📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী 📄 তাকওয়া অর্জন ও হারাম বর্জন

📄 তাকওয়া অর্জন ও হারাম বর্জন


“মু'মিনদেরকে দৃঢ়পদ রেখো।” অচিরেই আমি কাফিরদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করবো। কাজেই তাদের স্কন্ধে আঘাত হানো। আঘাত হানো প্রতিটি আঙ্গুলের গিঁটে গিঁটে। এর কারণ হলো তারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধিতা করে। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, (তাদের জেনে রাখা দরকার যে,) আল্লাহ শাস্তিদানে বড়ই কঠোর।”

তিনি আরো ঘোষণা করেন:
“আর আল্লাহ যে এটা করেছিলেন, এর উদ্দেশ্য তোমাদেরকে সুসংবাদ দান করা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যাতে এর মাধ্যমে তোমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। কারণ সাহায্য তো একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। আল্লাহ তো মহাপরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞানী।”

সালাহউদ্দীন হারাম কর্মকাণ্ড ও অনৈতিকতা প্রতিরোধে খুবই তৎপর ছিলেন। তিনি মিশরের শাসনভার পাওয়ার পর সবরকম প্রকাশ্য পাপাচার ও অশ্লীলতা বন্ধের ব্যবস্থা নেন। এ ধরনের পাপাচার মিশরে খুবই প্রসার লাভ করেছিলো। বিশেষ করে ফাতিমি যুগে নওরোজ (নববর্ষ) জাতীয় উৎসবগুলো অশ্লীলতায় সয়লাব হয়ে যেতো। আল-মাকরিযি তাঁর বই খুতুত-এ বলেন যে, এসব পালা-পার্বণে প্রকাশ্য অশ্লীলতা-অনৈতিকতা ছিলো খুবই স্বাভাবিক। এই দিনে বহু লোকবেষ্টিত হয়ে "নওরোজ রাজ" বাহনে চড়তেন। সম্ভ্রান্তদের উপর আরোপিত এক ধরনের ট্যাক্স এই দিনে সংগ্রহ করা হতো। চরিত্রহীন লোকেরা এসে রাজপ্রাসাদের নিচে জড়ো হয়ে ফাতিমি খলিফার মনোরঞ্জন করতো। উচ্চস্বরে হট্টগোল করা হতো, মদপান করা হতো আর মানুষের গায়ে মদ ও পানি ছিটানো হতো। সম্মানিত কোনো লোক এই দিনে ঘরের বাইরে বের হলে পরিষ্কার জামাকাপড় নিয়ে ফিরতে পারতো না।

সালাহউদ্দীনের জীবনের আধ্যাত্মিক অংশের ব্যাপারে আল-কাযী বাহাউদ্দীন লিখেন:
“তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন বিনয়ী এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করা এক মুখলিস বান্দা। কুর'আন তিলাওয়াত করা হলে তিনি তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন ও কান্না করতেন। তিনি ইসলামী উপলক্ষগুলোকে ভালোবাসতেন। দার্শনিক ও বিদ'আতি গোষ্ঠীগুলোকে ঘৃণা করতেন। রাজ্যে কোনো মুলহিদ-যিন্দিকের খবর পেলে তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দিতেন। তিনি ইসলামের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে সবসময় কঠোর ছিলেন। তিনি যথাসময়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতেন। তাঁর একজন ব্যক্তিগত ইমাম ছিলেন, যিনি তাঁকে সালাতে ইমামতি করতেন। সেই ইমাম অনুপস্থিত থাকলে অন্য কোনো নেককার লোকের ইমামতিতে সালাত পড়তেন। তিনি সুন্নাত সালাতগুলোও যথাযথভাবে আদায় করতেন। তিনি রাতের শেষাংশে কিছু রাক'আত নফল সালাত পড়তেন। আর রাতে উঠতে না পারলে ফজরের আগে পড়ে নিতেন।"

আর-রাওদাতাইন ফি আখবারুদ দাওলাতাইন কিতাবে আশ-শামাহ বলেন যে, তিনি সালাহউদ্দীনকে মৃত্যুপূর্ব অসুস্থতাকালেও সালাত পড়তে দেখেছেন। শেষ তিনদিনে যখন অবচেতন ছিলেন, তখনই কেবল তাঁর সালাত ছুটে যায়। সফররত অবস্থায় সালাতের সময় আসলে তিনি বাহন থামিয়ে সালাত পড়ে নিতেন।

তিনি তাঁর সন্তানদেরকে ও তাঁর নিয়োগ করা গভর্নরদেরকে সৎ, ধার্মিক ও আল্লাহর হুকুম-আহকামের প্রতি অনুগত, জনগণের অধিকার সংরক্ষণকারী, ও ন্যায়পরায়ণ থাকার তালিম দিতেন। মুসলিম ইতিহাসবিদদের থেকে পুল বর্ণনা করেন যে, সালাহউদ্দীন একবার তাঁর সন্তান আয-যাহিরকে বলেছিলেন:
"আমি তোমাকে আদেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করার এবং তাঁর বিধি-বিধানগুলো প্রতিষ্ঠিত করার। কারণ এটিই নাজাতের পথ। রক্ত ঝরানোর ক্ষেত্রে সতর্ক হও, কারণ রক্ত কখনো (প্রতিশোধ না নিয়ে) থেমে থাকে না। আমি আদেশ দিচ্ছি আমার প্রতিনিধি এবং আল্লাহর বান্দা হিসেবে তুমি জনগণের অধিকার সংরক্ষণ করবে ও তাদের প্রতি যত্নশীল হবে।"

এই ছিলেন সালাহউদ্দীন! এমন বান্দাকে কি আল্লাহ বিপদের মুখে একলা ছেড়ে দিতে পারেন?

আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ বলেন:
“তাঁকে যখন বলা হলো যে, মুসলিম সেনাবাহিনীকে শত্রুরা হারিয়ে দিয়েছে, তখন তিনি সেজদায় পড়ে বলতে থাকেন, 'হে আল্লাহ! আমার দুনিয়াবি আসবাব শেষ হয়ে গেছে। তাই আমি আপনার দ্বীনকে বিজয়ী করতে ব্যর্থ হয়েছি। আপনার সাহায্য, আপনার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, আর আপনার রহমতের উপর ভরসা করা ছাড়া আর কিছুই বাকি নেই। আপনিই আমার জন্য যথেষ্ট, আর আপনি হলেন শ্রেষ্ঠ কর্মবিধায়ক।”

তাঁকে সালাতে এত কাঁদতে দেখেছি যে, অশ্রু গড়িয়ে তাঁর দাড়ি ও মাদুর ভিজে গিয়েছিলো। তিনি কী পড়তেন তা-ই শোনা যাচ্ছিলো না। তারপর একদিন তাঁকে খবর দেওয়া হলো যে মুসলিম সেনাবাহিনী জয়লাভ করেছে। তিনি জুমু'আর দিনে যুদ্ধ করতেন যাতে হাদীসে বর্ণিত দু'আ কবুলের সেই বিশেষ মুহূর্তে করা দু'আর সুযোগ নিয়ে তিনি জয়লাভ করতে পারেন।”

খুলাফায়ে রাশেদীন তাঁদের সৈনিকদের আল্লাহকে ভয় করা ও হারাম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতেন, সমগ্র উম্মাহকে ইসলামী নিয়ম-কানুন মেনে চলার হুকুম দিতেন। সালাহউদ্দীনও তাঁদের পথ অনুসরণ করেন। পারস্য জয় করতে যাওয়ার সময় সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে লেখা এক চিঠিতে 'উমার বিন খাত্তাব (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) বলেন:
“পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমি আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করার। কারণ তাকওয়াই হলো শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বোত্তম প্রস্তুতি ও সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধাস্ত্র। আপনি এবং আপনার সাথে যারা আছে, সবাই যেন হারাম কাজ ত্যাগ করে। কারণ হারামে লিপ্ত হওয়াই আমাদের উপর শত্রুদের প্রাধান্য বিস্তারের কারণ। মুসলিমরা জয়লাভ করে আল্লাহর প্রতি তাদের আনুগত্য এবং আল্লাহর প্রতি শত্রুদের অবাধ্যতার কারণে। শত্রুদের পার্থিব শক্তি-সরঞ্জাম আমাদের চেয়ে বেশি। আল্লাহর আনুগত্যই আমাদের শক্তি। আমাদের উভয় পক্ষের গুনাহ যদি সমান হয়ে যায়, তাহলে তারা পার্থিব শক্তিবলে আমাদেরকে হারিয়ে দেবে। মনে রাখবেন, ফেরেশতাদ্বয় আপনার আমলনামা লিখছে এবং তাঁদের প্রতি লজ্জিত থাকা উচিত। এমনটা বলবেন না যে, 'আমাদের শত্রুরা আমাদের চেয়ে বেশি আল্লাহর অবাধ্য। তাই আমরা ভুল করলেও আল্লাহর গযব আমাদের উপর আসবে না।' আল্লাহ যেভাবে বনী ইসরাঈলের উপর অন্যদেরকে কর্তৃত্ব দিয়েছেন, সেভাবে আপনার উপরও অন্যদেরকে কর্তৃত্ব দিয়ে দিতে পারেন। তিনি মাজুসিদেরকে (অগ্নিপূজারী) তাদের উপর ক্ষমতা দিয়েছিলেন। আল্লাহর কাছে দু'আ করুন তিনি যেন আপনাদের সাহায্য করেন এবং শত্রুদের উপর আপনাদেরকে বিজয় দান করেন। আপনার ও আমার জন্য আল্লাহর কাছে এই দু'আই করি।”

মোটকথা, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মান্য করা ছাড়া মুসলিম উম্মাহ কখনোই শত্রুদের উপর জয়লাভ করতে পারবে না। বিজয় ও চিরস্থায়ী জিন্দেগির রাস্তা কেবল এটিই।

টিকাঃ
[৩৫] সূরাহ আল-আনফাল ৮:১২-১৩
[৩৬] সূরাহ আল-আনফাল ৮:১০
[৩৭] পহেলা বৈশাখে উৎসবমুখর পরিবেশে খাজনা আদায়ের মুঘল সংস্কৃতির সাথে সাদৃশ্য লক্ষণীয়- বাংলা অনুবাদক
[৩৮] সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে জুমু'আর দিনে একটি সময় আছে যখন বান্দা আল্লাহর কাছে দু'আ করলে তা কবুল করা হয়। আবু হুরায়রা (রাঃ) হাদিসটি বর্ণনা করার সময় বলেন, সময়টি খুব অল্প। আর আবু বুরদা ইবনে আবু মূসা আশআরী (রা) বর্ণিত হাদিসে আছে সময়টি হলো, ইমামের বসা থেকে নামায শেষ করার মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে। - সম্পাদক

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী 📄 পূর্ণ প্রস্তুতি ও অটুট লক্ষ্য

📄 পূর্ণ প্রস্তুতি ও অটুট লক্ষ্য


ইতিহাসবিদরা একমত যে, সালাহউদ্দীন জেরুজালেম মুক্ত করতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। দ্বীনি ও নৈতিক প্রস্তুতির মতোই তিনি জোরেশোরে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করেন। যেমন, তিনি আলাদা একটি বিভাগ খোলেন যাদের কাজ ছিলো সৈন্যদের এক শিবির থেকে আরেক শিবিরে ঘুরে ঘুরে তাদের ঘোড়া, অস্ত্র, সামরিক পোশাকসহ সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। এছাড়া তিনি অস্ত্র ও জাহাজশিল্পকে উন্নত করা, বিস্ফোরক, মাইন, মিনজানিক ও অন্যান্য সামরিক হাতিয়ার তৈরির ক্ষেত্রেও খুব তৎপর ছিলেন।

তিনি নৌবাহিনীর ব্যাপারেও খুব সজাগ ছিলেন। এ সংক্রান্ত আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক অবস্থা তদারকির জন্যও তাঁর আলাদা বিভাগ ছিলো। এই নৌবহর বিভাগের প্রধানকে বলা হতো সাগরের আমির বা পানিপথের আমির।

এই সর্বব্যাপী প্রস্তুতি নিয়েই তিনি দৃঢ় প্রত্যয় সহকারে শত্রুদের উপর আক্রমণ করেন এবং তাদেরকে পরাস্ত করতে সক্ষম হন। আর এভাবেই সালাহউদ্দীনের হাতে শত্রুরা পরাজিত হয় এবং ইসলামের গৌরব পুনরুদ্ধার হয়।

টিকাঃ
[৩৯] মিনজানিক এক ধরণের গুলতি যা পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর যুদ্ধক্ষেত্রে সুরক্ষিত দূর্গ আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হতো। - সম্পাদক

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী 📄 মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর রাজনৈতিক ঐক্য

📄 মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর রাজনৈতিক ঐক্য


৫৬৭ হিজরিতে ফাতিমি খলিফার মৃত্যু হলে সালাহউদ্দীন মিশরের শাসক হন। তিনি দক্ষিণ মিশর (নুবিয়া), ইয়েমেন ও হিজায জয় করে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন। লোহিত সাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকা তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীনে আসে। এছাড়া নূরুদ্দীনের মৃত্যুর পর শামে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লে সালাহউদ্দীন দামেস্ক, হালাব ও অন্যান্য কিছু শহর নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এভাবে উত্তর ইরাক (কুর্দিস্তান), শাম, ইয়েমেন, মিশর, বারকাহ ও অন্যান্য আরো অনেক শহর মিলে বিশাল এক মুসলিম সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে।

জেরুজালেম মুক্ত করার ক্ষেত্রে এই সম্মিলিত রাষ্ট্র গঠন করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুসলিম ভূমিগুলো যখন একজন মুমিন নেতা, অভিজ্ঞ বীর, সাহসী ও অভিজ্ঞ শাসক ও ন্যায়পরায়ণ রাজার অধীনে দ্বীনি ও রাজনৈতিক ঐক্য নিয়ে অবস্থান করে, তখন শত্রুদের বিরুদ্ধে ইসলামের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। দুষ্ট কাফিরদের হাত থেকে মুসলিমদের প্রথম কিবলা, তৃতীয় সবচেয়ে সম্মানিত মসজিদ, মি'রাজের স্থান ও 'ঈসার ('আলাইহিসসালাম) জন্মভূমিকে উদ্ধার করতে সালাহউদ্দীন এ সবকিছুই বাস্তবায়ন করেছেন。

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী 📄 আল্লাহর কালেমাকে উচ্চে তুলে ধরার লক্ষ্য

📄 আল্লাহর কালেমাকে উচ্চে তুলে ধরার লক্ষ্য


ইসলামী শরীয়তে জিহাদে যাওয়ার আগে সৈনিককে অবশ্যই নিয়্যাত ঠিক করতে হবে। তাকে যুদ্ধে যেতে হবে শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়। গানিমাত, খ্যাতি, অনৈসলামী চেতনা কিংবা নিফাকের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে গেলে হবে না। আল্লাহ বলেন:
"ঈমানদাররা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় আর কাফিররা যুদ্ধ করে তাগুতের রাস্তায়।”

রাসূলুল্লাহকে এমন ব্যক্তিদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো যে বীরত্ব, জাতিয়তাবাদী চেতনা বা নিফাকের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে যায়। এমন ব্যক্তিদের মাঝে কে আল্লাহর রাস্তার যোদ্ধা তা জানতে চাওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে আল্লাহর কালিমাকে সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য যুদ্ধ করে, সে-ই আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে।”

এই ইসলামী নিয়্যাত নিয়েই সালাহউদ্দীন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন। আল-কাদি বাহাউদ্দিন ইবনু শাদ্দাদের লেখা আন-নাওয়াদির আস- সুলতানিয়্যা কিতাবের একটি ঘটনা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি লিখেন:
“আমি তাঁর কাছে যা শুনেছি, তা বর্ণনা করছি। ৫৮৪ হিজরির যুলকা'দা মাসে মিশরীয় সৈন্যদেরকে ছুটি দেন। তাঁর ভাই আল-মালিক আল- 'আদিলের নেতৃত্বে মিশরীয় সৈনিকেরা দেশে ফিরে যায়। জেরুসালেমে 'ঈদের সালাত শেষে তাদেরকে বিদায় জানাতে সালাহউদ্দীন তাদের সাথে এগোতে থাকেন। তিনি আস্কালন পর্যন্ত তাদের সাথে যান। ফিরে আসার সময় তিনি উপকূলীয় অঞ্চল হয়ে অ্যাকর দিয়ে ফেরত আসার কথা ভাবেন। তাহলে উপকূলীয় শহরগুলোর অবস্থাও তদারক করা যাবে। তাঁর সাথীরা এমনটা করতে নিষেধ করেন। কারণ মিশরীয় সেনাদের চলে যেতে দেখে টায়ারের ক্রুসেডাররা আক্রমণ করে বসতে পারে। তিনি এ কথায় কান দিলেন না। তাঁর ভাইকে বিদেয় দিয়ে আমরা তাঁর সাথে উপকূলীয় এলাকা হয়ে অ্যাকরের দিকে চললাম। তখন ছিলো শীতকাল আর উত্তাল সাগরে ছিলো পাহাড়সম ঢেউ। আমি দৃশ্য অবলোকনে বুঁদ হয়ে ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, 'আমি আপনাকে কিছু কথা জানাতে চাই। আল্লাহ যদি আমাকে উপকূলের বাকি অংশগুলো জয় করার তাওফিক দেন, তাহলে আমি শহরগুলো (আমার ছেলেদের মাঝে) ভাগ-বাটোয়ারা করে দেবো। তারপর আমার উইল লিখে আপনার হাতে দিয়ে জাহাজে করে ক্রুসেডারদের দ্বীপগুলোতে চলে যাবো, যাতে কুফফারদের সব দলগুলোকে পরাস্ত করতে পারি অথবা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে যেতে পারি।”

আমার কাছে তাঁর কথা শুনে আমার খুবই খুশি লাগলো। আমি বললাম, 'আপনার নিজের ও সৈনিকদের জীবনের ব্যাপারে এমন ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে না। সৈনিকেরা ইসলামের প্রহরী।' তিনি বললেন, 'আমাকে একটি ফাতওয়া জানান। দুই মৃত্যুর মধ্যে কোনটি বেশি উত্তম?' আমি বললাম, 'আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত।' তিনি বললেন, 'সেটাই আমি চাই।'

কতই না বিশুদ্ধ নিয়্যাত! কতই না সাহসী সে বীর! রাহিমাহুল্লাহ! হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে তিনি তাঁর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তিনি আপনার রহমত প্রত্যাশী ছিলেন। তাঁকে আপনি রহম করুন।

যুদ্ধাবস্থায় আল্লাহর কাছে তাঁর দু'আ করার কথা তো বলাই হলো। তিনি দু'আ করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমার দুনিয়াবি আসবাব শেষ হয়ে গেছে। তাই আমি আপনার দ্বীনকে বিজয়ী করতে ব্যর্থ হয়েছি। আপনার সাহায্য, আপনার রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, আর আপনার রহমতের উপর ভরসা করা ছাড়া আর কিছুই বাকি নেই। আপনিই আমার জন্য যথেষ্ট, আর আপনি হলেন শ্রেষ্ঠ কর্মবিধায়ক।”

শত্রুদের প্রতি তাঁর মহান আচরণ দেখেও বোঝা যায় যে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধ করতেন, দুনিয়াবি ক্ষমতার লালসা বা রক্তপিপাসার কারণে নয়। কী পশ্চিমা, কী প্রাচ্যীয়, কী ওরিয়েন্টালিস্ট, কী মুসলিম – সকল ইতিহাসবিদই তাঁর এমন আচরণের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। ক্রুসেডারদের মধ্যকার গরীব, বিকলাঙ্গ ও বয়স্কদেরকে টাকা ও সওয়ারির ব্যবস্থা করে দেওয়া, মুক্তিপণের বিনিময়ে সবাইকে ছেড়ে দিতে রাজি হওয়া এ সবই তাঁর মহানুভবতার জীবন্ত দৃষ্টান্ত। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এমন আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আলোচিত হবে ইনশাআল্লাহ।

এ প্রসঙ্গে হাত্তি বলেন, “আটাশি বছরের ব্যবধানে সাধারণ মুসলিমদের প্রতি ক্রুসেডারদের আচরণ আর সাধারণ ক্রুসেডারদের প্রতি মুসলিমদের আচরণের পার্থক্য খুবই স্বাভাবিক।” ক্রুসেডারদের প্রতি সালাহউদ্দীনের আচরণ সংক্রান্ত পরিচ্ছেদে নারী, শিশু, বৃদ্ধদের প্রতি সালাহউদ্দীনের এমন অনেক আচরণের কথা বলা হয়েছে।

টিকাঃ
[৪০] সূরাহ আন-নিসা ৪:৭৬
[৪১] আল-বুখারি ও মুসলিম

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية