📄 আত্মসংযম ও দানশীলতা
তিনি দুনিয়াবি সুখ-সম্ভোগ থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন। তাঁর অনুসারীরা তাঁর জন্য দামেস্কে এক আলিশান বাড়ি বানায়। তিনি এর পরোয়াই না করে বললেন, “এই ঘরে আমরা চিরকাল থাকবো না। শাহাদাত পিয়াসীদের জন্য এ ঘর শোভনীয় নয়। এখানে আমরা আল্লাহ তা'আলার বন্দেগি করতে এসেছি।”
ক্ষমতা-কর্তৃত্ব নিয়ে তিনি অহংকার করতেন না। তাঁর একটি উক্তি এমন, “আমার চোখে অর্থ-সম্পদ আর ধূলাবালি একই জিনিস।” তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) কোনো টাকা, জমি বা প্রাসাদ রেখে মারা যাননি। ইবনু শাদ্দাদ উল্লেখ করেছেন, “মৃত্যুর সময় তাঁর যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদও অবশিষ্ট ছিলো না। গরীব-দুখীদের জন্য তিনি দু হাত খুলে দান করেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ সাতচল্লিশ দিরহাম ও এক জুম (খেজুরের বিচি সমান ওজনের মুদ্রা)। তিনি ঘরবাড়ি, বাগান, গ্রাম, খামার বা অন্য আর কোনো ধরনের সম্পত্তি রেখে যাননি।”
এমন শাসকের সংখ্যা ইতিহাসে শূন্যের কোঠায়। সুলতান আখিরাতের চিরস্থায়ী সুখের বিনিময়ে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুখকে বিকিয়ে দিয়েছেন।
তিনি ভিক্ষুক ও অভাবীদেরকে দান করতে কুণ্ঠিত হতেন না। ইবনু শাদ্দাদ বলেন:
“তিনি যখন দামেস্কের দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, জেরুসালেমে তাঁর বাসস্থানে অভাবীরা জড়ো হলো। কোষাগারে যথেষ্ট টাকা ছিলো না। আমি তাঁকে বিষয়টি জানালাম। তিনি কোষাগারের কিছু জিনিস বিক্রি করে তাদেরকে দান করার ব্যবস্থা করলেন। সংকট ও প্রাচুর্য উভয় অবস্থায় তিনি দানশীল ছিলেন। কোষাধ্যক্ষরা বিশেষ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে কিছু সম্পদের হিসাব তাঁর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। সালাহউদ্দীন বলতেন, 'এমনও মানুষ আছে যাদের কাছে টাকাপয়সা আর ধূলাবালি একই জিনিস।' হয়তো তিনি নিজেই এমন এক লোক ছিলেন।”
আলিম ও তাসাউফ চর্চাকারীদের প্রতিও তিনি উদার ছিলেন। অন্যদেরকেও তাঁদের প্রতি উদার হতে নির্দেশ দিতেন। একবার একজন আলিম সূফি তাঁর পাশ দিয়ে যান। এর কিছুদিন পর তিনি সে এলাকা থেকে চলে যান। সালাহউদ্দীন তাঁর খবর জানতে চাইলে তাঁকে জানানো হলো যে তিনি চলে গেছেন। সুলতানের চেহারায় অসন্তোষ ফুটে উঠলো। তিনি বললেন, “তিনি চলে যাওয়ার আগে কোনো দান-সদকা কেন করা হলো না তাঁকে?” সেই আলিমের পরিচিত এক কেরানিকে দিয়ে সুলতান খবর পাঠালেন যেন তিনি ফিরে এসে সুলতানের সাথে দেখা করেন। তিনি আসার পর সুলতান তাঁকে স্বাগত জানান, তাঁর সাথে কথাবার্তা বলেন এবং কয়েকদিনের জন্য তাঁকে অতিথি হিসেবে রাখেন। সুলতান তাঁর কাছে তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীদের জন্য উপঢৌকন, টাকা, সওয়ারি জন্তু ও কাপড় দেন। সূফি সাধকটি খুশি মনে প্রস্থান করেন।
সম্পদ আসার খবর পেলে তা হাতে এসে পৌঁছাবার আগেই সালাহউদ্দীন অভাবী ও সৈনিকদেরকে দান-সদকা করতে শুরু করতেন। যুদ্ধে কারো ঘোড়া আহত হলে তিনি সেটি বদলে সুস্থ ঘোড়া দিতেন। তাঁর নিজের নির্দিষ্ট কোনো ঘোড়া ছিলো না। তিনি সৈনিক ও জনগণকে ঘোড়া সদকা বা হাদিয়া হিসেবে দিতেন। এভাবে প্রায় দশ হাজার ঘোড়া তিনি দান করেন। এছাড়া তিনি লিনেন, সূতি ও পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন। কোনো অভাবীর খবর পেলে তা দানও করে দিতেন।
এমন দানশীলতার কারণ হলো তিনি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডাক পাওয়া সৈনিক ছাড়া নিজেকে আর কিছুই ভাবতেন না। এছাড়া তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যখন-তখন মৃত্যু চলে আসতে পারে। তাহলে প্রকৃত অভাবী লোকদেরকে বঞ্চিত করে নিজের কাছে টাকা জমিয়ে রাখার কী দরকার? এছাড়া তিনি দুনিয়াবি বিলাসিতা পরিহার করতেন। প্রতিনিধিদেরকে কাজে পাঠিয়ে নিজে সিংহাসনে বসে আয়েশ করতেন না। আয়েশী রাজার বদলে তিনি ছিলেন এক কঠোর পরিশ্রমী যোদ্ধা। বিশ্রাম নেওয়ার দরকার পড়লে তিনি মেঝেতে বা সামান্য তাঁবুর ছায়ায়ই বিশ্রাম নিতে জানতেন। মুসলিমদেরকে ঐক্যবদ্ধ ও মর্যাদার আসনে আসীন দেখেই তিনি প্রশান্তি পেতেন।
টিকাঃ
[৭২] হায়াতু সালাহউদ্দীন, আহমাদ আল-বায়ালি, পৃষ্ঠা ২১৪
📄 জিহাদপ্রেম
দখলদার ক্রুসেডারদের হাত থেকে মুসলিম ভূখণ্ডগুলোকে উদ্ধার করার জন্য সালাহউদ্দীন নাওয়া-খাওয়া ভুলে কাজ করেছেন।
ইবনু শাদ্দাদ আরো বলেন:
"জিহাদের প্রেমে তিনি ছিলেন পাগলপারা। একে তিনি এতই ভালোবাসতেন যে প্রতিটি সভায় এ প্রসঙ্গ তুলতেন। তিনি শুধুই তাঁর সৈনিক, সরঞ্জাম, এবং উপদেশ-নসিহতকারীদের ভালোবাসতেন। স্ত্রী-সন্তান, জন্মভূমি ছেড়ে এমন তাঁবুর নিচে বাস করতেন, যা বাতাসে পড়ে যাওয়ার জোগাড় হতো। একবার তিনি তাঁবুর বাইরে থাকা অবস্থায় তাঁর তাঁবু ভেঙে পড়ে। কিন্তু এতে তাঁর জিহাদস্পৃহা বেড়েছে বৈ কমেনি।”
সালাহউদ্দীনের এসব গুণাবলি আমাদের আজকের শাসকদের মাঝে আরো বেশি করে দরকার। তাহলেই তারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ইসরায়েলকে ধ্বংস করে উম্মাহর গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে। আল্লাহ চাইলে কিছুই অসম্ভব নয়।
মুসলিম উম্মাহর আজ এমন এক নেতার বড়ই প্রয়োজন যার মাঝে দ্বীনদারি, ন্যায়পরায়ণতা, দয়াশীলতা, সাহসিকতা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, সৌজন্য, মহানুভবতা, আত্মসংযম, দানশীলতা, কর্মঠতার সমাহার ঘটে। শাসক বা নেতার মাঝে এসব গুণ থাকলেই কেবল ইসলামের গৌরব পুনরুদ্ধার সম্ভব।
কত শত পথে ভাগ হয়ে গেছে হায় মোদের হৃদয়গুলো,
রব্বের কাছে যে দু হাত তুলে আজ দু'আর সময় এলো!
হে আল্লাহ! দাও সে শাসক, ইসলামের তরে যে কুরবান,
মুসলিমদের প্রতি সে আর তার প্রতি তুমি থাকবে মেহেরবান।