📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সৌজন্য ও মহানুভবতা

📄 সৌজন্য ও মহানুভবতা


ইতিহাসবিদরা একমত যে, যুদ্ধ আর রাজ্যজয়ের ইতিহাসে সালাহউদ্দীনের মতো সৌজন্য, মহানুভবতা আর শত্রুদের প্রতি সদাচরণের নজির একেবারে বিরল।

ইবনু শাদ্দাদ বলেন: “একবার আমরা শত্রুসীমা ঘেঁষে হাঁটছিলাম। এক মুসলিম সৈনিক একজন ক্রুসেডার নারীকে সাথে নিয়ে এলো। মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে বুক চাপড়াচ্ছিলো। সালাহউদ্দীন এর কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে মহিলাটি তার ছোট্ট মেয়েকে হারিয়ে ফেলেছে। সালাহউদ্দীনের দয়া হলো ও চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তিনি আদেশ দেন যে সেই মেয়েকে খরিদ করেছে, তাকে যেন তলব করা হয়। তারপর তাকে মূল্য পরিশোধ করে যেন মেয়েটিকে মুক্ত করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে মেয়েটিকে ফিরিয়ে আনা হয় আর তার মা তার দিকে দৌড়ে যায়। সে মুখে ধুলাবালি মেখে কাঁদতে থাকে। মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে তার মেয়েকে নিয়ে তাদের শিবিরে ফিরে যায়।”

ইবনু শাদ্দাদের বর্ণিত আরেকটি ঘটনা থেকে সালাহউদ্দীনের সৌজন্য ও মহানুভবতার দৃষ্টান্ত দেখা যায়: "সালাহউদ্দীনের চরম শত্রু ইংলিশ রাজা রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন সালাহউদ্দীন তাঁর খোঁজ-খবর নেন এবং তাঁর জন্য ফলমূল ও বরফ পাঠান। ক্ষুধার্ত ক্রুসেডাররা শত্রুর কাছ থেকে এমন মহানুভব আচরণ পেয়ে একেবারে তাজ্জব বনে যায়।”

ইতিহাসবিদগণ একমত যে, সালাহউদ্দীন ক্রুসেডারদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেননি। আদ-দা'ওয়াহ ইলাল ইসলাম গ্রন্থে আর্নল্ড বলেন, “বিপুল সংখ্যক ক্রুসেডার সালাহউদ্দীনের দয়ালু আচরণ দেখে ইসলাম গ্রহণ করে।"

ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের অন্ধ ঘৃণা আর খ্রিষ্টানদের সাথে মুসলিমদের ইসলামী সৌজন্যমূলক আচরণে ব্যাপক ফারাক। ক্রুসেডাররা ক্রোধে অন্ধ হয়ে আক্রমণ করে নারী-শিশু-বৃদ্ধ সবার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের নৃশংসতার বলি হয় মাসজিদুল আকসায় আশ্রয় নেওয়া সত্তর হাজার মুসলিম নারী, শিশু আর বিকলাঙ্গ। পক্ষান্তরে সালাহউদ্দীন জেরুসালেম জয় করার পর ক্রুসেডারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তাদের উপর যুলুম হওয়ার আশংকা রোধ করেন, তাদের থেকে মুক্তিপণ কবুল করেন। শুধু তা-ই না, মুসলিম সৈনিকদের তত্ত্বাবধানে তাদেরকে টায়ারেও পৌঁছে দিয়ে আসা হয়।

টিকাঃ
[৬৭] পুরো নাম থমাস ওয়াকার আরনল্ড। তিনি স্যার আহমেদ খানের খুব কাছের লোক ছিলেন। কবি আল্লামা ইকবালের দ্বারা প্রভাবিত এই ওরিয়েন্টালিস্ট এবং ইসলামি ইতিহাসবিদ উপমহাদেশের আলেম আল্লামা শিবলী নুমানিরও সঙ্গ পেয়েছেন। The preaching of Islam: a history of the propagation of the Muslim faith তার লেখা একটি বিখ্যাত বই।- সম্পাদক

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সালাহউদ্দীনের সমালোচনা

📄 সালাহউদ্দীনের সমালোচনা


আধুনিক ইতিহাসবিদগণ সালাহউদ্দীনের বিভিন্ন নীতিমালা, বিশেষ করে ইসলামের শত্রুদের প্রতি অতিরিক্ত সৌজন্যমূলক আচরণের সমালোচনা করেছেন। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:

১.
সালাহউদ্দীনের উচিত ছিলো ক্রুসেডারদের আচরণের সমুচিত জবাব দেওয়া। তারা যেভাবে মুসলিম বন্দীদের হত্যা করেছে, তাদের বন্দীদেরকেও সেভাবে হত্যা করা।
“অন্যায়ের প্রতিবিধান হলো অনুরূপ অন্যায়।”
“কাজেই যে কেউ তোমাদের সাথে কঠোর আচরণ করে, তোমরাও তার প্রতি কঠোর আচরণ কর যেমন কঠোরতা সে তোমাদের প্রতি করেছে।”

২.
তিনি ক্রুসেডার বন্দীদেরকে টায়ারে স্থায়ী হতে দিয়েছেন। এর ফলেই তারা ইউরোপ থেকে রসদ-সাহায্য আনিয়ে তৃতীয় ক্রুসেড শুরু করতে সমর্থ হয় এবং অ্যাকর দখল করে বসে।

৩.
হািত্তন যুদ্ধের পর যেসব বিপর্যয় ঘটে, সেগুলো পূর্ব-পশ্চিমে মুসলিমদের জয়যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে।

তবে অন্যান্য ইতিহাসবিদগণ সালাহউদ্দীনের কাজগুলোকে সমর্থন করে বলেছেন যে, এরকম দয়ালু আচরণ ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করেই করা হয়েছিলো। বন্দীদেরকে হত্যা ও বন্দী করেও রাখা যায় আবার মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়েও দেওয়া যায়। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কোন পদক্ষেপটি সবচেয়ে লাভজনক হবে, সেই ইজতিহাদ করার অধিকার মুসলিম শাসক বা নেতার রয়েছে।
“অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর অথবা তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ কর। তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করে।”

এছাড়া সালাহউদ্দীন তো যাজক-সেবক মিলিয়ে প্রায় দুইশ মতো বন্দীকে হত্যা করেছেনই। এরা বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, প্রোপাগান্ডা আর চুক্তিভঙ্গ করার মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে ঝামেলা বাঁধানোর চেষ্টা করছিলো। আর এরাই ছিলো সব নষ্টের গোড়া। এদের বিশাল অনুসারী গোষ্ঠী ছিলো এবং তারা চরমভাবে মুসলিমবিরোধী ছিলো। এছাড়া আগেও বলা হয়েছে যে রাসূলকে গালিগালাজকারী কেরাকের শাসক রেজিনাল্ড অব শ্যাতিওনকে হত্যা করে সালাহউদ্দীন তাঁর কসম পূর্ণ করেছেন।

এ আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, যেখানে কঠোরতা দরকার হতো সেখানে সালাহউদ্দীন কঠোরতা দেখাতেন। আর যেখানে মহানুভবতার দরকার হতো, সেখানে তিনি মহানুভবতা দেখাতেন। এক কবি লিখেছেন:
যেথায় কোমল হতে হয় সেথা যাবে না কঠোর হওয়া,
আবার কঠোর হতেই হলে যাবে না কোমলতা সওয়া।

আর টায়ারে থাকতে দেওয়ার ব্যাপারে বলা যায় যে, এখানে তো চুক্তি করেই থাকতে দেওয়া হয়েছে। সালাহউদ্দীনের দয়ালু আচরণ দেখে তারা এই চুক্তিকে সম্মান করবে, মুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করবে, এমন আশা করাটা তো অন্যায় নয়। কিন্তু তারা সেই ইহসানের কথা ভুলে যায়। এক আরব কবি বলেন:
মানুষ যা চায়, ঠিক তা-ই কি সবসময়ই হয়?
জাহাজের ঠিক উল্টো দিকেও প্রবল বায়ু বয়।

তবে সালাহউদ্দীন যদি তাদের থাকার জায়গাগুলোকে ভেঙে ভেঙে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতেন, তাহলে হয়তো তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এভাবে আক্রমণ চালানোর কথা ভাবতে পারতো না। কিন্তু তাঁর হাতে তো আর গায়েবের চাবিকাঠি নেই যে আগে থেকেই তৃতীয় ক্রুসেডের কথা জেনে যাবেন।

অতীত গিয়েছে অতীত হয়ে, ভবিষ্যতও তো গায়েব,
বর্তমানের জীবন নিয়েই বেশি করে ভাবুন, সায়েব!

শেষ কথা হলো, তিনি নবীগণের মতো মাসুম ছিলেন না। ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “যিনি কবরে শায়িত (অর্থাৎ মুহাম্মাদ ﷺ), তিনি ছাড়া উম্মাতের যে কেউই ভুল করতে পারে।” মুজতাহিদ ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এক নেকি পায়, আর সঠিক হলে দুই নেকি। সালাহউদ্দীন যে দলেই পড়ুন, ইনশাআল্লাহ তিনি পুরষ্কৃত হবেন।

টিকাঃ
[৬৮] সূরাহ আশ-শুরা ৪২:৪০
[৬৯] সূরাহ আল-বাকারাহ ২:১৯৪
[৭০] সূরাহ মুহাম্মাদ ৪৭:৪
[৭১] হায়াতু সালাহউদ্দীন, আহমাদ আল-বায়ালি, পৃষ্ঠা ১৬২

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 কাব্য ও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা

📄 কাব্য ও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা


সালাহউদ্দীন আসলে একজন সুসংহত মানুষ ছিলেন। তাঁর মন সবসময় জিহাদের কথা ভাবতো বটে, কিন্তু তাই বলে তিনি হালাল বিনোদন উপভোগ করতে ভুলেননি। ইবনু শাদ্দাদ বলেন যে, সালাহউদ্দীন ছিলেন মিশুক, নৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন, সেই সাথে রসবোধসম্পন্ন। তিনি আরবদের বংশলতিকা, যুদ্ধের তালিকা, তাদের জীবনী, তাদের ঘোড়াগুলোর কুলুজি এবং গল্প-উপকথা মুখস্থ জানতেন।

তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বের একটি প্রমাণ ছিলো তাঁর মুখস্থ থাকা কবিতাগুলো। আর এগুলো তিনি প্রায়ই কথায় কথায় আওড়াতেন। ইবনু খালিকান তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, সালাহউদ্দীন ভালো মানের কবিতা আর বাজে কবিতার মাঝে পার্থক্য জানতেন। অনেক কবি তাঁর কাছে এসে স্বরচিত কবিতা শোনাতো।

তিনি প্রায়ই এক কবির কবিতা আবৃত্তি করতেন:
বিপদের মাঝেও প্রিয়তমাকে স্বপ্নে দেখি সোৎসাহে
সব জাগিয়ে দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছি প্রায়,
রাত কেটে গিয়ে ভোর হয়ে গেলো, এ কী!
স্বপ্ন ভেঙে আমার আনন্দ দুঃখ হয়ে গেলো, হায়!

ওয়াফিয়াতুল আ'ইয়ান এর লেখক বলেন যে, ইবনুন মুনাজিমের এই কথায় সালাহউদ্দীন সন্তুষ্ট ছিলেন:
পাকা চুল দেখতে খারাপ লাগে, তাই কলপ মাখে লোকে,
চুল বড় হয়ে পাকা মূল বেরোলে আরো বিশ্রী লাগে চোখে।
যৌবনের মৃত্যুতে চুল জেনো সব কালো হয়েছিলো শোকে।

রাওদাতাইন এর লেখক উল্লেখ করেছেন যে, সালাহউদ্দীন ছিলেন উসামা ইবনু মুনকিযের কবিতার ভক্ত। হৃদয়কাড়া অনেক কবিতা তাঁর মুখস্থ ছিলো। ইতিহাসবিদগণ বর্ণনা করেন যে, তাঁর ভাই তুরান শাহ'র মৃত্যুর পর তিনি শোককবিতা আবৃত্তি করে তাঁর দুঃখ প্রকাশ করেন। আল-'ইমাদ আরো বলেন, তিনি বন্ধুদের কাছে চিঠি লিখে কোনো সুসংবাদ দেওয়ার সময় চরণ আকারে লিখতেন:
একদা তোকে স্বচোখে দেখেও মেটেনি মনের সাধ
আজ শুধু তোর খবর শুনেই খুশি মানে না বাধ।

আল-'ইমাদ আল-কাতিব আরো বলেন যে, সালাহউদ্দীন সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের ভক্ত ছিলেন। কবিদের সাথে দেখা করে তাদের নতুন নতুন কবিতা শুনতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, জেরুজালেম বিজয়ের পর তিনি এমন একটি সভা করে কবিতা আবৃত্তি শোনেন। সপ্তম অধ্যায়ে এমন কিছু কবিতা উল্লেখিত হয়েছে।

সালাহউদ্দীন ছিলেন দক্ষ কাব্য সমালোচক। সেখানকার বিখ্যাত খুবানি ফলের মৌসুমে আল-'ইমাদকে দামেস্কে দাওয়াত দিয়ে আহমাদ ইবনু নাফাদাহ একটি কবিতা লিখেছিলেন। তার শুরুতে ছিলো:
সুস্বাদু সব খুবানি ফলের দাওয়াত যখন আসে
দামেস্ক ছাড়া আর কোথাকার ছবি না মনে ভাসে।

আল-'ইমাদ সেটি সুলতান সালাহউদ্দীনকে দেখালে সালাহউদ্দীন জানতে চান এর জবাবে তিনি কী লিখেছেন। আল-'ইমাদ বলেন:
দস্তরখানে বসি চলো গিয়ে, খুবানি ফল নিয়ে খাই,
রূপায় জড়ানো সোনা যেন তা, চোখ ফেরাতে না পাই।

সুলতান তা শুনে বললেন, “পাতার সাথে রূপার তুলনাটা মিললো না। পাতা হলো সবুজ, আর রূপা তো সাদাটে।” আল-'ইমাদ এরপর সংশোধন করে লিখলেন:
পাতার ভেতর খুবানি যেন পান্না মোড়ানো সোনা,
কবির উপমা ভুল হলো বলে সুলতানের সমালোচনা।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 আত্মসংযম ও দানশীলতা

📄 আত্মসংযম ও দানশীলতা


তিনি দুনিয়াবি সুখ-সম্ভোগ থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন। তাঁর অনুসারীরা তাঁর জন্য দামেস্কে এক আলিশান বাড়ি বানায়। তিনি এর পরোয়াই না করে বললেন, “এই ঘরে আমরা চিরকাল থাকবো না। শাহাদাত পিয়াসীদের জন্য এ ঘর শোভনীয় নয়। এখানে আমরা আল্লাহ তা'আলার বন্দেগি করতে এসেছি।”

ক্ষমতা-কর্তৃত্ব নিয়ে তিনি অহংকার করতেন না। তাঁর একটি উক্তি এমন, “আমার চোখে অর্থ-সম্পদ আর ধূলাবালি একই জিনিস।” তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) কোনো টাকা, জমি বা প্রাসাদ রেখে মারা যাননি। ইবনু শাদ্দাদ উল্লেখ করেছেন, “মৃত্যুর সময় তাঁর যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদও অবশিষ্ট ছিলো না। গরীব-দুখীদের জন্য তিনি দু হাত খুলে দান করেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ সাতচল্লিশ দিরহাম ও এক জুম (খেজুরের বিচি সমান ওজনের মুদ্রা)। তিনি ঘরবাড়ি, বাগান, গ্রাম, খামার বা অন্য আর কোনো ধরনের সম্পত্তি রেখে যাননি।”

এমন শাসকের সংখ্যা ইতিহাসে শূন্যের কোঠায়। সুলতান আখিরাতের চিরস্থায়ী সুখের বিনিময়ে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুখকে বিকিয়ে দিয়েছেন।

তিনি ভিক্ষুক ও অভাবীদেরকে দান করতে কুণ্ঠিত হতেন না। ইবনু শাদ্দাদ বলেন:
“তিনি যখন দামেস্কের দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, জেরুসালেমে তাঁর বাসস্থানে অভাবীরা জড়ো হলো। কোষাগারে যথেষ্ট টাকা ছিলো না। আমি তাঁকে বিষয়টি জানালাম। তিনি কোষাগারের কিছু জিনিস বিক্রি করে তাদেরকে দান করার ব্যবস্থা করলেন। সংকট ও প্রাচুর্য উভয় অবস্থায় তিনি দানশীল ছিলেন। কোষাধ্যক্ষরা বিশেষ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে কিছু সম্পদের হিসাব তাঁর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। সালাহউদ্দীন বলতেন, 'এমনও মানুষ আছে যাদের কাছে টাকাপয়সা আর ধূলাবালি একই জিনিস।' হয়তো তিনি নিজেই এমন এক লোক ছিলেন।”

আলিম ও তাসাউফ চর্চাকারীদের প্রতিও তিনি উদার ছিলেন। অন্যদেরকেও তাঁদের প্রতি উদার হতে নির্দেশ দিতেন। একবার একজন আলিম সূফি তাঁর পাশ দিয়ে যান। এর কিছুদিন পর তিনি সে এলাকা থেকে চলে যান। সালাহউদ্দীন তাঁর খবর জানতে চাইলে তাঁকে জানানো হলো যে তিনি চলে গেছেন। সুলতানের চেহারায় অসন্তোষ ফুটে উঠলো। তিনি বললেন, “তিনি চলে যাওয়ার আগে কোনো দান-সদকা কেন করা হলো না তাঁকে?” সেই আলিমের পরিচিত এক কেরানিকে দিয়ে সুলতান খবর পাঠালেন যেন তিনি ফিরে এসে সুলতানের সাথে দেখা করেন। তিনি আসার পর সুলতান তাঁকে স্বাগত জানান, তাঁর সাথে কথাবার্তা বলেন এবং কয়েকদিনের জন্য তাঁকে অতিথি হিসেবে রাখেন। সুলতান তাঁর কাছে তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীদের জন্য উপঢৌকন, টাকা, সওয়ারি জন্তু ও কাপড় দেন। সূফি সাধকটি খুশি মনে প্রস্থান করেন।

সম্পদ আসার খবর পেলে তা হাতে এসে পৌঁছাবার আগেই সালাহউদ্দীন অভাবী ও সৈনিকদেরকে দান-সদকা করতে শুরু করতেন। যুদ্ধে কারো ঘোড়া আহত হলে তিনি সেটি বদলে সুস্থ ঘোড়া দিতেন। তাঁর নিজের নির্দিষ্ট কোনো ঘোড়া ছিলো না। তিনি সৈনিক ও জনগণকে ঘোড়া সদকা বা হাদিয়া হিসেবে দিতেন। এভাবে প্রায় দশ হাজার ঘোড়া তিনি দান করেন। এছাড়া তিনি লিনেন, সূতি ও পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন। কোনো অভাবীর খবর পেলে তা দানও করে দিতেন।

এমন দানশীলতার কারণ হলো তিনি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডাক পাওয়া সৈনিক ছাড়া নিজেকে আর কিছুই ভাবতেন না। এছাড়া তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যখন-তখন মৃত্যু চলে আসতে পারে। তাহলে প্রকৃত অভাবী লোকদেরকে বঞ্চিত করে নিজের কাছে টাকা জমিয়ে রাখার কী দরকার? এছাড়া তিনি দুনিয়াবি বিলাসিতা পরিহার করতেন। প্রতিনিধিদেরকে কাজে পাঠিয়ে নিজে সিংহাসনে বসে আয়েশ করতেন না। আয়েশী রাজার বদলে তিনি ছিলেন এক কঠোর পরিশ্রমী যোদ্ধা। বিশ্রাম নেওয়ার দরকার পড়লে তিনি মেঝেতে বা সামান্য তাঁবুর ছায়ায়ই বিশ্রাম নিতে জানতেন। মুসলিমদেরকে ঐক্যবদ্ধ ও মর্যাদার আসনে আসীন দেখেই তিনি প্রশান্তি পেতেন।

টিকাঃ
[৭২] হায়াতু সালাহউদ্দীন, আহমাদ আল-বায়ালি, পৃষ্ঠা ২১৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00