📄 আল্লাহর কালেমাকে উচ্চে তুলে ধরার লক্ষ্য
ইসলামী শরীয়তে জিহাদে যাওয়ার আগে সৈনিককে অবশ্যই নিয়্যাত ঠিক করতে হবে। তাকে যুদ্ধে যেতে হবে শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়। গানিমাত, খ্যাতি, অনৈসলামী চেতনা কিংবা নিফাকের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে গেলে হবে না। আল্লাহ বলেন:
"ঈমানদাররা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় আর কাফিররা যুদ্ধ করে তাগুতের রাস্তায়।”
রাসূলুল্লাহকে এমন ব্যক্তিদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো যে বীরত্ব, জাতিয়তাবাদী চেতনা বা নিফাকের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে যায়। এমন ব্যক্তিদের মাঝে কে আল্লাহর রাস্তার যোদ্ধা তা জানতে চাওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে আল্লাহর কালিমাকে সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য যুদ্ধ করে, সে-ই আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে।”
এই ইসলামী নিয়্যাত নিয়েই সালাহউদ্দীন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন। আল-কাদি বাহাউদ্দিন ইবনু শাদ্দাদের লেখা আন-নাওয়াদির আস- সুলতানিয়্যা কিতাবের একটি ঘটনা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি লিখেন:
“আমি তাঁর কাছে যা শুনেছি, তা বর্ণনা করছি। ৫৮৪ হিজরির যুলকা'দা মাসে মিশরীয় সৈন্যদেরকে ছুটি দেন। তাঁর ভাই আল-মালিক আল- 'আদিলের নেতৃত্বে মিশরীয় সৈনিকেরা দেশে ফিরে যায়। জেরুসালেমে 'ঈদের সালাত শেষে তাদেরকে বিদায় জানাতে সালাহউদ্দীন তাদের সাথে এগোতে থাকেন। তিনি আস্কালন পর্যন্ত তাদের সাথে যান। ফিরে আসার সময় তিনি উপকূলীয় অঞ্চল হয়ে অ্যাকর দিয়ে ফেরত আসার কথা ভাবেন। তাহলে উপকূলীয় শহরগুলোর অবস্থাও তদারক করা যাবে। তাঁর সাথীরা এমনটা করতে নিষেধ করেন। কারণ মিশরীয় সেনাদের চলে যেতে দেখে টায়ারের ক্রুসেডাররা আক্রমণ করে বসতে পারে। তিনি এ কথায় কান দিলেন না। তাঁর ভাইকে বিদেয় দিয়ে আমরা তাঁর সাথে উপকূলীয় এলাকা হয়ে অ্যাকরের দিকে চললাম। তখন ছিলো শীতকাল আর উত্তাল সাগরে ছিলো পাহাড়সম ঢেউ। আমি দৃশ্য অবলোকনে বুঁদ হয়ে ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, 'আমি আপনাকে কিছু কথা জানাতে চাই। আল্লাহ যদি আমাকে উপকূলের বাকি অংশগুলো জয় করার তাওফিক দেন, তাহলে আমি শহরগুলো (আমার ছেলেদের মাঝে) ভাগ-বাটোয়ারা করে দেবো। তারপর আমার উইল লিখে আপনার হাতে দিয়ে জাহাজে করে ক্রুসেডারদের দ্বীপগুলোতে চলে যাবো, যাতে কুফফারদের সব দলগুলোকে পরাস্ত করতে পারি অথবা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে যেতে পারি।”
আমার কাছে তাঁর কথা শুনে আমার খুবই খুশি লাগলো। আমি বললাম, 'আপনার নিজের ও সৈনিকদের জীবনের ব্যাপারে এমন ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে না। সৈনিকেরা ইসলামের প্রহরী।' তিনি বললেন, 'আমাকে একটি ফাতওয়া জানান। দুই মৃত্যুর মধ্যে কোনটি বেশি উত্তম?' আমি বললাম, 'আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত।' তিনি বললেন, 'সেটাই আমি চাই।'
কতই না বিশুদ্ধ নিয়্যাত! কতই না সাহসী সে বীর! রাহিমাহুল্লাহ! হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে তিনি তাঁর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তিনি আপনার রহমত প্রত্যাশী ছিলেন। তাঁকে আপনি রহম করুন।
যুদ্ধাবস্থায় আল্লাহর কাছে তাঁর দু'আ করার কথা তো বলাই হলো। তিনি দু'আ করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমার দুনিয়াবি আসবাব শেষ হয়ে গেছে। তাই আমি আপনার দ্বীনকে বিজয়ী করতে ব্যর্থ হয়েছি। আপনার সাহায্য, আপনার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, আর আপনার রহমতের উপর ভরসা করা ছাড়া আর কিছুই বাকি নেই। আপনিই আমার জন্য যথেষ্ট, আর আপনি হলেন শ্রেষ্ঠ কর্মবিধায়ক।”
শত্রুদের প্রতি তাঁর মহান আচরণ দেখেও বোঝা যায় যে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধ করতেন, দুনিয়াবি ক্ষমতার লালসা বা রক্তপিপাসার কারণে নয়। কী পশ্চিমা, কী প্রাচ্যীয়, কী ওরিয়েন্টালিস্ট, কী মুসলিম – সকল ইতিহাসবিদই তাঁর এমন আচরণের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। ক্রুসেডারদের মধ্যকার গরীব, বিকলাঙ্গ ও বয়স্কদেরকে টাকা ও সওয়ারির ব্যবস্থা করে দেওয়া, মুক্তিপণের বিনিময়ে সবাইকে ছেড়ে দিতে রাজি হওয়া এ সবই তাঁর মহানুভবতার জীবন্ত দৃষ্টান্ত। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এমন আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আলোচিত হবে ইনশাআল্লাহ।
এ প্রসঙ্গে হাত্তি বলেন, “আটাশি বছরের ব্যবধানে সাধারণ মুসলিমদের প্রতি ক্রুসেডারদের আচরণ আর সাধারণ ক্রুসেডারদের প্রতি মুসলিমদের আচরণের পার্থক্য খুবই স্বাভাবিক।” ক্রুসেডারদের প্রতি সালাহউদ্দীনের আচরণ সংক্রান্ত পরিচ্ছেদে নারী, শিশু, বৃদ্ধদের প্রতি সালাহউদ্দীনের এমন অনেক আচরণের কথা বলা হয়েছে।
টিকাঃ
[৪০] সূরাহ আন-নিসা ৪:৭৬
[৪১] আল-বুখারি ও মুসলিম
📄 মুসলিম ভূখণ্ডের মুক্তি সমগ্র উম্মাহ’র দায়িত্ব
ইসলামী বিধান হলো, মুসলিমদের কোনো ভূখণ্ড শত্রু কাফিরদের দখলে চলে গেলে তা পুনরুদ্ধার করতে সমগ্র উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে তাদের সবাই যদি এ আসমানি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তাহলে সবাই গুনাহগার হবে।
আল্লাহ বলেন:
“তোমরা যদি (যুদ্ধে) অগ্রসর না হও, তাহলে তিনি তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন আর তোমাদেরকে অন্য জাতি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে দেবেন। আর তোমরা তাঁর কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। আর আল্লাহ সবকিছুর উপর কর্তৃত্বশীল”।
আল্লাহ আরো বলেন,
“বেরিয়ে পড়ো, (স্বাস্থ্য, বয়স, সম্পদ বা অস্ত্রের দিক থেকে) অবস্থা ভারীই হোক আর হালকাই হোক। আর আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে যুদ্ধ করতে থাকো। এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে।”
এই মূলনীতির ভিত্তিতেই সালাহউদ্দীন বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণের সেনাদেরকে এক ইসলামের পতাকার নিচে সমবেত করেন। তারা এক দেহের মতো হয়ে সম্মিলিতভাবে শত্রুদেরকে আক্রমণ করে। কেন হবে না? এক ইসলামের পতাকাতলে আসলে তারা একে অপরের প্রতি এমনই দয়ালু হয়ে ওঠে যেমনটা দেহের এক অঙ্গে ব্যথা হলে সকল অঙ্গই অস্থির হয়ে যায়।
বিভিন্ন জাতি-গোত্র-ভাষা-বর্ণের মানুষেরা এক পতাকাতলে এসে গেলে তাদের মাঝে তাকওয়া ছাড়া আর কোনো শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি থাকে না। আরব-অনারব, সাদা-কালো দিয়ে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ হয় না। তারা সকলে যে এক ঈমান, এক দ্বীন, এক কুর'আন ও আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী। যত বিঘত ভূমিতে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়, যত কেল্লায় ইসলামের পতাকা ওড়ে, সবই তো তাদের সমষ্টিগত মালিকানা।
এক কবি বলেন:
স্বদেশ আমার ইসলাম নীলনদ কিংবা শাম,
আল্লাহর যিকর হলেই হলো যা-ই হোক স্থানের নাম।
সালাহউদ্দীনের শত্রুরা জীবনকে ভালোবাসতো আর তাঁর সৈনিকেরা শাহাদাতকে ভালোবাসতো। শাহাদাতের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে শহীদের কাছে মনে হয়:
মৃত্যু তো আসবেই থাকি আমি যেকোনো শহরে,
হোক না তাহলে সে মৃত্যু ইসলামেরই চাদরে।
বলবো আমি, "দৌড়ে এসেছি, হে আল্লাহ! তোমার পথ।
সফল হয়ে গিয়েছি আমি, কা'বার রবের শপথ!”
ভাষা-বর্ণ নির্বিশেষে যে কেউ আল্লাহকে রব্ব, ইসলামকে দ্বীন আর মুহাম্মাদকে নবী ও রাসূল বলে মেনে নিয়েছে, সে-ই সালাহউদ্দীনের সেনা। কারণ তারা যে উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে যুদ্ধ করতো, তার শেষ প্রান্তে মৃত্যু নেই, আছে শাহাদাত।
টিকাঃ
[৪২] সূরাহ আত-তাওবাহ ৯:৩৯
[৪৩] সূরাহ আত-তাওবাহ ৯:৪১