📄 শুধুই আরবদের ব্যাপার?
হাত্তিনের বিজয়ের একটি কারণ হলো ফিলিস্তিনের সংকটকে পুরো মুলসিম উম্মাহর সংকট হিসেবে দাঁড় করানো। অপরদিকে আজকের পরাজয়ের কারণ হলো ফিলিস্তিন সংকটকে শুধুই আরবদের জাতীয় সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা। প্রচারমাধ্যমে খালি আরব জাতীয়তাবাদের কথাই বলা হয়। আর বলা হয় যে, ইয়াহুদীদেরকে হটিয়ে ফিলিস্তিন মুক্ত করা কেবলই আরবদের দায়িত্ব।
এ কথার মাধ্যমে কি বিশ্বের ছয়শ মিলিয়ন মুসলিমকে অবজ্ঞা করা হলো না? অনারব মুসলিমরা কি মাসজিদুল আকসাকে তৃতীয় পবিত্রতম মাসজিদ বলে বিশ্বাস করে না? প্রথম কিবলাহ হিসেবে বিশ্বাস করে না? মি'রাজের স্থান হিসেবে বিশ্বাস করে না? শুধু এসবই না, তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করাকে সর্বশ্রেষ্ঠ লক্ষ্য বলেও বিশ্বাস করে।
জাতীয়তাবাদ আর আরবীয়বাদের নামে ইয়াহুদীদের সাথে লড়াই করার অর্থ হলো ইসলাম, মুসলিম ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা। ইসলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, কারণ ইসলামের নামে যুদ্ধ করার বদলে আরব জাতীয়তাবাদের নামে যুদ্ধ করা হচ্ছে। মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, কারণ ইসলামী ভ্রাতৃত্বকে আরব ভ্রাতৃত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হচ্ছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"মু'মিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই।”
"নিশ্চয় তোমাদের এই উম্মাহ একই উম্মাহ।”
এই দুই আয়াত মুসলিমদের মধ্যকার সত্যিকার বন্ধনের কথা বলে। আর তা হলো ইসলামের বন্ধন। রক্ত, জাতি, বর্ণ, ভাষা বা ইতিহাসের বন্ধনের চেয়ে এই বন্ধনকেই ইসলাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। মুসলিমদের ইতিহাসে কখনো এই বন্ধনের সাথে এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়নি, যা আমরা আজ করে চলেছি। মুসলিমদের শত্রুদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে কখনো এভাবে ইসলামী ভ্রাতৃত্বকে অস্বীকার করা হয়নি।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, কারণ আরব জাতীয়তাবাদের আহ্বানকারীরা অনারব মুসলিমদেরকে এই কাজে শরিক হওয়া থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে। তারা এই সংকটে অনারব মুসলিমদেরকে নাক গলাতে নিষেধ করে তাদের উপর যুলুম করেছে। এরকম ভেদাভেদ উস্কে দেওয়া আচরণ দেখার পর কি কখনো অনারব মুসলিমরা এই পবিত্র ভূমি মুক্ত করার কাজে শরিক হওয়ার আগ্রহ পাবে?
মুসলিমরা ইসলাম, ঈমান ও কুর'আন ছাড়া অন্য কোনো বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, এরকম নজির সারা ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
কবি সত্যই বলেছেন:
এক আহ্বানকারী ডাক দিয়ে দিয়ে বলছে হতে চায় সে তার বাপ-দাদার বংশের সেরা,
তারা পড়ে আছে কাইস আর তামিম নিয়ে
কিন্তু জেনো, আমার কোনো বাপ নেই ইসলাম ছাড়া।
আল-ঈমান তারিকুনা ইলান নাসর (ঈমান আমাদের বিজয়ের পথ) গ্রন্থে শেইখ মুহাম্মাদ নিমর আল-খতিব বলেন:
"আরব নেতারা অনেক দিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে ফিলিস্তিন সংকটকে শুধুই আরবদের নিজেদের ব্যাপার বলে প্রতিষ্ঠা করার। আমি জানি না এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে। আমি বুঝতে পারছি না তারা কেন সাতশ মিলিয়ন মুসলিমদেরকে গোনার মধ্যেই ধরছে না। অথচ এসকল মুসলিম ধনী ধনী দেশে বাস করে, তারা সোনা-রূপার মালিক। সব জাতিই চেষ্টা করে অন্য জাতির সাথে বন্ধুত্ব করার, অথচ আরব নেতারা করছে তার উল্টোটা। আমার মনে হচ্ছে তারা আরব বিশ্বে বসবাসরত খ্রিষ্টানদের খুশি করতে চাইছে। ‘যিশুর জন্মস্থান আর পুনরুত্থানের গীর্জা' যেই ফিলিস্তিনে অবস্থিত, সেখানে অবস্থানরত আমাদের ভাইদেরকে আমরা বাঁচাবো – এতে খ্রিষ্টানদের বিরক্ত হওয়ার কী আছে? পবিত্র ভূমিকে মুক্ত করার জন্য অনারব মুসলিমরা আমাদের সাথে যোগ দিলে তাদের কী সমস্যা?"
ইসলাম ও আরব জাতীয়তাবাদের এই দ্বন্দ্বের কারণ হলো বর্তমান বিশ্ব এখন আর ধর্মের নামে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধের ডাক দেওয়াকে ভালো মনে করে না। তার উপর ফিলিস্তিন সংকটকে যদি আমরা ইসলামী উপায়ে সমাধান করতে চাই, তাহলে তারা আমাদেরকে পশ্চাৎপদ, মধ্যযুগীয় ও প্রতিক্রিয়াশীল বলে কটাক্ষ করবে। তারা কি ভুলে গেছে যে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ইয়াহুদীবাদের ভিত্তিতে? দেশে-বিদেশে তাদের প্রোপাগান্ডাও ইয়াহুদীবাদের নামেই হয়ে থাকে।
ইয়াহুদী উইজম্যান তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন:
“আমি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোরের সাথে দেখা করলাম। তিনি সেখানেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি উগান্ডায় আপনার নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে রাজি হলেন না কেন?' আমি উত্তর দিয়েছিলাম, 'জায়নিজম যদিও একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন, কিন্তু আমরা এর আধ্যাত্মিক দিকটা অস্বীকার করতে পারি না। আমি নিশ্চিত যে আমরা যদি ধর্মীয় দিকটিকে অবজ্ঞা করি, তাহলে আমরা আমাদের জাতীয় ও রাজনৈতিক স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হবো।”
১৮৯৭ সালে অনুষ্ঠিত বাসেল কনফারেন্সে। ইয়াহুদী হার্যল বলেন, “জায়নিজমে ফিরে যাওয়ার আগে ইয়াহুদীবাদের দিকে ফিরে যেতে হবে।”
প্রেসিডেন্ট দ্য গলকে লেখা এক চিঠিতে বেন গুইরন লেখেন,
“ব্যাবিলনিয়ান আর রোমানদের হাতে দুটি পরাজয় আর খ্রিষ্টানদের পক্ষ থেকে হাজার বছরের ঘৃণার পরও যে কারণে আমরা টিকে আছি, তা হলো পবিত্র গ্রন্থের উপর আমাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস।”
ইয়াহুদী নেতারা নিয়ম করেছে যে প্রাপ্তবয়স্ক সকল ইয়াহুদীকে এই শপথ নিতে হবে, “হে ইসরায়েল! এই আমার শপথ। আমি কসম করছি যে আমি ঈশ্বরের প্রতি, তোরাহ'র (তাওরাত) প্রতি, ইয়াহুদী জনগণের প্রতি ও ইয়াহুদী রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবো।”
কনফারেন্স ফর ইন্টারন্যাশনাল জায়নিজম এর ২৫ তম অধিবেশনে (২৫ ডিসেম্বর, ১৯৬০) বেন গুইরন ঘোষণা করেন, “প্রত্যেক ইয়াহুদীর উচিত ইসরায়েলে হিজরত করা। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়ে যেসব ইয়াহুদী এই রাষ্ট্রের বাইরে বসবাস করছে, তারা তাওরাতের শিক্ষার বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন করছে এবং প্রতিটি দিন ইয়াহুদী ধর্মের উপর কুফরি করে চলেছে।”
ইয়াহুদীদের মধ্যে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের চর্চার ফলাফল হলো
* রাষ্ট্রের নাম ইসরায়েল রাখা
* শনিবারে কাজকর্মকারীদেরকে পাথর মেরে হত্যা করা
* সিভিল বিয়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকা
* নন-কোশার খাবার তৈরিকারী রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া
* প্রতিটি ইয়াহুদীকে বাধ্যতামূলকভাবে তাওরাত থেকে নিজের জন্য একটি নাম নির্ধারণ করার আদেশ করা
কিছুদিন পরই ইসরায়েলের গ্রান্ড রাবি নেসীম তালমুদকে ইসরায়েলের সংবিধান বানাতে চান। এর আগে এই রাষ্ট্রের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী তোরাহকে ইসরায়েলের সংবিধান বানাতে চেয়েছিলেন। এমনকি এও জানা গেছে যে বিশাল একটা অংশ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গোল্ডা মায়ারকে ভোট দেয়নি কারণ ইয়াহুদী ধর্মে নারীদেরকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা নিষেধ।
আমাদের শত্রুরা তাদের মিথ্যা ধর্মের ডাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে বসে আছে। এমতাবস্থায় আমাদের কি উচিত আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামের অনুসারী হয়েও এর নামে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ও যুদ্ধ করার ব্যাপারে লজ্জিত হওয়া? ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে আগ্রহী লোকেরাও বিষয়টিকে আরবদের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে আর ছয়শ মিলিয়ন অনারব মুসলিমদেরকে বাদ করে দিচ্ছে। আরব জাতীয়তাবাদের নামে যুদ্ধ করা মুসলিমদের পক্ষে কি সম্ভব ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করা?
এই হলো অতীতের ফিলিস্তিন আর বর্তমানের ফিলিস্তিনের মধ্যকার এক সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক পর্যালোচনা। প্রতিশ্রুত বিজয় অর্জন করে নজির স্থাপন করতে ইচ্ছুকদের মধ্যে যাদের চোখ খোলা, তাদের উচিত পবিত্র ভূমিকে মুক্ত করার শ্রেষ্ঠতম পদ্ধতিটি বেছে নেওয়া। নাজাত ও ইজ্জতের একমাত্র পথ ইসলাম।
“আল্লাহ তাঁর কাজের ব্যাপারে পূর্ণ কর্তৃত্বশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই (তা) জানে না।”
টিকাঃ
[৫৮] সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১০
[৫৯] সূরাহ আল-আম্বিয়া ২১:৯২
[৬০] কাইস আর তামিম প্রাক-ইসলামিক যুগে আরবের বিখ্যাত দু'টি গোত্রের নাম।
[৬১] শাইখ আবদুল্লাহ নাসির উলওয়ানের এই বইটি প্রথম ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। কিন্তু ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারী Pew Research Institute এর তথ্যমতে বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১.৮ বিলিয়ন।- সম্পাদক
[৬২] জায়োনিস্ট অর্গানাইজেশনের এটাই ছিলো প্রথম সম্মেলন যা ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয়।- সম্পাদক
[৬৩] পুরো নাম ড্যাভিড বেন গুরিয়ন। জন্ম রাশিয়ায়। তিনি ইহুদীবাদী ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি 'বিশ্ব ইহুদীবাদী সংস্থা'র প্রধান নির্বাচিত হন- সম্পাদক
[৬৪] কোশার আইন দ্বারা ইহুদিরা খাবার দাবারের উপর কিছু নিয়ম-নীতি তৈরি করে। এসব নিয়মের বাইরের কোন খাবার তারা অনুমোদন না দিতে বলে। এমনকি যারা তাদের এই নিয়ম মানে না তাদের রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলে। বিস্তারিত জানতে http://www.koshercertification.org.uk - সম্পাদক
[৬৫] সূরাহ ইউসুফ ১২:২১