📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 মতানৈক্য ও ঝগড়া-বিবাদ

📄 মতানৈক্য ও ঝগড়া-বিবাদ


হাত্তিনের বিজয়ের একটি কারণ ছিলো এক নেতৃত্বের অধীনে মুসলিমদের রাজনৈতিক ঐক্য। আর আজকের পরাজয়ের কারণ হলো মতানৈক্য ও ঝগড়াঝাটি। মুসলিম শাসকদের মাঝে প্রচুর দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ, পাল্টাপাল্টি দোষারোপের ঘটনা ঘটেছে। জনসাধারণও এসব প্রত্যক্ষ করেছে। শাসকরা একে অপরের বিরুদ্ধে চর নিয়োগ করে, ষড়যন্ত্র করে। আর শত্রুরা নিজেদেরকে আধ্যাত্মিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত করতে করতে এসব ঝগড়া-বিবাদ দেখে মুখ টিপে হাসে। তারা সারা বিশ্বের ইয়াহুদীদেরকে ইসরায়েলে গিয়ে জড়ো হতে বলে। নীল থেকে ফুরাত পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা দিনরাত কাজ করে চলে।

ইসলামকে ছেড়ে দেওয়ার কারণেই আরব শাসকদের মাঝে আজ এসকল মতানৈক্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা পূর্ব-পশ্চিম সবখান থেকে এনে স্তূপ করা নীতি-নৈতিকতার এক অদ্ভূত সমষ্টির অনুসরণ করে। জনগণ তাই তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কর্মপদ্ধতিগত ও আদর্শগত – উভয় রকমের মতভেদই বিদ্যমান। কেউ ওয়াশিংটনকে মানে, তো কেউ লন্ডনকে। কেউ মস্কোকে মানে, তো কেউ বেইজিংকে। একদলকে বলা হয় ডানপন্থী, আরেকদলকে বলা হয় বামপন্থী। কেউ প্রগতিশীল, তো কেউ রক্ষণশীল। আরবের মুসলিম উম্মাহ আজ কত নামে, কত রাষ্ট্রে, কত শহরে, কত দলে যে বিভক্ত! ইসলামকে যারা অনুসরণই করে না, তাদেরকে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করা কীভাবে সম্ভব? আল্লাহ বলেন:

"আল্লাহ তাকে অবশ্যই সাহায্য করেন, যে তাঁকে সাহায্য করে। আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রান্ত।”
"যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদক্ষেপ দৃঢ় রাখবেন।”

"আর নিশ্চয় এটিই আমার সরল পথ, অতএব এরই অনুসরণ কর। আর বিভিন্ন পথের অনুসরণ কোরো না, কারণ সেগুলো তোমাকে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।”

"আর (নিজেদের মাঝে) ঝগড়া-বিবাদ কোরো না। তাহলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি খর্ব হয়ে যাবে।”

আমাদের আজকের অবস্থায় কি তাহলে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব?

টিকাঃ
[৪৬] সূরাহ আল-হাজ্জ ২২:৪০
[৪৭] সূরাহ মুহাম্মাদ ৪৭:৭
[৪৮] সূরাহ আল-আন'আম ৬:৫৩
[৪৯] সূরাহ আল-আনফাল ৮:৪৫

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 দুনিয়ার মোহ আর ‘আমলে ঘাটতি

📄 দুনিয়ার মোহ আর ‘আমলে ঘাটতি


সালাহউদ্দীন হাত্তিনে জয়লাভ করেছিলেন পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ এবং জেরুসালেমের মুক্তি নিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তা ফিকির থাকার কারণে। আর আজকে ইয়াহুদীদের সাথে আমরা পরাজিত হচ্ছি কারণ কেবল হুমকি-ধমকি আর কথার ফুলঝুরি দিয়েই আমরা ফিলিস্তিন উদ্ধার করে ফেলতে চাই। ফিলিস্তিন ইশ্য যখন থেকে তৈরি হয়েছে তখন থেকেই জনগণের আবেগ উথলে তোলার জন্য প্রচুর বক্তৃতা-সমাবেশ করা হয়েছে। জনগণ সরলমনে হাত তালি দিয়ে তাদের কথা বিশ্বাস করে নেয়। কিন্তু পরে আর কোনো গঠনমূলক ও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে ওঠে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা করো না তা বলো কেন? যা করা হয় না, তা বলা আল্লাহর নিকট খুবই গুরুতর অপরাধ।”

কবি বলেন;
লায়লার সাথে নাকি তার প্রেম এমনটাই সবাই বলে
অথচ লায়লা নিজেই তো তাকে সদা এড়িয়ে চলে।

ফিলিস্তিন সমস্যা দিন দিন বাড়ছেই। আজ এটা সমাধান হয় তো কাল আরেক সমস্যা মাথাচাড়া দেয়। এদিকে ইসরায়েল দিনকে দিন শক্তি-সামর্থ্য বাড়িয়ে চলেছে। মুসলিম উম্মাহ কাঁধে দায়িত্ব তুলে নেওয়ার মতো সাহসই হারিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ হঠাৎ সমঝোতার কথা শোনা যায়। রজার'স প্রজেক্ট, অমুক সম্মেলন, তমুক সম্মেলন আরো কত কী! উদাহরণস্বরূপ, কিছু আরব রাষ্ট্র একসাথে কিছু পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। ফিলিস্তিনি ফিদায়িনদের নির্মূল করার মতো বিভিন্ন ইশ্য সামনে এনে মূল সমস্যাকে একপাশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ আখেরে ইসরায়েলী আগ্রাসনের পক্ষেই সুফল বয়ে আনবে।

ইসরায়েলের জন্মলগ্ন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত বেশিরভাগ আরব শাসকই ফিলিস্তিন সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে গেছে এবং এর জন্য যথাযথ কুরবানি করেনি। যদি সত্যিই তাদের এ ব্যাপারে অগ্রহ থাকতো, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্য গলের মতো করে সব বেশ্যালয়, ড্যান্স হল আর মদের বারগুলো বন্ধ করে দিতো। টেলিভিশনে অশ্লীল নাটক-সিনেমা ও গান-বাজনার প্রচার নিষিদ্ধ করতো। পাশাপাশি যুবসমাজকে সবরকম নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে সচেতন করে তুলতো। আমোদ-ফূর্তিতে ডুবে থাকা মুসলিম উম্মাহ আজ ভুলে গেছে আল আকসার সম্মানে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে। এই পৌরুষহীন জাতি কী করে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য আশা করে!

টিকাঃ
[৫০] সূরাহ আস-সফ ৬১:১-২
[৫১] ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল এবং মিশরের মধ্যকার যুদ্ধের অবসান লক্ষ্যে আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী William P. Rogers ১৯৬৯ সালে একটি প্রস্তাব পেশ করেন যা 'রজার'স প্রজেক্ট' নামে পরিচিত। তার এই প্রস্তাবনা ব্যর্থ হলে তিনি ১৯৭০ সালে আরো একটি প্রস্তাব পেশ কররেছিলেন। - সম্পাদক
[৫২] ফিলিস্তিনি ফিদায়িন ইসরায়েল বিরোধী একটি গেরিলা সংগঠন। মূলত জাতীয়তাবাদী আদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিলো ইসরায়েলি জায়োনিজমের মূলোৎপাটন করা এবং সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।- সম্পাদক

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 ভুল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

📄 ভুল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য


হা‌ত্তিনের যুদ্ধে মুসলিমদের জয়ের কারণ ছিলো আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করার নিয়্যাতে লড়াই করা। আর আজকের পরাজয়ের কারণ হলো দলীয় চেতনা, খা‌হেশাত, পশ্চিমা আদর্শ, আর অনৈসলামী ভাবধারার বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে নামা। কিছু শাসক যুদ্ধের আহ্বান করে বক্তৃতা দিয়েছে, অথচ আল্লাহ বা ইসলামের নামটা পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি। কেবল অজ্ঞতা আর ফাঁকা জযবার মাধ্যমে জনগণকে উত্তেজিত করতে চেয়েছে।

১৯৪৮-এ যুদ্ধের আহ্বান করা হয় জাতীয়তাবাদের নামে।
১৯৫৬-তে যুদ্ধের আহ্বান করা হয় জাতীয়তাবাদের নামে।
১৯৬৭-তে যুদ্ধের আহ্বান করা হয় বিপ্লবী চেতনার নামে।
১৯৭৩-এ যুদ্ধের আহ্বান করা হয় আরবদের মান-মর্যাদার নামে।

মুশরিকদের কাল্পনিক উপাস্যগুলোর মতো এসব চেতনাও মানুষের মনগড়া।
আল্লাহ বলেন:
এগুলো তো কেবল কতগুলো নাম, যা তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষেরা রেখেছো। এর পক্ষে আল্লাহ কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। তারা তো শুধু অনুমান আর প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে, যদিও তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে পথনির্দেশ এসেছে।

এছাড়াও আজকাল তো নাস্তিকীয় স্লোগান তুলে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এদের আসল উদ্দেশ্য হলো মুসলিমদেরকে তাদের মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া। সেইসাথে কিছু লেখককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে আল্লাহ, ইসলাম ও নবী-রাসূল নিয়ে সংশয় তৈরি করার জন্য। উদাহরণস্বরূপ, এক জ্ঞানপাপী দালাল নাদিম আল-বিতার তার মিনান নাকসাহ ইলাস সাওরাহ (স্থবিরতা থেকে বিপ্লবের দিকে) নামক বইয়ে লিখেছে:
“দুনিয়া নাজাত পাবে বিপ্লবীদের মাধ্যমে। তাদেরকে ছাড়া আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাবে। বিপ্লবীরাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ আর আল্লাহর দায়িত্ব গ্রহণকারী। কারণ আমি নিশ্চিত হয়ে গেছি যে আল্লাহ এখন আর নেই। আমাদেরকে বরং তাঁকে সৃষ্টি করে নিতে হবে।”

আল্লাহ, তাঁর হুকুম-আহকাম ও নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করে বুঝি বিজয় আসবে? নাকি এর মাধ্যমে এক স্থবিরতা থেকে আরেক স্থবিরতার দিকেই যাওয়া হবে কেবল?
এদের থেকে কী-ই বা আশা করা যায়?
আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী এরাই কি ভবিষ্যতের ফিদায়ীন?
ফিলিস্তিন সেই নাস্তিক বিদ্রোহীদের হাতে মুক্ত হবে না! আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি কুফরিকারীদের হাতে ফিলিস্তিন কখনো মুক্তি লাভ করতে পারে না!
মদ-মাদকের পথ অনুসরণকারীদের হাতে ফিলিস্তিন মুক্ত হবে না।

ড. ইউসুফ আল-কারাযাবী বলেন, “যেসব সত্যিকারের মু'মিন রুকু-সেজদা করে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে, আল্লাহর হুকুমসমূহ তামিল করে, আর বিশুদ্ধ অন্তর ও শরীর নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে, তাদেরকে ছাড়া অন্য কারো হাতেই ইসরায়েলের পতন ও ফিলিস্তিনের মুক্তি আসবে না। যখন আহ্বান করা হয়, 'হে জান্নাতি বায়ু! আমাদের দিকে এসো। হে আল্লাহর সাহায্য! দ্রুত এসো। হে কুর'আনওয়ালারা! কুর'আনের শিক্ষা বাস্তবায়ন কর।' তখন এরাই হবে আসল সৈনিক যাদেরকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না এবং কেউ তাদের সামনে টিকতে পারবে না। এরা বস্তুবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, সংখ্যার ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে, শত্রুদের সংখ্যাকে পরোয়া করে না, বরং তাদের নিজেদের কাছে যা আছে তাতে আস্থা রাখে। পৃথিবী ছাড়িয়ে তাদের দিগন্ত গায়েবি জগতের আসমান ও শাহাদাতের দুয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা বিশ্বাস করে মানুষ যদি সাহায্যের হাত গুটিয়েও নেয়, আল্লাহই সাহায্য করবেন।

“এবং ওয়ালী (অভিভাবক) হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং সাহায্যকারী হিসেবেও আল্লাহই যথেষ্ট।”
আর আল্লাহর সৈনিকেরা তাদের সাথে আছে।
“তোমার রব্বের বাহিনীকে তিনি ছাড়া কেউই চেনে না।”

এরাই ইয়াহুদীদের হাত থেকে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করবে। তাদের একমাত্র লক্ষ্য আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করা। তাদের পরিচয় হলো ইসলাম, আল্লাহর ইবাদাতের চিহ্ন দেখে এদের চেনা যায় আর এদের স্লোগান হলো 'আল্লাহু আকবার!' রাসূল ﷺ এসব যোদ্ধাদের ব্যাপারে বলেন,
কিয়ামাতের পূর্বে মুসলিমরা ইয়াহুদীদের সাথে লড়াই করবে। তারা (মুসলিমরা) এমনভাবে জয়লাভ করবে যে তারা (ইয়াহুদীরা) গাছ ও পাথরের আড়ালে লুকাবে। পাথর আর গাছেরা কথা বলে উঠবে, 'হে মুসলিম! হে আল্লাহর বান্দা! আমার পেছনে এক ইয়াহুদী লুকিয়ে আছে। এসো একে হত্যা কর।'

সেসব মুসলিমকে জর্ডানিয়ান, সিরিয়ান, ফিলিস্তিনি বা এমনকি আরব বলেও ডাকা হবে না। কারণ তারা সেসব পরিচয় ছুঁড়ে ফেলে এক 'মুসলিম' পরিচয়কে গ্রহণ করেছে। যাদের উদ্দেশ্যে গাছ-পাথর কথা বলে উঠবে, তাদের পতাকা ইসলামের পতাকা, আর তাদের উদ্দেশ্য হলো এক আল্লাহর ইবাদাত। এরাই সেই আসল যোদ্ধা, যাদেরকে উম্মাহর প্রয়োজন, যারা ইয়াহুদীদের হত্যা করে ইসরায়েলি রাজ্য ধ্বংস করবে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন এরা সেই মুসলিম যাদের হৃদয় আল্লাহর প্রতি ঈমান ও ইয়াকীনে ভরপুর আর যারা আখিরাত পাওয়ার আশায় দুনিয়াবি সুখ পরিত্যাগ করে। তারা কোনো 'ভৌগলিক' মুসলিম নয় যে তার বাপের বংশীয় নামের মতো ইসলামকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যা তার কাছে জন্ম নিবন্ধন সনদের কিছু শব্দ মাত্র। আসল মুসলিম হলো আল্লাহর বান্দা। পেট, নারী, মদ, দুনিয়া, টাকা, বা ইয়াহুদীদের নিয়ম-নীতির বান্দা নয়। এসব জিনিসের বান্দারা না জয়ী হতে পারে, না ভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে পারে, না উম্মাহর ঝাণ্ডা বহন করতে পারে। তাদের মাধ্যমে বরং বিপর্যয় আর পরাজয়ই আসে।”

১৯৪৮ সালে ইয়াহুদীরা ইখওয়ানুল মুসলীমিনের হাতে পর্যুদস্ত হয়। মাত্র দুইশ জনের ছোট দল, সামান্য সরঞ্জাম আর অন্যদের বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও তারা অসাধ্য সাধন করে। তারা শহীদী তামান্নায় যুদ্ধে বের হয়। মুজাহিদীনের একজন বন্দী অফিসারকে এক ইয়াহুদী বলেছিলো, “ওই স্বেচ্ছাশ্রমিকদের দলটাকে ছাড়া আমরা কোনোকিছুকেই ভয় পাই না।” অফিসার জিজ্ঞেস করলেন তারা তাদের কোন জিনিসটাকে ভয় পাচ্ছে। সেই ইয়াহুদী বলে, “আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই ভূমিতে থাকার উদ্দেশ্যে এসেছি। আর তারা এখানে মরার উদ্দেশ্যে এসেছে।"

সর্বশেষ ১০ই রামাদ্বানের যুদ্ধে (৬ই অক্টোবর, ১৯৭৩, আমেরিকায় ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ নামে পরিচিত) সিরিয়ান সেনাবাহিনীর কিছু মুমিন অফিসার ও মুসলিম সৈনিক নিজেদের বীরত্বের প্রমাণ দেন, শত্রুদের ক্ষতিসাধন করেন এবং জাতির জন্য আংশিক বিজয় নিয়ে আসেন। তাঁরা আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করেছেন, মহান ইসলামী নৈতিক শিক্ষা মেনে চলেছেন এবং অসাধারণ পৌরুষ দেখিয়েছেন।

অতএব, আল্লাহর উপর ঈমান, তাঁর কালেমাকে বুলন্দ করা, তাঁর রাহে কুরবানি করা, এবং ইসলামের নামে যুদ্ধ ঘোষণা করাই হলো বিজয়ের প্রথম ধাপ।
আজ মুসলিমদের যা অবস্থা, তাতে কি শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় আর আল্লাহর সাহায্য আশা করা যায়?

টিকাঃ
[৫৩] সূরাহ আন-নাজম ৫৩:২৩
[৫৪] সূরাহ আন-নিসা ৪:৪৫
[৫৫] সূরাহ আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩১
[৫৬] সহীহ মুসলিম
[৫৭] ড. ইউসুফ আল কারযাবী, দারস আন-নাকবাহ আত-তানিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৮৯

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 শুধুই আরবদের ব্যাপার?

📄 শুধুই আরবদের ব্যাপার?


হাত্তিনের বিজয়ের একটি কারণ হলো ফিলিস্তিনের সংকটকে পুরো মুলসিম উম্মাহর সংকট হিসেবে দাঁড় করানো। অপরদিকে আজকের পরাজয়ের কারণ হলো ফিলিস্তিন সংকটকে শুধুই আরবদের জাতীয় সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা। প্রচারমাধ্যমে খালি আরব জাতীয়তাবাদের কথাই বলা হয়। আর বলা হয় যে, ইয়াহুদীদেরকে হটিয়ে ফিলিস্তিন মুক্ত করা কেবলই আরবদের দায়িত্ব।

এ কথার মাধ্যমে কি বিশ্বের ছয়শ মিলিয়ন মুসলিমকে অবজ্ঞা করা হলো না? অনারব মুসলিমরা কি মাসজিদুল আকসাকে তৃতীয় পবিত্রতম মাসজিদ বলে বিশ্বাস করে না? প্রথম কিবলাহ হিসেবে বিশ্বাস করে না? মি'রাজের স্থান হিসেবে বিশ্বাস করে না? শুধু এসবই না, তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করাকে সর্বশ্রেষ্ঠ লক্ষ্য বলেও বিশ্বাস করে।

জাতীয়তাবাদ আর আরবীয়বাদের নামে ইয়াহুদীদের সাথে লড়াই করার অর্থ হলো ইসলাম, মুসলিম ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা। ইসলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, কারণ ইসলামের নামে যুদ্ধ করার বদলে আরব জাতীয়তাবাদের নামে যুদ্ধ করা হচ্ছে। মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, কারণ ইসলামী ভ্রাতৃত্বকে আরব ভ্রাতৃত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হচ্ছে।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"মু'মিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই।”
"নিশ্চয় তোমাদের এই উম্মাহ একই উম্মাহ।”

এই দুই আয়াত মুসলিমদের মধ্যকার সত্যিকার বন্ধনের কথা বলে। আর তা হলো ইসলামের বন্ধন। রক্ত, জাতি, বর্ণ, ভাষা বা ইতিহাসের বন্ধনের চেয়ে এই বন্ধনকেই ইসলাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। মুসলিমদের ইতিহাসে কখনো এই বন্ধনের সাথে এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়নি, যা আমরা আজ করে চলেছি। মুসলিমদের শত্রুদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে কখনো এভাবে ইসলামী ভ্রাতৃত্বকে অস্বীকার করা হয়নি।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, কারণ আরব জাতীয়তাবাদের আহ্বানকারীরা অনারব মুসলিমদেরকে এই কাজে শরিক হওয়া থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে। তারা এই সংকটে অনারব মুসলিমদেরকে নাক গলাতে নিষেধ করে তাদের উপর যুলুম করেছে। এরকম ভেদাভেদ উস্কে দেওয়া আচরণ দেখার পর কি কখনো অনারব মুসলিমরা এই পবিত্র ভূমি মুক্ত করার কাজে শরিক হওয়ার আগ্রহ পাবে?

মুসলিমরা ইসলাম, ঈমান ও কুর'আন ছাড়া অন্য কোনো বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, এরকম নজির সারা ইতিহাসে পাওয়া যায় না।

কবি সত্যই বলেছেন:
এক আহ্বানকারী ডাক দিয়ে দিয়ে বলছে হতে চায় সে তার বাপ-দাদার বংশের সেরা,
তারা পড়ে আছে কাইস আর তামিম নিয়ে
কিন্তু জেনো, আমার কোনো বাপ নেই ইসলাম ছাড়া।

আল-ঈমান তারিকুনা ইলান নাসর (ঈমান আমাদের বিজয়ের পথ) গ্রন্থে শেইখ মুহাম্মাদ নিমর আল-খতিব বলেন:
"আরব নেতারা অনেক দিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে ফিলিস্তিন সংকটকে শুধুই আরবদের নিজেদের ব্যাপার বলে প্রতিষ্ঠা করার। আমি জানি না এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে। আমি বুঝতে পারছি না তারা কেন সাতশ মিলিয়ন মুসলিমদেরকে গোনার মধ্যেই ধরছে না। অথচ এসকল মুসলিম ধনী ধনী দেশে বাস করে, তারা সোনা-রূপার মালিক। সব জাতিই চেষ্টা করে অন্য জাতির সাথে বন্ধুত্ব করার, অথচ আরব নেতারা করছে তার উল্টোটা। আমার মনে হচ্ছে তারা আরব বিশ্বে বসবাসরত খ্রিষ্টানদের খুশি করতে চাইছে। ‘যিশুর জন্মস্থান আর পুনরুত্থানের গীর্জা' যেই ফিলিস্তিনে অবস্থিত, সেখানে অবস্থানরত আমাদের ভাইদেরকে আমরা বাঁচাবো – এতে খ্রিষ্টানদের বিরক্ত হওয়ার কী আছে? পবিত্র ভূমিকে মুক্ত করার জন্য অনারব মুসলিমরা আমাদের সাথে যোগ দিলে তাদের কী সমস্যা?"

ইসলাম ও আরব জাতীয়তাবাদের এই দ্বন্দ্বের কারণ হলো বর্তমান বিশ্ব এখন আর ধর্মের নামে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধের ডাক দেওয়াকে ভালো মনে করে না। তার উপর ফিলিস্তিন সংকটকে যদি আমরা ইসলামী উপায়ে সমাধান করতে চাই, তাহলে তারা আমাদেরকে পশ্চাৎপদ, মধ্যযুগীয় ও প্রতিক্রিয়াশীল বলে কটাক্ষ করবে। তারা কি ভুলে গেছে যে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ইয়াহুদীবাদের ভিত্তিতে? দেশে-বিদেশে তাদের প্রোপাগান্ডাও ইয়াহুদীবাদের নামেই হয়ে থাকে।

ইয়াহুদী উইজম্যান তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন:
“আমি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোরের সাথে দেখা করলাম। তিনি সেখানেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি উগান্ডায় আপনার নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে রাজি হলেন না কেন?' আমি উত্তর দিয়েছিলাম, 'জায়নিজম যদিও একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন, কিন্তু আমরা এর আধ্যাত্মিক দিকটা অস্বীকার করতে পারি না। আমি নিশ্চিত যে আমরা যদি ধর্মীয় দিকটিকে অবজ্ঞা করি, তাহলে আমরা আমাদের জাতীয় ও রাজনৈতিক স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হবো।”

১৮৯৭ সালে অনুষ্ঠিত বাসেল কনফারেন্সে। ইয়াহুদী হার্যল বলেন, “জায়নিজমে ফিরে যাওয়ার আগে ইয়াহুদীবাদের দিকে ফিরে যেতে হবে।”

প্রেসিডেন্ট দ্য গলকে লেখা এক চিঠিতে বেন গুইরন লেখেন,
“ব্যাবিলনিয়ান আর রোমানদের হাতে দুটি পরাজয় আর খ্রিষ্টানদের পক্ষ থেকে হাজার বছরের ঘৃণার পরও যে কারণে আমরা টিকে আছি, তা হলো পবিত্র গ্রন্থের উপর আমাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস।”

ইয়াহুদী নেতারা নিয়ম করেছে যে প্রাপ্তবয়স্ক সকল ইয়াহুদীকে এই শপথ নিতে হবে, “হে ইসরায়েল! এই আমার শপথ। আমি কসম করছি যে আমি ঈশ্বরের প্রতি, তোরাহ'র (তাওরাত) প্রতি, ইয়াহুদী জনগণের প্রতি ও ইয়াহুদী রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবো।”

কনফারেন্স ফর ইন্টারন্যাশনাল জায়নিজম এর ২৫ তম অধিবেশনে (২৫ ডিসেম্বর, ১৯৬০) বেন গুইরন ঘোষণা করেন, “প্রত্যেক ইয়াহুদীর উচিত ইসরায়েলে হিজরত করা। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়ে যেসব ইয়াহুদী এই রাষ্ট্রের বাইরে বসবাস করছে, তারা তাওরাতের শিক্ষার বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন করছে এবং প্রতিটি দিন ইয়াহুদী ধর্মের উপর কুফরি করে চলেছে।”

ইয়াহুদীদের মধ্যে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের চর্চার ফলাফল হলো
* রাষ্ট্রের নাম ইসরায়েল রাখা
* শনিবারে কাজকর্মকারীদেরকে পাথর মেরে হত্যা করা
* সিভিল বিয়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকা
* নন-কোশার খাবার তৈরিকারী রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া
* প্রতিটি ইয়াহুদীকে বাধ্যতামূলকভাবে তাওরাত থেকে নিজের জন্য একটি নাম নির্ধারণ করার আদেশ করা

কিছুদিন পরই ইসরায়েলের গ্রান্ড রাবি নেসীম তালমুদকে ইসরায়েলের সংবিধান বানাতে চান। এর আগে এই রাষ্ট্রের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী তোরাহকে ইসরায়েলের সংবিধান বানাতে চেয়েছিলেন। এমনকি এও জানা গেছে যে বিশাল একটা অংশ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গোল্ডা মায়ারকে ভোট দেয়নি কারণ ইয়াহুদী ধর্মে নারীদেরকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা নিষেধ।

আমাদের শত্রুরা তাদের মিথ্যা ধর্মের ডাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে বসে আছে। এমতাবস্থায় আমাদের কি উচিত আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামের অনুসারী হয়েও এর নামে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ও যুদ্ধ করার ব্যাপারে লজ্জিত হওয়া? ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে আগ্রহী লোকেরাও বিষয়টিকে আরবদের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে আর ছয়শ মিলিয়ন অনারব মুসলিমদেরকে বাদ করে দিচ্ছে। আরব জাতীয়তাবাদের নামে যুদ্ধ করা মুসলিমদের পক্ষে কি সম্ভব ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করা?

এই হলো অতীতের ফিলিস্তিন আর বর্তমানের ফিলিস্তিনের মধ্যকার এক সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক পর্যালোচনা। প্রতিশ্রুত বিজয় অর্জন করে নজির স্থাপন করতে ইচ্ছুকদের মধ্যে যাদের চোখ খোলা, তাদের উচিত পবিত্র ভূমিকে মুক্ত করার শ্রেষ্ঠতম পদ্ধতিটি বেছে নেওয়া। নাজাত ও ইজ্জতের একমাত্র পথ ইসলাম।

“আল্লাহ তাঁর কাজের ব্যাপারে পূর্ণ কর্তৃত্বশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই (তা) জানে না।”

টিকাঃ
[৫৮] সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১০
[৫৯] সূরাহ আল-আম্বিয়া ২১:৯২
[৬০] কাইস আর তামিম প্রাক-ইসলামিক যুগে আরবের বিখ্যাত দু'টি গোত্রের নাম।
[৬১] শাইখ আবদুল্লাহ নাসির উলওয়ানের এই বইটি প্রথম ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। কিন্তু ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারী Pew Research Institute এর তথ্যমতে বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১.৮ বিলিয়ন।- সম্পাদক
[৬২] জায়োনিস্ট অর্গানাইজেশনের এটাই ছিলো প্রথম সম্মেলন যা ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয়।- সম্পাদক
[৬৩] পুরো নাম ড্যাভিড বেন গুরিয়ন। জন্ম রাশিয়ায়। তিনি ইহুদীবাদী ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি 'বিশ্ব ইহুদীবাদী সংস্থা'র প্রধান নির্বাচিত হন- সম্পাদক
[৬৪] কোশার আইন দ্বারা ইহুদিরা খাবার দাবারের উপর কিছু নিয়ম-নীতি তৈরি করে। এসব নিয়মের বাইরের কোন খাবার তারা অনুমোদন না দিতে বলে। এমনকি যারা তাদের এই নিয়ম মানে না তাদের রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলে। বিস্তারিত জানতে http://www.koshercertification.org.uk - সম্পাদক
[৬৫] সূরাহ ইউসুফ ১২:২১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00