📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 সালাহউদ্দীনের জীবনাবসান

📄 সালাহউদ্দীনের জীবনাবসান


১. ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সালাহউদ্দীন স্বেচ্ছায় সন্ধিচুক্তি করেননি। কিন্তু সৈনিকদের অবাধ্যতা ও বিরক্তির কারণে তিনি তা করতে বাধ্য হন। আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করা এবং সিরিয়া ও ফিলিস্তিনকে পাক-পবিত্র করার জন্য তিনি জিহাদ চালিয়ে যেতে খুবই উদগ্রীব ছিলেন। তাঁর আশংকা হচ্ছিলো যে ক্রুসেডাররা তাদের শাসনাধীন শহরগুলোতে সবরকমের অনাচার-অনর্থ চালিয়ে যাবে। তারা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণ করে দখল করে বসবে, এমন আশংকাও অমূলক ছিলো না।

আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ তাঁর আন-নাওয়াদির আস-সুলতানিয়া কিতাবে লেখেন:
“আল্লাহর কসম! তিনি সমঝোতা চাননি। সমঝোতা সংক্রান্ত এক কথোপকথনে তিনি বলেন, 'আমি তাদের সাথে সমঝোতা করতে চাই না। কারণ, এমনটা করলে তারা হয়তো আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের সাথে লড়াই করে শহরগুলো পুনর্দখল করতে চাইবে। তাদের প্রত্যেকে একটা করে শহর শাসন না করা পর্যন্ত থামবে না।”

যা-ই হোক, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো এই যুদ্ধের পর উভয় পক্ষই রামাল্লা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়। উভয় পক্ষের জন্যই যুদ্ধটি ছিলো হতাশাজনক। সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ও গঠনমূলক কাজের জন্য উভয় দলই চাইছিলো পরিস্থিতি শান্ত হোক। চুক্তি স্বাক্ষরের পর মুসলিম-খ্রিষ্টান উভয় পক্ষই যে কী পরিমাণ খুশি হয়, তার বর্ণনা দিয়ে আস-সুলুক কিতাবে আল-মাকরিযি বলেন, “চুক্তির দিনটি ছিলো স্মরণীয় একটি দিন। দীর্ঘ যুদ্ধের পর উভয় পক্ষেই স্বস্তির সুবাতাস বইতে থাকে।”

সালাহউদ্দীন ঘোষণা করেন, “চুক্তির কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেছে। অতএব, তাদের মধ্য থেকে কেউ আমাদের শহরগুলোতে ঢুকতে চাইলে ঢুকুক। আমাদের কেউ ওদের শহরগুলোতে ঢুকতে চাইলে তাতেও আপত্তি নেই।” শান্তিচুক্তির পর ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে। মুসলিমরা ব্যবসায়িক কাজে ইয়াফফা যাতায়াত করতে থাকে। ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে আর জনগণ শান্তি-নিরাপত্তা উপভোগ করতে থাকে।

শুধু তা-ই না। খ্রিষ্টানদের অবাধ যাতায়াতের জন্য সুলতান সালাহউদ্দীন জেরুজালেমের দরজা খুলে দেন। বিপুল সংখ্যক খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীর খবর পেয়ে রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট শংকিত হয়ে যান যে, সালাহউদ্দীন বিরক্ত হতে পারেন। তাই তিনি সুলতানকে অনুরোধ করেন যেন লোকসংখ্যা কমিয়ে আনা হয় এবং রিচার্ডের বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো খ্রিষ্টানকে জেরুজালেমে যেতে না দেওয়া হয়। কিন্তু সালাহউদ্দীন তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এই তীর্থযাত্রীরা দূর-দূরান্ত থেকে এই পবিত্র ভূমিতে আসছে। আমার কোনো অধিকার নেই তাদেরকে বাধা দেওয়ার।” তিনি খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের প্রতি সদয় আচরণ করেন, তাদেরকে খাবার প্রদান করেন এবং তাদের সাথে কুশলাদি বিনিময় করেন।

পূর্ব থেকে পশ্চিম সমস্ত রাজাদেরকে সালাহউদ্দীন সহনশীলতা, ক্ষমা, সুন্দর আচরণ ও নৈতিকতার মহান শিক্ষা দিয়ে গেলেন। রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট দেশে ফেরার আগেই এসবকিছু ঘটে। সালাহউদ্দীনকে আল্লাহ রহম করুন এবং তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন。

২. রামল্লা চুক্তির পর সালাহউদ্দীন জেরুসালেমের অবস্থা পরিদর্শন, ব্যবস্থাপনা, বিদ্যালয় ও হাসপাতাল স্থাপন ও প্রশাসন তদারক করতে যান। তিনি হাজ্জে যেতে চান, কিন্তু ক্রুসেডারদের কাছ থেকে ক্ষতির আশংকায় রাজকুমাররা তা না করার পরামর্শ দেন। তিনি পরামর্শ মেনে নেন। তারপর উপকূলে গিয়ে ক্রুসেডারদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত দূর্গগুলোর পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার কাজে মন দেন। ২৬শে শাওয়াল তিনি জেরুজালেম থেকে নাবলুস, বিসান, টাইবেরিয়াস, বৈরুত হয়ে দামেস্কে যান। জনগণ দোকান-পাট বন্ধ করে তাঁকে বরণ করে নিতে এগিয়ে আসে। এমনটাই হওয়ার কথা। কারণ আল্লাহর ইচ্ছায় তিনিই তাদের দেশে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দমন করে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছেন।

দামেস্কে এসে তিনি রাষ্ট্রীয় কাজ তদারক, দানের উপযুক্তদের মাঝে অর্থ বিতরণ, সৈনিকদের ছুটিছাটা, জনগণের অভিযোগ শ্রবণ ইত্যাদি কাজে মন দেন। দামেস্ক ছিলো শান্তিময় এক জায়গা। সেখানে তিনি ভাই আল-'আদিল এবং সন্তানদের সাথে শিকারে বের হন। দীর্ঘ দিবস রজনীর পরিশ্রমের পর অবশেষে তিনি একটু শান্তির সুবাতাস খুঁজে পান। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ বলেন যে, দামেস্কের প্রশান্তি পেয়ে তিনি মিশরে আর ফিরে না যাওয়ার ইচ্ছা করেন। তিনি ইবনু শাদ্দাদকে দামেস্কে ডাকিয়ে আনেন। ইবনু শাদ্দাদ বলেন, “আমি তাঁর কক্ষে যাওয়ার পর তিনি আমাকে স্বাগত জানান, জড়িয়ে ধরেন এবং কান্না করেন। আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন।”

৫৮৯ হিজরির ১৪ই সফর পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকেন। তারপর হাজ্জফেরত জনগণকে অভ্যর্থনা জানাতে বের হন। হাজীদের দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাদের মধ্যকার একজন হওয়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করেন। কিন্তু এই মহান নিয়ামত তাঁর তাকদিরে ছিলো না।

৩. হাজীদের সাথে মোলাকাত করে ফিরে এসেই তিনি পীতজ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। দিন দিন তাঁর অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে। চিকিৎসকরা শেষমেশ সব আশা ছেড়ে দেন। তাঁর রোগের কথা যখন ঘোষণা করা হয়, জনগণ ভীত ও দুঃখিত হয়ে পড়ে। অনেকে দামস্কের দূর্গের কাছে জড়ো হয়ে তাঁর খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করে, কেউবা আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকে। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ এবং আল-কাযী আল-ফাদল ছাড়া আর কেউই তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি পাননি। সুলতানের অসুস্থতার পুরো সময়টা এই দুজন তাঁর সঙ্গ দেন।

ষষ্ঠ দিন। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ তখন সুলতানের সাথে। ভৃত্যরা সুলতানের ঔষধ খাওয়ার পর পান করার জন্য ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসে। কিন্তু সুলতানের কাছে সে পানি খুব গরম মনে হলো। অন্য পানি আনা হলে তিনি বেশি ঠাণ্ডা বলে অভিযোগ করেন। তিনি বললেন, "আল্লাহ মহান! কারো সামর্থ্য নেই পানি পরিবর্তন করার।” তিনি আসলে রাগান্বিত হয়ে এ কথা বলেননি। ইবনু শাদ্দাদ আরো বলেন, "আল-কাযী আল-ফাদল আর আমি বাইরে গিয়ে কাঁদতে লাগলাম।" আল-কাদি আল-ফাদল বলেন, "তাঁর মতো উত্তম চরিত্রের অধিকারী কাউকে আর কখনো দেখতে পাবো না। আল্লাহর কসম! এমনটা যদি অন্য কোনো রাজার সাথে ঘটতো, তিনি চাকরকে পেয়ালা দিয়ে আঘাত করে বসতেন।"

ইবনু শাদ্দাদ বলেন:
"দশম দিনে তাঁকে দুইবার ইঞ্জেকশান দেওয়া হয়। তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে অল্প একটু পানি পান করেন। মানুষ সেদিন খুবই খুশি ছিলো। যখন বলা হলো তাঁর পা ঘামছে (জ্বর ছাড়ার লক্ষণ), তখন আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলাম। যখন জানানো হলো তাঁর সারা শরীর ঘামছে, তখনও আমরা খুশি হলাম। এগারো তম দিনে অর্থাৎ, ২৬শে সফর বলা হলো যে তাঁর শরীর এত ঘেমেছে যে বিছানা, মাদুর ও মেঝে ভিজে গেছে। ডাক্তাররা তাঁর জন্য কিছুই করতে পারলেন না।”

সালাহউদ্দীনের বড় ছেলে আল-মালিক আল-আফদাল নূরুদ্দীন 'আলী নিশ্চিত করলেন যে, সুস্থতার আর কোনো আশা নেই আর তাঁর পিতা এখন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর। তিনি জনগণকে শপথ করালেন যে, তাঁর পিতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। তাঁর মৃত্যুর পর তা নূরুদ্দীনের হাতে আসবে। আন-নাওয়াদির আস-সুলতানিয়্যা কিতাবে ইবনু শাদ্দাদ শপথটির কথাগুলো উল্লেখ করেন:
“এখন আমার নিয়্যাত ইখলাসপূর্ণ। আমি সুলতানের জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি অনুগত থাকবো। আমি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা করবো এবং তজ্জন্য আমার সম্পদ ও সময় ব্যয় করবো। আমার তলোয়ার ও সৈনিকেরা তাঁর আজ্ঞাধীন। তারপর তাঁর ছেলে আল-আফদাল নূরুদ্দীন 'আলী হবেন তাঁর উত্তরাধিকারী। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর আনুগত্য করবো, রাষ্ট্রকে নিজের জান-মাল ও তলোয়ার দিয়ে রক্ষা করবো এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবো। আমার ভেতর-বাহির একই (অর্থাৎ, মুখে যা বলছি অন্তরেও তা আছে)। আল্লাহই সর্বোত্তম সাক্ষী।”

৪. ২৭শে সফর বুধবার অসুস্থতার বারোতম দিনে সালাহউদ্দীনের স্বাস্থ্যের অবস্থা আরো খারাপ হয় এবং তিনি একরকম কোমায় চলে যান। একজন কারীকে কুর'আন তিলাওয়াত করার জন্য আনা হয়। তিনি যখন এই আয়াতে পৌঁছান, সালাহউদ্দীনের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে:
“তিনি (আল্লাহ) ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাঁর উপরই আমার ভরসা।”
২৭শে সফর, ৫৮৯ হিজরি, ফজর সালাতের পর তাঁর রূহ মহান রব্বের নিকট ফিরে যায়।

৫. সালাহউদ্দীনের মৃত্যু ছিলো মুসলিমদের জন্য বিরাট এক ধাক্কা। ইবনু শাদ্দাদ ছিলেন এর চাক্ষুস সাক্ষী। তিনি সেসময়ে মুসলিমদের মনোবেদনার বর্ণনা দিয়ে বলেন:
“এ ছিলো এক শোকের দিন। খুলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ জনের মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে উম্মাহ এমন শোকে আর কোনোদিন মূহ্যমান হয়ে পড়েনি। সেই দূর্গ, সেই জাতি ও এই পৃথিবী জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। আল্লাহর কসম! আমি কিছু মানুষকে তাঁর জন্য নিজের জীবন কুরবানি করে দেওয়ার কথা বলতে শুনেছি। এমন গুরুতর কথা আমি কখনো কাউকে বলতে শুনিনি। এমন কুরবানি যদি জায়েয হতো, তাহলে মনে হয় তা কবুল হয়ে তাঁর জীবনই বেঁচে যেতো। তাঁর ছেলেরা রাস্তায় বেরিয়ে গিয়ে কাঁদতে থাকে। মানুষ এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। যুহরের ওয়াক্ত পর্যন্ত এই ছিলো পরিস্থিতি। 'আসর সালাতের আগে তাঁকে দাফন করা হয়। রাহিমাহুল্লাহ! তাঁর ছেলে আল-মালিক আয-যাফির শোকার্ত জনতাকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন।"

৬. আল-কাযী আল-ফাদলের আনা একটি কাফনে মোড়া অবস্থায় 'আসরের আগে সালাহউদ্দীনকে তাঁর কবরের আবাসস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর কফিন দেখামাত্র সবাই একসাথে এমনভাবে কান্না জুড়ে দেয় যে, মনে হতে থাকে একজন মানুষই এভাবে কাঁদছে। দামেস্কের দূর্গের প্রাঙ্গনে তাঁকে দাফন করা হয়। তিন বছর পর আল-উমাওয়াই মাসজিদের কাছেই এক নেককার লোকের কাছ থেকে একটি ঘর ক্রয় করেন আল-মালিক আল-ফাদল। তারপর তিনি একে সমাধির মতো বানান। 'আশুরা'র দিনে (১০ই মুহাররম) বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তিনি সালাহউদ্দীনের দেহাবশেষ সেখানে স্থানান্তর করেন এবং আল-উমাওয়াই মাসজিদের কাছে তিন দিন শোক পালন করেন।

সালাহউদ্দীনের মৃত্যুর দিন মুসলিমরা এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্রকে হারায়, যিনি মানুষের হৃদয়ে সম্মানের জায়গা করে নিয়েছিলেন। মায়েদের জন্য কতই না কঠিন এমন আরেকটি সন্তানের জন্ম দেওয়া, যার মাঝে একসাথে এত গুণাবলির সম্মেলন ঘটেছে: মহান, কুরবানিওয়ালা, সৎ এবং বীর যোদ্ধা। আল্লাহ তাঁকে আখিরাতে সম্মানিত করুন, তাঁর কবরকে আলোকিত করুন এবং জান্নাতে তাঁকে উঁচু মাকাম দান করুন।

৭. মৃত্যুকালে সালাহউদ্দীন (রাহমাতুল্লাহ 'আলাইহি) এর বয়স ছিলো সাতান্ন বছর। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ সাতচল্লিশ দিরহাম ও এক দিনার। এছাড়া কোনো জমি, বাগান, খামার বা সম্পত্তি তিনি রেখে যাননি।

৮. তাঁর মৃত্যুর পর অসংখ্য কবি তাঁকে নিয়ে কাব্যরচনা করে। তারা তাঁর মহান গুণাবলি বর্ণনা করে, যেমন জনগণের প্রতি তার ভালোবাসা। মুসলিমদের পবিত্র ভূমিসমূহের প্রতিরক্ষা ও হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করার প্রতীক হিসেবে তাঁকে তুলে ধরা হয়। এসব কবিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো 'ইমাদ আল-আসবাহানির লেখা একটি কবিতা:
রাজ্যগুলোকে শাসন করতো বিভেদ। সব ভালাই দূর হয়ে মন্দেরা জেঁকে বসেছিলো।
কোথায় সেই লোক যাকে আমরা অনুসরণ করতাম আর যার আনুগত্য আল্লাহরই প্রতি ছিলো?
কোথায় আন-নাসির আল-মালিক যার নিয়্যাত ছিলো খালিস আর কাজ ফী সাবীলিল্লাহ?
কোথায় সে নেতা যার শাসন ছিলো বহুলাকাঙ্ক্ষিত, যার কর্তৃত্বে মন্দেরা ভীত, হে আল্লাহ?
কোথায় তিনি যিনি যুগের চাহিদা বুঝতেন, সম্মানিতদের করতেন সম্মান?
কোথায় তিনি যার অসম সাহসিকতায় ক্রুসেডাররা সব হয়ে গেছে অপমান?
জিহাদের রাহে শত দুখ ভোগী দুনিয়ারে দূরে ঠেলে দিলেন যিনি জেনে নিয়ো আমরা তো সব মরেই আছি, শুধু বেঁচে আছেন তিনি।
ইসলামের তরে সদা তৎপর জান্নাতে পেতে স্থান এমনই এক রাজা তিনি যিনি দ্বীনের তরে কুরবান।
ইয়াতীম এবং বিধবাদের প্রতি তিনি ছিলেন সদা দানশীল-দয়াময়,
সীমান্তগুলো আজ অনিরাপদ কারণ কারো জিহাদ তাঁর জিহাদের মতো নয়।
হায় ইসলামের জন্য! প্রতিটি মুমিনের মন ভরে গেছে ভয়ে, ঘণ্টার মতো করে তাঁর আমলের বছরগুলো গেছে বয়ে।
রহমত দিয়ে ভরে দিও তাঁকে, ইয়া রাহমানুর রাহীম! প্রশংসা তোমারই, হে রব্বুল 'আরশীল 'আযীম!

১. ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সালাহউদ্দীন স্বেচ্ছায় সন্ধিচুক্তি করেননি। কিন্তু সৈনিকদের অবাধ্যতা ও বিরক্তির কারণে তিনি তা করতে বাধ্য হন। আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করা এবং সিরিয়া ও ফিলিস্তিনকে পাক-পবিত্র করার জন্য তিনি জিহাদ চালিয়ে যেতে খুবই উদগ্রীব ছিলেন। তাঁর আশংকা হচ্ছিলো যে ক্রুসেডাররা তাদের শাসনাধীন শহরগুলোতে সবরকমের অনাচার-অনর্থ চালিয়ে যাবে। তারা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণ করে দখল করে বসবে, এমন আশংকাও অমূলক ছিলো না।

আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ তাঁর আন-নাওয়াদির আস-সুলতানিয়া কিতাবে লেখেন:
“আল্লাহর কসম! তিনি সমঝোতা চাননি। সমঝোতা সংক্রান্ত এক কথোপকথনে তিনি বলেন, 'আমি তাদের সাথে সমঝোতা করতে চাই না। কারণ, এমনটা করলে তারা হয়তো আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের সাথে লড়াই করে শহরগুলো পুনর্দখল করতে চাইবে। তাদের প্রত্যেকে একটা করে শহর শাসন না করা পর্যন্ত থামবে না।”

যা-ই হোক, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো এই যুদ্ধের পর উভয় পক্ষই রামাল্লা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়। উভয় পক্ষের জন্যই যুদ্ধটি ছিলো হতাশাজনক। সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ও গঠনমূলক কাজের জন্য উভয় দলই চাইছিলো পরিস্থিতি শান্ত হোক। চুক্তি স্বাক্ষরের পর মুসলিম-খ্রিষ্টান উভয় পক্ষই যে কী পরিমাণ খুশি হয়, তার বর্ণনা দিয়ে আস-সুলুক কিতাবে আল-মাকরিযি বলেন, “চুক্তির দিনটি ছিলো স্মরণীয় একটি দিন। দীর্ঘ যুদ্ধের পর উভয় পক্ষেই স্বস্তির সুবাতাস বইতে থাকে।”

সালাহউদ্দীন ঘোষণা করেন, “চুক্তির কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেছে। অতএব, তাদের মধ্য থেকে কেউ আমাদের শহরগুলোতে ঢুকতে চাইলে ঢুকুক। আমাদের কেউ ওদের শহরগুলোতে ঢুকতে চাইলে তাতেও আপত্তি নেই।” শান্তিচুক্তির পর ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে। মুসলিমরা ব্যবসায়িক কাজে ইয়াফফা যাতায়াত করতে থাকে। ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে আর জনগণ শান্তি-নিরাপত্তা উপভোগ করতে থাকে।

শুধু তা-ই না। খ্রিষ্টানদের অবাধ যাতায়াতের জন্য সুলতান সালাহউদ্দীন জেরুজালেমের দরজা খুলে দেন। বিপুল সংখ্যক খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীর খবর পেয়ে রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট শংকিত হয়ে যান যে, সালাহউদ্দীন বিরক্ত হতে পারেন। তাই তিনি সুলতানকে অনুরোধ করেন যেন লোকসংখ্যা কমিয়ে আনা হয় এবং রিচার্ডের বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো খ্রিষ্টানকে জেরুজালেমে যেতে না দেওয়া হয়। কিন্তু সালাহউদ্দীন তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এই তীর্থযাত্রীরা দূর-দূরান্ত থেকে এই পবিত্র ভূমিতে আসছে। আমার কোনো অধিকার নেই তাদেরকে বাধা দেওয়ার।” তিনি খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের প্রতি সদয় আচরণ করেন, তাদেরকে খাবার প্রদান করেন এবং তাদের সাথে কুশলাদি বিনিময় করেন।

পূর্ব থেকে পশ্চিম সমস্ত রাজাদেরকে সালাহউদ্দীন সহনশীলতা, ক্ষমা, সুন্দর আচরণ ও নৈতিকতার মহান শিক্ষা দিয়ে গেলেন। রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট দেশে ফেরার আগেই এসবকিছু ঘটে। সালাহউদ্দীনকে আল্লাহ রহম করুন এবং তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন。

২. রামল্লা চুক্তির পর সালাহউদ্দীন জেরুসালেমের অবস্থা পরিদর্শন, ব্যবস্থাপনা, বিদ্যালয় ও হাসপাতাল স্থাপন ও প্রশাসন তদারক করতে যান। তিনি হাজ্জে যেতে চান, কিন্তু ক্রুসেডারদের কাছ থেকে ক্ষতির আশংকায় রাজকুমাররা তা না করার পরামর্শ দেন। তিনি পরামর্শ মেনে নেন। তারপর উপকূলে গিয়ে ক্রুসেডারদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত দূর্গগুলোর পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার কাজে মন দেন। ২৬শে শাওয়াল তিনি জেরুজালেম থেকে নাবলুস, বিসান, টাইবেরিয়াস, বৈরুত হয়ে দামেস্কে যান। জনগণ দোকান-পাট বন্ধ করে তাঁকে বরণ করে নিতে এগিয়ে আসে। এমনটাই হওয়ার কথা। কারণ আল্লাহর ইচ্ছায় তিনিই তাদের দেশে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দমন করে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছেন।

দামেস্কে এসে তিনি রাষ্ট্রীয় কাজ তদারক, দানের উপযুক্তদের মাঝে অর্থ বিতরণ, সৈনিকদের ছুটিছাটা, জনগণের অভিযোগ শ্রবণ ইত্যাদি কাজে মন দেন। দামেস্ক ছিলো শান্তিময় এক জায়গা। সেখানে তিনি ভাই আল-'আদিল এবং সন্তানদের সাথে শিকারে বের হন। দীর্ঘ দিবস রজনীর পরিশ্রমের পর অবশেষে তিনি একটু শান্তির সুবাতাস খুঁজে পান। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ বলেন যে, দামেস্কের প্রশান্তি পেয়ে তিনি মিশরে আর ফিরে না যাওয়ার ইচ্ছা করেন। তিনি ইবনু শাদ্দাদকে দামেস্কে ডাকিয়ে আনেন। ইবনু শাদ্দাদ বলেন, “আমি তাঁর কক্ষে যাওয়ার পর তিনি আমাকে স্বাগত জানান, জড়িয়ে ধরেন এবং কান্না করেন। আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন।”

৫৮৯ হিজরির ১৪ই সফর পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকেন। তারপর হাজ্জফেরত জনগণকে অভ্যর্থনা জানাতে বের হন। হাজীদের দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাদের মধ্যকার একজন হওয়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করেন। কিন্তু এই মহান নিয়ামত তাঁর তাকদিরে ছিলো না।

৩. হাজীদের সাথে মোলাকাত করে ফিরে এসেই তিনি পীতজ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। দিন দিন তাঁর অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে। চিকিৎসকরা শেষমেশ সব আশা ছেড়ে দেন। তাঁর রোগের কথা যখন ঘোষণা করা হয়, জনগণ ভীত ও দুঃখিত হয়ে পড়ে। অনেকে দামস্কের দূর্গের কাছে জড়ো হয়ে তাঁর খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করে, কেউবা আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকে। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ এবং আল-কাযী আল-ফাদল ছাড়া আর কেউই তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি পাননি। সুলতানের অসুস্থতার পুরো সময়টা এই দুজন তাঁর সঙ্গ দেন।

ষষ্ঠ দিন। আল-কাযী ইবনু শাদ্দাদ তখন সুলতানের সাথে। ভৃত্যরা সুলতানের ঔষধ খাওয়ার পর পান করার জন্য ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসে। কিন্তু সুলতানের কাছে সে পানি খুব গরম মনে হলো। অন্য পানি আনা হলে তিনি বেশি ঠাণ্ডা বলে অভিযোগ করেন। তিনি বললেন, "আল্লাহ মহান! কারো সামর্থ্য নেই পানি পরিবর্তন করার।” তিনি আসলে রাগান্বিত হয়ে এ কথা বলেননি। ইবনু শাদ্দাদ আরো বলেন, "আল-কাযী আল-ফাদল আর আমি বাইরে গিয়ে কাঁদতে লাগলাম।" আল-কাদি আল-ফাদল বলেন, "তাঁর মতো উত্তম চরিত্রের অধিকারী কাউকে আর কখনো দেখতে পাবো না। আল্লাহর কসম! এমনটা যদি অন্য কোনো রাজার সাথে ঘটতো, তিনি চাকরকে পেয়ালা দিয়ে আঘাত করে বসতেন।"

ইবনু শাদ্দাদ বলেন:
"দশম দিনে তাঁকে দুইবার ইঞ্জেকশান দেওয়া হয়। তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে অল্প একটু পানি পান করেন। মানুষ সেদিন খুবই খুশি ছিলো। যখন বলা হলো তাঁর পা ঘামছে (জ্বর ছাড়ার লক্ষণ), তখন আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলাম। যখন জানানো হলো তাঁর সারা শরীর ঘামছে, তখনও আমরা খুশি হলাম। এগারো তম দিনে অর্থাৎ, ২৬শে সফর বলা হলো যে তাঁর শরীর এত ঘেমেছে যে বিছানা, মাদুর ও মেঝে ভিজে গেছে। ডাক্তাররা তাঁর জন্য কিছুই করতে পারলেন না।”

সালাহউদ্দীনের বড় ছেলে আল-মালিক আল-আফদাল নূরুদ্দীন 'আলী নিশ্চিত করলেন যে, সুস্থতার আর কোনো আশা নেই আর তাঁর পিতা এখন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর। তিনি জনগণকে শপথ করালেন যে, তাঁর পিতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। তাঁর মৃত্যুর পর তা নূরুদ্দীনের হাতে আসবে। আন-নাওয়াদির আস-সুলতানিয়্যা কিতাবে ইবনু শাদ্দাদ শপথটির কথাগুলো উল্লেখ করেন:
“এখন আমার নিয়্যাত ইখলাসপূর্ণ। আমি সুলতানের জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি অনুগত থাকবো। আমি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা করবো এবং তজ্জন্য আমার সম্পদ ও সময় ব্যয় করবো। আমার তলোয়ার ও সৈনিকেরা তাঁর আজ্ঞাধীন। তারপর তাঁর ছেলে আল-আফদাল নূরুদ্দীন 'আলী হবেন তাঁর উত্তরাধিকারী। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর আনুগত্য করবো, রাষ্ট্রকে নিজের জান-মাল ও তলোয়ার দিয়ে রক্ষা করবো এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবো। আমার ভেতর-বাহির একই (অর্থাৎ, মুখে যা বলছি অন্তরেও তা আছে)। আল্লাহই সর্বোত্তম সাক্ষী।”

৪. ২৭শে সফর বুধবার অসুস্থতার বারোতম দিনে সালাহউদ্দীনের স্বাস্থ্যের অবস্থা আরো খারাপ হয় এবং তিনি একরকম কোমায় চলে যান। একজন কারীকে কুর'আন তিলাওয়াত করার জন্য আনা হয়। তিনি যখন এই আয়াতে পৌঁছান, সালাহউদ্দীনের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে:
“তিনি (আল্লাহ) ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাঁর উপরই আমার ভরসা।”
২৭শে সফর, ৫৮৯ হিজরি, ফজর সালাতের পর তাঁর রূহ মহান রব্বের নিকট ফিরে যায়।

৫. সালাহউদ্দীনের মৃত্যু ছিলো মুসলিমদের জন্য বিরাট এক ধাক্কা। ইবনু শাদ্দাদ ছিলেন এর চাক্ষুস সাক্ষী। তিনি সেসময়ে মুসলিমদের মনোবেদনার বর্ণনা দিয়ে বলেন:
“এ ছিলো এক শোকের দিন। খুলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ জনের মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে উম্মাহ এমন শোকে আর কোনোদিন মূহ্যমান হয়ে পড়েনি। সেই দূর্গ, সেই জাতি ও এই পৃথিবী জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। আল্লাহর কসম! আমি কিছু মানুষকে তাঁর জন্য নিজের জীবন কুরবানি করে দেওয়ার কথা বলতে শুনেছি। এমন গুরুতর কথা আমি কখনো কাউকে বলতে শুনিনি। এমন কুরবানি যদি জায়েয হতো, তাহলে মনে হয় তা কবুল হয়ে তাঁর জীবনই বেঁচে যেতো। তাঁর ছেলেরা রাস্তায় বেরিয়ে গিয়ে কাঁদতে থাকে। মানুষ এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। যুহরের ওয়াক্ত পর্যন্ত এই ছিলো পরিস্থিতি। 'আসর সালাতের আগে তাঁকে দাফন করা হয়। রাহিমাহুল্লাহ! তাঁর ছেলে আল-মালিক আয-যাফির শোকার্ত জনতাকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন।"

৬. আল-কাযী আল-ফাদলের আনা একটি কাফনে মোড়া অবস্থায় 'আসরের আগে সালাহউদ্দীনকে তাঁর কবরের আবাসস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর কফিন দেখামাত্র সবাই একসাথে এমনভাবে কান্না জুড়ে দেয় যে, মনে হতে থাকে একজন মানুষই এভাবে কাঁদছে। দামেস্কের দূর্গের প্রাঙ্গনে তাঁকে দাফন করা হয়। তিন বছর পর আল-উমাওয়াই মাসজিদের কাছেই এক নেককার লোকের কাছ থেকে একটি ঘর ক্রয় করেন আল-মালিক আল-ফাদল। তারপর তিনি একে সমাধির মতো বানান। 'আশুরা'র দিনে (১০ই মুহাররম) বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তিনি সালাহউদ্দীনের দেহাবশেষ সেখানে স্থানান্তর করেন এবং আল-উমাওয়াই মাসজিদের কাছে তিন দিন শোক পালন করেন।

সালাহউদ্দীনের মৃত্যুর দিন মুসলিমরা এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্রকে হারায়, যিনি মানুষের হৃদয়ে সম্মানের জায়গা করে নিয়েছিলেন। মায়েদের জন্য কতই না কঠিন এমন আরেকটি সন্তানের জন্ম দেওয়া, যার মাঝে একসাথে এত গুণাবলির সম্মেলন ঘটেছে: মহান, কুরবানিওয়ালা, সৎ এবং বীর যোদ্ধা। আল্লাহ তাঁকে আখিরাতে সম্মানিত করুন, তাঁর কবরকে আলোকিত করুন এবং জান্নাতে তাঁকে উঁচু মাকাম দান করুন।

৭. মৃত্যুকালে সালাহউদ্দীন (রাহমাতুল্লাহ 'আলাইহি) এর বয়স ছিলো সাতান্ন বছর। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ সাতচল্লিশ দিরহাম ও এক দিনার। এছাড়া কোনো জমি, বাগান, খামার বা সম্পত্তি তিনি রেখে যাননি।

৮. তাঁর মৃত্যুর পর অসংখ্য কবি তাঁকে নিয়ে কাব্যরচনা করে। তারা তাঁর মহান গুণাবলি বর্ণনা করে, যেমন জনগণের প্রতি তার ভালোবাসা। মুসলিমদের পবিত্র ভূমিসমূহের প্রতিরক্ষা ও হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করার প্রতীক হিসেবে তাঁকে তুলে ধরা হয়। এসব কবিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো 'ইমাদ আল-আসবাহানির লেখা একটি কবিতা:
রাজ্যগুলোকে শাসন করতো বিভেদ। সব ভালাই দূর হয়ে মন্দেরা জেঁকে বসেছিলো।
কোথায় সেই লোক যাকে আমরা অনুসরণ করতাম আর যার আনুগত্য আল্লাহরই প্রতি ছিলো?
কোথায় আন-নাসির আল-মালিক যার নিয়্যাত ছিলো খালিস আর কাজ ফী সাবীলিল্লাহ?
কোথায় সে নেতা যার শাসন ছিলো বহুলাকাঙ্ক্ষিত, যার কর্তৃত্বে মন্দেরা ভীত, হে আল্লাহ?
কোথায় তিনি যিনি যুগের চাহিদা বুঝতেন, সম্মানিতদের করতেন সম্মান?
কোথায় তিনি যার অসম সাহসিকতায় ক্রুসেডাররা সব হয়ে গেছে অপমান?
জিহাদের রাহে শত দুখ ভোগী দুনিয়ারে দূরে ঠেলে দিলেন যিনি জেনে নিয়ো আমরা তো সব মরেই আছি, শুধু বেঁচে আছেন তিনি।
ইসলামের তরে সদা তৎপর জান্নাতে পেতে স্থান এমনই এক রাজা তিনি যিনি দ্বীনের তরে কুরবান।
ইয়াতীম এবং বিধবাদের প্রতি তিনি ছিলেন সদা দানশীল-দয়াময়,
সীমান্তগুলো আজ অনিরাপদ কারণ কারো জিহাদ তাঁর জিহাদের মতো নয়।
হায় ইসলামের জন্য! প্রতিটি মুমিনের মন ভরে গেছে ভয়ে, ঘণ্টার মতো করে তাঁর আমলের বছরগুলো গেছে বয়ে।
রহমত দিয়ে ভরে দিও তাঁকে, ইয়া রাহমানুর রাহীম! প্রশংসা তোমারই, হে রব্বুল 'আরশীল 'আযীম!

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 শেষ কথা

📄 শেষ কথা


এই ছিলো অবিস্মরণীয় বীর সুলতান ইউসুফ সালাহউদ্দীন আল-আইয়ুবীর জীবনের এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। তাঁর দ্বীনদারি, সাহসিকতা, দয়া, দৃঢ়তা, দানশীলতা, জিহাদ ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে। আরো দেখানো হয়েছে কীভাবে তিনি উত্তর ইরাক, কুর্দিস্তান, শাম, ইয়েমেন, মিশর ও বারকাহ সহ খণ্ড-বিখণ্ড মুসলিম ভূমি ও অন্তরগুলোকে ইসলামের পতাকার নিচে একত্র করেছেন। এই ইসলামী ঐক্যের খবরে বিশ্বের আনাচে কানাচের মুসলিমরা আনন্দিত হয়। অল্প সময় পরই তাঁর নেতৃত্বে হাত্তিনের মহাগুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে মুসলিমরা জয়লাভ করে জেরুজালেমের মুক্তি তরান্বিত করে। তিনি ফ্র্যাংক ও অন্যান্য পশ্চিমা কুফফার শক্তিগুলোকে পরাস্ত করেন। ক্রুসেডারদেরকে অ্যাকর ও ইয়াফফা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। তাঁর মৃত্যুর অনেক বছর পর ইসলামী বাহিনী ক্রুসেডারদেরকে মুসলিম ভূমিগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করতে সমর্থ হয়।

ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। ইয়াহুদী ও উপনিবেশবাদী নব্য-ক্রুসেডারদের ষড়যন্ত্রে উসমানী খিলাফাহর পতনের মাধ্যমে মুসলিমরা আবার ছোট ছোট জাতিরাষ্ট্রে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মুসলিমরা যখন বিভক্ত হচ্ছে, ততক্ষণে ইয়াহুদীরা ইসলামের প্রথম কিবলার ভূমিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেছে আর দিনে দিনে শক্তি-সামর্থ্যে বেড়ে চলেছে। অতীতের অবস্থা আর বর্তমানের অবস্থা হুবহু একইরকম। কিন্তু কোন সে কারণ, যার জন্য আজকের মুসলিমরা অতীতের মতো জয়লাভ করতে পারছে না?

* অতীতে ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য মুসলিমরা ইসলামের নামে যুদ্ধ করছে। আর আজকে যুদ্ধ করছে এমন সব জাতীয়তাবাদী মিথ্যা স্লোগানের নামে, যেসবের ব্যাপারে আল্লাহ কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি।
* অতীতে তারা জয়লাভ করেছে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার-ফায়সালা করার কারণে। আর আজকে পূর্ব-পশ্চিম সবখান থেকে আমদানীকৃত মানবরচিত জগািখচুড়ি দিয়ে মুসলিম ভূমিগুলো শাসিত হচ্ছে।
* অতীতে জয়লাভ করেছে শক্তিশালী এক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর। আর আজ পরাজিত হচ্ছে ছোট ছোট দুর্বল জাতিরাষ্ট্রে ভাগ হয়ে থাকার কারণে।
* অতীতে জয়লাভ করেছে আল্লাহর সাহায্যে ইয়াকীন করার কারণে। আজ তাদের ইয়াকীন হলো পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের মতো যুলুমের হাতিয়ারগুলোর প্রতি।
* আজকে সাধারণভাবে মুসলিম ও বিশেষ করে আরব মুসলিম শাসকদেরকে ইতিহাস অধ্যয়ন করে জানতে হবে কীভাবে রাসূলুল্লাহ থেকে শুরু করে আমাদের পূর্ববর্তী সালাফগণ বদর, কাদিসিয়াহ, ইয়ারমুক, হাত্তিন, 'আইন জালুতের যুদ্ধগুলো জিতেছে। তাঁদের মতো ঈমান-আকিদা, দ্বীনদারি-ইবাদাত, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সাহসিকতা-দৃঢ়তা অর্জন করতে হবে।

তাদের আরো উচিত হবে আল্লাহর দেওয়া বিধানাবলি অধ্যয়ন করা, কুর'আন শিক্ষা করা। কারণ আল্লাহর হুকুমই সত্য, সুন্দর; এতেই প্রগতি, এতেই উন্নতি; ন্যায়, সমতা আর শান্তি এখানেই; এখানেই লুকিয়ে আছে শক্তি, বিজয় ও সভ্যতার রহস্য। আল্লাহ বলেন:
তারা কি জাহিলি যুগের আইন-বিধান চায়? দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আইন-বিধান প্রদানে আল্লাহ হতে কে বেশি শ্রেষ্ঠ? [৭৫]

সালাহউদ্দীনকে আল্লাহ রহম করুন। তিনি তাঁর দায়িত্ব পূর্ণ করেছেন, উম্মাহর হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করেছেন, মুসলিমদেরকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করেছেন, ক্রুসেডারদের নাপাক থাবা থেকে জেরুজালেমকে মুক্ত করেছেন। পূর্ব-পশ্চিমের ইতিহাসে সালাহউদ্দীনের এমন অবিস্মরণীয় হয়ে থাকাটা তাই অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইতিহাস তাঁর জীবন, নৈতিকতা, বিরল সাহসিকতা, মহান সৌজন্যবোধ ও সংগ্রামের কাহিনী চিরকাল মনে রাখবে।

আমরা ইবনু শাদ্দাদের ভাষায় তাঁর জন্য দু'আ করি, “হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে আপনার দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য তিনি তাঁর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তিনি আপনার রহমত প্রত্যাশী ছিলেন। তাঁকে আপনি রহম করুন।”

আমরা আরো দু'আ করি আল্লাহ যেন আমাদেরকে সালাহউদ্দীনের মতো আরেকজন নেতা দেন যিনি জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন সহ সকল মুসলিম ভূমিগুলোকে ইয়াহুদী ও নব্য-ক্রুসেডারদের হাত থেকে মুক্ত করবেন।

সেদিন মু'মিনরা আনন্দ করবে। (সে বিজয় অর্জিত হবে) আল্লাহর সাহায্যে। যাকে ইচ্ছে তিনি সাহায্য করেন। তিনি মহাপরাক্রমশালী, বড়ই দয়ালু। [৭৬]

আল্লাহর কাছে দু'আ করে কবি বলেন:
কত শত পথে ভাগ হয়ে গেছে হায় মোদের হৃদয়গুলো, রব্বের কাছে যে দু হাত তুলে আজ দু'আর সময় এলো!
হে আল্লাহ! দাও সে শাসক, ইসলামের তরে যে কুরবান, মুসলিমদের প্রতি সে আর তার প্রতি তুমি থাকবে মেহেরবান।

টিকাঃ
৭৫. সূরাহ আল-মা'ইদাহ ৫:৫০
৭৬. সূরাহ আর-রূম ৩০: ৪-৫

এই ছিলো অবিস্মরণীয় বীর সুলতান ইউসুফ সালাহউদ্দীন আল-আইয়ুবীর জীবনের এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। তাঁর দ্বীনদারি, সাহসিকতা, দয়া, দৃঢ়তা, দানশীলতা, জিহাদ ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে। আরো দেখানো হয়েছে কীভাবে তিনি উত্তর ইরাক, কুর্দিস্তান, শাম, ইয়েমেন, মিশর ও বারকাহ সহ খণ্ড-বিখণ্ড মুসলিম ভূমি ও অন্তরগুলোকে ইসলামের পতাকার নিচে একত্র করেছেন। এই ইসলামী ঐক্যের খবরে বিশ্বের আনাচে কানাচের মুসলিমরা আনন্দিত হয়। অল্প সময় পরই তাঁর নেতৃত্বে হাত্তিনের মহাগুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে মুসলিমরা জয়লাভ করে জেরুজালেমের মুক্তি তরান্বিত করে। তিনি ফ্র্যাংক ও অন্যান্য পশ্চিমা কুফফার শক্তিগুলোকে পরাস্ত করেন। ক্রুসেডারদেরকে অ্যাকর ও ইয়াফফা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। তাঁর মৃত্যুর অনেক বছর পর ইসলামী বাহিনী ক্রুসেডারদেরকে মুসলিম ভূমিগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করতে সমর্থ হয়।

ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। ইয়াহুদী ও উপনিবেশবাদী নব্য-ক্রুসেডারদের ষড়যন্ত্রে উসমানী খিলাফাহর পতনের মাধ্যমে মুসলিমরা আবার ছোট ছোট জাতিরাষ্ট্রে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মুসলিমরা যখন বিভক্ত হচ্ছে, ততক্ষণে ইয়াহুদীরা ইসলামের প্রথম কিবলার ভূমিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেছে আর দিনে দিনে শক্তি-সামর্থ্যে বেড়ে চলেছে। অতীতের অবস্থা আর বর্তমানের অবস্থা হুবহু একইরকম। কিন্তু কোন সে কারণ, যার জন্য আজকের মুসলিমরা অতীতের মতো জয়লাভ করতে পারছে না?

* অতীতে ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য মুসলিমরা ইসলামের নামে যুদ্ধ করছে। আর আজকে যুদ্ধ করছে এমন সব জাতীয়তাবাদী মিথ্যা স্লোগানের নামে, যেসবের ব্যাপারে আল্লাহ কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি।
* অতীতে তারা জয়লাভ করেছে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার-ফায়সালা করার কারণে। আর আজকে পূর্ব-পশ্চিম সবখান থেকে আমদানীকৃত মানবরচিত জগািখচুড়ি দিয়ে মুসলিম ভূমিগুলো শাসিত হচ্ছে।
* অতীতে জয়লাভ করেছে শক্তিশালী এক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর। আর আজ পরাজিত হচ্ছে ছোট ছোট দুর্বল জাতিরাষ্ট্রে ভাগ হয়ে থাকার কারণে।
* অতীতে জয়লাভ করেছে আল্লাহর সাহায্যে ইয়াকীন করার কারণে। আজ তাদের ইয়াকীন হলো পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের মতো যুলুমের হাতিয়ারগুলোর প্রতি।
* আজকে সাধারণভাবে মুসলিম ও বিশেষ করে আরব মুসলিম শাসকদেরকে ইতিহাস অধ্যয়ন করে জানতে হবে কীভাবে রাসূলুল্লাহ থেকে শুরু করে আমাদের পূর্ববর্তী সালাফগণ বদর, কাদিসিয়াহ, ইয়ারমুক, হাত্তিন, 'আইন জালুতের যুদ্ধগুলো জিতেছে। তাঁদের মতো ঈমান-আকিদা, দ্বীনদারি-ইবাদাত, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সাহসিকতা-দৃঢ়তা অর্জন করতে হবে।

তাদের আরো উচিত হবে আল্লাহর দেওয়া বিধানাবলি অধ্যয়ন করা, কুর'আন শিক্ষা করা। কারণ আল্লাহর হুকুমই সত্য, সুন্দর; এতেই প্রগতি, এতেই উন্নতি; ন্যায়, সমতা আর শান্তি এখানেই; এখানেই লুকিয়ে আছে শক্তি, বিজয় ও সভ্যতার রহস্য। আল্লাহ বলেন:
তারা কি জাহিলি যুগের আইন-বিধান চায়? দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আইন-বিধান প্রদানে আল্লাহ হতে কে বেশি শ্রেষ্ঠ? [৭৫]

সালাহউদ্দীনকে আল্লাহ রহম করুন। তিনি তাঁর দায়িত্ব পূর্ণ করেছেন, উম্মাহর হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করেছেন, মুসলিমদেরকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করেছেন, ক্রুসেডারদের নাপাক থাবা থেকে জেরুজালেমকে মুক্ত করেছেন। পূর্ব-পশ্চিমের ইতিহাসে সালাহউদ্দীনের এমন অবিস্মরণীয় হয়ে থাকাটা তাই অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইতিহাস তাঁর জীবন, নৈতিকতা, বিরল সাহসিকতা, মহান সৌজন্যবোধ ও সংগ্রামের কাহিনী চিরকাল মনে রাখবে।

আমরা ইবনু শাদ্দাদের ভাষায় তাঁর জন্য দু'আ করি, “হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে আপনার দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য তিনি তাঁর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তিনি আপনার রহমত প্রত্যাশী ছিলেন। তাঁকে আপনি রহম করুন।”

আমরা আরো দু'আ করি আল্লাহ যেন আমাদেরকে সালাহউদ্দীনের মতো আরেকজন নেতা দেন যিনি জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন সহ সকল মুসলিম ভূমিগুলোকে ইয়াহুদী ও নব্য-ক্রুসেডারদের হাত থেকে মুক্ত করবেন।

সেদিন মু'মিনরা আনন্দ করবে। (সে বিজয় অর্জিত হবে) আল্লাহর সাহায্যে। যাকে ইচ্ছে তিনি সাহায্য করেন। তিনি মহাপরাক্রমশালী, বড়ই দয়ালু। [৭৬]

আল্লাহর কাছে দু'আ করে কবি বলেন:
কত শত পথে ভাগ হয়ে গেছে হায় মোদের হৃদয়গুলো, রব্বের কাছে যে দু হাত তুলে আজ দু'আর সময় এলো!
হে আল্লাহ! দাও সে শাসক, ইসলামের তরে যে কুরবান, মুসলিমদের প্রতি সে আর তার প্রতি তুমি থাকবে মেহেরবান।

টিকাঃ
৭৫. সূরাহ আল-মা'ইদাহ ৫:৫০
৭৬. সূরাহ আর-রূম ৩০: ৪-৫

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 শাইখ সা’ইদ হাওয়ার অভিমত

📄 শাইখ সা’ইদ হাওয়ার অভিমত


সকল প্রশংসা আল্লাহ্। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের উপর এবং তাঁর পরিবারবর্গের উপর।

সালাহউদ্দীন আইয়ুবী সম্পর্কে লেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখক যথাযথ কাজ করেছেন। কারণ,

প্রথমত, আজ মুসলিম উম্মাহর সালাহউদ্দীনের মতো একজন বীরের বড় বেশি প্রয়োজন। তাই তাঁর অনুরূপ ব্যক্তি খুঁজে পেতে হলে তাঁর জীবনচরিত অধ্যয়ন অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, জেরুজালেম বর্তমানে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একে স্বাধীন করতে হলে আমাদের জানতে হবে যে, আমাদের পূর্বসূরিগণ কোন পথে হেঁটে জেরুজালেমের মুক্তি এনেছিলেন।

তৃতীয়ত, আমাদের মুসলিম উম্মাহ সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে সরে গেছে এবং আমাদের আদর্শ ব্যক্তিদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাই এই উম্মাহর উচিত সেই আদর্শধারী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা, যাদের মধ্যে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী অন্যতম।

চতুর্থত, এই উম্মাহ জিহাদ পরিত্যাগ করেছে, যা ফিলিস্তিন দখলমুক্ত করার একমাত্র পথ। উল্টো মুসলিমরা আজ লোভ-লালসার পথ ও দ্বীনের বিধিবিধান সম্পর্কে কুতর্ক করার পথ ধরেছে। তাই সালাহউদ্দীনের বিস্তারিত জীবনী আলোচনার মাধ্যমে এসব কুতর্কের পথ রুদ্ধ করা জরুরি।

অতএব, লেখকের সিদ্ধান্ত সঠিক। আমরা আশা করি মুসলিমরা বিজয় অর্জনের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করতে জোর প্রচেষ্টা চালাবে।

এছাড়াও সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁর বিচক্ষণতার উৎস ও তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসার কারণ ছিলো ইসলাম। তাঁর উপর মানুষের আস্থা এবং উম্মাহর ঈমান ছিলো জেরুজালেম মুক্তির কারণ। আজকের মুসলিম নেতাদের উচিৎ সালাহউদ্দীনের কাছ থেকে নেতৃত্বের সঠিক গুণাবলি শিখে নেওয়া।

আমাদের সামনে একমাত্র পথ হলো ফিলিস্তিন ইশ্যুকে মুসলিম উম্মাহর হাজার বছরের আবহমান আশা, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের আলোকে দেখতে শেখা। সালাহউদ্দীনের স্মৃতি আজও অম্লান, কারণ তিনি এই পথেই এগিয়েছিলেন।

যারা ভাবে নেতৃত্বের গুণাবলি হলো ফাঁকা বুলি ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, তারা ভুল করছে। তারা এই পথে চলতে থাকলে অনাগত প্রজন্ম তাদের অভিশাপ দেবে এবং ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে।

যারাই বিশ্বাস করে যে মুসলিম উম্মাহর চিরন্তন ঐতিহ্য বাদ দিয়ে অন্য পথ ধরে ফিলিস্তিন মুক্ত করা যাবে, তারাই আল্লাহ্র গযব, প্রজন্মের বদদু'আ ও ইতিহাসের তিরস্কার ভোগ করবে।

যুগ যুগ ধরে এই দ্বীনের কেন্দ্রীয় একটি বিষয় হয়ে রয়েছে এই ফিলিস্তিন ইশ্যু। আমাদের গৌরব ও বীরত্বের স্মারকও এটিই। ক্রুসেডার ষড়যন্ত্রের বিনাশ শুরু হয়েছে ইসলামের পতাকাতলে শাম (বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও ফিলিস্তিন) ও মিশরের একীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে। আব্বাসি খিলাফাতের অধীনে থাকা মুসলিম বিশ্বের সমর্থনও প্রয়োজন ছিলো এই ঐক্যের জন্য। আজকেও ফিলিস্তিন সংকট সমাধান করতে হলে ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষার ভিত্তিতে এমন ঐক্য গড়তে হবে। পুরো মুসলিম বিশ্বেরই সহযোগিতা প্রয়োজন। এই বইটি সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে এক বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ। আমাদের উচিৎ বইটি পাঠ করা, বিতরণ করা ও উপহার দেওয়া। আল্লাহ্ এই বইয়ের রচয়িতাকে রহম করুন।

-শাইখ সা'ঈদ হাওয়া

সকল প্রশংসা আল্লাহ্। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের উপর এবং তাঁর পরিবারবর্গের উপর।

সালাহউদ্দীন আইয়ুবী সম্পর্কে লেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখক যথাযথ কাজ করেছেন। কারণ,

প্রথমত, আজ মুসলিম উম্মাহর সালাহউদ্দীনের মতো একজন বীরের বড় বেশি প্রয়োজন। তাই তাঁর অনুরূপ ব্যক্তি খুঁজে পেতে হলে তাঁর জীবনচরিত অধ্যয়ন অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, জেরুজালেম বর্তমানে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একে স্বাধীন করতে হলে আমাদের জানতে হবে যে, আমাদের পূর্বসূরিগণ কোন পথে হেঁটে জেরুজালেমের মুক্তি এনেছিলেন।

তৃতীয়ত, আমাদের মুসলিম উম্মাহ সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে সরে গেছে এবং আমাদের আদর্শ ব্যক্তিদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাই এই উম্মাহর উচিত সেই আদর্শধারী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা, যাদের মধ্যে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী অন্যতম।

চতুর্থত, এই উম্মাহ জিহাদ পরিত্যাগ করেছে, যা ফিলিস্তিন দখলমুক্ত করার একমাত্র পথ। উল্টো মুসলিমরা আজ লোভ-লালসার পথ ও দ্বীনের বিধিবিধান সম্পর্কে কুতর্ক করার পথ ধরেছে। তাই সালাহউদ্দীনের বিস্তারিত জীবনী আলোচনার মাধ্যমে এসব কুতর্কের পথ রুদ্ধ করা জরুরি।

অতএব, লেখকের সিদ্ধান্ত সঠিক। আমরা আশা করি মুসলিমরা বিজয় অর্জনের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করতে জোর প্রচেষ্টা চালাবে।

এছাড়াও সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁর বিচক্ষণতার উৎস ও তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসার কারণ ছিলো ইসলাম। তাঁর উপর মানুষের আস্থা এবং উম্মাহর ঈমান ছিলো জেরুজালেম মুক্তির কারণ। আজকের মুসলিম নেতাদের উচিৎ সালাহউদ্দীনের কাছ থেকে নেতৃত্বের সঠিক গুণাবলি শিখে নেওয়া।

আমাদের সামনে একমাত্র পথ হলো ফিলিস্তিন ইশ্যুকে মুসলিম উম্মাহর হাজার বছরের আবহমান আশা, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের আলোকে দেখতে শেখা। সালাহউদ্দীনের স্মৃতি আজও অম্লান, কারণ তিনি এই পথেই এগিয়েছিলেন।

যারা ভাবে নেতৃত্বের গুণাবলি হলো ফাঁকা বুলি ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, তারা ভুল করছে। তারা এই পথে চলতে থাকলে অনাগত প্রজন্ম তাদের অভিশাপ দেবে এবং ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে।

যারাই বিশ্বাস করে যে মুসলিম উম্মাহর চিরন্তন ঐতিহ্য বাদ দিয়ে অন্য পথ ধরে ফিলিস্তিন মুক্ত করা যাবে, তারাই আল্লাহ্র গযব, প্রজন্মের বদদু'আ ও ইতিহাসের তিরস্কার ভোগ করবে।

যুগ যুগ ধরে এই দ্বীনের কেন্দ্রীয় একটি বিষয় হয়ে রয়েছে এই ফিলিস্তিন ইশ্যু। আমাদের গৌরব ও বীরত্বের স্মারকও এটিই। ক্রুসেডার ষড়যন্ত্রের বিনাশ শুরু হয়েছে ইসলামের পতাকাতলে শাম (বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও ফিলিস্তিন) ও মিশরের একীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে। আব্বাসি খিলাফাতের অধীনে থাকা মুসলিম বিশ্বের সমর্থনও প্রয়োজন ছিলো এই ঐক্যের জন্য। আজকেও ফিলিস্তিন সংকট সমাধান করতে হলে ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষার ভিত্তিতে এমন ঐক্য গড়তে হবে। পুরো মুসলিম বিশ্বেরই সহযোগিতা প্রয়োজন। এই বইটি সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে এক বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ। আমাদের উচিৎ বইটি পাঠ করা, বিতরণ করা ও উপহার দেওয়া। আল্লাহ্ এই বইয়ের রচয়িতাকে রহম করুন।

-শাইখ সা'ঈদ হাওয়া

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 প্রখ্যাত কবি ও অধ্যাপক আব্দুল জববার আর-রাহবির অভিমত

📄 প্রখ্যাত কবি ও অধ্যাপক আব্দুল জববার আর-রাহবির অভিমত


অসাধারণ বিশেষজ্ঞ ও দ্বীনদার অধ্যাপক আব্দুল্লাহ নাসিহ উলওয়ানের প্রতি।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাহাতুহু। কেমন আছেন, অধ্যাপক উলওয়ান? আমাদের বন্ধুবর, জ্ঞানী-গুণী, মহান ভাই অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আত-তানতাওয়ির উপস্থিতিতে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। আল্লাহ্র দ্বীনের মুজাহিদ, মুশরিক ও উপনিবেশবাদী শত্রুদের হাত থেকে মুসলিম ভূমিগুলোকে পবিত্রকারী, ন্যায়পরায়ণ মুসলিম সম্রাট সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর জীবনী নিয়ে আপনার বইটি আপনার কাছ থেকেই উপহার পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ।

আমি বইটি পড়েছি, ইতিহাসের মূল্যবান শিক্ষা আহরণ করেছি; যে ইতিহাস বীরত্ব, জিহাদ, সততা ও তাকওয়ায় পরিপূর্ণ। তাই আমি এই উপহারের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ একটি কাব্য রচনা করতে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আপনার খেদমতে তা এখানে পেশ করলাম।

সালাহ আদ-দ্বীন আল্লাহ্ তোমায় প্রতিদান দিন, হে আল্লাহর দাস!
কলমে যে লিখেছো তুমি সালাহুদ্দীনের ইতিহাস।
লিবদ্ধ হয়েছে এতে এক মহানেতার কাহিনী
আরও যত বীর ইসলামের তরে হাঁকিয়েছে বাহিনী।
মুসলিম জাতি তাঁদেরই অধীনে মেনেছে ইসলামী শাস্ত্র,
তাদের হাতে গড়ে উঠেছে ন্যায়ানুগ ইসলামী রাষ্ট্র।
তাঁরা যে করেছেন আল্লাহর পথে বারেবারে এ জিহাদ
তাই ইতিহাস জানায় তাঁদের অবিরত সাধুবাদ।

ভূমিগুলো সব মুক্ত করে তাঁরা তাড়ালেন হানাদার,
দামিয়েটা, গাযা, হাত্তিন যেন ফিরে আসে বারেবার।
গোলানে ইউরো রাজারা লুটায় ইমাদুদ্দীনের পায়ে,
ইয়াফফা-অ্যাকরে নুরুদ্দীন যেন বজ্রের ন্যায় বয়ে যায়।
ভুলবে না কেউ সালাহউদ্দীনের বিজয়, ন্যায় আর দয়া,
যুগ যুগ ধরে তাঁর ইতিহাস একেবারে থাকে নয়া।
উলওয়ান ভাই, তোমার জন্য শুভকামনাই শুধু,
সুবাসিত তা ফুলেরই মতো আর রূপে যেন নয়াবধূ।

সবশেষে আমার সবিশেষ অভিবাদন জানাচ্ছি।

ইতি আব্দুল জব্বার আর-রাহবি
৬ই মার্চ, ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ

অসাধারণ বিশেষজ্ঞ ও দ্বীনদার অধ্যাপক আব্দুল্লাহ নাসিহ উলওয়ানের প্রতি।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাহাতুহু। কেমন আছেন, অধ্যাপক উলওয়ান? আমাদের বন্ধুবর, জ্ঞানী-গুণী, মহান ভাই অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আত-তানতাওয়ির উপস্থিতিতে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। আল্লাহ্র দ্বীনের মুজাহিদ, মুশরিক ও উপনিবেশবাদী শত্রুদের হাত থেকে মুসলিম ভূমিগুলোকে পবিত্রকারী, ন্যায়পরায়ণ মুসলিম সম্রাট সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর জীবনী নিয়ে আপনার বইটি আপনার কাছ থেকেই উপহার পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ।

আমি বইটি পড়েছি, ইতিহাসের মূল্যবান শিক্ষা আহরণ করেছি; যে ইতিহাস বীরত্ব, জিহাদ, সততা ও তাকওয়ায় পরিপূর্ণ। তাই আমি এই উপহারের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ একটি কাব্য রচনা করতে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আপনার খেদমতে তা এখানে পেশ করলাম।

সালাহ আদ-দ্বীন আল্লাহ্ তোমায় প্রতিদান দিন, হে আল্লাহর দাস!
কলমে যে লিখেছো তুমি সালাহুদ্দীনের ইতিহাস।
লিবদ্ধ হয়েছে এতে এক মহানেতার কাহিনী
আরও যত বীর ইসলামের তরে হাঁকিয়েছে বাহিনী।
মুসলিম জাতি তাঁদেরই অধীনে মেনেছে ইসলামী শাস্ত্র,
তাদের হাতে গড়ে উঠেছে ন্যায়ানুগ ইসলামী রাষ্ট্র।
তাঁরা যে করেছেন আল্লাহর পথে বারেবারে এ জিহাদ
তাই ইতিহাস জানায় তাঁদের অবিরত সাধুবাদ।

ভূমিগুলো সব মুক্ত করে তাঁরা তাড়ালেন হানাদার,
দামিয়েটা, গাযা, হাত্তিন যেন ফিরে আসে বারেবার।
গোলানে ইউরো রাজারা লুটায় ইমাদুদ্দীনের পায়ে,
ইয়াফফা-অ্যাকরে নুরুদ্দীন যেন বজ্রের ন্যায় বয়ে যায়।
ভুলবে না কেউ সালাহউদ্দীনের বিজয়, ন্যায় আর দয়া,
যুগ যুগ ধরে তাঁর ইতিহাস একেবারে থাকে নয়া।
উলওয়ান ভাই, তোমার জন্য শুভকামনাই শুধু,
সুবাসিত তা ফুলেরই মতো আর রূপে যেন নয়াবধূ।

সবশেষে আমার সবিশেষ অভিবাদন জানাচ্ছি।

ইতি আব্দুল জব্বার আর-রাহবি
৬ই মার্চ, ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00