশরের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেনকে তিনি খুব গুরুত্ব দিতেন। এই বাণিজ্যের ফলে ইউরোপের অনেক শহরও লাভবান হয়। যেমন ইতালির ভেনিস ও পিসা। ভেনেশিয়ানরা আলেক্সান্দ্রিয়ায় আল-আইক বাজার স্থাপন করে।
সালাহউদ্দীন মিশর ও শামে বড় বড় বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করেন ও সংস্কার করেন। এর ফলে অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জিত হয় ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। ৫৭৮ হিজরিতে ইবনু জুবাইর এসব বাণিজ্যকেন্দ্রের কয়েকটি পরিদর্শন করেন ও এগুলোর প্রশংসা করেন। হালাবের (আলেপ্পো) ব্যাপারে তিনি লিখেন:
“এটি খুবই সুন্দর ও চমৎকার। বাজারগুলো বড়, প্রশস্ত, সুবিন্যস্ত ও দীর্ঘ। বিভিন্ন পণ্য ও উৎপাদন কারখানা তাদের নিজ নিজ জায়গায় বিন্যস্ত। প্রতিটি দোকান কাঠের ছাদযুক্ত। প্রতিটি দোকানই ব্যস্ত পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাকে দাঁড়াতে বাধ্য করবে। বেশিরভাগ দোকানই সুন্দর করে খোদাই করা পাথরের তৈরি।”
সালাহউদ্দীনের সময়ের শামের অন্তর্গত ত্রিপোলির বর্ণনা দিয়ে নাসির খসরু তাঁর সফরনামায় লেখেন:
"আখ, টক কমলা, কলা, ও লেবুর খামার ও বাগানে ঘেরা সুন্দর একটি শহর এটি। এখানে চার, পাঁচ বা ছয়তলাবিশিষ্ট সুতা কারখানা আছে। রাস্তাঘাট-দোকানপাটগুলো এত পরিপাটি যে, দেখে মনে হয় প্রতিটি দোকানই সুসজ্জিত প্রাসাদ। শহরের মাঝখানে কারুকার্য খচিত এক বিশাল সুন্দর মাসজিদ। মাসজিদের উঠানের পরই বিশাল গম্বুজের নিচে মার্বেলের তৈরি চৌবাচ্চা। উঠানের মাঝখানে আছে হলুদ তামার তৈরি একটি ঝর্ণা। এই ঝর্ণার পানি পাঁচটি কলের মাধ্যমে বাজারের লোকদের তৃষ্ণা মেটায়। এখানে একটি কাজগকলও ছিলো। কিন্তু শহরটি বিজিত হওয়ার সময় কারখানাটি ধ্বংস হয়, এর ভেতরের লোকেরা নিহত হয় আর পাঠাগার, বিদ্যালয় ও কারখানা ছাই হয়ে যায়।"
এ আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, সালাহউদ্দীন শহর-বন্দরে দালানকোঠা নির্মাণ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনে মনোযোগী ছিলেন। ত্রিপোলির কাগজকলও সালাহউদ্দীনের অর্জন। ক্রুসেডের বদৌলতে এসব কারখানা তৈরির শিক্ষা ইউরোপে আমদানী হয়। সেখানে প্রথম কারখানা স্থাপিত হয় ১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বেলজিয়ামে। ষোড়শ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে কোনো কাগজকল ছিলোই না।
মূলত অস্ত্র, বুননশিল্প, রেশমি কাপড়, ঘোড়ার জিন ও কাঁচ উৎপাদন শিল্পকে সালাহউদ্দীন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। এছাড়া মৃত্তিকাশিল্প ও জাহাজশিল্পও সে যুগে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। এছাড়া আরো অন্যান্য শিল্পও ছিলো যেগুলো মিলিয়ে অর্থনীতির চাকা সজোরে ঘুরতে থাকে।
📄 সমাজ সংস্কার
সালাহউদ্দীনের সময়কার সামাজিক অবস্থা জুড়ে ছিলো ফ্র্যাংক ও অন্যান্য শত্রুদের সাথে জিহাদ ও প্রতিরোধ। লোক দেখানো বাহাদুরি, মিছে আত্মগৌরব ও বিলাস-প্রমোদের কোনো ছাপ ছিলো না।
সাধারণ পোশাক পরিধান, সাধারণ মানের খাবার গ্রহণ আর বিনয়ী ভঙ্গিতে বসার ক্ষেত্রে সালাহউদ্দীন ছিলেন সাধারণ সৈনিক ও জনগণের জন্য আদর্শ। আল-'ইমাদ আল-আসফাহানি তাঁর পোশাক-আশাক ও চাল-চলনের বর্ণনায় বলেন, “তিনি শুধু হালাল পোশাকই পরতেন। যেমন- লিনেন, সুতি বা পশমের। কেউ তাঁর সাথে বসলে মনেই হতো না যে সে সুলতানের পাশে বসে আছে।”
ঘোড়সওয়ারগিরি ও বল খেলায় সালাহউদ্দীন ছিলেন দক্ষ খেলুড়ে। যুহর সালাতের পর তিনি তাঁর লোকদেরকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে 'আসর পর্যন্ত পোলো খেলা দেখতেন। লোকলস্কর ও সঙ্গীসাথীদের সাথে তিনি খেলাধুলাও করতেন। শিকার করা ছিলো সে সময়কার মানুষের প্রিয় একটি শখ। শিকারী কুকুর, বাজপাখি ও নানারকম সরঞ্জাম ব্যবহার করে তাঁরা পাখি, মাছ, রাজহাঁস, খরগোশ ইত্যাদি শিকার করতেন।
এসব থেকেই বোঝা যায় শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তিনি সহজাতভাবেই গড়ে উঠেছিলেন। সালাহউদ্দীনের হাতে যেসব সমাজ সংস্কারমূলক কাজ হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ফাতিমি যুগ থেকে চলে আসা বিভিন্ন অশ্লীলতা-পাপাচার বন্ধ করা। বিশেষ করে নওরোজ উৎসবে যেসব বিশ্রী কাজকারবার ঘটতো, সেগুলো তিনি বন্ধ করে দেন।
সালাহউদ্দীন এসব পাপাচার-অশ্লীলতা বন্ধ করে দিয়ে ইসলামী নিয়ম মেনে জনগণকে পবিত্র জীবনযাপনের সুযোগ করে দেন। বিভিন্ন পালা-পার্বণে যেসব বিদ'আত ও ধর্মদ্রোহী কাজকারবার হতো, সেগুলোও তিনি বন্ধ করে দেন। যেমন- 'আশুরা'র দিনে (১০ই মুহাররম) মানুষ কান্নাকাটি আর মাতম করে একে শোকদিবস বানিয়ে ফেলেছিলো। কাজকর্ম থামিয়ে, দোকানপাট বন্ধ করে মানুষকে এমনভাবে বিরক্ত করা হতো যেন তাদের কাছের কেউ মরে গেছে। সালাহউদ্দীন এসব বিদ'আতকে উৎখাত করেন। শোকের এই দিনকে আনন্দের দিনে পরিণত করেন এবং এই দিনে দান-সদকার প্রচলন করেন। এটি রাসূলুল্লাহর শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সালাহউদ্দীন প্রজাদের প্রতি খুবই দানশীল ছিলেন। তিনি দারিদ্র্যের ভয় করতেন না। তাঁর কাছে টাকাপয়সা আর ধূলাবালি ছিলো সমান। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ তো আগেই বলা হয়েছে। মাত্র সাতচল্লিশ দিরহাম ও এক জুর্ম। কোনো বাড়ি, ক্ষেত-খামার বা প্রাসাদ তিনি রেখে যাননি।
তিনি যদি নিজের জন্য ও নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য কিছু না-ই নিয়ে থাকেন, তাহলে এত সম্পদ ব্যয় করেছেন কোথায়? এ সবই বণ্টিত হয়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সামরিক খরচ, গোলাবারুদ প্রস্তুতি এবং গরীব-দুঃখীদের মাঝে। সালাহউদ্দীন চেয়েছিলেন ঐক্যবদ্ধ সমাজ, শক্তিশালী রাষ্ট্র, এবং মানুষের উন্নত জীবনমান।
সালাহউদ্দীন অনেক অন্যায় কর প্রত্যাহার করেন। বিশেষ করে মক্কার শাসক কর্তৃক হাজ্জযাত্রীদের উপর আরোপিত কর তিনি বাতিল করেন। হাজ্জযাত্রীরা জেদ্দায় ঢোকার আগে এই কর পরিশোধ করতে হতো। সালাহউদ্দীন এর বদলে নিজ খরচে মক্কার শাসককে আট হাজার আরদেব দিতেন এই শর্তে যে, মক্কার প্রকৃত গরীব-দুখীদের মাঝে তা বণ্টন করতে হবে। এভাবে তিনি হাজীদের কষ্টও কমালেন, মক্কার দরিদ্র লোকদেরও উপকার করলেন।
সালাহউদ্দীন শান্তি প্রতিষ্ঠা, মুসলিমদের ঐক্য রক্ষা ও যুলুম প্রতিরোধে তৎপর ছিলেন। পুত্র আল-মালিক আয-যাহিরকে আলেপ্পোর শাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তিনি তাঁকে যে উপদেশ দেন, সেটির বাক্যগুলোতেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ইবনু শাদ্দাদ সেই উপদেশ উদ্ধৃত করেন:
"আমি তোমাকে আদেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করার এবং তাঁর বিধি-বিধানগুলো প্রতিষ্ঠিত করার। কারণ এটিই নাজাতের পথ। রক্ত ঝরানোর ক্ষেত্রে সতর্ক হও, কারণ রক্ত কখনো (প্রতিশোধ না নিয়ে) থেমে থাকে না। আমি আদেশ দিচ্ছি আমার প্রতিনিধি এবং আল্লাহর বান্দা হিসেবে তুমি জনগণের অধিকার সংরক্ষণ কর ও যত্নশীল হও। রাজ-রাজড়া ও সম্ভ্রান্তদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখবে যাতে তোমার লক্ষ্য অর্জিত হয়। সবারই মৃত্যু আসে, কাজেই কারো জন্য অন্তরে বিদ্বেষ পুষে রেখো না। কারো প্রতি অবিচার করবে না। কারণ মাযলুম তোমাকে মাফ না করলে আল্লাহও তোমাকে মাফ করবেন না। অথচ আল্লাহর অধিকার ক্ষুণ্ণ করলে তিনি তা মাফ করে দেন, তিনি তো ক্ষমাশীল।”
মোটকথা, সালাহউদ্দীনের সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে মুসলিম সমাজ থেকে অশ্লীলতা-পাপাচার দূরীভূত হয়ে ইসলামী নীতি-নৈতিকতার পুনর্জাগরণ ঘটে।
টিকাঃ
[৭৪] আরদেব পরিমাপের একটি বড় একক যার সমমান হলো ২৪ সা'আ। এক সা'আ সমান ৩.৫ কিলোগ্রাম।