📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সমঝোতা ও ক্ষমাপরায়ণতা

📄 সমঝোতা ও ক্ষমাপরায়ণতা


ইবনু শাদ্দাদের বর্ণিত আরেকটি ঘটনা থেকে সালাহউদ্দীনের ধৈর্য ও অল্পে তুষ্টির কথা জানা যায়। সালাহউদ্দীনের এক ছেলের নাম ছিলো ইসমা'ঈল। তাঁকে ইসমা'ঈলের মৃত্যুর সংবাদ দিলে তিনি ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরেন এবং আল্লাহর নিকট এই কুরবানির প্রতিদানের আশা রাখেন। শুধু তাঁর চোখ দুটি অশ্রুতে ভিজে যায়। ইবনু শাদ্দাদ বলেন, “হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে ধৈর্য ও কুরবানির পথ দেখিয়েছেন। তাঁকে এর প্রতিদানও দিন, ইয়া রাহমান!”

সালাহউদ্দীনের উল্লেখযোগ্য গুণ হলো তাঁর ক্ষমাশীলতা ও ঝামেলা মিটমাট করে ফেলার ক্ষমতা। তিনি অসদাচরণের জবাব দিতেন সদাচরণের মাধ্যমে আর কর্কশ স্বভাবের জবাব দিতেন ধৈর্যের মাধ্যমে। ইবনু শাদ্দাদ বর্ণনা করেন যে, আদালতে মানুষ এত ভিড় করতো যে সালাহউদ্দীনের কাপড়ের ঝুলে মানুষ পাড়া দিয়ে দিতো। অথবা তিনি যে মাদুরে দাঁড়াতেন, সেখানে উঠে আসতো। কিন্তু তিনি এতে কিছু মনে করতেন না। অনেক মামলার বাদী তাঁর সাথে রূঢ়ভাবে কথা বলতো, কিন্তু তিনি তাদের কথা মেনে নিতেন।

এক বৃষ্টির দিনে ইবনু শাদ্দাদ খচ্চরের পিঠে চড়ে সালাহউদ্দীনের পাশ দিয়ে গেলেন। ঠিক এই সময় খচ্চরটি গা ঝাড়া দিলো। ফলে কাদার ছিটা গিয়ে সালাহউদ্দীনের কাপড়ে লাগলো। কিন্তু সালাহউদ্দীন ইবনু শাদ্দাদকে বিব্রত হতে না দিয়ে হাসি দিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করলেন।

সালাহউদ্দীনের ক্ষমাপরায়ণতার আরেকটি ঘটনার চাক্ষুস সাক্ষী হন ইবনু শাদ্দাদ। ইয়াফফা নিয়ে যখন সালাহউদ্দীন আর রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্টের মধ্যে ঝামেলা চলছিলো, তখন কিছু সৈনিক সালাহউদ্দীনের নির্দেশ অমান্য করে তাঁর সাথে খারাপ আচরণ করে। তিনি রাগ করে চলে গেলেন। অন্য সৈনিকেরা তাঁর রাগ দেখে ভাবলো তিনি হয়তো ওইসব সৈনিককে তাদের আচরণের কারণে হত্যাই করে ফেলেছেন। সালাহউদ্দীন হেডকোয়ার্টারে গিয়ে সভাসদদের সাথে কথা বলার সময় সবাই এতই ভয় পাচ্ছিলেন যে, মনে হতে থাকলো তিনি তাঁদের উপরও রেগে আছেন। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর ইবনু শাদ্দাদও বলেছেন, “আমার ভয় হচ্ছিলো যে তিনি আমাকে না আবার ডাক দিয়ে বসেন।” কিন্তু তিনি সালাহউদ্দীনের কক্ষে যাওয়ার পর তাঁকে শান্ত অবস্থায় দেখতে পান। তিনি ইবনু শাদ্দাদকে বলেন সভাসদদেরকে ডাকিয়ে আনতে। দামেস্ক থেকে কিছু ফল এসেছে, তা সবাই মিলে খাওয়ার জন্য ডাকতে বললেন সবাইকে। সভাসদরা ভয়ে ভয়ে প্রবেশ করে সালাহউদ্দীনকে হাসিখুশি পেলেন। কিছুই যেন হয়নি এমন বোধ নিয়ে তাঁরা আবার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

ইতিহাসবিদরা আরো বর্ণনা করেছেন যে, একবার সালাহউদ্দীন ক্লান্ত থাকা অবস্থায় এক লোক তাঁর কাছে অভিযোগ নিয়ে আসে। তিনি বলেন যে তিনি ক্লান্ত আছেন, পরে দেখে দিবেন। কিন্তু লোকটি অপেক্ষা করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সেখানেই অভিযোগটি পড়ে শোনায়। সালাহউদ্দীন তা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। লোকটির পড়া শেষ হলে তিনি বলেন যে অভিযোগপত্রটি স্বাক্ষর করার জন্য তাঁর কাছে কালির দোয়াত নেই। লোকটি গিয়ে কালি এনে দেয়। সালাহউদ্দীন একটুও না রেগে নীরবে অভিযোগপত্রটি সই করে দেন।

তিনি শুধু নিজের প্রজা, অনুসারী আর সৈনিকদের প্রতিই ক্ষমাশীল ছিলেন, তা নয়। শত্রুদের সাথেও তিনি ক্ষমাশীল আচরণ করতেন। সপ্তম অধ্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

টিকাঃ
[৬৬] আন-নাওাদির আস-সুলতানিয়াহ, পৃষ্ঠা ৫০

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সৌজন্য ও মহানুভবতা

📄 সৌজন্য ও মহানুভবতা


ইতিহাসবিদরা একমত যে, যুদ্ধ আর রাজ্যজয়ের ইতিহাসে সালাহউদ্দীনের মতো সৌজন্য, মহানুভবতা আর শত্রুদের প্রতি সদাচরণের নজির একেবারে বিরল।

ইবনু শাদ্দাদ বলেন: “একবার আমরা শত্রুসীমা ঘেঁষে হাঁটছিলাম। এক মুসলিম সৈনিক একজন ক্রুসেডার নারীকে সাথে নিয়ে এলো। মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে বুক চাপড়াচ্ছিলো। সালাহউদ্দীন এর কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে মহিলাটি তার ছোট্ট মেয়েকে হারিয়ে ফেলেছে। সালাহউদ্দীনের দয়া হলো ও চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তিনি আদেশ দেন যে সেই মেয়েকে খরিদ করেছে, তাকে যেন তলব করা হয়। তারপর তাকে মূল্য পরিশোধ করে যেন মেয়েটিকে মুক্ত করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে মেয়েটিকে ফিরিয়ে আনা হয় আর তার মা তার দিকে দৌড়ে যায়। সে মুখে ধুলাবালি মেখে কাঁদতে থাকে। মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে তার মেয়েকে নিয়ে তাদের শিবিরে ফিরে যায়।”

ইবনু শাদ্দাদের বর্ণিত আরেকটি ঘটনা থেকে সালাহউদ্দীনের সৌজন্য ও মহানুভবতার দৃষ্টান্ত দেখা যায়: "সালাহউদ্দীনের চরম শত্রু ইংলিশ রাজা রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন সালাহউদ্দীন তাঁর খোঁজ-খবর নেন এবং তাঁর জন্য ফলমূল ও বরফ পাঠান। ক্ষুধার্ত ক্রুসেডাররা শত্রুর কাছ থেকে এমন মহানুভব আচরণ পেয়ে একেবারে তাজ্জব বনে যায়।”

ইতিহাসবিদগণ একমত যে, সালাহউদ্দীন ক্রুসেডারদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেননি। আদ-দা'ওয়াহ ইলাল ইসলাম গ্রন্থে আর্নল্ড বলেন, “বিপুল সংখ্যক ক্রুসেডার সালাহউদ্দীনের দয়ালু আচরণ দেখে ইসলাম গ্রহণ করে।"

ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের অন্ধ ঘৃণা আর খ্রিষ্টানদের সাথে মুসলিমদের ইসলামী সৌজন্যমূলক আচরণে ব্যাপক ফারাক। ক্রুসেডাররা ক্রোধে অন্ধ হয়ে আক্রমণ করে নারী-শিশু-বৃদ্ধ সবার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের নৃশংসতার বলি হয় মাসজিদুল আকসায় আশ্রয় নেওয়া সত্তর হাজার মুসলিম নারী, শিশু আর বিকলাঙ্গ। পক্ষান্তরে সালাহউদ্দীন জেরুসালেম জয় করার পর ক্রুসেডারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তাদের উপর যুলুম হওয়ার আশংকা রোধ করেন, তাদের থেকে মুক্তিপণ কবুল করেন। শুধু তা-ই না, মুসলিম সৈনিকদের তত্ত্বাবধানে তাদেরকে টায়ারেও পৌঁছে দিয়ে আসা হয়।

টিকাঃ
[৬৭] পুরো নাম থমাস ওয়াকার আরনল্ড। তিনি স্যার আহমেদ খানের খুব কাছের লোক ছিলেন। কবি আল্লামা ইকবালের দ্বারা প্রভাবিত এই ওরিয়েন্টালিস্ট এবং ইসলামি ইতিহাসবিদ উপমহাদেশের আলেম আল্লামা শিবলী নুমানিরও সঙ্গ পেয়েছেন। The preaching of Islam: a history of the propagation of the Muslim faith তার লেখা একটি বিখ্যাত বই।- সম্পাদক

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সালাহউদ্দীনের সমালোচনা

📄 সালাহউদ্দীনের সমালোচনা


আধুনিক ইতিহাসবিদগণ সালাহউদ্দীনের বিভিন্ন নীতিমালা, বিশেষ করে ইসলামের শত্রুদের প্রতি অতিরিক্ত সৌজন্যমূলক আচরণের সমালোচনা করেছেন। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:

১.
সালাহউদ্দীনের উচিত ছিলো ক্রুসেডারদের আচরণের সমুচিত জবাব দেওয়া। তারা যেভাবে মুসলিম বন্দীদের হত্যা করেছে, তাদের বন্দীদেরকেও সেভাবে হত্যা করা।
“অন্যায়ের প্রতিবিধান হলো অনুরূপ অন্যায়।”
“কাজেই যে কেউ তোমাদের সাথে কঠোর আচরণ করে, তোমরাও তার প্রতি কঠোর আচরণ কর যেমন কঠোরতা সে তোমাদের প্রতি করেছে।”

২.
তিনি ক্রুসেডার বন্দীদেরকে টায়ারে স্থায়ী হতে দিয়েছেন। এর ফলেই তারা ইউরোপ থেকে রসদ-সাহায্য আনিয়ে তৃতীয় ক্রুসেড শুরু করতে সমর্থ হয় এবং অ্যাকর দখল করে বসে।

৩.
হািত্তন যুদ্ধের পর যেসব বিপর্যয় ঘটে, সেগুলো পূর্ব-পশ্চিমে মুসলিমদের জয়যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে।

তবে অন্যান্য ইতিহাসবিদগণ সালাহউদ্দীনের কাজগুলোকে সমর্থন করে বলেছেন যে, এরকম দয়ালু আচরণ ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করেই করা হয়েছিলো। বন্দীদেরকে হত্যা ও বন্দী করেও রাখা যায় আবার মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়েও দেওয়া যায়। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কোন পদক্ষেপটি সবচেয়ে লাভজনক হবে, সেই ইজতিহাদ করার অধিকার মুসলিম শাসক বা নেতার রয়েছে।
“অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর অথবা তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ কর। তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করে।”

এছাড়া সালাহউদ্দীন তো যাজক-সেবক মিলিয়ে প্রায় দুইশ মতো বন্দীকে হত্যা করেছেনই। এরা বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, প্রোপাগান্ডা আর চুক্তিভঙ্গ করার মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে ঝামেলা বাঁধানোর চেষ্টা করছিলো। আর এরাই ছিলো সব নষ্টের গোড়া। এদের বিশাল অনুসারী গোষ্ঠী ছিলো এবং তারা চরমভাবে মুসলিমবিরোধী ছিলো। এছাড়া আগেও বলা হয়েছে যে রাসূলকে গালিগালাজকারী কেরাকের শাসক রেজিনাল্ড অব শ্যাতিওনকে হত্যা করে সালাহউদ্দীন তাঁর কসম পূর্ণ করেছেন।

এ আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, যেখানে কঠোরতা দরকার হতো সেখানে সালাহউদ্দীন কঠোরতা দেখাতেন। আর যেখানে মহানুভবতার দরকার হতো, সেখানে তিনি মহানুভবতা দেখাতেন। এক কবি লিখেছেন:
যেথায় কোমল হতে হয় সেথা যাবে না কঠোর হওয়া,
আবার কঠোর হতেই হলে যাবে না কোমলতা সওয়া।

আর টায়ারে থাকতে দেওয়ার ব্যাপারে বলা যায় যে, এখানে তো চুক্তি করেই থাকতে দেওয়া হয়েছে। সালাহউদ্দীনের দয়ালু আচরণ দেখে তারা এই চুক্তিকে সম্মান করবে, মুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করবে, এমন আশা করাটা তো অন্যায় নয়। কিন্তু তারা সেই ইহসানের কথা ভুলে যায়। এক আরব কবি বলেন:
মানুষ যা চায়, ঠিক তা-ই কি সবসময়ই হয়?
জাহাজের ঠিক উল্টো দিকেও প্রবল বায়ু বয়।

তবে সালাহউদ্দীন যদি তাদের থাকার জায়গাগুলোকে ভেঙে ভেঙে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতেন, তাহলে হয়তো তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এভাবে আক্রমণ চালানোর কথা ভাবতে পারতো না। কিন্তু তাঁর হাতে তো আর গায়েবের চাবিকাঠি নেই যে আগে থেকেই তৃতীয় ক্রুসেডের কথা জেনে যাবেন।

অতীত গিয়েছে অতীত হয়ে, ভবিষ্যতও তো গায়েব,
বর্তমানের জীবন নিয়েই বেশি করে ভাবুন, সায়েব!

শেষ কথা হলো, তিনি নবীগণের মতো মাসুম ছিলেন না। ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “যিনি কবরে শায়িত (অর্থাৎ মুহাম্মাদ ﷺ), তিনি ছাড়া উম্মাতের যে কেউই ভুল করতে পারে।” মুজতাহিদ ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এক নেকি পায়, আর সঠিক হলে দুই নেকি। সালাহউদ্দীন যে দলেই পড়ুন, ইনশাআল্লাহ তিনি পুরষ্কৃত হবেন।

টিকাঃ
[৬৮] সূরাহ আশ-শুরা ৪২:৪০
[৬৯] সূরাহ আল-বাকারাহ ২:১৯৪
[৭০] সূরাহ মুহাম্মাদ ৪৭:৪
[৭১] হায়াতু সালাহউদ্দীন, আহমাদ আল-বায়ালি, পৃষ্ঠা ১৬২

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 কাব্য ও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা

📄 কাব্য ও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা


সালাহউদ্দীন আসলে একজন সুসংহত মানুষ ছিলেন। তাঁর মন সবসময় জিহাদের কথা ভাবতো বটে, কিন্তু তাই বলে তিনি হালাল বিনোদন উপভোগ করতে ভুলেননি। ইবনু শাদ্দাদ বলেন যে, সালাহউদ্দীন ছিলেন মিশুক, নৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন, সেই সাথে রসবোধসম্পন্ন। তিনি আরবদের বংশলতিকা, যুদ্ধের তালিকা, তাদের জীবনী, তাদের ঘোড়াগুলোর কুলুজি এবং গল্প-উপকথা মুখস্থ জানতেন।

তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বের একটি প্রমাণ ছিলো তাঁর মুখস্থ থাকা কবিতাগুলো। আর এগুলো তিনি প্রায়ই কথায় কথায় আওড়াতেন। ইবনু খালিকান তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, সালাহউদ্দীন ভালো মানের কবিতা আর বাজে কবিতার মাঝে পার্থক্য জানতেন। অনেক কবি তাঁর কাছে এসে স্বরচিত কবিতা শোনাতো।

তিনি প্রায়ই এক কবির কবিতা আবৃত্তি করতেন:
বিপদের মাঝেও প্রিয়তমাকে স্বপ্নে দেখি সোৎসাহে
সব জাগিয়ে দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছি প্রায়,
রাত কেটে গিয়ে ভোর হয়ে গেলো, এ কী!
স্বপ্ন ভেঙে আমার আনন্দ দুঃখ হয়ে গেলো, হায়!

ওয়াফিয়াতুল আ'ইয়ান এর লেখক বলেন যে, ইবনুন মুনাজিমের এই কথায় সালাহউদ্দীন সন্তুষ্ট ছিলেন:
পাকা চুল দেখতে খারাপ লাগে, তাই কলপ মাখে লোকে,
চুল বড় হয়ে পাকা মূল বেরোলে আরো বিশ্রী লাগে চোখে।
যৌবনের মৃত্যুতে চুল জেনো সব কালো হয়েছিলো শোকে।

রাওদাতাইন এর লেখক উল্লেখ করেছেন যে, সালাহউদ্দীন ছিলেন উসামা ইবনু মুনকিযের কবিতার ভক্ত। হৃদয়কাড়া অনেক কবিতা তাঁর মুখস্থ ছিলো। ইতিহাসবিদগণ বর্ণনা করেন যে, তাঁর ভাই তুরান শাহ'র মৃত্যুর পর তিনি শোককবিতা আবৃত্তি করে তাঁর দুঃখ প্রকাশ করেন। আল-'ইমাদ আরো বলেন, তিনি বন্ধুদের কাছে চিঠি লিখে কোনো সুসংবাদ দেওয়ার সময় চরণ আকারে লিখতেন:
একদা তোকে স্বচোখে দেখেও মেটেনি মনের সাধ
আজ শুধু তোর খবর শুনেই খুশি মানে না বাধ।

আল-'ইমাদ আল-কাতিব আরো বলেন যে, সালাহউদ্দীন সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের ভক্ত ছিলেন। কবিদের সাথে দেখা করে তাদের নতুন নতুন কবিতা শুনতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, জেরুজালেম বিজয়ের পর তিনি এমন একটি সভা করে কবিতা আবৃত্তি শোনেন। সপ্তম অধ্যায়ে এমন কিছু কবিতা উল্লেখিত হয়েছে।

সালাহউদ্দীন ছিলেন দক্ষ কাব্য সমালোচক। সেখানকার বিখ্যাত খুবানি ফলের মৌসুমে আল-'ইমাদকে দামেস্কে দাওয়াত দিয়ে আহমাদ ইবনু নাফাদাহ একটি কবিতা লিখেছিলেন। তার শুরুতে ছিলো:
সুস্বাদু সব খুবানি ফলের দাওয়াত যখন আসে
দামেস্ক ছাড়া আর কোথাকার ছবি না মনে ভাসে।

আল-'ইমাদ সেটি সুলতান সালাহউদ্দীনকে দেখালে সালাহউদ্দীন জানতে চান এর জবাবে তিনি কী লিখেছেন। আল-'ইমাদ বলেন:
দস্তরখানে বসি চলো গিয়ে, খুবানি ফল নিয়ে খাই,
রূপায় জড়ানো সোনা যেন তা, চোখ ফেরাতে না পাই।

সুলতান তা শুনে বললেন, “পাতার সাথে রূপার তুলনাটা মিললো না। পাতা হলো সবুজ, আর রূপা তো সাদাটে।” আল-'ইমাদ এরপর সংশোধন করে লিখলেন:
পাতার ভেতর খুবানি যেন পান্না মোড়ানো সোনা,
কবির উপমা ভুল হলো বলে সুলতানের সমালোচনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00