📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 ইবাদাত-বন্দেগী

📄 ইবাদাত-বন্দেগী


নিঃসন্দেহে মুসলিমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো দ্বীনদারি, ইবাদাত, তাকওয়া, ঈমান, তাওয়াক্কুল ইত্যাদি। আল্লাহর নিকটই সবকিছু চাওয়া এবং তাঁর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমেই একজন মুসলিম সাহসী বীরের জন্ম হয়। সালাহউদ্দীন ছিলেন এমনই গুণে গুণান্বিত। তাঁর ঘনিষ্ট সহচর আল-কাযী বাহাউদ্দীন ইবনু শাদ্দাদ তাঁর সীরাত সালাহউদ্দীন গ্রন্থে বলেন:
“তাঁর (রাহিমাহুল্লাহ) ঈমান ছিলো উত্তম এবং তিনি আল্লাহর অনেক যিকির করতেন। বড় বড় আলিম ও কাযিদের সাহচর্যে থেকে তিনি এসব গুণাবলি অর্জন করেন। যেমন, শেইখ কুতুবুদ্দীন আন-নাইসাবুরি তাঁর জন্য ঈমান-আকাঈদ সংক্রান্ত অনেক বিষয় একত্র করে দেন। তিনি তাঁর সন্তানদেরকে শিশুকালেই পরম যত্ন নিয়ে এসব শিক্ষা দান করতেন ও মুখস্থ করাতেন। আমি তাঁকে তা শেখাতে দেখেছি এবং তাঁর সন্তানদেরকে দেখেছি তাঁর কাছে পড়া দিতে।

তিনি সঠিক ওয়াক্তে জামা'তের সাথে সালাত আদায় করতেন। তিনি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ও সুন্নাতে গায়রে মুয়াক্কাদা সালাতগুলোও নিয়মিত পড়তেন। কিয়ামুল লাইল করার জন্য শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠতেন, আর উঠতে না পারলে ফজরের আগে পড়ে নিতেন। মৃত্যুপূর্ব অসুস্থতার সময়ও তাঁকে আমি দাঁড়িয়ে সালাত পড়তে দেখেছি। জীবনের শেষ তিন দিনে অবচেতন হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সালাত ছাড়েননি। সফরের সময় সালাতের ওয়াক্ত হলে তিনি নেমে সালাত পড়ে নিতেন।

মৃত্যুর সময় তাঁর যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদও অবশিষ্ট ছিলো না। গরীব- দুখীদের জন্য তিনি দু হাত খুলে দান করেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ সাতচল্লিশ দিরহাম ও এক জুম (খেজুরের বিচি সমান ওজনের মুদ্রা)। তিনি ঘরবাড়ি, বাগান, গ্রাম, খামার বা অন্য আর কোনো ধরনের সম্পত্তি রেখে যাননি।

রামাদ্বানের কিছু সওম তাঁর অসুস্থতার কারণে ছুটে গিয়েছিলো। মৃত্যুর বছরে জেরুজালেমে থাকা অবস্থায় তিনি সেগুলোর কাযা শুরু করেন। ডাক্তার তাঁকে এর কারণে তিরস্কার করেছিলেন। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, 'আমি তো আমার তাকদির জানি না।' মনে হয় তিনি মৃত্যুর আগমন টের পাচ্ছিলেন।

তিনি নিজে কুর'আন তিলাওয়াত করতেন এবং শ্রেষ্ঠ কারিদের বেছে নিয়ে তাঁদের তিলাওয়াত শুনতেন। তাঁর অন্তর ছিলো নরম এবং প্রায়ই তিনি তিলাওয়াত করে বা শুনে কেঁদে দিতেন। তিনি রাসূলুল্লাহ'র (ﷺ) হাদীসও শুনতেন। একজন উচ্চশিক্ষিত শাইখের কথা শুনে তিনি তাঁকে নিমন্ত্রণ করিয়ে আনেন এবং তাঁর কাছ থেকে দ্বীন শিক্ষা করেন। অন্যদেরকেও তিনি এই দারসে আসার অনুমতি দেন।

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে তিনি অনেক সম্মান করতেন। তিনি দার্শনিক ও বাতিল ফির্কাগুলোকে ঘৃণা করতেন। রাজ্যে কোনো যিন্দিক-মুলহিদের খবর পেলে তিনি তাকে হত্যার আদেশ দিতেন।

তিনি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকারী বা তাওবাহকারী ছিলেন। মুসলিমদের পরাজয়ের খবর পেলে তিনি সিজদায় পড়ে দু'আ করতে শুরু করতেন, 'হে আল্লাহ! আমার দুনিয়াবি আসবাব শেষ হয়ে গেছে। তাই আমি আপনার দ্বীনকে বিজয়ী করতে ব্যর্থ হয়েছি। আপনার সাহায্য, আপনার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, আর আপনার রহমতের উপর ভরসা করা ছাড়া আর কিছুই বাকি নেই। আপনিই আমার জন্য যথেষ্ট, আর আপনি হলেন শ্রেষ্ঠ কর্মবিধায়ক।'

আল-কাযী বাহাউদ্দীন আরো বলেন,
“আমি তাঁর অশ্রু গড়িয়ে তাঁর দাড়িতে, তারপর মাদুরে পড়তে দেখেছি। এমনকি তাঁর কথাও আর বোঝা যাচ্ছিলো না।” একই দিনেই তাঁকে বলা হয়েছিল যে মুসলিম সৈনিকেরা জয়লাভ করেছে। এছাড়া তিনি জিহাদকে এত ভালোবাসতেন যে, এটি তাঁর পুরো হৃদয়-মন-প্রাণ জুড়ে থাকতো। তিনি জুমু'আর দিনে যুদ্ধ করতেন যাতে হাদীসে বর্ণিত দু'আ কবুলের সেই স্বল্পস্থায়ী বিশেষ মুহূর্তে করা দু'আর সুযোগ নিয়ে তিনি জয়লাভ করতে পারেন।”

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 ন্যায়বিচার ও দয়া

📄 ন্যায়বিচার ও দয়া


আল-কাযী বাহাউদ্দীন বলেন:
“তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, দয়ালু ও গরীবের বন্ধু। কাযি, বিচারক ও আলিমদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কাউন্সিলে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার তিনি সমাজের সবরকম মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনতেন। যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-গরীব সবার। ঘরে থাকুন বা সফরে, এই কাজ থেকে তাঁর মুক্তি ছিলো না। তিনি বাদীর অভিযোগ শুনে যত্ন নিয়ে তা সমাধা করতেন।"

তিনি আদালতে নিঃসংকোচে-নিরহংকারে তাঁর প্রতিপক্ষের সাথে পাশাপাশি দাঁড়াতেন, যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। 'উমার আল-খাল্লাতি নামে এক ব্যবসায়ী ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে তার দাস সুন্ধুর ও তার সম্পদ অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনে। বিচারক ইবনু শাদ্দাদের সামনে সে তার সাক্ষী নিয়ে আসে। সালালহউদ্দীন শান্ত থাকেন। তিনিও তাঁর সাক্ষী নিয়ে আসেন। উভয়পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। শেষে দেখা গেলো যে ব্যবসায়ী সালাহউদ্দীনের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছিলো। কিন্তু মামলা জেতার পর সালাহউদ্দীন সেই ব্যবসায়ীকে কিছু মাল-সম্পদ উপহারস্বরূপ দিয়ে তাঁর দয়াশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

তিনি প্রজাদের অনেক যত্ন নিতেন এবং তাদের উপর চাপানো কিছু কর ও দায়িত্ব মওকুফ করে দেন। ইবনু জুবাইর উল্লেখ করেন যে, প্রজাদের জন্য সালাহউদ্দীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর মধ্যে আছে বিক্রয় কর মওকুফ করা এবং নীলনদ থেকে পানি পানের উপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা।

মক্কা-মদীনার পুনঃনির্মাণ ও সেখানকার লোকেদের সাহায্য করার জন্য হিজাযগামী হাজ্জযাত্রীদের প্রত্যেকের উপর সাড়ে সাত দিরহাম কর আরোপ করা ছিলো। ফাতিমিরা এই কর আদায় করতে অনেক কঠোরতা অবলম্বন করতেন। যারা তা পরিশোধে ব্যর্থ হতো তারা চরম শাস্তি পেতো। সালাহউদ্দীন গরীব হাজীদের উপর থেকে এই কর প্রত্যাহার করে নেন এবং হিজাযবাসীদেরকে এর সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে দেন। এভাবেই সালাহউদ্দীনের ন্যায়পরায়ণ শাসনাধীনে হাজীগণ অনেক কষ্ট থেকে রক্ষা পান。

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সাহস ও অবিচলতা

📄 সাহস ও অবিচলতা


শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলে সালাহউদ্দীনের নজিরবিহীন সাহসিকতার কথা স্বীকার করতো। তিনি সেসব রাজা-বাদশাহ'র মতো ছিলেন না যাদের কাজ ছিলো সৈন্যদেরকে যুদ্ধ করার হুকুম দিয়ে নিজে দূর্গের ভেতর সুরক্ষিত থাকা। বরং তিনি সৈনিকদের সাথে প্রথম কাতারে থেকে সকল বিপদ-আপদ মোকাবেলায় অভ্যস্ত ছিলেন।

৫৮৪ হিজরিতে কাওকাব দূর্গ দখলের ঘটনায় তাঁর সাহসিকতার একটি প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর ভাই আল-মালিক আল-'আদিলের নেতৃত্বাধীনে থাকা মিশরীয় সৈন্যদের জন্য তিনি ছুটি মঞ্জুর করেন। তিনি আস্কালন পর্যন্ত গিয়ে তাদেরকে বিদায় জানান। তাঁর পরিকল্পনা ছিলো এর পরে অ্যাকর পর্যন্ত উপকূলীয় শহরগুলো তদারক করা। তাঁর সহচররা এই পরিকল্পনার সাথে দ্বিমত করেন। কারণ মিশরীয় সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর তাঁর দেহরক্ষীর সংখ্যা স্বভাবতই কমে যায়। টায়ারে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক ক্রুসেডাররা আক্রমণ করে বসলে সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। ইবনু শাদ্দাদ ও অন্যান্যরা তাই তাঁকে সেদিকে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি শত্রুদের অগ্রাহ্য করে মিশরীয় সৈন্যদের ছাড়াই অ্যাকরের দিকে যাত্রা করেন।

তখন ছিলো শীতকাল আর সাগর ছিলো উত্তাল। সাগরের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ইবনু শাদ্দাদকে সালাহউদ্দীন বলেন, “আল্লাহ যদি আমাকে উপকূলের বাকি অংশগুলো জয় করার তাওফিক দেন, তাহলে আমি শহরগুলো (আমার ছেলেদের মাঝে) ভাগ-বাটোয়ারা করে দেবো। তারপর আমার উইল লিখে আপনার হাতে দিয়ে জাহাজে করে ক্রুসেডারদের দ্বীপগুলোতে চলে যাবো, যাতে কুফফারদের সব দলগুলোকে পরাস্ত করতে পারি অথবা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে যেতে পারি।”

বিপদ-আপদের মোকাবেলায় তিনি ছিলেন শান্ত, সুস্থির ও অবিচল প্রত্যয়ী। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ বর্ণনা করেন:
“ক্রুসেডারদের অ্যাকর অবরোধের সময় এক রাতেই ক্রুসেডারদের সত্তরটি জাহাজ অ্যাকরে পৌঁছায়। তিনি ‘আসরের পর থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেগুলো গুনলেন। কিন্তু তাঁকে ভীত দেখায়নি, বরং তিনি আরো সাহস অনুভব করেন। আমি কখনো শত্রুর সংখ্যা বা শক্তির কারণে তাদেরকে ভয় পেতে দেখিনি।”

অ্যাকরে ক্রুসেডারদের সাথে একটি যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজিত হয় এবং তাদের মানের অবনতি দেখা যায়। কিন্তু সালাহউদ্দীন অবিচল থেকে সৈনিকদের একটি ছোট দল সহ পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে তাদেরকে আবার যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করতে থাকেন। এভাবে শেষ পর্যন্ত তিনি বিজয় অর্জন করে ছাড়েন।

আরেক ঝড়-বাদলের দিনে অ্যাকরে অবস্থানকালে তাঁর উপর তাঁবু ভেঙে পড়ে। এতে তিনি মারাও যেতে পারতেন। এ ঘটনায় তাঁর জিহাদের ক্ষুধা বরং বেড়ে যায়। এ থেকেই তাঁর জীবনীশক্তি, আল্লাহর উপর আস্থা ও সাহসিকতার প্রমাণ মেলে।

আল-কাযী বাহাউদ্দীন তাঁর জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ'র আগ্রহের বর্ণনায় বলেন:
“তিনি জিহাদকে এতই ভালোবাসতেন যে, এটি তাঁর মন, মুখ ও হাত জুড়ে থাকতো। সৈন্য, গোলাবারুদ আর জিহাদপ্রেমীদের নিয়েই ছিলো তাঁর দিনকাল। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার জন্য তিনি তাঁর পরিবার ও স্বদেশ থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকেন। ঝড়-ঝঞ্ঝায় পতনশীল তাঁবুর নিচে বাস করেই তিনি ছিলেন সন্তুষ্ট। অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি বেশ কয়েকবার সৈনিকদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে শত্রুর মুখোমুখি হন।”

ইবনু শাদ্দাদের এহেন বিস্ময়ভাব দেখে সালাহউদ্দীন তাঁকে বলেছিলেন,
“লড়াই শুরু করলেই আমার অসুস্থতা কেটে যায়।”

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সমঝোতা ও ক্ষমাপরায়ণতা

📄 সমঝোতা ও ক্ষমাপরায়ণতা


ইবনু শাদ্দাদের বর্ণিত আরেকটি ঘটনা থেকে সালাহউদ্দীনের ধৈর্য ও অল্পে তুষ্টির কথা জানা যায়। সালাহউদ্দীনের এক ছেলের নাম ছিলো ইসমা'ঈল। তাঁকে ইসমা'ঈলের মৃত্যুর সংবাদ দিলে তিনি ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরেন এবং আল্লাহর নিকট এই কুরবানির প্রতিদানের আশা রাখেন। শুধু তাঁর চোখ দুটি অশ্রুতে ভিজে যায়। ইবনু শাদ্দাদ বলেন, “হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে ধৈর্য ও কুরবানির পথ দেখিয়েছেন। তাঁকে এর প্রতিদানও দিন, ইয়া রাহমান!”

সালাহউদ্দীনের উল্লেখযোগ্য গুণ হলো তাঁর ক্ষমাশীলতা ও ঝামেলা মিটমাট করে ফেলার ক্ষমতা। তিনি অসদাচরণের জবাব দিতেন সদাচরণের মাধ্যমে আর কর্কশ স্বভাবের জবাব দিতেন ধৈর্যের মাধ্যমে। ইবনু শাদ্দাদ বর্ণনা করেন যে, আদালতে মানুষ এত ভিড় করতো যে সালাহউদ্দীনের কাপড়ের ঝুলে মানুষ পাড়া দিয়ে দিতো। অথবা তিনি যে মাদুরে দাঁড়াতেন, সেখানে উঠে আসতো। কিন্তু তিনি এতে কিছু মনে করতেন না। অনেক মামলার বাদী তাঁর সাথে রূঢ়ভাবে কথা বলতো, কিন্তু তিনি তাদের কথা মেনে নিতেন।

এক বৃষ্টির দিনে ইবনু শাদ্দাদ খচ্চরের পিঠে চড়ে সালাহউদ্দীনের পাশ দিয়ে গেলেন। ঠিক এই সময় খচ্চরটি গা ঝাড়া দিলো। ফলে কাদার ছিটা গিয়ে সালাহউদ্দীনের কাপড়ে লাগলো। কিন্তু সালাহউদ্দীন ইবনু শাদ্দাদকে বিব্রত হতে না দিয়ে হাসি দিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করলেন।

সালাহউদ্দীনের ক্ষমাপরায়ণতার আরেকটি ঘটনার চাক্ষুস সাক্ষী হন ইবনু শাদ্দাদ। ইয়াফফা নিয়ে যখন সালাহউদ্দীন আর রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্টের মধ্যে ঝামেলা চলছিলো, তখন কিছু সৈনিক সালাহউদ্দীনের নির্দেশ অমান্য করে তাঁর সাথে খারাপ আচরণ করে। তিনি রাগ করে চলে গেলেন। অন্য সৈনিকেরা তাঁর রাগ দেখে ভাবলো তিনি হয়তো ওইসব সৈনিককে তাদের আচরণের কারণে হত্যাই করে ফেলেছেন। সালাহউদ্দীন হেডকোয়ার্টারে গিয়ে সভাসদদের সাথে কথা বলার সময় সবাই এতই ভয় পাচ্ছিলেন যে, মনে হতে থাকলো তিনি তাঁদের উপরও রেগে আছেন। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর ইবনু শাদ্দাদও বলেছেন, “আমার ভয় হচ্ছিলো যে তিনি আমাকে না আবার ডাক দিয়ে বসেন।” কিন্তু তিনি সালাহউদ্দীনের কক্ষে যাওয়ার পর তাঁকে শান্ত অবস্থায় দেখতে পান। তিনি ইবনু শাদ্দাদকে বলেন সভাসদদেরকে ডাকিয়ে আনতে। দামেস্ক থেকে কিছু ফল এসেছে, তা সবাই মিলে খাওয়ার জন্য ডাকতে বললেন সবাইকে। সভাসদরা ভয়ে ভয়ে প্রবেশ করে সালাহউদ্দীনকে হাসিখুশি পেলেন। কিছুই যেন হয়নি এমন বোধ নিয়ে তাঁরা আবার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

ইতিহাসবিদরা আরো বর্ণনা করেছেন যে, একবার সালাহউদ্দীন ক্লান্ত থাকা অবস্থায় এক লোক তাঁর কাছে অভিযোগ নিয়ে আসে। তিনি বলেন যে তিনি ক্লান্ত আছেন, পরে দেখে দিবেন। কিন্তু লোকটি অপেক্ষা করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সেখানেই অভিযোগটি পড়ে শোনায়। সালাহউদ্দীন তা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। লোকটির পড়া শেষ হলে তিনি বলেন যে অভিযোগপত্রটি স্বাক্ষর করার জন্য তাঁর কাছে কালির দোয়াত নেই। লোকটি গিয়ে কালি এনে দেয়। সালাহউদ্দীন একটুও না রেগে নীরবে অভিযোগপত্রটি সই করে দেন।

তিনি শুধু নিজের প্রজা, অনুসারী আর সৈনিকদের প্রতিই ক্ষমাশীল ছিলেন, তা নয়। শত্রুদের সাথেও তিনি ক্ষমাশীল আচরণ করতেন। সপ্তম অধ্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

টিকাঃ
[৬৬] আন-নাওাদির আস-সুলতানিয়াহ, পৃষ্ঠা ৫০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00