📄 নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতন
সালাহউদ্দীনের বিজয়ের কারণ আলোচনা করতে গেলেই আজকের দিনে ইয়াহুদীদের সাথে আমাদের পরাজয়ের কারণগুলো সামনে চলে আসে। বলা চলে বিংশ শতাব্দী থেকে মুসলিমরা শোচনীয়ভাবে মার খেয়ে চলেছে। তাও কাদের হাতে? ইতিহাসের সবচেয়ে লাঞ্ছিত জাতির হাতে। যাদেরকে আল্লাহ বানর ও শূকরে পরিণত করে দিয়েছিলেন, তাদের হাতে। যাদের উপর আল্লাহর গযব, তাদের হাতে। যারা ইতিহাসে সবচেয়ে বিশ্বাসঘাতক, ভীতু আর ধুরন্ধর জাতি হিসেবে পরিচিত, তাদের হাতে। আগের অধ্যায়ে আমরা মুসলিমদের জয়ের কারণ আলোচনা করেছি। এ অধ্যায়ে ইনশাআল্লাহ আমরা আলোচনা করবো ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নিয়ে এই বইয়ের প্রকাশকাল পর্যন্ত মুসলিমদের পরাজয়ের কারণসমূহ। লেখকের মতে, প্রধান কারণগুলো নিম্নরূপ:
হাত্তিনে মুসলিমদের বিজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো ইসলামী অনুশাসনের প্রতি মুসলিমদের দৃঢ় আনুগত্য। আর আজকের দিনে আমাদের পরাজয়ের কারণ হলো ঠিক এই ক্ষেত্রেই দুর্বলতা। এর ফলে জিহাদে অংশগ্রহণকারী সেনাবাহিনীগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনও খবর এসেছে যে ময়দানের প্রথম সারির কিছু যোদ্ধা মদপান করে আর বেশ্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর শত্রুরা দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে এদের এই নৈতিক দুর্বলতা।
রেডিও স্টেশনগুলো থেকে আমরা ঘোষিত হতে শুনেছি, “শত্রুদেরকে তুমুল আঘাত কর! অমুক শিল্পী তোমাদের পক্ষে। অমুক নায়ক-নায়িকা তোমাদেরকে সমর্থন জানিয়েছে।” কোথায় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে তা না, এইসব নিয়ে পড়ে আছে!
এমনও খবর পাওয়া গেছে যে আরব নেতাদের কেউ কেউ যোদ্ধাদের কাছে নায়িকা-গায়িকাদের উত্তেজক ছবি বিলি করে তাদের অধঃপতনকে তরান্বিত করেছে।
এমনও খবর এসেছে যে, ১৯৬৭-এর যুদ্ধের এক মাস আগে যোদ্ধাদের মাঝে বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ ম্যাগাজিন বিতরণ করা হয়েছে। এসব পত্র-পত্রিকা প্রকাশ্যে শির্ক-কুফরের দিকে আহ্বান করতো। এক নাস্তিক সাংবাদিক সেখানে প্রবন্ধ ছেপেছে “কেমন হওয়া উচিত নয়া জমানার আরবদের?” শিরোনামে। সে লিখেছে: “আরব বিশ্ব মধ্যযুগে আল্লাহর সাহায্য চেয়েছে। ইসলামী ও খ্রিষ্টীয় জীবনাচারে আশ্রয় খুঁজেছে, সামন্ততান্ত্রিক ও পুঁজিবাদীসহ অন্যান্য শক্তিগুলোর মদদ চেয়েছে। কিন্তু এ সবই ব্যর্থ হয়েছে। একটি সফল আরব সভ্যতা গড়ে তোলার একমাত্র উপায় হলো আরবদের মাঝে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রসার ঘটানো।"
এই সাংবাদিক এমন মানুষ চায় “যে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ, ধর্মসমূহ, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ, উপনিবেশবাদসহ প্রাচীন সমাজের সব আদর্শ ইতিহাসের জাদুঘরের কিছু মমি মাত্র।”
আল-মু'আলিম আল-'আরাবি ম্যাগাজিনে এক নাস্তিক কবি তার দ্বীন- দুনিয়াকে শয়তানের কাছে বিক্রি করার ঘোষণা দিয়ে কবিতা পর্যন্ত লিখেছে। সে খোলাখুলি নাস্তিকতা, চরম অশ্লীলতা ও ভ্রান্ত মত-পথের দিকে আহ্বান করেছে। সে লিখেছে:
আমি ফিলিস্তিনের গান গাই, যার পা নাই, পথ নাই।
তারা জানতে চায় কে কে নামাজ পড়েনি,
অথচ নামাজ তো তাদের কাজে আসেনি।
আল্লাহ তো কবেই মরে গেছে মূর্তিদের সাথে,
গায়েবের মদদ চায় তারা মোনাজাতের হাতে।
গায়েবি সাহায্য তারাই চায় যারা হীনবল
নির্ভয়ে লড়ে যারা, তারাই শুধু সবল।
সে আরো লিখেছে:
তারা অজুহাত খোঁজে, দোষ দিয়েছে ধৈর্যহীনতাকে,
তাই আমি অস্বীকার করলাম ফিলিস্তিনের আল্লাহকে।
অবাক করা ব্যাপার হলো, এই ম্যাগাজিনের সম্পাদক দাবি করেছে এটা নাকি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য নৈতিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়। কিন্তু এখানেই আবার মুসলিম উম্মাহর বিশ্বাস ও মুহাম্মাদের আনীত বার্তার ব্যাপারে চরম বিদ্বেষপূর্ণ কবিতা প্রকাশিত হয়। এইসব পত্র- পত্রিকা পড়ে কি যোদ্ধারা কখনও মুসলিমদের শত্রুদের হারাতে পারবে? আল্লাহ কি তাদেরকে সাহায্য করবেন?
এদের অবস্থা কি আবু জাহলের (লা'নাতুল্লাহ 'আলাইহি) মতো নয়? আবু সুফিয়ান যখন খবর দিলেন যে তাঁদের কাফেলা এখন নিরাপদ, তখনও আবু জাহল গোঁয়ারের মতো বলে ওঠে, “আল্লাহর কসম! আমরা বদরে গিয়ে সেখানে তিনদিন অবস্থান করবো, উদরপূর্তি করবো, পশু জবাই দিবো, মদপান করবো, গান-বাজনা করবো, আরবদের প্রশংসা শুনবো, তারপর ফিরে আসবো।”
'উমার বিন খাত্তাবের (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) সেই চিঠি থেকে তো স্পষ্টই হয়ে গেছে কোন পথে বিজয় আসে। তাঁর সেই চিঠি এ যুগেও একইরকম প্রাসঙ্গিক:
“পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমি আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করার। কারণ তাকওয়াই হলো শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বোত্তম প্রস্তুতি ও সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধাস্ত্র। আপনি এবং আপনার সাথে যারা আছে, সবাই যেন হারাম কাজ ত্যাগ করে। কারণ আমাদের হারামে লিপ্ত হওয়াই আমাদের উপর শত্রুদের প্রাধান্য বিস্তারের কারণ। মুসলিমরা জয়লাভ করে আল্লাহর প্রতি তাদের আনুগত্য এবং আল্লাহর প্রতি শত্রুদের অবাধ্যতার কারণে। শত্রুদের পার্থিব শক্তি-সরঞ্জাম আমাদের চেয়ে বেশি। আল্লাহর আনুগত্যই আমাদের শক্তি। আমাদের উভয় পক্ষের গুনাহ যদি সমান হয়ে যায়, তাহলে তারা পার্থিব শক্তিবলে আমাদেরকে হারিয়ে দেবে।"
হারামে লিপ্ত হওয়া ও সাধারণ গুনাহর ব্যাপারেই যদি এমন কথা বলা হয়, তাহলে প্রকাশ্যে নাস্তিকতার দিকে আহ্বানকারীদের অবস্থা কেমন হবে? মুসলিম উম্মাহকে, বিশেষ করে আরব জাতিকে এই বিষয়টি ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
টিকাঃ
[৪৪] এই বইটি ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। কিন্তু এখানে অনুবাদক বর্তমান সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কথাটি উল্লেখ করেছেন।- সম্পাদক
[৪৫] সালিহ 'আদিমাহ, "নাশিদ আল-আরুশাহ আদ-দা'আহ", আল মু'আলিম আল-'আরাবি, ইশ্য-৫, অক্টোবর ১৯৬৫, পৃষ্ঠা ৫৪
📄 মতানৈক্য ও ঝগড়া-বিবাদ
হাত্তিনের বিজয়ের একটি কারণ ছিলো এক নেতৃত্বের অধীনে মুসলিমদের রাজনৈতিক ঐক্য। আর আজকের পরাজয়ের কারণ হলো মতানৈক্য ও ঝগড়াঝাটি। মুসলিম শাসকদের মাঝে প্রচুর দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ, পাল্টাপাল্টি দোষারোপের ঘটনা ঘটেছে। জনসাধারণও এসব প্রত্যক্ষ করেছে। শাসকরা একে অপরের বিরুদ্ধে চর নিয়োগ করে, ষড়যন্ত্র করে। আর শত্রুরা নিজেদেরকে আধ্যাত্মিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত করতে করতে এসব ঝগড়া-বিবাদ দেখে মুখ টিপে হাসে। তারা সারা বিশ্বের ইয়াহুদীদেরকে ইসরায়েলে গিয়ে জড়ো হতে বলে। নীল থেকে ফুরাত পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা দিনরাত কাজ করে চলে।
ইসলামকে ছেড়ে দেওয়ার কারণেই আরব শাসকদের মাঝে আজ এসকল মতানৈক্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা পূর্ব-পশ্চিম সবখান থেকে এনে স্তূপ করা নীতি-নৈতিকতার এক অদ্ভূত সমষ্টির অনুসরণ করে। জনগণ তাই তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কর্মপদ্ধতিগত ও আদর্শগত – উভয় রকমের মতভেদই বিদ্যমান। কেউ ওয়াশিংটনকে মানে, তো কেউ লন্ডনকে। কেউ মস্কোকে মানে, তো কেউ বেইজিংকে। একদলকে বলা হয় ডানপন্থী, আরেকদলকে বলা হয় বামপন্থী। কেউ প্রগতিশীল, তো কেউ রক্ষণশীল। আরবের মুসলিম উম্মাহ আজ কত নামে, কত রাষ্ট্রে, কত শহরে, কত দলে যে বিভক্ত! ইসলামকে যারা অনুসরণই করে না, তাদেরকে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করা কীভাবে সম্ভব? আল্লাহ বলেন:
"আল্লাহ তাকে অবশ্যই সাহায্য করেন, যে তাঁকে সাহায্য করে। আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রান্ত।”
"যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদক্ষেপ দৃঢ় রাখবেন।”
"আর নিশ্চয় এটিই আমার সরল পথ, অতএব এরই অনুসরণ কর। আর বিভিন্ন পথের অনুসরণ কোরো না, কারণ সেগুলো তোমাকে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।”
"আর (নিজেদের মাঝে) ঝগড়া-বিবাদ কোরো না। তাহলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি খর্ব হয়ে যাবে।”
আমাদের আজকের অবস্থায় কি তাহলে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব?
টিকাঃ
[৪৬] সূরাহ আল-হাজ্জ ২২:৪০
[৪৭] সূরাহ মুহাম্মাদ ৪৭:৭
[৪৮] সূরাহ আল-আন'আম ৬:৫৩
[৪৯] সূরাহ আল-আনফাল ৮:৪৫
📄 দুনিয়ার মোহ আর ‘আমলে ঘাটতি
সালাহউদ্দীন হাত্তিনে জয়লাভ করেছিলেন পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ এবং জেরুসালেমের মুক্তি নিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তা ফিকির থাকার কারণে। আর আজকে ইয়াহুদীদের সাথে আমরা পরাজিত হচ্ছি কারণ কেবল হুমকি-ধমকি আর কথার ফুলঝুরি দিয়েই আমরা ফিলিস্তিন উদ্ধার করে ফেলতে চাই। ফিলিস্তিন ইশ্য যখন থেকে তৈরি হয়েছে তখন থেকেই জনগণের আবেগ উথলে তোলার জন্য প্রচুর বক্তৃতা-সমাবেশ করা হয়েছে। জনগণ সরলমনে হাত তালি দিয়ে তাদের কথা বিশ্বাস করে নেয়। কিন্তু পরে আর কোনো গঠনমূলক ও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে ওঠে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা করো না তা বলো কেন? যা করা হয় না, তা বলা আল্লাহর নিকট খুবই গুরুতর অপরাধ।”
কবি বলেন;
লায়লার সাথে নাকি তার প্রেম এমনটাই সবাই বলে
অথচ লায়লা নিজেই তো তাকে সদা এড়িয়ে চলে।
ফিলিস্তিন সমস্যা দিন দিন বাড়ছেই। আজ এটা সমাধান হয় তো কাল আরেক সমস্যা মাথাচাড়া দেয়। এদিকে ইসরায়েল দিনকে দিন শক্তি-সামর্থ্য বাড়িয়ে চলেছে। মুসলিম উম্মাহ কাঁধে দায়িত্ব তুলে নেওয়ার মতো সাহসই হারিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ হঠাৎ সমঝোতার কথা শোনা যায়। রজার'স প্রজেক্ট, অমুক সম্মেলন, তমুক সম্মেলন আরো কত কী! উদাহরণস্বরূপ, কিছু আরব রাষ্ট্র একসাথে কিছু পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। ফিলিস্তিনি ফিদায়িনদের নির্মূল করার মতো বিভিন্ন ইশ্য সামনে এনে মূল সমস্যাকে একপাশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ আখেরে ইসরায়েলী আগ্রাসনের পক্ষেই সুফল বয়ে আনবে।
ইসরায়েলের জন্মলগ্ন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত বেশিরভাগ আরব শাসকই ফিলিস্তিন সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে গেছে এবং এর জন্য যথাযথ কুরবানি করেনি। যদি সত্যিই তাদের এ ব্যাপারে অগ্রহ থাকতো, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্য গলের মতো করে সব বেশ্যালয়, ড্যান্স হল আর মদের বারগুলো বন্ধ করে দিতো। টেলিভিশনে অশ্লীল নাটক-সিনেমা ও গান-বাজনার প্রচার নিষিদ্ধ করতো। পাশাপাশি যুবসমাজকে সবরকম নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে সচেতন করে তুলতো। আমোদ-ফূর্তিতে ডুবে থাকা মুসলিম উম্মাহ আজ ভুলে গেছে আল আকসার সম্মানে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে। এই পৌরুষহীন জাতি কী করে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য আশা করে!
টিকাঃ
[৫০] সূরাহ আস-সফ ৬১:১-২
[৫১] ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল এবং মিশরের মধ্যকার যুদ্ধের অবসান লক্ষ্যে আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী William P. Rogers ১৯৬৯ সালে একটি প্রস্তাব পেশ করেন যা 'রজার'স প্রজেক্ট' নামে পরিচিত। তার এই প্রস্তাবনা ব্যর্থ হলে তিনি ১৯৭০ সালে আরো একটি প্রস্তাব পেশ কররেছিলেন। - সম্পাদক
[৫২] ফিলিস্তিনি ফিদায়িন ইসরায়েল বিরোধী একটি গেরিলা সংগঠন। মূলত জাতীয়তাবাদী আদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিলো ইসরায়েলি জায়োনিজমের মূলোৎপাটন করা এবং সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।- সম্পাদক
📄 ভুল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
হাত্তিনের যুদ্ধে মুসলিমদের জয়ের কারণ ছিলো আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করার নিয়্যাতে লড়াই করা। আর আজকের পরাজয়ের কারণ হলো দলীয় চেতনা, খাহেশাত, পশ্চিমা আদর্শ, আর অনৈসলামী ভাবধারার বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে নামা। কিছু শাসক যুদ্ধের আহ্বান করে বক্তৃতা দিয়েছে, অথচ আল্লাহ বা ইসলামের নামটা পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি। কেবল অজ্ঞতা আর ফাঁকা জযবার মাধ্যমে জনগণকে উত্তেজিত করতে চেয়েছে।
১৯৪৮-এ যুদ্ধের আহ্বান করা হয় জাতীয়তাবাদের নামে।
১৯৫৬-তে যুদ্ধের আহ্বান করা হয় জাতীয়তাবাদের নামে।
১৯৬৭-তে যুদ্ধের আহ্বান করা হয় বিপ্লবী চেতনার নামে।
১৯৭৩-এ যুদ্ধের আহ্বান করা হয় আরবদের মান-মর্যাদার নামে।
মুশরিকদের কাল্পনিক উপাস্যগুলোর মতো এসব চেতনাও মানুষের মনগড়া।
আল্লাহ বলেন:
এগুলো তো কেবল কতগুলো নাম, যা তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষেরা রেখেছো। এর পক্ষে আল্লাহ কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। তারা তো শুধু অনুমান আর প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে, যদিও তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে পথনির্দেশ এসেছে।
এছাড়াও আজকাল তো নাস্তিকীয় স্লোগান তুলে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এদের আসল উদ্দেশ্য হলো মুসলিমদেরকে তাদের মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া। সেইসাথে কিছু লেখককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে আল্লাহ, ইসলাম ও নবী-রাসূল নিয়ে সংশয় তৈরি করার জন্য। উদাহরণস্বরূপ, এক জ্ঞানপাপী দালাল নাদিম আল-বিতার তার মিনান নাকসাহ ইলাস সাওরাহ (স্থবিরতা থেকে বিপ্লবের দিকে) নামক বইয়ে লিখেছে:
“দুনিয়া নাজাত পাবে বিপ্লবীদের মাধ্যমে। তাদেরকে ছাড়া আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাবে। বিপ্লবীরাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ আর আল্লাহর দায়িত্ব গ্রহণকারী। কারণ আমি নিশ্চিত হয়ে গেছি যে আল্লাহ এখন আর নেই। আমাদেরকে বরং তাঁকে সৃষ্টি করে নিতে হবে।”
আল্লাহ, তাঁর হুকুম-আহকাম ও নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করে বুঝি বিজয় আসবে? নাকি এর মাধ্যমে এক স্থবিরতা থেকে আরেক স্থবিরতার দিকেই যাওয়া হবে কেবল?
এদের থেকে কী-ই বা আশা করা যায়?
আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী এরাই কি ভবিষ্যতের ফিদায়ীন?
ফিলিস্তিন সেই নাস্তিক বিদ্রোহীদের হাতে মুক্ত হবে না! আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি কুফরিকারীদের হাতে ফিলিস্তিন কখনো মুক্তি লাভ করতে পারে না!
মদ-মাদকের পথ অনুসরণকারীদের হাতে ফিলিস্তিন মুক্ত হবে না।
ড. ইউসুফ আল-কারাযাবী বলেন, “যেসব সত্যিকারের মু'মিন রুকু-সেজদা করে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে, আল্লাহর হুকুমসমূহ তামিল করে, আর বিশুদ্ধ অন্তর ও শরীর নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে, তাদেরকে ছাড়া অন্য কারো হাতেই ইসরায়েলের পতন ও ফিলিস্তিনের মুক্তি আসবে না। যখন আহ্বান করা হয়, 'হে জান্নাতি বায়ু! আমাদের দিকে এসো। হে আল্লাহর সাহায্য! দ্রুত এসো। হে কুর'আনওয়ালারা! কুর'আনের শিক্ষা বাস্তবায়ন কর।' তখন এরাই হবে আসল সৈনিক যাদেরকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না এবং কেউ তাদের সামনে টিকতে পারবে না। এরা বস্তুবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, সংখ্যার ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে, শত্রুদের সংখ্যাকে পরোয়া করে না, বরং তাদের নিজেদের কাছে যা আছে তাতে আস্থা রাখে। পৃথিবী ছাড়িয়ে তাদের দিগন্ত গায়েবি জগতের আসমান ও শাহাদাতের দুয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা বিশ্বাস করে মানুষ যদি সাহায্যের হাত গুটিয়েও নেয়, আল্লাহই সাহায্য করবেন।
“এবং ওয়ালী (অভিভাবক) হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং সাহায্যকারী হিসেবেও আল্লাহই যথেষ্ট।”
আর আল্লাহর সৈনিকেরা তাদের সাথে আছে।
“তোমার রব্বের বাহিনীকে তিনি ছাড়া কেউই চেনে না।”
এরাই ইয়াহুদীদের হাত থেকে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করবে। তাদের একমাত্র লক্ষ্য আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করা। তাদের পরিচয় হলো ইসলাম, আল্লাহর ইবাদাতের চিহ্ন দেখে এদের চেনা যায় আর এদের স্লোগান হলো 'আল্লাহু আকবার!' রাসূল ﷺ এসব যোদ্ধাদের ব্যাপারে বলেন,
কিয়ামাতের পূর্বে মুসলিমরা ইয়াহুদীদের সাথে লড়াই করবে। তারা (মুসলিমরা) এমনভাবে জয়লাভ করবে যে তারা (ইয়াহুদীরা) গাছ ও পাথরের আড়ালে লুকাবে। পাথর আর গাছেরা কথা বলে উঠবে, 'হে মুসলিম! হে আল্লাহর বান্দা! আমার পেছনে এক ইয়াহুদী লুকিয়ে আছে। এসো একে হত্যা কর।'
সেসব মুসলিমকে জর্ডানিয়ান, সিরিয়ান, ফিলিস্তিনি বা এমনকি আরব বলেও ডাকা হবে না। কারণ তারা সেসব পরিচয় ছুঁড়ে ফেলে এক 'মুসলিম' পরিচয়কে গ্রহণ করেছে। যাদের উদ্দেশ্যে গাছ-পাথর কথা বলে উঠবে, তাদের পতাকা ইসলামের পতাকা, আর তাদের উদ্দেশ্য হলো এক আল্লাহর ইবাদাত। এরাই সেই আসল যোদ্ধা, যাদেরকে উম্মাহর প্রয়োজন, যারা ইয়াহুদীদের হত্যা করে ইসরায়েলি রাজ্য ধ্বংস করবে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন এরা সেই মুসলিম যাদের হৃদয় আল্লাহর প্রতি ঈমান ও ইয়াকীনে ভরপুর আর যারা আখিরাত পাওয়ার আশায় দুনিয়াবি সুখ পরিত্যাগ করে। তারা কোনো 'ভৌগলিক' মুসলিম নয় যে তার বাপের বংশীয় নামের মতো ইসলামকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যা তার কাছে জন্ম নিবন্ধন সনদের কিছু শব্দ মাত্র। আসল মুসলিম হলো আল্লাহর বান্দা। পেট, নারী, মদ, দুনিয়া, টাকা, বা ইয়াহুদীদের নিয়ম-নীতির বান্দা নয়। এসব জিনিসের বান্দারা না জয়ী হতে পারে, না ভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে পারে, না উম্মাহর ঝাণ্ডা বহন করতে পারে। তাদের মাধ্যমে বরং বিপর্যয় আর পরাজয়ই আসে।”
১৯৪৮ সালে ইয়াহুদীরা ইখওয়ানুল মুসলীমিনের হাতে পর্যুদস্ত হয়। মাত্র দুইশ জনের ছোট দল, সামান্য সরঞ্জাম আর অন্যদের বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও তারা অসাধ্য সাধন করে। তারা শহীদী তামান্নায় যুদ্ধে বের হয়। মুজাহিদীনের একজন বন্দী অফিসারকে এক ইয়াহুদী বলেছিলো, “ওই স্বেচ্ছাশ্রমিকদের দলটাকে ছাড়া আমরা কোনোকিছুকেই ভয় পাই না।” অফিসার জিজ্ঞেস করলেন তারা তাদের কোন জিনিসটাকে ভয় পাচ্ছে। সেই ইয়াহুদী বলে, “আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই ভূমিতে থাকার উদ্দেশ্যে এসেছি। আর তারা এখানে মরার উদ্দেশ্যে এসেছে।"
সর্বশেষ ১০ই রামাদ্বানের যুদ্ধে (৬ই অক্টোবর, ১৯৭৩, আমেরিকায় ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ নামে পরিচিত) সিরিয়ান সেনাবাহিনীর কিছু মুমিন অফিসার ও মুসলিম সৈনিক নিজেদের বীরত্বের প্রমাণ দেন, শত্রুদের ক্ষতিসাধন করেন এবং জাতির জন্য আংশিক বিজয় নিয়ে আসেন। তাঁরা আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করেছেন, মহান ইসলামী নৈতিক শিক্ষা মেনে চলেছেন এবং অসাধারণ পৌরুষ দেখিয়েছেন।
অতএব, আল্লাহর উপর ঈমান, তাঁর কালেমাকে বুলন্দ করা, তাঁর রাহে কুরবানি করা, এবং ইসলামের নামে যুদ্ধ ঘোষণা করাই হলো বিজয়ের প্রথম ধাপ।
আজ মুসলিমদের যা অবস্থা, তাতে কি শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় আর আল্লাহর সাহায্য আশা করা যায়?
টিকাঃ
[৫৩] সূরাহ আন-নাজম ৫৩:২৩
[৫৪] সূরাহ আন-নিসা ৪:৪৫
[৫৫] সূরাহ আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩১
[৫৬] সহীহ মুসলিম
[৫৭] ড. ইউসুফ আল কারযাবী, দারস আন-নাকবাহ আত-তানিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৮৯